Home ইতিহাস পাশ্চাত্যে ধর্মচর্চার ইতিকথা

পাশ্চাত্যে ধর্মচর্চার ইতিকথা

338
0
SHARE

সুপ্রিয় পাঠক, এ প্রান্তিকের নতুন আয়োজন পাশ্চাত্যে ধর্মচর্চার ইতিকথা’য় আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ৷ আশা করি নতুন এ ধারাবাহিক আপনাদের চিন্তা-চেতনাকে সমৃদ্ধ করতে সহযোগিতা করবে৷ মানব জীবনের স্বাভাবিক বা মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্ম৷ ধর্মের ইতিহাস তাই মানবেতিহাসের মতোই প্রাচীন৷ ধর্মের ইতিহাস নিয়ে যতো বিচিত্র গবেষণা হয়েছে , কিংবা ধর্মের যতো বিচিত্র সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে , সেসবই একটি সত্যকেই উপস্থাপন করেছে , তা হলো-মানবেতিহাসের শুরু থেকেই ধর্ম মানুষের অন্তর-আত্মা জুড়ে বিদ্যমান ছিল৷ কালের পরিক্রমায় ধর্মের অস্তিত্ব এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্য এটাই প্রমাণ করে যে , বিভিন্ন ধর্মেই আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করা হতো৷ অন্যভাবে বলা যায় যে , সমগ্র মানব জাতিই নিজেদেরকে মাখলুক বা সৃষ্টি বলে মনে করতো এবং তাদের স্রষ্টার ইবাদাত করতো৷ তাহলে ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের জনগণ ধর্ম নিয়ে কী ভাবতো বা কীভাবে ভাবতো-এই কৌতূহল আধুনিক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে সবার মনেই জাগতে পারে৷ সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা নতুন এই ধারাবাহিকের আয়োজন করেছি ৷

ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে আসরের ভূমিকাপর্বে যা বলা হলো , ইউরোপ বা পাশ্চাত্যেও ধর্মের সেই ইতিহাস ব্যতিক্রমী ছিল না৷ খৃষ্ট ধর্মের সাথে পরিচিত হবার আগে ইউরোপীয়দের মাঝে বহু ধর্মের রেওয়াজ ছিল৷ প্রাচীনকালে রোমান সাম্রাজ্যের ছোট্ট একটি অংশে ইহুদি এবং জরাথ্রুস্ট ধর্মের কিছু অনুসারী ছিল৷ এদের বাইরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠি ছিল বহু খোদায় বিশ্বাসী অর্থাৎ একত্ববাদ বিরোধী৷ তারা অনেক খোদার পূজা করতো৷ সে সময় ইউরোপীয়দের অধিকাংশই ছিল মূর্তিপূজক৷ তারা বহু পশু বা বৃক্ষের পূজা করার পাশাপাশি প্রকৃতি পূজা অর্থাৎ সূর্য , নক্ষত্র , সমুদ্র ইত্যাদির পূজা করতো৷ ইউরোপের বারবারিয়ান গোত্রে এসব পূজা বেশি হতো৷ গ্রীসের অধিবাসীরা তখন অনেক খোদায় বিশ্বাসী ছিল৷ গ্রীক সভ্যতার ইতিহাস বিধৃত হয়েছে কালজয়ী মহাকবি হোমারের মহাকাব্যে ৷ তার মহাকাব্যের রূপকথাগুলোতেও বহু খোদা বা দেবতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়৷ এসব ছিল তার জীবনদর্শনেরই কাব্যিক রূপমাত্র৷ হোমারের কাব্যের ব্যাপক প্রভাব ছিল জনগণের ওপর৷ তার কাব্যে খোদা এবং ধর্মের যে ব্যাখ্যা ও পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে তার প্রভাবে সমকালীন গ্রীকবাসীদের অনেকেই বারো খোদায় বিশ্বাস করতো৷ সোফিস্টদের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে হোমারের খোদাদের ব্যাপারে জনগণের বিশ্বাসে ভাটা পড়ে৷ সোফিস্টরা ছিল সন্দেহবাদী৷ সবকিছুর ব্যাপারেই তারা সন্দেহ পোষণ করতো৷ সত্যকে তারা আপেক্ষিক বলে মনে করতো৷ তাই সোফিস্টদের আগমণের ফলে গ্রিসের জনগণের মাঝে নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা দেয়৷ কারণ হলো , সোফিস্টদের প্রভাবে মানুষের মন থেকে খোদার ভয় দূর হয়ে গিয়েছিল৷ অবশ্য এ সময় মানুষের মাঝে সক্রেটিস , প্লেটো , এরিস্টটলের মতো কালজয়ী প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেছিল৷ অনেকের মতে এঁরা এক খোদায় বিশ্বাসী ছিলেন৷ এঁরা হোমারের খোদাদেরকে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে উপহাস করতেন৷ প্রাচীন রোমেও শের্ক বা বহুত্ববাদ এবং দেব-দেবী পূজার প্রচলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল৷ রোমানদের অনেক খোদা ছিল৷ একথা অতিশয়োক্তি হবে না যে , রোমানদের খোদাগুলোর মতো খোদার অস্তিত্ব বোধ হয় অন্য কোনো জাতির বিশ্বাসে ছিল না৷ তাদের স্বাস্থ্য দেবতা , যৌবন দেবতা , স্মৃতি দেবতা , ভাগ্য দেবতা , আশা দেবতা , বিপদের দেবতা , বছরের বিভিন্ন ঋতুর ভিন্ন ভিন্ন দেবতা , পানির দেবতা , সুফলদায়ক দেবতা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের দেবতা রয়েছে৷ অনেকে রোমানদের খোদা বা দেবতাদের সংখ্যা ত্রিশ হাজার বলে উল্লেখ করেছেন৷ ধর্মীয় গুরুরা তাদের এই বিশ্বাস জনগণের মাঝে জিইয়ে রাখার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো৷ তারা পূজা সংক্রান্ত রীতি-রেওয়াজগুলো বাস্তবায়ন করার জন্যে এবং দেবতাদের দরবারে কোরবানী করার জন্যে জনগণের প্রতি আহবান জানাতো৷
ইউরোপের ইতিহাস খৃষ্ট ধর্মের ইতিহাসের সাথে গ্রন্থিবদ্ধ হয়ে গেছে৷ হযরত ঈসা ( আ ) এর আবির্ভাব বা খৃষ্ট ধর্মের জন্ম যদিও ফিলিস্তিনের পূর্বাঞ্চলে হয়েছিল , তবু খৃষ্ট ধর্মের আবির্ভাবের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এই ধর্মটি ইউরোপে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে তা ব্যাপক বিস্তৃতি পায়৷ এই ধর্ম ইউরোপে এমনভাবে শেকড় গেড়ে বসে যে , তা অতীতের মতো এখনো ইউরোপীয় জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে আছে৷ ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন যে , ইউরোপে খৃষ্ট ধর্মের প্রবেশ ও বিকাশ ঘটেছিল হযরত ঈসা (আ) এর শিষ্য বা অনুসারী পিটার্স ও পুল্‌সের বক্তব্যের প্রভাবে৷ পিটার্স সর্বপ্রথম রোমে গিয়েছিলেন খৃষ্টিয় ৪২ সালে৷ তাঁর এই সফরের মধ্য দিয়ে রোমের রাজধানীতে খৃষ্ট ধর্মের একটি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে এবং ইউরোপে খৃষ্ট ধর্মের প্রচার-প্রসারের জন্যে বিচিত্রমুখী প্রচেষ্টা চালানো হয়৷ ইউরোপে যখন খৃষ্টধর্মের প্রচারের কাজ শুরু হয় , তখন প্রাচীন রোমান শাসকরা জনগণের ওপর ব্যাপক অত্যাচার করছিল৷ তাই ধর্মীয় কারণে তো বটেই , শাসকদের অত্যাচার থেকে বাঁচার একটা উপায় হিসাবেও জনগণ খৃষ্টধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ে৷ আর এ কারণেই ইউরোপে এই ধর্ম অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করে৷ রোমান সাম্রাজ্যে শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে দাস প্রথা চালু ছিল৷ এই প্রথায় দাসদের অবস্থা ছিল একেবারেই হতাশাব্যঞ্জক এবং শোচনীয়৷ ইঞ্জিলের আশাবাদী শিক্ষা এবং খৃষ্টধর্ম প্রচারকদের সুসংবাদ নির্যাতিত-নিপীড়িত দাসদের মনে আশার সঞ্চার করে৷ তারা মুক্তির জন্যে এরকম একটি ধর্মের অপেক্ষায় দিন গুণছিল৷ সে কারণেই তাদের মাঝে খৃষ্ট ধর্মের বিস্তার ঘটে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে ইউরোপে খৃষ্টধর্মের ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে৷ প্রথমত ইউরোপে খৃষ্টধর্মের শুরুতে এই ধর্মটিকে স্বতন্ত্র কোনো ধর্ম হিসেবে মনে করা হতো না৷ ভুলবশত খৃষ্ট ধর্মকে ইহুদি ধর্মের একটি শাখা বলে মনে করা হতো৷ ইউরোপীয়রা ভাবতো , ঈসা (আ) এর অনুসারীরা ইহুদি ধর্ম থেকে বেরিয়ে আসা একটা দল৷ মায়ের গীর্যা বায়তুল মোকাদ্দাসে অবস্থিত ছিল এবং পুল্‌স নিজ দায়িত্বে অ-ইহুদিদের মাঝে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা চালিয়েছিল৷ খৃষ্টিয় ৭০ সালে এই বায়তুল মোকাদ্দাস শহরটি রোমানদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়৷ ফলে সেখানে কোনো গীর্যার অস্তিত্ব আর অবশিষ্ট ছিল না৷ তারপর থেকে খৃষ্ট ধর্মের অনুসারীদের জন্যে রোম শহরের গীর্যাই কেন্দ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে৷ খৃষ্টধর্মের ইতিহাসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো , কনস্টান্টিনের খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষা লাভ৷ ৩২৩ খৃষ্টাব্দে তিনি খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেন৷ কনস্টান্টিনের খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষা লাভের আগে গীর্যার অনুসারীদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার করা হয়েছিল৷ কিন্তু কনস্টান্টিনের খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষা লাভের পর এই ধর্মের বিকাশ দ্রুত গতি লাভ করে এবং গীর্যার প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয়ে যায়৷ এমনকি এ ধর্মের অনুসারীদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়৷ আর খৃষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা লাভ করে৷ গীর্যা এবং রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে , খৃষ্টধর্ম প্রচার প্রসারের বিগত সকল ইতিহাস ভেঙ্গে যায়৷ এই ধর্ম ইউরোপীয় ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে৷ #

২য় পর্ব

ধর্মের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নামক গ্রন্থের লেখক জন.বি.ন্যাস খৃষ্টান ধর্মের ব্যাপারে বলেছেন, মূর্তমান খোদায় বিশ্বাস নিয়ে খৃষ্ট ধর্মের যাত্রা শুরু হয়েছে৷ এরফলে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং বিচিত্র পরিস্থিতি অতিক্রম করে এক মানবিক ঐশ্বর্য লাভ করেছে৷ এই ধর্মে সকল ভুল-ত্রুটি-দুর্বলতা এবং প্রবণতার সাথে মানবিকতার উদ্ভাস লক্ষ্য করা গেছে৷ এই ধর্মের গল্প বেশ বড়ো৷ বিশেষ করে এই ধর্মের ইতিহাসে এতো ব্যাপক চড়াই-উৎরাই রয়েছে যে , তা ধর্মের ইতিহাসে বিরল ও বিস্ময়কর৷
গত গত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে , কনস্টান্টাইনের শাসনামল থেকে খৃষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়৷ ইউরোপের বিশাল অংশ জুড়ে এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল৷ অনেক ইতিহাসবিদের মতে কনস্টান্টাইনের খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করার ঘটনা ছিল একটা রাজনৈতিক কৌশল৷ তিনি তাঁর শাসন ব্যবস্থাকে দৃঢ় ও মজবুত করার প্রয়োজনে খৃষ্টধর্মকে কাজে লাগিয়েছেন৷ কনস্টান্টাইনের শাসনকালে ফিউডাল বা সামন্তদের বিরুদ্ধে দাসদের বিদ্রোহ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল৷ কনস্টান্টাইন তখন অনেক ভেবে চিন্তে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন যে , ধর্ম নামক অস্ত্রটি ব্যবহার করে তিনি এই বিদ্রোহ দমন করবেন৷ কারণ ধর্মের কথা বললে খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী এইসব গোলাম বা দাসেরা তার কথা মানবে-এমনটা তিনি ভেবেছিলেন৷ এভাবেই তিনি খৃষ্টধর্মের প্রতি তাঁর বিশ্বাস বা ঈমান আনার কথা ঘোষণা দিলেন এবং গীর্যার প্রতি তার সমর্থনের কথা জানালেন৷ সামন্তবাদীরা তখন গীর্যার জন্যে তাদের বহু জমি-জমা দান করলেন এবং পাদ্রীরাও দাসদেরকে তাদের মালিকদের পূর্ণ আনুগত্য করার আহবান জানাতে লাগলেন৷ আর এভাবেই গীর্যা এবং পাদ্রীরা দাসপ্রথার প্রতি পরোক্ষভাবে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে৷কনস্টান্টাইনের পরের সম্রাটগণ গীর্যার প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখে৷ গীর্যার সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক একসময় এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে , এদের একটাকে অপরটার কাছ থেকে পৃথক করাটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে হতো৷ তারমানে গীর্যার সমস্যা রাষ্ট্রের সমস্যা,আর রাষ্ট্রের সমস্যা গীর্যার সমস্যায় পরিণত হয়৷ ফলে খুব সহজেই বোঝা যায় যে , রাষ্ট্র গীর্যার কার্যক্রমে সহযোগিতা করতো এবং গীর্যা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের বৈধতা দিতো৷ এভাবেই গীর্যার সমর্থনে রোম সম্রাট বা কায়সারদেরকে মর্ত্যে খোদার স্থলাভিষিক্ত মনে করা হতো৷ এই প্রক্রিয়ায় স্বয়ং গীর্যা ক্রমান্বয়ে বৃহৎ ভূখন্ডের অধিকারী হয়ে পড়ে৷ বিখ্যাত দার্শনিক বিল ডুরান্ট তাঁর লেখা দর্শনের ইতিহাস নামক গ্রন্থে লিখেছেন , ইউরোপের বিভিন্ন সমাজে গীর্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার ঘটনায় তাদের ধন-সম্পদও বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ মধ্যযুগের প্রাথমিক কয়েক শতকে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি গীর্যার অধীনে চলে গিয়েছিল৷ আর গীর্যা ধন-সম্পদের দিক থেকে অসম্ভব ধনী হওয়ায় স্বয়ং শক্তিশালী আরেক ফিউডাল বা সামন্ত জমিদারে পরিণত হয়৷ প্রথম দিকে গীর্যার প্রতি সম্রাটদের সমর্থন সহযোগিতা ছিল৷ অথচ , এই গীর্যাই ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় হুকুমাতের সাথে পাল্লা দিতে থাকে৷ এক সময় এমন এক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায় যে , কোন্‌ অঞ্চলের ওপর কে শাসন করবে তা সরাসরি ঠিক করে দিত খৃষ্টানদের সর্বোচচ ধর্মগুরু বা পোপ৷ শাসকরা নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থে পোপ বা পুরোহিতদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হতো৷ এদিকে পোপরাও নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলো৷ একবার একজন পাদ্রি তাঁর নিজের বইতে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে পোপদের পরোক্ষ হস্তক্ষেপ সম্পর্কে লিখেছিলেন৷ এ কারণে তখনকার পোপ ঐ পাদ্রীর বইটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল৷ ইউরোপীয় ইতিহাসে মধ্যযুগটা ছিল তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ৷ এই যুগটা খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দির শেষ থেকে শুরু হয়ে খৃষ্টীয় পণেরো শতাব্দি অর্থাৎ ইউরোপীয় রেণেসাঁসের কাল পর্যন্ত বিস্তৃত৷ এই মধ্যযুগের প্রাথমিক পর্যায়ে ইউরোপের অবস্থা ছিল খুবই ভয়ঙ্কররকম অরাজকতাপূর্ণ এবং নিরাপত্তাহীন৷ এ সময় পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক এবং সামাজিক শৃঙখলা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছিল৷ ইউরোপের ইতিহাসে এই কালপর্বটিকে অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করা হয়েছে৷ অন্ধকার যুগে ইউরোপে যুদ্ধ-বিগ্রহ , দ্বন্দ্ব-সংঘাত মারাত্মক বৃদ্ধি পেয়েছিল৷ বিভিন্ন এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার জন্যে সেখানে আভ্যন্তরীণ সংঘাত দেখা দিয়েছিল৷ এ সময় প্লেগের মতো সংক্রামক রোগগুলোর প্রকোপও বেড়ে গিয়েছিল৷ সর্বোপরি , অর্থনৈতিক দুরবস্থা জনগণকে মারাত্মক সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল৷এ রকম এক সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতিতে গীর্যার কার্যক্রম অজ্ঞতা আর হানাহানির আগুনে যেন পানি ঢেলে দিয়েছিল৷ অর্থাৎ গীর্যার ধর্মীয় কার্যক্রমের ফলে এসব অনেকটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ আর এভাবে গীর্যার ইতিহাসে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মধ্যযুগ সবচে গুরুত্বপূর্ণ একটি কালপর্বে পরিণত হয়৷ এই পর্বের প্রথমার্ধে পাশ্চাত্যের বিগত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তথা দ্বন্দ্ব-সংঘাত , হানাহানি-মারামারি এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ থেমে যায়৷ গীর্যাগুলো এ সময় ছিল এক ধরনের পাঠশালা৷ কেননা ; এখানে তখন সীমিত পর্যায়ের জ্ঞান চর্চা হতো৷ বিশেষত ঐশী জ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষা এখানে দেওয়া হতো৷ খৃষ্ট ধর্মের ইতিহাস নামক গ্রন্থের লেখক টনি লীনের বক্তব্য অনুযায়ী সে সময় গীর্যাগুলো ছিল দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ উত্তাল মহাসমুদ্রে নিরাপদ দ্বীপের মতো৷ মধ্যযুগের গীর্যার ইতিহাসে অবশ্য অনেক কালো অধ্যায়ও দেখতে পাওয়া যায়৷ গীর্যার বিরুদ্ধে কোনোরকম সমালোচনা করা যেত না৷ পোপের আদেশ লঙঘনকারীকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হত৷ খৃষ্টধর্ম প্রচারকগণ হযরত ঈসা (আ) এর আদর্শ প্রচারের লক্ষ্যে প্রথম প্রথম সদাচারী ও বিনয়ী ছিলেন৷ কিন্তু কালক্রমে তাঁরা যশ-খ্যাতি আর সম্পদের লোভে পড়ে যায়৷ পোপরা তাদের নিজেদের অর্থভান্ডার পূর্ণ করার জন্যে বিভিন্ন ধরনের ট্যাঙ নিত , বিশেষ করে গীর্যার বিভিন্ন পদে নিয়োগদানকালে বড়ো অঙ্কের টাকা-পয়সা নিত৷ দ্বিতীয় পোপ পিউস কার্ডিনালদের উদ্দেশে বলেছিলেন,‘জনগণ বলাবলি করছে যে আমরা জীবনকে আমোদ-প্রমোদের মধ্য দিয়ে কাটাচিছ৷ আমরা অহমিকা ও দর্পের সাথে চলি , বিলাস-বহুল জীবনযাপন করছি , সর্বোত্তম ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হই৷ আমরা শিকারের উদ্দেশ্যে ঘোড়া এবং কুকুর লালন-পালন করি , কৌতুকশিল্পী আর অযাচিতদের পেছনে কাড়ি কাড়ি অর্থ ব্যয় করি অথচ ধর্মের জন্যে কোনো কাজই করছি না৷ তাদের এই বক্তব্যের সত্যতা ও বাস্তবতা রয়েছে৷ আমাদের প্রতিনিধি এবং কর্মকর্তারা ঠিক এ ভাবেই জীবনযাপন করছে৷ আমাদের দরবারের জাঁকজমক প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি৷ আর এ কারণেই জনগণ আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট৷’ ‘গীর্যার বিরুদ্ধে যারা কথা বলতো , তাদেরকে প্রতিহত করার জন্যে পোপ আদালতের এঙ্গেইযিশিউন আইন প্রয়োগ করতো৷ গ্রীক এই শব্দটির বাংলা রূপ দাঁড়াবে জেরা বা জিজ্ঞাসাবাদ৷ এইসব আদালতে জনগণ এক গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতে দন্ডপ্রাপ্ত হতো৷ জিজ্ঞাসাবাদকারীরা অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতন করতো এমনকি তাদের পাগুলোকে আগুনে পোড়াতো৷ দন্ডপ্রাপ্তদের সম্পদ দুইভাগে ভাগ করা হতো৷ এক অংশ পেত গীর্যা , অপর অংশ পেত রাষ্ট্র৷’
সবশেষে মধ্যযুগে গীর্যার মাধ্যমে জনগণকে কী রকম শাস্তি দেওয়া হতো , সে সম্পর্কে বিল ডুরান্টের সভ্যতার ইতিহাস নামক গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের আসরের ইতি টানবো৷ তিনি লিখেছেন, খৃষ্টান ধর্মবিশ্বাস লঙঘনকারীদের বা গীর্যার কার্যক্রমের সমালোচনাকারীদের জবানবন্দী নেওয়ার জন্যে আদালতের বিশেষ নিয়ম বা পদ্ধতি ছিল৷ আদালত অভিযুক্তদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালাতো৷ এই নির্যাতন অবশ্য স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন উপায়ে করা হতো৷ কখনো অভিযুক্ত ফরিয়াদীর হাত পিঠে বাঁধা হতো৷ আবার অনেক সময় হাত বাঁধা অবস্থায় তাকে ঝুলিয়ে রাখা হতো৷ আবার কখনো তাকে বেঁধে ফেলা হতো যাতে সে নড়াচড়া করতে না পারে৷ এ অবস্থায় তার গলায় প্রচুর পরিমাণ পানি ছোঁড়া হতো , যার ফলে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যেত৷ কখনো রশি দিয়ে তার বাজু এবং পা এমন শক্ত করে বাঁধা হতো যে , মাংস ভেদ করে ঐ রশি হাড্ডিতে গিয়ে লাগতো ৷’ #

৩য় পর্ব

সুপ্রিয় পাঠক, গত দুটি আসরে আমরা পশ্চিমাদের ধর্মচিন্তার ইতিহাসের দুটি পর্বের কথা বলেছিলাম৷ একটি হলো খ্রিষ্টান ধর্মের আবির্ভাব এবং অপরটি হলো মধ্যযুগ পর্ব৷ পাশ্চাত্যে মধ্যযুগটি পঞ্চদশ শতাব্দি পর্যন্ত বিস্তৃত৷ এরপর থেকে শুরু হয় রেনেসাঁর যুগ৷ আজ আমরা পঞ্চদশ শতাব্দি-পরবর্তী পাশ্চাত্যের রেনেসাঁ নিয়েই কথা বলার চেষ্টা করবো ৷ ইউরোপে সীমিত সংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী-সাহিত্যিকের মাঝে একটা আদর্শ হিসেবে রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়৷ রেনেসাঁর যুগে মধ্যযুগীয় বৈশিষ্ট্যাবলী নিয়ে ব্যাপক বাক-বিতন্ডা দেখা দেয় এবং বস্তুবাদ , ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিভিন্ন বিষয় ও উপলক্ষ্য এবং সেইসাথে বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি আকর্ষণ ও মনোযোগ বেড়ে যায়৷ রেনেসাঁর যুগকে বিকাশের যুগও বলা হয়৷ মূলত এই যুগেই ইউরোপে নতুন সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় এবং ইউরোপ ইতিহাসের এক নতুন পর্বে প্রবেশ করে৷ কারণ রেনেসাঁর ফলে ইউরোপের রাজনৈতিক , সামাজিক , অর্থনৈতিক , সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় সকল অবস্থারই রুপান্তর ঘটে যায়৷ কিন্তু ঠিক কী কারণে এই সময়টায় এ ধরনের রুপান্তর ঘটেছিল-এ প্রশ্নের বহু উত্তর রয়েছে৷ নিঃসন্দেহে ইউরোপের ঐ সময়ের পরিস্থিতিই এ ধরনের পরিবর্তনের প্রধান কারণ৷ তবে ইতিহাসবিদদের অনেকের মতে এই রূপান্তরের পেছনে দুটি প্রধান কারণ ছিল৷ এ্যাক , পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা গবেষণামূলক কাজের বিস্তার৷ দুই , রিফরমিজম অর্থাৎ পোপ বিরোধী ধর্মীয় সংস্কার৷ বার্টান্ড রাসেল তার পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস নামক গ্রন্থে লিখেছেন,
“নবযুগ নামে খ্যাত ইতিহাসের ঐ পর্বের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বদৃষ্টি৷ এই বিশ্বদৃষ্টির সাথে মধ্যযুগীয় বিশ্বদৃষ্টির ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে৷ নবযুগীয় বিশ্বদৃষ্টির দুটি দিক অন্য সবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ৷ একটি হলো গীর্যার শাসন ক্ষমতা হ্রাস এবং অপরটি হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের শক্তি বৃদ্ধি৷” এই যুগে যে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল , রসায়ন , জ্যোতির্বিদ্যা পরিবেশ বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোর উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিলে তার প্রমাণ মেলে৷ বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিল ডুরান্টের মতে , ইউরোপে বিজ্ঞান-চেতনার উন্মেষের পেছনে রজার বীকন , কপারনিক , গ্যালিলিওর মতো বৈজ্ঞানিকদের ঋণ অপরিসীম৷ তাঁর মতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে সমান তালে ভয় দূরে সরে যেত৷ ফলে কেউ আর অজ্ঞতার পূজা করতো না৷ উল্টো বরং চেষ্টা করতো কীভাবে অজ্ঞতাকে উত্তীর্ণ করে যাওয়া যায় অর্থাৎ অজানাকে জানা যায়৷ এই সময়টাই ছিল চেষ্টা-প্রচেষ্টার যুগ৷
বিজ্ঞানের বিকাশের যুগে অর্থাৎ রেনেসাঁসের যুগে যে ক্ষেত্রে সবচে বেশি রূপান্তর বা পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল , সেই ক্ষেত্রটি হলো ধর্ম৷ গত আসরে আমরা যেমনটি বলেছিলাম যে , মধ্যযুগে গীর্যার অর্থ-সম্পদ এবং ক্ষমতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচিছল , আর এই বিষয়টিই গীর্যার নেতৃবৃন্দের মাঝে রাজনৈতিক ও চারিত্রিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ এ কারণেই খ্রিষ্টিয় পণেরো শতকে গীর্যার সংস্কার একরকম অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ এই সংস্কারের বিষয়টি গীর্যার অনেক সদস্যও সমর্থন করেছিলেন৷ মধ্যযুগে গীর্যার দ্বন্দ্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে , গীর্যা সংস্কারে স্বয়ং গীর্যার বহু কর্মকর্তাও বাধ্য হয়েছিলেন ৷ এমন কয়েকজন কর্মকর্তা হলেন-পোপ আলেঙান্ডার , ষষ্ঠ রডরিজ বুর্গিসা , কার্ডিনাল কারাফা , পিকু লুফিনি প্রমুখ৷ অবশ্য গীর্যার তত্ত্বাবধানেই এই সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল৷ তাই গীর্যার শিক্ষা ও কাঠামো প্রায় সংরক্ষিতই ছিল৷ যেটুকু পরিবর্তন বা সংস্কার হয়েছিল , তা ছিল একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য বা ভাসাভাসা৷ গীর্যা সংস্কারের এই হাল-অবস্থার সমালোচনা করে গীর্যার যথাযথ সংস্কারের দাবী জানিয়ে যেসব পাদ্রী বা নেতৃবৃন্দ সোচচার হয়েছিলেন , তাদের মধ্যে জন উইলকিফের নাম উল্লেখযোগ্য৷ তাঁকে পাশ্চাত্যে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের শুকতারা বা পুরোধা বলে অভিহিত করা হয়৷ কেননা ; তাঁর পরবর্তীকালের সংস্কারকামীদের ওপর তাঁর চিন্তা-ভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল৷ তিনিই ইউরোপে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছিলেন৷ উইলকিফ তার কর্মপ্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে গীর্যার পার্থিব কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সমালোচনা করেন৷ তিনি মনে করতেন যে , ঐশী গ্রন্থ কেবল পাদ্রীরাই জনগণের উদ্দেশে পড়বে-তা ঠিক নয় বরং সকল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরই উচিত পবিত্র গ্রন্থ পাঠ করা৷ এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ঐশী গ্রন্থকে ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন৷ উইলকিফ ধর্মগ্রন্থের উচচ মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করে পাদ্রী ও পুরোহিতদের ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং পাদ্রীদের গুরুত্ব হ্রাস করেন৷ তিনিই প্রথম এ ধারণা দেন যে , পাদ্রীদের শক্তিকে দুনিয়াবী বা পার্থিব বিষয়ে কাজে লাগানো উচিত নয় অর্থাৎ গীর্যার বাইরে রাষ্ট্রীয় বা অন্য কোনো পার্থিব কাজে পাদ্রীদের নাক গলানো উচিত নয়৷ তিনি সহসাই পোপদের ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রদানের ব্যবস্থাকে প্রত্যাখান করেন৷ উইলকিফের মৃত্যুর পর তার চিন্তার বিস্তৃতি ঘটে , যদিও গীর্যা তার ঐ চিন্তাধারা বা মতবাদের নিন্দা জানায়৷ খ্রিষ্টিয় ষোল শতকের প্রাথমিক বছরগুলোতে জার্মানীতে মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বা প্রোটেস্টান্টিজম শুরু হয়েছিল৷ গীর্যার সাথে তার মতানৈক্য মূলত অর্থের বিনিময়ে দন্ড মওকুফ করার ঘটনা থেকেই উৎসারিত হয়েছে৷ কারণ , খ্রিষ্টান ধর্মের বিধান অনুযায়ী অপরাধীদের ক্ষমা করার বিষয়টি ছিল অন্যরকম৷ তাদের বক্তব্য অনুযায়ী স্বয়ং ঈসা ( আ ) পিটার্স হাভা’রীকে এবং তার মাধ্যমে পাদ্রীদেরকে জনগণের পাপ-অপরাধ মাফ করে দেওয়ার ক্ষমতা বা এখতিয়ার দিয়েছিলেন৷ তাই , পাদ্রীদের ক্ষমতা ছিল যে , যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতো , তাদেরকে প্রায়শ্চিত্ত করার শর্তে ক্ষমা করে দিতে পারতো৷ তবে এই প্রায়শ্চিত্ত করা থেকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না৷ এই প্রায়শ্চিত্যের বিধান প্রথম দিকে দান করা , দোয়া পড়া ইত্যাদির মাঝেই সীমিত ছিল , কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই প্রায়শ্চিত্ত করার রূপ পাল্টে যায়৷ বিল ডুরান্টের মতে , ‘পাদ্রীদের অনেকেই অপরাধীদেরকে প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তওবা করা , প্রার্থনা করার মতো কাজগুলো করতে বলতো না , বরং এর পরিবর্তে অপরাধীদেরকে দন্ড মওকুফের আদেশনামা দিতো৷ আর এই আদেশনামার বিনিময়ে পাদ্রীরা অপরাধীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিতো৷’ পাশ্চাত্যে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের একজন নেতা হিসেবে পরিচিত মার্টিন লুথার পাদ্রীদের বেহেশ্‌ত বিক্রি এবং দন্ড মওকুফের আদেশনামা বিক্রির ব্যাপক বিরোধী ছিলেন৷ এই কারণে তাঁকে পাদ্রীরা ধর্মচ্যুত ঘোষণা করে চিঠি দিয়েছিলেন৷ লুথার ঐ চিঠি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল৷ এ কারণেই ইউরোপে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল৷ লুথার ক্যাথলিক গীর্যার দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ গীর্যার কোনো কোনো কর্মকর্তার উচচ পদ-মর্যাদা ও আসনকেও অস্বীকার করেন৷ তাঁর মতে প্রত্যেক খ্রিষ্টানেরই মর্যাদা সমান , তবে কেবল আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় কর্মকান্ডে যাঁরা আত্মনিবেদিত , তাঁদের মর্যাদা আলাদা৷ লুথার ‘গীর্যার ব্যাবিলনীয় বন্দীদশা’ নামক তাঁর নিজস্ব গ্রন্থে ক্যাথলিক গীর্যার সাতটি বিধি-বিধানকে আক্রমণ করেছেন৷ তাঁর মতে গীর্যার রাষ্ট্রীয় বিধানগুলো কেবল ঈসা ( আ ) প্রদত্ত বিধি-বিধান অনুসারেই হতে হবে৷ অল্প সময়ের মধ্যেই লুথারের এই চিন্তা জার্মানীতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং তারপর পূর্ব ইউরোপ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে তা ছড়িয়ে পড়ে৷ কিন্তু লুথারের চিন্তা কেবল প্রোটেস্টান্টিজমের কাঠামোর মতোই ছিল না৷ লুথারের চিন্তা কীরকম ছিল-সে ব্যাপারে আমরা বরং আগামী আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো ৷

৪র্থ পর্ব

সুপ্রিয় পাঠক পাশ্চাত্যে ধর্মচর্চার ইতিকথা শীর্ষক ধারাবাহিকের আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি৷ গত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে , রেনেসাঁসের ফলে যুগপৎ দুটি মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল৷ একটি হলো বিজ্ঞানের উন্নতি এবং অপরটি ধর্মীয় সংস্কার৷ আরো বলেছিলাম যে , জার্মানীতে মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বা প্রোটেস্টান্টিজম শুরু হয়েছিল এবং এই আন্দোলন পরে পূর্ব ইউরোপসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে বিস্তৃতি পেয়েছিল৷ তো এর পরবর্তী অবস্থা আজকের পর্বে তুলে ধরবার চেষ্টা করবো৷ প্রোটেস্টান্টিজম পূর্ব ইউরোপসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে বিস্তৃতির অল্পকাল পরেই এই আন্দোলন লুথারি এবং সংশোধিত-এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে৷ লুথারের মতো অনেকেই তাদের ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকে শাসক বা বাদশাহদের আনুকূল্যে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল৷ এই গ্রুপটি চায় নি যে , গীর্যা এবং শাসকদের মধ্যকার সম্পর্ক বিচিছন্ন হয়ে যাক৷ বরং তারা চেয়েছিল যে ক্যাথলিক গীর্যার কার্যক্রমে যেসব মৌলিক ত্রুটি রয়েছে , সেগুলোর অবসান হোক৷ কিন্তু লুথারের মুক্তচিন্তার মোকাবেলায় চরমপন্থী সংস্কারবাদীরা আরো গভীরতর সংস্কার চেয়েছিল৷ তাদের অনেকেই ত্রিত্ববাদের মতো খ্রিষ্টধর্মের মৌলিক কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ আবার অনেকেই মহাগ্রন্থ এবং খ্রিষ্টধর্মের বাহ্যিক গঠনকে গুরুত্বহীন বলে মনে করতো৷ অ্যানাব্যাপ্টিস্টরা ধর্মীয় সংস্কারকামী গ্রুপগুলোর একটি৷ এই সংগঠনটি ষোল শতকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ এই গ্রুপটি শিশুদের দীক্ষা দেওয়ার বিরোধী৷ তাদের বক্তব্য হচ্ছে শিশুদের দীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি পোপ এবং পাদ্রীদেরই সৃষ্টি৷ খ্রিষ্টবাদের ইতিহাস নামক গ্রন্থের লেখক টনি লীন লিখেছেন- অ্যানাব্যাপ্টিস্টদের অসংখ্য নেতাকে ক্যাথলিক গীর্যার কর্মকর্তাদের আদেশে গ্রেফতার করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে৷ ক্যালভিনীরাও প্রোটেস্টানদেরই আরেকটি গ্রুপ৷ এই গ্রুপটির নেতা ছিল জন ক্যালভিন৷ জেনেভা শহরে এই গ্রুপটি সংগঠিত হয়৷ জন ক্যালভিন তার অধীনস্থ একটি গীর্যার ওপর কঠোর নিয়ম-নীতি আরোপ করে খ্রিষ্টানদের এমন একটি গ্রুপ দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন , যাদের জীবন ছিল একটি আদর্শিক ভিত্তিমূলে স্থাপিত৷ সতেরো শতকের প্রথম দিকে পাইটিজম বা সন্যাসী দলটি প্রোটেস্টান গীর্যাগুলোর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে৷ পাইটিস্টদের দৃষ্টিতে কেবল গীর্যায় দীক্ষা নেওয়া আর লুথারের আইডিয়া বা চিন্তাগুলোকে প্রত্যয়ন করাই যথেষ্ট ছিল না বরং জনগণের নবজন্ম লাভ করা অর্থাৎ আত্মিক পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল৷ পাইটিস্ট বা খ্রিষ্টান সন্যাসীদের দৃষ্টিতে প্রকৃত খ্রিষ্টান ধর্ম কেবল কিছু আইডিয়া বা চিন্তার প্রতি ঈমান আনাই নয় বরং জীবনার্থে পরিবর্তন আনা তথা নতুন জীবন লাভ করাকেও বোঝায়৷ সন্যাসীরা প্রেমকে ভীষণ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এবং এই প্রেমকে তারা খ্রিষ্টধর্মের মূল বলে মনে করে৷ বর্তমানে এই দলটি লুথারী গীর্যায় সবচে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী দল ৷ প্রোটেস্টানরা এখন বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছে৷ লুথারি , ক্যালভিনী , ব্যাপ্টিস্ট এবং পিউরিটান৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এদের পৃথক পৃথক গীর্যা রয়েছে এবং তারা সেখানে তাদের নিজ নিজ কার্যক্রম চালিয়ে যাচেছ৷ সর্বোপরি বলা যায় যে প্রোটেস্টান্টিজমের জন্ম খ্রিষ্টান ধর্মের জন্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম একটি ঘটনা৷ খ্রিষ্টান ধর্মের আবির্ভাবের প্রাথমিক ক’বছরেই পূর্ব এবং পশ্চিম রোমের গীর্যাগুলো ক্যাথলিক এবং অর্থডক্স-এই দুই গীর্যায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল৷ এই বিভক্তির পেছনে গীর্যার কাঠামো সংক্রান্ত মতানৈক্যই সবচে বেশি কাজ করেছে৷ নৈলে ক্যাথলিক বা অর্থডক্সদের মাঝে আকিদা বা বিশ্বাসগত গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য তেমন একটা ছিল না৷ তবে আইডিয়া বা মতবাদগত দিক থেকে প্রোটেস্টান্টদের সাথে ক্যাথলিকদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পার্থক্য ছিল৷ গবেষকদের মতে প্রোটেস্টান্টিজমের ওপর ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাব পড়েছে৷ এ কারণেই লুথারি ,ক্যালভিনীসহ প্রোটেস্টান ধর্মে ইহুদিদের পার্থিব জগতপ্রীতি দেখতে পওয়া যায়৷
প্রোটেস্টান্টিজমের বিস্তারের ফলে ক্যাথলিক গীর্জার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং খ্রিষ্টিয় জগতের বিশাল একটি অংশের ওপর থেকে ক্যাথলিক গীর্জার কর্তৃত্ব বা শাসন হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল৷ এ কারণে ক্যাথলিকদের বৈধতা এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায় এমনকি পোপদের সম্মান ও মর্যাদা পর্যন্ত প্রশ্নের সম্মুখীন হয়৷ প্রোটেস্টান্টিজমের আবির্ভাবের ফলে খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন ফেরকার মধ্যকার মতভেদ তুঙ্গে ওঠে৷ তাদের মাঝে দীর্ঘদিন পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব-সংঘাত পর্যন্ত বিরাজ করছিল৷ ক্যাথলিকরা প্রোটেস্টান্টদেরকে ধর্মচ্যুত বলে মনে করতো এবং তাদের রক্তকে বৈধ বলে মনে করতো , অর্থাৎ তাদেরকে মারলে কোনোরকম অন্যায় হবে না বলে মনে করতো৷ ১৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে এক সপ্তারও কম সময়ের মধ্যে কেবল ফ্রান্সেই প্রোটেস্টান্টদের প্রায় এক হাজার অনুসারী গণহত্যার শিকার হয়েছিল৷ প্রোটেস্টান্টিজম আন্দোলন ধর্মীয় গন্ডী পেরিয়ে সামাজিক , রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল৷ এই আন্দোলনের ফলে রেনেসাঁস এবং তার পরবর্তীকালেও শিল্প ও বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল৷ এই উন্নতির ক্ষেত্রে লুথারের চেয়েও বেশি ভূমিকা রেখেছিল ক্যালভিন৷ ক্যালভিন সুদ খাওয়াকে বৈধ বলে মনে করতো৷ জার্মানীর বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী বিশিষ্ট লেখক ম্যাঙ ভেবার তাঁর পুঁজিবাদের আত্মা ও প্রোটেস্টান্টদের চরিত্র”শীর্ষক বিখ্যাত বইতে , প্রোটেস্টান্টিজমকে ইউরোপ ও আমেরিকায় আধুনিক পুঁজিবাদের উৎস এবং বিস্তারের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন৷ প্রোটেস্টান্টরা বস্তুবাদী স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাপক তৎপর ছিল৷ খ্রিষ্টানদের একটি গ্রুপ বস্তুবাদী স্বার্থসিদ্ধির মধ্যেই তাদের সাফল্য নিহিত রয়েছে বলে মনে করতো ৷ আর এটাকে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ বলেই ভাবতো ৷ ধর্ম ও বিজ্ঞান নামক গ্রন্থের লেখক ইয়ান বারবুর এ সম্পর্কে বলেছেন-পুঁজিপতি হবার জন্যে এটা ছিল একটা মোক্ষম অজুহাত ৷ তারা প্রকাশ্যেই এই চিন্তার অসদ্ব্যবহার করতো৷

৫ম পর্ব

সতেরো শতকে বাষপীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের ফলে ইউরোপে আঠারো শতকের শিল্প বিপ্লবের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়৷ ফ্রান্সের বৃহৎ বিপ্লবের পাশাপাশি এই শিল্প বিপ্লব ছিল এ সময়কার ইউরোপীয় ইতিহাসের মৌলিক দুটি ঘটনা৷ বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে এই দুটি ঘটনা ইউরোপীয় ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করে৷ এই যুগটা এনলাইটমেন্ট এরা বা আলোকিত যুগ হিসেবে পরিচিত৷ সুপ্রিয় পাঠক ! ইউরোপে ধর্ম চর্চার ইতিকথা শীর্ষক আলোচনার আজকের পর্বে আমরা এই যুগ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো৷
বাষপীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মূলত প্রযুক্তির উন্নয়নেরই ধারা সূচিত হয়েছিল৷ প্রকৃতিকে পরাজিত করে যন্ত্রপাতি তৈরী করার ক্ষেত্রে মানুষের সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছিল এই বাষপীয় ইঞ্জিন তৈরীর মধ্য দিয়ে৷ ফ্রান্সের বৃহৎ বিপ্লবও আঠারো শতকের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ এই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্স প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়৷ এই বিপ্লব ধীরে ধীরে ইউরোপের অধিকাংশ দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে৷ রেনেসাঁর যুগ থেকে শিল্পবিপ্লব পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে শিল্প-সাহিত্য ও দর্শনের ক্ষেত্রে এক জোয়ার সৃষ্টি হয়৷ এ সময় দার্শনিক , প্রকৃতি বিজ্ঞানী , লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একটি দলের আবির্ভাব ঘটেছিল৷ তাদের ব্যাপক গবেষণার সূত্র ধরেই আধুনিক যুগের ভিত্তি রচিত হয়েছিল৷ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে পাশ্চাত্যে আধুনিক যুগের সূচনা হয় বলে প্রসিদ্ধি রয়েছে৷ বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই আধুনিক যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে৷ অঙফোর্ড ডিকশনারীতে মডার্ন পরিভাষাটি ট্র্যাডিশনাল চিন্তাধারার পরিবর্তে নতুন স্টাইল বা নতুন চিন্তার প্রকাশ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ এই আধুনিকতার ফলে পাশ্চাত্যের মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সকল দিক বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয় এবং শিল্প-সাহিত্যের ওপরও ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল৷ ইউরোপীয় সমাজের বহু চিন্তাবিদ এ সময় ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে সন্দেহবাদী ধারণা পোষন করতে থাকেন৷ তো একদিকে তাদের এই ধর্মের প্রতি আক্রমণ অপরদিকে ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম প্রতিরক্ষা প্রয়াস-সবমিলিয়ে আধুনিক যুগে ধর্মীয় পরিস্থিতির ওপর এর বিস্ময়কর প্রভাব পড়েছিল৷
অবশ্য পাশ্চাত্যের বহু গবেষক খ্রিষ্টান ধর্ম এবং আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞানের নতুন চিন্তাধারার সাথে এক ধরনের সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছেন৷ ধর্মীয় বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় আধুনিকতাবাদ ধর্ম বিষয়ক টেঙট এর সমালোচনা করার নতুন একটি প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে৷ এ পদ্ধতিতে ধর্মীয় বিধি-বিধানের প্রতি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং পক্ষান্তরে ধর্মের মানবিকতাবাদী দিকগুলোকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে৷

এই আধুনিকতার একটা পরিণতি হলো নীতি-নৈতিকতার প্রতি ভ্রুক্ষেপহীনতা৷ আধুনিকতাবাদীরা ব্যক্তিস্বার্থ এবং স্বাতন্ত্র্য চেতনায় বিশ্বাসী ছিল৷ যার ফলে তারা খোদার পরিবর্তে নিজেদেরকে অর্থাৎ স্বাতন্ত্র্য চেতনাকেই সকল মূল্যবোধের মানদন্ড হিসেবে মনে করতো৷ আর এভাবেই পাশ্চাত্যের জনগণ ইতিহাসের নতুন একটি অধ্যায় বা যুগে পদার্পন করে৷ স্বাতন্ত্র্যচেতনা বা আধুনিকতার যুগে মানবজাতি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে অনেক কিছু অর্জন করেছিল ঠিকই , কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি অত্যাচারের ঘুর্ণাবর্তেও নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল৷ তারা এমনভাবে অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে এরফলে তাদের মাঝে আধ্যাত্মিকতা এবং নৈতিকতার মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছিল৷ এ ব্যাপারে ফ্রান্সের বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী ফ্রান্স জিয়ফ্রেট এর অভিমত আধ্যাত্বিকতা হলো আমাদের সময়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল ৷ সমাজে তখন হত্যা-আত্মহত্যা , খুন-খারাবি এবং উন্মাদনার মতো ফেতনা-ফাসাদ তীব্র ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল৷ সামাজিক এ দুরবস্থার কারণ ছিল সেখানে ধর্মের অস্তিত্ব না থাকা৷ ইউরোপে এমন কোনো ধর্মের অস্তিত্ব নেই যে ধর্ম জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে৷ আর এ কারণেই জনগণ আত্মিক ও আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসের দুর্বলতম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল৷ দুঃখজনক হলেও সত্য যে , যতোই দিন যাচেছ আমরা আরো শক্তিশালী হচিছ ঠিকই কিন্তু হৃদয়ের আন্তরিক অনুভূতিগুলো হারিয়ে ফেলছি৷” একইভাবে পশ্চিমা আরেক মনীষী ক্যামেল ফ্লামারিউনও পাশ্চাত্যে নৈতিক ও চারিত্র্যিক অধপতন সম্পর্কে বলেছেন : আমাদের চারিত্র্যিক অধপতনের কথা স্বীকারে লজ্জার কিছু নেই৷ কেননা ; আমরা আমাদের নৈতিক এই অবক্ষয়ে সন্তুষ্ট৷ আমরা আমাদের ব্যক্তিস্বার্থ চিন্তাতেই বিভোর৷ আমাদের জীবনের সকল প্রচেষ্টা কেবল সম্পদ আহরণকে ঘিরেই আবর্তিত৷ এই সম্পদ আমরা কীভাবে বা কোন্‌ উপায়ে সংগ্রহ করলাম তা মোটেই বিবেচ্য বিষয় নয়৷ আমরা জোর করে অন্যদের কাছ থেকে সম্মান ও মর্যাদা আদায় করে নিই৷ আমরা খোদায়ী বিধি-বিধানের ধার ধারি না৷ আমাদের মানবিকতা অধপতনের চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে৷” পাশ্চাত্যে ধর্মীয় চিন্তাধারা সম্পর্কে কথা বলার সূত্রে আরো যে বিষয়টি প্রসঙ্গত এসে যায় তাহলো-খ্রিষ্টান জগতে মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁর যুগ পর্যন্ত এমনকি সংস্কারবাদীদের তৎপরতার সময়ও এই ধর্মের মূলনীতিগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয় নি৷ কিন্তু আধুনিককালে অর্থাৎ আঠারো শতকে ধর্মের সাথে পশ্চিমাদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তিনটি উপাদান কাজ করেছিল৷ এগুলো হলো জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রতি অতিশয় অনুরাগ এবং ঐতিহাসিক সমালোচনা৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নামে একটি দল খ্রিষ্টান ধর্ম কিংবা বলা যায় সর্বোপরি ধর্মের ওপর আঘাত হেনেছিল৷ অনেকেই আবার জ্ঞান-বিজ্ঞানের নামে ধর্মীয় তাৎপর্য এবং ভাবার্থের ব্যাপারে দ্বিধা-সঙ্কোচ বা সন্দেহ প্রতিষ্ঠা করেছে৷ আরেকটি দল ইতিহাস সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষন করতো৷ তারা মনে করতো কিংবা বলা যায় বিশ্বাস করতো যে , ইতিহাস যে সবসময় প্রামাণ্য এবং নির্ভুল , তা বলা যাবে না৷ খ্রিষ্টান ধর্মের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও তাদের বক্তব্য অভিন্ন৷
যার ফলে ঐশী গ্রন্থ , ঈসা (আ) এর জীবনী এবং তাঁর শিক্ষার ইতিহাস আর একমাত্র অনুসৃতব্য থাকলো না বরং এগুলোও অন্যসবের মতো ইতিহাসের উপাদানে পরিণত হলো৷ এমনকি এইসব উপাদানের আলাদা কোনো গুরুত্বও ছিল না , অন্যান্য উপাদানের মতো এগুলোকেও সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখা হতো৷ এর অনিবার্য পরিণতিতে পাশ্চাত্যে ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা গণহারে লোপ পায় অর্থাৎ ধর্মবিশ্বাসের ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যায়৷ আর এই ধর্মবিশ্বাসের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যে পাশ্চাত্যে আরেকটা আইডিওলজীর প্রয়োজনীয়তা দখা দেয়৷ নতুন এই মতাদর্শ হিসেবে অবশেষে হিউম্যানিজম বা মানবিকতাবাদের আবির্ভাব ঘটে৷

৬ষ্ঠ পর্ব

সুপ্রিয় পাঠক, পাশ্চাত্যে ধর্ম চর্চার ইতিকথা শীর্ষক আলোচনার গত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে , পাশ্চাত্যে ধর্মবিশ্বাসের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যে আরেকটা আইডিওলজীর প্রয়োজনীয়তা দখা দেয়৷ নতুন এই মতাদর্শ হিসেবে অবশেষে হিউম্যানিজম বা মানবিকতাবাদের আবির্ভাব ঘটে৷ বলা বাহুল্য রেনেসাঁসের পর হিউম্যানিজমের আবির্ভাবের সাথে সাথে পাশ্চাত্যের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়৷ তো পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির স্বরূপ নিয়ে আজ বরং কথা বলা যাক৷
হিউম্যানিজমের আদর্শ অনুযায়ী মানুষই হলো সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বা মানদন্ড৷ মানুষই বিশ্বের সকল ক্ষমতার অধিকারী৷ মানবিকতাবাদের এই বিশ্বদৃষ্টি অনুযায়ী ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি কোনোরকম গুরুত্ব না দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারের প্রতিই গুরুত্ব দেওয়া হয়৷ এই মতবাদে আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বহীন ও ম্লান করে দেখা হয়৷ মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারকে সকল কিছুর এমনকি সামাজিক অধিকারের ওপরও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়৷ এই মতবাদে সকল কিছুকেই মানুষের সাথে সম্পৃক্তির নিরিখে বর্ণনা করা হয়৷ ধর্মীয় বিষয়-আশয়ের ক্ষেত্রেও একই বক্তব্য৷ আর এ ভাবেই হিউম্যানিজম এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চেতনা পাশ্চাত্যে স্বার্থবাদী ও ভোগবাদী চিন্তাকেই প্রাণময়তা দেয়৷ পাশ্চাত্যে দুঃখ এবং আনন্দ তাই ভালো এবং মন্দের মানদন্ডে পরিণত হয়ে পড়ে৷ যেমনটি পাশ্চাত্যের বহু মনীষীও বিশ্বাস করতেন৷ তাদের মতে যা কিছুই মানুষকে আনন্দ দেয় নৈতিকতার বিচারে তা-ই ভালো৷ আর যে সব বিষয় বা কাজ মানুষকে কষ্ট দেয় , নৈতিকতার বিচারে তা-ই পাপ বা অকল্যাণ৷
সর্বোপরি ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা যখন ভালো-মন্দ নির্ণয়ের মানদন্ডে পরিণত হয় , তখন রুচিগত বৈচিত্র্যের কারণে চারিত্র্যিক নীতি-নৈতিকতা আপেক্ষিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়৷ আর এক্ষেত্রে আপেক্ষিকতার শাসনের ফলে নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধগুলো যে অকেজো হয়ে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক৷ নৈতিক এই অধপতন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় হিউম্যানিজমেরই পরিণতি৷ আমেরিকার বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও লেখক বিল ডুরান্ট তাঁর লেখা ‘দর্শনের আনন্দ’ নামক বইতে লিখেছেন-আমাদের সংস্কৃতি এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে৷ কেননা ; শিল্পের দিক থেকে এটা হয়তো সমৃদ্ধ তবে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিক থেকে এই সংস্কৃতি ভীষণ দুর্বল৷ এক সময় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে আত্মিক যে ভারসাম্য ছিল সেটারও বিলুপ্তি ঘটেছে৷
পাশ্চাত্যের আরেকটি মতবাদ হলো লিবারেলিজম৷ ধর্মীয় অঙ্গনে লিবারেলিজম এমন এক সময় আত্মপ্রকাশ করেছিল , যখন খ্রিষ্টীয় মতবাদ সমকালীন বিশ্বের সকল চিন্তাদর্শনকেই পুরোপুরি মেনে নিয়েছিল৷ লিবারেলিস্টরা বর্তমানে খ্রিষ্ট ধর্মকে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাবার জন্যে এই ধর্মের অধিকাংশ মৌলিক উপাদানকেই পরিত্যাগ করছে৷ তারা মনে করে , মানুষের আবেগ-অনুভূতির সাথে ধর্মের সম্পর্ক রয়েছে এবং ঈমানের অর্থ কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন বা সে অনুযায়ী আমল করা নয় ৷ তারা ধর্মকে আবেগ-অনুভূতির পর্যায়ে সীমিত করে ফেলেছে৷ লিবারেলিস্টরা মনে করে যে , খোদার ওপর আন্তরিক বিশ্বাস থাকাটাই যথেষ্ট৷ এর বাইরে ধর্মীয় আদর্শ বা এর শিক্ষা-দীক্ষার সাথে পরিচিত হওয়া এবং সেসব বাস্তবায়ন করার মতো কোনো সুযোগ লিবারেলিজমে নেই৷ লিবারেল মতবাদ কেবল খোদায়ী প্রেম এবং ভালোবাসার ওপরই নির্ভরশীল৷ লিবারেলিস্টদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ধর্মকে তার প্রতি সন্দেহের বিধবংসী সয়লাব থেকে রক্ষা করা৷ কিন্তু তাদের রক্ষা কৌশল এমন ছিল যে , এরফলে কেবলমাত্র ধর্মের কাঠামোটাই সুরক্ষিত হতো আর ধর্মের আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো পরিত্যাক্ত হতো৷ জন ল্যাকের মতো ব্যক্তিদের চিন্তা অনুযায়ী লিবারেলিজমের সাথে ধর্ম , সংস্কৃতি , অর্থনীতি ইত্যাদির বাহ্যিক মিল বা সম্পর্ক রয়েছে৷ নীতি-নৈতিকতা বা ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যাপারে মানব স্বাধীনতার ওপর এই মতবাদে অনেক বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে৷
বিগত শতাব্দীর ধর্মীয় শাসন তথা গীর্যার শাসনে যারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল কিংবা যাদের মনে সেই দুঃশাসনের স্মৃতি জাগ্রত ছিল , তাদের কাছে গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি কিংবা লিবারেলিজম বা উদারনৈতিকতাবাদের শ্লোগান ছিল যথেষ্ট আনন্দদায়ক৷ কারণ তারা এই শ্লোগানের মাঝে গীর্যার শৃঙখল থেকে মুক্তি পাবার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল৷ এ জন্যেই পাশ্চাত্যের জনগণ নতুন মতবাদ লিবারেলিজমকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছিল৷ অথচ পাশ্চাত্যে লিবারেলিজমের উৎপত্তি থেকে এর পরিপূর্ণ বিকাশ পর্যন্ত মানুষ এই মুক্তির স্বাদ পায় নি৷ অবশ্য লিবারেলিজমের ফলে গীর্যার ভূমিকা ম্লান হয়ে পড়েছিল , এমনকি খ্রিষ্টধর্মযাজকদের অবস্থাও নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল ঠিকই৷ তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লিবারেলিজম যে আসলে মানবতা বিরোধী একটা মতবাদ পাশ্চাত্যের জনগণ তা বুঝতে পেরেছে৷ অনুরূপভাবে লিবারেলিজম যদিও পাশ্চাত্যকে ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং আচার-অনুষ্ঠান থেকে মুক্তি দিয়ে নতুনত্ব দিয়েছে , তবে খুব বেশিদিন না যেতেই এই মতবাদ নৈতিক অধপতনের চরম অবস্থাও উপহার দিয়েছে৷ জাপানী বংশোদ্ভুত মার্কিন চিন্তাবিদ ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা এ সম্পর্কে বলেছেন-লিবারেলিজম শাসিত সমাজে আগ্রহ-উদ্দীপনা থেমে যাবে এবং এই সমাজ বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়বে৷ জাপানী দার্শনিক তাকেশি উমাহা মনে করেন লিবারেলিজমের পতন অবশ্যম্ভাবী৷ তাঁর মতে মার্ক্সিজমের ব্যর্থতা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিপূর্ণ পতন পাশ্চাত্যে লিবারেলিজমের পতনেরই ইঙ্গিতবাহী৷ লিবারেলিজম কেবল মার্ক্সিজম কিংবা অন্যান্য মতাদর্শের মতো আধিপত্যের ইতিহাসের পাতাই দখল করবে না বরং এই লিবারেলিজম মার্ক্সিজম-পরবর্তী মতবাদ , যার পতন ঘটবে৷ “পশ্চিমা বিশ্বের আরেকটি শক্তিশালী মতবাদের নাম হলো সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ৷ রেনেসাঁসের আগে জ্ঞান-বিজ্ঞান , দর্শন , অর্থনীতি , শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির মতো মানব জীবনের সকল দিকই ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত৷ অন্যভাবে বলা যায় যে ,সে সময়কার মানুষ তাদের জীবনের এই দিকগুলোকে কোনো না কোনোভাবে ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত করতে চাইতো৷ কিন্তু রেনেসাঁসের পর পশ্চিমা বিশ্বে ধর্মের অবস্থান বা গ্রহণযোগ্যতা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়৷ কেননা তখন মনে করা হতো যে মানুষ নিজেই তার জীবনের সকল কল্যাণ সাধনে সক্ষম৷ পরবর্তীকালে এই চিন্তাদর্শ মানবজীবনের সকল মূল্যবোধ এবং প্রয়োজনীয়তা থেকে ধর্মকে আলাদা করে ফেলল৷ এভাবেই শিক্ষা-দর্শন-শিল্প এবং সামাজিক ও নৈতিকতার বিষয়-আশয়গুলোর সাথে ধর্মের দূরত্ব সৃষ্টি হলো৷ রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করার যে প্রবণতা এখন পাশ্চাত্যে লক্ষ্য করা যায় , তা সেক্যুলারিজম নীতির ছোট্ট একটি শাখার বাস্তবায়নমাত্র৷ তবে ইংরেজ কবি শেলীর ভাষ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক শতাব্দীতে সবচেয়ে বড়ো যে বিপর্যয়টি ঘটেছে তা হলো নৈতিক এবং চারিত্র্যিক স্খলন৷

৭ম পর্ব

সুপ্রিয় পাঠক, পাশ্চাত্যে ধর্ম চর্চার ইতিকথা শীর্ষক আলোচনার এপর্ব রেনেসাঁস পরবর্তীকালের একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করবো ৷ এই ঘটনাটি হলো একটি অবক্ষয়৷ গীর্যার অটল মনোভাব এবং রূঢ় আচরণের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার ফলেই এই অবক্ষয়ের সূচনা হয়েছিল৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি , ধর্মীয় বিষয়-আশয় এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধর্মযুদ্ধের তীক্ত স্মৃতির কারণে পাশ্চাত্যের জনগণ সংঘাত অথবা বিরুদ্ধ বিশ্বাস ও চিন্তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে৷ এই পরিস্থিতি পাশ্চাত্যে দেইজম অথবা একত্ববাদের জন্ম দেয়৷
দেইজমের অনুসারীরা ধর্মীয় বিশ্বাস বা শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে৷ তাদের অনেকেই হযরত ঈসা (আ) কে একজন নবী হিসেবে নয় বরং একজন মহাজ্ঞানী বা চিকিৎসক বলে মনে করে ,যিনি ছিলেন একজন মানব সংস্কারক৷ মডার্নিজমের যুগ প্রকৃতির ওপর মানব আধিপত্যের যুগ৷ এই যুগে উন্নত টেকনোলজি এবং প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ প্রকৃতি বিজ্ঞান থেকে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে৷ প্রযুক্তির এই উন্নতির ফলে মানুষের গর্ব ও অহঙ্কার বেড়ে যায়৷ মানুষ তাই ধর্মীয় বিষয় বা শিক্ষার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়ে৷ পশ্চিমা দেশগুলোতে এ ব্যাপারে বিশ্বাসী হতে দেখা যায় যে , ধর্ম বর্ণিত পরকালের বেহেশ্‌ত বা জাহান্নামের যুগ শেষ হয়ে গেছে৷ তারা বরং আরেকটু অগ্রসর হয়ে দাবী করে যে , মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর বুকেই ধর্ম বর্ণিত বেহেশ্‌ত তৈরী করতে সক্ষম৷
নব্য ইউরোপে ধর্মহীনতার চর্চার কারণে পশ্চিমা ভূখন্ডের মানুষ আসমানী বেহেশত থেকে অর্থাৎ যে বেহেশ্‌ত পেতে হলে নৈতিক চরিত্র এবং ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য , সেই বেহেশ্‌ত থেকে তাদের অন্তর ফিরিয়ে নেয়৷ তার পরিবর্তে পৃথিবীর বেহেশ্‌তের প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়ে পড়ে৷ কেননা ; এই বেহেশ্‌তে অন্তরের সকল ইচছা-আকাঙক্ষা , কামনা-বাসনা খুব সহজেই চরিতার্থ করা যায়৷ উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যে মডার্নিজমের সূচনা হয়েছিল , তার নেতিবাচক দিকগুলো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও পাশ্চাত্যের জনগণ মর্তের এই বেহেশতের ওপর দৃঢ় আস্থা পোষণ করে৷
মডার্নিজমের যুগে মানুষের মৌলিক একটা প্রবণতা ছিল ভোগবাদিতা৷ এই ভোগবাদিতার কেন্দ্রমূলে ছিল অবাধ যৌন চর্চা৷ কিন্তু মানুষের বৈচিত্র্যকামী অন্তর থাকার কারণে মডার্ন যুগের মানুষও প্রতিনিয়ত ভোগের নতুন নতুন সামগ্রী ও প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করতে থাকে৷ একথা নিশ্চিত যে , মানুষ যখন ভোগ আর আনন্দকে জীবনের মানদন্ড হিসেবে বেছে নেয় এবং পার্থিব বেহেশ্‌ত গড়াকে জীবনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নেয় ,তখন চারিত্রিক মূল্যবোধের অনুসরণ নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়৷ সুতরাং বলা যায় যে , নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ই হলো মডার্নিজমের অবদান৷ আধুনিক বিশ্বে নৈতিকতার যে নতুন রূপ উন্মোচিত হয়েছে , তার সাথে খোদায়ী বিধি-বিধানের কোনোরকম সম্পর্ক তো ছিলই না বরং সেসব মানুষের স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচিছল৷ ডঃ হোসাইন নাস্‌রের বক্তব্য অনুযায়ী , আধুনিক বিশ্বের নৈতিকতা মানবসৃষ্ট হবার কারণে মানুষের ঘুর্ণাবর্তে নিমজ্জিত হবার ঘটনা ত্বরান্বিত হয়েছিল৷
আধুনিক মানুষেরা তাদের পার্থিব বেহেশ্‌ত তৈরী নিশ্চিত করার জন্যে নিজেদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার পাশাপাশি দুঃখ-কষ্টের পরিবর্তে পৃথিবীতে আনন্দ-স্ফূর্তি আর উল্লাস প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছিল৷ কিন্তু আধুনিক সব টেকনোলজি বা প্রযুক্তির মাধ্যমেও সকল দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা ছিল অসম্ভব৷ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বড়জোর কেবল শারীরিক কষ্টেরই নিরাময় করতে পারে৷ তবে প্রযুক্তির পক্ষেও কিন্তু সকল সমস্যা বা প্রশ্নের সমাধান দেওয়া সম্ভব হতো না৷ তো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেসব প্রশ্নের জবাব দিতে ব্যর্থ হতো , সেখানেই তাদের অন্তরজ্বালা দেখা দিত৷ যেমন , কোত্থেকে এসেছে , কোথায় যাবে কিংবা পৃথিবীতে মানব জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী , ইত্যাদি ? আধুনিক মানুষের বিবেক-বুদ্ধি তাকে মুক্তি দিত না , এবং তার কাজের জন্যে তাকে জবাবদীহি করতে হতো৷
আধুনিক মানুষের এই আচছন্নতার কোনো সদুত্তর না থাকায় তারা উদাসীন হয়ে পড়েছিল৷ কেননা বাস্তবতার উপলব্ধি তাদেরকে আরো বেশি পীড়া দিত৷ এ কারণে কীভাবে নিজেকে ভুলে থাকা যায় , তার উপায় খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়৷ এভাবেই আনন্দ-উপভোগে মেতে উঠে বিচিত্র মাদকদ্রব্যের ব্যবহার বিশেষ করে এ্যালকোহোলিক মদ পানের প্রবণতা পাশ্চাত্যে দিন-দিন বৃদ্ধি পায়৷ বলা যেতে পারে যে , আধুনিক মানুষের জন্যে মডার্নিজমের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হচ্ছে এই উদাসীনতা৷ আমেরিকার বিখ্যাত একজন চিন্তাবিদ ও মনোবিজ্ঞানী এরিক ফোর্ম এ সম্পর্কে লিখেছেন , ইউরোপের সবচে, শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এমনকি স্বয়ং আমেরিকাতেও মানসিক অস্থিরতা বা পেরেশানির পরিমাণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি৷ পশ্চিমা বিশ্বে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যই হলো বস্তুতান্ত্রিক জীবন৷ যেসব দেশ এই বস্তুতান্ত্রিক লক্ষ্যের অভিমুখী হয়েছে , সেসব দেশে মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ বেশি দেখা যায়৷ তাহলে কি বলা যায় না যে , বিলাস-বহুল জীবন বস্তুগত প্রশান্তি নিশ্চিত করলেও নিরন্তর অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ? যার কারণে সবাই মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে ? পাশ্চাত্যের চিন্তা ও মতবাদগত ভ্রান্তি এ কথারই সাক্ষ্য দিচেছ যে , নতুন এই সভ্যতা মানব জীবনের গভীর চাহিদাগুলো মেটাতে সক্ষম হয় নি৷
পাশ্চাত্যের আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সমালোচকগণ মনে করেন যে , আধুনিকতাবাদে বিশ্বাসী মানুষেরা নিঃসঙ্গ বা আত্মস্বরূপ-বিচিছন্ন হয়ে গেছে৷ লুই লেফ্রান্স রাঙ্গে নামের ফরাশী বিখ্যাত লেখকের লেখার উদ্ধৃতি দিয়েই বরং আজকের আলোচনার পরিসমাপ্তি টানা যাক৷ তিনি তাঁর পাশ্চাত্যের আবর্জনা নামক গ্রন্থে পশ্চিমা সমাজের বর্তমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সমালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন , বিবেক-বুদ্ধি থেকে দূরে অবস্থানকারী চিন্তাদর্শের প্রতি ঝোঁক এমনকি যুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ঘটনা আধুনিক পাশ্চাত্যের যুবকদেরকে সচেতন করে তুলেছে৷ শুধুমাত্র যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়া আর প্রজ্ঞাই সবকিছু নয় , যা আমাদেরকে জীবনের মূল্যবোধ বা জীবনার্থ বুঝতে সাহায্য করে , বরং আজকাল বহু যুবক বা মানুষ রয়েছেন যাঁরা জীবনের অর্থের অন্বেষণ করছেন৷ পাশ্চাত্যের যুব প্রজন্মের মধ্যে ভয়াবহ যে মাদকাসক্তি বিরাজ করছে , তা এদেরই একটি গ্রুপের উত্তেজনা , গোমরাহী আর জীবনের সকল অঙ্গিকার ও নৈতিক বাধ্যবাধকতাকে প্রত্যাখ্যান করার ফলাফলমাত্র৷ আজকের প্রজন্মের অধিকাংশ যুবক পাশ্চাত্যের বর্তমান সভ্যতা তথা আরাম-আয়েশী ও বস্তুবাদী সভ্যতার বিরোধী৷ কারণ , এই সভ্যতায় তাদের জন্যে দেহবৃত্তির বাইরে আর কোনো বার্তা নেই৷

৮ম পর্ব

পশ্চিমা মতবাদের ইতিহাসে পোস্ট মডার্ন যুগ এমন একটি যুগ যা ট্র্যাডিশনাল এবং মডার্ন যুগের পরে সৃষ্টি হয়েছে৷ এই যুগের পাশ্চাত্য গবেষক-চিন্তাবিদদের অনেকেরই মডার্ন যুগের ওপর বিশ্বাস নেই৷ পাশ্চাত্য সমাজ চিন্তার মৌলিক কিছু উপাদান এখনো আছে , তবে পোস্টমডার্ন চিন্তার অনুসারীরা বিশ্বের অস্তিত্বকে কেবল প্রকৃতির মাঝে সীমাবদ্ধ বলে মনে করে না৷ যাই হোক শ্রোতাবন্ধুরা , মডার্নিজম এবং লিবারেলিজম নিয়ে কথা বলার পর আজ বরং এই পোস্ট মডার্নিজম নিয়েই আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো৷ আপনারা আসরের শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গী হচ্ছেন এই প্রত্যাশা রইলো৷ পোস্ট মডার্নিজমের ধর্মীয় গুরুত্ব নামক গ্রন্থে হিউস্টন স্মিথ লিখেছেন, ‘বৈজ্ঞানিক বিশ্বদৃষ্টি আমাদেরকে কেবল অর্ধেক বিশ্ব সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে৷ কিন্তু বাকী অর্ধেক-যার মধ্যে রয়েছে মূল্যবোধ , প্রতীয়মান অর্থ , গুণমান এবং অবস্তুগত বাস্তবতা-সে সম্পর্কে কোনো খবরই নেই৷’ পোস্ট মডার্নিজমের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য হলো ধর্ম-বিধর্ম নির্বিশেষে সকল বিশ্বদৃষ্টির প্রতিই অবিশ্বাস স্থাপন৷ অন্যভাবে বলা যায় , মডার্নিজমের যুগে পশ্চিমা বিশ্ব বৈজ্ঞানিক উন্নতির কারণে ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল৷ এখনো তার অবস্থা তথৈবচ৷ ধর্মের স্থানে তারা অন্যকিছুকে স্থলাভিষিক্ত না করেই পোস্টমডার্নিজমকে গ্রহণ করে৷ সমকালীন একজন বিখ্যাত চিন্তাবিদ অলভিন টপলার মডার্নিজম পরবর্তী পোস্ট মডার্নিজমকে পাশ্চাত্যে পরিবর্তনের তৃতীয় ধাপ বা তরঙ্গ বলে অভিহিত করে বলেছেন, ‘ দ্বিতীয় তরঙ্গ অর্থাৎ মডার্নিজম ট্র্যাডিশনাল দৃষ্টিভঙ্গীকে অবমূল্যায়ন করে শিল্পক্ষেত্রে প্রবর্তিত হয়েছিল৷ পরিবর্তনের পর্যায়ে এখনো রয়েছি আমরা৷ নতুন এই তরঙ্গ অর্থাৎ পোস্ট মডার্নিজমের লক্ষ্য হলো বিগত তিন শ’ বছরের বোধ-বিশ্বাসকে অস্বীকার করা৷ এখন শিল্পযুগের চিন্তাধারাগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে কিংবা বৃহৎ থিউরিগুলোর প্রভাব বলয়ের নীচে চাপা পড়ে গেছে৷” পাশ্চাত্যের জনগণ সম্ভবত বিগত কয়েক দশকের তুলনায় আধ্যাত্মিকতার দিকে বর্তমানে অনেক বেশী ঝুঁকছে৷ ইউরোপে আঠারো কিংবা উনিশ শতকে উদ্ভূত মতবাদ বা আইডিয়োলজিগুলোর ব্যর্থতার কারণেই এই ঘটনা ঘটছে৷ কেননা অল্প সময়ের মধ্যেই পাশ্চাত্য মতবাদগুলোর বিধবংসী প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে গেছে৷ আজকের পাশ্চাত্যের অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও গবেষক ধর্ম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি যেভাবে ঝুঁকে পড়েছে , তা নজীরবিহীন৷ অলভিন টপলার এই ধর্মানুরাগের কারণ সম্পর্কে লিখেছেন , মডার্নিজম মতবাদের ব্যর্থতার কারণে পাশ্চাত্যে এখন কোটি কোটি মানুষ নতুন কোনো বিশ্বাসের অপেক্ষায় হতাশার বীণা বাজাচেছ৷ এমনকি তারা প্রাচীন কোনো বিশ্বাসকে যা পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তের জন্যে হয়তো কোনো এক সময় সঠিক ও গ্রহণযোগ্য ছিল , সেরকম কোনো বিশ্বাসকে নিজেদের দেশে প্রবেশ করাতে এবং তার প্রচার প্রসারের চেষ্টা চালাচেছ৷ শিল্পযুগের মানব সৃষ্ট মনগড়া মতবাদের পতনের ফলে তারা এখন আত্মার খোরাক খুঁজে বেড়াচেছ৷ এই অনুসন্ধানী তৎপরতার রেশ ধরেই তারা ধর্মীয় গবেষণায় লিপ্ত হচ্ছে এবং প্রাচীন কিছু মতাদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে৷ টপলার আরো বলেছেন, ুমানুষ , বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ও যে মতাদর্শগত দুর্দশার ঘুর্ণাবর্তে পড়ে এতোটা বিষাদগ্রস্ত হতে পারে তার কোনো দৃষ্টান্ত ইতোপূর্বে দেখা যায় নি৷ প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো আমাদের মন-মানসিকতাকে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং মানুষ আজ হতাশার সমুদ্র সাঁতরে তীরে ওঠার জন্যে যে-কোনো একটা মতবিশ্বাসের খোঁজে রয়েছে৷ ” নতুন জীবনের একটা বৈশিষ্ট্য হলো জীবনের অর্থ খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানো৷ জীবনার্থ হারিয়ে অসংখ্য যুবক বিপথে পা বাড়িয়েছে৷ কেউ যৌন লিপ্সা চরিতার্থ করার পথ বেছে নিয়েছে , কেউবা নিয়েছে মাদকদ্রব্যের পথ৷ আবার অনেকেই সহিংসতা ও বিচিত্র অপরাধের পথে এগিয়েছে৷ আরেকটি গ্রুপ বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তা , সাংস্কৃতিক চিন্তা বা নতুন কোন ধর্মের অন্বেষণে আত্মনিয়োজিত হয়েছে৷ কেউ কেউ একটা বাস্তবতায় পৌঁছার আশায় দিন গুণে গুণে আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে আত্মহননের পথই বেছে নিয়েছে৷ ইউরোপ এবং আমেরিকার ধনিক বা উচচবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকেরাই এই পথে বেশী ধাবিত হয়েছে৷ টেঙাস বিশ্ববিদ্যালয়ের নওমুসলিম সাবেক প্রফেসর মুহাম্মাদ লগন হৌজান এ সম্পর্কে বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্বে জনজীবন এতোবেশী গতানুগতিক ও একঘেঁয়ে হয়ে গেছে যে , তাদের জীবন থেকে যেন হাসি-আনন্দ পালিয়ে গেছে৷ তাদের অন্তর তাই এই একঘেঁয়ে জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো তথা মুক্তি পাবার লক্ষ্যে সদা ছটফট করছে৷ যদি তাৎক্ষণিক প্রেম থাকতে পারে , যদি তাৎক্ষণিক চমৎকারিত্ব থাকতে পারে কিংবা থাকতে পারে দ্রুত সুস্থতার ব্যবস্থা , তাহলে জরুরী ধর্ম বা মতবাদের ব্যবস্থা কেন থাকতে পারে না ? মাদকদ্রব্যের ব্যবহারকেও এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হয় , অর্থাৎ মাদকদ্রব্য সেবন হলো মনের চাহিদাগুলো মেটানোর একটা তাৎক্ষণিক ও অবৈধ উপায়৷”
পাশ্চাত্যে ধর্মকে আরো ভালভাবে উপলব্ধি করার জন্যে দুটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া দরকার৷ একটা হলো ধর্মীয় আদর্শ যা গীর্যার বাইরে থেকে প্রকাশিত হয়েছে , অপরটি হলো ধর্মের নবরূপায়নের জন্যে যেসব আন্দোলন হয়েছে সেগুলোর প্রতি নজর দেওয়া৷ বিগত কয়েক দশকে পাশ্চাত্যে নতুন কিছু ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে৷ এইসব ধর্মের আবিষ্কর্তা হলেন সেইসব পাদ্রী যারা গতানুগতিক গীর্যা থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের বিশেষ বিশেষ ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন৷ এই ধরনের নতুন একটি ধর্মীয় বিধান হলো ক্রিশ্চিয়ন সায়েন্স৷ ক্রিশ্চিয়ন সায়েন্স গ্রুপের সদস্যরা হলো সেইসব ব্যক্তিবর্গ যারা আগে প্রোটেস্টান্ট ছিলো কিন্তু ট্র্যাডিশনাল গীর্যার বিরোধী ছিল৷ এই গ্রুপটি আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী৷ তবে দুঃখ-দারিদ্র্য , যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো অস্বাভাবিক বিষয়গুলোর জন্যে মানুষ নিজেই দায়ী বলে তারা মনে করে৷ অর্থাৎ তাদের বক্তব্য হলো মানুষের ব্যক্তিগত ধবংসকামী চিন্তা এবং পাপের ফলেই অস্বাভাবিকতাগুলো দেখা দেয়৷ এই গ্রুপটি রোগ-ব্যাধির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বা হাসপাতালের চিকিৎসার পরিবর্তে দোয়া করার পক্ষপাতি৷ এই মতবাদের অনুসারীদেরকে সমাজের ব্যাধিগ্রস্ত ও আর্থিক সমস্যাগ্রস্ত মধ্যশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়৷
অপর যে বিষয়টি পাশ্চাত্যে লক্ষ্য করা গেছে তাহলো প্রাচ্য ধর্মগ্রহণ প্রবণতা৷ এই ঘটনা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বেশী লক্ষ্য করা গেছে৷ পাশ্চাত্যের যেসব মানুষ আত্মিক এবং আধ্যাত্মিকতার তৃষ্ণায় ভুগছিলেন , তারা তাদের প্রচলিত ধর্মে এর সমাধান না পেয়ে প্রাচ্যের ধর্মগুলো বিশেষ করে হিন্দু ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল৷ ধর্মান্তরের এইসব ঘটনা যদিও বাহ্যিকভাবে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয় , তবু নবপ্রজন্মের আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজনীয়তা এ থেকে প্রমাণিত হয়৷ অন্যদিকে , খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদিধর্ম থেকে পাশ্চাত্যের জনগণের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও এ থেকে প্রমাণিত হয়৷ তবে দুঃখজনক বিষয়টি হলো পাশ্চাত্যের এই নতুন চিন্তা তথা পোস্টমডার্নিজম অনেকটা পূর্বের আপেক্ষিকতাবাদ কিংবা নিহিলিজমের কাছাকাছি৷

৯ম পর্ব

সুপ্রিয় পাঠক ! পাশ্চাত্যে ধর্ম চর্চার ইতিকথা শীর্ষক আলোচনার গত পর্বে আমরা পশ্চিমা বিশ্বের জনগণের ধর্মাদর্শ চিন্তা এবং পোস্টমডার্নিজম বা উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে করেছি৷ আজ তারি ধারাবাহিকতায় পশ্চিমা সমাজে ধর্মীয় চিন্তা এবং আধ্যাত্মিকতার সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো৷ ইতোপূর্বে আপনা জেনেছেন যে , ১৯৫০ এর দশকের মাঝামাঝি পর্যায় থেকে মডার্নিজমের আশাবাদে সন্দেহ দেখা দেয়৷ প্রযুক্তির ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় এবং এ বিষয়ে উপনীত হয় যে , প্রযুক্তির ধবংসাত্মক প্রভাব মানুষের স্বাধীনতা এবং পরিবেশকে বিপন্ন করবে৷ বিশ্বজুড়ে আজ এই চিন্তা বিস্তৃতি পাচেছ যে কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বস্তুগত অগ্রগতিই জীবন নয়৷ এই দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী একটা সমাজ কারিগরী বা প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নত হলেও চরিত্র , শিল্প , রাজনীতি এবং পরিবেশগত দিক থেকে যদি উন্নত বা সুস্থ না হয় , তাহলে ঐ সমাজ উন্নত সমাজ হিসেবে গণ্য হয় না৷ আমরা কেবল শাব্দিক অর্থে উন্নয়নের দিকে ছুটছি অথচ প্রকৃত উন্নয়ন বলতে যা বোঝায় তা বস্তুতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় সংজ্ঞায়িত হয় না৷ সমকালীন লেখক অলভিন টপলারের ভাষ্যমতে-‘বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচেছ , এই দুর্গন্ধ মরণাপন্ন শিল্প সভ্যতার দুর্গন্ধ৷’বিশ্বের অনেক বুদ্ধিজীবী মনে করেন , আমরা সঙ্কটময় এক বিশ্বে বসবাস করছি৷ এই সঙ্কটের বেশিরভাগই মডার্নিজমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিণতি৷ ধর্ম থেকে দূরে অবস্থান করার সাথে এই সঙ্কটের সম্পর্ক রয়েছে৷ সমাজ ও পরিবেশগত এই সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে অপরাধ ও জুলুমের বিস্তার , মাদকাসক্তির ভয়াবহ বিস্তার , এ্যালকোহলিক পানীয় অর্থাৎ মদ পানের প্রবণতা বৃদ্ধি , আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি, পারিবারিক সঙ্কট বৃদ্ধি প্রভৃতি৷ বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের সামনে অসংখ্য সমস্যার পাশাপাশি যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশী মারাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছে তাহলো নিঃসঙ্গতা৷ নিঃসঙ্গতা মানুষের জীবনীশক্তিকে নষ্ট করে দেয় , জীবনকে যান্ত্রিক করে তোলে৷ অলভিন টপলার এ প্রসঙ্গে বলেছেন ঃ‘লস এঞ্জেলস থেকে লেনিনগ্রাদ পর্যন্ত যুবাকিশোর থেকে শুরু করে অসুখী দম্পতি, নিঃসঙ্গ মাতা-পিতা , সাধারণ শ্রমিক এবং বৃদ্ধরা-সবাই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে হতাশায় ভুগছে৷ পিতা-মাতারা অভিযোগ করছেন যে , তাদের ছেলেমেয়েরা এতো বেশী ব্যস্ত-শশব্যস্ত যে তারা তাদের বাবা-মায়ের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা এমনকি টেলিফোন করে খোঁজখবর নেওয়ারও সুযোগ পাচেছ না৷ ব্যাচেলর ক্লাবগুলো পতিতালয়ে পরিণত হয়েছে৷ অবস্থা এমন দুর্বিসহ যে জীবনের ক্ষেত্রে হতাশ যুবকদের একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র যেন এগুলো৷ হাউজ ওয়াইফ বা গৃহবধূরা তাদের সোনার সংসারে একাকী নিঃসঙ্গ জীবনের গ্লানী নিয়ে পেরেশানীতে ভুগছে৷ তাদের এই নিঃসঙ্গতা বা গৃহের নীরবতা ভঙ্গ করার জন্যে তারা গৃহপালিত বিচিত্র পশু পোষার কাজে আত্মনিয়োগ করেছে৷ নিঃসঙ্গতা এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে চোখে না দেখলে তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে না৷ পশ্চিমা জনগণের বর্তমান এই অস্থিরতাপূর্ণ পরিস্থিতির ব্যাপারে জার্মানীর বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী এরিক ফ্রুম বলেছেন-‘মানুষের মাঝে ভীতি এবং নিঃসঙ্গতার এই অনুভূতির জন্যে দায়ী হলো নব্য স্বাধীনতা৷’ বর্তমান সঙ্কটগুলো নিরসনের জন্যে সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীসহ সমকালীন চিন্তাবিদগণ ধর্মের প্রতি মনোনিবেশ করেছেন৷ তাঁদের মতে যে সমাজের নাগরিকরা ধর্মের নীতিমালার ওপর ভর দিয়ে সামাজিক অসংলগ্নতাগুলোকে দূরীভূত করতে পারে না , সেই সমাজ ধবসে পড়তে বাধ্য এবং সেই সমাজে ব্যক্তিগত অস্থিরতা ও সামাজিক উত্তেজনা শেঁকড় গেড়ে বসে৷ আজকাল লক্ষ্য করা যায় যে , পশ্চিমা অনেক বুদ্ধিজীবী সামাজিক সমস্যার সমাধানে ধর্মীয় কোনো কোনো নীতিমালার বাস্তবায়নের প্রতি মনোযোগী হয়েছেন৷ পরিবেশের কথাই ধরা যাক , বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন যে , পাশ্চাত্য তাদের দৃষ্টি যদি প্রকৃতির দিকে ফেরায় তাহলেই পরিবেশের সঙ্কট সমাধান করা যায়৷ ধর্মীয় কিছু অনুশাসন মেনে চলার মাধ্যমেই তা সম্ভব৷ এ সম্পর্কে পশ্চিমা লেখক উইলিয়ম মন্টেগমারী ওয়াট পরিবেশবাদীদের প্রতি ইঙ্গিত করেন যে, তারা তাদের পরিবেশবাদী আন্দোলনগুলোতে ধর্মের রঙ লাগাবার চেষ্টা করছেন যাতে ধর্মের প্রতি অনুরাগীরা তাদের এই আন্দোলনের প্রতি মনোনিবেশ করে৷ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন : ‘পশ্চিমা ভূখন্ডে বিস্তীর্ণ পর্যায়ে প্রযুক্তির লাগামহীন প্রয়োগ যে জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে তা বিগত কয়েক শতাব্দীতে বোঝা গেছে৷ যদিও এ বিষয়টা প্রত্যক্ষভাবে ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয় , তারপরও ধর্মই প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহার রোধ করে তার যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷ সেইসাথে সকল জাতিকেই প্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে৷’ পাশ্চাত্যে আজকের ধর্মচর্চার সাথে অতীতের ধর্মচর্চার যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তার কারণ হলো, বর্তমান পাশ্চাত্যের জনগণ ধর্মকে হয় তাদের জীবনের প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে দেখেছে , না হয় একটা উপাদান হিসেবে দেখেছে৷ আর সেজন্যেই ধর্ম পশ্চিমাদের জীবনে খুব কমই তার পবিত্র প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে৷ এরিক ফ্রুম এ সম্পর্কে বলেছেন : ‘আসলে পশ্চিমা সমাজে এখন খোদার মূল ভাবার্থ বা তাৎপর্যই অনুপস্থিত৷ জনগণ যেন খোদা সম্পর্কে তাদের নিজস্ব বোধ উপলব্ধি খুইয়ে বসেছে৷ তারা এমন এক সংস্কৃতির চর্চা করছে , যার সাথে নিজস্ব সমাজ ও জীবনবোধ বা জীবন চর্চার কোনো সম্পর্ক নেই৷ এককথায় পাশ্চাত্যের জীবন একরকম যান্ত্রিকতায় পরিণত হয়েছে৷ অবশ্য বর্তমানে খোদার প্রতি বিশ্বাসের তাৎপর্যে দৃষ্টিভঙ্গীগত নবায়ন ঘটেছে৷ এখন খোদার প্রতি বিশ্বাস মনোবিজ্ঞানের একটি উপায়-উপকরণে পরিণত হয়েছে৷ অর্থাৎ খোদার প্রতি বিশ্বাস থাকলে প্রতেযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মানসিক শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়৷’একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জনগণ এ ব্যাপারে সচেতন হয়েছে যে , নতুন সভ্যতার অবদান কেবল নিঃসঙ্গতাই নয় বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্তুতান্ত্রিক এবং আধ্যাত্মিকতার অভাবও এই সভ্যতার অবদান৷ এই সচেতনতা বিশেষত উন্নত বিশ্বের যুবকদের ক্ষেত্রেই বেশী প্রযোজ্য৷ যেসব যুবক তাদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন , এই সচেতনতা এখন তাদেরকে জীবনার্থ খুঁজে বেড়ানোর কাজে তৎপর করে তুলেছে৷ তারা বুঝতে পেরেছে যে , বর্তমান সমস্যাসঙ্কুল বিশ্বের মানব জীবন ও সভ্যতা নির্ভর করছে এইসব সমস্যার সমাধানের ওপর৷ আর এই সমস্যা সমাধানের জন্য মানুষের উচিত ধর্মীয় বাস্তবতাকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করা৷ কেননা ধর্ম হলো একটা জীবন বিধান অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত এমন কিছু বিধি-বিধান এবং শিক্ষার সমষ্টি যার সাহায্যে জীবনের সকল সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা হয়৷ এই দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী , ধর্ম এমন কোনো মাধ্যম বা উপাদান নয় যা কেবল মানুষের তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান দেবে৷ যদিও মানুষের বস্তুগত এবং অবস্তুগত বা আধ্যাত্মিক সকল সমস্যা সমাধানেই ধর্মের যথার্থ ক্ষমতা রয়েছে৷ #

১০ম পর্ব

প্রিয় পাঠক, ‘পাশ্চাত্যে ধর্মচর্চার ইতিকথা’ শীর্ষর্ক ধারাবাহিক আলোচনার বিগত পর্বগুলোতে আমরা বলেছিলাম যে , খ্রীস্টধর্ম থেকে পশ্চিমা জনগণের দূরত্বের মধ্য দিয়ে মডার্নিজমের যুগ শুরু হয়৷ জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে তারা আশা করেছিল যে , এসবের মাধ্যমে তারা তাদের সকল চাহিদা মেটাতে পারবে৷ মডার্নিজমের যুগের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো ভোগলিপ্সা এবং উদাসীনতা৷ এই যুগে বিচিত্র উন্নতি সত্ত্বেও জনগণ এ বিষয়টি খুঁজে বেড়াতো যে , পৃথিবীতে আসলে জীবনের প্রকৃত মানে টা কী ? প্রশ্নই শুধু মনে জেগেছিল , কিন্তু উত্তর দিতে তারা ছিল অপারগ৷ এই অবস্থা থেকেই পাশ্চাত্যে ধর্মীয় চিন্তার ইতিহাসে নতুন আরেকটি যুগের উন্মেষ ঘটে , যার নাম পোস্ট মডার্নিজম হিসেবেই বিখ্যাত৷ আজ আমরা এ বিষয়টি দিয়েই আমাদের আলোচনা শুরু করবো৷
এই যুগে পাশ্চাত্যের জনগণ তাদের অজ্ঞতা-অস্থিরতা এবং আত্মপরিচয়হীনতা সম্পর্কে সচেতন হয়৷ তারা এখন ভালো করেই জানে যে , তাদের নতুন নতুন আবিষ্কার আর উদ্ভাবনী দিয়ে সকল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না৷ ফলে হতাশ হয়ে তারা এখন নতুন কোনো বিশ্বাস বা মতাদর্শের অনুসন্ধান করছে৷ নতুন এই মতাদর্শ অনুসন্ধান করতে গিয়ে পশ্চিমারা বিভিন্ন পথ অতিক্রম করেছে৷ অবশ্য আলফ্রেড স্মিথের মতো পশ্চিমা চিন্তাবিদগণ জীবন সমস্যার এই সমাধান ইসলামের মধ্যেই অনুসন্ধান করছেন৷ এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘বর্তমানে মানব সমাজের নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক বিভিন্ন সমস্যা বিশ্বজনীন হয়ে পড়েছে৷ আমরা বলতে পারি যে , ইসলাম কেবল মুসলমানদের জন্যেই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের জন্যেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো , পাশ্চাত্যের বহু রাজনীতিবিদ এবং আরো অনেকেই এই বাস্তবতাকে মেনে নিচেছ না৷’
পাশ্চাত্যের খ্রীস্টিয় জগতের ওপর যেসব চিন্তাদর্শ প্রভাব ফেলেছিল , ইসলাম ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম৷ আপনাদের জানা আছে নিশ্চয়ই যে, ইউরোপে ইসলামের উপস্থিতি বেশ দীর্ঘ ছিল৷ ইউরোপীয় সমাজের সামগ্রীক অবক্ষয়কালে এই ইসলামই ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেছিল৷ ইসলামী বিধি-বিধান ও কর্মসূচির ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কালে ইসলামের এইসব কর্মসূচির কারণে ইউরোপে ইসলামের উন্নয়ন ও বিকাশ হয়েছিল৷ মধ্যযুগে ইউরোপে ইসলামের উপস্থিতির ফলে ইউরোপীয়রা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে উপকৃত হয়েছিল৷ বস্তুত রেনেসাঁসের যুগে প্রাকৃতিক এবং ব্যবহারিক বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি ও অগ্রগতির জন্যে ইউরোপীয়রা মুসলমানদের চিন্তাধারার কাছে ঋণী৷ এ সময় আরবি , ফার্সি ভাষার বিভিন্ন বই-পুস্তক ইউরোপের বহু ভাষায় অনূদিত হয়৷ পাশ্চাত্যে ধর্ম সংস্কারের যে আন্দোলন প্রোটেস্টান্ট তথা ক্যালভিন এবং লুথারী ধারার ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল , জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উন্নয়ন এবং মানুষের মাঝে কর্মপ্রচেষ্টা বৃদ্ধির প্রয়াস ঐ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল৷ বলা যায় ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার সাথে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের পরিচয়ের সূত্র ধরেই জ্ঞান ও কর্মের প্রতি তাদের এই আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল৷ ২০০১ সালে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ইস্পাইগেল ইউরোপে ইসলামের উপস্থিতি সম্পর্কে ‘মুহাম্মাদ কে ? ‘ শিরোণামে একটি প্রবন্ধ ছাপে৷ ঐ প্রবন্ধে লেখা হয়েছিল , খ্রীস্টিয় ৭৩২ সালে ইউরোপে ইসলামের অগ্রযাত্রা প্যারিসের দোরগোড়ায় এসে থেমে যাবার কারণে ফ্রান্সবাসীরা ইসলামী আদর্শ থেকে লাভবান হতে পারে নি৷ জার্মানী এবং ফ্রান্সে যখন রোগ-ব্যাধি আর ক্ষুধায় মানুষ মারা যাচিছল ,তখন মুসলিম বিশ্বের পূর্বাঞ্চলে হাসপাতাল আর ঔষধ সরবরাহকেন্দ্রগুলো ব্যাপক তৎপর ছিল৷ স্পেনে ইসলামী স্থাপত্য শিল্প বিকাশ লাভ করেছিল এবং মুসলমানরা সেখানে রসায়ন , জ্যোতির্বিদ্যা , গণিত ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণামূলক বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল৷ সে সময় মুসলমান মনীষীরা যদি এ্যারিস্টটলের রচনাগুলো প্রকাশ ও বিশ্লেষণ না করতো , তাহলে তার সম্পর্কে জানার জন্যে পশ্চিমা বিশ্বকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হতো৷ কাগজ , বারুদ , দিক-দর্শনযন্ত্র বা কম্পাসের মতো জিনিসগুলো মুসলমানরাই দূরপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে নিয়েছিলেন এবং আবহাওয়া বিজ্ঞানের মতো গর্বিত বিষয়গুলো মুসলমানদেরই আবিষ্কার ছিল৷ ইউরোপে ইসলামের আগমনের ফলে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটেছিল এবং পাশ্চাত্যের জনজীবনে অনুকূল বাতাস বইতে শুরু করেছিল৷
খ্রীষ্ট জগতের জন্যে ইসলামের ব্যাপক অবদান সত্ত্বেও সেই শুরু থেকেই খ্রীস্টানদের কিছু নেতা ইসলামের সাথে শত্রুতামূলক আচরণ করতে থাকে৷ তাদের সেই শত্রুতার ধারা আজ পর্যন্তও অব্যাহত রয়েছে৷ এই শত্রুতার অংশ হিসেবেই পাশ্চাত্যের কিছু স্বার্থপর ব্যক্তিবর্গ সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল কোরআন এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মর্যাদার ওপর আঘাত হানে৷ তাদের এই শত্রুতার কারণ হলো ইসলামের সীমাহীন গ্রহণযোগ্যতা ও সকল সমস্যা সমাধানে তার সামর্থ৷ ইসলামী যুগে মুসলমানরা এই ধর্মের সকল সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছিল৷ ইউরোপ যখন অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল , তখন মুসলমানরা সভ্যতা এবং সংস্কৃতিতে ব্যাপক উন্নত ছিল৷ ইসলামের বিকাশের সাথে সাথে তাই খ্রীস্টিয় জগতের ব্যাপ্তি হ্রাস পেতে থাকে৷ এ জন্যেই পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা ইসলামের বিকাশ রোধ করার লক্ষ্যে এই ধর্মের চেহারায় বিশেষ করে হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ওপর কালিমালেপন করার মতো ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চালায়৷ এমনকি সর্বসম্প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের কথা উচচারণ করলেও এসব দেশের গণমাধ্যমগুলোতে ইসলামী মূল্যবোধ ও নীতিমালার প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ করতে দেখা গেছে৷ জার্মানীর ইসলাম বিশেষজ্ঞ ডঃ ইওভুয ইযুগুয এ সম্পর্কে বলেন, ‘জার্মানীসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্যে তাদের সকল শক্তি কাজে লাগাচেছ৷ তাদের এই অপপ্রয়াসের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজনমতকে ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রবাহিত করা৷ পাশ্চাত্যে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার ঘটনা বৃদ্ধি পাবার কারণে ভীত হয়েই তারা এধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে৷ মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারণার এটাই মূল কারণ৷’
বলা বাহুল্য ! পাশ্চাত্যে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে এতোসব ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে৷ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং পর্যালোচনাযোগ্য ঘটনা যে , ইসলামের বিরুদ্ধে এতো বিষাক্ত অপপ্রচারণার পরও কেন ইউরোপীয় জনগণ সেই ইসলামকেই বেছে নিচেছ৷ অথচ তাদের সামনে রয়েছে পোস্টমডার্ন মতবাদ৷ রয়েছে মডার্নিজমের অভিজ্ঞতার সম্ভার আর খ্রীস্টবাদের হতাশাগ্রস্ত নিষপ্রাণ শিক্ষা৷

১১তম পর্ব

সুপ্রিয় পাঠক ! পাশ্চাত্যে ধর্ম চর্চার ইতিকথা শীর্ষক আলোচনায় গত কয়েকটি পর্বে আমরা বলেছিলাম যে , পাশ্চাত্য এবং ইসলামের মধ্যকার সম্পর্কের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ৷ ইসলাম আবির্ভাবের পর আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলে খ্রিষ্টধর্মের স্থলাভিষিক্ত হয়৷ তার অল্প পরেই ইসলাম স্পেন এবং ফ্রান্সের দিকেও পাড়ি জমায়৷ তাই ইসলাম সম্পর্কে পশ্চিমাদের ধারণা বা উপলব্ধি সঠিক ছিল না , সেহেতু তারা ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে৷ তাদের এই আক্রমণের রূপ ও কৌশল বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রকমের ছিল৷ অবশ্য ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে লক্ষ্য করা গেছে যে , ইউরোপের বহু মহান ব্যক্তিত্ব ইসলামকে ভীষণ ভালবাসতেন৷ এঁদের মধ্যে রয়েছেন জার্মানীর বিখ্যাত কবি গ্যাটে , মার্কিন দার্শনিক এমার্সন প্রমুখের মতো আরো অনেকেই৷ কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্মের চরমপন্থী কিছু নেতা এবং প্রাচ্যবিদ সবসময়ই ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করে আসছেন৷ তো এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আলোচনা করার চেষ্টা করবো৷
পাশ্চাত্যের ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীকে বলা যায় ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ার যুগ সন্ধিক্ষণ৷ পশ্চিমা বিশ্বের বহু চিন্তাবিদ ইসলাম সম্পর্কে যুক্তি-প্রমাণভিত্তিক গবেষণা করতে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন৷ মুসলমানরাও ইসলাম ও তার মূলনীতির সাথে বিশ্ববাসীকে পরিচিত করে তোলার জন্যে নতুন একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করে৷ তারা ইংরেজি , জার্মান এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় বহু গ্রন্থ লিখে ইসলামকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দেয়৷ এ কারণেই ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে৷ ইউরোপে ইসলাম ধর্মের পরিস্থিতি পর্যালোচনা প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ইশপিগ্যাল লিখেছে : ইসলাম হচ্ছে পৃথিবীর সকল ধর্মের মধ্যে সবচে জীবন্ত৷ ইসলাম ধর্মের মতো আর কোনো ধর্ম এতো দ্রুত বিকশিত হয় নি৷ আমাদের পশ্চিমাদের কাছে ইসলাম ধর্ম সবচে বেশি অপরিচিত ধর্ম৷ কিন্তু পাশ্চাত্যের বিশেষজ্ঞমহল এখন হতাশ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দেখছে ইসলামের অগ্রগতির ধারা৷ উদাহরণত বলা যায় , স্পেনে আন্দালূসের পতনের পাঁচ শ’ বছর পর সেদেশের যুবকরা এখন ব্যাপকহারে ইসলামের দিকে ধাবিত হচ্ছে৷
ইউরোপীয় দেশগুলোতে মুসলমানদের যাতায়াত করার ফলে ইউরোপের স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে৷ যার ফলে সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়৷ আর সম্প্রতি যে শ্রেণীটি ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে তারা সমাজের শিক্ষিত ও অভিজাত সম্প্রদায়ের৷ ইসলাম অনুরাগী পশ্চিমা এই অভিজাত ও শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে শিল্পী-সাহিত্যিক , লেখক এবং দার্শনিক৷ এই দলটি মূলত ইসলামের সামগ্রীক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়েই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে৷ তাঁরা ইসলামে এমন এক আলোর সন্ধান পেয়েছেন যে আলো তাঁদেরকে নিরুদ্দেশ ও হতাশার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারে৷ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পেছনে যেসব যুক্তি-প্রমাণ দেখানো হচ্ছে , তা হলো , জীবন বাস্তবতা ও জীবন সমস্যার সমাধানে এই ধর্মের যৌক্তিক ও প্রামাণ্য নির্দেশনা৷
পাশ্চাত্যের মতবাদগুলো বিশেষ করে মডার্নিজমের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী এবারে পর্যালোচনা করা যেতে পারে৷ নতুন কিছু শ্লোগান যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে ফেরা , মানবাধিকারের প্রতি মনোযোগ ইত্যাদি পরিপূর্ণভাবেই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিরই অংশ৷ ফলে সহজেই অনুমিত হয় যে , মানব স্বাধীনতা ও মানব মর্যাদা , জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা , জীবনের সহজতার জন্যে প্রযুক্তির ব্যবহার , অর্থনৈতিক এবং নাগরিক উন্নয়ন ইত্যাদি মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়৷ তাই ইসলামী বিধি-বিধানের আলোকেই আধুনিক জীবনযাপন করা সম্ভব৷ তবে খেয়াল রাখতে হবে যে , ইসলামের শিক্ষা ও বিধি-বিধানে পরিবারের ভিত্‌ নষ্ট করে দেওয়া , নীতি-নৈতিকতা পরিহার করা , অন্যায় আচরণ করা , লাগামহীন পুঁজি গড়ে তোলা , দুনিয়াবী স্বার্থসিদ্ধি আর ভোগলিপ্সায় মেতে ওঠা , ইবাদাত-বন্দেগী ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি ধর্মনিরপেক্ষবাদী আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলোর বিন্দুমাত্র স্থান নেই৷
কেউ কেউ মনে করেন যে ,বস্তুবাদী এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নগুলোকে গ্রহণ করতে হলে চারিত্র্যিক অশুভ দিকগুলো এবং সমাজের অসৎ ও অস্বাভাবিক কিছু দিককে গ্রহণ করা অপরিহার্য৷ অথচ এ ব্যাপারে ইসলামের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে৷ ইসলামের ইতিহাস ভালভাবেই প্রমাণ করে যে ,বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে নৈতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণের কোনো বিরোধ নেই৷ তারমানে সামাজিক দ্বন্দ্ব-বিশৃঙক্ষলা বা নৈতিক সমস্যার সম্মুখীন না হয়েও বস্তুগত এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নগুলোকে গ্রহণ করা যায়৷ আপনারা জানেন যে , ইসলাম আবির্ভূত হবার অল্প সময় পরই একটা নতুন ও বৃহৎ সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্ম দেয় এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে৷ এই সভ্যতা জ্ঞান-বুদ্ধি-বিচক্ষণতা ও আধ্যাত্মিকতাকে পরস্পরের সাথে যুক্ত বা সমন্বিত করেছে৷ জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসলামের যে বৃহৎ উন্নতি ঘটেছে তা এক কথায় অসাধারণ৷ এর প্রমাণ মেলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন গণিত , প্রকৃতি বিজ্ঞান , রসায়ন , পদার্থবিদ্যা ,জ্যোতির্বিদ্যা , উদ্ভিদ বিজ্ঞান , প্রাণীবিজ্ঞান , ফার্মাসী , শল্যচিকিৎসা , প্রকৌশল ও স্থাপত্য , দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে মুসলমানদের চর্চা ও গবেষণা৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের এইসব অবদান এখনো জ্ঞানপিপাসুদের বিমুগ্ধ করে৷ খ্রিষ্টান এবং মুসলমান নির্বিশেষে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের ইতিহাসবিদগণ তাঁদের লেখালেখি ও গবেষণায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের বিভিন্ন অবদানের কথা তুলে ধরেছেন৷ মুসলিম বিশ্বে এতো বড়ো বড়ো জ্ঞানী-বিজ্ঞানীর আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে তাঁদের ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠতা , নৈতিকতা , মর্তপ্রীতির দূষণ থেকে আত্মরক্ষা সর্বোপরি ইসলামের মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার কারণেই৷ কেননা ; ইসলাম আকল-বুদ্ধি-অভিজ্ঞতা , মানসম্পন্ন জীবনযাপন , পার্থিব জীবন পরিকল্পনা এবং মানুষের সম্মান ও অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টাকেও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের উপায় বলে মনে করে৷ ইসলাম এগুলোকে খোদায়ী মূল্যবোধ বলে গণ্য করে৷ উইলিয়াম মন্টেগমারী ওয়াট বলেছেন : মধ্যযুগে খ্রিস্টান এবং ইসলামের মধ্যকার সম্পর্ক সার্বিক দিক থেকে প্রত্যক্ষ করলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে , খ্রিষ্টধর্মের ওপরে ইসলামের প্রভাব সম্পর্কে যেটুকু বলা হয় , বাস্তবে এই প্রভাব আরো অনেক বেশী৷ ইউরোপের সকল বস্তুর উৎপাদন এবং প্রযুক্তি আবিষ্কারের পেছনে ইসলামের অংশগ্রহণ রয়েছে৷ দর্শন এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলাম ইউরোপকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এবং ইসলাম যেন ইউরোপে নতুন দৃশ্যের অবতারণা করেছে৷ ইসলামী সভ্যতা প্রমাণ করেছে যে ,পাশ্চাত্যে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গী সত্য ও বাস্তবতার বিপরীত , অর্থাৎ ধর্মকে অস্বীকার করে মানুষের নিজস্ব সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়৷ পক্ষান্তরে ইসলামে অর্থাৎ খোদায়ী বিধানে মানুষের আত্মমর্যাদা ও সম্মান তথা মানবিকতার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত৷ ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ম হলো মানবিকতার পূর্ণতা ও উন্নতির রাজপথ৷ একজন মুসলমান সমাজ , প্রকৃতি ও নিজস্ব ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে৷ এই শক্তি আল্লাহ তায়ালাই তাকে দান করেছে৷ মানুষকে তিনি স্বাধীন , ক্ষমতাবান এবং দায়িত্বশীল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন৷ এ জন্যেই আল্লাহ তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলদের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যে , মানুষের আত্মসম্মান রক্ষার উপায় হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এবং সকল প্রকার জুলুম-অত্যাচার আর পাপাচার থেকে বিরত থাকা৷ ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ-শক্তি আর ক্ষমতা সাধারণত খারাপ বা নোংরা কিছু নয় বরং এগুলোকে অবৈধভাবে গ্রহণ বা অর্জন করাই বিশ্বের সকল অনাচার আর গন্ডগোলের উৎস৷#

শেষ পর্ব

সুপ্রিয় পাঠক! পাশ্চাত্যে ধর্ম চর্চার ইতিকথা শীর্ষক আলোচনার গত কয়েকটি পর্বে আমরা বলেছিলাম যে , ইসলাম এমন একটি ঐশী ধর্ম পাশ্চাত্যে যার অনুসারীদের সংখ্যা লক্ষ্য করার মতো৷ ফ্রান্স , বৃটেন এবং এমনকি আমেরিকার মতো পশ্চিমা অনেক দেশে ইসলাম দ্বিতীয় ধর্ম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে৷ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পশ্চিমা সমাজে ইসলাম নিয়ে খুব কমই আলোচনা হতো৷ ইসলাম কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই একটা আলোচ্য বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল৷ তাও আবার কেবল প্রাচ্যবিদ ও ইসলাম বিশেষজ্ঞদের মাঝে৷ কিন্তু সর্বশেষ ঐশী ধর্ম ইসলাম এতোসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কীভাবে পাশ্চাত্যের সমাজে আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হলো সে ব্যাপারেই আজকের পর্বে আমরা আলোচনা করার চেষ্টা করবো৷
সমাজ এবং রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমে ইসলাম বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে ৷ ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়৷ ইরানের বিপ্লবে ইসলাম সবসময়ই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল৷ এ কারণেই পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা বিপ্লব এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলী অর্থাৎ রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইসলামের ভূমিকার ব্যাপারে ব্যাপক দৃষ্টিনিক্ষেপ করেছেন৷ অন্যদিকে আশার প্রাণসঞ্চারক , বিশ্ব মুসলমানের সম্মান ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টিকারী ইসলামী বিপ্লবের বিজয় ইউরোপীয় মুসলমানদের ওপরও গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়৷ যেই মুসলমানরা একসময় ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে অবহেলিত ও কোনঠাসা অবস্থায় , তারা এই বিপ্লবের পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায়ে পরিণত হয়ে যায়৷
পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানী স্টোন ভারতুভেক এর মতে ‘আসলে ইরানের বিপ্লবের সময় থেকে ইউরোপীয় মুসলমান সমাজের প্রতি সকলেরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়৷ পাশ্চাত্যের ইতিহাসের এই পর্বে ইসলামের দীপ্ত উপস্থিতিকে যদিও ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলোর বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছিল , কিন্তু অনেকেই তার বিরোধিতা করেছিল৷ এই বিরোধী পক্ষগুলো ইসলামের প্রকৃত চেহারাকে বিকৃত করার জন্যে পরিকল্পিতভাবে উঠেপড়ে লেগে যায়৷ পাশ্চাত্যের এই ইসলাম বিরোধী রাজনৈতিক মহলটি এ কাজে তাদের গণমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে , মধ্যযুগে মৌলবাদী শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে গীর্যার অনুসারী অর্থাৎ ধর্মানুরাগী বলে উপহাস করা হতো৷ সে সময় গীর্যার কিছু কিছু অসমর্থিত কাজের জন্যেই এরকম পরিভাষা ব্যবহার করা হতো৷ অথচ ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে পশ্চিমা সমাজে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও তারা তাদের গণমাধ্যমগুলোতে এই স্পর্শকাতর মৌলবাদ পরিভাষাটিকেই ব্যবহার করে৷ মজার ব্যাপার হলো ফান্ডামেন্টালিজম বা মৌলবাদ পরিভাষাটি যে পশ্চিমাদেরই সৃষ্টি , সে ব্যাপারে তারা পুরোপুরি অমনোযোগী৷ পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এই পরিভাষাটি ব্যবহার করে বোঝাতে চায় যে , ইসলামের অনুসারীরা অর্থাৎ মুসলমানরা হলো সেকেলে এবং তাদের চিন্তাধারা মধ্যযুগীয়৷
মুসলমানদের ব্যাপারে শত্রুতামূলক বানোয়াট খবরাখবর প্রচারের প্রতি ইঙ্গিত করে স্টোন ভারতুভেক বলেন , ‘পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইসলামের প্রসঙ্গ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সবসময়ই বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে৷ বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে , পশ্চিমা সাংবাদিকরা জানে না , ইসলামের ব্যাপারে তাদের কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করা উচিত৷ তারা কি ইসলামকে রাজনৈতিক মতাদর্শের আওতাভুক্ত একটা সম্প্রদায় বলে গ্রহণ করবে , নাকি তাকে একটা ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করবে ? এছাড়া পাশ্চাত্যে ইসলাম সম্পর্কে যারা লেখালেখি করে কিংবা দৃষ্টিভঙ্গী ব্যক্ত করে তাদের মাঝেও দৃষ্টিভঙ্গীগত বিশৃঙক্ষলা পরিলক্ষিত হয়৷ তাদের সাংবাদিকমহল , মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকগণ , সমাজ বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ , বুদ্ধিজীবীগণ , নারী বিষয়ক কর্মকর্তাগণ-কারোরই ইসলাম সম্পর্কে বিশেষ কোনো পারদর্শিতা নেই৷ ইসলাম সম্পর্কে সকল ভুল বোঝাবুঝি , সবধরনের মিথ্যাচার আর বিকৃতি তাদের অজ্ঞতাপূর্ণ কর্মকান্ডেরই পরিণতি৷’
পাশ্চাত্যে ইসলামের গভীর প্রভাব বিস্তারের আরেকটি কারণ হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন৷ যদিও প্রকৃতিগত দিক থেকে ইসলাম এবং কমিউনিজমের মধ্যে কোনোরকম সামঞ্জস্য বা মিল নেই , তবু পশ্চিমা রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যম তাদের আধিপত্যকামী চিন্তা বিস্তারের কাল্পনিক শত্রু হিসেবে ইসলামকে কমিউনিজমের স্থলাভিষিক্ত করে৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমাদের দৃষ্টি ইসলামের প্রতি নিবদ্ধ হয়৷ কেননা , তাদের দৃষ্টিতে ইসলাম এমন একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক শক্তি যা তাদের স্বার্থকে বিঘ্নিত করতে পারে৷ এ কারণেই তারা ইসলামকে তাদের নতুন শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তারা ইসলামী মৌলবাদের বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সাবধান করে দিয়েছে৷ পশ্চিমা সরকারগুলোর এতোসব ষড়যন্ত্রের কারণে সেসব দেশের কিছু সচেতন ও সূক্ষ্মদর্শী ব্যক্তিত্ব ইসলামকে বোঝার জন্যে ব্যাপক তৎপরতা চালায় এবং অবশেষে তারা ইসলাম গ্রহণ করে৷ পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে আমেরিকা ইসলামকে ভয়াবহ ও বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরে মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রিকার সুদান ও সোমালিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোতে তাদের আধিপত্যকামী লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরতে পেরেছে৷ আফগানিস্তান যুদ্ধে এবং তারপরে ইরাক যুদ্ধে আমেরিকা এবং তার মিত্ররা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শ্লোগান তুলে এ অঞ্চলে তাদের আধিপত্যকামী স্বার্থই উদ্ধার করেছে৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইসলাম-ভীতিকে বড়ো করে তোলা প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন স্পাইগেল লিখেছে , কমিউনিস্ট রাশিয়ার পতনের পর-যা পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিতে একটা অনিষ্ট বা পাপাচার ছিল-পশ্চিমা সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদরা মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীকে যা-না তা করে অর্থাৎ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড়ো করে তুলে ধরে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে , যাতে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্যে নতুন শত্রু তৈরী করা যায়৷ আর এই নতুন কল্পিত শত্রুর নাম দেওয়া হয় ইসলামী মৌলবাদ৷ পাশ্চাত্যে ইসলামের বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে ইউরোপে ইসলামের অতীত ইতিহাসের দিকে প্রত্যাবর্তন করছে৷ অপরদিকে ইসলাম এখন সেখানে ব্যাপক সামাজিক এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে৷ ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর নেতিবাচক প্রচারণা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাপক চাপের পরও ইসলাম বর্তমানে সেখানে বিস্তারমুখী একটা সমাজবাস্তবতা হিসেবে অবস্থান করছে৷ পাশ্চাত্যে ধর্মচিন্তায় পরিক্রমণের পদক্ষেপ একটা দুরূহ ও বিস্ময়কর ব্যাপার৷ মধ্যযুগ , মডার্নিজম , পোস্ট মডার্নিজম প্রত্যেকটি মতবাদই পশ্চিমাদের জন্যে ছিল গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার বিষয়৷ পাশ্চাত্য তার নিজস্ব ইতিহাসে গীর্যার একক আধিপত্যের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে যেমন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগেরও৷ এইসব মতবাদের যুগে যদিও তারা চরম অবস্থায় পৌঁছে , এমনকি তাদের সকল সমস্যা , ইচছা-আকাঙক্ষা প্রভৃতির সমাধান বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই করতে চায় , তবুও এর পরিণতিতে পেরেশানী আর অস্থিরতাই শুধু দেখা দেয়৷ বিজ্ঞানের এই একক আধিপত্যের ফলেই দেখা দিয়েছিল পোস্টমডার্ন মতবাদ৷ আসলে পশ্চিমা জনগণের জন্যে মনে হয় এই ধরনের ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ছিল যাতে তারা প্রকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তির মতো মণিমুক্তার মূল্য কী তা বুঝতে পারে৷ এই মণিমুক্তা গীর্যার আধিপত্যকামী ও গণবিরুদ্ধচিন্তাকে কেবল নাকচই করে না বরং এই চিন্তাকে এক ধরনের ইবাদত বলে মনে করে , এবং বিজ্ঞানকে মনে করে আল্লাহকে চেনার উপায়৷ ইসলাম খোদায়ী সংস্কৃতি ও শিক্ষার মাধ্যমে পশ্চিমা জনগণকে সুখ-শান্তি-যার জন্যে পশ্চিমা বিশ্বের জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপেক্ষমান ছিল-সেই শান্তি উপহার দিচেছ৷ ইতালীর বিশিষ্ট পাদ্রী মাজুলিনীর মন্তব্য দিয়ে শেষ করবো ধারাবাহিক এই আলোচনা ৷ তিনি বলেছেন, ‘ইসলামই হলো বিশ্বের আগামী দিনের ধর্ম ৷’

Share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here