পুনরূত্থান বা পরকাল পরিচিতি

0
506

পুনরূত্থান বা পরকাল পরিচিতি

shaban

মানুষ দেহ ও আত্মার সমষ্টিইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি যাদের জানা আছে, তারা নিশ্চয়ই জানেন যে, পবিত্র কুরআন বা হাদীসে প্রায়ই মানুষের দেহ ও আত্মা প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছেসবাই জানেন যে, পঞ্চেন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভবযোগ্য এই দেহ সম্পর্কে ধারণা করা আত্মার তুলনায় অনেক সহজআর আত্মা সম্পর্কে ধারণা অর্জন যথেষ্ট জটিল ও দুর্বোধ্যশীয়া ও সুন্নি, উভয় সমপ্র দায়ের কালাম (মৌলিক বিশ্বাস শাস্ত্র) শাস্ত্রবিদ এবং দার্শনিকদের মধ্যে আত্মা সম্পর্কিত মতামতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মতভেদ বিরাজমানতবে এটা একটা সর্বজন স্বীকৃত বিষয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে দেহ ও আত্মা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির অস্থিত্বমৃত্যুর মাধ্যমে মানবদেহ তার জীবনীশক্তি হারায় এবং ধীরে ধীরে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়কিন্তু আত্মার বিষয়টি মোটেও এমন নয়বরং জীবনীশক্তি মূলতঃ আত্মা থেকেই উসরিতযতক্ষণ পর্যন্ত আত্মা দেহের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে, দেহও ততক্ষণ ঐ আত্মা থেকে সঞ্জীবনীশক্তি লাভ করবেযখনই আত্মা ঐ দেহ থেকে পৃথক হবে এবং (মৃত্যুর মাধ্যমে) দেহের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে, তখনই দেহ নিজীব হয়ে পড়বেতবে আত্মা তার জীবনীশক্তি নিয়ে আপন জীবনকাল অব্যাহত রাখেপবিত্র কুরআন এবং ইমামগণের (আ.) হাদীস সমূহের মাধ্যমে যা আমরা বুঝতে পারি, তা হল, আত্মা মহান আল্লাহ্‌র এক অসাধারণ ও অভিনব সৃষ্টিতবে আত্মা ও দেহের অস্থিত্বের মধ্যে এক ধরণের সংগতি ও ঐক্য বিদ্যমান মহান আল্লাহ্‌ পবিত্র কুরআনে বলেছেন ঃ আমরা মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি অতঃপর আমরা তাকে শুক্র বিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছিএরপর আমরা শুক্রবিন্দুকে জমাটবাধাঁ রক্তে পরিনত করেছিঅতঃপর জমাট বাধাঁ রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করেছিএরপর সেই মাংসপিন্ড থেকে অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্তিত্বকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি, অবশেষে তাকে এক নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি” (সুরা আল্‌মুমিনীন, ১২-১৪ নং আয়াত।)উপরোলিখিত আয়াত থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, উক্ত আয়াতের প্রথম অংশে সৃষ্টির জড়গত ক্রমবির্বতন সম্পর্কে আলোচিত হয়েছেআর উক্ত আয়াতের শেষাংশে আত্মা, অনুভূতি এবং ইচ্ছাশক্তির সৃষ্টির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছেএভাবে উক্ত আয়াতের শেষাংশে দ্বিতীয় প্রকৃতির সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা প্রথম প্রকৃতির সৃষ্টির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নতরপবিত্র কুরআনের অন্যত্র মানুষের পুনরূত্থানের বিষয় অস্বীকারকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছেতাদের প্রশ্ন ছিল, মৃত্যুর পর মানুষের দেহ যখন ধ্বংস প্রাপ্ত হয় এবং পুনরায় তাকে প্রথম অবস্থার ন্যায় সৃষ্টি করা সম্ভব? এর উত্তরে মহান আল্লাহ্‌‌ বলেছেন ঃ তারা বলে, আমরা মৃত্তিকায় মিশ্রিত হয়ে গেলেও পুনরায় নতুন করে সৃজিত হব কি? বরং তারা তাদের পালনকর্তার সাক্ষাতকে অস্বীকার করেবলুন, তোমাদের প্রাণহরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তা তোমাদের প্রাণহরণ করবেঅতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যার্বতিত হবে” (-সুরা আস্‌ সিজদাহ্‌, ১০-১১ নং আয়াত।)এ ছাড়া পবিত্র কুরআনে আরও বিস্তারিতভাবে আত্মা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছেসেখানে আত্মাকে এক অজড় অস্থিত্ব হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছেএ ব্যাপারে মহান আল্লাহ্‌‌ বলেছেন ঃ “(হে রাসুল সঃ) তোমাকে তারা আত্মার (রূহ্‌) রহস্য সম্পর্কে প্রশ্ন করে থাকেবলে দাও; আত্মা সে আমার প্রতিপালকের আদেশঘটিত” (-সুরা আল্‌ ইস্‌রা, ৮৫ নং আয়াত।)এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ তিনি যখন কোন কিছু করতে ইচ্ছে করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, হও তখনই তা হয়ে যায়” (-সুরা আল্‌ ইয়াসিন, ৮৩ নং আয়াত।)উপরোক্ত আয়াত থেকে এটাই প্রতীয়মাণ হয় যে, কোন কিছু সৃষ্টির ব্যাপারে মহান আল্লাহ্‌র আদেশের বাস্তবায়ন কোন ক্রমধারা বা পর্যায়ক্রমের নীতি অনুসরণ করে নাতাঁর আদেশ বাস্তবায়ন কোন স্থান বা কালের করতলগত নয়সুতরাং আত্মা যেহেতু মহান আল্লাহ্‌র আদেশ বৈ অন্য কিছু নয়, তাই তা অবশ্যই কোন জড়বস্তু নয়অতএব যার অস্থিত্বের মাঝে ক্রমধারা, স্থান ও কালের ন্যায় জড় বস্তুবাচক কোন গুণাবলীরই উপস্থিতি নেই  আত্মার রহস্য সম্পর্কে অন্য একটি আলোচনা আত্মার রহস্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গী বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমেও সমর্থিত হয়পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তার নিজের মধ্যে এক সত্তার অস্থিত্ব উপলব্ধি করে, যাকে সে আমিবলে আখ্যায়িত করেমানুষের এ উপলব্ধি চিরদিনেরএমনকি মানুষ মাঝে মাঝে তার নিজের হাত, পা, মাথাসহ দেহের সকল অঙ্গকে ভুলে গেলেও যতক্ষণ সে বেঁচে আছে, তার ঐ আত্মোপলব্ধি (আমি) সে কখনই ভুলে যায় নাযেমনটি সর্বত্র পরিদৃষ্ট হয়, এই সত্তার (আমি) অস্থিত্ব কখনই বিভাজ্য নয়মানুষের দেহ প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীলমানবদেহ সর্বদাই একটি সুনির্দিষ্ট স্থান অধিকার করে এবং সময়ের অগণিত মূহুর্তের স্রোত সর্বদাই তার উপর দিয়ে প্রবাহমাণকিন্তু ঐ মূল সত্তার অস্থিত্ব সর্বদাই স্থিরকোন পরির্বতনশীলতাই তার অস্থিত্বকে কখনোই স্পর্শ করে নাএতে এটাই প্রতীয়মণ হয় যে, ঐ সত্তার অস্থিত্ব (আমি বা আত্মা) অবশ্যই জড় অস্থিত্ব নয়তা না হলে অবশ্যই তা স্থান, কাল, বিভাজন ও পরিবর্তনশীলতার মত জড়বস্তুর গুণবাচক বৈশিষ্ট্য সমূহও তাতে পাওয়া যেতহ্যাঁ, আমাদের সবার দেহই জড়বস্তুর গুণবাচক ঐসব বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণআর আত্মার সাথে দেহের ওতপ্রোত সম্পর্কের কারণে, ঐসব দৈহিক বৈশিষ্ট্য সমূহকে আত্মার প্রতিও আরোপ করা হয়কিন্তু সামান্য একটু মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করলেই এ ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এখন ও তখন (সময়), এখানে ও সেখানে (স্থান), এরকম ও সেরকম (আকৃতি ও আয়তন) এবং এদিক ও সেদিক (দিক) এসবই আমাদের এ জড় দেহেরই বৈশিষ্ট্যকিন্তু আত্মা ঐ সকল জড়বাচক বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্তদেহের মাধ্যমেই ঐসব বৈশিষ্ট্য তাকে স্পর্শ করেঠিক একই কথা আত্মার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্যযেমন ঃ অনুভূতি ও উপলব্ধি (জ্ঞান) একমাত্র আত্মারই বৈশিষ্ট্যসুতরাং এটা চিরসত্য যে, জ্ঞান যদি জড়বস্তু হত, তাহলে স্থান ও কাল বিভাজনের ন্যায় জড়বাচক গুণাবলীও তার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রযোজ্য হতঅবশ্য উক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়টি একটি ব্যাপক আলোচনা ও অসংখ্য প্রশ্ন ও উত্তরের সূত্রপাত ঘটাতে বাধ্যতাই এই বইয়ের এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার অবতারণা না করাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছিএ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জ্ঞান আহরণে আগ্রহীদেরকে ইসলামী দর্শনের বইগুলো পড়ার অনুরোধ জানাচ্ছিইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু বাহ্যিক এবং সংর্কীণ দৃষ্টিতে মৃত্যু মানুষের ধ্বংসেরই নামান্তরকারণ, জন্ম ও মৃত্যুর মাঝেই মানুষের জীবনকে সীমাবদ্ধ বলে ধারণা করা হয়কিন্তু ইসলাম মৃত্যুকে মানবজীবনের একটি পর্যায় থেকে অন্য একটি পর্যায়ে স্থানান্তর বলে আখ্যায়িত করেইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ এক অনন্ত জীবনের অধিকারী, যার কোন শেষ নেইমৃত্যু মানুষের আত্মাকে তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে জীবনের অন্য একটি স্তরে স্থানান্তরিত করেমৃত্যু পরবর্তী এ জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা মানুষের মৃত্যুপূর্ব জীবনের সকাজ ও অসকাজের উপরই নির্ভরশীলমহানবী (সা.) এ ব্যাপার বলেছেনঃ কখনেই মনে কর না যে, মৃত্যুর মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যাবেবরং, মৃত্যুর মাধ্যমে তোমরা এক বাড়ী থেকে অন্য বাড়ীতে স্থানান্তরিত হবে মাত্র” [বিহারূল আনোয়ার, ৩য় খন্ড, ১৬১ নং পৃষ্ঠা।] বারযাখ্‌ (কবরের জীবন) পবিত্র কুরআন ও সুন্নাতের বর্ণনা অনুযায়ী মৃত্যু থেকে নিয়ে কেয়ামত বা পুনরূত্থান দিবসের পূর্ব পর্যন্ত মানুষের একটি সীমিত ও অস্থায়ী জীবন রয়েছেকেয়ামত বা পরকাল ও পার্থিব জীবনের মাঝামাঝি মানুষের মৃত্যু পরবর্তী এই জীবনের নামই বারযাখবা কবরের জীবন। [বিহারূল আনোয়ার, ২য় খন্ড, বারযাখ অধ্যায়।] পৃথিবীর জীবনে মানুষ তার বিশ্বাস অনুযায়ী যে সব ভাল বা খারাপ কাজ করেছে, মৃত্যু পরবর্তী ঐ বারযাখজীবনে ঐ সব ভাল বা খারাপ কাজের জন্যে প্রতিটি মানুষকেই ব্যক্তিগত ভাবে জবাবদিহি করতে হবেঅতঃপর ঐ জবাবদিহির ভিত্তিতে মোটামুটি একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবেআর ঐ সিদ্ধানে-র ভিত্তিতেই মানুষ পরকালে এক সুখময় ও মধুর জীবন অথবা এক অশানি-পূর্ণ ও তিক্ত জীবন যাপনের অধিকারী হবেআর ঐ ধরণের জীবনযাপন শুরুর মাধ্যমেই মানুষ কেয়ামত বা পুনরূত্থানের জন্যে প্রতীক্ষমান থাকবে। [বিহারূল আনোয়ার, ২য় খন্ড, বারযাখ অধ্যায়।] মানুষের এই বারযাখের (কবরের) জীবন অনেকটা বিচারকার্য শুরু হওয়ার পূর্বে আদালত কক্ষে অপেক্ষামান আসামী বা ফরিয়াদীর মতবিচারকার্য শুরুর পূর্বে তার প্রস্তুতি পর্ব সম্পনেড়ব র জন্যে আসামী বা ফরিয়াদী সাধারণতঃ প্রয়োজনীয় নথিপত্র পূর্ণ করা ও তল্লাসী সম্পন্ন করা সহ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেএরপর সে আদালত কক্ষে গ্রেপ্তার অবস্থায় বিচারকার্য শুরু হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেমানুষ এ পৃথিবীতে বসবাসকালীন সময়ে যেভাবে জীবনযাপন করেছে, মৃত্যুর পর বারযাখ বা কবরের জীবনে তার আত্মাও ঠিক সেভাবেই জীবনযাপন করবেযদি সে পার্থিব জীবনে সলোক হয়ে থাকে, তাহলে বারযাখের জীবনেও সে সৌভাগ্য, ও প্রাচুর্য্যের অধিকারী হবে এবং আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভকারী সলোকদের নৈকট্য লাভ করবেআর যদি সে অস ব্যক্তি হয়ে থাকে তাহলে, বারযাখের জীবনেও সে কষ্ট ও শাস্থির অধিকারী হবে এবং দুষ্টও পথভ্রষ্ট অসলোকদের সংসর্গ লাভ করবেমহান আল্লাহ্‌‌ মৃত্যু পরবর্তী সৌভাগ্যবান লোকদের অবস্থার ব্যাপারে বলেছেন ঃ আর যারা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো নাবরং তারা তাদের নিজদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকা প্রাপ্তআল্লাহ্‌‌ নিজের অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদ্‌যাপন করছেআর যারা এখনো তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করেকারণ, তাদের কোন ভয়-ভীতিও নেই এবং কোন চিন্তা ভাবনাও নেইআল্লাহ্‌র নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং তা এভাবে যে, আল্লাহ্‌‌ ঈমানদারদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না” (-সুরা আল ইমরান, ১৬৯-১৭১ নং আয়াত।) মহান আল্লাহ্‌‌ পবিত্র কুরআনে মৃত্যু পরবর্তী র্দূভাগা লোকদের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন ঃ যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে ঃ হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) প্রেরণ করুন, যাতে আমি সকর্ম করতে পারি, যা আমি (পূর্বে) করিনি” (-সুরা আল মুমিনুন, ৯৯-১০০ নং আয়াত।)  পুনরূত্থান দিবস পৃথিবীতে ঐশী গ্রন্থগুলোর মধ্যে একমাত্র পবিত্র কুরআনেই কেয়ামত বা পুনরূত্থান দিবস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছেএমন কি ঐশীগ্রন্থতাওরাতেকেয়ামতের নামটি পর্যন্ত উলেখিত হয়নিআর ইঞ্জিলগ্রনেঅত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে কেয়ামতের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে মাত্রপবিত্র কুরআনে শতাধিক স্থানে বিভিন্ন প্রসংগে এবং বিভিন্ন নামে কেয়ামত বা পুনরূত্থান দিবসের কথা উল্লেখিত হয়েছেএ বিশ্বজগত ও তার অধিবাসীদের অবস্থা কেয়ামতের দিন কেমন হবে, তা কখনও বা সংক্ষেপে আবার কখনও বা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছেপবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মহান আল্লাহ্‌‌র প্রতি ঈমান আনয়নের পাশাপাশি প্রতিদান (কেয়ামত) দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাও আমাদের অবশ্য কর্তব্যকারণ; প্রতিদান (কেয়ামত) দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ইসলামের তিনটি (আল্লাহ্‌র একত্ববাদ, নবুয়ত ও কেয়ামত) মূলনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বিশেষসুতরাং, প্রতিদান দিবসের অস্বীকারকারী প্রকৃতপক্ষে ইসলামী আর্দশ থেকে বিচ্যুতআর প্রতিদান দিবসে অবিশ্বাসী ব্যক্তির পরিণতি হচ্ছে নিশ্চিত ধ্বংস, এটা নিশ্চিত সত্যকারণ; মহান আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে মানব জীবনের কৃতকর্মের কোন হিসাব নিকাশ এবং শাস্তি বা পুরুস্কারের কোন ব্যবস্থাই যদি না থাকে, তাহলে আল্লাহ্‌র দ্বীন বা ধর্ম প্রচার নিষ্ফল হয়ে পড়বেকেননা, আদেশ নিষেধ সম্বলিত নির্দেশ সমূহের সমষ্টির নামই তো দ্বীনঐ অবস্থায় নবীদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এবং দ্বীনপ্রচার উভয়ের ফলাফলই হবে একবরং, এমতাবস্থায় নবী ও দ্বীনপ্রচারের অনুপস্থিতি তার অস্থিত্বের উপর অগ্রাধিকার পাবেকারণ; ঐ অবস্থায় দ্বীনগ্রহণ করা ও শরীয়তের আইন-কানুন মেনে চলার মাধ্যমে নিজেকে কষ্ট দেয়া এবং আত্মস্বাধীনতা বির্সজন দেয়ারই নামান্তর হবেদ্বীনের অনুসরণের মধ্যে যদি কোন সুফলই লাভ না হয়, তাহলে জনগণ কখনেই দ্বীনের অধীনতা স্বীকার করবে নাআর প্রাকৃতিক স্বাধীনতা ভোগ থেকেও কখনোই তারা বিরত হবে নাএ থেকেই স্পষ্ট প্রতীয়মাণ হয় যে, প্রতিদান বা কেয়ামতের দিনকে স্মরণ করানোর গুরুত্ব প্রকৃতপক্ষে দ্বীন প্রচারের গুরুত্বেরই সমানআর এ থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, প্রতিদান বা কেয়ামত দিনের প্রতি বিশ্বাসই মানুষকে তাকওয়া’ (খোদাভীতি) অবলম্বন, অসচ্চরিত্র থেকে বেঁচে থাকা এবং বড় ধরণের পাপকাজ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেএকই ভাবে কেয়ামতের বিষয়টি ভুলে যাওয়া বা ঐ দিনের প্রতি অবিশ্বাসই মানুষের যে কোন ধরণের পাপকাজে লিপ্ত হওয়ার মূল কারণমহান আল্লাহ্‌‌ বলেছেন ঃ নিশ্চয় যারা আল্লাহ্‌র পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি, এ কারণে যে তারা হিসাব দিবসকে ভুলে গিয়েছিল” (সুরা আস্‌ সোয়াদ, ২৬ নং আয়াত।)উপরোক্ত আয়াতে কেয়ামতের বিষয়টি ভুলে যাওয়াকেই মানুষের সবধরণের পথ ভ্রষ্টতার উ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছেসমগ্র সৃষ্টিজগতের সৃষ্টি এবং ঐশী আইনমালার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কে সুগভীরভাবে পর্যালোচনা করলেই এই প্রতিদান (কেয়ামত) দিবসের অপরিহার্যতা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেএমনকি আমরা এ সৃষ্টিজগতের সচরাচর সংঘটিত কার্য কলাপকে যদি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখতে পাব যে, সুনির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য ছাড়া কোন কাজই সস্পন্ন হয় নাকখনও কোন বস্তুর জন্যে তারই স্বয়ংক্রিয় গতি স্বকীয়ভাবে অথবা সত্তাগতভাবে তারই কাঙ্খিত বিষয় বা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে নাবরং বিশেষ কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিদিষ্ট কোন কাজ সাধিত হওয়ার ব্যাপারে তার পটভূমি রচনা করেঅতঃপর তা কাঙ্খিত কাজে পরিণত ও সাধিত হয়এমনকি আপাত দৃষ্টিতে অনেক কাজকেই আমাদের কাছে উদ্দেশ্যবিহীন বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা উদ্দেশ্যবিহীন নয়যেমনঃ শিশু সুলভ খেলা-ধুলা ইত্যাদিযদি আমরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাবে এ ধরণের কাজকর্ম পযর্বেক্ষণ করি, তাহলে দেখতে পাব যে, বাহ্যতঃ লক্ষ্যহীন ঐসব কাজের পিছনেও তার উপযোগী উদ্দেশ্য ক্রিয়াশীল রয়েছেএভাবে প্রকৃতিতে যত কাজই সম্পন্ন হয়, সবই কোন না কোন উদ্দেশ্য সম্বলিততেমনি শিশু সুলভ খেলা ধুলার উদ্দেশ্যও এক ধরণের নিছক কল্পনা প্রসূত আনন্দ উপভোগ, যা ঐ শিশুর জন্যেই উপযোগী, ঐ লক্ষ্যে পৌঁছাই তার খেলার উদ্দেশ্যঅবশ্য এ বিশ্বজগত ও মানুষ সৃষ্টি আল্লাহ্‌রই কাজআর মহান আল্লাহ্‌র অবশ্যই যেকোন অর্থহীন বা উদ্দেশ্যহীন কাজ সম্পাদনের মত বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্রমহান আল্লাহ্‌‌ একের পর এক সৃষ্টিই করে চলেছেন, তাদের জীবিকা দান করেছেনঅতঃপর তাদের মৃত্যু দিচ্ছেনআবার নতুন করে সৃষ্টি করছেনআবার তাদের জীবিকা দিচ্ছেন, মৃত্যু দিচ্ছেনএভাবে সর্বক্ষণ সৃষ্টি করছেন আর ধ্বংস করছেনএটা আদৌ কল্পনা যোগ্য নয় যে, এ ধরণের সৃষ্টি ও ধ্বংসের পেছনে আল্লাহ্‌র নিদিষ্ট কোন লক্ষ্য নেইঅতএব এ বিশ্বজগত ও মানুষের সৃষ্টির পেছনে সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অস্থিত্বের ধারণা একটি অপরিহার্য বিষয়অবশ্য এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, এ সৃষ্টিকার্যের মাঝে নিহিত লাভ, নিঃসন্দেহে অভাবমুক্ত আল্লাহ্‌র দিকে প্রত্যাবর্তন করবে নাএ সৃষ্টি রহস্যের মাঝে লুকায়িত লাভ দ্বারা একমাত্র সৃষ্টিনিচয়ই লাভবান হবেসুতরাং , বলা যায় যে, এ বিশ্বজগত ও মানুষ এক সুনির্দিষ্ট ও শ্রেষ্ঠতর অস্থিত্ব লাভের প্রতি ধাবমান, যা অবিনশ্বর ও অনন্তআমরা যদি দ্বীনি শিক্ষার দৃষ্টিকোন থেকে সূক্ষ্ম ভাবে জনগণের আস্থা পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখতে পাব যে, খোদায়ী নির্দেশনা ও দ্বীনি প্রশিক্ষণের প্রভাবে মানুষ স ও অস দুদলে বিভক্তঅথচ পাথির্ব জীবনে এ দুদলের মাঝে বিশেষ কোন পার্থক্যই পরিলক্ষিত হয় নাশুধু তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই যে পৃথিবীর অত্যাচারী ও অস লোকরাই সকল উন্নতি ও সাফল্যের ধারক-বাহক আর সর্ব সাধারণের বঞ্চনা, কষ্টভোগ দূর্দশা ও অসহায়ত্বের কারণঅথচ পৃথিবীর স লোকেরাই সাধারণত সব ধরণের কষ্টভোগ, বাঞ্চনা, দূর্দশা ও অত্যাচারের শিকার হয়এমতাবস্থায় ঐশী ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে এমন একটি জগত ও জীবনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে উপরোক্ত দুদলের লোকেরাই তাদের স্ব-স্ব কার্য কলাপের উপযুক্ত প্রতিদান পাবেআর সবাই তাদের নিজ নিজ কর্মফল অনুযায়ী সেখানে উপযুক্ত জীবন যাপন করবেমহান আল্লাহ্‌‌ তাই পবিত্র কুরআনে বলেছেন ঃ আমরা নভো-মন্ডল, ভূ-মন্ডল ও এতদভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনিআমরা এগুলো যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছিকিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বোঝে না” (-সুরা আদ্‌ দুক্ষান, ৩৮-৩৯ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ অন্যত্র বলেছেন যে ঃ যারা দুষ্কর্ম উপার্জন করেছে তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের সে লোকদের মত করে দেব, যারা ঈমান আনে ও সকর্ম করে তাদের জীবন ও মৃত্যু কি সমান হবে? তাদের দাবী কত মন্দ! আল্লাহ্‌ নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেনযাতে প্রত্যেক ব্যক্তি তার উপার্জনের ফল পায়তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না” (-সুরা আল্‌ জাসিয়াহ্‌, ২১-২২ নং আয়াত।) অন্য একটি ব্যাখ্যাপবিত্র কুরআনের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দিকের আলোচনায় ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, পবিত্র কুরআনে ইসলামী জ্ঞান বিভিন্ন পন্থায় আলোচিত হয়েছেআর ঐসকল পন্থা বাহ্যিক (জাহের) ও আভ্যন্তরীণ বা গোপন (বাতেন) দিক নামে দুভাগে বিভক্তকুরআনের বাহ্যিক বর্ণনা পদ্ধতি গণমানুষের সাধারণ মেধাশক্তির স্তরের উপযোগীকিন্তু কুরআনের আধ্যাত্মিক বা বাতেনী বর্ণনা পদ্ধতি প্রথম পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীতএই পদ্ধতি গণমুখী নয়বরং বিশেষ এক শ্রেণীর জন্যে এই পদ্ধতি নির্ধারিতশুধুমাত্র আধ্যাত্মিক জীবনের অধিকারীগণ তাদের পরিশুদ্ধ আত্মার মাধ্যমেই উক্ত পদ্ধতি উপলব্ধি করতে সর্মথকুরআনের বাহ্যিক বর্ণনা পদ্ধতিতে মহান আল্লাহ্‌‌কে সমগ্র সৃষ্টিজগতের নিরংকুশ অধিপতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছেবলা হয়েছে, সমগ্র বিশ্ব জগতে তিনিই একমাত্র সত্ত্বাধিকারীমহান আল্লাহ্‌‌ তার আদেশ সমূহ বাস্তবায়নের জন্যে অসংখ্য ফেরেস্তা সৃষ্টি করেছেনতারা এ বিশ্ব জগতের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেনসৃষ্টিজগতের প্রতিটি জিনিসের জন্যেই দায়িত্বশীল বিশেষ একদল ফেরেস্তা নিযুক্ত রয়েছেতারা তাদের ঐ নির্দিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি স্বরূপমানুষ আল্লাহ্‌রই সৃষ্টি এবং তারই দাস স্বরূপআল্লাহর সকল আদেশ-নিষেধ মেনে চলা তার একান্ত কর্তব্যনবীগণ আল্লাহ্‌র বাণীবাহক এবং তার পক্ষ থেকে শরীয়ত বা ঐশী আইন আনয়নকারীতারা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্যে এ পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেনমহান আল্লাহ্‌ তার প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপনকারী ও তার অনুগত লোকদের জন্যে পূর্ণ পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনআর তাকে অস্বীকারকারী পাপীদের জন্যে চরম শাস্তির হুমকি দিয়েছেনতিনি যা কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার খেলাপ তিনি কখনেই করবেন নামহান আল্লাহ্‌ ন্যায়বিচারকতাই ন্যায়বিচারের দাবী হচ্ছে, এ জাগতিক জীবনে সলোক বা অস লোক তাদের কর্মের উপযুক্ত প্রতিদান না পাওয়ার কারণে এমন একটি জীবনের অবতারণা প্রয়োজন, যেখানে সলোক ও অসলোক উভয়েই তাদের কাজের উপযুক্ত প্রতিদান ভোগ করবেমহান আল্লাহ্‌ তার ন্যায়বিচারের প্রমাণ স্বরূপ এ পৃথিবীর সকল মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করবেনঅতঃপর প্রতিটি মানুষের মৌলিক বিশ্বাস ও তার কার্য কর্মের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ করবেনতিনি সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে মানুষের কৃতকর্মের বিচার করবেনআর সে অনুযায়ী সবার প্রাপ্য অধিকার তিনি আদায় এবং অত্যাচারীর হাত থেকে অত্যাচারীতের হৃত অধিকার পুনরূদ্ধার করবেনপ্রতিটি ব্যক্তিই তাদের কৃতকর্মের উপযুক্ত প্রতিদান পাবেমানুষ তার কৃতকর্ম অনুসারে কেউ অনন্ত কালের জন্যে বেহেশতে প্রবেশ করবে,আবার কেউ বা চিরদিনের জন্যে দোযখের আগুনে প্রবেশ করবেএটাই পবিত্র কুরআনের বাহ্যিক বর্ণনাআর এটাই সত্য ও সঠিকএ বিষয়টি মানুষের জন্যে সহজ ও বোধগম্য ভাষায় রচিত, যাতে এ থেকে সাধারণ গণমানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারেঅপরদিকে যারা পবিত্র কুরআনে লুকায়িত নিগূঢ় অর্থ ও তার রহস্যময় আধ্যাত্মিক ভাষা সম্পর্কে অবহিত, তারা গণমানুষের দ্বারা লব্ধ সাধারণ অর্থের চেয়ে অনেক উচ্চস্তরের জ্ঞান কুরআন থেকে আহরণ করে থাকেনপবিত্র কুরআনও তার সহজ সাধারণ বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে প্রায়ই ঐ বর্ণনায় লুকায়িত গূঢ় অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে থাকেপবিত্র কুরআন অসংখ্য ইঙ্গিতের মাধ্যমে মোটামুটি ভাবে এটাই বুঝাতে চায় যে, মানুষ সহ এ সৃষ্টিজগতের সকল অংশই তার নিজস্ব প্রাকৃতিক গতির (যা অবিরাম গতিতে পূর্ণত্ব আহরণের পথে ধাবমান) মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে মহান আল্লাহ্‌র দিকে ধাবমানএভাবে চলতে চলতে একদিন অবশ্যই তার গতি পরিক্রমা থেমে যাবেএ সৃষ্টিনিচয় সেদিন সর্বস্রষ্টা আল্লাহ্‌র অসীম মহত্বের সম্মুখে নিজের সকল আমিত্ব ও সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলবেমানুষও সৃষ্টিজগতের একটি অংশ বিশেষমানুষের জন্যে নির্ধারিত পূর্ণত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞান ও উপলব্ধি ক্ষমতা বিকাশের মাধ্যমে অর্জিত হয়আর এ পথেই বিকশিত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়তই তার গতি মহান প্রভু আল্লাহ্‌র প্রতি ধাবমানমানুষের এ গতি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে শেষ হবে, তখনই মানুষ প্রকৃত সত্যে উপনীত হবে এবং আল্লাহ্‌র একত্ব ও মহত্বকে চাক্ষুষভাবে অবলোকন করবেতখন সে চাক্ষুষভাবে উপলব্ধি করবে যে, শক্তি ও মালিকানা সহ শ্রেষ্ঠত্বের সকল গুণাবলীই একমাত্র মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র সত্তার জন্যে নির্ধারিতআর তখনই এ জগতের সকল বস্তু ও বিষয়ের প্রকৃত রহস্য ও স্বরূপ তার কাছে উদঘটিত হবেএটাই অনন্ত ও অসীম জগতে প্রবেশের সর্বপ্রথম তোরণমানুষ যদি তার ঈমান ও সকাজের মাধ্যমে ঐ ঐশী জগতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে এবং আল্লাহ্‌‌ ও তার নৈকট্য প্রাপ্তদের সাথে আত্মিক বন্ধন ও যোগাযোগকে সুদৃঢ় করতে পারে, তাহলেই মহান আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করতে পারবেযার ফলে সে আল্লাহ্‌‌ ও পবিত্র আত্মাদের সান্নিধ্যে স্বর্গীয় জীবন যাপন করার সৌভাগ্যলাভ করবেএটা এমন এক সৌভাগ্য যাকে পৃথিবীর কোন বিশেষণে বিশেষিত করা অসম্ভবকিন্তু মানুষ যদি তার হৃদয় থেকে এ নশ্বর জগতের মায়া কাটাতে সক্ষম না হয়, যার ফলে আল্লাহ্‌‌, পবিত্র আত্মাগণ ও স্বর্গীয় জগতের সাথে তার ঐশী সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে অবশ্য তাকে চিরদিনের জন্যে সুকঠিন ও কষ্টময় শাস্তির শিকার হতে হবেযদিও এ কথা সত্য যে, জাগতিক জীবনে মানষের কৃত স বা অস কাজ দুটোই এক সময় বাহ্যত নশ্বর হয়ে যায়কন্তু মানুষের কৃত স বা অস কাজের প্রতিচ্ছবি তার আত্মায় চিরদিনের জন্যে সঞ্চিত হয়ে থাকে, যা কখনোই মুছে ফেলা যায় নাযেখানেই সে যাক না কেন, তার কৃতকর্মের ঐ স্মৃতি তার সাথে থাকবেইমানব জীবনের কৃত ঐসব স বা অস কাজই পরকালে তার অনন্ত সুখী জীবন অথবা কষ্টময় জীবনের একমাত্র পুজিঁ স্বরূপউপরোক্ত বিষয়টি পবিত্র কুরআনের নিম্নোলিখিত আয়াত সমূহে আলোচিত হয়েছেমহান আল্লাহ্‌‌ বলেছেন ঃ নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন হবে” (-সুরা আল আলাক, ৮ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ বলেছেন ঃ জেনে রাখ! সমস্ত বিষয় আল্লাহ্‌র দিকেই প্রত্যার্বতন করনে” (-সুরা আশ্‌ শুরা, ৫৩ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ বলেছেন ঃ সেদিন কেউ কারো কোন উপকার করতে পারবে না এবং সেদিন সব কর্তৃত্ব আল্লাহ্‌রই” (-সুরা আল ইনফিত্‌ার, ১৯ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ বলেছেন ঃ হে বিশ্বস্ত আত্মা, তুমি তোমার পালনকর্তার দিকে প্রত্যাবর্তন কর সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন অবস্থায়অতঃপর আমার উপাসনায় মনোনিবেশ কর এবং আমারই জান্নাতে প্রবেশ কর” (-সুরা আল ফাজ্‌র, ২৭-৩০ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ কেয়ামতের দিন বেশকিছু লোককে উদ্দেশ্য করে বলবেন ঃ “(তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যাকিছু এখন দেখছো) তুমি তো এই দিন সম্পর্কে উদাসীন ছিলেএখন তোমার নিকট থেকে যবনিকা সরিয়ে দিয়েছিফলে আজ তোমার দৃষ্টি সুতীক্ষ্ম” (-সুরা আল ক্ব্‌াফ, ২২ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ পবিত্র কুরআনের তাউইলসম্পর্কে (কুরআনের গূঢ় অর্থ এখান থেকেই উসরিত) বলেছেন ঃ যারা কুরআনকে স্বীকার করে না, তারা কি এখনো তাউইলব্যতীত অন্য কিছুর অপেক্ষায় আছে, যেদিন এর তাউইলপ্রকাশিত হবে, পূর্বে যারা একে ভুলে গিয়েছিল, সেদিন তারা বলবেঃ বাস্তবিকই আমাদের প্রতিপালকের পয়গম্বরগণ সত্যসহ আগমন করেছিলেনঅতএব, আমাদের জন্যে কোন সুপারিশকারী আছে কি যে, সুপারিশ করবে অথবা আমাদেরকে পুণঃ (পৃথিবীতে) প্রেরণ করা হলে আমরা পূর্বে যা করতাম তার বিপরীত কাজ করে আসতামনিশ্চয়ই তারা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেতারা মনগড়া যা বলত, উধাও হয়ে যাবে” (-সুরা আল্‌ আরাফ, ৫৩ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ বলেন ঃ সেদিন আল্লাহ্‌‌ তাদের শাস্তি পুরোপুরি দিবেন এবং তারা জানতে পারবে যে, আল্লাহ্‌‌ই সত্য, স্পষ্ট ব্যক্তকারী” (-সুরা আন্‌ নুর, ২৫ নং আয়াত। )আল্লাহ্‌‌ বলেন ঃ হে মানুষ তোমাকে তোমার পালনকর্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে কষ্ট স্বীকার করতে হবে, অতঃপর তার সাক্ষাত ঘটবে” (-সুরা আল্‌ ইনশিকক, ৬ নং আয়াত।)আল্লাহ্‌‌ আরো বলেন ঃ যে আল্লাহ্‌র সাক্ষাত কামনা করে, আল্লাহ্‌র সেই নির্ধারিত কাল অবশ্যই আসবে” (-সুরা আল্‌ আন্‌কাবুত, ৫ নং আয়াত।)আল্লাহ্‌‌ আরো বলেন ঃ অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার উপাসনায় কাউকে অংশীদার না করে” (-সুরা আল্‌ কাহফ্‌, ১১০ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ আরও বলেছেন ঃ হে বিশ্বস্ত আত্মা, তুমি তোমার পালনকর্তার দিকে প্রত্যাবর্তন কর সস্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন অবস্থায়অতঃপর আমার উপাসনায় মনোনিবেশ কর এবং আমারই জান্নাতে প্রবেশ কর” (-সুরা আল্‌ ফাজ্‌র, ২৭-৩০ নং আয়াত।)মহান আল্লাহ্‌‌ বলেন ঃ অতঃপর যখন মহাসংকট (কেয়ামত) এসে যাবেঅর্থা যেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম স্মরণ করবে এবং দর্শকদের জন্যে জাহান্নাম প্রকাশ করা হবে, (মানুষেরা দুশ্রেণীতে বিভক্ত হবে) তখন যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নামপক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাাত’’ (-সুরা আন্‌ নাযিআ, ৩৪ থেকে ৪১ নং আয়াত।)মানুষের কৃতকর্মের প্রতিদানের স্বরূপ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্‌ বলেন ঃ হে কাফের সমপ্রদায়, তোমরা আজ কোন অজুহাত পেশ করো নাতোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেয়া হবে যা তোমরা করতে” (-সুরা আত্‌ তাহরীম, ৭নং আয়াত।)  সৃষ্টির অব্যাহত অস্থিত্ব আমাদের দৃশ্যমান এ সৃষ্টিজগত অন্তহীন আয়ুর অধিকারী নয়একদিন অবশ্যই এ সৃষ্টিজগতের আয়ু নিঃশেষ হয়ে যাবেপবিত্র কুরআনেরও এ মতের সমর্থন পাওয়াযায়মহান আল্লাহ্‌‌ বলেন ঃ নভোমন্ডল, ভূ-মন্ডল ও এদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আমি যথাযথ ভাবেই এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্যেই সৃষ্টি করেছি (একটি নিদিষ্ট ও নির্ধারিত সময়ের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে)” (-সুরা আল্‌ আহ্‌ক্বাফ্‌ ৩ নং আয়াত।) উপরোক্ত সুনির্দিষ্ট ও সীমিত সময় সীমার কথা উলেখ করা হয়েছেকিন্তু এ পৃথিবী ও মানব জাতির বর্তমান প্রজন্ম সৃষ্টির পূর্বে অন্য কোন পৃথিবী বা প্রজন্ম সৃষ্টি করা হয়েছিল কি? এ বিশ্ব এবং মানব জাতির ধ্বংসপ্রাপ্তির পর (যেমনটি কুরআনে উলেখ করা হয়েছে) পুনরায় অন্য কোন বিশ্ব ও মানবজাতির সৃষ্টি হবে কি ? সামান্য কিছু ইঙ্গিত ছাড়া এসব প্রশ্নের সরাসরি ও সুস্পষ্ট কোন উত্তর পবিত্র কুরআনে খুঁজে পাওয়া যায় নাতবে আমাদের ইমামগণের (আ.) বর্ণিত হাদীস সমূহে এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক উত্তর দেয়া হয়েছে। (বিহারুল আনোয়ার, ১৪ নং খন্ড, ৭৯ নং পৃষ্ঠা।)  

 

Share

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY