Home ইতিহাস সাইফ ও সাক্বীফাহ্‌র ঘটনা

সাইফ ও সাক্বীফাহ্‌র ঘটনা

308
0
SHARE

সাইফ ও সাক্বীফাহ্‌র ঘটনা

     সাইফ সাক্বিফাহ্‌র১ ঘটনা সম্পর্কে সাতটি হাদীছ বর্ণনা করেছে। আমরা এখানে তার বর্ণিত হাদীছগুলো উদ্ধৃত করবো এবং এরপর একই ঘটনা সম্পর্কে অন্যান্য সূত্রের বর্ণনা উদ্ধৃত করবো ও উভয়ের মধ্যে তুলনা করবো সাইফের বর্ণিত হাদীছ সমূহ      ১) ইবনে হাজার আসকালানী ক্বাক্বাবিন্‌ আম্‌র্‌ সম্পর্কে সাইফ থেকে বর্ণনা করেন ঃ ক্বাক্বাবলেন ঃ আমি রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর ওফাতের সময় উপস্থিত ছিলাম। আমি যখন যোহরের নামায আদায় করছিলাম তখন এক ব্যক্তি এসে বললেন ঃ আনছাররা সর্বসম্মতভাবে সাদ্‌ বিন্‌ ইবাদাহ্‌কে খলীফাহ্‌ নির্বাচিত করতে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর সাথে কৃত অঙ্গীকার পরিত্যাগ করতে চাচ্ছেন। মুহাজিররা এ খবর শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।     ২) ত্বাবারী হিজরী একাদশ বর্ষের ঘটনাবলী প্রসঙ্গে সাইফ থেকে বর্ণনা করেন ঃবর্ণনাকারী সাঈদ বিন্‌ যায়েদকে জিজ্ঞেস করলেন ঃ রাসূল্লাহ্‌র (সাঃ) ওফাত কালে আপনি উপস্থিত ছিলেন?”তিনি বললেন ঃ হ্যা।কোন দিন আবু বকরের সাথে বাইআত অনুষ্ঠিত হয়?”যেদিন রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ইন্তেকাল করেন সেদিনই, যেহেতু লোকেরা সামাজিক সংস্থা ব্যতীত অর্ধ দিনও থাকতে চায় নি।কেউ কি আবু বকরের সাথে বাইআতের বিরোধিতা করেছিলেন?”না, আল্লাহ্‌ তাদেরকে আনছারদের হাত থেকে মুক্তি দেয়ার পর, একমাত্র যারা মুরতাদ হয়েছিল বা মুরতাদ হওয়ার কাছাকাছ পৌঁছে গিয়েছিল তারা ব্যতীত কেউই বিরোধিতা করে নি।মুহাজিরদের মধ্য থেকে কেউ বাইআত হওয়া থেকে বিরত ছিলেন?”না, কেউ বাইআতের জন্যে তাঁদেরকে অনুপ্রাণিত না করা সত্ত্বেও তাঁদের সকলে একের পর এক এসে বাইআত হন।     ৩) আনছারদের সাদ্‌ বিন্‌ ইবাদাহ্‌র নিকট বাইআত হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ ও আবু বকরের প্রতি তাঁদের বিরোধিতা প্রসঙ্গে ত্বাবারী বলেন, সাইফ্‌ স্বীয় সনদে সাহ্‌ল্‌ ও আবি ওসমান থেকে এবং তাঁরা যাহ্‌হাক্‌ বিন্‌ খালীফাহ্‌ থেকে বর্ণনা করেন৪ ঃ     হুবাব্‌ বিন্‌ মুনযের্‌ দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তলোয়ার উন্মুক্ত করে বললেন ঃ আমি উষ্ট্রশালায় রক্ষিত সেই কাষ্ঠ যা এ জন্য রাখা হয় যাতে উটেরা এর সাথে গা চুলকাতে পারে এবং সেই বিশাল বৃক্ষ বিপদে পড়ে যার ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করা চলে – ঝড়ো হাওয়া যার ক্ষতি করতে পারে না; আমি সিংহের গুহায় সিংহ-পিতা।তখন ওমর তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাঁর হাতের ওপর এতই আঘাত করেন যে, তাঁর (হুবাবের) হাত থেকে তলোয়ার পড়ে যায়। ওমর তলোয়ার তুলে নিলেন এবং সাদ্‌ বিন্‌ ইবাদাহ্‌র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তখন অন্যরাও সাদ্‌ বিন্‌ ইবাদাহ্‌র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং এর পর পরই আবু বকরের নিকট বাইআত হলেন। আর আনছারদের এ কাজ ছিল জাহেলিয়্যাত যুগের দোষের মতো একটি দোষ যার বিরুদ্ধে আবু বকর রুখে দাঁড়ান। সাদ্‌ বিন্‌ ইবাদাহ্‌ যখন নাস্তানাবুদ হলেন তখন এক ব্যক্তি বললেন ঃ আপনারা সাদ্‌ বিন্‌ ইবাদাহ্‌কে খতম করে দিলেন।তখন ওমর বললেন ঃআল্লাহ্‌ তাকে ধ্বংস করুন; সে একটা মুনাফিক।এরপর ওমর হুবাবের তলোয়ার দিয়ে পাথরের ওপর আঘাত করে সেটিকে (তলোয়ারটি) ভেঙ্গে ফেললেন।     ৪) ত্বাবারী বলেন৫ ঃ     সাইফ্‌ মুবাশ্‌শির্‌ থেকে ও তিনি জাবের থেকে বর্ণনা করেন ঃ সেদিন সাদ্‌ বিন্‌ ইবাদাহ্‌ আবু বকরকে বলেন ঃ হে মুহাজিরদের দল! তোমরা আমার শাসনকর্তৃত্বের ব্যাপারে ঈর্ষা করেছো। আর হে আবু বকর! তুমি আমার গোত্রের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে আমাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাইআতে বাধ্য করেছো।জবাবে তাঁরা বললেন ঃ আমরা যদি তোমাকে তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য করতাম তাহলে এরপরও তুমি চাইলে জনগণের সাথে থাকতে পারতে; তোমার সে অধিকার থাকতো। কিন্তু আমরা তোমাকে জনগণের সাথে থাকতে বাধ্য করেছি। অতএব, সুস্পষ্ট যে, এ পরিস্থিতিকে এলোমেলো করার সুযোগ দেয়া যায় না। সুতরাং, তুমি যদি কখনো আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নাও অথবা জনগণের মাঝে ফাটল সৃষ্টি কর তাহলে তোমার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলবো।     ৫) ত্বাবারী আবু বকরের অনুকূলে হযরত আলী (আঃ)-এর বাইআত সম্পর্কে সাইফ থেকে রেওয়াইয়াত করেন ঃ     আলী তাঁর গৃহে ছিলেন। এ সময় লোকেরা খবর নিয়ে এলো যে, আবু বকর বাইআত গ্রহণের জন্যে বসেছেন। আলী এ খবর শোনার পর যেহেতু আবু বকরের অনুকূলে বাইআতের ব্যাপারে দেরী করতে চাচ্ছিলেন না, সেহেতু তিনি ক্বাবা (ঢোলা বহিরাবরণ) ও পাজামা না পরেই কেবল একটিমাত্র জামা গায়ে তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে এলেন ও আবু বকরের নিকট ছুটে এলেন এবং তাঁর নিকট বাইআত হয়ে তাঁর পাশে বসে পড়লেন। এরপর তিনি একজনকে তাঁর ক্বাবা নিয়ে আসার জন্যে পাঠালেন এবং (নিয়ে আসা হলে) তা পরিধান করে বসে পড়লেন।     ৬) ত্বাবারী সাইফ থেকে রেওয়াইয়াত করেন৬ ঃ     হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ওফাতের পরদিন আবু বকর অপেক্ষকৃত দীর্ঘ দুটি খোতবাহ্‌ প্রদান করেন। এ দুটি খোতবায় তিনি অন্য সব কিছুর চাইতে মৃত্যু ও এ দুনিয়ার অবিনশ্বরতা এবং আখেরাতের কথা বেশী করে বললেন। (এ সম্পর্কে পরে পর্যালোচনা করা হবে। তবে এ দুই খোতবায় সর্বাধিক যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হচ্ছে একটি বিশেষ বাক্য। সাইফের রেওয়াইয়াত অনুযায়ী,) আবু বকর বলেন ঃ সাবধান! জেনে রাখো, অবশ্যই আমার একটি শয়তান আছে যা (অনেক সময়) আমাকে পরাভূত করে, অতএব, যখন তা আমার কাছে আসবে (ও আমাকে পরাভূত করবে) তখন তোমরা আমার কাছ থেকে দূরে থেকো যাতে আমি নিজের স্বার্থে তোমাদের ধন ও জনে হস্তক্ষেপ না করি।     ৭) ত্বাবারী৭ মুবাশ্‌শির বিন্‌ ফুযাইল থেকে, তিনি জুবাইর থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা ছাখার থেকে – যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর দেহরক্ষী – বর্ণনা করেছেন ঃ     রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) যখন ইন্তেকাল করেন তখন খালেদ বিন্‌ সাঈদ আছী ইয়ামানে ছিলেন। তিনি এক মাস পর মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন এবং রেশমী ক্বাবা (বহিরাবরণ) গায়ে ওমর ও আলীর সামনে পড়ে গেলেন। ওমর তাঁকে রেশমী ক্বাবা গায়ে দেখামাত্রই আশেপাশের লোকদের দিকে ফিরে চীকার দিয়ে উঠলেন ঃ খালেদের ক্বাবাটি তার গায়ে থাকা অবস্থায়ই ছিঁড়ে ফেলো। সে রেশমী ক্বাবা পরিধান করে আছে, অথচ এখন কোন যুদ্ধ নেই, বরং এখন শান্তির সময়।     ওমরের নির্দেশে তাঁর আশেপাশের লোকেরা খালেদের রেশমী ক্বাবা তাঁর গায়ে থাকা অবস্থায়ই ছিঁড়ে ফেললো। এতে খালেদ ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন এবং আলীকে উদ্দেশ করে বললেন ঃ হে আবূল হাসান! হে আব্‌দ্‌ মানাফের বংশধররা! তোমরা খেলাফতকে হাতছাড়া করেছো এবং পরাভূত হয়েছো!     জবাবে আলী বললেন ঃ তুমি কি একে পরাভূতকারী ও পরাভূত হিসেবে দেখছো, নাকি খেলাফত হিসেবে?”     তখন ওমর খালেদের দিকে ফিরে বললেন ঃ আল্লাহ্‌ তোমার মুখকে চুরমার করে দিন। আল্লাহ্‌র শপথ! তুমি এমন কথা বলেছো যা সব সময়ই মিথ্যাবাদীদের নিকট বাহানা হয়ে থাকবে। আর যে এ কথা বলবে সে কেবল নিজের ক্ষতিই করবে।     ওমর এরপর খালেদের কথা  সম্পর্কে আবু বকরকে জানালেন।     এর কিছুদিন পর আবু বকর যখন মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলেন তখন খালেদের জন্যেও একটি পতাকার ব্যবস্থা করলেন। ওমর তাঁকে এ কাজে বাধা দিলেন এবং বললেন ঃ খালেদ একজন কাপুরুষ ও দুর্বল লোক এবং সে এমন একটি মিথ্যা উচ্চারণ করেছে যে, যতদিন ধরণীর বুকে কথা বলার মতো কেউ থাকবে ততদিন তা নিয়ে আলোচনা করবে ও এর চারদিকে আবর্তন করবে। এমন কারো কাছ থেকে সাহায্য নেয়া ঠিক নয়। তখন আবু বকর তাঁকে (খালেদকে) মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিবর্তে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত করলেন এবং সেনাপতিত্ব দিয়ে তীমাপাঠালেন। এভাবে তিনি (আবু বকর) ওমরের কথার একাংশ মেনে নিলেন এবং অপর অংশ মানলেন না।সাইফের হাদীছের সনদ পরীক্ষা     হাদীছ শাস্ত্র বিশারদগণ কোন হাদীছ বা রেওয়াইয়াতের যথার্থতা পরীক্ষা করার জন্যে দুটি বিষয়কে বিবেচনা করেন। প্রথমতঃ সনদ বিচার করা হয় অর্থা প্রতিটি স্তরের বর্ণনাকারী কী ধরনের লোক ছিলেন তা দেখা হয়। দ্বিতীয়তঃ এর মূল পাঠ পরীক্ষা করা হয়। অর্থা এর বক্তব্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করা হয়। অতএব, সাক্বীফাহ্‌র ঘটনা সম্পর্কে সাইফের বর্ণিত হাদীছ সমূহও এ দুই দিক থেকেই পরীক্ষা করতে হবে।     প্রথমেই সনদের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।     সাইফ থেকে এখানে প্রথম যে হাদীছটি উদ্ধৃত করেছি সেটি আল্‌-ইছাবাহ্‌ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। সাইফ তা ক্বাক্বাইবনে আম্‌র্‌ তামীমী থেকে বর্ণনা করেছে। কিন্তু ক্বাক্বাহচ্ছে সাইফ বর্ণিত কল্পকাহিনী সমূহের অন্যতম কাল্পনিক সূত্র বাস্তবে যার কোন অস্তিত্ব ছিল না। সাইফ তাকে ছাহাবী হিসেবে দাবী করেছে এবং তার বিস্তারিত পরিচয় (!) দিয়েছে। ক্বাক্বার রচিত কবিতা, তার বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও বীরত্বের কাহিনী এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড শত শত গ্রন্থে স্থানলাভ করেছে। কিন্তু এসব কল্পকাহিনীর একমাত্র উ হচ্ছে সাইফের রেওয়াইয়াত।৮       সাইফ থেকে উদ্ধৃত তৃতীয় রেওয়াইয়াতটি সে সাহ্‌ল্‌ থেকে বর্ণনা করেছে। কিন্তু সাহ্‌ল্‌ও একটি কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব যাকে কেবল সাইফের রেওয়াইয়াতেই পাওয়া যায়।৯     সাইফ তার চতুর্থ রেওয়াইয়াত মুবাশ্‌শির্‌ থেকে গ্রহণ করেছে। এ-ও একটি কাল্পনিক চরিত্র। কেবল সাইফের রেওয়াইয়াতেই তার উল্লেখ পাওয়া যায়। হাদীছ শাস্ত্র বিশেষজ্ঞগণ মন্তব্য করেছেন ঃ সাইফ তার নিকট থেকে উদ্ধৃত করেছে, কিন্তু কেউ তাকে চিহ্নিত করতে পারে নি।১০     সাইফ তার শেষ রেওয়াইয়াতটি ছাখার্‌ থেকে উদ্ধৃত করেছে। সাইফ্‌ তাকে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর দেহরক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তুইল্‌মে রেজালের গ্রন্থাবলীতে এবং হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর জীবনী ও তাঁর ছাহাবীগণের পরিচিতি সংক্রান্ত মৌলিক গ্রন্থাবলীতে এমন কোনো ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায় না।     সাইফ বর্ণিত হাদীছ সমূহের বর্ণনা ধারাক্রমে আরো অনেক অজ্ঞাতপরিচয় বর্ণনাকারীর নাম রয়েছে। সংক্ষেপণের স্বার্থে তাদের সম্পর্কে আলোচনা থেকে বিরত থাকলাম।     এই হল সাইফ বর্ণিত হাদীছের সনদের অবস্থা।সাইফের হাদীছের মূল পাঠ পরীক্ষা     সাইফের বর্ণিত হাদীছে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, সে মিথ্যা হাদীছ রচনার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষতার অধিকারী ছিল। কারণ সে কোন ঘটনার একটি অংশ বিকৃত করে এবং অপরাপর অংশ এমনভাবে বর্ণনা করে যে, পাঠকের নিকট পুরো ঘটনাটা সঠিক বলে মনে হবে। মিথ্যা হাদীছ রচনায় তার দক্ষতার একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি ঃ     আমাদের উদ্ধৃত সাইফ বর্ণিত হাদীছ সমূহের অন্যতম হচ্ছে এই যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ওফাতের দিনে যোহরের নামাযের পরে মসজিদুন্নাবী (সাঃ)-এ খবর পৌঁছল যে, আনছাররা সাদের অনুকূলে বাইআত হয়ে রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে চাচ্ছে। … পাঠকগণের মনে এ থেকে এ ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক যে, খেলাফতের ব্যাপারে জনগণ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর সাথে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছিল আনছাররা যা ভঙ্গ করতে চাচ্ছিল।১১      অন্যদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ওসামাহ্‌র বাহিনী সংক্রান্ত হাদীছে সাইফ বলছে ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। এমতাবস্থায় ওসামাহ্‌ তাঁর সেনাবাহিনীর যাত্রা বন্ধ করে দিলেন এবং ওমরকে বললেন ঃ আপনি রাসূলুল্লাহ্‌র খলীফাহ্‌র নিকট ফিরে যান এবং তাঁর নিকট থেকে অব্যাহতি (যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি) নিয়ে আসুন যাতে লোকদেরকে ফিরিয়ে আনতে পারি।এ রেওয়াইয়াতের মাধ্যমে এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশায়ই খেলাফত সম্পর্কে জনগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং সে অঙ্গীকার হযরত আবু বকরের অনুকূলে ছিল। সাইফ সাক্বীফাহ্‌ সংক্রান্ত রেওয়াইয়াত সমূহে এ ধরনের অনেক কুশলী ধোঁকাবাযীর আশ্রয় নিয়েছে।     সাক্বীফাহ্‌র ঘটনা হচ্ছে ঐ সব ঘটনার অন্যতম যাতে সত্যকে তার মূল অক্ষ থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত করা হয়েছে। কিন্তু সাইফ এ আমানতকে (প্রকৃত ঘটনার বর্ণনাকে) খেয়ানত ছাড়াই লোকদের নিকট পৌঁছতে দিতে চায় নি। সে সাক্বীফাহ্‌র ঘটনা এবং আবু বকরের অনুকূলে বাইআত সম্পর্কে যে সব রেওয়াইয়াত উপস্থাপন করেছে তার সবগুলোই বাস্তবতা ও প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতিহীন। অন্যান্য ঐতিহাসিকের বর্ণনায় সাকীফাহ্‌র ঘটনা     এবার আমরা সাক্বীফাহ্‌র ঘটনার ব্যাপারে আহ্‌লে সুন্নাতের ওলামায়ে কেরাম ও মনীষীদের দৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলী থেকে সাক্বীফাহ্‌র দিনের ঘটনাবলী থেকে শুরু করে মুআবিয়ার সময়কার ঘটনাবলী উদ্ধৃত করবো এবং এ ব্যাপারে সাইফের রেওয়াইয়াত সমূহ উদ্ধৃত করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করবো যা থেকে সাইফের মিথ্যাচার আরো বেশী সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।যে আদেশ পালিত হয় নি     প্রকৃত পক্ষে সাক্বীফাহ্‌র ঘটনা হচ্ছে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ওফাতের অব্যবহিত পূর্ববর্তী ঘটনাবলীরই ধারাবাহিকতা মাত্র। ইতিপূর্বে যেমন উল্লিখিত হয়েছে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) তাঁর ওফাতের পূর্বে ওসামাহ্‌ বিন্‌ যায়েদের সেনাপতিত্বে রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযানের  এবং তাতে অংশগ্রহণের জন্যে একমাত্র হযরত আলী (আঃ) ব্যতীত সকল শীর্ষস্থানীয় ছাহাবীর প্রতি নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর এ আদেশ পালন করেন নি এবং যুদ্ধযাত্রার বিষয়টি পিছিয়ে দেন। আর এ অবস্থায়ই হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ইন্তেকাল করেন। এর ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয় যা ইসলামের ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তিত করে দেয়।যে ওয়াছিয়্যাত লেখা হয় নি     হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছিল। ফলে সারা মদীনায় শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল। সকলেই বুঝতে পারছিল যে, মানব জাতি তার অতীত ও ভবিষ্যতের তথা সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম নেতাকে হারাতে যাচ্ছে।     হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) তাঁর ওফাতের পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু যারা তাঁর নির্দেশের বরখেলাফে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে গমনে বিলম্ব করছিলেন তাঁরাই তাঁর এ সিদ্ধান্তে বাধা দিলেন। ফলে অন্তিম শয্যায় তিনি উম্মাতের জন্যে পথনির্দেশ বাচক যে লিখিত দলীল রেখে যেতে চাচ্ছিলেন মুসলিম উম্মাহ্‌ তার অধিকারী হওয়া থেকে বঞ্চিত হল।     ওমর বিন্‌ খাত্তাব স্বয়ং বলেন ঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর নিকট ছিলাম এবং মহিলারা পর্দার আড়ালে বসে ছিলেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বললেন ঃ আমাকে সাত মশক পানি দ্বারা গোসল করাবে। আর আমার জন্যে এক পাতা কাগজ ও দোয়াত নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে এমন লেখা লিখে রেখে যাবো যার ফলে আমার পরে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না।মহিলারা বললেন ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) যে জিনিসের কথা বললেন তা নিয়ে এসো।১২     মাক্বরীযী লিখেছেন ঃরাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর স্ত্রী যায়নাব বিনতে জাহ্‌হাশ্‌ ও তাঁর সাথে অবস্থানরত মহিলারা একথা বললেন। তখন ওমর বললেন ঃ আমি বলছি আপনারা চুপ করুন। আপনারা তো সেই নারীরাই যারা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) অসুস্থ হলে চোখ মুছেন আর কান্না করেন, আর তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁর টুটি টিপে ধরেন এবং নাফাক্বাহ্‌ দাবী করেন!তখন রাসূলুল্লাহ্‌ বললেন ঃ এই নারীরা তোমাদের তুলনায় উত্তম।     ইবনে সাদ্‌ জাবের থেকে বর্ণনা করেন১৩ ঃ     রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) অন্তিম শয্যায় উম্মতের জন্যে কিছু লিখে রাখার উদ্দেশ্যে কাগজ চাইলেন যাতে উম্মাত না নিজে গোমরাহ্‌ হয়, না অন্যরা তাদেরকে গোমরাহ্‌ করতে পারে। কিন্তু উপস্থিত লোকেরা এমনই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেন যে, তিনি এ কাজ থেকে বিরত থাকলেন।     মুসনাদে আহ্‌মাদে১৪ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর মৃত্যু সন্নিকটবর্তী হলে তিনি বললেন ঃ আমার জন্যে দুম্বার কাঁধ১৫ নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে এমন একটি লেখা লিখে রেখে যাবো যাতে আমার পরে তোমাদের মধ্যে কোন দুই ব্যক্তি পরস্পর বিবাদে লিপ্ত না হয়।ইবনে আব্বাস বলেন ঃ এতে উপস্থিত লোকেরা হৈচৈ ও ডাক-চীকার শুরু করে দিলেন। তখন মহিলাদের মধ্য থেকে একজন তাঁদের উদ্দেশে বললেন ঃ তোমাদের জন্যে পরিতাপ! রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ওয়াছিয়্যাত্‌ করতে চাচ্ছেন। (কেন তোমরা তাঁকে সে সুযোগ দিচ্ছ না?)”     অন্য এক রেওয়াইয়াতে ইবনে আব্বাস বলেন১৬ ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) যে রোগের কারণে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন সে রোগে আক্রান্ত থাকাকালে বলেন ঃ আমার জন্যে কাগজ ও দোয়াত নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে এমন একটা লেখা লিখে রেখে যাবো যার ফলে এরপর তোমরা কখনোই গোমরাহ্‌ হবে না।     তখন ওমর বললেন ঃ রোমানদের শহরগুলোর মধ্য থেকে অমুক শহর ও অমুক শহর এখনো অবশিষ্ট আছে; এসব শহর বিজয় না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) মারা যাবেন না। আর যদি তিনি মারাই যান তাহলে আমরা তাঁর জন্যে প্রতীক্ষায় থাকবো ঠিক যেভাবে বানী ইসরাঈল মূসার জন্যে প্রতীক্ষায় রয়েছে।জবাবে রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর স্ত্রী যায়নাব বললেন ঃ আপনারা কি শুনতে পাচ্ছেন না, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) আপনাদের উদ্দেশে ওয়াছিয়্যাত করতে চাচ্ছেন?”     এরপর হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) তাঁদের উদ্দেশে বললেন ঃ তোমরা ওঠো (চলে যাও)।তাঁরা যখন বেরিয়ে গেলেন সে মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ইন্তেকাল করলেন।     এসব হাদীছ থেকে এবং পরে এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট আরো যেসব হাদীছ উদ্ধৃত করা হবে তা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) অন্তিম শয্যায় থাকা অবস্থায় একাধিক বার কাগজ ও দোয়াত আনার জন্যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তখন যারা তাঁর নিকটে বসে ছিলেন তাঁরা হৈচৈ সৃষ্টি করে তাঁকে একাজ সম্পাদন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেন। পরবর্তীতে এ সংক্রান্ত আরো যেসব রেওয়াইয়াত উদ্ধৃত করা হবে তা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর সামনে তাঁর সম্পর্কে কী ধরনের অযথার্থ কথাবার্তা বলা হয়েছিল যার ফলে রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) তাঁর ওয়াছিয়্যাতনামা লেখা হতে বিরত থাকা ছাড়া গত্যন্তর দেখেন নি।     ছহীহ্‌ বুখারী১৭ ও অন্যান্য গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, ইবনে আব্বাস বলেন ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর রোগ বৃদ্ধি পেলে তিনি বললেন ঃ আমার জন্যে কাগজ নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে একটা লেখা লিখে দেবো যার ফলে তোমরা কখনোই গোমরাহ্‌ হবে না।তখন উপস্থিত লোকদের মধ্যে ঝগড়া বেধে গেল, অথচ কোন নবীর সামনেই ঝগড়া-বিবাদ করা জায়েয নেই। কতক লোক বলল ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) প্রলাপ বকছেন।রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বললেন ঃ তোমরা আমাকে আমার নিজের অবস্থায় ছেড়ে দাও। তোমরা আমার সম্পর্কে যা বলছো তার চেয়ে আমার অবস্থা অনেক ভালো।     ঐ কথাটি কে বলেছিলেন অন্য এক হাদীছে ইবনে আব্বাস তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন১৮ ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে একদল লোক – যাদের মধ্যে ওমর বিন্‌ খাত্তাবও ছিলেন – রাসূলুল্লাহ্‌র গৃহে সমবেত হলেন। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বললেন ঃ তাড়াতাড়ি করো; আমি তোমাদের জন্যে একটা লেখা লিখে রেখে যাবো যার ফলে অতঃপর আর তোমরা কখনোই গোমরাহ্‌ হবে না।তখন ওমর বললেন ঃ নিঃসন্দেহে রোগ রাসূলল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর স্বাভাবিক চেতনাকে১৯ পরাভূত করেছে; তোমাদের কাছে কোরআন আছে এবং আমাদের জন্য আল্লাহ্‌র কিতাবই যথেষ্ট।     (তখন রাসূলুল্লাহ্‌র) গৃহে যেসব লোক উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে মতবিরোধ ও কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল এবং কতক লোক ওমরের সাথে অভিন্ন মত পোষণ করলো। যেহেতু অনেক বাজে কথাবার্তা হলো এবং মতবিরোধ তীব্রতর হয়ে উঠলো সেহেতু রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) খুবই অস্থির হয়ে উঠলেন। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বললেন ঃ তোমরা 0আমার সামনে থেকে চলে যাও; তোমাদের জন্য আমার সামনে ঝগড়া ও মতবিরোধ করা জায়েয নেই।     আর মুসনাদে আহ্‌মাদ ও ত্বাবাক্বাতের রেওয়াইয়াতে বলা হয়েছে ঃ যেহেতু অনেক বাজে কথাবার্তা হলো, সেহেতু রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) দুঃখভারাক্রান্ত হলেন; রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বললেন ঃ তোমরা আমার সামনে থেকে উঠে যাও।     বর্ণনাকারী বলেন ঃ ইবনে আব্বাস এরপর বার বার বলেছেন ঃ দুর্ভাগ্য ও মুছিবত ছিল সেই সময়টা যখন মতভেদ ও বাযে কথাবার্তা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)কে সেই লেখাটি লেখার সুযোগ দেয় নি।২০     উপরোক্ত রেওয়াইয়াত সমূহে দেখা যায় হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) কর্তৃক ওয়াছিয়্যাতনামা লিখে দিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে ওমর কথা বলেছিলেন বলে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত হয়েছে; আর কারো নাম সরাসরি উল্লিখিত হয় নি। এছাড়া ওমর রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর স্ত্রীদের উদ্দেশে অপমান জনক ভাষায় কথা বলেন। আবার তিনিই বলেন ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ইন্তেকাল করলে কে রোমানদের শহরগুলো জয় করবে?” কিন্তু তাঁর এ সব কথা সত্ত্বেও তিনি যখন দেখলেন যে, লোকেরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর নিকট থেকে অন্তিম ওয়াছিয়্যাতনামা পেতে আগ্রহী এবং এ ওয়াছিয়্যাতনামা লেখা হলে ওমর ও তাঁর বন্ধুদের পরিকল্পনা নস্যাত হয়ে যাবে, এমতাবস্থায় ওমর রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)কে ওয়াছিয়্যাতনামা লেখা থেকে বিরত রাখার জন্যে বললেন যে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) রোগের প্রকোপের কারণে প্রলাপ বকছেন (নাউযু বিল্লাহি মিন্‌ ক্বাওলি যালিক্‌)।     এ প্রসঙ্গে কেউ হয়তো বলতে পারেন যে, ওমরের বিরোধিতা সত্ত্বেও হযরত রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) তাঁর ওয়াছিয়্যাতনামা লিখে রেখে যেতে পারতেন; কেন তিনি তা লিখলেন না? এ প্রশ্নের জবাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, এমতাবস্থায় তা লেখা না-লেখার সমান হত। কারণ, সে ক্ষেত্রে এ ওয়াছিয়্যাতনামা যাদের পসন্দ হত না তারা বলত যে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) রোগের ঘোরে এটি রিখিয়েছিলেন যখন তাঁর অনুভূতি শক্তি ও বিচারবুদ্ধি সঠিকভাবে কাজ করছিল না, অতএব, এটির কোন কার্যকরিতা নেই।     ইবনে আব্বাসের একটি রেওয়াইয়াত থেকেও এরই আভাস পাওয়া যায়। তিনি বলেন ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর নিকটে বসা এক ব্যক্তি (বিস্ময় প্রকাশ করে) বললেন ঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) প্রলাপ বকছেন!!এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর নিকট আবেদন করলেন ঃ আপনি যা চাচ্ছিলেন আমরা কি তা আপনার জন্যে নিয়ে আসবো না?” তখন রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বললেন ঃ এখন আর কী জন্য!অর্থা যে কথা বলা হয়েছে তারপর আর এতে কী ফায়দা হবে!২১     এ প্রসঙ্গে ওমরের নিকট প্রশ্ন করা যেত যে, তিনি অসুস্থ অবস্থায় হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)কে ওয়াছিয়্যাতনামা লিখতে বাধা দিলেন এ যুক্তিতে যে, তিনি প্রলাপ বকছেন, কিন্তু তিনি একই যুক্তিতে খলীফাহ্‌ আবু বকরকে অন্তিম ওয়াছিয়্যাতনামা লিখতে বাধা দিলেন না কেন? (অথচ আবু বকর তাঁর ওয়াছিয়্যাতনামা লেখানোর মাঝখানে বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন।)     ত্বাবারী লিখেছেন২২ ঃ আবু বকর ওসমানকে মজলিস থেকে একান্তে ডেকে নিলেন এবং বললেন, “লিখো ঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এ হচ্ছে আবু বকর বিন্‌ আবি কুহাফাহ্‌র পক্ষ থেকে মুসলমানদের উদ্দেশে ওয়াছিয়্যাত। অতঃপর …।বর্ণনাকারী বলেন ঃ এরপর তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন এবং আর কথা বলতে পারছিলেন না। কিন্তু আবু বকর বেহুশ থাকা অবস্থায়ই ওসমান লিখলেন ঃ আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তদনুযায়ী আমি ওমর বিন্‌ আল-খাত্তাবকে আমার স্থলাভিষিক্ত ও তোমাদের ওপর খলীফাহ্‌ নিয়োগ করেছি এবং তোমাদের কল্যাণ কামনার ব্যাপারে কোনই ত্রুটি করি নি।ওসমান লেখা শেষ করার পর আবু বকর পুনরায় সংজ্ঞা ফিরে পেলেন এবং ওসমানকে জিজ্ঞেস করনে ঃ পড়ো, দেখি কী লিখেছো।ওসমান যা লিখেছিলেন তা আবু বকরকে পড়ে শোনালেন। আবু বকর বললেন ঃ আল্লাহু আকবার! আমার মনে হয় তুমি ভয় পাচ্ছিলে যে, বেহুশ অবস্থায় আমার এ দেহকাঠামো শূন্য হয়ে গেলে জনগণের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।ওসমান বললেন ঃ জ্বী।আবু বকর বললেন ঃ আল্লাহ্‌ তোমাকে ইসলাম থেকে ও আহ্‌লে ইসলাম থেকে কল্যাণ দান করুন। আবু বকর ওসমানের লেখা গ্রহণ করলেন।     আবু বকরের এ ওয়াছিয়্যাতনামা সম্পর্কে স্বয়ং ওমরের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?     ত্বাবারী লিখেছেন২৩ ঃ ওমর বসে ছিলেন এবং জনগণ তাঁর পাশে ছিলেন। ওমরের হাতে ছিল খেজুর গাছের একটি শাখা। আবু বকরের আযাদকৃত ক্রীতদাস শাদীদ ওমরকে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করে লেখা আবু বকরের পত্র নিয়ে এলো। ওমর জনগণকে সম্বোধন করে বললেন ঃ হে লোক সকল! তোমরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর খলীফাহ্‌র ফরমানের আনুগত্য করো। খলীফাহ্‌ তোমাদের উদ্দেশে বলছেন ঃ আমি তোমাদের কল্যাণ কামনার ব্যাপারে কোনই ত্রুটি করি নি।     বিস্ময়কর! যে ওমর মৃত্যুশয্যায় হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) কর্তৃক ওয়াছিয়্যাতনামা লেখার বিষয়টি মেনে নিতে পারেন নি এবং বলেছিলেন ঃ আল্লাহ্‌ই আমাদের জন্যে যথেষ্ট।কিন্তু সেই ওমরই আবু বকর এহেন অবস্থায় ওয়াছিয়্যাতনামা লিখে রেখে গেলে তা মেনে নিলেন। দুটি ক্ষেত্রে আচরণের মধ্যে কতই না পার্থক্য! এ কারণে যথার্থভাবেই ইবনে আব্বাস এতই অশ্রুপাত করেছিলেন যে, তা গড়িয়ে পড়ে নুড়ি পাথর ভিজে গিয়েছিল।পাদটীকা ঃ১.  সাক্বিফাহ্‌ মানে ছাউনি। হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ছাহাবীগহ্বানূ সায়েদাহ্‌ব একটি ছাউনির নীচে সমবেত হয়ে খেলাফতের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হন ও পরে ফয়সালায় পৌঁছেন বিধায় ইতিহাসে এ ঘটনা সাক্বিফাহ্‌র ঘটনা হিসেবে সুপরিচিত হয়েছে। – অনুবাদক২.  তারীখে ত্বাবারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২১০।৩. প্রাগুক্ত।৪.  আল্‌-ইছাবাহ্‌, ২য় খণ্ড, পৃ ২৪০; আজ্‌-জার্‌হ্‌ ওয়াত্‌-তাদীল (রাযী), ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১৩৬।৫.  তারীখে ত্বাবারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৫৮৬।৬. প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২১০।৭.  প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৫৮৬।৮. গ্রন্থকারের রচিত এক শত পঞ্চাশ জন কল্পিত ছাহাবীগ্রন্থে কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব ক্বাক্বাসম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।৯.  গ্রন্থকারের রাওয়াতুন্‌ মুখতালিফূন্‌গ্রন্থে তার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।১০. লিসানুল মীযান, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ১৩।১১. বলা বাহুল্য যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর সাথে জনগণের এ ধরনের কোন অঙ্গীকারের ঘটনা ঘটে থাকলে তা বিপুল সংখ্যক সূত্রে বর্ণিত হাদীছে মুতাওয়াতির হতো, অথচ এ ধরনের কোন অঙ্গীকারের কথা অন্য কোন সূত্রেই বর্ণনা করা হয় নি। ১২. ত্বাবাক্বাতে ইবনে সাদ্‌, ২য় খণ্ড, ২-ক্বাফ্‌, পৃঃ ৩৭; নিহাইয়াতুল্‌ আরাব্‌, ১৮তম খণ্ড, পৃঃ ৩৭৫; কান্‌যুল্‌ উম্মাল, ৩য় খণ্ড, ১৩৮ ও ৪র্থ খণ্ড, ৩৭৫।১৩. ত্বাবাক্বাতে ইবনে সাদ্‌, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৪২।১৪. ১ম খণ্ড, ২৯৩।১৫. উল্লেখ্য, সে যুগে কাগজ স্বল্পতার কারণে চামড়া, হাড্ডি, কাঠ ইত্যাদির ওপরেও লেখা হতো।১৬. ত্বাবাক্বাতে ইবনে সাদ্‌, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৪৪।১৭. কিতাবুল্‌ জিহাদ, বাবে জাওয়ায়িযু ওয়াফ্‌দ্‌, ২য় খণ্ড/ ১২০ এবং ২য় খণ্ড, ১১২; ছহীহ মুসলিম, ৫ম খণ্ড/ ৭৫ ও ৭৬; মুসনাদে আহ্‌মাদ, হাদীছ নং ১৯৩৫; ত্বাবাক্বাত্‌, ২য় খণ্ড, ২৪২ ও ২৪৪; ত্বাবারী, ৪র্থ খণ্ড, ১৯৩। (মূলে তথ্যসূত্র বিস্তারিত; কিছুটা সংক্ষেপ করা হল। – অনুবাদক)১৮. ছহীহ্‌ বুখারী, ১ম খণ্ড/ ২২, বাবে কিতাবাতুল্‌ ইল্‌ম্‌; মুসনাদে আহ্‌মাদ, হাদীছ নং ২৯৯২; ত্ববাক্বাত্‌, ২য় খণ্ড/ ২৪৪।১৯. মূলে আছে مشاعر যার মানে অনুভূতি সমূহ অর্থা ইন্দ্রিয় নিচয়ের স্বভাবিক কার্যক্ষমতা ও বিচারবুদ্ধি। – অনুবাদক ২০. বুখারী, ৩য় খণ্ড/ ৬২, ৪র্থ খণ্ড/ ৫ ও ১৮০; মুসলিম,  ৫ম খণ্ড/ ৭৬; মুসনাদে আহ্‌মাদ, হাদীছ নং ৩১১১; তারীখে ইবনে কাছীর, ৫ম খণ্ড/ ২২৭-২২৮; তাইসীরুল উছূল, ৪র্থ খণ্ড/ ১৯৪; তারীখে যাহাবী, ১ম খণ্ড/ ৩১১; তারীখে কামেল, পৃঃ ১০৮ প্রভৃতি। (তথ্যসূত্র সংক্ষেপিত। – অনুবাদক)২১. ত্বাবাক্বাতে ইবনে সাদ্‌, ২য় খণ্ড/ ২৪৪।২২. ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৫২।প্রাগুক্ত, পৃঃ ৫১

Share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here