সুরা বাকারার তাফসির দ্বিতীয় অংশ (৪৪-১০২ নম্বর আয়াত)

0
4778

সুরা বাকারার তাফসির দ্বিতীয় অংশ (৪৪-১০২ নম্বর আয়াত)

সূরা বাকারাহ’র ৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
َتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (44)

“তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেরা নিজেদেরকে ভুলে যাও,অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না?” (২:৪৪)

গত পর্বে আমরা বলেছি আল্লাহপাক ইহুদী পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন তোমরা কেন সত্য গোপন কর এবং মানুষকে তা জানতে দাও না? এ আয়াতেও তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, “ইসলামের নবীর আগমনের পূর্বে তোমরা যারা জনগণকে ওই নবীর আবির্ভাবের সুসংবাদ দিতে,এখন তোমরা কেন তার প্রতি ঈমান আনলে না? অথচ তোমরা তওরাত সম্পর্কে অনেক জান।” যদিও এ আয়াতে বনি ইসরাইল ও তাদের পণ্ডিতদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, কিন্তু আয়াতটির অর্থ অনেক ব্যাপক। সব ধর্ম ও মতবাদের প্রচারকরদের ক্ষেত্রে এই আয়াত প্রযোজ্য। এ সম্পর্কে রাসূলে খোদার বিশিষ্ট বংশধর হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) বলেছেন, মানুষকে মুখ দিয়ে নয় নিজের কর্ম দিয়ে সৎ কাজের দিকে আহ্বান জানাও।

 আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) এ সম্পর্কে বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি নিজে করি না এমন কোন কাজ করতে তোমাদেরকে উৎসাহ দেই না, আর আমি এমন কাজে তোমাদেরকে বাধা দেই যা থেকে আমি নিজে বিরত থাকি।” পবিত্র কোরআনের সূরা জুমার ৫ নম্বর আয়াতে আমলবিহীন জ্ঞানী ব্যক্তিকে গাধার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে কেবল বইয়ের বোঝা বহন করে আর অন্যরা ঐসব বই থেকে উপকৃত হয় অথচ নিজে ভার বহন ছাড়া তা থেকে লাভবান হয় না।
এই সূরার ৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ (45

“তোমরা ধৈর্য্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। আর নিশ্চয়ই এ কাজ বিনয়ী ও খোদাভীরু ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন।” (২:৪৫)

মানুষের ভেতরের কামনা-বাসনা ও বাইরের সমস্যার মোকাবেলায় মানব জীবনের সর্বোত্তম সাথী হলো দৃঢ়তা ও অবিচল থাকা। এই অবিচলতা তার মধ্যে জোগায় অফুরন্ত শক্তি। আর এই শক্তির বলে সে বিনীতভাবে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পন ও তাঁরই এবাদত করতে পারে। এই আয়াতে যে ধৈর্য্যের কথা বলা হয়েছে কিছু হাদীসে তাকে ” রোজা ” বলে অভিহিত করা হয়েছে। তবে রোজা কেবল ধৈর্য্য এবং সংযমের একটি রূপ। এ ছাড়াও ধৈর্য্যের পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। তাই রাসূলে খোদা (সাঃ) বলেছেন,”ধৈর্য্য বা সবর তিন ধরনের। একটি হলো বিপদ-আপদের সময় ধৈর্য্য, আরেকটি হলো পাপ কাজের ব্যাপারে ধৈর্য্য অবলম্বন এবং তৃতীয় হলো, আল্লাহর নির্দেশ ও এবাদত পালনের ক্ষেত্রে ধৈর্য্য।” নবী বংশের সদস্য ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) বলেছেন, “যখন দুনিয়ার কোন দুঃখে তুমি আক্রান্ত হবে তখন অজু করে মসজিদে চলে যাবে। সেখানে নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। কারণ আল্লাহপাক নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন।” যাদের অন্তর পবিত্র তারা নামাজকে সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করে, কিন্তু যারা অহঙ্কারী তারা নামাজকে ভারী বোঝা বলে মনে করে। তারা নামাজের দিকে মনোযোগী হওয়ার পরিবর্তে নামাজ থেকে পালিয়ে বেড়ায়।

এরপর ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو رَبِّهِمْ وَأَنَّهُمْ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (46

“বিনীত তারাই যারা বিশ্বাস করে যে তাদের প্রতিপালকের সাথে অবশ্যই তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে এবং তাঁরই দিকে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।” (২:৪৬)

পরকাল ও আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার বিশ্বাস মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলে বিনয়, খোদাভীরুতা ও দায়িত্ব অনুভূতি। এই বিশ্বাস তার জীবনকে পরিণত করে একটি আদালতে যেখানে তাকে সব কাজের জবাবদিহিতা করতে হবে। আল্লাহর সাথে মানুষের সাক্ষাতের যে কথাটি এ আয়াতে বলা হয়েছে, তার অর্থ দৈহিক সাক্ষাত নয়। কারণ আল্লাহ পাকের কোন আকৃতি নেই যে মানুষ পরকালে তাকে চোখে দেখতে পাবে। বরং আল্লাহর সাথে মানুষের সাক্ষাতের অর্থ হলো, তার পুরস্কার ও শাস্তি দানের মধ্য দিয়ে তার শক্তি অবলোকন করা। ওই সময় মানুষ হৃদয় ও অন্তরে আল্লাহপাকের দর্শন লাভ করবে, যেন আল্লাহকে সে সরাসরি অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে পাচ্ছে এবং দর্শন সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা সংশয় নেই।
হযরত আলী (আঃ)-এর একজন সহচর একবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আল্লাহকে দেখেছেন? হযরত আলী জবাবে বললেন, যে আল্লাহকে আমি দেখি না কিভাবে আমি তার এবাদত করবো? এর পর ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, চর্ম চক্ষুতে তাকে দেখা যায় না ঠিকই, তবে ঈমানের নূরে আলোকিত অন্তর তাকে উপলদ্ধি করতে পারে।

এরপর এই সূরার ৪৭নং আয়াতে বলা হয়েছে-
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَنِّي فَضَّلْتُكُمْ عَلَى الْعَالَمِينَ (47

“হে বনী ইসরাইল, আমার সেই নেয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আমি তোমাদেরকে দান করেছি। আর আমিই তো তোমাদেরকে বিশ্বে সবার ওপর উচ্চমর্যাদা দান করেছি।” (২:৪৭)

ইহুদী জাতির প্রতি আল্লাহর অন্যতম দয়া ছিল তারা ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়ে মিশরের শাসন ক্ষমতা লাভ করে এবং অসংখ্য বস্তুগত সুখ-সম্পদ আল্লাহ তাদেরকে দান করেন। এ আয়াতে তৎকালীন যুগে অন্যান্য জাতির তুলনায় বনী ইসরাইল জাতির শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে তারা যাতে আল্লাহর মহা নেয়ামতের শোকর আদায় করে। অন্যান্য জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্বের এ মর্যাদা হযরত মূসা (আঃ) এর নেতৃত্বের ফলে অর্জিত হয়। তাই নবী ইসরাইল জাতিকে আল্লাহ তা’লা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের আহ্বান জানিয়েছেন।

সূরা বাকারাহ’র ৪৪,৪৫,৪৬,৪৭ নম্বর আয়াতের প্রধান কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে।
এক. মুখে নয় বরং কর্মের মাধ্যমে সৎকাজের প্রতি অন্যদেরকে আহ্বান জানাতে হবে অর্থাৎ অন্যদের বলার আগে নিজেকে তা আমল করতে হবে।
দুই. সমস্যার ওপর জয়ী হবার জন্য দু’টি বিষয়ের প্রয়োজন। একটি অভ্যন্তরীণ শক্তি, আর তা হলো ধৈর্য্য ও অবিচলতা। অপর বিষয়টি বাহ্যিক শক্তি, আর তা হলো নামাজ ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক।
তিন. পরকালের প্রতি গভীর বিশ্বাসতো বটেই এমনকি এর অস্তিত্বের ব্যাপারে ধারণাও মানুষকে যেকোন অন্যায় থেকে বিরত রাখতে পারে।
চার. মানুষ আল্লাহর নবীদের নেতৃত্বের ফলে শুধু পরকালে বেহেশতই লাভ করে না বরং দুনিয়াতেও বস্তুগত সুখ-সম্পদ লাভ করে। তাদের নেতৃত্বে মানুষ পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে।
সূরা বাকারাহ’র ৪৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
وَاتَّقُوا يَوْمًا لَا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ (48

“আর সেদিনের ভয় কর, যখন কেউ কারও সামান্য উপকারে আসবে না এবং তার পক্ষে কোন সুপারিশও কবুল হবে না;কারও কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও নেয়া হবে না এবং তারা কোন রকম সাহায্যও পাবে না।” (২:৪৮)
এই আয়াতে পরকাল সম্পর্কে মানুষের চার ধরনের ভুল ধারণা তুলে ধরে সেগুলোর জবাব দেয়া হয়েছে। ইহুদীরা মনে করত তাদের পূর্বপুরুষেরা তাদেরকে পরকালের আজাব থেকে রক্ষা করতে পারবে। অথবা তাদের ধর্মীয় নেতারা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। কিংবা তাদের বন্ধুরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারবে। ইহুদীদের মধ্যে অনেকে আবার ভাবতো ক্ষতিপূরণ দেয়ার মাধ্যমে তারা পরকালের শাস্তি থেকে রক্ষা পাবে। পবিত্র কোরআন তাদের এসব ভুল ধারণার জবাবে বলেছে,ওই দিন কেউ কাউকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। কেয়ামতের দিন সবাই ব্যস্ত নিজের মুক্তি চিন্তায়। তাই তোমরা শুধু তোমাদের ঈমান ও সৎকাজের ওপর আস্থা রেখ। অবশ্য আল্লাহ তার অফুরন্ত দয়া ও রহমতের কারণে সৎ পথে ফিরে আসার পথ বন্ধ রাখেননি। দুনিয়াতে তওবা আর পরকালে সুপারিশের পথ খুলে দিয়ে আল্লাহ গুনাহগারদেরকে ক্ষমা লাভের আশা দিয়েছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো সুপারিশের কিছু শর্ত আছে। ওইসব শর্তের ফলে মানুষের মধ্যে পাপকাজের সাহস থাকে না এবং সে পুনরায় অপরাধ করা থেকে দূরে থাকে। তাই এ আয়াতে নিঃশর্ত সুপারিশের যে ধারণা ইহুদীদের মধ্যে ছিল তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আর খ্রিস্টানদের বিশ্বাস হচ্ছে হযরত ঈসা মাসিহ (আ) তাঁর অনুসারীদের পাপ মার্জনার জন্য নিজের জীবনকেই উৎসর্গ করেছেন। কোরআন এই ধারণাও বাতিল করে দিয়েছে।

এরপর ৪৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ نَجَّيْنَاكُمْ مِنْ آَلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ يُذَبِّحُونَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ وَفِي ذَلِكُمْ بَلَاءٌ مِنْ رَبِّكُمْ عَظِيمٌ (49)

“হে বনী ইসরাইল,তোমরা ওই সময়ের কথা স্মরণ করো, যখন আমি ফেরাউনী সম্প্রদায় থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলাম যারা তোমাদেরকে অত্যন্ত মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিত। তারা তোমাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করতো এবং নারীদেরকে দাসী হিসাবে ব্যবহার করার জন্য জীবিত রাখত। এতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ছিল এক মহা পরীক্ষা।” (২:৪৯)

ফেরাউন তার শাসন ক্ষমতা রক্ষার জন্য বিভিন্ন অজুহাতে বনী ইসরাইল জাতির তরুণ ও পুরুষদেরকে হত্যা করতো। আর ওই গোত্রের মহিলাদেরকে ব্যবহার করতো ক্রীতদাসীর মত। এভাবে ফেরাউন ও তার দলবল বনী ইসরাইল জাতিকে দুর্বল করে রেখেছিল। কোরআনের দৃষ্টিতে ওই দুঃখ-দুর্দশা এবং এই মুক্তি ও শান্তি, দু’টিই মানুষের জন্য পরীক্ষা। মানুষের প্রকৃত অবস্থা যাতে উন্মোচিত হয় এবং সে পূর্ণতায় পৌঁছে, সেজন্যে আল্লাহ পরীক্ষার ব্যবস্থা রেখেছেন।

এরপর ৫০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ فَرَقْنَا بِكُمُ الْبَحْرَ فَأَنْجَيْنَاكُمْ وَأَغْرَقْنَا آَلَ فِرْعَوْنَ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ (50

“হে বনী ইসরাইল,তোমরা ওই সময়ের কথা স্মরণ কর যখন তোমাদের জন্য সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলাম। তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলাম কিন্তু ফেরাউনী সম্প্রদায়কে নিমজ্জিত করেছিলাম। আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।” (২:৫০)

এই আয়াতে ফেরাউনের হাত থেকে বনী ইসরাইল জাতি কিভাবে রক্ষা পেয়েছিল,তা ইঙ্গিত করা হয়েছে। বনী ইসরাইল জাতির উদ্ধার পাওয়ার ঘটনাটি ছিল স্পষ্ট মুজেযা এবং আল্লাহর অলৌকিক কাজের দৃষ্টান্ত। আল্লাহর নির্দেশে হযরত মূসা (আঃ) তার জাতিকে মিশর থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু যখন হযরত মূসা ( আঃ) নীল নদের কাছাকাছি পৌঁছলেন তখন বুঝতে পারলেন যে, ফেরাউন ও তার বাহিনী তাদের পিছু ধাওয়া করছে। প্রচণ্ড উদ্বেগ আর আতঙ্কে বনী ইসরাইল গোত্র কাঁপতে থাকল। তখন আল্লাহর আদেশে হযরত মূসা (আঃ) তার হাতের লাঠিখানা দিয়ে সাগরে আঘাত করলেন। সাগরের পানি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং নীল নদ অতিক্রমের জন্য একটি পথ সৃষ্টি হলো। ফেরাউনের বাহিনী নীল নদের মধ্যেই তাদের পিছু ধাওয়া করল। কিন্তু যখন তারা মাঝামাঝি পৌঁছল তখন নীল নদের পানি একত্রিত হল এবং ফেরাউন বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেল। বনী ইসরাইল জাতি নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পেল। তারা আল্লাহর মুজেযা দেখলো ও স্বচক্ষে দুশমনদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রত্যক্ষ করলো। এর চেয়ে বড় দয়া ও নেয়ামত আর কি হতে পারে ?
এর পরের আয়াতে বনী ইসরাইলীদের পাপে লিপ্ত হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ (51

“(হে বনী ইসরাইল!) তোমরা স্মরণ কর যখন মূসার জন্য চল্লিশ রাত নির্ধারণ করেছিলাম। তার প্রস্থানের পর তোমরা গো-বৎসকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলে। আর এ কাজের মাধ্যমে তোমরা নিজের ওপরই জুলুম করেছিলে।” (২:৫১)

ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বনী ইসরাইল জাতি উদ্ধার পাবার পর ৪০ দিনের জন্য হযরত মূসা (আঃ)কে তুর পাহাড়ে যেতে হলো। সেখানে তিনি গেলেন তওরাতের বাণী গ্রহণের জন্য। কিন্তু এই অল্প সময়েই বনী ইসরাইল জাতির জন্য এক বড় পরীক্ষা আসল। সামেরী নামের এক অতি ধূর্ত ব্যক্তি মানুষের সোনা-দানা দিয়ে একটি গরুর বাছুরের প্রতিকৃতি তৈরী করল। মুর্তিটি থেকে গরুর ডাক ভেসে আসত এবং জনগণ অবাক হয়ে যেত। সামেরী তখন জনগণকে স্বর্ণের তৈরী অদ্ভুত ওই মুর্তির উপাসনার দিকে আহ্বান জানায়। বেশীরভাগ মানুষ সামেরীর দলে যোগ দিল এবং বাছুর পূজা শুরু করল। এ কাজের মাধ্যমে তারা নিজের ওপর যেমন জুলুম করলো তেমনি সুযোগ্য নেতা ও নবী হযরত মূসা (আঃ)এর ওপর জুলুম করলো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষার জন্য কি কষ্টই না সহ্য করেছিলেন। অবশ্য তুর পাহাড় থেকে হযরত মূসা ফিরে আসার পর জনগণ তাদের অন্যায় বুঝতে পারলো। আল্লাহ তখন তাদের এই শিরকের অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন।

সূরা বাকারাহ’র ৫২ নম্বর আয়াতে বিষয়টির বর্ণনা এ ভাবে দেয়া হয়েছে,
ثُمَّ عَفَوْنَا عَنْكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (52

“ওই বড় অপরাধের পরও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।” (২:৫২)

বান্দাদের প্রতি আল্লাহর অসংখ্য অনুগ্রহের একটি হলো অপরাধের জন্য সাথে সাথে তিনি শাস্তি দেন না বরং তিনি তাদেরকে অনুশোচনা ও তওবা করার সুযোগ দেন। এ ঘটনাতেও আল্লাহ বনী ইসরাইলের শিরকের মত বড় পাপ ক্ষমা করে দিলেন।

সূরা বাকারাহ’র ৪৮,৪৯,৫০,৫১ ও ৫২ নম্বর আয়াতের প্রধান শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
এক. দৈনন্দিন জীবনে পরকালের কথা মনে রাখতে হবে। ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা বা বন্ধুত্বের জন্য পাপ করা ঠিক নয়। কারণ ওই দিন কেউ কারো সাহায্য করতে পারবে না। কোন ধন-সম্পদ সুপারিশের কাজে আসবে না।
দুই. ফেরাউন সম্প্রদায়ের মত খোদাদ্রোহী শক্তির প্রথম লক্ষ্য হলো তরুণ সমাজ। বর্তমান পৃথিবীতেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো উশৃঙ্খলতা ও বিভিন্ন গর্হিত কাজে আসক্তি সৃষ্টি করে যুবসমাজকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পোশাক-আশাক সাজ-গোজ এ সব ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে তারা নারীকে তাদের কামনা বাসনার উপাদানে পরিণত করেছে।
বনী ইসরাইলীদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ পাক সূরা বাকারাহ’র ৫৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন,
وَإِذْ آَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَالْفُرْقَانَ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ (53)

“আর (স্মরণ কর) যখন আমি মূসাকে কিতাব এবং ফোরক্বান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বিধানকারী নির্দেশ) দান করেছি, যাতে তোমরা সরল পথ প্রাপ্ত হতে পার।” (২:৫৩)
ফোরক্বান শব্দের অর্থ হলো সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথককারী। আসমানী কেতাব ও নবীদের মোজেজার মাধ্যমে সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করা যায় বলেই আসমানী কিতাব ও নবীদের মোজেজাকে ফোরক্বান বলা হয়। মহান আল্লাহ মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্যে আসমানী কিতাব বা ঐশী গ্রন্থ এবং পথনির্দেশক হিসাবে নবীদেরকে পাঠিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি মানুষের কাছে মিথ্যাবাদী ও সত্যবাদীদেরকে চিহ্নিত করার জন্য পয়গম্বরদেরকে অলৌকিক নিদর্শন বা মোজেজা প্রদর্শনের ক্ষমতা দিয়েছেন।

এরপর ৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِنَّكُمْ ظَلَمْتُمْ أَنْفُسَكُمْ بِاتِّخَاذِكُمُ الْعِجْلَ فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ عِنْدَ بَارِئِكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (54)

“এবং যখন মূসা নিজ সম্প্রদায়কে বলেছিল,হে আমার সম্প্রদায়!তোমরা বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে ঘোর অনাচার করেছ, সুতরাং তোমরা তোমাদের স্রষ্টার দিকে ফিরে যাও এবং তোমরা নিজ নিজ প্রাণ উৎসর্গ কর। তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় বা কল্যাণকর। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়। ” (২:৫৪)

তুর পাহাড় থেকে ৪০ দিন পর হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরে এলেন, তখন তিনি দেখলেন তার জাতি গরুর বাছুরের পূজা করছে। এই আয়াতে মূসা (আঃ)এর সম্প্রদায়কে দু’টি বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে।
প্রথমত: তাদেরকে এটা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, তোমরা এ কাজ করে নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছ এবং বাছুরকে উপাস্য করে মানুষের মর্যাদা ও সম্মানকে পদদলিত করেছ।
দ্বিতীয়ত: তোমাদের অপরাধ কুফরীর চাইতেও বেশী। কারণ তোমরা সত্যকে উপলব্ধি করে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করার পর পুনরায় তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। এ ভাবে তোমরা কট্টর বা চরম অবিশ্বাসী হিসাবে মূর্তাদ হয়ে গেছ। আর মূর্তাদ হবার শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড বা প্রাণহরণ। মহান আল্লাহ দয়া ও করুণার আধার। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি মানবজাতির একজন আন্তরিক ও কল্যাণকামী অভিভাবক। তাই আল্লাহ মাঝে মধ্যে তিরস্কার ও কঠিন শাস্তির মাধ্যমে অন্যদেরকে এ শিক্ষা দিতে চান যে, ধর্ম নিয়ে কেউ যেন হেলা-ফেলা না করে এবং এভাবে আল্লাহ সমাজকে নোংরা ও অপছন্দনীয় কাজ থেকে মুক্ত করেন। মূর্তি পূজা ও গরুর বাছুর পূজা এমন কোন সাধারণ বা ছোট-খাট অপরাধ নয় যে শুধু মৌখিক ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমেই ক্ষমা লাভ করা যেতে পারে। বিশেষ করে কোন সম্প্রদায়ের এ ধরনের অপরাধকে সহজেই ক্ষমা করা যায় না, যারা আল্লাহর নিদর্শনগুলো দেখেছিল এবং আল্লাহর অনেক নেয়ামত বা অনুগ্রহ ভোগ করে তার প্রতি বিশ্বাস বা ঈমানও এনেছিল।

এরপর ৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً فَأَخَذَتْكُمُ الصَّاعِقَةُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ (55)

“হে বনী ইসরাইল! স্মরণ কর যখন তোমরা বলেছিলে,হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনও বিশ্বাস করবো না। তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে এবং তোমরা প্রত্যক্ষ করেছিলে।” (২:৫৫)
এখানে বনী ইসরাইল বা ইহুদী জাতির আরেকটি বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা একবার গরুর বাছুর পূজায় লিপ্ত হয়েছিল সে কথা এরআগে বলা হয়েছে। এরপর তারা হযরত মূসার কাছে এই দাবী তোলে যে আমরা আল্লাহকে নিজ চোখে সরাসরি দেখতে চাই। আর আল্লাহকে এভাবে দেখার পরই তোমার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করব এবং তোমার অনুগত হব। আল্লাহ তাদেরকে এটা বোঝাতে চাইলেন যে, মানুষ চোখ দিয়ে আল্লাহকে দেখা তো দূরের কথা তার অনেক সৃষ্টিকে দেখারও ক্ষমতা রাখে না। তাই আল্লাহর নূর বা আলোর এমন এক ঝলক তাদের ওপর এসে পড়লো যে,তারা বজ্রাহত হয়ে ভয়ে-আতঙ্কে মৃত্যুমুখে পতিত হলো।
এরপর ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘
ثُمَّ بَعَثْنَاكُمْ مِنْ بَعْدِ مَوْتِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (56)

“অতঃপর আমি মৃত্যুর পর তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করলাম যাতে তোমরা আমার অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।'”(২:৫৬)
বজ্রপাতের ঘটনায় বনী ইসরাইল বা ইহুদীগোত্রের ৭০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মারা গিয়েছিল। হযরত মূসা (আঃ)এর দোয়ার কারণে আল্লাহ তাদের পুনরায় জীবিত করেন, যাতে তারা ও পুরো ইহুদীগোত্র আল্লাহ ও তার শক্তিতে বিশ্বাস করে।
সূরা বাকারাহ’র ৫৩,৫৪,৫৫ ও ৫৬ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
এক. খোদা নয়,পাপীরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করে। মানুষের প্রকৃত সত্ত্বা তার দেহ নয় বরং আত্মা। আর পাপ বা গোনাহ মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে এবং আত্মাকে রোগাক্রান্ত করে। ফলে আত্মার মৃত্যু ঘটে। আর তখন মানুষের মধ্যে পাশবিক কাঠামো ছাড়া আর কিছুই বাকী থাকে না।
দুই. প্রত্যেক গোনাহ বা পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা বা তওবা হতে হবে পাপের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়ে গরুর বাছুরের উপাসনার পাপ শুধু কান্না ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে মোচন হতে পারে না। মৃত্যুদণ্ড গ্রহণের মাধ্যমেই এই পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে হবে।
তিন. অনেকেই বলে থাকেন যে আল্লাহকে নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তারা হয় অজ্ঞতা অথবা একগুঁয়েমীর কারণেই এ ধরনের কথা বলেন। কারণ আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। অবশ্য আল্লাহর শক্তি, ক্ষমতা ও মহত্বকে মানুষ নিজেদের মধ্যে ও সমগ্র সৃষ্টিজগতে দেখতে পারে।
চার. মৃতদেরকে জীবিত করা অসম্ভব কোন ব্যাপার নয়। মহান আল্লাহ এই পৃথিবীতেই অনেক মৃত মানুষকে জীবিত করেছেন। যেমন বজ্রপাতের ঘটনায় যে ৭০ জন ইহুদী নেতা মারা গিয়েছিল, হযরত মূসা (আঃ)-এর দোয়ায় আল্লাহ তাদেরকে পুনরায় জীবিত করেছিলেন।
সূরা বাকারাহ’র ৫৭ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন-
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (57)

“(হে বনী ইসরাইল!) আমি তোমাদের ওপর মেঘ দ্বারা ছায়া দান করেছিলাম এবং তোমাদের জন্য মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করেছিলাম। আর বলেছিলাম তোমাদের যে জীবিকা দান করলাম সেই পবিত্র বস্তু হতে খাও। তারা (আমার নির্দেশ অমান্য করে) আমার কোন অনিষ্ট করেনি বরং নিজেদেরই অনিষ্ট করেছিল।” (২:৫৭)
মহান আল্লাহ ফেরাউনের কবল থেকে বনী ইসরাইলকে রক্ষা করার পর তাদেরকে ফিলিস্তিনে যাবার নিদের্শ দেন। কিন্তু সেখানে অত্যাচারীদের শাসন ব্যবস্থা বিরাজ করছে এই অজুহাত দেখিয়ে ইহুদীরা সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকে। ফলে আল্লাহর ক্রোধ তাদেরকে ঘিরে ফেলল। অর্থাৎ তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে এল এবং প্রায় ৪০ বছর ধরে তারা সিনাই উপত্যকায় ভবঘুরের মত ও অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াল। এই দীর্ঘ সময়ে অবশ্য তাদের অনেকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হলো এবং মহান আল্লাহ পুনরায় তাদের ওপর দয়া করলেন। আর ওই দয়া ও অনুগ্রহের কথাই এ আয়াতে বলা হয়েছে। ওই তপ্ত ও শুষ্ক মরুভূমির ওপর ছায়াদান ছাড়াও আল্লাহ তাদেরকে সেখানে দু’ধরনের খাবার দিচ্ছিলেন। প্রথম ধরনের খাবার ছিল মধু জাতীয় এক ধরনের খাবার যা গাছের রস থেকে তৈরি হতো। এ খাবারকে বলা হতো মান্না। আর সালওয়া অর্থাৎ দ্বিতীয় ধরনের খাবার ছিল কবুতর জাতীয় এক ধরনের পাখি।
এরপরের আয়াতে অর্থাৎ ৫৮নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قُلْنَا ادْخُلُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ فَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ رَغَدًا وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا وَقُولُوا حِطَّةٌ نَغْفِرْ لَكُمْ خَطَايَاكُمْ وَسَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ (58

“স্মরণ কর যখন তোমাদের বলেছিলাম এই শহর অর্থাৎ বায়তুল মোকাদ্দাসে প্রবেশ কর এবং সেখান থেকে যা ইচ্ছে স্বাচ্ছন্দে আহার কর। দরজার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করার সময় নত শিরে প্রবেশ কর এবং বল আমরা আমাদের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাই। তাহলে আমি তোমাদের ক্ষমা করব এবং অচিরেই ভালো লোকদেরকে অতিরিক্ত দান করব।” (২:৫৮)
ইহুদীরা সিনাই উপত্যকায় ৪০ বছর ধরে ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়ায়। এরপর তাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আল্লাহ তা’লা তাদেরকে বায়তুল মোকাদ্দাস শহরে প্রবেশের নির্দেশ দিলেন এবং ক্ষমা প্রার্থনার জন্য ‘হেত্বাতুন’ শব্দটি বার বার উচ্চারণ করতে বললেন। এই শব্দের অর্থ হলো, আমাদের পাপ বা গোনাহগুলো মুছে ফেল ও আমাদেরকে ক্ষমা কর। এই আয়াত থেকে এটাও বোঝা গেল যে, পবিত্র স্থানগুলোতে প্রবেশের সময় বিশেষ সম্মান বা ভক্তি প্রদর্শন জরুরী। আর প্রার্থনা এবং ক্ষমা প্রার্থনার বাক্য ও রীতিও আল্লাহর কাছ থেকে শিখতে হবে। পরবর্তী আয়াতে ইহুদীদের পক্ষ থেকে কুৎসিত পন্থায় আল্লাহর আদেশ অমান্যের কথা বলা হয়েছে।

সুরা বাকারাহ’র ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
فَبَدَّلَ الَّذِينَ ظَلَمُوا قَوْلًا غَيْرَ الَّذِي قِيلَ لَهُمْ فَأَنْزَلْنَا عَلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ (59)

“কিন্তু যারা অন্যায় করেছিল, তারা তাদের যা বলা হয়েছিল, তার পরিবর্তে অন্য কথা বলল। তাই অনাচারীদের প্রতি আমি আকাশ হতে শাস্তি প্রেরণ করলাম যেহেতু তারা সত্য ত্যাগ করেছিল।” (২:৫৯)
অপরাধী ইহুদীদের অনেকে বিদ্রুপের ছলে হেত্বাতু অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা ভুল করেছি বা ক্ষমা করে দাও” বলার পরিবর্তে হেনত্বাতু শব্দটি উচ্চারণ করেছিল, যার অর্থ হলো গম। আল্লাহর নির্দেশকে এভাবে খেলাচ্ছলে গ্রহণ করায় তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসে এবং তাদের মধ্যে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। আয়াতে এটা স্পষ্ট যে, শুধু আদেশ অমান্যকারী ওপরই এই রোগ বা শাস্তি নেমে এসেছিল, সবার ওপর নয়। এই আয়াত থেকে এটা বোঝা যায়, যে সমাজের মানুষ সত্য থেকে পলায়নের চেষ্টা করে বা সত্যকে অমান্য করে কিংবা এ ব্যাপারে ঔদ্ধত্য দেখায়, সেই সমাজের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

এরপর ৬০নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذِ اسْتَسْقَى مُوسَى لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَانْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ كُلُوا وَاشْرَبُوا مِنْ رِزْقِ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ (60

“যখন মূসা নিজ সম্প্রদায়ের জন্য পানি প্রার্থনা করল। আমি বললাম, তোমার লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত কর। ফলে তা থেকে ১২টি ঝর্ণা প্রবাহিত হলো। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ ঘাট অর্থাৎ পানস্থান জেনে নিল। তাদেরকে বললাম, আল্লাহর জীবিকা থেকে খাও ও পান কর এবং পৃথিবীতে শান্তি ভঙ্গ করে বেড়িও না।” (২:৬০)
যদিও হযরত মূসা (আঃ) বনী ইসরাইলের কাছে প্রেরিত নবী বা পয়গম্বর ছিলেন এবং তার মূল দায়িত্ব ছিল আল্লাহর বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঐশী পথ-প্রদর্শকরা মানুষের পার্থিব কল্যাণ ও পার্থিব সমস্যা নিয়েও চিন্তা করেন। তাই হযরত মূসা (আঃ) তার জাতির জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-এর দোয়া কবুল করেন এবং অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে তাদেরকে পানি দান করেন। এজন্যে তিনি হযরত মূসা (আঃ)কে তার সেই লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করতে বলেন,যে লাঠির আঘাতে তিনি নীল দরিয়ায় শুকনো পথ সৃষ্টি করেছিলেন। এভাবে আল্লাহ তাদের এটাও বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তার নবী যেকোন কাজ করতে সক্ষম। বনী ইসরাইল বা ইসরাইলের বংশধরদের মধ্যে ১২টি গোত্র বা গোষ্ঠী ছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের জন্য ১২টি ঝর্ণা বা প্রস্রবন সৃষ্টি হলো, যাতে প্রত্যেক গোত্র আলাদাভাবে পানি পেতে পারে এবং পানির সংকট দেখা না দেয়। এভাবে আল্লাহ একদিকে মান্না ও সালওয়া খাবার পাঠিয়ে এবং অন্যদিকে যথেষ্ট পানির ব্যবস্থা করে ইহুদী জাতির কল্যাণের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন যাতে তারা পাপাচার, নৈরাজ্য ও হঠকারিতা থেকে দূরে থাকতে পারে।
সূরা বাকারাহ’র ৫৭, ৫৮, ৫৯, ৬০ নম্বর আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
এক. আল্লাহ মানুষের জীবিকা ও খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। তাই বলে পশুর মত যে কোন পন্থায় পেট ভরানোর চিন্তাতেই ব্যস্ত থাকা উচিত নয়। তাই মানুষ হিসাবে আমাদেরকে হালাল রিযিকের সন্ধান করতে হবে। যেমনটি সূরা বাকারাহ’র ৫৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-‘তোমাদেরকে যে জীবিকা দান করলাম সেই পবিত্র বস্তু হতে খাও।’

দুই. আল্লাহ ক্ষমাশীল। কিন্তু তওবা বা ক্ষমা প্রার্থনা হতে হবে আন্তরিকভাবে। অন্তর থেকে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে মৌখিকভাবেও ক্ষমা স্বীকার করতে হবে। যেমন সূরা বাকারাহ’র ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-নত শিরে প্রবেশ কর এবং বল আমরা ক্ষমা চাই।
তিন. আল্লাহর ইবাদত বা নির্দেশ যথাযথভাবে বা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পালন করতে হবে। তা না হলে তা পূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না বরং তা হবে আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অবমাননা ও ঐদ্ধত্য বা হঠকারিতা প্রকাশ।
সূরা বাকারাহ’র ৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نَصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَا سَأَلْتُمْ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآَيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (61)

“(হে বনী ইসরাইল) যখন তোমরা বলেছিলে, হে মূসা আমরা একই রকম খাদ্যে কখনও ধৈর্য্য ধারণ করতে পারবো না। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর,তিনি যেন ভূমিজাত দ্রব্য শাক-সব্জী,কাঁকুড়, রসুন বা গম,মসুর ও পিয়াঁজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন। মূসা বললেন, তোমরা কি উৎকৃষ্ট জিনিসকে নিকৃষ্ট জিনিসের সাথে বদল করতে চাও? তাহলে এই উপত্যকা থেকে বের হয়ে অন্য কোন শহরে যাও। তোমরা যা চাও তা সেখানে আছে। তারা লাঞ্ছনা ও দরিদ্রগ্রস্ত হলো এবং তারা অল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো, এটা এ জন্যে যে তারা আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শনকে অস্বীকার করতো এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের জন্যই তাদের এ পরিণতি হয়েছিল। ” (২:৬১)
মহান আল্লাহ শুষ্ক মরুভূমিতে বনি ইসরাইল বংশের জন্য পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও ইহুদীরা একদিকে অকৃতজ্ঞ এবং অন্যদিকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রত্যাশী ও স্বার্থপর ছিল বলে হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আরো বেশী খাবারের জন্য দাবি করল। মূসা (আঃ) তাদেরকে জবাবে বললেন, প্রথমত: তোমরা উত্তম স্বর্গীয় খাদ্যের পরিবর্তে নিকৃষ্ট খাদ্য চাচ্ছো। দ্বিতীয়ত: এ ধরনের খাবার পেতে হলে তোমাদেরকে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে এবং এমন এক শহরে যেতে হবে যেখানে তোমরা ওইসব খাবার পেতে সক্ষম হবে। তোমরা যুদ্ধ ও জেহাদের জন্য প্রস্তুত নও অথচ সমস্ত নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে চাও। তোমাদের এ ধরনের ভোগবাদী বা খাই-খাই মনোভাব তোমাদেরকে লাঞ্ছনা ও দূর্দশার মধ্যে ফেলেছে এবং তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসবে। তোমরা এ ধরনের অন্যায় দাবি জানিয়ে আল্লাহর নিদর্শন ও ক্ষমতাকে উপহাস করেছ। এমনকি তোমরা আল্লাহর নবীগণকে বৈষয়িক ও পার্থিব স্বার্থ অর্জনের পথে বাধা দেয়ার জন্য হত্যা করেছ।
এই আয়াত থেকে এটাই বোঝা যায় যে, স্বার্থপরতা ও ভোগ-লিপ্সার পরিণতি হল ধ্বংস। যে কোন ধরনের সুবিধাবাদের পরিণাম হলো অমর্যাদা ও লাঞ্ছনা। তাই মানুষকে এ অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হবে।
এরপর ৬২নং আয়াতে বলা হয়েছে-
إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (62)

“যারা ঈমান এনেছে, ইহুদী, খ্রিস্টান ও সাবেঈনদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার আছে ও তাদের জন্য কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।” (২:৬২)
যে কোন ঐশী ধর্মে পারলৌকিক পুরস্কারের শর্ত হিসাবে বিশ্বাস ও সৎকর্মের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, পুনরুত্থান বা বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহর নির্দেশাবলী মেনে চলার মাধ্যমে ঐশী পুরস্কার পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদী ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে কোন বৈষম্য করা হয়নি। অবশ্য পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। সূরা আল ইমরানের ৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মের অনুসরণ করলে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। তাই যারা নিজেদের যুগের নবীর প্রতি এবং তাদের ওপর অবতীর্ণ ঐশী গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পাশাপাশি ওই গ্রন্থের বিধান অনুযায়ী নিজেদের দায়িত্ব পালন ও সৎকর্ম করেছে, শুধুমাত্র তারাই ঐশী পুরস্কার লাভ করবে। কিন্তু ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের সাথে সাথে অন্যকোন ধর্মেরই আর গ্রহণযোগ্যতা নেই। সূরা বাকারাহ’র ৬২ নম্বর আয়াতে যেসব ঐশী ধর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেসবের মধ্যে একটি হলো সাবেঈনদের ধর্ম। এরা সম্ভবত: হযরত নূহ নবী অথবা ইব্রাহীম (আঃ) বা ইয়াহিয়া (আঃ)-এর অনুসারী ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভুল চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটে। সাবেঈনরা গণকবিদ্যা বা জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল। এই আয়াত থেকে এটাও স্পষ্ট যে, সব ঐশী ধর্ম একত্ববাদ ও পুনরুত্থানের ব্যাপারে একমত এবং বিশ্বাস ও সৎকাজকেই মুক্তির উপায় বলে মনে করে। অযৌক্তিক বিশ্বাস ও আকাঙ্খা এই সব ধর্ম অনুযায়ী মুক্তির উপায় নয়।
সূরা বাকারাহ’র ৬৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آَتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (63)

“আর আমি যখন তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পর্বতকে তোমাদের মাথার ওপর তুলে ধরেছিলাম এই বলে যে,তোমাদিগকে যে কিতাব (তওরাত) দেয়া হয়েছে তা দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং এতে যা কিছু রয়েছে তা মনে রেখ যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পার।” (২:৬৩)
হযরত মূসা (আঃ)কে যখন তাওরাত গ্রন্থ দেয়া হয়, তখন আল্লাহ বনী ইসরাইলীদের কাছ থেকে এ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে,ওই গ্রন্থের নির্দেশ তারা মান্য করবে এবং যে কোন ধরনের অবহেলা থেকে বিরত থাকবে, যাতে তারা খোদা ভীরু হতে পারে। খোদার সাথে অঙ্গীকারের পর তারা কি করেছিল তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে পরবর্তী আয়াতে। ওই আয়াতে বলা হয়েছে,
ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَكُنْتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ (64

“এরপরও তোমরা বিমুখ হলে,সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ ও অনুকম্পা তোমাদের প্রতি না থাকলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।” (২:৬৪)
বনি ইসরাইলীরা আল্লাহর সাথে ওয়াদাবদ্ধ হবার পরও ঐশী নির্দেশকে অমান্য করে। কিন্তু দয়াময় আল্লাহ দয়া করে পুনরায় তাদেরকে শাস্তি দান থেকে বিরত থাকেন।
এ আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
এক. অতিরিক্ত পাবার ইচ্ছে বা লোভ ও স্বার্থপরতা মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে ধ্বংস করে। স্বার্থপরতা ও অতিরিক্ত পাবার ইচ্ছা মানুষের জন্য লাঞ্ছনা ও দূর্গতি ডেকে আনে। এর ফলে মানুষ বৈষয়িক স্বার্থ অর্জনের জন্য আল্লাহর বিধানকে পদদলিত করতে প্রস্তুত হয়।
দুই. পাপ বা অপরাধ এবং অবাধ্যতা মানুষকে পর্যায়ক্রমে কুফরী বা অবিশ্বাসের দিকে টেনে নেয় এবং সত্যকে অস্বীকার করার মনোভাব তার মধ্যে সৃষ্টি হতে থাকে
তিন. প্রকৃত শান্তি শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি এবং পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাসের মধ্যেই রয়েছে। এই বিশ্বাসের জন্য তাদেরকে উজ্জ্বল ভবিষ্যত বা সৌভাগ্যের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।
সূরা বাকারাহ’র ৬৫ ও ৬৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِينَ اعْتَدَوْا مِنْكُمْ فِي السَّبْتِ فَقُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ (65) فَجَعَلْنَاهَا نَكَالًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهَا وَمَا خَلْفَهَا وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ (66)

“তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের সীমা লঙ্ঘন করেছিল,তাদের (পরিণতি) তোমরা নিশ্চিতভাবে জানো। আমি তাদের বলেছিলাম-অধম বানর হয়ে যাও। আমি এটা তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীগণের জন্য দৃষ্টান্ত এবং সাবধানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ করেছি।” (২:৬৫-৬৬)
এখানে বনি ইসরাইলীদের আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি হল- মহান আল্লাহ তাদের জন্য শনিবারকে বিশ্রামের দিন ঘোষণা করেছিলেন। অর্থাৎ শনিবারে কাজ-কর্ম নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী একদল ইহুদী এক ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে শনিবারে মাছ ধরতো। তারা সাগরের প্রান্তে এক ধরনের ফাঁদ বা গর্ত তৈরি করতো এবং ওইসব গর্তে মাছ প্রবেশ করার পর গর্তের মুখ বা প্রবেশপথ বন্ধ করে দিত এবং পরের দিন অর্থাৎ রোববারে ওইসব মাছ ধরতো। আর এভাবে তারা আল্লাহর নির্দেশকে অবজ্ঞা করেছিল। আল্লাহও তার বিধানকে অমান্য করা ও ঐশি বিধি-বিধানকে অবজ্ঞা করার শাস্তি হিসাবে তাদের চেহারাকে বিকৃত করে দেন এবং তাদেরকে বানরে রূপান্তরিত করেন যাতে অন্যরাও এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। যদিও পশুরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত নয়, কিন্তু মানুষকে পশুতে রূপান্তর করার মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে নিজের দরবার ও অনুগ্রহ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।
এরপর ৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ (67

“স্মরণ কর যখন মূসা আপন সম্প্রদায়কে বলেছিল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের একটি গরু জবাই করার আদেশ দিয়েছেন, তারা বলেছিল-তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছ? মূসা বলল, আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি,যাতে মূর্খদের অন্তর্ভূক্ত না হই।” (২:৬৭)
এখানে বনী ইসরাইলের গরুর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ কারণেই এই সূরার নাম বাকারাহ অর্থাৎ গরু রাখা হয়েছে। ৬৭ থেকে ৭৩তম আয়াতে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ঘটনাটি হলো, বনী ইসরাইলীদের মধ্যে নিহত এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেল। কিন্তু হত্যাকারী কে তা জানা গেল না। এ নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলো। প্রত্যেক গোত্রই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অন্যান্য গোত্রকে দায়ী করছিল। অবশেষে এ বিবাদের মীমাংসার জন্য বনী ইসরাইলের লোকেরা হযরত মূসা (আঃ)-এর শরণাপন্ন হলো। যেহেতু সাধারণ উপায়ে এ সমস্যার সামাধান করা সম্ভব ছিল না, তাই হযরত মূসা (আঃ) অলৌকিক পন্থায় এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন। তিনি বনী ইসরাইলীদের বললেন, আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, একটি গরু জবাই করতে হবে। এরপর জবাই করা গরুর এক টুকরো গোশত নিহত ব্যক্তির গায়ে স্পর্শ করলে সে জীবিত হয়ে হত্যাকারীর নাম বলে দেবে।” তারা এই নির্দেশ শুনে মূসা (আঃ)কে বলল, এ ধরনের পরামর্শ দিয়ে তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছো ? হযরত মূসা (আঃ) জবাবে বললেন, ঠাট্টা বিদ্রুপ করা অজ্ঞ লোকদের কাজ। আল্লাহর নবীরা কখনও এমনটি করেন না। যদি হত্যাকারীকে চিহ্নিত করতে চাও তবে নির্দেশিত এই কাজ করতে হবে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকটি হচ্ছে, যদি আল্লাহর নির্দেশ আমাদের রুচি ও জ্ঞান অনুযায়ী বোধগম্য না হয়, তাহলেও তাকে অবজ্ঞা করা আমাদের উচিত নয় এবং কখনোই এ ধরনের নির্দেশকে হালকা ও গুরুত্বহীন মনে করা যাবে না। আল্লাহ ইচ্ছে করলে, অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে হত্যাকারীর নাম বা পরিচয় মূসা (আঃ)কে বলে দিতে পারতেন,কিন্তু গরু জবাইয়ের নির্দেশের মাধ্যমে আল্লাহ ইহুদীদের মধ্য থেকে বাছুর বা গরুভক্তি বা গরু পূজার প্রচলন ও এ ধরনের মানসিকতা দূর করতে চেয়েছিলেন।
এরপর ৬৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنْ لَنَا مَا هِيَ قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ لَا فَارِضٌ وَلَا بِكْرٌ عَوَانٌ بَيْنَ ذَلِكَ فَافْعَلُوا مَا تُؤْمَرُونَ (68

“বনী ইসরাইলীরা মূসাকে বলেছিল,তুমি আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল যে, তা কি রকম গরু? মূসা বলল, তিনি অর্থাৎ আল্লাহ বলেছেন, সেই গরু বৃদ্ধও নয়, অল্প বয়স্ক বা শাবকও নয়-মধ্য বয়সী। অতএব তোমরা যেমন আদেশ পেলে তেমনই কর।” (২:৬৮)
যখন ইহুদীরা বুঝতে পারলো যে, গরু জবাই করার আদেশ সত্যি বা অবশ্য করণীয়, তখন তারা বিভিন্ন ধরনের টালবাহানা শুরু করল এবং জানতে চাইল কোন ধরনের গরু জবাই করতে হবে? সম্ভবত এ ধরনের প্রশ্ন প্রকৃত হত্যাকারীর পক্ষ থেকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়, যাতে এই অপরাধ বা কেলেঙ্কারীর হোতাকে জনগণ চিনতে না পারে। যদিও প্রশ্ন করা ভালো লক্ষণ এবং প্রশ্নের মাধ্যমে অনেক অস্পষ্টতা দূর হয়, কিন্তু ইহুদীরা এ ধরনের প্রশ্ন তুলে উপলদ্ধি বা বোঝার পরিবর্তে দায়িত্ব পালন না করার চেষ্টা করছিল। তাই তারা অভদ্রভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকে, যেমন তারা বলেছে, ‘হে মূসা! তোমার খোদার কাছে প্রার্থনা কর।’ ভাবটা এমন যে, মূসা (আঃ)এর খোদা ও তাদের খোদা যেন দুই ভিন্ন খোদা।

এরপর এই সূরার ৬৯ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-
قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنْ لَنَا مَا لَوْنُهَا قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ صَفْرَاءُ فَاقِعٌ لَوْنُهَا تَسُرُّ النَّاظِرِينَ (69

“তারা বলল- তুমি আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের গরুর রং কেমন তা বর্ণনা করেন। মুসা বললেন, তিনি ( আল্লাহ) বলেছেন, সেই গরুর বর্ণ গাঢ় হলুদ যা দর্শকদেরকে আনন্দ দেয়।” (২:৬৯)
পুনরায় যখন গরু জবাইয়ের নির্দেশ দেয়া হল, তখনও তারা ওই নির্দেশ পালনে অনিচ্ছুক ছিল। তাই তারা আরো প্রশ্ন করা শুরু করে এবং জানতে চায় যে, ওই গরুর রং কেমন হতে হবে? অথচ আল্লাহর প্রথম নির্দেশে গরুর কোন নির্দিষ্ট রঙের কথা উল্লেখ করা ছিল না। যদি রঙের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হত তবে আল্লাহ প্রথম নির্দেশেই তা উল্লেখ করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাদের অজুহাত সৃষ্টির পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য পরে নির্দিষ্ট রঙের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে তারা এটাও যেন বুঝতে পারে, যে গরুর জবাইয়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা যেন কুৎসিৎ ও অকেজো বা মূল্যহীন না হয়ে মধ্য বয়স্ক এবং চোখ জুড়ানো উজ্জ্বল রঙের হয়।
সূরা বাকারাহ’র ৬৫ নম্বর থেকে ৬৯ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
এক. আল্লাহর নির্দেশ মান্য করার ক্ষেত্রে প্রতারণা বা ধোঁকাবাজির আশ্রয় নেয়া যাবে না। ধর্মের শুধু বাহ্যিক দিক রক্ষা করে আমরা যেন খোদার বিধানের মূল বিষয়কে পরিবর্তন না করি। কারণ বাহ্যিক দিক নয় বরং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বা লক্ষ্যই হল খোদার বিধানের মূল দিক। তাই মর্মার্থ হতে দূরে থেকে ধর্মের চেহারাকে বিকৃত করা হলে মানবতার মূল চেহারা বা প্রকৃতি বা চরিত্রেও বিকৃতি দেখা দেবে। বনী ইসরাইলের মধ্যে যারা শনিবারে মাছ ধরতো তাদের মধ্যে এ বিকৃতি দেখা দেয়।
দুই. খোদায়ী শাস্তি শুধু পরকালের জন্যই নির্ধারিত নয়, অনেক সময় আল্লাহ কোন কোন অপরাধের জন্যে পৃথিবীতেই শাস্তি দিয়ে থাকেন, যাতে করে ওই যুগের মানুষ ও ভবিষ্যত প্রজন্ম তা থেকে শিক্ষা নেয়।
তিন. আল্লাহর বিধানকে আমরা যেন ঠাট্টা ও উপহাস না করি। বরং আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে যেসব নির্দেশ বা বিধান দিয়েছেন তা মানবসমাজের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যই দিয়েছেন।
সূরা বাকারাহ’র ৭০ ও ৭১ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنْ لَنَا مَا هِيَ إِنَّ الْبَقَرَ تَشَابَهَ عَلَيْنَا وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَمُهْتَدُونَ (70) قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ لَا ذَلُولٌ تُثِيرُ الْأَرْضَ وَلَا تَسْقِي الْحَرْثَ مُسَلَّمَةٌ لَا شِيَةَ فِيهَا قَالُوا الْآَنَ جِئْتَ بِالْحَقِّ فَذَبَحُوهَا وَمَا كَادُوا يَفْعَلُونَ (71)

“বনী ইসরাইল মূসাকে বললো, গরুটি কি ধরনের হতে হবে তা তোমার প্রতিপালককে আমাদের জন্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল। আমাদের কাছে গরুতো একই রকম। আর আল্লাহ চাইলে আমরা নিশ্চয়ই সঠিক পথ পাব। মূসা জবাবে বললেন, আল্লাহ বলছেন তা এমন এক গরু যা জমি চাষ ও ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহার করা হয়নি-সুস্থ ও নিখুঁত। তারা বললো, এখন তুমি ঠিক কথা বলেছ। এরপর তারা গরুটি জবাই করলো, যদিও তারা প্রায় এ কাজ বর্জনে উদ্যত হয়েছিল।” (২:৭০-৭১)
গত পর্বে আমরা বলেছিলাম, আল্লাহপাক হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার জন্য গরু জবাইয়ের নির্দেশ দেন। বনী ইসরাইল গোত্রের একাংশ নানা অজুহাত খাড়া করতে লাগল এবং উপহাস করে গরুর রং ও বয়স জিজ্ঞাসা করতে থাকে। এ আয়াতেও বনি ইসরাইল বা ইহুদীদের আনা একের পর এক অজুহাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহপাক গরুর রং ও বয়স বলে দেয়ার পরও তারা বললো, হে মূসা! ওই গরুকে চেনার জন্য আরো কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলো। হযরত মূসা যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে ওই গরুর আরো কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা দিল তখন বনি ইসরাইলীদের আর কোন অজুহাত থাকল না এবং তারা ওই গরুকে জবাই করলো। যদিও আল্লাহর নির্দেশ মানার কোন আগ্রহ তাদের ছিল না।
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের একগুঁয়েমি তাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়,যে সে নিজের ইচ্ছা ও মতকেই শুধু সঠিক বলে মনে করে। তাই দেখা যায় হযরত মূসা (আঃ)গরু সম্পর্কে এত বর্ণনা দেয়ার পরও বনী ইসরাইল ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে বলে, “এতক্ষণে তুমি সঠিক বলেছো। ”
এবারে সূরা বাকারাহ’র ৭২ ও ৭৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে,
وَإِذْ قَتَلْتُمْ نَفْسًا فَادَّارَأْتُمْ فِيهَا وَاللَّهُ مُخْرِجٌ مَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ (72) فَقُلْنَا اضْرِبُوهُ بِبَعْضِهَا كَذَلِكَ يُحْيِي اللَّهُ الْمَوْتَى وَيُرِيكُمْ آَيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (73)

“স্মরণ কর যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে এবং একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করছিলে। কিন্তু তোমরা যা গোপন রাখছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দেন। এরপর আমি বললাম, গরুর কোন একটি অংশ দিয়ে নিহত ব্যক্তিকে স্পর্শ কর। এভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং নিজের নিদর্শন তোমাদেরকে দেখিয়ে থাকেন। যাতে তোমরা উপলদ্ধি কর।” (২:৭২-৭৩)
এর আগের আয়াতগুলোয় বনী ইসরাইলের নানারকম অজুহাতের কথা বিস্তারিত বলা হয়েছে। এ দুই আয়াতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তোমরা হত্যা করেছিলে এবং হত্যাকারীর পরিচয় গোপন রেখেছিলে। কিন্তু আল্লাহ তার অসীম ক্ষমতার মাধ্যমে তোমাদের অন্যায় ফাঁস করে দিয়েছেন। তাই জেনে রাখ আল্লাহ অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করার ক্ষমতা রাখেন। মৃতকে জীবিত করার অসীম ক্ষমতা যে আল্লাহ রাখেন এ আয়াত তারই নিদর্শন। আল্লাহর এ ধরনের ক্ষমতা দেখে মানুষ যাতে পরকালের ব্যাপারে আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে এবং জেনে রাখে যে আল্লাহ ইচ্ছা করলে একটি মৃত দেহের ওপর আরেকটি মৃতের অংগের স্পর্শে জীবিত করতে পারেন।
এরপর ৭৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهَارُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَشَّقَّقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ الْمَاءُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (74

“অতঃপর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মত অথবা তদপেক্ষাও কঠিন। পাথরের মধ্যে এমনও আছে; যা থেকে ঝরণা প্রবাহিত হয়, এমনও আছে, যা বিদীর্ণ হয়,এরপর তা থেকে পানি নির্গত হয় এবং এমনও আছে, যা আল্লাহর ভয়ে (পাহাড় থেকে) খসে পড়তে থাকে! আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।” (২:৭৪)
সূরা বাকারাহ’র ৪৯ নম্বর আয়াত থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বনী ইসরাইলীদের প্রতি আল্লাহর বহু নেয়ামত ও মোজেযার কথা বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি, নীল নদ দু’ভাগে বিভক্ত হওয়া, বাছুর পূজার তওবা কবুল, ঐশী খাবার-দাবার লাভ, মেঘকে ছায়া হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আর সর্বশেষ ঘটনা হলো- অলৌকিক উপায়ে হত্যাকারীর পরিচয় উদ্ঘাটন। কিন্তু আল্লাহর অলৌকিক ক্ষমতার এতসব নিদর্শন ও মোজেযা দেখার পরও বনী ইসরাইল আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পন করেনি বরং আল্লাহর হুকুম এড়িয়ে যাবার জন্য নানারকম পাঁয়তারা করছিল। যাকে কিনা কোরআন ‘পাষাণ হৃদয়’ বিশেষণে আখ্যায়িত করেছে। মানুষ অনেক সময় এমন অধঃপতনের শিকার হয় যা তাকে জীব-জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্টে পরিণত করে কিংবা তাকে পাথরের চেয়ে কঠিন করে ফেলে। এ আয়াতে বলা হয়েছে- কঠিন পাথর অনেক সময় ফেটে তা থেকে পানি প্রবাহিত হয় কিংবা অন্তত: নীচের দিকে ধ্বসে পড়ে। কিন্তু কিছু মানুষের অন্তর পাথরের চেয়েও শক্ত। কোন ভালবাসা কিংবা প্রেমে তাদের অন্তর বিগলিত হওয়াতো দূরের কথা আল্লাহর ভয়েও তাদের হৃদয় কাঁপে না। তাই তারা মানুষের উপকারও করে না এবং আল্লাহর হুকুম-নির্দেশও মেনে চলে না।
সূরা বাকারাহ’র ৭০ থেকে ৭৪ নম্বর আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে-
এক. আল্লাহর নির্দেশ এড়ানোর জন্যে ছলচাতুরির আশ্রয় কিংবা একগুঁয়েমি করা ঠিক নয়। এ উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করাও অন্যায়। কারণ দেখা যায়, প্রশ্ন অনেক সময় জানার জন্যে নয় বরং দায়িত্ব এড়ানোর জন্য প্রশ্ন করা হয়ে থাকে।
দুই. আল্লাহর নির্দেশে যে পশু জবাই করা হবে তা নিখুঁত হওয়া দরকার। তাই হজ্বের সময় হাজীরা কোরবানীর ঈদের দিন ত্রুটিমুক্ত পশু জবাই করেন।
তিন. আমাদের প্রকাশ্য-গোপন সব কাজের ব্যাপারেই আল্লাহ পূর্ণ অবগত। তিনি চাইলে আমাদের ঐসব কাজ প্রকাশ করে আমাদের অপদস্ত করতে পারেন। তাই পাপ করা উচিত নয় কিংবা নিজের পাপ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।
চার. অনেক ক্ষেত্রে এ দুনিয়াতেই আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তার শক্তি প্রদর্শন করেন এবং আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেন কেয়ামত সম্পর্কে গভীর চিন্তা করতে।
সূরা বাকারাহ’র ৭৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (74

“(হে মুসলমানগণ!) তোমরা কি আশা কর যে,তারা (ইহুদীরা) তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? তাদের মধ্যে একদল ছিল,যারা আল্লাহর বাণী শ্রবণ করত; এরপর বুঝে-শুনে তা বিকৃত করত এবং তারা তা অবগত ছিল।”(২:৭৫)
ইসলাম আবির্ভাবের পর আশা করা হয়েছিল যে, ইহুদীরা অন্যদের আগে ইসলাম গ্রহণ করবে। কারণ তারা মুশরিকদের মত ছিল না বরং তাদের কাছে ছিল আসমানী কিতাব। তারা তাদের ওই গ্রন্থ থেকে ইসলামের নবীর বৈশিষ্ট্য জেনে গিয়েছিল। কিন্তু এরপরও তারা কার্যত মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাথে জোটবদ্ধ হয়। তাই এ আয়াতে আল্লাহ পাক মহানবী (সাঃ) ও মুসলমানদেরকে সহানুভূতি জানিয়ে বলেছেন যে, ইহুদীরা যদি ইসলাম গ্রহণ না করে তাহলে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এতে নিজেদের ঈমান ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া ঠিক নয়। ইহুদী সম্প্রদায় সহজেই ঐশি ধর্ম গ্রহণ করবে এমন আশা করা অনুচিত। কারণ এরা হলো তাদেরই বংশধর যারা হযরত মূসার সাথে তুর পাহাড়ে গিয়ে আল্লাহর বাণী শুনেছে এবং তার বিধান উপলব্ধি করতে পেরেছে। কিন্তু তারপরও তারা তা অবলীলায় বিকৃত করেছে এবং ঐশি ধর্মের বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত হয়েছে।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়-প্রত্যেক সম্প্রদায়ের পণ্ডিত ব্যক্তিরা সত্যকে বিকৃত করে গোটা জাতিকে ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ ধরনের পণ্ডিত ব্যক্তিরা সত্যকে জেনেও এমনভাবে তা তুলে ধরে যাতে জনগণ বিভ্রান্তিতে পড়ে।
এরপর ৭৬ ও ৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন-
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آَمَنُوا قَالُوا آَمَنَّا وَإِذَا خَلَا بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ قَالُوا أَتُحَدِّثُونَهُمْ بِمَا فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ لِيُحَاجُّوكُمْ بِهِ عِنْدَ رَبِّكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (76) أَوَلَا يَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ (77

“যখন তারা মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হয়,তখন বলে আমরা মুসলমান হয়েছি। আর যখন পরস্পরের সাথে নিভৃতে অবস্থান করে,তখন বলে, আল্লাহ তোমাদেরকে (ইসলামের নবীর বৈশিষ্ট সম্পর্কে ) যে ধারণা দিয়েছেন তা কি তাদেরকে (মুসলমানদেরকে) বলে দিয়েছ ? তাহলে যে তারা এ নিয়ে আল্লাহর সামনে (কেয়ামতের দিন) তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। তোমরা কি তা উপলব্ধি কর না?
তারা কি জানে না যে, যা তারা গোপন রাখে কিংবা প্রকাশ করে নিশ্চিতভাবে আল্লাহ তা জানেন?” (২:৭৬-৭৭)
ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক ইহুদী মুসলমানদেরকে দেখলে বলতো, তোমাদের পয়গম্বরের নিদর্শনগুলো আমাদের তাওরাত গ্রন্থের ভবিষ্যদ্বানীর সাথে মিলে যাওয়ায় আমরাও তোমাদের ধর্মের ওপর ঈমান আনব। কিন্তু যখন তারা অন্যান্য ইহুদীদের সাথে মিলিত হত, তখন তারা শেষ নবীর নিদর্শনগুলো মুসলমানদেরকে বলে দেয়ার জন্যে পরস্পরকে তিরস্কার করতো এবং তারা বলতো মুসলমানরা এ বিষয়কে কেয়ামতের সময় তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। ইহুদী পণ্ডিতরা সত্যকে বিকৃত করায় বর্তমানেও অনেক লোক ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মের অনুসরণ করছে।
এরপর ৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِيَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (78

“ইহুদীদের মধ্যে এমন অনেক অশিক্ষিত লোক আছে যারা আল্লাহর গ্রন্থকে কল্পনা বা মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া অন্য কিছু মনে করে না এবং শুধু নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং তারা অনুমান বা কল্পনা ছাড়া অন্য কিছু জানে না।” (২:৭৮)
এই আয়াতে বনী ইসরাইলের অন্য একটি দলের কথা বলা হয়েছে, যারা ছিল তাওরাত গ্রন্থ বিকৃতকারী পণ্ডিতদের বিপরীতে সাধারণ অশিক্ষিত ইহুদী। এরা তাওরাত গ্রন্থ সম্পর্কে কোন খবর রাখতো না এবং নিজেদের খেয়াল-খুশী মত জীবন যাপন করত। তারা মনে করতো, তাওরাত গ্রন্থে ইহুদী জাতিকে উন্নত জাতি বলে ধারণা দেয়া হয়েছে এবং তারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র। আর পরকালে শুধু মাত্র ইহুদীরাই মুক্তি বা পরিত্রাণ পাবে এবং তারা নরক বা জাহান্নামে যাবে না, যদি তাদেরকে শাস্তি দেয়াও হয় তবে তা কয়েক দিনের বেশী স্থায়ী হবে না। এ ধরনের ভুল ধারণা অন্যান্য ঐশী ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই জানতে হবে এইসব শুধুমাত্র অশিক্ষা ও ঐশী গ্রন্থ সম্পর্কে অজ্ঞতার ফল। কারণ কোন ঐশী ধর্মেই এ ধরনের অবাস্তব কথা বলা হয়নি।
এ সূরার ৭৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ (79

“সুতরাং তাদের জন্য আফসোস,যারা স্বহস্তে গ্রন্থ রচনা করে ও সামান্য মূল্য পাবার আশায় বলে যে, তা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে। আক্ষেপ, তাদের হাত যা রচনা করেছে এবং আক্ষেপ যা তারা উপার্জন করেছে।” (২:৭৯)
ইতিহাসে সব সময়ই অনেক পণ্ডিত ধর্মকে নিজেদের পার্থিব স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যবহার করেছে, এখনো অনেকে তা করছে। দোকানদার বা ব্যবসায়ীরা যেমন পণ্য বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে, তেমনি অনেক অর্থলোভী ধর্মের মুখোশ পরে ধর্মকে বিক্রি করে সম্পদশালী হচ্ছে। মানুষকে খুশী করার জন্য অথবা শাসকদের কাছ থেকে উঁচু মর্যাদা বা পদ পাবার জন্য কিংবা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য আল্লাহর বিধানের নামে অনেকে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়। পবিত্র কোরআন কঠোর ভাষায়-আক্ষেপ শব্দের পুনরাবৃত্তি করে এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
আজকের আলোচিত আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
এক. সব মানুষ বিশ্বাসী হবে বা ঈমান আনবে এমনটি আশা করা ভাল, কিন্তু এটাও সত্য যে,বহু মানুষ সত্যকে গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই তাদের অবিশ্বাস যেন আমাদের বিশ্বাসের মধ্যে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না করে সে দিকে সতর্ক থাকতে হবে।
দুই. মন গড়া ধর্ম তৈরি ও ধর্ম বিক্রি করা হলো দুর্নীতি পরায়ণ পণ্ডিতদের কাজ। তাই কোন ব্ক্তব্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সাবধান হতে হবে। এ ধরনের পণ্ডিতরা ধর্মের মুখোশ পরে থাকলেও জনগণকে সাবধান হতে হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা বাকারাহ’র ৮০ নম্বর আয়াতে বলেছেন-
وَقَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَعْدُودَةً قُلْ أَتَّخَذْتُمْ عِنْدَ اللَّهِ عَهْدًا فَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ عَهْدَهُ أَمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ (80)

“বনী ইসরাইল বললো : দোজখের আগুন আমাদেরকে অল্প কয়েক দিন ছাড়া কখনো স্পর্শ করবে না। হে নবী! আপনি তাদের বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে কোন অঙ্গীকার পেয়েছ যে, আল্লাহ তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করবেন না। কিংবা তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলছো যা তোমরা জানো না।” (২:৮০)
গত পর্বে বলা হয়েছে, সাধারণ ইহুদীদের অনেকেরই ঐশী কিতাব সম্পর্কে কোন জ্ঞান ছিল না, অথচ তারা অযথাই ভাবতো যে, ইহুদী জাতি বুঝি শ্রেষ্ঠ জাতি এবং আল্লাহর প্রিয়। তারা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে বলতো, ‘ইহুদীরা কোন গুনাহ করলেও আল্লাহ অন্যদের চেয়ে তাদেরকে কম শাস্তি দেবেন এবং শুধু অল্প কয়েক দিনের জন্যে তারা শাস্তি ভোগ করবে।’ এ আয়াত ইহুদীদের ওই অলীক ধারণাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে, এটা আল্লাহর প্রতি তোমাদের মিথ্যা অপবাদ। কারণ তিনি শাস্তি বা পুরস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর বান্দাদের ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য করেন না। প্রকৃতপক্ষে বংশ ও গোত্রের ভিত্তিতে কোন রকম মর্যাদার দাবি করা কোন যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু মাত্র তাকওয়া ও সৎকাজ মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি। পরকালেও আল্লাহ মানুষকে পুরস্কৃত বা সাজা দেবেন খোদাভীরুতা ও সৎ কাজের ভিত্তিতে।

এরপরের দুই আয়াত অর্থাৎ ৮১ ও ৮২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
بَلَى مَنْ كَسَبَ سَيِّئَةً وَأَحَاطَتْ بِهِ خَطِيئَتُهُ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (81) وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (82

“যে পাপ কাজ করে এবং সে পাপ তাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী, আর সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তারা বেহেশতবাসী এবং সেখানেই তারা চিরদিন থাকবে।” (২:৮১-৮২)

ইহুদীরা দোজখে যাবে না বলে যে ধারণা করতো, এর আগের আয়াতে তা উল্লেখ করে বিষয়টিকে আল্লাহর প্রতি ইহুদীদের অপবাদ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এই দুই আয়াতে পরকালে আল্লাহর সাজা ও পুরস্কারের মাপকাঠির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ পাপ করলে এবং পাপের মধ্যে নিমজ্জিত হলে, তার অবস্থান যেন আগুনের মধ্যে, ফলে ওই আগুন থেকে পালানোর কোন উপায় তার নেই। আর এই শাস্তির ক্ষেত্রে ইহুদী জাতির সাথে অন্যান্য জাতির কোন পার্থক্য নেই। আর চিরস্থায়ী বেহেশতে প্রবেশের জন্য শর্ত হলো ঈমান ও সৎকাজ। শুধু ঈমান কিংবা শুধু সৎকাজের মাধ্যমে বেহেশতে যাওয়া সম্ভব নয়,বরং দু’টিই থাকতে হবে।

এবারে সূরা বাকারাহ’র ৮৩ নম্বর আয়াতের দিকে যাচ্ছি। এ আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِنْكُمْ وَأَنْتُمْ مُعْرِضُونَ (83

“স্মরণ কর যখন বনী ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো এবাদত করবে না। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন,এতিম ও দরিদ্রদের প্রতি সদাচরণ করবে,মানুষের সঙ্গে সদালাপ করবে,নামাজ কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। কিন্তু অল্প কিছু লোক ছাড়া তোমরা সবাই বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে।” (২:৮৩)
এর আগে কয়েকটি আয়াতে বনী ইসরাইল আল্লাহর সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলো, শুধু সে কথাই বলা হয়েছিল। কিন্তু অঙ্গীকারের বিষয়বস্তুর বর্ণনা দেয়া হয়নি। তবে এ আয়াতে এবং এর পরের আয়াতগুলোয় বনী ইসরাইলীদের অঙ্গীকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। ইহুদীরা তাদের ওয়াদা লঙ্ঘন করায় এসব আয়াতে আল্লাহপাক তাদেরকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেন। নবীদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রেরিত নির্দেশ, মানুষের বিবেক ও প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতির মধ্যেই সঁপে দিয়েছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও প্রবণতা। সব নবীর মূল কথা তৌহিদ ও এক আল্লাহর উপাসনা করা। অর্থাৎ মানুষের কাজ যদি আল্লাহকেন্দ্রীক হয় তবেই তা কল্যাণ বয়ে আনবে। আল্লাহর এবাদতের পর তার দ্বিতীয় নির্দেশ হলো পিতা-মাতার আনুগত্য এবং তাদের প্রতি উত্তম আচরণ করা। কারণ তাদের মাধ্যমেই আমরা জন্মলাভ করি এবং আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ আসে তাদের মাধ্যমে। বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণের পাশাপাশি সমাজের দুঃস্থ বিশেষ করে আত্মীয়-স্বজনদেরকে সাহায্যের কথাও বলা হয়েছে। যাতে মানুষ শুধু নিজের কথা এবং পরিবারের কথাই না ভাবে এবং সমাজের প্রতিও লক্ষ্য রাখে। মানব সেবার পাশাপাশি বিশেষ উপায়ে আল্লাহর উপাসনা অর্থাৎ নামাজের কথা বলা হয়েছে। কারণ স্রষ্টার সাথে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্কের প্রয়োজন উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। শুধু আচার-আচরণেই নয়,একজন খোদাভীরুকে কথা বার্তায়ও হতে হবে সুন্দর। শুধু নিজ ধর্মের ও গোত্রের লোকদের সাথেই নয় বরং মুমিন, কাফের নির্বিশেষে সবার সাথে তাকে সদালাপী হতে হবে।

এরপর ৮৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ لَا تَسْفِكُونَ دِمَاءَكُمْ وَلَا تُخْرِجُونَ أَنْفُسَكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ ثُمَّ أَقْرَرْتُمْ وَأَنْتُمْ تَشْهَدُونَ (84

“সেই সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন তোমাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে,তোমরা কেউ কারো রক্তপাত করবে না এবং পরস্পরকে নিজেদের মাতৃভূমি থেকে বহিষ্কার করবে না। এরপর তোমরা ত্রুটি স্বীকার করেছিলে এবং এ ব্যাপারে তোমরাই তার সাক্ষী।” (২:৮৪)
এর আগের আয়াতে আল্লাহর ৬টি নির্দেশ বর্ণনার পর এ আয়াতে আরো দু’টি নির্দেশের কথা বলা হয়েছে। একটি মানুষের প্রাণের নিরাপত্তা সংক্রান্ত এবং অন্যটি হলো মাতৃভূমি ও ঘর-বাড়ির ওপর মানুষের অধিকার সংক্রান্ত। একটা সমাজের ন্যূনতম প্রাথমিক চাহিদাগুলোর একটি হলো জনগণের প্রাণের নিরাপত্তা। সকল ঐশী ধর্মে প্রাণের নিরাপত্তা ও মাতৃভূমিতে বসবাসের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বেঁচে থাকার অধিকার প্রত্যেক মানুষের। সে যে জাতি, ধর্ম বা গোত্রেরই হোক না কেন কেউ মানুষের এ অধিকার হরণ করতে পারে না। তাই হত্যা করা কবিরা গুনাহ এবং দুনিয়াতে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আর পরকালের শাস্তি হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা মানুষের স্বভাবজাত ও প্রবৃত্তিগত ব্যাপার। তাই ধর্মও এ অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে থাকে। এজন্য মাতৃভূমিতে বসবাসের অধিকার থেকে কেউ কাউকে বঞ্চিত করতে পারে না।

৮০ থেকে ৮৪ নম্বর আয়াতের প্রধান শিক্ষণীয় বিষয়গুলো একে একে এবার তুলে ধরছি।
এক. ধর্মের দৃষ্টিতে বর্ণবাদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং পৃথিবীর সব মানুষ আল্লাহর কাছে সমান।
দুই. আল্লাহর দেয়া পুরস্কার ও শাস্তির মাপকাঠি হলো মানুষের ঈমান ও কাজ। সৎকাজ ছাড়া কেউ যদি নিছক আশা করে তাতে কোন লাভ হবে না।
তিন. অনেক সময় পাপ মানুষের অস্তিত্বে এমনভাবে প্রবেশ করে যে, তার হৃদয় ও আত্মাকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে এবং তার কথা-বার্তা ও কাজ-কর্মে মন্দ ছাড়া কিছু থাকে না।
চার. মানুষের কল্যাণের জন্য আল্লাহপাক মানুষের কাছ থেকে যেসব অঙ্গীকার নিয়েছেন তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-তওহীদ ও এক আল্লাহর উপাসনা, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ, দুঃস্থ লোক জন, আত্মীয়-স্বজন ও এতিমদের সাহায্য, মানুষের সাথে সদালাপ, নামাজ কায়েম,যাকাত দান,হত্যা ও রক্তপাত পরিহার এবং অন্যের ঘর-বাড়ি ও মাতৃভূমির ওপর আগ্রাসন চালানো থেকে বিরত থাকা।
সূরা বাকারাহ’র ৮৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
ثُمَّ أَنْتُمْ هَؤُلَاءِ تَقْتُلُونَ أَنْفُسَكُمْ وَتُخْرِجُونَ فَرِيقًا مِنْكُمْ مِنْ دِيَارِهِمْ تَظَاهَرُونَ عَلَيْهِمْ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَإِنْ يَأْتُوكُمْ أُسَارَى تُفَادُوهُمْ وَهُوَ مُحَرَّمٌ عَلَيْكُمْ إِخْرَاجُهُمْ أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (85

“অতঃপর সেই তোমরাই প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও তোমাদের একে অন্যকে হত্যা করছ এবং তোমরাই একদলকে তাদের মাতৃভূমি থেকে বের করে দিচ্ছ, তোমরা তাদের প্রতি অন্যায় ও সীমা লঙ্ঘনে পরস্পরকে সাহায্য করছ এবং তারা বন্দী হয়ে তোমাদের কাছে আসলে তোমরা মুক্তিপণ নাও। অথচ তাদেরকে বহিষ্কার করাই তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল। তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ অবিশ্বাস কর ? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তারা পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া অন্য কিছু পাবে না এবং পুনরুত্থান বা কিয়ামতের দিনে তারা কঠোর শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। আর তোমরা যা কিছু করছ আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন নন।” (২:৮৫)

এ আয়াতে বনী ইসরাইলকে তিরস্কার করে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা ভঙ্গ করে একে অন্যকে হত্যা করেছে এবং তাদেরই একদলকে মাতৃভূমি থেকে বহিষ্কার করেছে। অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো, তারা তাওরাত গ্রন্থের বিধান অনুযায়ী বন্দীদের মুক্তি দেয়ার জন্য মুক্তিপণ নেয়। মুক্তিপণ নিয়ে মুক্তি দেয়া যেমন তাওরাতের বিধান তেমনি হত্যা না করা ও কাউকে তার ঘর বাড়ী থেকে তাড়িয়ে না দেয়াও তাওরাতের বিধান। প্রকৃতপক্ষে তোমরা আসমানী গ্রন্থের পরিবর্তে প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়েছিল। তারা খোদার যেসব বিধানকে নিজেদের রুচি ও ইচ্ছের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মনে করতো শুধু সেগুলোকেই মান্য করতো,আর নিজেদের মনমত না হলে আল্লাহর বিধানকে অবজ্ঞা করতে।

এই আয়াত অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত ঈমানের পরিচয় পাওয়া যায় তার কাজে-যেসব কাজের জন্য আল্লাহই নির্দেশ দিয়েছেন। ঈমানের পরিচয় সে ধরনের কাজে পাওয়া যায় না যেসব কাজ মানুষ তার ব্যক্তিগত স্বার্থ ও পছন্দ অনুযায়ী কারে থাকে। কারণ এ ধরনের কাজ আল্লাহর ইবাদত নয় বরং নিজেরই পূজা বা উপাসনা। শুধু পাপ করা নয়, পাপীকে সহযোগিতা করাও নিষিদ্ধ। রাসূল (সাঃ)-এর আহলে বাইত হযরত ইমাম কাজেম (আঃ) একজন মুসলমানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের দরবারের জন্য উট ভাড়া দেয়া জায়েজ নয়। যদি তারা হজ্বে যাবার জন্যেও ভাড়া নিতে চায় তবুও উট ভাড়া দেয়া জায়েজ হবে না। কারণ তারা সফর থেকে নিরাপদে ফিরে এসে তোমাকে ভাড়ার অর্থ পরিশোধ করুক এটাই তুমি চাইবে। কিন্তু কোন অত্যাচারী বেশি দিন বেঁচে থাকুক এই কামনা করাও তো পাপ।

এবারে সূরা বাকারাহ’র ৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآَخِرَةِ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ (86

“এরাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে। সুতরাং তাদের শাস্তি হ্রাস করা হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না।”(২:৮৬)

এই আয়াতে আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা ভঙ্গ করা, হত্যা করা এবং অন্যদেরকে ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বনী ইসরাইলীরা শুধু দুনিয়ার জীবনের পিছনেই ছুটছে এবং শুধু নিজেদের স্বার্থ রক্ষাকারী বিধানগুলোই পালন করছে। কিন্তু আখেরাতের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ের প্রতি তারা উদাসীন। এত দুনিয়া পূজা ও পাপ করা সত্ত্বেও ইহুদীরা পরকালে শাস্তি পাবে না বলে দাবি করতো। কিন্তু এই আয়াতে বলা হয়েছে যে,তাদের এই দূরাশার বিপরীতে অন্যান্য পাপীদের মত তারাও তাদের পাপের জন্য শাস্তি ভোগ করবে এবং কেউই তাদের সাহায্য করবে না।

এরপর ৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَقَدْ آَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَآَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ (87)

“অবশ্যই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি। এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রসূল পাঠিয়েছি। আমি মরিয়ম তনয় ঈসাকে সুস্পষ্ট মোজেযা দান করেছি এবং পবিত্র রূহের মাধ্যমে তাকে শক্তিদান করেছি। অতঃপর যখনই কোন রসূল এমন নির্দেশ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে, যা তোমাদের মনে ভাল লাগেনি, তখনই তোমরা অহংকার করেছ। শেষ পর্যন্ত তোমরা একদলকে মিথ্যাবাদী বলেছ এবং একদলকে হত্যা করেছ।” (২: ৮৭)

এ আয়াতে মানুষের পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহর অবিরাম অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)এর পর বনী ইসরাইলের কাছে অন্যান্য নবীদের পাঠিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ) ছিলেন অন্যতম। কিন্তু ইহুদীরা দুনিয়াপূজা ও আত্মপূজার কারণে নিজেদের অবাধ্যতার চিরাচরিত রীতি অনুসরণের মাধ্যমে ঐসব নবীদের অস্বীকার করেছে, এমনকি তাদের অনেককে শহীদ করেছে। কারণ নবীরা ইহুদীদের অবৈধ দাবি মেনে নিতে রাজি হননি।

৮৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلًا مَا يُؤْمِنُونَ (88)

“তারা (নবীদেরকে) বলেছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, (আমরা তোমাদের বক্তব্যের কিছুই বুঝি না)। আসলে তা নয় বরং অবাধ্যতার জন্য আল্লাহ তাদের অভিশাপ দিয়েছেন (আর এ জন্যই তারা বুঝতে পারছে না) এবং তাদের অল্প সংখ্যকই বিশ্বাস করে। ” (২:৮৮)

দাম্ভিক ও অবাধ্য ইহুদীরা নবীদের আহ্বানের জবাবে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে বলতো আমরা এসব কথা বুঝি না এবং যা আমরা বুঝতে পারি না তা গ্রহণও করতে পারব না। পবিত্র কোরআন তাদের এই বিদ্রুপের জবাবে বলেছে, নবীদের বক্তব্য জনগণের জন্য দুর্বোধ্য নয়। আসলে গোয়ার্তুমি ও সত্যকে ঢাকা দেয়ার চেতনার কারণেই একদল ইহুদী সত্যকে বুঝতে পারছে না এবং তারা খুব কমই বিশ্বাস করে। নফস বা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণের ফলে আত্মপূজার প্রবল চেতনা তাদের চিন্তাধারা ও হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে এবং তারা সত্য ও বাস্তবতাকে পার্থিব বা বৈষয়িক দৃষ্টি দিয়ে দেখে বলে শুধু বাহ্যিক দিকই দেখতে পায়। আর এ জন্যেই তারা ঐশী জ্ঞানকে অগ্রাহ্য করে।

এ আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে,

এক. আমাদেরকে আল্লাহর সকল বিধান মেনে নিতে হবে। যেসব বিধান আমাদের পছন্দের বা মনপুত শুধু সেসব মানলেই হবে না। যদি আমরা আল্লাহর বিধান মানার ক্ষেত্রে শুধু পছন্দনীয় বিধানগুলো মানি আর অপছন্দনীয় বিধানগুলো না মানি তাহলে তা হবে আল্লাহর অনুগত্যের পরিবর্তে নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ।
দুই. আমরা যা-ই করি না কেন আল্লাহ যে তা দেখছেন তা আমাদের মনে রাখতে হবে এবং এটা মনে রাখতে হবে যে আমরা আল্লাহর ব্যাপারে উদাসীন হলেও আল্লাহ আমাদের ব্যাপারে কখনো উদাসীন নন। আমরা যা কিছু করছি সে সম্পর্কে আল্লাহ সবই জানেন।
তিন. আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সকল মানুষ সমান। অনেকে মনে করেন তাদের জাতি সেরা এবং আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। আর এ ধরনের ভুল ধারণার বা দূরাশার জন্য অপরাধীদের শাস্তি মোটেও হ্রাস পাবে না।
চার. আল্লাহ মানুষের মুক্তির জন্য অনেক নবী পাঠিয়েছেন। কিন্তু মানুষ কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে নবীদেরকে অস্বীকার করেছে এবং অনেক নবীকে শহীদও করেছে।
সূরা বাকারাহ’র ৮৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন-
وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ (89

“আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কাছে রাখা নিদর্শনের সমর্থক কিতাব আসার পরও তারা সেই কিতাব অগ্রাহ্য করল। অথচ এর আগে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তারা তাদের কাছে রাখা নিদর্শনের সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করত। কিন্তু যখন তাদের কাছে তা আসল,তখন তারা সেটি প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ।”(২:৮৯)
এর আগের আলোচনায় হযরত মূসা ও তওরাতের বিধানের প্রতি বনী ইসরাইল জাতির বিদ্বেষ ও গোড়ামীর কথা উল্লেখ করেছিলাম৷ আর এ আয়াতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইহুদীদের কথা বলা হয়েছে, যারা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামের নবীর আগমনের অপেক্ষায় ছিল এবং নিজেদের ঘর-বাড়ি ও মাতৃভূমি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল হিজাজে ৷
মদিনা ও মদিনার আশেপাশে বসতিস্থাপনকারী ইহুদীরা মুশরিকদেরকে বলত, খুব শিগগিরই আবির্ভূত হবেন মুহাম্মদ নামের একজন নবী যিনি শত্রুদের ওপর বিজয় লাভ করবেন৷ ইহুদীরা ওই নবীর প্রতি ঈমান আনারও কথা বলত। কিন্তু সত্যিই যখন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আবির্ভূত হলেন এবং মদীনায় হিজরত করলেন, তখন দেখা গেল ইহুদীরা তাদের গোঁড়ামী ও বস্তুপূজার কারণে ঈমান আনতে অস্বীকার করল। অপরদিকে মদিনার মুশরিকরা দলে দলে ঈমান আনল এবং গ্রহণ করল ইসলাম।

এ আয়াত থেকে বোঝা যায় স্রেফ জ্ঞানই যথেষ্ট নয় বরং সত্যকে গ্রহণ ও তা মেনে চলার মনোভাবেরও প্রয়োজন ৷ ইহুদীরা এবং তাদের পুরোহিতরা মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও সত্য গ্রহণ ও তা মেনে নিতে পারেনি।

এরপর ৯০তম আয়াতে বলা হয়েছে-
بِئْسَمَا اشْتَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ أَنْ يَكْفُرُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ بَغْيًا أَنْ يُنَزِّلَ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ فَبَاءُوا بِغَضَبٍ عَلَى غَضَبٍ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ مُهِينٌ (90

“তারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট মূল্যে নিজেদেরকে বিক্রি করেছে। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা হিংসা বশবর্তী হয়ে প্রত্যাখ্যান করে শুধু এ কারণে যে আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। অতএব,তারা ক্রোধের ওপর ক্রোধ অর্জন করেছে। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।” (২:৯০)

ইহুদীরা আশা করেছিল ইসলামের নবী আসবে তাদের বনী ইসরাইল গোত্র থেকে আর তাহলেই কেবল তারা ওই নবীর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ায় গোত্রীয় হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। এমনকি তারা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জানিয়ে বসে। ইহুদীরা তাদের এ আচরণের মাধ্যমে ক্ষতিকর লেনদেনের স্বীকার হয়েছে। কারণ তারা প্রতিশ্রুত নবীর প্রতি ঈমান আনার জন্যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মদিনায় এসে বসতি স্থাপন করেছিল। এ জন্যে তাদেরকে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাই পরিণত হয় ইসলামের শত্রুতে। কেবল গোঁড়ামী আর হিংসার কারণেই তারা নবীর প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে এবং নিজেদেরকে বিক্রি করে হিংসার মূল্যে। এভাবে তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়।

এরপর ৯১তম আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آَمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (91

“যখন তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তাতে বিশ্বাস কর। তারা বলে আমাদের নবীর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাস করি। তা ছাড়া সব কিছুই তারা প্রত্যাখ্যান করে। যদিও এ কোরআন সত্য এবং তাদের কাছে যা আছে তা (কোরআনকে) সমর্থন করে। হে নবী! আপনি তাদের বলুন, যদি তোমরা অতীতে তোমাদের ওপর অবতীর্ণ হওয়া বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসী হতে তবে কেন তোমরা অতীতে নবীদেরকে হত্যা করেছিলে?” (২:৯১)

এ আয়াতে ইহুদীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনছো না এ জন্যে যে, তিনি তোমাদের গোত্রের নন। তোমরা যদি সত্যিই ঐশি গ্রন্থ মেনে চল তবে কেন তোমরা অতীতে নবীদেরকে হত্যা করেছিলে? এ থেকে বোঝা যায় তোমরা মূলত: সত্যের বিরোধী ৷ ওই সত্য তোমাদের নবীই বলুক অথবা ইসলামের নবীই বলুক তাতে তোমাদের কিছু এসে যায় না৷ কোরআনের বাণীকে তোমরা যেমন অগ্রাহ্য করেছ তেমনি তওরাতের কথাও তোমরা গ্রহণ করনি ৷’ মূলত: আসমানী গ্রন্থের সব বিষয় এসেছে এক আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং সেসব কোন বিশেষ জাতি বা গোত্রের জন্যে আসেনি বরং এসেছে তাবত মানুষের জন্যে। তাই এটা কারো বলার অধিকার নেই যে, আমি কেবল আমার জাতির নবীকে অনুসরণ করব, অন্য কাউকে নয় ।
সব ঐশী ধর্মের বিষয়বস্তুর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক এবং একটির সঙ্গে অন্যটির কোন বিরোধ নেই ৷

এরপর ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَقَدْ جَاءَكُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ (92)

“নিশ্চয় মূসা তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছে৷ কিন্তু তোমরা তার অনুপস্থিতিতে বাছুর পূজা শুরু করেছিলে। সত্যিই তোমরা ছিলে বড় অত্যাচারী।” (২:৯২)

ইহুদীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করার পেছনে যে যুক্তি এনেছিল তাহলো, মহানবী (সাঃ) আরব, আর অন্যদিকে হযরত মূসা ছিলেন বনী ইসরাইল৷ কিন্তু হযরত মূসা তাদের জন্য মোজেযাসহ আসার পর যখন তুর পাহাড়ে গেলেন, তখন বনী ইসরাইল জাতি বাছুর পূজার দিকে ঝুঁকে পড়ল৷ হযরত মূসার দীর্ঘ দিনের শ্রম এক নিমিষে পানি হয়ে গেল৷ এভাবে ইহুদীরা জুলুম করেছিল তাদের নবীর প্রতি৷

এবারে সূরা বাকারাহ’র ৯৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে,
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آَتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاسْمَعُوا قَالُوا سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَأُشْرِبُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ قُلْ بِئْسَمَا يَأْمُرُكُمْ بِهِ إِيمَانُكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (93)

“স্মরণ কর যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুরকে তোমাদের উর্ধ্বে স্থাপন করেছিলাম৷ বলেছিলাম তাওরাত ও এর যেসব বিধান তোমাদেরকে দিলাম সেসব দৃঢ়ভাবে গ্রহণ কর এবং শ্রবণ কর ৷ কিন্তু তারা বললো, আমরা শ্রবণ করলাম ও অমান্য করলাম।” (২:৯৩)

কুফরী ও অবিশ্বাসের কারণে তারা তাদের অন্তরে বাছুরকে স্থান দেয়৷ হে নবী আপনি তাদের বলুন যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তাহলে তোমাদের বিশ্বাস যা নির্দেশ দেয় তা কত নিকৃষ্ট।
এর আগে বলেছি- ইহুদীরা মহানবী (সাঃ)এর প্রতি ঈমান না আনার অজুহাত হিসাবে বলেছিল- রাসূলে খোদা বনী ইসরাইল জাতির লোক না ৷ তারা বলেছিল আমরা কেবল এমন নবীর প্রতি ঈমান আনবো যে আমাদের গোত্রের হবে৷ আর আমরা কেবল মূসার আনা কিতাব তাওরাতই মেনে চলব৷ এর আগের কয়েকটি আয়াতে উদাহরণ দেয়া হয়েছে যা দেখে বুঝা যায়, ইহুদীরা তাদের নবী মূসা ও তার ধর্মগ্রন্থ মেনে চলা দূরের কথা বরং তার বিপরীতভাবে চলে৷ আর এ আয়াতে সেরকম আরেকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে৷ তুর পাহাড়ে আল্লাহপাক বনী ইসরাইলের কাছ থেকে কিছু বিষয়ে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন ৷ কিন্তু তারা সেগুলো জেনে শুনে বেমালুম ভুলে গেল৷ কারণ তাদের অন্তরের ভেতর শিরক্‌ ও দুনিয়া পূজা এমন গভীরভাবে গেড়ে বসল যে, সেখানে চিন্তা ও বিশ্বাসের কোন স্থান ছিল না ৷ তাদের এ দুনিয়া পূজার বিষয়টি ফুটে উঠে স্বর্ণের বাছুর পূজার মাধ্যমে৷ আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে- আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার সঙ্গে সঙ্গে তারা ঈমানেরও দাবি করত৷ পবিত্র কোরআন তাদের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন করে তাদেরকে জবাব দেয়৷ প্রশ্ন করা হয়, তোমাদের ঈমান কি তোমাদেরকে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গের নির্দেশ দেয়? ওই বিশ্বাস কি বাছুর পূজা এবং আল্লাহর নবীদের হত্যা করতে বলে? যদি তোমাদের ঈমান এ ধরনের হয়, তবেতো সে খুব নিকৃষ্ট নির্দেশই তোমাদের দিচ্ছে৷

সূরা বাকারাহ’র ৮৯ নম্বর থেকে ৯৩ নম্বর মূল শিক্ষা হচ্ছে-
এক. আজ ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে ইসলাম গ্রহণ না করতে দেখলেও ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ করা উচিত নয়৷ কারণ তাদের অনেকে সত্য বোঝার পরও প্রবৃত্তিগত কারণে ইসলাম মেনে নিতে রাজী হয় না ৷ যেমনিভাবে মদীনার ইহুদীরা নবীজিকে চিনেও ইসলাম গ্রহণ করে নি ৷
দুই. হিংসা হলো কুফরী, অবিশ্বাস ও সত্য প্রত্যাখ্যানের উৎস ৷ বনী ইসরাইল যখন দেখল রাসূলে খোদা তাদের গোত্রের নয় তখন তারা হিংসা বশবর্তী হয়ে অবিশ্বাস করতে লাগল ৷
তিন. আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোন কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বিপজ্জনক৷ কারণ এ জাতীয় আকর্ষণ মানুষকে সত্যের ব্যাপারে অন্ধ করে ফেলে৷
সূরা বাকারাহ’র ৯৪ ও ৯৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
قُلْ إِنْ كَانَتْ لَكُمُ الدَّارُ الْآَخِرَةُ عِنْدَ اللَّهِ خَالِصَةً مِنْ دُونِ النَّاسِ فَتَمَنَّوُا الْمَوْتَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (94) وَلَنْ يَتَمَنَّوْهُ أَبَدًا بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ (95)

“(ওই ইহুদীদের) বলে দিন,যদি পরকালের বাসস্থান আল্লাহর কাছে একমাত্র তোমাদের জন্যই বরাদ্দ হয়ে থাকে-অন্য লোকদের বাদ দিয়ে,তবে তোমরা নিজেদের মৃত্যু কামনা কর, যদি সত্যবাদী হয়ে থাক।” (২:৯৪)
“কিন্তু তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য কখনোই মৃত্যু কামনা করবে না। আর আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের সম্পর্কে অবহিত ৷” (২:৯৫)
অতীতকাল থেকে ইহুদীরা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ জাতি মনে করতো। তারা বিশ্বাস করতো বেহেশত তাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এবং দোজখের আগুন তাদেরকে স্পর্শ করবে না। আর তারা আল্লাহর সন্তান ও তারই বন্ধু। এই মিথ্যা ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা একদিকে তাদের খুশীমত জুলুম-অত্যাচার ও পাপ কাজ করতো আর অন্যদিকে আক্রান্ত হতো আত্মম্ভরিতা,গর্ব ও অহঙ্কারের ব্যাধিতে। ফলে এই আয়াতে তাদের বিবেকের ওপর বিচারের ভার ছেড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, “বেহেশত একমাত্র ইহুদীদের জন্য” যদি তোমাদের এ দাবি সত্য হয় তাহলে তোমরা কেন দ্রুত বেহেশতে যাওয়ার জন্য মৃত্যু কামনা কর না? কেন মৃত্যুকে ভয় পাও? মৃত্যু ভয় অনেকটা চালকের ভ্রমণভীতির মত। ওই চালকই সফর করতে ভয় পায় যে রাস্তা চেনে না,জ্বালানি নেই কিংবা অপরাধ করেছে, অথবা চোরাই মাল বহন করছে বা গন্তব্যস্থলে থাকার কোন জায়গা নেই৷ কিন্তু প্রকৃত মোমিন রাস্তা চেনে,সৎকাজের মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহ করেছে,তওবার মাধ্যমে অপরাধ মার্জনা করে নিয়েছে, তার কাছে চোরাই কিছু নেই এবং পরকালেও তার রয়েছে বাসস্থান বা বেহেশত।

অধিকাংশ মানুষ যারা মৃত্যুকে ভয় পায়,তাদের ভীতি মূলত: দু’টি কারণে৷
প্রথমত: তারা মৃত্যুকেই চূড়ান্ত ধ্বংস মনে করে। দ্বিতীয়ত: তারা হয়ত পরকালে বিশ্বাস করে, কিন্তু নিজেদের পাপ ও অন্যায় কাজের জন্যে মৃত্যুকে ভয় পায়। কারণ মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় মানুষের কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ। আর তাই মৃত্যু যাতে দেরীতে আসে ইহুদীরা সেটাই কামনা করতো। কিন্তু নবী-রাসুল এবং আল্লাহর অলীরা মৃত্যুকে বিনাশ ও ধ্বংস মনে করেন না বরং একে আরেকটি জীবনের সূচনা বলে বিশ্বাস করেন। তারা তাদের কর্মে ও চিন্তায় কোন অপরাধ করেননি বলে মৃত্যুকে ভয় পান না বরং উদ্যম ও আগ্রহের সাথে মৃত্যুকে বরণ করে নেন। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) বলেছেন,খোদার কসম! মৃত্যুর প্রতি আমার আকর্ষণ মাতৃস্তনের প্রতি নবজাতকের আকর্ষণের চেয়ে বেশী৷

৯৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَتَجِدَنَّهُمْ أَحْرَصَ النَّاسِ عَلَى حَيَاةٍ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ يُعَمَّرُ أَلْفَ سَنَةٍ وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَنْ يُعَمَّرَ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ (96)

“আপনি তাদেরকে (ইহুদীদেরকে) জীবনের প্রতি সবার চাইতে,এমনকি মুশরিকদের চাইতেও অধিক লোভী দেখবেন। তাদের প্রত্যেকে কামনা করে, যেন হাজার বছর আয়ু পায়। অথচ এরূপ আয়ু প্রাপ্তি তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। তারা যা কিছু করে আল্লাহ তা দেখেন।” (২:৯৬)

রাসূলে খোদা (সাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে এ আয়াতে বলা হয়েছে, বেহেশতের দাবিদার ইহুদীরা মৃত্যু কামনাতো করেই না বরং অন্যান্য মানুষ এমনকি মুশরিকরা যারা পরকালে বিশ্বাস করে না এবং মৃত্যুকে জীবনের ধ্বংস বলে মনে করে, তাদের চেয়েও এ দুনিয়ার প্রতি তারা বেশী লোভী। তারা দুনিয়ার জীবনের প্রতি এতই আসক্ত যে, পৃথিবীতে হাজার বছর জীবন-যাপন করতে চায়। যাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে দূরে থাকা যায় এবং জমা করা যায় দুনিয়ার ধন-সম্পদ। কিন্তু আল্লাহপাক জবাবে বলেন, তাদেরকে এক হাজার বছর বেঁচে থাকার সুযোগ দেয়া হলেও ওই দীর্ঘায়ূ তাদের প্রাপ্য শাস্তি ঠেকাতে পারবে না। কারণ তাদের সমস্ত কাজ আল্লাহ দেখেন, কাজেই এই শিশুসুলভ চিন্তা তাদের জন্য কোন ফল বয়ে আনবে না ৷

এরপর ৯৭ ও ৯৮ নম্বর আল্লাহ পাক বলেছেন-
قُلْ مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَهُدًى وَبُشْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ (97) مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِلَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَافِرِينَ (98)

“আপনি বলুন-যে জীবরাঈলের শত্রু সে জেনে রাখুক, জিবরাঈল আল্লাহর নির্দেশে আপনার হৃদয়ে কোরআন পৌঁছে দিয়েছে, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবের সমর্থক এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথ প্রদর্শক ও শুভ সংবাদ। যে কেউ আল্লাহ, তার ফেরেশতা, রাসূলগণ এবং জিবরাঈল ও মিকাঈলের শত্রু, সে জেনে রাখুক আল্লাহ নিশ্চয় সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের শত্রু ৷” (২:৯৭-৯৮)

রাসূলে খোদা (সাঃ) যখন মদীনায় আসলেন তখন কিছু ইহুদী তাদের একজন পুরোহিতসহ রাসূলের কাছে এসে কিছু প্রশ্ন করল। তাদের একটি প্রশ্ন ছিল, তোমার কাছে যে ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসে তার নাম কি? রাসূলে খোদা জবাবে বলেন, জিবরাঈল। তখন ইহুদীরা বলল,যদি ওহীর ফেরেশতা মিকাঈল হতো তাহলে আমরা ঈমান আনবো। কারণ জিবরাঈল আমাদের শত্রু। সে আমাদের জন্য জেহাদের মত কঠিন বিধান নিয়ে আসে৷ মানুষ যখন সত্যকে মেনে নিতে চায় না তখন অজুহাত খুঁজে বেড়ায়৷ এমনকি তারা আল্লাহর ফেরেশতাকেও অযৌক্তিকভাবে দায়ী করে যাতে সত্য থেকে পালিয়ে থাকা যায়। জিবরাঈল, মিকাঈল প্রমুখ ফেরেশতাগণ নিজের থেকে কোন বাণী আনেন না। তাঁরা আল্লাহর বাণী পয়গম্বরদের কাছে পৌঁছে দেন। তারা কেবল আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যে মাধ্যম হিসাবে কাজ করেন৷ তাই এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে ইহুদীবাদীদের এ দাবি ছিল ইসলাম গ্রহণ না করার একটি বাহানা।

আজকের আলোচিত আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
এক. প্রত্যেক মানুষকে এমনভাবে জীবন-যাপন করা উচিত ,যাতে সে যেকোন সময় মৃত্যুর জন্যে তৈরি থাকতে পারে।এই পৃথিবীতে কেউ যদি সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করে এবং অপরাধের জন্য তওবা করে তাহলে মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই ।
দুই. দীর্ঘ জীবন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। একমাত্র আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যমেই জীবন হয়ে উঠে মূল্যবান৷ তাই দেখা যায় ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) তার এক দোয়ায় বলেছেন, হে আল্লাহ! আমার আয়ু যদি তোমাকে মেনে চলার মাধ্যম হয় তাহলে তা বাড়িয়ে দাও৷ আর যদি শয়তানের অনুসরণের জন্য হয় তাহলে তা সংক্ষিপ্ত করে দাও ।
তিন. ধর্ম হলো অনেকগুলো বিশ্বাসের সমষ্টি৷ তাই কেউ যদি বলে আল্লাহকে বিশ্বাস করি কিন্তু তার ফেরেশতা আমার শত্রু বা ওই নবীকে বিশ্বাস করি না তাহলে তার ঈমান নেই৷ সুতরাং একজন প্রকৃত মুমিন হলো সেই যে আল্লাহ, সব নবী ও সব ফেরেশতার প্রতি বিশ্বাস রাখে।
সূরা বাকারাহ’র ৯৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন-
وَلَقَدْ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ آَيَاتٍ بَيِّنَاتٍ وَمَا يَكْفُرُ بِهَا إِلَّا الْفَاسِقُونَ (99)

“হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি স্পষ্ট নিদর্শন অবতীর্ণ করেছি যা অবাধ্যরা ছাড়া অন্য কেউ অস্বীকার করে না।” (২:৯৯)
মদীনার ইহুদীরা ইসলাম গ্রহণ না করার জন্য নানা অজুহাত উত্থাপন করতো ৷ এর মধ্যে একটি ছিল, ফেরেশতা জিবরাইল রাসূলে খোদার কাছে ওহী আনায় তারা রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে না। কারণ ফেরেশতা জিবরাঈল(আ.)-কে তারা শত্রু মনে করত। আর এ আয়াতে তাদের আরেকটি অজুহাত তুলে ধরা হয়েছে৷ ইহুদীরা বলতো আমরা এ কিতাবের কিছু বুঝি না এবং এর বিষয়বস্তু আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আর তাই আমরা মুহাম্মদের প্রতি ঈমান আনব না এবং কোরআনকেও তার মোজেযা হিসাবে গ্রহণ করব না। অথচ পড়লে ও কোরআনের বক্তব্য নিয়ে একটু চিন্তা করলেই ইসলামের নবীর সত্যতা এবং কোরআনের অলৌকিত্ব বোঝা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। অবশ্য এই সত্য তারাই উপলদ্ধি করতে পারে যাদের অন্তর পাপে কলুষিত হয়নি এবং যাদের মধ্যে সত্যকে মেনে নেয়ার মনোভাব আছে। কারণ পাপ কাজ কুফরী বা সত্যকে প্রত্যাখ্যানের পটভূমি সৃষ্টি করে। মানুষ প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা অনুসরণের মাধ্যমে কুফরীর দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সত্যকে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করে। কারণ ওই সত্য গ্রহণ করলে সে আর অনায়াসে পাপ কাজ করতে পারবে না।

এরপরের আয়াত অর্থাৎ একশ’ নম্বর আয়তে বলা হয়েছে-
أَوَكُلَّمَا عَاهَدُوا عَهْدًا نَبَذَهُ فَرِيقٌ مِنْهُمْ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ (100)

“কি আশ্চর্য, যখন তারা (ইহুদীরা আল্লাহ ও তার পয়গম্বরদের সঙ্গে) কোন অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়, তখন তাদের একদল তা ছুঁড়ে ফেলে,বরং অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।” (২:১০০)

এ আয়াতে রাসূলে খোদা (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হয়েছে, যাতে তিনি ইহুদীদের কার্যকলাপে দুঃখ না পান৷ কারণ ইহুদীদের আচরণ বিস্ময়কর। তারা তাদের নিজেদের গোত্রের নবীদের প্রতি দেয়া অঙ্গীকার রাখেনি। তারা হযরত মূসা (আ.)এর সাথে বিভিন্ন অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর নানা অজুহাতে সেটা অমান্য করতো। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মদীনায় আসার পর সেখানকার ইহুদীরা নবীজীর সাথে অঙ্গীকার করলো যে অন্তত তারা মুসলমানদের শত্রুকে সাহায্য করবে না৷ কিন্তু অচিরেই তারা তাদের সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে আহযাবের যুদ্ধে তারা মুশরিকদের সাথে হাত মিলায়। একইভাবে আজও ইসরাইলের ইহুদীবাদীরা কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অঙ্গীকার মেনে চলছে না। কোন চুক্তি করার পরপরই তারা অবলীলায় তা ভঙ্গ করে বসে। কারণ এরা হলো বর্ণ বিদ্বেষী ও সুবিধাবাদী জাতি।

এরপর ১০১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (101)

“যখন রাসূলে খোদা আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ হিসাবে তাদের কাছে এলেন এমন কিছু নিদর্শন নিয়ে যার সাথে তাদের কাছে রাখা নিদর্শনের মিল ছিল, তখন ঐশী গ্রন্থের অনুসারীদের একদল আল্লাহর কিতাবকে অগ্রাহ্য করে বসে৷ যেন তারা সে সম্পর্কে কিছুই জানে না।” (২:১০১)

রাসূলে খোদা (সাঃ)এর আবির্ভাবের আগে ইহুদী পণ্ডিতরা জনগণকে তার আগমন সম্পর্কে সুসংবাদ দিতো। তারা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তওরাতে নবীজী সম্পর্কে যেসব নিদর্শনের কথা বলা হয়েছে সেগুলো জনগণের মধ্যে বলে বেড়াতো। কিন্তু সত্যিই সর্বশেষ নবীর আগমন হয় তখন তারা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে এমনভাবে অস্বীকার করলো যেন তাঁর সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।
মূলত: পদমর্যাদার লোভ অধিকাংশ মানুষের জন্য বিশেষ করে পণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্য একটি বিপজ্জনক বিষয়। যখন ইহুদী পণ্ডিতরা মনে করলো যে, তারা মহানবী (সাঃ)এর নবুয়্যতের সত্যতা স্বীকার করলে নিজেদের দুনিয়াবী পদমর্যাদা হাতছাড়া হবে, তখন তারা তাঁর নবুয়্যাতকে বেমালুম অস্বীকার করে বসলো। তবে ইহুদীদের মধ্যে যারা সত্যপন্থী এবং সৎ তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পবিত্র কোরআন বলেছে, অধিকাংশ লোক সত্যকে অস্বীকার করলেও তাদের মধ্যে অল্প সংখ্যক ব্যক্তি সত্য গ্রহণ করেছিল ৷

সূরা বাকারাহ’র ১০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآَخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ (102)

“ইহুদীরা (তওরাত অনুসরণের পরিবর্তে) সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তান যা আবৃত্তি করতো তার অনুসরণ করতো। অথচ সুলায়মান কখনো যাদু করেনি এবং সত্য প্রত্যাখ্যান করেনি। কিন্তু শয়তান মানুষকে যাদু শিক্ষা দিতো এবং কাফের হয়ে গিয়েছিল। ইহুদীরা বাবেল শহরের দুই ফেরেশতা হারুত ও মারুতের ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল তা অনুসরণ করত। ‘আমরা তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ-সুতরাং যাদুকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে কাফের হইও না’-এ কথা না বলে ওই দুই ফেরেশতা কাউকে কিছু শিক্ষা দিত না৷ কিন্তু তারা ওই দুই ফেরেশতা থেকে শুধু এমন কিছু শিখত যা দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা যায়। অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কারো ক্ষতি করতে পারে না। তারা শুধু ওই সব অংশই শিখত যা ছিল তাদের জন্য ক্ষতিকর এবং তাদের জন্য কোন ধরনের উপকারী ছিল না। আর তারা নিশ্চয়ই জানত, যে এ পণ্য ক্রয় করবে পরকালে তার কোন মুনাফা পাবে না ৷ যে জিনিসের বদলে তারা নিজেদের বিক্রি করল তা বড়ই নিকৃষ্ট, যদি তারা জানত ৷” (২:১০২)

হযরত সোলায়মান (আ.)এর যুগে যাদু ও তন্ত্র-মন্ত্র বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাই হযরত সোলায়মান (আ.) যাদুকরদের সব কাগজ-পত্র এক জায়গায় জমা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত সোলায়মানের পর একদল লোক ওই কাগজ-পত্রের খোঁজ পায় এবং শরু করে যাদু শিক্ষা ও তার চর্চার। এ আয়াতে বলা হয়েছে- বনী ইসরাইলের কিছু লোক ঐশী গ্রন্থ তওরাত অনুসরণের পরিবর্তে ওই যাদু ও তন্ত্র-মন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ল। আর তারা তাদের এ কাজকে জায়েয করার জন্যে বলে বেড়াতে লাগলো যে,এই বই-পত্রতো সোলায়মানের এবং তিনি ছিলেন শক্তিশালী যাদুকর। পবিত্র কোরআন তাদের এ মিথ্যা দাবির জবাবে বলেছে সোলায়মান কখনোই যাদুকর ছিলেন না। বরং তিনি হলেন আল্লাহর নবী। তিনি যেসব অলৌকিক নিদর্শন দেখাতেন সেসব ছিল আল্লাহর দেয়া মোজেযা। বরং তোমরা এর মাধ্যমে ওইসব শয়তানের অনুসরণ করছো যারা যাদু চর্চা ছড়িয়ে দিয়েছে৷
অবশ্য আরেকটি উপায়েও ইহুদীরা যাদুবিদ্যা অর্জন করেছিল। আল্লাহর নির্দেশে বাবেল শহরে একবার হারুত ও মারুত নামে দুই ফেরেশতার আগমন ঘটে। মানুষরূপী এ দুই ফেরেশতার কাজ ছিল মানুষকে যাদু-তন্ত্রের প্রভাব নস্যাৎ করার উপায় বাতলে দেয়া। এ দুই ফেরেশতা একইসঙ্গে মানুষকে সতর্ক করে দিতো যাতে কেউ যাদু বিদ্যার অপব্যবহার করে নিজেদের বস্তুগত স্বার্থ হাসিল না করে। কিন্তু ইহুদীরা ওই দুই উপায়ে যাদু ও তন্ত্র-মন্ত্র শিখে এর মাধ্যমে নিজেদের অন্যায় স্বার্থ পূরণ করতো। যদিও তারা জানতো যে, যাদুর কাজ কুফরীর শামিল এবং এরমাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবার ও সমাজ। এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, যাদু ও তন্ত্র-মন্ত্র মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সব কিছুর উর্দ্ধে একমাত্র আল্লাহ। তাই তার আশ্রয় প্রার্থনা,তার ওপর ভরসা,দোয়া এবং সদকা বা দান-খয়রাতের মাধ্যমে যাদুর দুষ্ট প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

সূরা বাকারাহ’র ৯৯ থেকে ১০২ নম্বর আয়াতের মূল শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-

এক. ধর্মের প্রতি অনেকের অবিশ্বাস থেকে ধর্মের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করা উচিৎ নয়, বরং মনে রাখতে হবে পাপ কাজের কারণে মানুষের আত্মা সত্য গ্রহণের মনোভাব হারিয়ে ফেলে ৷
দুই. কেবল বিদ্যা শিক্ষাই যথেষ্ট নয় বরং এর সাথে সত্য গ্রহণের মনোভাব থাকাও জরুরী৷ ইহুদী পণ্ডিতরা তওরাতের বদৌলতে ইসলামের নবীর শুভ আগমনের কথা জানতো৷ কিন্তু তারা নিজেরাও নবীজীর প্রতি ঈমান আনেনি এবং অন্যদেরকেও নিষেধ করেছে ঈমান আনতে৷
তিন. জ্ঞান সব সময় মানুষের জন্য উপকারী নয়৷ বরং জ্ঞান হলো ধারালো চাকুর মতো৷ যদি তা অস্ত্রোপচারকারী ডাক্তারের হাতে পড়ে তাহলে তা দিয়ে তিনি রুগীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। আর যদি খুনীর হাতে পড়ে তাহলে সে তা দিয়ে হত্যা করে নিরপরাধ মানুষকে ৷
চার. শয়তান পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ ও বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। আর অন্যদিকে ফেরেশতারা চেষ্টা করে তাদের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি স্থাপনের। একইভাবে মানুষও দু’দলে বিভক্ত৷ একদল শয়তানের পথে আরেক দল ফেরেশতাদের পথে।

 

Share

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY