Home ইতিহাস মোহাম্মদ মোর নয়ন-মনি

মোহাম্মদ মোর নয়ন-মনি

698
0
SHARE

“মোহাম্মদ মোর নয়ন-মনি মোহাম্মদ মোর জপমালা
ঐ নামে মিটাই পিয়াসা ও নাম কওসরের পিয়ালা।”

বিশ্বের বুকে বিদ্যমান অসাধারণ সকল সোন্দর্যকে তুলে ধরা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তারচেয়েও কঠিন কাজ হলো এমন কোনো মহান ব্যক্তিত্বের জীবনচিত্র আঁকা , যাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী হিসেবে। এরকম কোনো ব্যক্তিত্বের জীবনচিত্র যিনি আঁকতে চান , তিনি আসলে অসীম সমুদ্রকে ছোট্ট একটি আয়নার মাঝেই প্রতীকায়িত করতে চান। নতুন এই আসরে আমরা আপনাদেরকে দীর্ঘরাত্রির পর সুপ্রভাতের ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিস্ময়কর এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের কথা শোনাবো,যিনি অসংখ্য মানুষকে তাঁর হেদায়েতের নৌকায় চড়িয়েছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হেদায়েতের ঐ নৌকা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ তরঙ্গের মুখে বারবার পড়েছে , তারপরও আজ পর্যন্ত নৌকাটি কালের সাগরে ভাসমান রয়েছে , ডোবে নি। আজো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্র পতাকা পৎপৎ€Œ করে উড়ছে। আজো মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা)’র সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষিত এবং তাঁর হেদায়াত সমানভাবে গ্রাহ্য।

তোমার নুরে সূর্য পেলো আলোকের শোভা
বার্তাবাহক জিব্রাঈল হলো অপূর্ব দ্যুতিময়
কোরআন তোমাকে পরিয়েছে শ্রেষ্ঠ চরিত্রের মালা
খোদার কৃপায় সজ্জিত হলে শ্রেষ্ঠ এ মহিমায়
ঐশীবাণী , ফেরেশ্তার গান , মুমিনের জিকির আর
সকলই উৎসর্গীত মুহাম্মাদ ও তাঁর আহালের পর।

 

আল্লাহর শেষ দূত মুহাম্মাদের ওপর নাযিল হয়েছিল মহাগ্রন্ আল-কোরআন। কোটি কোটি মানুষ এই কোরআন অধ্যয়ন করেছে এবং মণিমুক্তোময় মহাসমুদ্র আল-কোরআন থেকে উপকৃত হয়েছে। তবে যুগে যুগে ইসলামের শত্রুরা রাসূল (সা ) এর সূর্যোদীপ্ত চেহারাকে ধূলোমলিন করে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করেছে। ইসলাম যাতে বিকশিত হতে না পারে , সেটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারপরও অপার রহস্যময় এই পৃথিবীতে এমন কোনো জ্ঞানী-গুণী নেই , যার কানে রাসূলের আহ্বান পৌঁছে নি।
যুগে যুগে নবী রাসূলগণ এই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন একটিমাত্র উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। তাহলো সত্য ও শান্তির দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো। এই সত্যের আহ্বান জানাতে গিয়ে ভৌগোলিক সীমারেখার উর্ধ্বে উঠে নবী-রাসূলগণ এশিয়া-ইউরোপ-আফ্রিকা প্রভৃতি মহাদেশে দাওয়াতী কাজ চালিয়েছিলেন। যার ফলে এই মহাদেশগুলোর মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল। পঞ্চ পয়গম্বর যাঁদেরকে একত্রে উলুল আযম বলা হয়,তাঁরা বিশ্বের কৌশলগত দ্বীপের কেন্দ্র যাকে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য বলা হয়,সেখানে বিভিন্ন ভাষায় এক এবং অভিন্ন বার্তাই প্রচার করেছেন। তাঁদের মূল লক্ষ্যও ছিল অভিন্ন। তাহলো,এক আল্লাহর ইবাদাত করা এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করা।
নূহ ( আ ) এর সময় ভয়াবহ ঝড়-তুফান হয়েছিল। তাঁর নৌকা ‘জুদি’ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গিয়েছিল। নূহ ( আ ) এবং তাঁর ক’জন অনুসারী ঐ নৌকায় আরোহন করেছিলেন। যাতে তাঁদেরকে দিয়ে নতুন পৃথিবী গড়া যায় এবং ইতিহাস নতুনভাবে শুরু করা যায়। তাঁর পরে ইব্রাহীম ( আ ) ব্যাবিলন ভূখন্ডে তৌহিদের সেই বাণীর প্রতিধ্বনি করেন। তাঁর পরে মূসা ( আ ) লাঠির মো’জেযা দিয়ে তাঁর কওমকে ফেরাউনের কবল থেকে বাঁচান। এই ফেরাউন জনগণকে তার নিজের বান্দা বলে মনে করতো। মূসা (আ ) এর পর ঈসা ( আ ) জন্মগ্রহণ করেই খোদার অপার মেহেরবাণীতে কথা বলেন এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর আগমনের সুসংবাদ দেন। শেষ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মধ্যে যখন অসংখ্য খোদার পূজা করার ঘটনা দেখা দিল এবং সর্বত্র অজ্ঞতার আঁধার ছড়িয়ে পড়েছিল , তখন সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ ( সা ) মক্কায় আবির্ভূত হন। তিনি অপূর্ব সত্যের সুস্পষ্ট বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছান। সেইসাথে মানব মর্যাদা , মানবাধিকার , স্বাধীনতা এবং ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা তওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন : “তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী , মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল , দয়াময়।”
মহৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ইসলামের নবী সবসময় মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তিনি মানুষের মাঝে অসীম ক্ষমতাময় এক আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরে তাদেরকে শের্‌ক , মূর্তি পূজা , যাদু-মন্ত্রসহ বিচিত্র কুসংস্কারের জিঞ্জির থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তিনি মানব জীবনের অন্ধকার স্তরগুলোর মাঝে আলোকের জানালা খুলে দিয়ে শিখিয়েছেন যে , মানুষ যদি সত্য,জ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকের পেছনে ছোটে , তাহলে অজ্ঞতা এবং অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে পারে। তিনি সবসময়ই বিরোধী পক্ষের সামনে যুক্তি তুলে ধরতেন এবং আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী তাদেরকে তাদের দলীল-প্রমাণ দেখাতে বলতেন। যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে : €˜বল ! তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আসো !’
আধুনিক বিশ্বের নতুন নতুন ভূখন্ডে ইসলাম বিস্তারের কারণে ভীত হয়ে কোনো কোনো স্বার্থবাদী মহল ইসলামের এই মহান নবী সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর নিষ্কলুষ চরিত্রের ওপর কলঙ্ক লেপনের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। ২০০৬ সালে কলঙ্ক লেপনের এই ধারা নবরূপ ধারণ করেছে। পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যম তাদের সরকারগুলোর সহযোগিতায় সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মহানবী এবং ইসলাম বিকৃতির চেষ্টা চালিয়েছে। তাদের এইসব বিকৃতি ও অপপ্রচারের কারণে মুদ্রার একপিঠে যদিও মুসলমানরা হিংস্র এবং চরমপন্থী বলে পরিচিত হয়েছে , অপরপিঠে কিন্তু ইসলাম এবং নবীজী সম্পর্কে জানতে জনমনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজী ভাষী একজন অমুসলিম গবেষক মিসেস কার্ন আর্মস্ট্রং তাঁদেরই একজন। তিনি নবীজীর বিরুদ্ধে অপবাদ আর অভিযোগের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে সালমান রুশদীর অপবাদের কারণে ‘€˜মুহাম্মাদ’ নামক গ্রন’টি লেখেন। এই গ্রন্থটি লেখার কারণ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন , প্রকৃত ইসলামকে তুলে ধরা এবং ইসলামের নবীর ব্যাপারে পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টানদের স্মৃতিশক্তিকে জাগিয়ে তোলাই ছিল এই গ্রন্থ রচনার মূল উদ্দেশ্য। তিনি লিখেছেন,পশ্চিমাদের উচিৎ রঙীন এই পৃথিবীর গোলকধাঁধায় সত্য ও সঠিক পথে পরিচালিত হবার জন্যে হযরত মুহাম্মাদ ( সা. ) এর শিক্ষা গ্রহণ করা।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকার বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলাম ও মহানবীর শানে আঘাত হানার ঘটনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মিসেস আর্মস্ট্রং তাঁর পূর্বলিখিত `মুহাম্মাদ’ বইটির ভূমিকা পুনরায় লেখেন। নতুন করে লেখা ভূমিকায় তিনি লিখেছেন , বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার মতো সহিংস ঘটনা ইসলাম এবং মুহাম্মাদের আত্মা ও স্বভাব চরিত্রের সম্পূর্ণ বিরোধী। তাঁর ভাষায়-ইসলাম শব্দটির অর্থ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পিত ও অনুগত। শব্দটি €˜’সালাম’ অর্থাৎ €˜’শান্তি’ থেকে এসেছে। রাসূলের বাস্তব জীবনপদ্ধতিও এই নীতির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূলের যুগে রক্তপাত , প্রতিহিংসা , প্রতিশোধ পরায়নতার মতো জাহেলী যুগের বদ অভ্যাসগুলো সমূলে অপসারিত হয়ে গিয়েছিল। যে-কোনো পরিস্থিতি বা ঘটনাকে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করতেন এবং তাঁর সমকালীন অন্যান্য ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক বেশী উন্নত ও যুক্তিপূর্ণ সমাধান দিতেন। মিসেস আর্মস্ট্রং বলেন : ]”হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর সমগ্র জীবন প্রমাণ করে যে , সবকিছুর আগে আমাদের উচিত আমাদের মাঝ থেকে স্বার্থপরতা , ঘৃণা , অন্যদের চিনন্তা ও বিশ্বাসকে উপেক্ষা করার প্রবণতাগুলো দূর করা। আর তা সম্ভব হলে আমরা বিশ্ববাসীর জন্যে একটি সুন্দর , দৃঢ় ও নিরাপদ পৃথিবী গড়তে সক্ষম হবো। যেই পৃথিবীতে মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করবে। যেখানে থাকবে না কোনো জুলুম-নির্যাতন কিংবা কোনোরকম বৈষম্য।”
বিশ্ববাসীর পক্ষে আজ তাঁকে চেনার ও বোঝার সময় এসে গেছে। তাঁর শিক্ষাকে কাজে লাগানো আজ বিশ্ববাসীর জন্যে খুবই প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদেরকে এই শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্বের জীবনাদর্শ থেকে উপকার লাভ করবার তৌফিক দিন।

ইরানী বাদশাহ খসরু আনুশিরভন তাঁর নিজস্ব প্রাসাদ ফিরোযা প্রাসাদে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কিয়নী রাজবংশের হরিণা নক্সার সোনার মুকুট তাঁর সিংহাসনের পাশেই রক্ষিত ছিল। হঠাৎ যুদ্ধের দামামা বা রণবাদ্য বেজে উঠলো। রণবাদ্যের ধ্বনির ফলে তাঁর বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটলো। মর্মর পাথরের টুকরো প্রাসাদ থেকে ঝরে পড়তে লাগলো। প্রাসাদের বিভিন্ন কোণ থেকে রক্ষীদের চীৎকার শোনা যাচ্ছিল : ভেঙ্গে গেল, কেস্€Œরার দ্বারমনন্ডপ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। প্রাসাদের দেওয়াল ধ্বসে পড়লো’ ইত্যাদি। বাদশাহ খসরু ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগলো। একবার যায় বাগানের দিকে , একবার যায় বারান্দায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো বিস্ময়ের সাথে চারদিকে চোখ ফেরাতে লাগলো। হঠাৎ দেখতে পেলো বোযোর্গমেহের পন্ডিতকে। তাঁকে বললো : হে পন্ডিত কী এক অদ্ভুত রাত্রি। দুই দুটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। একটা হলো-আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। দ্বিতীয়টা হলো আমার প্রাসাদ ধ্বসে পড়েছে। স্বপ্নে দেখলাম এই অন্ধকার রাতে হেজাযের দিক থেকে সূর্য উঠেছে। ঐ সূর্যের আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে পড়েছে। কেবল আমার প্রাসাদের আঁধার দূরীভূত হয় নি। আমি ঐ আঁধার দেখে ভয় পেয়ে যাই। হঠাৎ আমার প্রাসাদ ভেঙ্গে পড়ার শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠি। এই সূর্য ওঠার ব্যাপারটা কী বলুন তো ? বোযোর্গমেহের বললেন , “একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটবে যাঁর ক্ষমতা বাদশাহদের চাইতে অনেক অনেক বেশী , তাঁর জ্ঞানও সকল পন্ডিতের চেয়ে অনেক অনেক বেশী। তাঁর যে আলো , তা আল্লাহ প্রদত্ত। তাঁর কথার নূরে সারা পৃথিবী আলোকিত হবে। প্রাচীন ধর্মগুলো গাছের হলুদ পাতা ঝরে পড়ার মতো মন’র হয়ে যাবে। বারান্দা ভেঙ্গে পড়া মানে সেই মহামানবের জন্ম হয়েছে। চল্লিশ বছর পর তাঁর ব্যাপারে জানা যাবে।”
ঐদিন সকালবেলা,আনুশিরভনের মাথা থেকে তখনো গতরাতের দুর্ঘটনার চিন্তাযায় নি। এমন সময় একজন ঘোড় সওয়ার এসে বললো : “হে বাদশাহ ! আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটেছে। হাজার বছর ধরে জ্বলন্ত ফার্সের অগ্নিমন্দিরের আগুন গতরাতে নিভে গেছে। অগ্নিমন্দির ঠান্ডা হয়ে গেছে। তারচেয়েও আশ্চর্য ঘটনা হলো গতরাতে ক্বাবা কেঁপে উঠেছিল এবং তারফলে কাবার ভেতরের মূর্তিগুলো মাটিতে পড়ে গেছে।” এমন সময় আরেক দূত এসে বললো : “বাদশাহ ! গতরাতে সভে হ্রদটি শুকিয়ে গেছে। ফলে যারা সভে হ্রদের পূজা করে , তারা বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে পড়েছে। মনে হয় বড়ো ধরনের কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।”
বাদশা আনুশিরভন স্বপ্নব্যাখ্যাকারী এবং পূর্বাভাসকারীদের ডেকে পাঠালেন। তাদের সবাই মক্কার আকাশে এক তারকার উদয়ের কথা বললেন। যেই তারকা বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন ঘটাবে। এভাবেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সর্বশেষ প্রেরিত দূতের জন্মমুহূর্তে বিশ্বকে তাঁর বরকতপূর্ণ পদক্ষেপের জন্যে প্রস্তুত করলেন।
ঐ রাতে মা আমেনার আশ্চর্যরকম এক অনুভূতি হয়েছিল। বেশ কয়েকমাস গত হয়ে গেল তাঁর স্বামী আব্দুল্লাহ মারা গেছেন , তিনি দিন-রাত স্বামীর মৃত্যু ভাবনায় ভারাক্রান্ত ছিলেন। এখন তাঁর সন্তানের জন্মলগ্ন এসে গেছে। সুবেহ সাদেকের সময় মা আমেনা যখন তীব্র বেদনা অনুভব করছিলেন তখন স্বগতোক্তি করছিলেন : আব্দুল্লাহ যদি এই সময় জীবীত থাকতেন ! যদি তাঁকে একা রেখে না যেতেন ! ঠিক এ সময় আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমেনার ঘর আলোয় আলোকিত হয়ে গেল। তিনি যা দেখলেন , তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাঁর মনে হলো যেন আকাশের সব তারা তাঁর ঘরে অবতরণ করছে। তাঁর বিস্ময় না কাটতেই আলোকোজ্জ্বল কয়েকজন নারী এসে তাঁর শিয়রে বসলেন। নারীদের একজন বললেন : আমি আসিয়া ! ফেরাউনের স্ত্রী ! অন্যজন বললেন : আমি মারিয়াম , ইমরান ( আ ) এর মেয়ে। কিছুক্ষণ পর একটি পুত্র সন্তনের জন্ম হলো। শিশুটির আগমনের সাথে সাথে সারা পৃথিবী যেন আলোকিত হয়ে গেল। এই অবস্থায় আমেনা একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন : তোমার এই সন্তানের মাঝে বিগত নবীদের উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একত্রীভূত হয়েছে। যেমন , তাঁর সত্ত্বায় রয়েছে নূহ ( আ ) এর বীরত্ব ও সাহস , রয়েছে ইব্রাহীম ( আ ) এর আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ নির্ভরতার বৈশিষ্ট্য , রয়েছে ইউসূফ ( আ ) এর আকৃতি-প্রকৃতি। আরো আছে মূসা ( আ ) এর যথার্থ বাকপটুত্ব ও অবিচল দৃঢ়তা এবং হযরত ঈসা ( আ ) এর পরহেজগারী এবং দয়া-দাক্ষিণ্য।
ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে , মুহাম্মাদ (সা) এর জন্মের পর থেকে তাঁর নবুয়্যতি লাভ করা পর্যনন্ত একের পর এক ঘটনাবলীর ধারা বিদ্যমান ছিল। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী মরুধাত্রীদের অনেকেই তাদের জীবিকার অন্বেষণে মক্কায় আসতো দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাদেরকে নেওয়ার জন্যে। তারা দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাদেরকে নিয়ে ধাইমা হিসেবে দুধ খাওয়াতো। কিন্তু মুহাম্মাদ যেহেতু ইয়াতিম এবং গরীব ছিলেন , সেজন্যে তাঁকে মরুনারীদের কেউই গ্রহণ করতে চাইলো না। হালিমা নামের দুর্ভিক্ষ কবলিত এক মরুনারীর ভাষ্য ছিল এ রকম : কোনো ধনী পরিবারের সন্তান আমার ভাগ্যে জুটলো না। মুহাম্মাদ নামের এক নবজাতক আমার ভাগ্যে জুটলো। তার মা কিংবা দাদা আমাদেরকে কোনো উপহার পর্যন্ত দিতে পারলো না। কিন্তু আমরা মক্কা থেকে খুব বেশি দূরে যেতে না যেতেই আশ্চর্যরকমভাবে উপলব্ধি করলাম,আমার শুষ্ক বুক দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এই পরিমাণ দুধ এলো , যাতে আমার নিজের সন্তান এবং মুহাম্মাদ উভয়েরই ক্ষুধা মেটে। যখন ঘরে পৌঁছলাম , আমার স্বামী ব্যাকুল হয়ে বললো : হালিমা দেখ ! দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও আমাদের উষ্ট্রীগুলো কেমন দুগ্ধপূর্ণ হয়ে উঠেছে ! সেই থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছি , এই সন্তানটি কল্যাণ এবং বরকতপূর্ণ। এই সন্তান নিশ্চয়ই আমাদেরকে সুখি ও সৌভাগ্যশালী করে তুলবে।
মুহাম্মাদ ( সা ) পাঁচ বছর বনী সাদ গোত্রে তাঁর শৈশবকাল কাটিয়েছেন। সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন। এই সময়ে নবীজীর শিশুসুলভ আচার-ব্যবহার অন্যান্য শিশুদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা বা স্বতন্ত্র ছিল। একদিন মুহাম্মাদ হালিমার কাছে এসে অন্য একটি শিশুর সাথে মরুভূমিতে যাবার অনুমতি চাইলো। হালিমা অনুমতি দিল ঠিকই , তবে বেশ উৎকণ্ঠিত হলো। হালিমা মুহাম্মাদকে সাজিয়ে গুজিয়ে দিলো। গলায় একটা হার পরিয়ে দিল। মুহাম্মাদ জিজ্ঞেস করলো-এটা কী ? হালিমা উত্তর দিলো-এটা তোমাকে হেফাজত করবে এবং তোমাকে বদনজর থেকে মুক্ত রাখবে। শিশু মুহাম্মাদ তখন তার ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে মালাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলে বললো-আমার এমন কেউ আছেন যিনি আমাকে রক্ষা করবেন। এই বলে মরুভূমির দিকে চলে গেল। কিন্তু হালিমার আর পলক পড়লো না। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে ভাবলো-এই শিশু কীকরে এরকম পন্ডিতের মতো কথা বলে !
যাই হোক , এভাবে কিছুদিন মরুতে বসবাস করবার পর শিশু মুহাম্মাদ মক্কায় ফিরে আসে এবং মায়ের অতুলনীয় ভালোবাসা আর স্নেহ-প্রেমের উষ্ণ ছোঁয়ায় কাটাতে থাকে। মাত্র ছয় বছর বয়সেই মুহাম্মাদ তাঁর মোহনীয় দৃষ্টি , চমৎকার চেহারা আর বিচক্ষণ কথাবার্তার জন্যে সবার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। একদিন মদীনার কোনো এক আত্মীয়ের সাথে দেখা করবার জন্যে মা আমেনা পুত্র মুহাম্মাদকে নিয়ে রওনা দেন। কিন্তু ফেরার সময় মাঝপথে এসে মা আমেনা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ইহলীলা ত্যাগ করেন। তারপর থেকে আব্দুল মোত্তালেব শিশু মুহাম্মাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আব্দুল মোত্তালেব এই শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অপেক্ষায় ছিলেন। সেজন্যে তার ব্যাপারে বেশ সতর্ক ছিলেন এবং যথাসাধ্য তার যত্ন নিতেন। মুহাম্মাদের প্রতি তাঁর স্নেহ দিনদিনই বৃদ্ধি পেতে লাগলো। কিন্তু আট বছর বয়সেই শিশু মুহাম্মাদ তার পৃষ্ঠপোষক আব্দুল মোত্তালেবকেও হারায়।
মুহাম্মাদ তরুণ বয়সে পৌঁছলেন। তাঁর বিশেষ যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল , সেসবের জন্যে তিনি তাঁর সমবয়সীদের মাঝে ছিলেন স্বতন্ত্র। প্রায়ই তিনি চিন্তর সাগরে নিমজ্জিত হয়ে যেতেন। পিতা-মাতা এবং দাদা মারা যাবার পর চাচা আবু তালেব পরম আদর যত্নে তাঁকে লালন পালন করেন। আবু তালেব মুহাম্মাদকে ভীষণ ভালবাসতেন। তাঁর সহৃদয় ভালোবাসার কারণে এতিম এই বালকটির স্বজন হারানোর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছিল। আবু তালেব ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একদিন মুহাম্মাদ শুনতে পেলেন যে , চাচা সিরিয়া সফরে যাচ্ছেন , তার মানে তাঁর চাচা কিছুদিন তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকবেন। একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন মুহাম্মাদ। মনে মনে বললেন , চাচা যদি আমাকেও তাঁর সফরসঙ্গী করতেন। ছয় বছর হয়ে গেছে মক্কার বাইরে যান নি মুহাম্মাদ। তাঁর মন ছিল ভীষণ কৌতূহলী। অজানাকে জানার জন্যে তাঁর মন সবসময় সফরে যেতে চাইতো। কারণ সফর তাঁর এই কৌতূহলী মনের চাহিদা কিছুটা মেটাতো। সিরিয়া সফরের জন্যে তাঁর আকুলতা এতোই ছিল যে , তিনি তাঁর চাচার কাছে গিয়ে কাফেলার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। কাফেলা সফর শুরু করার জন্যে প্রস্তত ছিলো। আবু তালিব উটের পিঠে বসা ছিলেন আর কাফেলাকে বিভিন্ন সামগ্রী বা মাল-সামানা দিচ্ছিলেন। মুহাম্মাদ একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে চাচার উটের লাগামটা হাতে নিলেন এবং বললেন : চাচাজান ! এমন কী হতো আমাকেও যদি আপনার সাথে নিয়ে যেতেন ! মুহাম্মাদের চেহারা দেখে আবু তালিবের মনে ঝড় বয়ে গেল। তিনি উটের পিঠ থেকে নেমে এলেন এবং মুহাম্মাদকে জড়িয়ে ধরে বললেন : মুহাম্মাদ ! প্রিয় আমার ! তুমি কি জানো , তোমার ভারাক্রান- চেহারা দেখাটা আমার জন্যে কতো কষ্টের ! এই বলে আবু তালিব তাঁর স্নেহভরা দু’হাত দিয়ে মুহাম্মাদকে আদর করে দিলেন এবং সফরের কষ্টের কথা চিন্তা না করেই সিদ্ধান্ত নিলেন , তাঁকে সাথে নিয়ে যাবেন। এই খবর শুন মুহাম্মাদ ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন।
কাফেলা মক্কার উত্তরের পাহাড়গুলোকে পেছনে ফেলে চলে গেল। মক্কার সুপরিচিত শহর ধীরে ধীরে মুহাম্মাদের দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল। তিনি তাঁর আশেপাশের সবকিছু দেখতে লাগলেন। বিসতৃত মাঠ-প্রান-র , প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখে তিনি বেশ উৎফুল্ল বোধ করতে লাগলেন। এ সময় মুহাম্মাদের বয়স ছিল বারো। তরুণ বয়সের সফর বলে তাঁর কাছে এটি ছিল সুখকর ও স্মৃতিময়। মুহাম্মাদ নীরবতা এবং একাকীত্ব ভীষণ ভালোবাসতেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি বেশ অভিভূত হতেন। কাফেলা অনেক দূর পেরিয়ে সামুদ জাতির বসবাসের উপভোগ্য আবহাওয়াময় অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছলো। আবু তালিব তখন আল্লাহর নাফরমানীর কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐ ধনী সমপ্রদায়টির গল্প মুহাম্মাদকে শোনালেন। বিচিত্র এলাকা , শহর , মানুষ , আইন-কানুন , বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি , পাহাড়ের পর পাহাড় , উপত্যকা আর তারাভরা মরুভূমির আকাশ দেখে আনন্দিত যেমন হলেন , তেমনি তাঁর জন্যে শিক্ষণীয়ও ছিল অনেক কিছু। কয়দিনের মধ্যেই কাফেলা সিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছলো।
মুহাম্মাদ কৌতূহলী ও সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে সবকিছু দেখতে লাগলেন ,মূল্যায়ন করতে লাগলেন এবং স্মৃতিভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন। এইসব মিষ্টি অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর সফরের ক্লানি- যেন অনুভূতই হলো না। তাছাড়া চাচাজানের সঙ্গে থাকার কারণে অন্যরকম মজা পাচ্ছিলেন। অনেকটা পথ পাড়ি দেবার পর কাফেলার মাঝে ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁরা বসরা নামক এলাকায় পৌঁছলেন। মুহাম্মাদ উটের পিঠে বসে ছিলেন। আবু তালিবের আদেশে কাফেলার সবাই একটি টিলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। টিলার চূড়ায় ছিল একটা গির্জা। এটা ছিল বুহাইরার গির্জা। এই গির্জাটি সে সময় খুব নামকরা ছিল। বুহাইরা ছিল বেশ জ্ঞানী ও পন্ডিত ব্যক্তি। তাওরাত-ইঞ্জিলসহ আগের সকল বিষয় সম্পর্কেই তিনি জানতেন। সেজন্যে দূরের এবং কাছের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বুহাইরাকে দেখতে তার গির্জায় আসতো। যাই হোক , কিছু সময় পর এই বুহাইরার দূত কাফেলার নেতার কাছে এলো। আবু তালিবের কাছে গিয়ে সে বললো : বুহাইরা আপনাদেরকে মধ্যাহ্ন ভোজের দাওয়াত দিয়েছেন। আবুতালিব এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এই খবর শুনে বেশ বিস্মিত হলেন। তাঁদের একজন বলে উঠলেন-“বছরের পর বছর এই এলাকা অতিক্রম করেছি , অথচ এই প্রথমবারের মতো বুহাইরা আমাদেরকে এভাবে দাওয়াত করলেন।” আবু তালিব বুহাইরার দাওয়াত গ্রহণ করলেন এবং ঠিক হলো যে , মুহাম্মাদ কাফেলার জিনিসপত্র দেখাশোনার দায়িত্বে থাকবেন আর বাকি সবাই বুহাইরার আমন্ত্রণে যাবেন।
গির্জায় বিচিত্র খাবারের আয়োজন করা হলো। বুহাইরা মেহমানদের অভ্যর্থনা জানালেন আর গভীরভাবে মেহমানদের চেহারাগুলো লক্ষ্য করে বললেন : তোমরা মনে হয় তোমাদের একজন সাথীকে সঙ্গে আনো নি। তাঁরা বললো : হ্যাঁ , একটা শিশুকে আমরা আমাদের মালামাল দেখাশোনা করার জন্যে রেখে এসেছি। বুহাইরা বললো : তাকেও নিয়ে আসো। মুহাম্মাদ যখন গির্জায় এলেন , বুহাইরা তখন গভীর দৃষ্টিতে মুহাম্মাদকে দেখতে লাগলেন এবং নিজের পাশে বসিয়ে ভীষণ আদর-যত্ন করতে লাগলেন। খাওয়া-দাওয়া সারবার পর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে কাফেলার লোকজন যেতে উদ্যত হলো। বুহাইরা মুহাম্মাদ এবং আবু তালিবকে রেখে অন্য সবাইকে যেতে দিলো। সবাই চলে যাবার পর বুহাইরা নিরিবিলি আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করলেন : “তোমার এবং এই যুবকের মাঝে কি কোনো সম্পর্ক আছে “? আবু তালিব বললেন : ও আমার সন্তান। বুহাইরা বললো : না , তার তো বাবা-মা থাকার কথা নয়। অল্পবয়সেই সে তার বাবা-মাকে হারিয়েছে। আবু তালেব বললো : হ্যাঁ , আমি তার চাচা এবং তার অভিভাবক। বুহাইরা মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলো। মুহাম্মাদ তাঁর নাম বললেন। বুহাইরা জবাব দিলো : হ্যাঁ , এরকমই তো। মুহাম্মাদ অথবা আহমাদ।
হে আমার সন্তান ! তোমাকে লাত-ওয€Œযার শপথ দিচ্ছি।
মুহাম্মাদ সাথে সাথে বললেন : লাত-ওয্‌যা নিয়ে আমার সাথে কোনো কথা বলো না। এই পৃথিবীর বুকে তাদের চেয়ে ঘৃণিত আর কোনো বস্তু আমার কাছে নেই। বুহাইরা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো : তোমাকে তোমার খোদার শপথ দিয়ে বলছি , আমার প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব দাও ! আবু তালিব তখন বললেন : নিশ্চিত থাকুন হে পাদ্রি ! আজ পর্যন্ত তার কাছ থেকে কেউই সত্য ব্যতীত অন্য কিছু শোনে নি।
বুহাইরা আনন্দের সাথে মুহাম্মাদকে জিজ্ঞেস করলো : হে মুহাম্মাদ ! আমাকে বলো ! কোন্‌ জিনিস তুমি বেশী পছন্দ করো। মুহাম্মাদ বললেন : একাকীত্ব। বুহাইরা আবার জিজ্ঞেস করলেন : একাকী কী চিন্তা কর বা কী নিয়ে ভাবো ! মুহাম্মাদ বললেন : স্রষ্টা ও সৃষ্টিজগত নিয়ে , জন্ম-মৃত্যু নিয়ে , সত্ত্বা নিয়ে , অন্যভূবন নিয়ে। বুহাইরা জানতে চাইলো : বিশ্বে যা কিছু দেখ , তার মধ্যে সবচে বেশী পছন্দ করো কী ? মুহাম্মাদ বললো : প্রকৃতি , আর প্রকৃতির মধ্যে আকাশ এবং তারকারাজি বেশী পছন্দ করি। বুহাইরা জানতে চাইলো : তুমি কি স্বপ্ন বেশি দেখো ? জবাবে মুহাম্মাদ বললেন : হ্যাঁ ! এবং তারপর সেগুলোকে বাস্তবেও লক্ষ্য করি। বুহাইরার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বিস্ময়ের সাথে আবু তালেবের কাছে মুহাম্মাদের কাঁধ দুটি দেখতে চাইলো। আবু তালেব মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে অসম্মতি জানাবার মতো কিছু দেখলেন না। তাই দেখালেন। বুহাইরা মুহাম্মাদের দুই কাঁধের মাঝখানে তিল দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেললো। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
পেরেশান হয়ে সে বললো : ঐশীগ্রন্থ এবং পূর্ববর্তীগণ যেরকম বলে গেছেন হুবহু সব মিলে যাচ্ছে। সে মুহাম্মাদ এবং আহমাদ। তোমার ওপর দরুদ হে ঐশীগ্রন’সমূহের রহস্য ! তোমার ওপর দরুদ! হে খোদার অনুগ্রহের প্রকাশস’ল। তুমি তো সে-ই , তাওরাত ইঞ্জিলে যাঁর আগমনের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ যাঁর লক্ষণগুলো বর্ণনা করে গেছেন। বুহাইরা আবু তালিবের দিকে তাকিয়ে বললো : তোমার ভাতিজার মাধ্যমে বিশাল বিশাল ঘটনা ঘটবে। সে মূর্তিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করবে। মানুষের চোখের সামনে থেকে শের্‌ক এবং কুফুরির পর্দা ছিন্ন করবে। সে সর্বশ্রেষ্ঠ আদম সন্তান এবং সর্বশেষ ঐশীদূত। এই শিশুর ভবিষ্যত উজ্জ্বল। তার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থেকো। আমি বিভিন্ন গ্রনে’ পড়েছিলাম যে একদিন সে এই ভূখন্ড অতিক্রম করবে। এই বলে বুহাইরা উঠে গেলো। আকাশের দিকে তাকালো। তারপর মুহাম্মাদের পবিত্র চেহারার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো : আহা ! আমার জীবনটা যদি এতোটুকু দীর্ঘ হতো যে , তোমার দাওয়াতী কাজের জমজমাট অবস্থাটা দেখে যেতে পারতাম !

সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। মুহাম্মাদ ( সা ) এখন যুবক। এই সময়টায় চাচা আবু তালিবের জীবন বেশ কষ্টে কাটছিল। আবু তালিবের বয়স তখন পঞ্চাশের উপরে। পাঁচটি সন্তান ছিল তাঁর। সিরিয়ায় যে সফরকালে মুহাম্মাদ ( সা )ও সাথে গিয়েছিলেন , ঐ সফরের পর আবু তালিব আর বাণিজ্যিক সফরে সিরিয়া যেতে পারেন নি। মুহাম্মাদ ( সা ) সবসময়ই চেষ্টা করতেন , যে-কোনো উপায়ে চাচাকে সঙ্গ দিতে বা সহায়তা করতে। তাই তিনি প্রায়ই চাচার দুম্বাগুলোকে মরুভূমিতে চরাতে নিয়ে যেতেন। মুহাম্মাদের দয়া-দাক্ষিণ্যের কথা ছিল সবার মুখেমুখে। যতোই দিন যাচ্ছিল , জনগণের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। তাঁর দৃষ্টি ছিল সদয়, সলজ্জ ও বিনয়ী। তাঁর কথাবার্তা ছিল বসন্তের বৃষ্টির মতো সতেজতাপূর্ণ এবং হৃদয়গ্রাহী। তাঁর কথাবার্তা অন্তরে যেন প্রাণের সঞ্চার করতো। তাঁর আচার-ব্যবহার ছিল তাঁরি নিষ্কলুষ মন ও মননের অকৃত্রিম দর্পন। অথচ এই আচার-ব্যবহার বা চারিত্র্যিক এই শিক্ষা তিনি তাঁর মুরুব্বিদের কাছে পান নি। তাঁর আচার-ব্যবহার, তাঁর স্বভাব-চরিত্রের সৌন্দর্য ছিল সহজেই দৃষ্টিগ্রাহ্য।
পঁচিশ বছর বয়সেই তাঁর সততা ও সত্যবাদিতার কথা ছিল মক্কার জনগণের মুখে প্রবাদতুল্য। কুরাইশ গোত্রের ঘরে ঘরে তাঁর মতো সচ্চরিত্র ও সাহসী আর কোনো যুবক ছিল না। তাঁর আধ্যাত্মিকতা ও ব্যক্তিত্বের সুষমা সবাইকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতো। সত্যকথা বলা এবং সঠিক ও যথার্থ কাজটি করার ব্যাপারটি এমন পর্যায়ের ছিল যে , জনগণ তাঁকে “আমিন” অর্থাৎ বিশ্বস- বা আস্থাভাজন উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর বিশ্বস-তা সম্পর্কে আবিল হামিসা চমৎকার একটি ঘটনা বলেছেন। ঘটনাটি তাঁর ভাষায় এ রকম : ‘আমি একদিন মুহাম্মাদের ( সা ) কাছে একটি জিনিস বিক্রি করেছিলাম। জিনিসটার দাম সামান্য বাকি ছিল। কথা ছিল , বাকী দামটা পরের দিন মক্কার বাজারের পাশে তার কাছ থেকে নেবো। কিন্তু আমি যে তাকে কথা দিয়েছিলাম , তা বেমালুম ভুলে গেলাম। অন্য একটা কাজে আমি মক্কার বাইরে চলে গেলাম। সেখানে তিনদিন থাকতে হয়েছিল আমাকে। তৃতীয় দিবসে অবশ্য মক্কায় প্রবেশ করলাম এবং যে স্থনটায় থাকবো বলে মুহাম্মাদকে কথা দিয়েছিলাম , ঐ স্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। দেখলাম মুহাম্মাদ ( সা ) উঁচু একটা জায়গায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁকে দেখেই আমার মনে পড়ে গেল তাকে কথা দেওয়ার ব্যাপারটি। তার দিকে এগিয়ে গেলাম। কথা বলে বুঝলাম , সততা এবং পবিত্রতার পরাকাষ্ঠা এই যুবক তিনদিন হলো নির্ধারিত সময়টাতে এখানে এসে আমাকে আমার দেনা পরিশোধ করবার জন্যে অপেক্ষা করেছে। তার বিশ্বস্ততায় আমি বিস্মিত হলাম আর আপন ভুলের জন্যে অর্থাৎ কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারার কারণে লজ্জিত হলাম। সেই থেকে বুঝলাম জনগণ কেন তাঁকে বিশ্বস্ত উপাধি দিয়েছে এবং এই বয়সে তাঁকে কেন মানুষ এতো বেশী শ্রদ্ধা-সম্মান করে।
মরুপ্রান্তরের প্রতি মুহাম্মাদের ছিল অন্যরকম আকর্ষণ। বিশেষ করে রাতের বেলা তারাভরা মরুর আকাশ তাঁকে ভীষণভাবে টানতো। তিনি রাতের আকাশকেই বেশি পছন্দ করতেন। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি চিন্তার সাগরে ডুবে যেতেন। ভাবতেন : আকাশ এবং তার অগণিত তারা কতো সুন্দর এবং উজ্জ্বল। নিশ্চয়ই এগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। সত্যিই , কেবল অনন্য ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহই পারেন বিস্ময়কর সুন্দর এই বিশাল পৃথিবী সৃষ্টি করতে। চাঁদ-সূর্য , পাহাড়-পর্বত ,মরু-প্রান্তর , মানুষ , সকল চতুষ্পদী এবং বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণীসহ সমগ্র সৃষ্টিকুল একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতা রাখেন। এই ধরনের চিন্ত মুহাম্মাদের ( সা ) অন্তরাত্মাকে অন্তর্মুখি বা ধ্যানী করে তুলতো।
এই অন্তর্মুখি চিন্তাই তাঁকে নুর পাহাড়ের অপার রহস্যময় নীরব-নিঃসঙ্গ স্থানে নিয়ে যেত , যাতে শহুরে শোরগোলের বাইরে গিয়ে প্রয়োজনীয় গোপণ ইবাদাতে মশগুল হওয়া যায়। নুর পাহাড়ের দক্ষিণ উপত্যকার “হেরা গুহা” ছিল তাঁর এই নিঃসঙ্গ ও গোপন ইবাদাতের জন্যে সবচে প্রিয় স্থান। হেরা গুহায় যাবার পার্বত্য পথটি ছিল দুর্গম-বন্ধুর ও কঙ্করময়। কিন্তু বারবার যাওয়া-আসা করতে করতে দুর্গম ঐ পথ অতিক্রম করা তাঁর জন্যে আর কষ্টকর ছিল না। নুর পাহাড়ের দক্ষিণ পাদদেশে গর্তের মতো দেখতে এই গুহাটিকে দেখলে মনে হয় যেন কতোগুলো পাথর একটার পর একটা স্থাপন করা। এগুলোর নীচেই গুহার মতো জায়টাটি রয়েছে। এই জায়গাটির প্রতিই ছিল মুহাম্মাদের ( সা ) অনন্তরের গভীর টান। হেরা গুহার অবস্থানটা ছিল এমন যে , মুহাম্মাদ ( সা ) যদি দাঁড়াতেন কিংবা বসতেন , তাহলে তাঁর প্রিয় কাবা শরীফকে দেখতে পেতেন। মুহাম্মাদ ( সা ) ঘণ্টার পর ঘণ্টা মক্কামুখি হয়ে বসে গুহার ছিদ্রপথে মক্কা শহরটাকে ভালো করে দেখতেন। এই শহরটাকে তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। কিন্তু এই শহরে প্রচলিত জাহেলি কর্মকান্ড আর অপসংস্কৃতির কারণে তিনি ভীষণ মর্মাহত ছিলেন। গোত্রে গোত্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা , মূর্তি পূজা ,কন্যা সন্তানকে জীবীত কবর দেওয়া , নিরীহ মানুষকে বিপদে ফেলে স্বার্থোদ্ধার করা ইত্যাদি অমানবিক কর্মকান্ডে তিনি খুবই দুঃখ পেতেন। তিনি সবসময় কামনা করতেন , এমন যদি হতো-যে জীবন প্রবাহ মানুষকে নোংরামি আর কষ্টের দিকে ঠেলে দেয় , সেরকম পরিস্থিতি আর না থাকতো ! নিরীহ ও অত্যাচারিতদের সাহায্যার্থে তাঁর অন্তরাত্মা অস্থির হয়ে পড়তো। তিনি একটা তরুণ সঙ্ঘে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই সংগঠনটি বিখ্যাত হয়ে পড়ে। বিখ্যাত হবার কারণ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার অবতারণা করা যেতে পারে। একদিন মধ্যবয়সী ,স্লিমদেহী এক লোক কাবার পাশের একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বললো : হে কুরাইশবাসী ! একজন নিরীহ লোক মক্কার মতো শহরে তার মাল-সামানা সব হারিয়েছে। ঐ ব্যক্তি বনী যুবাইদ গোত্রের বাসিন্দা। সে মক্কায় এসেছে তার মালামাল বিক্রি করতে। কিন্তু “আস ইবনে ওয়ায়েল” তার কাছ থেকে মালামাল কিনে মূল্য পরিশোধ করে নি। মুহাম্মাদ ( সা ) এই কথা শুনে ভীষণ কষ্ট পেলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন অত্যাচারিত এই নিরীহ লোকটির অধিকার যে-কোনো উপায়েই হোক আদায় করিয়ে দেবেন। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে শেষপর্যন্ত চাচা যুবায়েরের কাছে ব্যাপারটা খুলে বলাকেই তিনি শ্রেয় মনে করলেন। যুবায়ের এই ঘটনা শুনে শহরের কয়েকজন যুবককে একত্রিত করলেন এমন একটা উপায় খুঁজে বের করবার জন্যে যাতে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কোনো ঘটনা আর না ঘটে। তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিরীহ-অসহায় ও অত্যাচারিতদের সহযোগিতা এবং তাদের সমস্যা সমাধানকল্পে একটা সংগঠন দাঁড় করালেন। এই সংগঠনে মুহাম্মাদ ( সা ) নিজেও যোগ দিলেন।
এই তরুণ সঙ্ঘের খবর মক্কার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। মক্কার জনগণ যুবকদের এই মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায়। পরদিন এই সঙ্ঘের পক্ষ থেকে আস ইবনে ওয়ায়েলকে একটি বার্তা পাঠালেন যেন আগন’ক ব্যক্তিকে তার মালামালের দাম বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আস এই বার্তা পেয়ে সাংঘাতিক ভয় পেয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেয়। এই তরুণ সঙ্ঘটিই প্রথম কোনো সংগঠন যার সাথে মুহাম্মাদ ( সা ) যোগ দিয়েছিলেন। অত্যাচারিতদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি তিনি কখনোই ভোলেন নি। এই ধরনের মহতী কাজে তিনি এতো বেশী খুশি হতেন যে , নিজেই বলতেন : “এই প্রত্যয়ী ও মহতী কাজে আমি এতোবেশি খুশি যে এর পরিবর্তে আমাকে যদি কেউ লাল পশমি উটও দান করতো তাহলেও আমি ততোটা খুশি হতাম না।” মুহাম্মাদ ( সা ) প্রতিদিন আবু তালিবের মেষগুলোকে মরুভূমিতে চরাতে নিয়ে যেতেন। চাচার খেদমত বা সহযোগিতা করার কথা তিনি মুহূর্তের জন্যেও ভুলতেন না। একদিন মুহাম্মাদ ( সা ) মরুভূমিতে যাবার জন্যে প্রস’তি নিচ্ছিলেন। এমন সময় আবু তালিব তাঁকে ডেকে বললেন : €˜বাবা ! তোমার জন্যে একটা খবর আছে।’ মুহাম্মাদ ( সা ) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে চাচার পাশে বসলেন এবং আদ্যোপান- মনোযোগের সাথে চাচার কথাগুলো শুনলেন। চাচা বলছিলেন :”খোয়াইলিদের কন্যা খাদিজা তোমার জন্যে একটা প্রস্তব পাঠিয়েছে। তুমি জানো কিনা জানি না ! কিছুদিন আগে তাঁর স্বামী মারা গেছে। স্বামী তাঁর জন্যে প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে গেছে। খাদিজা এগুলো দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। প্রতিবছর মালামাল নিয়ে সিরিয়া এবং ইয়েমেনে যান। তোমাকে তিনি ভীষণ বিশ্বস্ত ও সচেতন ব্যক্তি বলে মনে করেন। তাই চাচ্ছেন , তোমাকে নিয়ে বাণিজ্যে যেতে।”
মুহাম্মাদ ( সা ) খাদিজা সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছেন। শুনেছেন যে , খাদিজা একজন সম্পদশালী ও সম্ভ্রান্ত নারী। মক্কায় তাঁর অনেক সুখ্যাতি আছে। এমনকি মদিনা এবং সিরিয়ার ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত তাঁকে চিনতো। খাদিজা সে সময়কার অত্যন্ত পূত-পবিত্র ও মহিয়সী এক নারী ছিলেন। যে সময় সুদ-ঘুষ খাবারের প্রচলন ছিল অহরহ , সে সময় তিনি অভাবী লোকজনকে টাকা-পয়সা হাওলাত দিতেন। ফেরত দেওয়ার সময় কোনোরকম সুদ বা অতিরিক্ত পয়সা নিতেন না। গরীব-দঃখী আর অসহায়দের সাহায্য সহযোগিতা করবার ক্ষেত্রে তাঁর খ্যাতি ছিল প্রবাদতুল্য। আবু তালিব তাঁর ভাতিজাকে আরো বললেন : “মুহাম্মাদ ! তুমি এখন যথেষ্ট জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন এক সচেতন যুবক। যদিও আমি তোমার উষ্ণ সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হতে চাই না , তবু বাস্তবতা হলো , তোমার এখন নিজের জীবনকে সাজাবার সময় এসে গেছে। আমি ভীষণ লজ্জিত যে , তোমার জন্যে কোনো সম্পদ আমি রেখে যেতে পারি নি। তবে আমি আশাবাদী যে , যদি তুমি খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করে এই বাণিজ্যিক সফরে যাও , তাহলে এই সফরের আয়ের টাকা দিয়ে নিজের একটা পুঁজি গড়ে তুলতে পারবে।”
মুহাম্মাদ ( সা ) এতোক্ষণ মাথা নীচু করে চাচার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। চাচার কথা শেষ হবার পর এবার মাথা তুলে চাচার দিকে স্বচ্ছ , পবিত্র ও সততার ঢেউ বহমান সদয় চোখে তাকালেন। আবু তালিব ভাতিজার ঐ দৃষ্টিতে স্বাভাবিক দৃঢ়তাসম্পন্ন আত্মসম্মান প্রদর্শনের চিত্র দেখতে পেলেন। মুহাম্মাদ ( সা ) সশ্রদ্ধ বিনয়ের সাথে বললেন : চাচাজান ! আমাকে একটু সময় দিন ! বিষয়টা আমি একটু ভালো করে ভেবে দেখি। আবু তালিব বললেন : “ঠিক আছে , তুমি যা চাও , তা-ই হবে।”

সুপ্রিয় পাঠক ! রাসুল (সা) এর জীবনী ভিত্তিক ধারাবাহিকের গত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে , চাচা আবু তালেব মুহাম্মাদকে ( সা ) খাদীজার ব্যবসায়িক সফরে যাবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ( সা ) ঐ প্রস্তাব ভেবে দেখার জন্যে চাচার কাছ থেকে সময় চেয়ে নেন। আজকের পর্বে আমরা তার পরবর্তী ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করবো।
মুহাম্মাদ ( সা ) শেষ পর্যন্ত সফরে যাবার জন্যে মনসি’র করলেন। তিনি ব্যবসার জন্যে দেওয়া খাদীজার প্রস্তাবে রাজি হলেন। খাদীজা এই বাণিজ্য কাফেলায় মুহাম্মাদের সাথে তাঁর নিজের গোলাম ‘মেইসারা’কেও দিলেন। গোলামকে বলে দিলেন মুহাম্মাদের সকল আদেশ যেন মেনে চলে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের সাথে যেন কোনোরকম বিরোধিতা না করে। একইভাবে মুহাম্মাদকেও তিনি বললেন যেন মেইসারাকে তাঁর সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেন , কারণ মেইসারা ব্যবসায়িক কাজে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং সচেতন।
মুহাম্মাদ ( সা ) মেইসারা এবং অন্যান্য গোলামদের সহযোগিতা নিয়ে ব্যবসায়িক মালামাল প্রস’ত করলেন। এইসব মালামালের মধ্যে ছিল , তায়েফের চামড়া , মক্কার বনৌষধি অর্থাৎ আধুনিক কালের হার্বাল মেডিসিনের বিচিত্র উপাদান , ভারতীয় ইস্পাতের তৈরী তলোয়ার , চমৎকার চমৎকার কার্পেট , রঙ-বেরঙের সিল্কের কাপড় , চীনের মেশ্‌ক এবং বাহরাইনের মুক্তা। এছাড়াও ছিল ফ্রান্স এবং পারস্যের স্বর্ণ-রূপায় পূর্ণ কয়েকটি ব্যাগ। সকালে কাফেলা রওনা দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলো। আবু তালেবের চেহারায় পূর্বরাত থেকেই কেমন যেন উদ্বেগের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। মুহাম্মাদও ব্যাপারটা অনুভব করলেন এবং চাচাকে বললেন : চাচাজান! আপনি এতো উদ্বিগ্ন কেন ? চাচা বললেন : তুমি দূরে চলে যাচ্ছো , কেন জানি আমি মেনে নিতে পারছি না। তোমার জীবনের ভয়ও হচ্ছে। তোমার মনে আছে , যখন তোমার বয়স বারো ছিল , তখন খ্রিষ্টান পাদ্রী বুহাইরা কী বলেছিল ? বুহাইরার কথার পর এখন তেরো বছর অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। তুমি এখন পরিপূর্ণ যৌবনের অধিকারী। তারপরও আমার মন কেন জানি মানছে না। কেননা ; তুমি অপরিচিত জায়গায় যাচ্ছো , সেখানে অসৎ , ভন্ড-প্রতারকের অভাব নেই। তুমি একটু সাবধানে থেকো।
মুহাম্মাদ ( সা ) আবু তালিবকে সহানুভূতি জানালেন। তারপর চাচী ফাতেমা বিনতে আসাদের দিকে তাকালেন , যিনি মায়ের মতো আদর-স্নেহ দিয়ে , মায়া-মমতা দিয়ে মুহাম্মাদকে তদারকি করেছেন। ফাতেমাও ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন যেন তাঁর নিজের স্নেহের সন্তান সফরে যাচ্ছে। তবে তিনি এমন কোনো দৃশ্যের অবতারণা করেন নি , যাতে মুহাম্মাদ পথে ঐ দৃশ্যের কথা চিন্তা করে মনে কষ্ট পান। তাই তিনি অম্লান চেহারায় খুশিমনে মুহাম্মাদকে বিদায় জানান। মুহাম্মাদ ( সা ) চাচার ঘরের ছোট্ট কাঠের দরোজা থেকে রাস্তায় পা রাখেন এবং আল্লাহর দরবারে এই বলে দোয়া করেন : “হে আল্লাহ ! তোমার ওপর নির্ভর করে সফরে যাচ্ছি। তোমার রহমতে আশ্রয় নিচ্ছি। সকল আশা , সকল ভরসা একমাত্র তোমার উপরেই। হে আল্লাহ ! আমাকে সকল প্রকার জটিলতা বা কাঠিন্য থেকে রক্ষা করো এবং সফরের জন্যে নেওয়া আমার রসদপত্রগুলোকে পবিত্রতা দান করো ! আমাকে গুনাহ থেকে মুক্ত রাখো এবং যেদিকেই দু’চোখ যায় , সেদিকেই নেকির ব্যবস্থা করো!”
বাণিজ্য কাফেলা সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে চললো। মুহাম্মাদ ( সা ) একটি দ্রুতগামী উটের পিঠে চড়ে সবার আগে আগে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝেই তিনি সামনের দিকে এবং পেছনে তাঁর কাফেলার দিকে সচেতন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন। একটা সময় কাফেলা ধীরে ধীরে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু পথ ধরে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এমন সময় মেইসারা সামনে এলো। আবহাওয়া ছিল ভীষণ গরম। তার কালো চেহারার ওপর ঘাম জমে বড়ো বড়ো বিচির মতো দাগ দেখা যাচ্ছিলো। অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে সহাস্য কণ্ঠে সে মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে বললো : বাতাস ভীষণ গরম ! মুহাম্মাদ ( সা ) তার কথা স্বীকার করলেন এবং আগের সফরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বললেন :’এখানে পলির প্রাচুর্য থেকে মনে হচ্ছে এই এলাকায় বন্যা বেশি হয়। ফলে এখানে যাত্রাবিরতি না করাই ভালো।’ মেইসারা বিনয়ের সাথে জড়ানো কণ্ঠে বললো : কিন্তু এই পার্বত্য পথ বেশ দীর্ঘ , সহজে শেষ হবে না। রাত্রিও প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। মুহাম্মাদ ( সা ) আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন :’কালো মেঘ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে , দ্রুত বৃষ্টি হবে। মেইসারাও জানতো যে , যেখানেই বাতাস গরম হয় , সেখানেই বৃষ্টি-বাদলে বন্যার আশঙ্কাটা বেশি থাকে। আর এই পার্বত্য পথ নিরাপদ জায়গা নয়। তারপরও সন’ষ্টির ভাব দেখিয়ে বললো : আপনার আদেশ ! হে নেতা ! আপনি যা বলবেন তা-ই হবে ! মুহাম্মাদ ( সা ) বললেন : এখন তো থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তো নিরাপদ কোনো উঁচু জায়গায় গিয়ে অবতরণ করা উচিত।
কাফেলা তুলনামূলক একটা উপযুক্ত স্থনে গিয়ে যাত্রা বিরতি করে। কাফেলার লোকজন কালো তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নেয়। আর মুহাম্মাদ ( সা ) কাফেলার মাল-সামানা থেকে খানিকটা দূরের উঁচু জায়গায় একটা পাথরের ওপরে গিয়ে বসলেন। কাফেলার লোকজন আসে- আসে- ঘুমিয়ে গেল। রাতের মৃদু বাতাস মুহাম্মাদের চেহারা মোবারকে কোমল পরশ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি যথারীতি রাতের আকাশের বিস্ময়কর সৌন্দর্য আর এই পৃথিবীর রহস্যময়তার ভেতর ডুবে গেলেন।
ঐ রাতে প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হলো। কাফেলার লোকজন যে যেভাবে পেরেছে বন্যার বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করেছে। পরদিন ব্যবসায়িক পণ্যগুলোকে শুকিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করলো। কিন্তু অল্পপরেই ছিল পারাপারের একটা সঙ্কীর্ণ পথ। ঐ পথে ছিল পানির প্রবাহ। গর্তটা কতোটা গভীর ছিল , তা কারো জানা ছিল না। মেইসারা মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে বললো : এখন কী উপায় ! মুহাম্মাদ ( সা ) বললেন : কাফেলাকে বলো যাত্রার প্রস্তুতি নিতে। তিনি নিজেও উটের পিঠে সওয়ার হলেন। আল্লাহর নাম নিয়ে সিরিয়া অভিমুখে রওনা হলেন। ওমর হেশাম নামের কাফেলার একজন মুহাম্মাদের ঔদ্ধত্য দেখে ঠাট্টা করে বললোঃ নৌচালনার সরঞ্জাম আছে তো হে আব্দুল্লাহর ছেলে ! কিন্ত মুহাম্মাদ তাকে কিছুই বললেন না। মেইসারা উদ্বেগের সাথে মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে বললো : দেখছো তো বন্যার পানিতে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে ! মুহাম্মাদ ( সা ) মেইসারার দিকে তাকালেন। মেইসারা এই তাকানোর মধ্যে পরিপূর্ণ নির্ভরতা , আশা এবং সাহসিকতা দেখতে পেলো। সে যখনি মুহাম্মাদের দিকে তাকাতো , তখনই একটা বিশেষ প্রশান্তি পেত। মুহাম্মাদ ( সা ) মিষ্টি হাঁসি হেঁসে বললেন : মেইসারা ! তোমার অন্তরে সাহস সঞ্চার করো ! দয়াময় মহান আল্লাহ তাঁর অনুসারী ও অনুরক্তদেরকে নিঃসঙ্গ কিংবা নিরাশ্রিত রাখেন না। এই বলে সামনে অগ্রসর হয়ে পানি পার হয়ে গেলেন।
উট নিয়ে তিনি নিরাপদে পানি পার হয়ে গেছেন দেখে কাফেলার অন্যান্য উটও তাঁর পিছু পিছু এলো এবং নিরাপদেই পানি পার হয়ে গেল। কাফেলার মাঝে এবার আনন্দের কোলাহল দেখা দিল। মুহাম্মাদের আত্মবিশ্বাস এবং সাহসিকতা অন্যদের মাঝে এই পরিমাণ প্রভাব ফেললো যে , এই গল্প তাদের মাঝে বেশ কিছুদিন ধরে চললো। মুহাম্মাদের জন্যে এটা ছিল বেশ সফল ও সুখকর এক অভিজ্ঞতা।
দীর্ঘ এই সফরে পথিমধ্যে বাণিজ্য কাফেলার অনেকেই অসুস্থহয়ে পড়ে। মুহাম্মাদ (সা) যাত্রাবিরতি দিয়ে অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। মেইসারা মুহাম্মাদকে বললো : আমরা যদি দেরি করে পৌঁছি তাহলে মক্কার অন্যান্য ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল বিক্রি করবে,আর আমরা তাদের তুলনায় পিছে পড়ে যাবো। কিন্তু মুহাম্মাদের দয়ালু অন্তর মানে নি। তিনি চিন্তা করেছেন দ্রুত পৌঁছাতে গেলে অসুস্থদের অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে পড়বে। তাঁর এই মানবতাপ্রীতির কারণে কাফেলা দুই দিন দেরি করে সিরিয়ায় পৌঁছেছিল। সূর্য সকালের শীতলতা শহরের বুক থেকে ধীরে ধীরে দূর করে দিচ্ছিল। সিরিয়ার বিশাল বাজার হেজাজের বাণিজ্য কাফেলার আগমনে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্যে আসা-যাওয়া করতে লাগলো। মেইসারা দামেশকের যে ক’জন ব্যবসায়ীর সাথে লেনদেন করতো তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলো। কিন্তু তারা ইতোমধ্যেই তাদের প্রয়োজনীয় কেনা-কাটা সেরে ফেলেছে। মক্কার অনেক ব্যবসায়ী খাদীজাকে পরোক্ষে তিরস্কারের ভাষায় বলতে লাগলো : এতো বড়ো একটা কাফেলাকে অদক্ষ আর নরম মনের এক যুবকের হাতে সোপর্দ করেছে। মেইসারা তার কানে একথা পৌঁছার সাথে সাথে ভীষণ কষ্ট পেলো। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। কিন্ত মুহাম্মাদ ( সা ) অশান্ত হলেন না। তিনি আল্লাহর সাহায্যের কথা বলে মেইসারাকে সহানুভূতি জানালেন।
বিকেলের দিকে বাজারের অপর প্রান্ত থেকে একটা কোলাহলের শব্দ ভেসে এলো। সবাই সেদিকে তাকালো। ফিলিস্তিনের একটা বড়ো কাফেলা সিরিয়ায় এসেছে। তারা বাজারের দিকে যাচ্ছিল। ফিলিস্তিনের এই যাত্রীদলের মধ্যে মক্কার জিনিসপত্র কেনার জন্যে ভালো ক্রেতা ছিল। তারা মক্কার ব্যবসায়ীদের খুঁজছিল। কিন্ত সেখানে একমাত্র মুহাম্মাদের বাণিজ্য কাফেলা ছাড়া তাদেরকে মালামাল দেওয়ার মতো আর কেউ ছিল না। মেইসারার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবার শেষ হলো। মুহাম্মাদের যোগ্যতা এবং উপযুক্ততায় এবার সে গর্ব করে বলতে লাগলো : “আমরা আজি প্রথম সিরিয়ায় পৌঁছেছি , অথচ আমাদের সকল মালামাল বিক্রি হয়ে গেছে , বিক্রির জন্যে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আমাদের ভাগ্য কতো সুপ্রসন্ন।”

খাদীজা ভোরে আশ্চর্য এক স্বপ্ন দেখলেন। তিনি স্বপ্নরাজ্যে দেখলেন যে , অন্ধকারাচ্ছন্ন শহরের আকাশের এক প্রান্তে উজ্জ্বল একটি চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। ঐ চিহ্নটি ধীরে ধীরে ভূপৃষ্ঠের দিকে নেমে আসছিল। তার আলো সূর্যের মতো উজ্জ্বল মনে হলো। স্বপ্নিল ঐ সূর্যটা নীচে আসতে আসতে মক্কার আকাশকে আলোকিত করে তুললো। খাদিজা বিস্ময়করভাবে ঐ নূরে আলোকিত হয়ে গেল এবং হঠাৎ দেখতে পেলো সূর্যটা তার মাথার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। সূর্যটা তারপর নীচে এলো এবং খাদীজার ঘরকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করে তুললো। খাদীজার ঘুম ভেঙ্গে গেল। অভূতপূর্ব এক অজানা আনন্দে তার মনটা ভরে গেল। খাদীজার এই মধুর স্বপ্ন তাকে আত্মনিমগ্ন করে তুললো। স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্যে সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। সে বুঝতে পেরেছিল যে , একটা বড়ো সৌভাগ্য তার জন্যে অপেক্ষা করছে , তবে সৌভাগ্যটা যে কী , তা বুঝতে পারে নি।
ক’দিন হলো খাদীজার বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে ফিরে এসেছে এবং মুহাম্মাদ (সা) ব্যাপক লাভ বা মুনাফা এনে দিতে সক্ষম হয়েছে। খাদীজা মনে মনে ভাবতে লাগলো , সম্ভবত আমার সৌভাগ্যটা হলো এই মুনাফা যা ‘মুহাম্মাদ আমীন’ সিরিয়া থেকে এনে দিয়েছে। আবার নিজে নিজেই বলতে লাগলো-কিন্তু , এ ধরনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল বস্তুগত সাফল্যের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে না। এই স্বপ্নের অর্থ ক্ষণস্থায়ী জীবন সংক্রান্ত বিষয়াবলীর অনেক উর্ধ্বে। খুব ভোরে খাদীজা তার বয়স্ক এক চাচাতো ভাইয়ের কাছে গেল। এই চাচাতো ভাইটির নাম ছিল ওরাকা ইবনে নাওফাল। আরবের মধ্যে তিনি ছিলেন বেশ জ্ঞানী একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুব ভালো জানতেন। খাদীজা তাঁর কাছে বিস্ময়কর ঐ স্বপ্নের ঘটনাটা বলে ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। ওরাকা স্বপ্নের ঘটনাটা অত্যন্ত মনোযোগের সাথে শুনলেন এবং বললেন : “খাদীজা ! এই স্বপ্নটা তোমার জন্যে বিরাট একটা সুসংবাদ। তুমি খুব দ্রুত এই পৃথিবীর সবচে’ মহান ও বিখ্যাত ব্যক্তিকে বিয়ে করবে।”
খাদীজার খাদেম মেইসারা সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের পর মুহাম্মাদের ব্যাপক প্রশংসা করেছিল। মেইসারা মুহাম্মাদের চারিত্র্যিক , আত্মিক এবং আধ্যাত্মিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে এবং আসা-যাওয়ার পথে যা যা ঘটেছিল , খাদীজার কাছে তার বর্ণনা দেয়। এইসব বর্ণনা শোনার পর মুহাম্মাদের মর্যাদা খাদীজার কাছে আগের চেয়ে আরো বেড়ে যায়। খাদীজা মুহাম্মাদকে অত্যন্ত সম্মানীয় ও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব বলে মনে করতো। সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের কয়েকদিন পর মুহাম্মাদ তাঁর পারিশ্রমিক নেওয়ার জন্যে খাদীজার কাছে এলেন।
খাদীজা বললো : `হে আমীন ! এই সফরে তুমি প্রচুর মুনাফা এনে দিয়েছো,এই মুনাফায় তোমারও অংশ আছে। এখন বলো তুমি কী চাও !’
মুহাম্মাদ বললেন : “এই সফর থেকে তোমার যা লাভ হয়েছে,তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে,এর মাঝে আমি কেবল ওসিলামাত্র ছিলাম।”
খাদীজা বললো : `ঠিক আছে,আমি নিজেই তোমাকে মুনাফা দিতে চাই। এখন তুমি বলো , এই টাকা দিয়ে তুমি কী করবে !’
মুহাম্মাদ খানিক বিরতির পর বললেন : `আমার ওপর চাচা আবু তালেবের ব্যাপক অধিকার রয়েছে। ঐ অধিকারের সামান্য অংশ আদায় করার জন্যে আমি আমার পারিশ্রমিকের পুরো টাকাটাই তাঁকে দিয়ে দিতে চাই। বিষয়টা চাচার কাছে উত্থাপন করেছিলাম কিন্তু তিনি রাজি হলেন না।’ খাদীজার কাছে মুহাম্মাদ (সা) এর মর্যাদা ও গাম্ভীর্য আরো বেড়ে যায়। খাদীজা চেয়েছিল মুহাম্মাদকে পুরস্কার স্বরূপ কিছু টাকা দিতে, কিন্তু মুহাম্মাদ নিলেন না, তিনি শুধু পারিশ্রমিকের টাকাটাই গ্রহণ করলেন।
খাদীজা ছিলো অত্যন্ত পূত-পবিত্র ও সতী-সাধ্বী এক রমনী। মুহাম্মাদের বিশ্বাস এবং তার অমায়িক ভদ্রতার তিনি প্রশংসা করতেন। মুহাম্মাদের মহান ব্যক্তিত্ব এবং আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য খাদীজার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। তাই মনে মনে ভাবলো : সম্ভবত স্বপ্নে দেখা ঐ সূর্য এই মুহাম্মাদেরই পবিত্র ও সুমহান অস্তিত্ব। কুরাইশদের মধ্য থেকে অনেক সম্পদশালী লোক এবং বড়ো বড়ো ব্যক্তিত্ব খাদীজাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু মুহাম্মাদ ছিলেন এক দরিদ্র যুবক। খাদীজা খুব ভালো করেই জানতো যে , সে যেহেতু কুরাইশদের মাঝে সবচে ধনী মহিলা , সেহেতু দারিদ্র্যের কারণে মুহাম্মাদ তাকে বিয়ে করার প্রস্তব দেবে না। তাই স্বপ্নের ঘটনায় সে সিদ্ধান্ত নেয় যে নিজেই মুহাম্মাদের কাছে নিজের বিয়ের প্রস্তাব দেবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক খাদীজা এই কাজের জন্যে তার এক বান্ধবী নাফিসা’র সহযোগিতা কামনা করে। নাফিসা বান্ধবীর আহ্বানে সাড়া দেয়। সে মুহাম্মাদের কাছে যায়। মুহাম্মাদ ( সা ) নাফিসাকে চিনতেন। সেও ছিল মক্কার একজন নামকরা রমনী। নাফিসা মুহাম্মাদের উদ্দেশ্যে বললো: `হে আমীন ! তোমার সততা , পবিত্রতা এবং আমানতদারীর কথা সর্বত্র শোনা যায়। মক্কার সকল মেয়েই তোমার সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। তোমার বয়স এখন ২৫ বছর। কেন তুমি বিয়ে করে নিজের জীবন সাজাচ্ছো না ?’
কিছুদিন থেকে অবশ্য মুহাম্মাদ ( সা ) নিজেও বিয়ের কথা ভাবছিলেন এবং ঈমানদার ও পূত-পবিত্র একজন রমনীকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করার কথা ভাবছিলেন। তাই নাফিসার কথা শোনার পর মাথা নিচু করে একটু ভাবলেন। নাফিসা বলতে লাগলো : `€˜আচ্ছা , আমি যদি তোমাকে এমন এক রমনীর সন্ধান দেই , যে কিনা রূপে-গুণে , ব্যক্তিত্বের মহিমায় , অর্থ-সম্পদে এবং পবিত্রতায় মক্কার মধ্যে বিখ্যাত,তাকে তুমি বিয়ে করবে ?’
মুহাম্মাদ জিজ্ঞেস করলেন :`তুমি কার কথা বলছো !’
নাফিসা বললো : আমি সেই নারীর কথা বলছি যাকে মক্কার সকল সম্পদশালী ব্যক্তিই বিয়ে করতে চায়। কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে তার মানদণ্ড অর্থ-সম্পদ নয় , তার মানদণ্ড হলো মর্যাদা,সম্মান ও ব্যক্তিত্ব যা আজকাল কম লোকের মাঝেই দেখা যায়। এরপর নাফিসা বললো-মুহাম্মাদ ! আমি খাদীজার কথা বলছি। তুমি তো তার পূত-পবিত্রতার খ্যাতির কথা জানোই। খাদীজাও তোমার মতোই , মূর্তিপূজা করে না এবং এই কাজকে মিথ্যা বা অন্যায় বলে মনে করে। সে-ও চিরসত্যের অনুসারী। আভ্যন্তরীণ কোনো এক বোধশক্তি তাকে অন্যায় বা নোংরা কাজ থেকে বিরত রাখে।’
মুহাম্মাদ নাফিসার কথা শুনে খানিকটা চিন্তা করলেন যে , তাঁর পক্ষে তো মূর্তিপূজক কোনো নারীকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। তাই তিনি নাফিসাকে বললেন :
`খাদীজা মক্কার একজন সম্মানিত ও সম্পদশালী মহিলা ! সে কি আমার মতো এক দরিদ্র যুবককে বিয়ে করবে ?’
নাফিসা মুহাম্মাদের কথা শুনে আনন্দিত হয়ে বললো : `বিয়ে করবে কি করবে না ,সে দায়িত্ব তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও !’-এই বলে নাফিসা খাদীজার ঘরের দিকে চলে গেল।
এর ক’দিন পর মুহাম্মাদ নাফিসাকে নিয়ে খাদীজার ঘরে গেল। এটা ছিল তাঁদের দু’জনের মাঝে বিয়ের প্রাথমিক সাক্ষাৎ। মুহাম্মাদ সবসময়ের মতোই শান্ত এবং বিনত মস্তক ছিলেন। ভাগ্য নির্ধারণী এ মুহূর্তে দু’জনই দু’জনের কথা শোনার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন। খাদীজা কথা শুরু করলেন এভাবে:
“হে মুহাম্মাদ ! আরবের মধ্যে বংশ-মর্যাদার দিক থেকে তোমার চেয়ে উচ্চস্থানীয় কেউ নেই। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে , বহু সম্পদশালী লোক আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু আমি তোমার সম্পর্কে অনেক শুনেছি। নিজেও তোমার বহু মাহাত্ম্য বা অলৌকিক কর্মকাণ্ড দেখেছি। তোমার সততা,আমানতদারী এবং পবিত্রতায় মুগ্ধ হয়ে আমি তোমার স্ত্রী হবার বাসনা পোষণ করছি। আমিও যে তোমার সততার ব্যাপারে আস্থাবান তুমি সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকো।”
কে জানে , পবিত্র ঐ মুহূর্তে মুহাম্মাদের মনের ভেতর কেমন করছিল। কিন্তু মুহাম্মাদ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বিনয় ও ভদ্রতার সাথে বললেন : এ ব্যাপারে আমার চাচার সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন। এরপর দু’পক্ষীয় অভিভাবকদের মাঝে একটা বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা ধার্য হলো।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খাদীজার বাসায় একটা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। আসরে সর্বপ্রথম মুখ খুললেন আবু তালেব। আল্লাহর নাম নিয়ে তিনি তাঁর ভাতিজাকে সবার সামনে পরিচিত করালেন এভাবে :”আমার ভাতিজা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ কুরাইশ যুবকদের সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠস্থানীয়। সে অবশ্য অর্থ-সম্পদের দিক থেকে বঞ্চিত। তবে একথা জেনে রেখো, সম্পদ হলো ছায়ার মতো,ছায়া একসময় বিলীন-বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু সম্মান-মর্যাদা এবং বিশ্বাসের মতো মৌলিক জিনিসগুলো থেকে যায়।”
আবু তালিবের কথা শেষ হবার পর খাদীজার চাচাতো ভাই ওরাকা ইবনে নাওফাল দাঁড়িয়ে বললেন : কুরাইশদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তোমাদের সম্মান-মর্যাদার কথা অস্বীকার করে। আমরাও আন্তরিকভাবেই তোমাদের এই সম্মান মর্যাদায় গর্বিত। আমরা তাই তোমাদের সাথে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ হতে চাই। এরপর বিয়ের মোহরানা ধার্য হলো এবং তাদের দু’জনের মাঝে বিয়ের আকদ হলো। এভাবেই পৃথিবীর দুই বিখ্যাত নর-নারী স্বামী-স্ত্রীর মহান সম্পর্কে আবদ্ধ হলো। কয়েক মুহূর্ত পর খাদীজা ( সা ) তাঁর স্বামী মুহাম্মাদ ( সা ) এর চেহারার প্রতি অর্থপূর্ণ দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন। তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাঁর এবং মুহাম্মাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকালেন এবং তাঁদের বিয়ের বরকতপূর্ণতা দেখতে পেলেন। খাদীজার স্বপ্ন এভাবেই বাস্তবে পরিণত হয়।
খাদীজা তাঁর স্বামীর আধ্যাত্মিকতার বিষয়টি খুব ভালো করেই জানতেন। আর এ কারণেই তিনি তাঁর স্বামীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হন। তিনি তাঁর সকল ধন-সম্পদ স্বামীর হাতে সোপর্দ করলেন। মুহাম্মাদ ( সা ) তাঁর দয়ালু চাচার ঘর থেকে খাদীজা ( সা )’র ঘরে এলেন। বিত্তবান জীবনে আসার পরও কিন্ত তাঁর আচার-আচরণে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসে নি। তিনি সহজ-স্বাভাবিক বা অনাড়ম্বর জীবন-যাপন করতেন। সাধারণ খাবার খেতেন। যে-কোনো অভাব-অভিযোগ বা প্রয়োজনে তিনি একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করতেন। বঞ্চিত, আর অভাবগ্রস-দের প্রতি তিনি ছিলেন সবসময়ই সদয়। তাদের চিন্তা ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক একটা বিষয়। কিন্তু অন্ধকার সে সময়কার লোকজন যে মূর্তিপূজা করতো,সে বিষয়টি তাঁর বিনীত অন্তরকে সারাক্ষণ আহত করতো ,কষ্ট দিতো। তিনি মক্কার গোলোযোগ এবং দাঙ্গাপূর্ণ পরিবেশ থেকে দূরে থাকতেন। মুহাম্মাদের অন্তরাত্মা ধীরে ধীরে বৃহৎ দায়িত্ব পালনের জন্যে প্রস্তত হচ্ছিল , যার অপেক্ষায় তিনি ছিলেন।

মুহাম্মাদের বয়স যতোই বাড়তে লাগলো,তাঁর চেহারায় নূরের ঔজ্জ্বল্যও বৃদ্ধি পেতে লাগলো। ইব্রাহীম ( আ ) প্রবর্তিত বিধি-বিধানের একটা ম্লান রূপ ইতিহাসের পাতায় তখনো অবশিষ্ট ছিল। ঈসা ( আ ) এর জন্মের কয়েক শতাব্দী কেটে গেল। তাঁর শিক্ষার আলোও নিষ্প্রাণ হয়ে গেল। পাশ্চাত্যে নির্দয় রোমান সভ্যতা সর্বত্র ছায়া বিস্তার করেছিল। ইরানে শাহের শক্তি ছিল অসীম , জনগণ তার কাছে প্রজা হিসেবে গণ্য ছিল। এই দুই সাম্রাজ্য অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্য এবং পারস্য সাম্রাজ্যে তখন যরাথুস্ত্র এবং ঈসা ( আ ) এর জয় জয়কার ছিল ঠিকই কিন্ত তাঁদের প্রবর্তিত বিধি-বিধানের সাথে দূরত্ব ছিল প্রচুর। এই দুই সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে গ্রামের পর গ্রাম শহরের পর শহর রক্তাক্ত হয়েছিল। রোমে গোলাম বা দাসদেরকে কঠিন কাজে ব্যবহার করা হতো। যেমন প্রাসাদ তৈরীর কাজ , প্রার্থনালয় ইত্যাদি কাজে তাদেরকে ব্যবহার করা হতো। দাসেরা যদি ছোটোখাটো কোনো প্রতিবাদও জানাতো,তাহলে তাদেরকে দেওয়াল বা পিলারের ফাঁকে জীবিত সমাহিত করা হতো। যুদ্ধ,নিষ্ঠুরতা এবং হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি প্লেগ আর দুর্ভিক্ষও সমানভাবে বিরাজ করছিল। অন্যদিকে জঙ্গলাকীর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকায় তখনো সভ্যতার কোনো ছোঁয়াই লাগে নি। সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের তীরভূমি কিংবা আমেরিকার হারানো উপমহাদেশ সম্পর্কে কারো কোনো ধারণাই ছিল না। ফলে বলা যায় , রোমান সভ্যতার ওপর দিয়ে খ্রিস্টান ধর্মের সুশীতল বায়ুপ্রবাহ যদি বয়ে না যেত,তাহলে পাশ্চাত্য ভূমিতে কারো মনেই খোদার প্রতি প্রেম বা ভালোবাসার অনুভূতিই জাগতো না। যাই হোক , তৎকালীন বিশ্ব জুলুম-অত্যাচার আর অজ্ঞতার আঁধারে একেবারে ছেয়ে গিয়েছিল।
হযরতের নবুয়্যত লাভ করার আগে অর্থাৎ ঈমান ও জ্ঞানের আলো বিকিরিত হবার আগে চিন্তা বা যুক্তিমার্গ থেকে মানুষ বহুদূরে অবস্থান করতো। তবে চন্দ্র , সূর্যের মত নানা জড়বস্তুর পূজা-অর্চনা , বলখে অবস্থিত বৃহৎ নওবাহার মন্দির এবং পারস্যে অসংখ্য অগ্নিমণ্ডপ ও বিশাল বৌদ্ধ মন্দিরের অবস্থান এই প্রমাণ বহন করে যে , সৃষ্টিকর্তা বা উপাসকের অন্বেষন মানুষের সহজাত প্রবণতা এবং এই প্রবণতা সার্বজনীন ও সর্বকালীন। ফলে মানুষ কোনো না কোনো কিছুর পূজা-অর্চনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই প্রবণতা বা প্রয়োজনীয়তার কারণেই ঐশী গ্রন্থগুলোও মানুষের অনুচিত হস্তক্ষেপ থেকে রেহাই পায় নি। যেমন , তৌরাতে আল্লাহর অস্তিত্ব মানুষের দৈহিক গঠনের মতো রূপ নেয়। এমনকি তৌরাতে মানবরূপী এই খোদা মানুষের সাথে কুস্তি খেলে হেরে যায়। আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকজন বছরের ৩৬০ দিনে তিন শ’ ষাট দেবতা বা মূর্তির পূজা করতো। তারা লাত-মানাত-ওয্’€Œযার মতো বড়ো বড়ো মূর্তিগুলোকে খোদার মেয়ে বলে মনে করতো। রোমেও এ ধরনের খোদাদের বাজার বেশ ভালোই জমেছিল। এসবই রাসূলের নবুয়্যত লাভের পূর্বেকার ঘটনা। সে সময় মানুষ বিচিত্র ধারণা-কল্পনা আর কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল। কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতিকে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। মার্কিন ইতিহাসবিদ বিল ডুরান্টের ভাষ্য অনুযায়ী , তখনকার দিনে মানুষ হরিণের হাঁড় আর কচ্ছপ পুড়িয়ে ভবিষ্যত বাণী করতো।
অন্যভাবে বলা যায় রাসূলের নবুয়্যত লাভের আগে সমাজে মানুষের প্রকৃত কোনো অবস্থান জানা ছিল না। অন্যদের ওপর নিজস্ব মালিকানা সত্ত্ব এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে একজন পিতা ইচ্ছে করলেই পরিবারের সবাইকে বিক্রি করে ফেলতে পারতো কিংবা পরিবারের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারতো। এই মালিকানা অধিকার একজন পিতার ছিল। স্ত্রীর প্রতিও পুরুষদের একইরকম অধিকার ছিল। আরবে নারীরা অন্যান্য মালামালের মতো লুট হতো। পুরুষরা অন্য কোনো পুরুষকে মেরে তার স্ত্রীকে অধিকার করতে পারতো। জাপানী পরিবারে বাবা তার নিজস্ব সন্তান-সন্ততিকে গোলাম হিসেবে যেমন বিক্রি করতে পারতো,তেমনি ইচ্ছে করলে পতিতালয়েও বিক্রি করতে পারতো।
জাহেলী যুগের সমাজে সর্বপ্রকার নোংরামী আর নিষ্ঠুরতা বিরাজ করছিল। রুক্ষ ও নির্দয় মানুষগুলোর অন্তর ছিল পাথরের মতো কঠিন। বংশে-বংশে , গোত্রে-গোত্রে মারামারি-হানাহানি আর রক্তপাত ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। রক্তপাত কে কতো বেশী ঘটাতে পারলো , তা নিয়ে গর্ব অহঙ্কার করতো তারা। আরব ভূখণ্ডে তখন জাহেলী চিন্তা আর অবৈধ কর্মকাণ্ড অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। হযরত আলী ( আ ) বলেন : “হে আরব জাতি ! তোমরা সর্ব নিকৃষ্ট ধর্ম বা আচার-কুসংস্কারের অনুসারী ছিলে ! সর্ব নিকৃষ্ট পরিবেশের মধ্যে দিনযাপন করছিলে! প্রস্তর আর কঙ্করময় ভূমিতে বিষাক্ত সাপের মাঝে-যেসব সাপ কোনো শব্দকেই ভয় করতো না -সে রকম পরিবেশে তোমরা বসবাস করছিলে। তোমরা দূষিত পানি পান করতে এবং রুক্ষ ও শুষ্ক সব খাবার-দাবার খেতে। তোমরা পরস্পরের খুন বইয়ে দিতে এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। তোমরা মূর্তিকে খোদা বলে দাবী করতে এবং তোমাদের মাঝে অন্যায়-পাপাচার ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।”এইসব বিশৃঙ্খল ঘটনা দেখে রাসূলের পবিত্র অন্তর ভীষণভাবে আহত হতো। তিনি বন্দীত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ কোনো ব্যক্তির দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না,এই জুলুমপূর্ণ পরিবেশ তিনি মেনে নিতে পারতেন না। নিরুপায় হয়ে শহর থেকে দূরে প্রাকৃতিক কোনো পরিবেশ কিংবা মরুভূমিতে গিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চিন্তায় মগ্ন হয়ে যেতেন। একদিন মুহাম্মাদ ( সা ) একদল লোককে মক্কার বাজারে দেখতে পেলেন। তিনি তাদের মাঝে গেলেন। দেখলেন একজন আরব জুয়া খেলতে খেলতে তার ঘর,উট সব হারিয়ে বিজয়ী ব্যক্তির অধীনে দশ বছরের জন্যে বন্দী হয়ে গেল। মুহাম্মাদ ( সা ) ঐদিন অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে মরুভূমির দিকে গেলেন। মক্কার আশেপাশের পাহাড়গুলোতে অন্যান্যদিনের তুলনায় অনেক বেশী সময় কাটালেন এবং রাতে বেশ দেরী করে বাসায় ফিরলেন।
তবে জাহেলী যুগের সবচেয়ে নোংরা আচার-প্রথাগুলো দেখা যেত তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে। দেবতাদের উদ্দেশ্যে মন্দিরের বলিকাষ্ঠে সাহসী সন্তানদেরকে জবাই করা হতো। বলি দেওয়া সন্তানের রক্তমাখা মাটিতে গড়াগড়ি করতো। অপরদিকে আরবরা কন্যা সন্তান থাকায় অপমানিত বোধ করে কিংবা ক্ষুধার্ত হবার ভয়ে নিজেদের কন্যা সন্তানগুলোকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিত। অনেক সময় দেখা যেত,অবুঝ ঐ কন্যা সন্তানটি তার জন্যে কবর খোঁড়ার কাজে বাবাকে সহযোগিতা করছে। আবার এমনও দেখা গেছে , বাবা তার কন্যা সন্তানটির সারা গায়ে লেগে থাকা ধূলোবালি পরিস্কার করে, ঘণ্টাখানেক পর নিজেই তাকে জীবিত কবর দিয়ে এসেছে।
ইসলামের সর্বশেষ নবীর নবুয়্যত প্রাপ্তির আগে বর্ণ এবং শ্রেণীবৈষম্য ছিল মারাত্মক। একটা শ্রেণী ছিল সম্পদশালী,আর আরেকটি শ্রেণী ছিল গরীব। ধনীরা গরীবদের শোষণ করতো। অপরের কাছ থেকে নিজস্ব অধিকার আদায় করে নেওয়ার শক্তি কারো ছিল না। অবস্থা এমন বেগতিক ছিল যে , মুহাম্মাদ ( সা ) কতিপয় যুবককে নিয়ে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হন। সংগঠনভুক্ত সবাই শপথ নেন যে,তাঁরা মজলুম বা বঞ্চিতদের অধিকার রক্ষায় সকল প্রকার চেষ্টা চালাবেন।
সে সময় দাস বেচা-কেনাও একটা লাভজনক ব্যবসা ছিল। যে দাসদের বেচা-কেনা করা হতো,তারা সাধারণত আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ছিল অথবা ছিল যুদ্ধবন্দী। একদিন খাদীজার ভাতিজা হাকীম সিরিয়া থেকে বেশ ক’জন দাসকে খাদীজার কাছে নিয়ে এলো। তাদের মাঝে বনু কেলাব গোত্রের একটি শিশুও ছিল। শিশুটির নাম ছিল যায়েদ। খাদীজা ঐ শিশুটিকে কিনে নিলেন। মুহাম্মাদ ( সা ) ঐ শিশুটিকে দেখে অন্তরে খুব ব্যথা পেলেন,তাঁর চেহারা ম্লান হয়ে গেল। হযরত খাদীজা ঐ শিশুটিকে তাঁর স্বামীর খেদমতে হাজির করলেন। মুহাম্মাদ ( সা ) দ্রুত শিশুটিকে আযাদ করে দিলেন। তারপর এই নিরাশ্রয় শিশুকে নিজেদের পরিবারের সন্তান হিসেবে বরণ করে নিলেন। অত্যাচার আর অজ্ঞানতার বিস্তৃতি যতোই বৃদ্ধি পেতে লাগলো,বিশ্ব একটা বিপ্লব বা বিশাল পরিবর্তনের জন্যে ততোই প্রস্তুত হতে লাগলো। ঐ নিঝুম অন্ধকারের মাঝেও হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি দেখা দিল। সত্য সুনির্মল এক জ্যোতি মুহাম্মাদ ( সা ) এর অন্তরকে আয়নার মতো আলোকোজ্জ্বল স্বচ্ছ করে দিল। উজ্জ্বল ঐ আলো অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকিত করে তুললো।

মুহাম্মাদ ( সা ) এখন চল্লিশ বছর বয়সে পা রেখেছেন। ছোটোবেলা থেকে যে প্রকৃতির সাথে তাঁর নিবীড় সখ্যতা ছিল,সেই সখ্যতা এখনো অটুট রয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি চলে যেতেন এবং অপেক্ষমাণ কৌতূহলী দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। মুহাম্মাদ ( সা ) সূক্ষ্মদর্শী ছিলেন বলে প্রকৃতির গ্রন্থে শিক্ষণীয় অনেক কিছু খুঁজে পেতেন। রাতের আকাশ ছিল তাঁর জন্যে বিস্ময়কর ও রহস্যময় শিক্ষার আধার। হেরা গুহা এখনো তাঁর নিঃসঙ্গতার পরম সহচর। নূর পাহাড়ের এই চূড়া থেকে তিনি লক্ষ্য করতেন মানুষের আদর্শহীন চিন্তাধারা আর আচার-আচরণ। মুর্খ লোকেরা অশালীন সব নিয়ম-কানুন পালন করেই সন্তুষ্ট ছিল। নিজেদের তৈরি মূর্তিগুলোকে তারা সেজদা করতো। সাধারণ কোনো ঘটনার জের ধরে খোনাখুনিতে লিপ্ত হতো। মোটকথা,সমগ্র বিশ্ব তখন আশ্চর্য এক অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মানুষের জীবনবৃক্ষ সবুজ-শ্যামলিমা হারিয়ে ঝরা পাতার মতো হলুদ হয়ে গিয়েছিল। মুহাম্মাদ ( সা ) এসব দেখে দেখে দুঃখ করতেন , কষ্ট পেতেন।
মুহাম্মাদ ( সা ) এখন আগের চেয়েও বেশি বেশি হেরা গুহায় যান। দিনের পর দিন তিনি হেরা গুহায় কাটান। খাদীজা ( সা ) এরকম দেরী দেখলে রাসূলের চাচাতো ভাই আলীর সাথে খাদ্যসামগ্রি ,পানি ইত্যাদি নিয়ে গুহায় যেতেন। অনেক দিন স্বামীর সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হবার কারণে খাদীজা তাঁর এবং তাঁর সন্তানদের বিষন্নতা নিয়ে কথা পাড়েন। চাচাতো ভাই আলীও রাসুলের প্রতি তার ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করলেন। কিন্তু হযরত তাঁদের কথার জবাবে বললেন : `€˜হ্যাঁ , সবই জানি আমি এবং আমিও যে তোমাদেরকে কতোটা ভালোবাসি , তোমরাও সে ব্যাপারে সচেতন। কিন্তু ঘটনাক্রমে এই ক’টা দিন আশ্চর্যরকমভাবে বিশ্বস্রষ্টার স্মরণ ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে মন বসছে না।’

অবশেষে সেই রহস্যময় রাত এলো। নূর পাহাড়ের ওপর এবং তার দক্ষিণ প্রান্তরে চাঁদ যেন তার কোমল জ্যোৎস্না বিছিয়ে রেখেছিল। মক্কা এবং তার আশেপাশের পরিবেশ যেন গভীর নিদ্রায় অচেতন। চারদিকে সুনসান নিরবতা। পৃথিবী এবং কাল যেন ঐ রাতে বিশাল কোনো ঘটনার অপেক্ষায় ছিল। মুহাম্মাদ ( সা ) অধিকাংশ রাতই জেগে কাটিয়ে দিতেন। ঐ রাতে পর্বতের কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ ছিল না। এই নিরবতা,এই শান্ত-নিবীড় মুহূর্তের একটা প্রতীয়মান অর্থ ছিল। রহস্যময় ঐ মুহূর্তে হঠাৎ আকাশে অচেনা এক বিদ্যুচ্ছটা দেখা গেল। হযরতের স্থির দৃষ্টি সেদিকে পড়লো। তিনি তাঁর দেহমনে একধরনের কম্পন অনুভব করলেন। তাঁর বিনম্র অন্তরাত্মা যেন বিশালত্ব খুঁজে পেল। তিনি জ্বলজ্বলে এক বিশাল কিছুর অস্তিত্ব দেখতে পেলেন। তিনি প্রথমত ভেবেছিলেন যে হয়তো স্বপ্ন দেখছেন ,কিন্তু না, এখন আরো স্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন সেই বিশাল অস্তিত্ব। তার বাহ্যিক আকৃতিতে একধরনের গাম্ভীর্য ও আকর্ষণ ছিল। মুহাম্মাদ ( সা ) আকাশের যে দিকেই তাকালেন ঐ বিশাল অস্তিত্ব তাঁর মাথার উপরে দেখতে পেলেন। এই অস্তিত্বটি আর কেউ নন,স্বয়ং ওহীবাহক জিব্রাঈল। জিব্রাঈল ফেরেশতা কাছে এসে মুহাম্মাদ ( সা ) কে বললেন: হে মুহাম্মাদ ! পড়ুন !
মুহাম্মাদ মনোযোগের সাথে দেখলেন তাঁর সামনে কিছু একটা লেখা প্রদর্শিত হচ্ছে। পুনরায় শব্দ হলো- পড় তোমার খোদার নামে।
মুহাম্মাদ ( সা ) বিচলিত কণ্ঠে বললেন : কী পড়বো ! তারপর ফেরেশতা জিব্রাইল বললেন : পড়ো তোমার প্রভুর নামে,যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ! যিনি আলাক বা জমাট রক্ত থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। পাঠ কর সেই মহান প্রভুর নামে,যিনি কলমের সাহায্যে মানুষকে সেইসব বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন,যেসব বিষয় তারা জানতো না!

হযরতের সকল অসি-ত্বে ঐশীপ্রেম যেন উপচে পড়ছিল। তিনি ফেরেশতার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে পড়তে শুরু করলেন। শূন্যে আবারো ধ্বনিত হলো : €˜হে মুহাম্মাদ ! তুমি আল্লাহর রাসূল এবং আমি তাঁরি ফেরেশতা জিব্রাঈল।’
ফেরেশতা জিব্রাঈল ( আ ) এর এই গুরুগম্ভীর উচ্চারণ হযরতের কানে যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। হ্যাঁ , আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আবারো তাঁর বান্দাদের সাথে কথা বলতে চেয়েছেন এবং তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকূলের মধ্য থেকে মুহাম্মাদকেই তাঁর অহীর বার্তা গ্রহণ করার উপযুক্ত মনে করলেন। মুহাম্মাদ নিজেই মানুষকে সকল গোমরাহী আর বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার চিন্তায় এতোদিন ব্যস্ত ছিলেন , এখন বিশাল একটি দায়িত্ব্‌ই তাঁর ওপর ন্যস্ত হলো। তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে বিস্ময়কর এক অনুভূতি জাগ্রত হলো। ভীষণ এক উষ্ণতায় তাঁর সমস্ত শরীর যেন পুড়ে যাচ্ছিল। এক ধরনের উত্তেজনায় তাঁর পবিত্র কাঁধ দুটি কাঁপছিলো। তিনি উঠতে চাইলেন কিন্ত ওঠার মতো শক্তি তাঁর ছিল না। মাটিতে কপাল রেখে কাঁদলেন। আবেগময় ঐ মুহূর্তে মুহাম্মাদ ( সা ) নবুয়্যতির দায়িত্বে অভিষিক্ত হলেন।
কঠিন এই পরিস্থিতির কিছুক্ষণ পর মুহাম্মাদ ( সা ) কম-বেশি আনুভূতিক শক্তি ফিরে পেলেন। হেরা গুহা থেকে এবার বাইরে পা রাখলেন তিনি। তারাভরা আকাশ , সরু নতুন চাঁদ আর মক্কার শান্ত শহর তাঁর সামনে দেখতে পেলেন। কিন্ত ঐ নিরবতার পর সমগ্র বিশ্ব যেন পুনরায় প্রাণস্পন্দন ফিরে পেল। বিশ্বব্যাপী নতুন করে প্রাণ সঞ্চারিত হলো। চারদিকে আবেগময় এক গুঞ্জরণ সৃষ্টি হলো। পাহাড়-পর্বত , মরুভূমি এককথায় আকাশ আর যমীনে যা কিছু ছিল সবাই ফিসফিস করে বললো : হে খোদার মনোনীত নবী ! তোমার প্রতি সালাম !
মুহাম্মাদ ( সা ) অত্যন্ত ধীরে সুস্থে চিন্তা-ভাবনা করে পদক্ষেপ ফেলছিলেন। বিস্ময়কর ঐ ওহীর বাণী তাঁর কানে একটা বিশেষ সুর সৃষ্টি করছিল : পড় তোমার প্রভুর নামে ! এভাবে তাঁর অন্তর প্রশান্তি পেলো। এক সমুদ্র অনুভূতি আর আবেগ নিয়ে তিনি তাঁর একান্ত সহচর খাদীজার কাছে রহস্যময় ঘটনাটি বলে আবেগ প্রশমিত করতে চাইলেন।
খাদীজা ( সা ) যখন দরোজা খুললেন , মুহাম্মাদ ( সা ) এর কালো চোখে একটা বিশেষ ঔজ্জ্বল্য দেখতে পেলেন। চেহারার এই ঔজ্জ্বল্য দেখে খাদীজা বুঝতে পেরেছেন যে কিছু একটা ঘটেছে। মুহাম্মাদ ( সা ) কয়েক মুহূর্ত বিশ্রাম নিয়ে খাদীজাকে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। ঘটনা শুনে খাদীজার অন্তর অপূর্ব এক আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লো। অশ্রুজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন : “হে মক্কার আমীন ! তুমি ছিলে সবার বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন , সৎ ও ন্যায়বান এবং সত্যভাষী ! তুমি ছিলে মজলুম ও অত্যাচারিতদের ডাকে সাড়াদানকারী এবং সত্য-ন্যায়ের পৃষ্ঠপোষক ! তোমার দয়ার কথা , তোমার উত্তম স্বভাব চরিত্রের কথা , আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে তোমার প্রচেষ্টার কথা সবার মুখে মুখে। এ কারণেই সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাকে তাঁর নবী হিসেবে মনোনীত করেছেন। তুমি শান্ত হও ! খোদার শপথ , এটা তোমার দুঃখ-কষ্ট আর পরহেজগারীর পুরস্কার। হে আল্লাহর রাসূল ! তোমার প্রতি সালাম !”
এভাবেই খাদীজা ( সা ) সর্বপ্রথম রাসূলের প্রতি ঈমান এনে গৌরবান্বিত হন। যাই হোক,এরপর মুহাম্মাদ ( সা ) একটু ঘুমালেন। খাদীজা ( সা ) দৃঢ় বিশ্বাসী অন্তর নিয়ে তাঁর মনে জাগ্রত কয়েকটি বিষয়ে জানার জন্যে বিজ্ঞ চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নাওফালের কাছে গেলেন। তিনি ওরাকার কাছে ঘটনাটা খুলে বললেন এবং এই ঘটনা একান্ত নিজের মনে লুকিয়ে রাখতে বললেন। খাদীজা ওরাকার কাছে জিব্রাঈল ফেরেশতা সম্পর্কে জানতে চান।
ওরাকা বললেন : “জিব্রাঈল হলো আল্লাহর একজন বড়ো ফেরেশতা। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলগণের মাঝে সম্পর্ক বা যোগাযোগের মাধ্যম। এই ফেরেশতাই হযরত মূসা এবং ঈসা ( আ ) এর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন। তিনি যেখানেই যান সেখানেই জনগণের জন্যে একটা বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়।”
খাদীজা আনন্দ ঝলমল চোখে বললেন : জিব্রাঈল হেরা গুহায় আমার স্বামী মুহাম্মাদের কাছে এসেছিল। ভাইজান ! বলুন তো , মুহাম্মাদ সম্পর্কে পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে কী বলা হয়েছে ?
ওরাকা খাদীজার কথায় কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন : আমি পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে পড়েছি যে , মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ একজন নবী পাঠাবেন যিনি ইয়াতিম,তিনি আশ্রয় দেবেন এবং কারো মুখাপেক্ষী হবেন না। তিনি হবেন সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। আমার কাছে যে ঘটনাটা তুমি বলেছো তা যদি ঘটে থাকে , তাহলে জিব্রাঈল যা বলেছে তা আল্লাহর ওহী। আর মুহাম্মাদ হলো আল্লাহর নবী। তুমি মুহাম্মাদকে বলো সে যেন তার কাজে দৃঢ় ও সুস্থির থাকে।
খাদীজা ( সা ) অপূর্ব এক আনন্দঘন চিত্তে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিলেন। তিনি আশাপূর্ণ হৃদয়ে হযরতের কাছে গেলেন এবং আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন।

আল্লাহর রাসূলগণ হচ্ছেন সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্যে এমন পথপ্রদর্শক , যাঁরা সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে মানুষকে তাদের প্রকৃত লক্ষ্য বা গন্তব্যে নিয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে , যেখানেই কোনো সম্প্রদায় পথের দিশা হারিয়েছে কিংবা প্রকৃত গন্তব্যে যেতে অক্ষম হয়ে পড়েছে , তাদের সহযোগিতা করার জন্যে আল্লাহ কোনো না কোনো পয়গাম্বরকে পাঠিয়েছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ঐ নবী পথের দিশাহীন জনপদটিকে মুক্তি বা গন্তব্যের নতুন নতুন পথের দিশা দিয়েছেন। এই নবী-রাসূলদের মাঝে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, তিনি হলেন আমাদের প্রিয়নবী আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদদ ( সা ) ।
নবীদের আগমনের পরম্পরায় দেখা গেছে যে , একজন নবী তাঁর পরবর্তী নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। যদিও অধিকাংশ নবীরই দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্র ও সময় ছিল নির্দিষ্ট। একইভাবে ইসলামের নবী অর্থাৎ আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল , যাঁর দাওয়াত ছিল বিশ্বজনীন , তাঁর ব্যাপারে ধর্মীয় গ্রন্গুলোতে সুস্পষ্টভাবে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। ইহুদি জাতি তাদের ধর্মগ্রন্থের ভিত্তিতে এবং তাদের নবীদের বক্তব্য অনুযায়ী সর্বশেষ নবীর অপেক্ষায় ছিল। হযরত মূসা ( আ ) ইহুদি সম্প্রদায়কে তাঁর মতো আরেক নবী আসার সুসংবাদ দিয়েছেন। তাওরাতে বলা হয়েছে-তোমাদের খোদা তোমাদের মাঝে তোমাদেরই ভাইদের মধ্য থেকে আমার মতো একজন নবী পাঠাবেন। তোমাদের উচিত তাঁর কথা মনযোগ দিয়ে শোনা এবং তাঁর আনুগত্য করা। আল্লাহ বলেছেন , আমি তাদের মধ্য থেকে তোমার মতো একজন নবী পাঠাবো এবং তাঁর মুখে আমার বাণী প্রেরণ করবো।’
এইসব সুসংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ইহুদিদের অনেকেই সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর আবির্ভাব উপলব্ধি করার জন্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৌদিআরবে গেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের অনেকেই রাসূলে খোদার নবুয়্যত লাভের পর তাঁকে অস্বীকার করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। দাউদ ( আ ) ‘র প্রার্থনায় এমন কিছু বক্তব্য এসেছে , মুফাস্€Œসিরদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী তা হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এবং তাঁর পরিবার ও সন্তানদের সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর প্রার্থনায় এ রকম কিছু বক্তব্য আছে : `তুমি সকল আদম সন্তানের মধ্যে সুন্দরতম , তোমার বাচনভঙ্গি অলঙ্কার সমৃদ্ধ , তোমার ঠোঁট থেকে দয়া আর অনুগ্রহ বর্ষিত হয় , খোদা তোমাকে অনন্তকালের জন্যে পবিত্র করেছেন। তোমার সকল পোশাকে সুগন্ধি মিশিয়ে দিয়েছেন। হে বাদশাহ ! তুমি বহু সন্তানের অধিকারী হবে , তারাও তাদের পূর্বপুরুষদের মতো দায়িত্বভার মাথায় তুলে নেবে এবং তুমি তাদের বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শাসনকার্যে নিযুক্ত করবে। তোমাকে সকল প্রজন্মের কাছে বিখ্যাত করে তুলবে। সকল মানুষ চিরকাল তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।’

ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় দেখা যায় যে , হযরত ঈসা ( আ )ও তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে তাঁর পরে একজন নবীর আবির্ভাবের সুসংবাদ দিয়েছেন। যিনি নিজেই ছিলেন আল্লাহর এক বিশাল মো’জেযা , তিনিই আরবে আল্লাহর সর্বশেষ দূতের আগমণ সম্পর্কে কথা বলতেন। তাঁর আগমণের বিভিন্ন নিদর্শন ব্যাখ্যা করতেন এবং জনগণের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসার অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিতেন। যতদূর পর্যন্ত ঈসা ( আ ) এর ধর্মীয় অনুশাসন চালু ছিল ততদূর পর্যন্ত তাঁর এই সুসংবাদগুলোও প্রচারিত হয়েছিল। `মসীহ’ নামক গ্রনে’ জার্মানীর বিখ্যাত দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়াসেপ্রস বলেছেন : `€˜মসীহ সম্পর্কে যা কিছু বেশি জানি , তাহলো তাঁর সুসংবাদ বার্তা।’
এ কারণেই খ্রিষ্টিয় সপ্তম শতাব্দীতে সর্বশেষ নবীর জন্যে অপেক্ষমানরা আরব্য উপদ্বীপের উল্লেখযোগ্য অংশে বসবাস করছিল। ইয়েমেন থেকে সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন থেকে মিশর পর্যন্ত বিসতৃত ভূখণ্ডের খ্রিষ্টানরা সর্বশেষ নবীকে দেখার জন্যে ব্যাকুল হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ইরানেও অপেক্ষমান এই দর্শনার্থীদের একটি ছোট্ট দলের অস্তিত্ব ছিল। তাদের মধ্যকার পরিচিত একজন হলেন সালমান ফারসী। সালমান তাঁর জীবনেতিহাসের একাংশে বলেছেন : €˜খ্রিষ্টান থাকাকালে যখন আমুরিয়াতে ছিলাম , তখন ধর্মীয় কাজের জন্যে পাদ্রীর কাছে যাওয়া-আসা করতাম। পাদ্রী তখন দিবারাত্রি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদাত করতো। কিছুদিন পর পাদ্রী অসুস্থ হয়ে পড়লো। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে আমাকে বললো : আমি এমন কাউকে চিনি না , যার কাছ থেকে ফয়েজ হাসেল করার জন্যে তোমাকে বলতে পারি। কিন্তু শেষ যমানার নবীর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ইব্রাহীমের বংশধর আরবদের মধ্য থেকে আসবেন তিনি। মক্কায় তিনি আবির্ভূত হবেন। তিনি উপহার গ্রহণ করবেন কিন্তু সদকা গ্রহণ করবেন না। তাঁর কাঁধে নবুয়্যতির চিহ্ন থাকবে। তাঁকে যদি চিনতে পারো , উপলব্ধি করতে পারো তাহলে প্রত্যয়ন করো এবং তাঁর প্রতি ঈমান এনো।
আমি বললাম : সে যদি তোমার ধর্মকে ত্যাগ করার আহ্বান জানায় , তারপরও কি তাঁকে প্রত্যয়ন করবো ?
পাদ্রি বললো : হ্যাঁ ! কেননা , তাঁর কথাই সত্য-সঠিক এবং তাঁর বিজয়ের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সন্তষ্টি।’
সালমান তাঁর স্মৃতিকথায় আরো বলেন : `এই পাদ্রীর মৃত্যুর পর আমাকে আরবের বনী কেলাব গোত্রের একটি বাণিজ্য কাফেলার সাথে আরব্য উপদ্বীপে পাঠানো হলো। সেখানে এক ইহুদির দাস হিসেবে কাজ করতাম। একদিন ঐ ইহুদি লোকটিকে অপর এক লোকের সাথে কথা বলতে শুনলাম। সে লোকজনকে গালিগালাজ করতে করতে বলছিল , জনরব উঠেছে যে, কোনো এক ব্যক্তি নাকি নিজেকে নবী বলে দাবী করছে। এই কথা শুনে হঠাৎ মনে হলো , বছরের পর বছর ধরে অভিবাসী আর উদ্বাস’ জীবন যাপনের পর বুঝি শেষ পর্যন্ত সুফল এলো। আমার অন্তরে কম্পন সৃষ্টি হয়ে গেল। অত্যন্ত আগ্রহের সাথে আমি ঐ লোকটির কাছে গেলাম এবং ঐ পয়গম্বর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। আমার মনিব এ ব্যাপারে আমার আগ্রহের কথা জানতে পেরে আমার সামনে এলো এবং আমার গালে সজোরে থাপপড় মারলো। সালমান সর্বশেষ নবীকে ভালোবাসার কারণে যতো অত্যাচার-নিপীড়ন ভোগ করেছিল,এই চপেটাঘাত ছিল তার সূচনা।’
ইহুদি এবং খ্রিষ্টান ধর্মগ্রন্থগুলো যদিও এখন বিকৃত হয়ে পড়েছে , তারপরও সর্বশেষ নবীর ব্যাপারে দেওয়া সুসংবাদ বা ইঙ্গিতগুলো এখনো দেখতে পাওয়া যায়। ইঞ্জিলে এসেছে-€˜এবং আমি তার কাছে আবেদন জানাবো , আর তিনি তোমাদের জন্যে আরেকজন সান্ত্বনাদাতা পাঠাবেন যাতে তোমাদের সাথে সবসময় থাকে।’
ইঞ্জিলের কয়েক জায়গায় ঈসা ( আ ) তাঁর পরে `প্যারাকলিত্€Œ’ অর্থাৎ `€˜আহমদ’ এর আসার কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। হযরত ঈসা ( আ ) বলেন : `আমি না যাওয়া পর্যন্ত তিনি আসবেন না। যদি আমাকে তোমরা ভালোবাসো , তাহলে আমার ওসিয়তগুলো সংরক্ষণ করো। আমি আবেদন জানাবো তোমাদের প্রতি যেন অন্য কোনো `প্যারাকলিত্’ কে পাঠানো হয় , যাতে তিনি তোমাদের সাথে সবসময় থাকেন। তিনি আল্লাহর সেই পবিত্র আত্মা যিনি তোমাদেরকে সকল সত্যতা এবং বাস্তবতার সাথে পরিচিত করাবেন।’
ইথিওপিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশির হাতে যখন ইসলামের নবীর দাওয়াতী পত্র পৌঁছলো , তখন নাজ্জাশি বলেছিল : `খোদার কসম ! ইনিই সেই নবী , আহলে কেতাব বা খ্রিষ্টানরা যাঁর অপেক্ষায় রয়েছে।’
তৌরাত এবং ইঞ্জিলে পূর্ববর্তী নবীগণ যে সর্বশেষ নবীর আগমণের সুসংবাদ দিয়েছেন , কোরআনের অসংখ্য আয়াতে সে ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগে যে , এরকম সুস্পষ্ট আয়াত থাকা সত্ত্বেও বহু সমপ্রদায় কেন সর্বশেষ রাসূলকে অস্বীকার করলো ? সূরা `সাফ’ এর ছয় নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : €˜স্মরণ করো ! যখন মারিয়াম পুত্র ঈসা ( আ ) বললো , হে বনী ইসরাইল ! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল , আমি আমার পূর্ববর্তী তৌরাতের সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন। তাঁর নাম আহমাদ। অবশেষে যখন তিনি সুস্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এলেন , তখন তারা বললো-এটাতো এক সুস্পষ্ট যাদু।’
সূরা আ’রাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতেও সর্বশেষ পয়গাম্বরের গুণাবলীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :`€˜যারা আল্লাহ প্রেরিত এমন এক নিরক্ষর নবীর আনুগত্য করছে , যাঁর গুণাবলীর বর্ণনা তাদের নিজেদের কাছে রক্ষিত তৌরাত এবং ইঞ্জিলেই রয়েছে। যেমন তাঁর গুণাবলী হচ্ছে-তিনি সৎ কাজের আদেশ দেন এবং অসৎ কাজ করতে নিষেধ করেন। তিনি যাবতীয় পবিত্র বস্তু তাদের জন্যে হালাল ঘোষণা করেন এবং অপবিত্র বস্তুগুলোকে হারাম ঘোষণা করেন। তিনি তাদের ওপর বিদ্যমান সকল বোঝা এবং বন্দীত্বের জিঞ্জীর অপসারণ করেন। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে , তাঁকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে এবং তাঁর সাথে অবতীর্ণ নূর তথা কোরআনের অনুসরণ করেছে , তাঁরাই সাফল্য অর্থাৎ মুক্তি লাভ করতে পেরেছে।’

নবী-রাসূলগণ হলেন বিশ্বমানবতার জন্যে সর্বোত্তম ঐশী উপহার, তাঁদের নূরের আলোয় মানুষ জীবনের সরু এবং বক্র পথেও সাফল্য ও সুখ সমৃদ্ধির পথ খুঁজে পেতে পারে। আল্লাহর এই দূতদের আবির্ভাবের বৃহৎ লক্ষ্য হলো মানুষকে তার অস্তিত্বের পূর্ণতায় পৌঁছানো। আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থার প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হলে আমরা দেখতে পাবো যে , আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যেই উন্নতির সকল উপাদান বা সাজ-সরঞ্জাম এবং তার পরিপূর্ণতার ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন। পরিপূর্ণতার প্রতি আভ্যন্তরীণ প্রেরণার কারণেই প্রত্যেক সৃষ্টবস্তু বিশেষ গন্তব্যের দিকে ধাবমান। ফলে বাধমুক্ত অনুকূল পরিবেশে প্রত্যেক সৃষ্টির সুপ্ত প্রতিভা ও সামর্থের বিকাশ ঘটে থাকে। মাটির নিচে রোপিত গমের দানা বা ফলের বীজ বেড়ে ওঠা বা পূর্ণতা লাভের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে থাকে। সূরায়ে ত্বা-হা’র পঞ্চাশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে :‘আমাদের প্রতিপালক এমন এক সত্ত্বা যিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে তার যোগ্য আকৃতি ও প্রয়োজনীয় সকল উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন , তারপর নিজস্ব পথপ্রদর্শন করেছে এই পরিচালনার বিষয়টি সকল সৃষ্টির ক্ষেত্রেই একটা সাধারণ ব্যাপার। অর্থাৎ একেবারে সূক্ষ্ম অণু থেকে শুরু করে বৃহৎ গ্যালাক্সি পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর এই অনুগ্রহ লাভে সমৃদ্ধ। কিন্তু আল্লাহ যাঁকে সৃষ্টির সেরা করে সৃষ্টি করেছেন,সেই মানুষের জন্যে কি প্রাকৃতিক এই পর্যায়গুলো অতিক্রম করাই যথেষ্ট ? অবশ্যই না। কারণ মানুষের জীবন বস্তগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ অন্যান্য প্রাণীকূল-বা জড় বস্তর মতো নয়। মানুষের চিন্তাগত এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় উপনীত হবার জন্যে সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা খুবই জরুরি। মানুষের প্রবৃত্তি ও প্রবণতা যেহেতু বিচিত্র,তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও এমন উত্তম হাতিয়ার বা উপকরণে তাকে সমৃদ্ধ করেছেন , যার সাহায্যে মানুষ সঠিকভাবে তার আভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তিগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নিয়মানুবর্তী করতে পারে। ফলে আল্লাহ মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্যে দুই ধরনের উপকরণ দিয়েছেন। একটি মানুষের আভ্যন্তরীণ সত্ত্বা অর্থাৎ বিবেক-বুদ্ধি , অপরটি হলো আল্লাহর নবী-রাসূল।একথা তর্কাতীতভাবে সত্য যে , জ্ঞান-বুদ্ধি অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অক্ষম হয়ে পড়ে , কিংবা অনেক সময় আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আবার কখনো কখনো সঠিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে স্বার্থান্বেষী হয়ে পড়ে। এ কারণেই এমন ধরনের দিক-নির্দেশনার প্রয়োজন যাতে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধি এবং উপলব্ধি ঐশী আলো বা অন্তর্র্দৃষ্টি লাভ করতে পারে এবং ঐ অন্তর্র্দৃষ্টি মানুষকে তার মেধা ও জ্ঞানের সঠিক বিকাশ ঘটাতে সহযোগিতা করে। চিন্তাবিদ বা গবেষকরা মানুষের অসি-ত্বকে এমন পাহাড়ের সাথে তুলনা করেছেন , যার ভেতরে গুপ্ত রয়েছে মূল্যবান সব পাথর। আর এই পাথরের বিশাল মজুদ লাভ করতে হলে অর্থাৎ মানুষের ভেতরকার অমূল্য সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নবী-রাসূলদের মতো মহাবিজ্ঞ প্রকৌশলীর প্রয়োজন। তাঁরা তাঁদের নিজস্ব শিক্ষা ও কর্মকৌশলের সাহায্যে মানুষের আভ্যন্তরীণ ও স্বভাবগত সকল যোগ্যতার বিকাশ ঘটান। হযরত আলী ( আ ) তাঁর নাহজুল বালাগায় নবীদের আগমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন : ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম সন্তানদের মাঝ থেকেই নবী-রাসূল মনোনীত করেছেন। আর তাদের মধ্য থেকেই ওহীর বার্তা পৌঁছানো ও রেসালাতের দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন….যাতে মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সম্ভারে বিদ্যমান মণি-মুক্তাগুলোকে বের করে আনা যায়।’
এমন ধরনের মানুষগুলো নবুয়্যতির দায়িত্ব পালনের জন্যে মনোনীত হয়েছেন, আত্মিক এবং আন্তরিক পবিত্রতার কারণে যাঁদের সাথে ওহীর উৎস তথা আল্লাহর সম্পর্ক ছিল। মানুষের মাঝে আল্লাহর হুকুম-আহকাম প্রচার বা উপস্থাপনার জন্যে তাঁরা ছিলেন সুযোগ্য। নবীগণ সত্যানুসন্ধিৎসা এবং একত্ববাদের ভিত্তির ওপর নির্ভর করে গভীর অন্ধকার সমাজেও মানব স্বভাবকে ঐশী নূরের আলোয় আলোকিত করে তাদেরকে যাবতীয় ভ্রান- আকীদা-বিশ্বাস থেকে পবিত্র করেছেন। তাঁরা জাহেলিয়াতের সকল অপচিন্তা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং মানবতাকে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি , ন্যায়কামিতা , স্বাধীনতা বা মুক্তি কামনা এবং একত্ববাদের মতো মহামূল্যবান সম্পদগুলো উপহার দিয়েছেন।
সকল নবীরই অভিন্ন লক্ষ্য ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সমাজে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করা। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে। নবী-রাসূলগণ মানুষকে পূজা-অর্চনা , কু-সংস্কার এবং শের্€Œক বা অংশীবাদিত্বের জিঞ্জীর থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। মানুষের হাতে-পায়ে বাঁধা এইসব জিঞ্জীর তাদের চলাফেরার শক্তি-সামর্থ কেড়ে নেয়। এইসব জিঞ্জীর কখনো বাহ্যিক আবার কখনো পরোক্ষ। পবিত্র কোরআনের সূরা আ’রাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতের একাংশে এই বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইসলামের নবী আল্লাহর সর্বশেষ দূত হিসেবে পৃথিবীতে এসেছেন। তিনি মানুষের মাঝে বিদ্যমান বন্দীত্বের জিঞ্জীরগুলো ছিঁড়ে ফেলার জন্যেই আবির্ভূত হয়েছেন। গর্ব-অহংকার , লোভ-লালসার মতো কু-প্রবৃত্তিগুলো মানুষের আভ্যন্তরীণ জিঞ্জীর। এগুলো মানুষের পরিপূর্ণতার পথে সবচে বড়ো অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত। এসব ছাড়াও সমাজের ওপর ছায়া বিস্তারকারী অমানবিক কিছু কিছু বাজে প্রথা বা রীতি-নীতি রয়েছে , যেগুলো মানুষের আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। নূরনবী মোস্তফা ( সা ) তাঁর সুস্পষ্ট শিক্ষা এবং তৌহিদ বা একত্ববাদী চিন্তার প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে মানবতার জন্যে যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন তা ছিল যথেষ্ট উন্নত পর্যায়ের। ফ্রান্সের বিখ্যাত গবেষক ‘€˜ডার্মিংহাম’ বলেন : `€˜শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ এবং সংস্কারের সর্ববৃহৎ নীতিমালা বলতে তা-ই ছিল , যা ওহী নামে পর্বে পর্বে মুহাম্মাদের ওপর অবতীর্ণ হয় এবং মানুষ যাকে আজ কোরআন নামে চেনে।’

নবী-রাসূলগণ মানবতার জন্যে সবচে বড়ো যে অবদানটি রেখেছেন , তাহলো তাঁরা আল্লাহ এবং মানুষের মাঝে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নবীগণ আল্লাহর বাণীকে যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন এবং আল্লাহকে কীভাবে ডাকতে হবে তা মানুষকে শিখিয়েছেন। নবীগণ মানুষকে যে শিক্ষা দিয়েছেন , তার ফলে মানুষ নিজের ভেতরে সঠিক পথ খুঁজে বের করার শক্তি-সামর্থ অর্জন করেছে এবং সেইসাথে পৃথিবীতে কীভাবে সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ জীবনযাপন করা যায় , সেই নির্দেশনাও পেয়েছে। ধর্মের বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা , আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক সৃষ্টি করে দেওয়া এবং মানুষের অন্তরাত্মাকে ঐশী বাস্তবতা মেনে নেওয়ার জন্যে প্রস্তত করা। নবীগণ জীবনের রাজপথকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করে পথের দিশা দিয়ে দেন,আর মানুষ নবীদের দেখিয়ে দেওয়া ঐ পথে জীবনের জটিল অলি-গলিগুলোও পেরিয়ে যায় সহজেই।
একের পর এক নবীদের আগমন এবং শরীয়তের পুনঃ পুনঃ পরিবর্তনের পেছনে কারণ হলো যুগে যুগে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার পরিবর্তন। মানুষের জীবন সমস্যা , মানুষের প্রয়োজনীয়তা যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে, সেইসাথে সঙ্গতি রেখে ঐশী বিধান দেওয়া হয়েছে। তবে মানুষকে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে নবীগণ যে মূলনীতি অনুসরণ করেছেন,তা ছিল অভিন্ন। সকল নবীই মানুষকে একই লক্ষ্যের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। আত্মপরিপূর্ণতা প্রাপ্তির পথে মানুষ সেই কাফেলার মতো,যে কাফেলা একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা ক’রে মারাত্মক চড়াই-উৎরাইয়ের মাঝে এসে পড়েছে,অপরদিকে গন্তব্যে যাবার পথও জানা নেই। ফলে কিছুক্ষণ পর পর একেকজনকে যাবার পথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে , আর তাদের প্রদর্শিত পথে মাইলের পর মাইল চলার পর এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছে , যেখান থেকে নতুন করে আবার পথের ঠিকানা নিতে হয়। এভাবে পথ চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পায় যিনি পথের পরিপূর্ণ মানচিত্র নিখুঁতভাবে এঁকে দেন। সর্বদা এবং সকল স্থানের জন্যে প্রযোজ্য ঐ মানচিত্র অনুযায়ী কাফেলা নিশ্চিন্তে তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়। হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) হলেন আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল যিনি মানুষকে তার জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি আর স্বাধীনতার পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা উপহার দিয়েছেন। তিনি হেদায়েতের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছেন। তাঁর শিক্ষা চিরন্তন।

Share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here