মুহাম্মদ আব্দুল ওহাব আন নাজদী

2
2031

ওহাবী বা সালাফী মাজহাবের গোপন কথা ( ১ )

আমরা যদি বিভিন্ন ধর্ম বা ধর্মীয় উৎসগুলো নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাবো বহু ধর্ম কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন মাযহাব বা ফের্কায় বিভক্ত হয়ে গেছে। মহান ঐশী ধর্মগুলোর ক্ষেত্রেও এ সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ধর্মগুলোর প্রবর্তন করেছিলেন যাঁরা,তাদেঁর সাথে কালগত দূরত্ব সৃষ্টির কারণে এইসব মাযহাব আর ফের্কার জন্ম হয়েছে। এ ধরনেরই একটি ফের্কা হচ্ছে ‘ওহাবি’ ফের্কা।
নিঃসন্দেহে ঐশী ধর্মগুলোতে এতোসব ফের্কা আর মাযহাবগত মতপার্থক্য এসেছে মানুষের চিন্তা থেকে। কেননা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সকল নবী-রাসূলেরই লক্ষ্য বা মিশন ছিল এক আল্লাহর প্রার্থনা বা একত্ববাদের প্রতি মানুষকে আহ্বান করা। এক্ষেত্রে সকল নবীরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল এক ও অভিন্ন এবং তাদেঁর সবাই মানব জাতিকে বিচ্ছিন্নতা পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। সর্বশেষ ত্রাণকর্তার আবির্ভাব এবং জুলুম নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করাও সকল ঐশী ধর্মের অভিন্ন বিশ্বাস। একইভাবে সকল ঐশী ধর্ম এ ব্যাপারে অভিন্ন বিশ্বাস পোষণ করে যে, ওহী আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে-যা সকল মারেফাত বা আধ্যাত্মিকতার উৎস। তবে ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় আমরা লক্ষ্য করবো,সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতি, লোভ-লালসা এবং পার্থিব মুনাফার লোভে অথবা অন্য কোনো দুরভিসন্ধিমূলক চিন্তার কারণে কোনো কোনো ব্যক্তির মাঝে ধর্ম সম্পর্কে ভুল উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে।

চিন্তা ও উপলব্ধিগত এই পার্থক্য কালক্রমে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে ঐশী ধর্মের অনুসারীদের মাঝে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে। এভাবেই অসংখ্য ফের্কা এবং মাজহাব-চাই তা মানুষের চিন্তাগত ভ্রান্তির কারণেই হোক কিংবা কোনো ব্যক্তি,দল বা কারো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির কারণেই হোক-গড়ে উঠেছে। একথা এখন অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে এইসব ফের্কা এবং মাজহাব দ্বীন বা ঐশী ধর্মগুলোর ঐক্যকে টার্গেট করে বিচ্ছিন্নতার তীর নিক্ষেপ করেছে। ঐশী ধর্মগুলো হচ্ছে ঐক্যের মূল উৎস। ঐক্যের এই উৎসমূলে বিচ্ছিন্নতার বীজ রোপন করেছে ফের্কা বা মাজহাবগুলো-যেসব মাজহাব কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামিপূর্ণও বটে। ‘ওহাবি’ মতবাদও অপরাপর বহু ফের্কার মতো একটি ফের্কা।

অন্যান্য ফের্কার মতো এই ফের্কাটিরও শেকড় প্রোথিত রয়েছে এর প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত চিন্তাধারার মধ্যে। ওহাবি মতবাদের মূল ভাবনাগুলো গৃহীত হয়েছে ‘ইবনে তাইমিয়া’র চিন্তাধারা থেকে। তাই প্রথমেই ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার দৃষ্টিভঙ্গিগুলো একবার পর্যালোচনা করে নেওয়া জরুরি। হিজরি সপ্তম শতাব্দিতে তথা ৬৬১ হিজরিতে ‘তাকিউদ্দিন আহমাদ ইবনে আব্দুল হালিম’ তৎকালীন তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় হাররান ( ইংরেজি ভাষায় Carrhae ) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইবনে তাইমিয়া নামেই বেশি পরিচিত। হাররান শহরটি সেই সময় ছিল হাম্বলি মাজহাব চর্চার প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলোর একটি। বর্তমানে অবশ্য শহরটির কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই। তবে প্রাচীনকালে হাররান ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ একটি শহর।

ইবনে তাইমিয়া এমন এক পরিবারে লালিত পালিত হন যেই পরিবারটি ছিল এক শতাব্দিরও বেশি সময় ধরে হাম্বলি মাজহাবের পতাকাবাহী। ধর্মীয় বহু বই-পুস্তক লেখালেখি হয়েছে এই পরিবারে। স্বয়ং ইবনে তাইমিয়ার পিতা ছিলেন হাররানের বিখ্যাত ফকিহ। তিনি ‘শায়খুল বালাদ’ নামে পরিচিত ছিলেন। হাররানের জনগণ তাকেঁ খতিব এবং ইসলামী জ্ঞান ও বিদ্যার শিক্ষক হিসেবেই জানতো। অপরদিকে ইবনে তাইমিয়ার জীবনকাল ছিল ইসলামী ভূখণ্ডে মোঙ্গলদের পাশবিক হামলার সমকালীন। সে সময় মোঙ্গলরা ব্যাপক সহিংস হামলা চালিয়ে মুসলিম ভূখণ্ডগুলো দখল করে নিয়েছিল এবং প্রতিদিনই প্রায় তাদের হুকুমাত বিস্তৃত হচ্ছিলো। এই যুগে মূল্যবান সব ইসলামী শিল্পকর্ম ও মুসলিম মনীষীদের বইপুস্তকগুলো মোঙ্গলদের হাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো।

বিখ্যাত আরব ঐতিহাসিক ইবনে কাসির লিখেছেনঃ ‘হিজরি ৬৬৭ সালে অর্থাৎ ১২৬৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন ইবনে তাইমিয়ার বয়স ৬ বছরের বেশি ছিলো না,তখন হাররান শহরের ওপর মোঙ্গলদের চাপ এতো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে, তাদের হামলার ভয়ে হাররানবাসীরা শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। ইবনে তাইমিয়াও সে সময় তার পরিবারের সাথে হাররান থেকে দামেশকে চলে গিয়েছিলেন।’ দামেশকে যাবার পর ‘দারুল হাদিসে’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন ইবনে তাইমিয়ার পিতা। সেখানে ইবনে তাইমিয়া পড়ালেখা করেন। তিনি তাঁর যৌবনকাল কাটান দামেশকে। তাঁর পিতাসহ হাম্বলি মাজহাবের বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে তিনি ফিকাহ, হাদিস, উসূল, তাফসির, কালাম ইত্যাদি শেখেন। এক পর্যায়ে তিনি হাম্বলি মাজহাবে ইজতেহাদের পর্যায়ে পৌছেঁন এবং ফতোয়া দেওয়া ও শিক্ষকতা করার মতো যোগ্যতা অর্জন করেন। দামেশকে তার পিতার মৃত্যুর পর তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন এবং কোরআনের তাফসির পড়ানোর দায়িত্বে নিয়োজিত হন।

ইবনে তাইমিয়া অন্যান্য ধর্ম এবং মাজহাব নিয়েও পড়ালেখা করেন এবং এমন কিছু ফতোয়া দিতে থাকেন যেগুলোর সাথে আহলে সুন্নাতের চার মাজহাবসহ শিয়া মাজহাবেরও কোনো মিল ছিলো না। ইবনে তাইমিয়া মুসলমানদের মাঝে প্রচলিত কিছু রীতিনীতিরও সমালোচনা করতে থাকেন এবং এমনকি কিছু কিছু সুন্নাতের অনুসরণকে শিরকের সাথে তুলনা করার পাশাপাশি আল্লাহর সাথে দূরত্ব সৃষ্টির কারণ বলেও উল্লেখ করেন। মুসলমানদের দৃঢ় বিশ্বাসগুলোর কোনো কোনোটির ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার কারণে এবং ব্যতিক্রমধর্মী ফতোয়া প্রদান করার কারণে ইবনে তাইমিয়ার জীবনে শুরু হয় ব্যাপক তোলপাড়। হিজরি ৬৯৮ সাল পর্যন্ত ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারা সম্পর্কে তেমন কিছুই শোনা যায় নি, কিন্তু এখন আবার ধীরে ধীরে তার চিন্তাধারার উত্থান ঘটছে। উদাহরণত বলা যায় এ বছরই আশআরি মাজহাবের বিরুদ্ধে একটি বই লেখা হয়েছে যে বইটি দামেশকে ব্যাপক হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে।

ইবনে তাইমিয়া নিজেকে ‘সালাফি’ বলে মনে করতেন।সালাফি শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অতীতচারিতা বা পূর্বপুরুষদের নিঃশর্ত অনুসরণ করা। তবে ‘সালাফিয়া’ একটি ফের্কার নাম যেই ফের্কায় নবীজী (সা), তাঁর সাহাবিবর্গ এবং তাবেয়িনদের অনুসরণের দাবী করা হয়। তাবেয়িন বলতে বোঝায় এমন শ্রেণীর লোকজনকে যাঁরা এক বা একাধিক সাহাবির সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছেন। সালাফিরা মনে করতেন ইসলামের সকল আকিদা-বিশ্বাস সাহাবি এবং তাবেয়িনদের আমল অনুযায়ী বাস্তবায়িত হওয়া উচিত। আর ইসলামী আকিদা কেবল কিতাব এবং সুন্নাত থেকেই গ্রহণ করতে হবে,আলেমদের উচিত হবে না কোরআনের বাইরের কোনো দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো কিছু আমল বা বাস্তবায়ন করা। সালাফিদের চিন্তায় বিবেক-বুদ্ধি বা যুক্তি তথা গবেষণার কোনো স্থান নেই,তাদের কাছে কেবল কোরআন-হাদিসের মূল টেক্সটই প্রমাণের জন্যে যথেষ্ট। তাদের যুক্তির বিরোধিতাকারীদের সাথে তারা কঠোর ব্যবহার করতো।

ইবনে তাইমিয়া সালাফি ইসলাম তথা প্রাচীন ইসলামে ফেরার অজুহাত দেখিয়ে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে এমন সব দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত দিতে থাকেন যার ভিত্তিতে মুসলমানদের বহু চিন্তা ও কাজকর্ম প্রশ্নের সম্মুখিন হয়ে যায়,এমনকি বহুসংখ্যক মুসলমান ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত অর্থাৎ কাফের হিসেবে পরিগণিত হয়।

ইবনে তাইমিয়া যখন তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা প্রসূত বিভিন্ন মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন, তখন তার ঐসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে,বিশেষ করে তিনি যখন আল্লাহর গুণাবলি নিয়ে কথা বলতেন তখন। তিনি আল্লাহ সম্পর্কে বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহ সশরীরী একটি সত্ত্বা এবং তিনি আকাশসমূহের উর্ধ্বে থাকেন। ইবনে তাইমিয়াই প্রথম কোনো মুসলিম যিনি আল্লাহর সশরীরী সত্ত্বার প্রবক্তা এবং এর পক্ষে লেখালেখিও করেছেন। তিনি মহানবী (সা) এর রওজা শরিফ যিয়ারত করা কিংবা তাঁর সম্পর্কে কোনো স্মরণসভা বা কোনো অনুষ্ঠান করাকে হারাম এবং শের্‌ক বলে মনে করতেন। এছাড়া তিনি কোনো ওলি আওলিয়া কিংবা নেককার বান্দাদের শরণাপন্ন হওয়া অথবা তাদের সহায়তা প্রার্থনা করাকেও হারাম বলে মনে করতেন কেননা তাঁর ধারণা এ ধরনের আমলের মানে হলো আল্লাহ বহির্ভুত সত্ত্বার শরণাপন্ন হওয়া।

ইবনে তাইমিয়া নবীজীসহ সকল অলিআওলিয়ার কবর মেরামত করা বা পবিত্র কোনো কবরের পাশে মসজিদ নির্মাণ করারও বিরোধী ছিলেন এবং এ ধরনের কাজকে তিনি শিরক বলে মনে করতেন। তাঁর এইসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাজহাবের আলেম ওলামাগণ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা আল্লাহর সশরীরী সত্ত্বায় বিশ্বাসী এবং আল্লাহকে মানুষের মতোই চিন্তা করতে অভ্যস্থ এমন কোনো ব্যক্তির এ ধরনের কথাবার্তা গ্রহণ করতে পারছিলেন না। তাঁরা কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্যগুলোকে খণ্ডন করে বহু বই লিখেছেন। বিশেষ করে আল্লাহ যে অশরীরী বা দৈহিক কাঠামোর উর্ধ্বে এবং মানুষের উপলব্ধিরও উর্ধ্বে সে সম্পর্কে বিস্তারিত লেখালেখি করেছেন। সেইসাথে তাঁরা আদালতে আবেদন জানিয়েছেন ইবনে তাইমিয়ার বিপথগামী চিন্তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে। ইবনে তাইমিয়া প্রতিবাদের এই ঝড়ের মুখেও তার বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটাতে থাকেন।

কেবল তাই নয় যারা তাঁর বিরোধিতা করছে তাদেরকে তিনি কাফের বলে অভিহিত করেন এমনকি কখনো কখনো তাঁর লেখায় তাদেঁরকে অভিহিত করার ক্ষেত্রে অশোভন শব্দও ব্যবহার করেছেন। ইতিহাসে এসেছে হিজরি ৭০৩ সালে ইবনে তাইমিয়া যখন বিখ্যাত আরব মুসলিম আরেফ ‘মহিউিদ্দন আরাবি’র লেখা ‘কুসুসুল হেকাম’ নামক বইটি পড়েন,তখন তিনি এতে তাঁর নিজস্ব মত ও বিশ্বাসের বিরোধী বক্তব্য খুঁজে পান। সেজন্যে পাল্টা একটি বই লেখেন ‘আন্নুসুসু আলাল ফুসুস’ নামে। এ বইতে মহিউদ্দিন আরাবি’র চিন্তাধারাকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর অনুসারীদেরকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। এভাবে মতবিরোধ ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করে।

মুসলমানদের মাঝে প্রচলিত বিখ্যাত ধ্যান-ধারণার সাথে ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য সাংঘর্ষিক হবার ফলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। যার পরিণতিতে ৭০৫ হিজরিতে সিরিয়ার আদালত তাঁর বিরুদ্ধে মিশরে নির্বাসনের রায় দেয়। হিজরি ৭০৭ সালে তিনি কারামুক্ত হন এবং কয়েক বছর পর আবার সিরিয়ায় ফিরে আসেন এবং তাঁর নিজের দৃষ্টিভঙ্গির অনকূলে পুনরায় লেখালেখি করতে থাকেন। ৭২১ হিজরিতে আবারো তাঁকে কারাগারে আটক করা হয় এবং ৭২৮ হিজরির জিলকাদ মাসে শেষ পর্যন্ত দামেশকের কেল্লা কারাগারে মারা যান।

ইবনে তাইমিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর চিন্তাদর্শেরও প্রায় মৃত্যু ঘটে গিয়েছিল। খুব কম লোকই তাঁর চিন্তাদর্শের অনুসারী ছিল।কিন্তু পাঁচ শতাব্দি পর ‘মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদি’নামের এক লোক ইবনে তাইমিয়ার আকায়েদের ভিত্তিতে নতুন করে একটি ফের্কার জন্ম দেন।তাঁর ওই ফের্কার নাম হচ্ছে ‘ওহাবিয়্যাত’বা ওহাবি মতবাদ। এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব হিজরি ১১১৫ সালে সৌদি অরবে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে তিনি ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিলেন। এমন একটি মতবাদের প্রবর্তন করেন তিনি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাগুলোর সাথে যার ব্যাপক মতপার্থক্য ছিলো। তবে তিনি তাঁর আকিদা বিশ্বাসের বিস্তারের ক্ষেত্রে নজদের শাসক ‘মুহাম্মাদ বিন সাউদে’র শক্তি ও ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আব্দুল ওহাব পুনরায় সালাফি মতবাদের প্রচার ঘটান। তিনি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র কেন্দ্র অর্থাৎ মক্কা এবং মদিনায় তাঁর এই মতবাদ পেশ করেন এবং ভয়াবহ সংঘর্ষের মাধ্যমে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাবের পিতা সন্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার শৈশব থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন, কেননা তার ছেলের কথাবার্তায় আচার আচরণে গোমরাহি বা বিচ্যুতির লক্ষণ ছিলো স্পষ্ট। আব্দুল ওহাব মুসলমানদের বেশিরভাগ আকিদা বিশ্বাসকেই ঠাট্টা মশকরা করে উড়িয়ে দিতো। মদিনায় পড়ালেখা করার সময় প্রায়ই এমন কিছু বিষয় তুলে ধরতো নির্দিষ্ট একটি আকিদার সাথে যা ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষকরাও তার ভবিষ্যৎ বিচ্যুতির ব্যাপারে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব মদিনাতেও ইসলামের নবির শরণাপন্ন হওয়া বা তাঁর রওজা যিয়ারত করতে আসা মানুষের সমালোচনা করতেন। জানা যায়, শৈশবে তিনি মিথ্যা নবুয়্যতের দাবিদার যেমন মুসাইলামাতুল কাজ্জাব কিংবা সাজ্জাদ, আসওয়াদ আনাসির মতো ব্যক্তিদের জীবনী পড়তেন এবং এ ব্যাপারে ভীষণ আকর্ষণ বোধ করতেন। তবে তাঁর আকিদা বিশ্বাসের ওপর সরাসরি ছাপ পড়েছে ইবনে তাইমিয়া এবং তাঁর ছাত্র ইবনে কাইয়্যেম জুযির মতো লোকদের।

মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব যখন তার আকিদার কারণে মদিনার লোকজনের বিরোধিতার সম্মুখিন হলেন তখন মদিনা ছেড়ে চলে গেলেন নাজদে। তারপর কিছুদিন ছিলেন বসরায়। বসরায় যখন ছিলেন তখন তিনি তাঁর আকিদা নিয়ে আবারো বাড়াবাড়ি করেন এবং বসরা থেকেও বিতাড়িত হন। ওহাব ধর্মের সরল সঠিক পথ থেকে এতো বেশি বিচ্যুত হন যে আপামর মুসলমানকে কাফের-মুশরিক বলে বেড়াতে শুরু করেন এমনকি মুসলমানদের হত্যা করাকে ওয়াজিব বলেও মন্তব্য করেন। আব্দুল ওহাব তার অসুস্থ চিন্তাধারার ভিত্তিতে এমনকি মক্কা-মদিনার মতো ইসলামের পবিত্রতম ভূখণ্ডগুলোকে পর্যন্ত ‘দারুল কুফ্‌র’ এবং ‘দারুল হার্‌ব’ বলে অভিহিত করেন। পবিত্র এই স্থাপনাগুলোকে দখল করা এবং ধ্বংস করাকে তার অনুসারীদের ওপর ওয়াজিব বলে ঘোষণা করেন। সহিংসতা ছিল আব্দুল ওহাব এবং তার অনুসারীদের আচরণগত প্রধান বৈশিষ্ট্য।

আব্দুল ওহাবের ভ্রান্ত আকিদার বিরুদ্ধে মুসলিম জনগোষ্ঠি তো বটেই, এমনকি তার পিতা এবং আপন ভাইও ঐ মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাই শায়খ সোলাইমানের জীবনকথায় এসেছে আব্দুল ওহাবের পিতা জীবিতকালে ছেলের এ ধরনের আকিদা প্রচারের ব্যাপারে বাধা দিয়েছিলেন। তবে হিজরি ১১৫৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর অনগ্রসর কিছু লোকের মাঝে তার আকিদা প্রচারের সুযোগ পায়। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের আকিদার বিষয়টি স্পষ্ট হবার পর তার বিরুদ্ধে বড়ো বড়ো বহু আলেম উঠে আসেন। স্বয়ং তার ভাই শায়খ সোলায়মান-যিনি ছিলেন একজন হাম্বলি আলেম-তিনিও ওহাবের আকিদা প্রত্যাখ্যান করে একটি বই লেখেন। ইমানী দায়িত্বের অংশ হিসেবে ওহাবকে কোরআন হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বহু চিঠিও লেখেন তিনি এবং ইসলামের ভেতর এসব বেদায়াত প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। একটি পত্রে তিনি সূরা নিসা’র ১১৫ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করেন যেখানে লেখা রয়েছেঃ ‘সত্য সুস্পষ্ট হবার পর যে কেউ নবীজীর বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথের অনুসরণ করে, আমরা তাকে সেই বাতিল পথেই চলতে দেবো এবং দোযখে প্রবেশ করাবো,সেই স্থানটি খুবই বাজে।’

তারপরও আব্দুল ওহাব তার জাহেলি বিশ্বাসের ওপর স্থির থাকে এবং যে-ই তার দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করে তাকেই কাফের বলে সাব্যস্ত করে। সোলায়মান এক জায়গায় আব্দুল ওহাবের মূর্খতার কথা উল্লেখ করে তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেনঃ রাসূলে আকরাম (সা) বলেছেন ‘কোনো বিষয়ে যার সঠিক জ্ঞান নেই সে বিষয়ে তার উচিত নয় মতামত ব্যক্ত করা,বরং তার উচিত হলো যেটা সে জানে না তা একজন জ্ঞানী লোকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া’। সূরা আম্বিয়ার ৭ নম্বর আয়াতেও এসেছেঃ فاَسئلوا أهلَ الذکر ان کنتم لا تعلمون অর্থাৎ’যদি না জানো তাহলে যে জানে তার কাছে জিজ্ঞেস করো।’সেজন্যেই শায়খ সোলায়মান বলতেন-ওহাবের জ্ঞানের অভাব রয়েছে,তাই তার উচিত যারা জ্ঞানী ও ইসলামী চিন্তাবিদ তাদেরকে জিজ্ঞেস করা এবং তাদের অনুসরণ করা।

যাই হোক ওহাবের বিরুদ্ধে সে সময় এতোসব বিরোধিতা সত্ত্বেও সে তার ভ্রান্ত আকিদাকে নাজদ অঞ্চলের কিছু লোকের মাঝে প্রচার করতে সক্ষম হয়েছিল। সমাজ বিজ্ঞানীগণ এর কারণ হিসেবে বলেছেন ঐ এলাকাটি ছিল প্রত্যন্ত মরু,তাদের লেখাপড়া কিংবা দ্বীনী জ্ঞান ছিল একেবারেই নগণ্য। সেই এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৈন্যতার কারণেই সেখানকার কিছু লোকজন ওহাবের আকিদা গ্রহণ করেছিল। এই শ্রেণীর লোকজনকে যে-কেউ খুব সহজেই প্রতারিত করতে পারে। তাছাড়া ওহাবের কথাবার্তার ভঙ্গিটাও ছিল বেশ আকর্ষণীয় এবং মুগ্ধকর। সবোর্পরি মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তির ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল তার পেছনে।

এমনিতেই পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো এ সময় চারদিক থেকে মুসলিম বিশ্বকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। ব্রিটিশরা পূর্বদিক থেকে ভারতের বৃহৎ অংশ দখল করে পারস্য উপসাগর উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। তারা প্রতিটি মুহূর্তে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। ফরাশিরাও নেপোলিয়নের নেতৃত্বে মিশর, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন দখল করে ভারতের দিকে যাবার চিন্তা করছিলো। রুশরাও চেয়েছিলো ইরান এবং তুরস্কে বারবার হামলা চালিয়ে তাদের সাম্রাজ্য একদিক থেকে সেই ফিলিস্তিন পর্যন্ত অন্যদিকে সুদূর পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করতে। সে সময়কার আমেরিকাও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাদের লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। তারা লিবিয়া এবং আলজেরিয়ায় গুলিবর্ষণ করে মুসলিম বিশ্বে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এরকম একটি কঠিন পরিস্থিতিতে যখন শত্রুদের মোকাবেলায় মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতামূলক হৃদ্যতার প্রয়োজন ছিলো,ঠিক সে সময় মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব ভ্রান্ত মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে কাফের সাব্যস্ত করে মুসলিম ঐক্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছিলো।

এদের মাঝে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদই ছিলো সবচেয়ে অগ্রসর। তারা মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করে তাদের সম্পদ লুট করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এই ফাটল সৃষ্টি করার জন্যে মুসলিম বিশ্বে মাজহাবগত মতপার্থক্য সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। এ কারণেই কোনো কোনো ঐতিহাসিক ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের স্বার্থসিদ্ধির সাথে ওহাবি ফের্কার আবির্ভাবের যোগসূত্রের বিষয়টিকে উড়িয়ে দেন নি। ইতিহাসে ব্রিটিশ গোয়েন্দা মিস্টার হ্যাম্পারের সাথে আব্দুল ওহাবের যোগাযোগের কথা এসেছে। হ্যাম্পার মুসলিম দেশগুলোতে বৃটেনের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তি করতো। সে ইসলামী বেশভুষায় মূলত মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির পথ খুজেঁ বেড়াতো। হ্যাম্পার তার ডায়েরিতে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথায় লিখেছে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় বসরা শহরে আব্দুল ওহাবের সাথে তার দেখা হয়। ওহাব সম্পর্কে তার মূল্যায়ন এরকমঃ ‘মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের মাঝে আমি আমার হারানো আমিকে খুজেঁ পেলাম। মাজহাব সংরক্ষণে তার নির্লিপ্তি, তার আত্মম্ভরি ও অহমিকাপূর্ণ আত্মা ও মানসিকতা, সমকালীন আলেমদের প্রতি তার ঘৃণা, স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি এমনকি চার খলিফা সম্পর্কে গুরুত্বহীনতা ইত্যাদি ছিল তার চিন্তাগত বৈশিষ্ট্য। কোরআন ও সুন্নাহর সামান্য জ্ঞানই ছিল মূল ভিত্তি। ওহাবের এইসব গুণাবলিই ছিল দুর্বল স্থান যার মধ্য দিয়ে তার ভেতরে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ ঘটে।’

হ্যাম্পারের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় তাহলো সে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবকে ওহাবি ফের্কা প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিলো এবং এ ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার তাকে ও মুহাম্মাদ ইবনে সাউদকে সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা দেবে বলেও ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাধ সেধেছে সে সময়কার আলেম সমাজ। ওহাবের ভাই,পিতাসহ সবাই তার ভ্রান্ত আকিদার বিরোধিতা করেছে। পিতার মৃত্যুর পর ওহাব যখন যেখানে গেছে কিছুদিন পরপর সেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছে। সবশেষে এসে ভিড়েছে নজদের বিখ্যাত শহর দারিয়ার গভর্নর মুহাম্মাদ ইবনে সাউদের কাছে। ইনিই ছিলেন আলে সউদের পূর্বপুরুষ। তার সাথে ওহাবের চুক্তি হয় উগ্র ওহাবি চিন্তাধারা বিকাশের মধ্য দিয়ে ইবনে সাউদের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটানো হবে। শাসক থাকবেন ইবনে সাউদ আর ধর্মীয় প্রচারণা চালাবে ওহাব। এই চুক্তিকে আরো মজবুত করার জন্যে দুই পরিবার বৈবাহিক সূত্রেও আবদ্ধ হয়।

আলে সাউদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আব্দুল ওহাব তার মতবাদের বিস্তার ঘটায়। বিশেষ করে তারা আশপাশের শহর এবং গোত্রগুলোতে দ্রুততার সাথে প্রচার কাজ শুরু করে। ওহাবি মতবাদ প্রচারের একেবারে শুরুতেই যে কাজটি করা হয় তাহলো উয়াইনা’য় সাহাবাদের এবং আওলিয়াদের মাযারগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। আব্দুল ওহাব আল্লাহর অলিদের শরণাপন্ন হওয়াকে শিরক এবং মূর্তিপূজার মতো অপরাধ বলে গণ্য করতো এবং যারা একাজ করতো তাদেরকে কাফের বলে সাব্যস্ত করতো। তাদেরকে হত্যা করা জায়েয এবং তাদের মালামালকে যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমত বলে ঘোষণা করেছিল। এই ফতোয়া পেয়ে ওহাবের অনুসারীরা হাজার হাজার নিরীহ মুসলমানের রক্ত ঝরিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো সে সময় দিরইয়ের লোকজন অভাবগ্রস্ত ছিল। এই রক্তপাতের পর তাদের ভাষায় প্রচুর গনিমত পাবার ফলে অভাব কেটে যায়। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বুশ্‌র নজদি’ লিখেছেনঃ আমি আমার কাজের শুরুতে দিরইয়া শহরের দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখেছি,কিন্তু পরবর্তীতে এই শহর সাউদের অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে সাউদের উত্তর পুরুষের সময়ে বেশ সম্পদশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু কীভাবে এতোটা সম্পদশালী হলো তার বর্ণনা প্রসঙ্গে ইবনে বুশর ইতিহাসের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ নজদের অন্যান্য শহরসহ বিভিন্ন গোত্রের মুসলমানদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের সম্পদ লুট করে এরকম সম্পদশালী হয়েছে। যারাই ওহাবি মতবাদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। হামলা করে যেসব গনিমত পেত তার সবই শায়খ মুহাম্মাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতো আর মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ, তার অনুমতিক্রমে একটা অংশ নিতো। আব্দুল ওহাব তার ইচ্ছামতো এই সম্পদ ব্যবহার করতো। অনেক সময় দেখা যেত ওহাব সকল সম্পদ মাত্র দু’তিন জনের মাঝে বিলি করে দিয়েছে। ওহাব বিভিন্ন শহরের লোকজনকে তার মতবাদের দিকে আমন্ত্রণ জানাতো। যারা গ্রহণ করতো তারা নিরাপদ ছিলো,আর যারা বিরোধিতা করতো তাদের জান-মালকে হালাল ঘোষণা করে আক্রমণ চালাতো। নজদ এবং নজদের বাইরে ওহাবিরা এরকম বহু যুদ্ধ করেছে। ইয়েমেন, হেজাজ, সিরিয়ার উপকণ্ঠ, ইরাকে ওহাবিরা যতো যুদ্ধ করেছে সবই তাদের মতবাদ গ্রহণে অস্বীকৃতির কারণেই করেছে। ‘আহসা’ শহরের ‘ফুসুল’ নামের একটি গ্রামের তিন শ’ মুসলমানকে ওহাবিরা হত্যা করে তাদের সকল মালামাল লুট করেছে।

আব্দুল ওহাব নিজেকে হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী বলে পরিচয় দিতেন। অথচ এই মাজহাবের মূল প্রবক্তা আহমাদ ইবনে হাম্বলকেও কাফের বলে ঘোষণা করেছিল। কেননা তিনি কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ) এর মাযার যিয়ারত সম্পর্কে বই লিখেছিলেন। ওহাবের দৃষ্টিতে পবিত্র কোনো স্থাপনা যেমন অলি-আওলিয়া, মাসুমিনদের মাযারের মতো মহান স্থাপনাগুলো যিয়ারত করা শির্‌ক, তাই এইসব স্থাপনা যিয়ারতকারীদের জানমাল হরণ করা মোবাহ অর্থাৎ সওয়াবের কাজ। তার এই চরমপন্থী মতবাদ শুরু থেকেই যে আলেমদের বিরোধিতার সম্মুখিন হয়েছিল সেকথা আমরা ইতোপূর্বেও বলেছি। সে সময়কার হেজাজের বিখ্যাত আলেমে দ্বীন এবং মক্কার মুফতি সাইয়্যেদ আহমাদ ইবনে যিনি দাহলান ‘খুলাসাতুল কালাম’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন ‘১১৬৫ হিজরিতে আব্দুল ওহাবের জীবিতাবস্থায় নজদের একদল ওহাবি আলেম মক্কা শহরে গিয়েছিলেন সেখানকার আলেমদের সাথে বাহাস করার জন্যে। তারা তাদের আকিদার কথা বর্ণনা করতো আর মক্কার আলেমগণ তাদের বক্তব্য খণ্ডন করতেন। কোরান-হাদিস বিরোধী ওহাবি আকিদা মক্কী আলেমগণ কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁরা ওহাবি মতবাদকে ভিত্তিহীন এবং নষ্ট আকিদা বলে মনে করতেন। ঠিক সে সময় মক্কার কাজি ওহাবি আলেমদেরকে কারাবন্দী করার আদেশ দেন। ঐ আদেশের পর কিছু কিছু ওহাবি আলেম পালিয়ে গিয়েছিলো আর কিছু কিছু আলেমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

ওহাবি আলেমদেরকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা একটু ভিন্নভাবে ১১৯৫ হিজরি তথা ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দেও ঘটেছিলো। আলে সাউদ এবং ওহাবি ফের্কার মূল কেন্দ্র দিরইয়া শহরের ওহাবি আলেমরা মক্কায় গিয়েছিলো সেখানকার আলেমদের সাথে নতুন তৌহিদ নিয়ে কথা বলার জন্যে। মক্কার আলেমগণ তখনো ওহাবি আলেমদেরকে কাফের বলে তাদেরকে মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং তাদের ওপর হজ্ব করা বা আল্লাহর ঘর যিয়ারত করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো। এখানে একটি প্রশ্ন এসে যায়,তাহলো ওহাবিরা কেন তাদের আকিদা নিয়ে মক্কায় যেত? জবাব হলো মক্কা শহর ছিলো ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান ও প্রাণকেন্দ্র। তাই ওহাবিরা চেয়েছিল মক্কা দখল করে তাকে তাদের ধর্মীয় কেন্দ্র বানাতে যাতে মুসলমানরা ইসলামের পরিবর্তে ওহাবি আকিদায় দীক্ষিত হয়।

ইতোমধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ ১১৭৯ হিজরি তথা ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর স্থলাভিষিক্ত হন তাঁরই পুত্র আব্দুল আযিয। বাবার মতো আব্দুল আযিযও ওহাবের সাথে মৈত্রীতে আব্দ্ধ হন। বাবা বেঁচে থাকতে আব্দুল আযিয পিতার সেনাবাহিনীর একাংশের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন,আব্দুল ওহাবের পৃষ্ঠপোষকতায় সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাই সৌদি আরবের বিরাট একটি অংশ দখল করতে সক্ষম হন তিনি। ওহাবি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব শেষ পর্যন্ত ১২০৭ হিজরিতে অর্থাৎ ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ৯৬ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার সন্তানেরা ওহাবি মতবাদ প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। তারই উত্তরপুরুষ আব্দুল লতিফ ওহাবি মতবাদের ওপর বহু বই লিখেছেন। এভাবে ওহাবের ছেলেরা, পৌত্রেরা ভ্রান্ত ওই মতবাদ ব্যাখ্যা করে বহু বই লিখেছেন।

ওহাবিদের চরমপন্থার ভয়াবহ একটি নিদর্শন হলো ইরাকের পবিত্র কারবালা শহরে হামলা চালিয়ে হাজার হাজার যিয়ারতকারীকে হত্যা করা এবং সেখানে অবস্থিত ইমাম হোসাইন (আ) এর মাযারে হামলা চালানো। ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দে সাউদ বিন আব্দুল আযিয,নজদের জঙ্গি আরব সেনাদের মধ্য থেকে বিশ হাজারের একটি বাহিনীকে কারবালা শহরে হামলার উদ্দেশ্যে পাঠান। ঐ সেনারা প্রতমে কারবালা শহর অবরোধ করে এভং পরে জোর করে শহরে প্রবেশ করে। সে সময় কারবালা ছিলো ব্যাপক খাতিমান ও সম্মানীয়। ইরান, তুরস্ক এভং আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যিয়ারতকারীগণ কারবালায় যেতেন ইমাম হোসাইন (আ) এর মাযার যিয়ারত করার জন্যে। সাউদ এই যিয়ারতকারী এবং তাদেরকে আশ্রয় প্রদানকারীকে কাফের বলে ঘোষণা করে সবাইকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করে। আত্মগোপনকারী কিংবা পলায়নকারীরা ছাড়া কেউ তাদের হাত থেকে রক্ষা পায় নি।

ইতিহাসে এসেছে ওহাবিরা কারবালা শহরের অন্তত ৫ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল। সাউদের এই নৃশংস সেনারা নবীজীর সন্তান হোসাইন ইবনে আলি (আ) এর মাযারের মর্যাদাটুকুও রাখে নি,মাযারটিকে তারা ধ্বংস করে দিয়ে সোনা-রূপাসহ সকল সম্পদ লুট করে নিয়ে গিয়েছিলো। ভয়াবহ সেই ঘটনার ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো সে সময়।

কারবালায় হামলার এই বিপর্যয়কর ঘটনায় মুসলিম বিশ্বে ওহাবিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিলো। সমকালীন কবিগণ এই হত্যাকাণ্ড এবং ইমাম হোসাইন (আ) এর মাযারের সম্মান ও পবিত্রতা বিনষ্ট করার ঘটনা নিয়ে বহু মর্সিয়া রচনা করেছিলেন। ওহাবিরা বারো বছর ধরে মাঝে মাঝেই কারবালা শহর এবং তার আশেপাশে হামলা চালিয়েছিল। নাজাফ শহরেও তারা হামলা চালায়। হামলা চালিয়ে তারা সেখানকার অর্থসম্পদ লুট করে নেয়। ইরাকের সমকালীন বিশিষ্ট আলেম আল্লামা সাইয়্যেদ জাওয়াদ আমেলি কারবালায় ওহাবিদের আক্রমণ সম্পর্কে লিখেছেনঃ ‘….(সাউদ) ১২১৬ হিজরিতে হোসাইন (আ) এর মাযারে হামলা চালায়। শিশুসহ বহু মানুষকে সে হত্যা করে। তাদের মালামাল লুট করে নেয় এবং হারাম শরিফের ওপর এমন অত্যাচার চালায় যে আল্লাহই ভালো জানেন।’ কারবালায় ওহাবিদের আক্রমণের ফলে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের ঘৃণা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌছেঁ যে ১২১৮ হিজরির গ্রীষ্মে সাউদের পিতা আব্দুল আযিযকে ৮৩ বছর বয়সে হত্যা করা হয়। হত্যাকারী ছিলো একজন শিয়া। সাউদের সেনারা ১২২০ হিজরিতেও পবিত্র নাজাফে ইমাম আলী (আ) এর পবিত্র মাযার স্থাপনায় আক্রমণ করে। কিন্তু নাজাফের লোকজনের নজিরবিহীন প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
লেখকদের বর্ণনায় এসেছে একদল মানুষ এবং দ্বীনী এলেম শিক্ষার্থী নাজাফের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন কাশেফ আলগাত্তার সাথে দিবারাত্রি এই শহর রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর ঘর ছিলো অস্ত্রের গুদাম। এই মুজাহিদ আলেম নাজাফের প্রতিটি প্রবেশদ্বারে এবং সকল টাওয়ারে লোকজনের সাথে তাঁর কজন ছাত্রকে প্রতিরক্ষার দায়িত্বে মোতায়েন করেছিলেন। নজদের ইতিহাসবিদ ইবনে বুশরা নাজাফে ওহাবিদের হামলা সম্পর্কে লিখেছেনঃ ১২২০ হিজরিতে বিশাল একটি সেনাদল ইরাকের নাজাফ শহরের দিকে পাঠায়। শহরের পাশে পৌঁছতেই ওহাবি সেনারা বেশ গভীর খন্দকের মুখোমুখি হয়। ওহাবি সেনারা কিছুতেই ওই পরিখা অতিক্রম করতে সক্ষম হলো না। নাজাফ শহরের উঁচু প্রাচীর বা স্থান থেকে তীর নিক্ষেপের ঘটনায় বহু ওহাবি সেনা মারা যায়,বাকিদের কেউ কেউ ফিরে যায় এবং আশেপাশের গ্রামে লুটপাট চালায়। ওহাবিরা এভাবেই মূল ইসলামে ফেরার প্রতারণাপূর্ণ শ্লোগান দিয়ে নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করে। অথচ কোরআনের শিক্ষা হলো মুসলমানদেরকে ঐক্য, সংহতি, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির দিকে আহ্বান জানানো। ইতিহাস সবসময় ভালো এবং মন্দের চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরে যাতে চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ সত্য এবং বাতিলকে সুস্পষ্টভাবে দেখতে পায়।

তো ওহাবি মতবাদের ইতিহাস হচ্ছে এমন একটি ক্যানভাসের মতো যেখানে উগ্র সহিংসতার বিচিত্র দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। আব্দুল ওহাবের মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে বাবার সেই সহিংস ধারা অব্যাহত রাখে। মুহাম্মাদ বিন সাউদের সন্তানও ওহাবি মতবাদ প্রচারে নামে এবং তার অধীনস্থ ভূখণ্ডে ওহাবি ফের্কার বিস্তার ঘটায়। এক্ষেত্রে আব্দুল আযিযের ভূমিকাটা ছিল উল্লেখযোগ্য। সে ওহাবি ফের্কা বিস্তারে গণহত্যা চালিয়ে ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টি করেছিলো। আব্দুল আযিয তার ছেলে সাউদসহ পবিত্র শহরগুলোতে রক্তপাত ঘটিয়েছে এবং পবিত্র সব মাযারসহ সকল ধর্মীয় নিদর্শন ধ্বংস করে দিয়েছে। পবিত্র কারবালা শহর এবং ইমাম হোসাইন (আ) এর মাযার শরিফ ধ্বংস করার পর তারা ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মক্কা শহর দখল করতে চেয়েছিলো।

পবিত্র কারবালা ও নাজাফ শহরে হামলা চালানোর পর ওহাবিরা ১২১৭ হিজরিতে হেজাজের গুরুত্বপূর্ণ শহর তায়েফে হামলা চালায়। আব্দুল আযিযের সময় তার ছেলে সাউদ ছিল ওহাবিদের সেনা অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে পরিচালিত এই হামলা ছিল নৃশংসতম একটি হামলা। এ সম্পর্কে ইরাকের বিখ্যাত মনীষী কবি জামিল যাহাভি লিখেছেনঃ “ওহাবিদের নোংরাতম কাজগুলোর একটি ছিল তায়েফের গণহত্যা। ছোটোবড়ো কারো পরেই কোনোরকম দয়া করে নি তারা। এমনকি দুধের শিশুকেও তারা মায়ের কোলে মাথা কেটে হত্যা করেছে। ঘরে ঘরে যখন আর কেউ বাকি ছিলো না তখন তারা মসজিদে,বাজারের দোকানে দোকানে গিয়ে লোকজনকে হত্যা করেছে। কোরান পড়া অবস্থায় এমনকি নামায আদায়কালেও তারা হত্যা করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বইপুস্তক, কোরান, হাদিস, বোখারি মুসলিম শরিফসহ হাদিস-ফেকাহর অন্যান্য কিতাবও তারা বাজারের গলিতে ফেলে দিয়ে পদদলিত করেছে।

তায়েফে এই গণহত্যা চালানোর পর ওহাবিরা মক্কার আলেমদের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে ওহাবি মতবাদের প্রতি আমন্ত্রণ জানায়। ‘হিন্দি’ নামে পরিচিত শাহ ফজলে রাসুল কাদেরি “সাইফুল জাব্বার” গ্রন্থে লিখেছেনঃ মক্কার আলেমগণ কাবার পাশে সমবেত হয়েছিলেন ওহাবিদের পত্রের জবাব দেওয়ার জন্যে। এরিমাঝে গণহত্যা-দুর্গত তায়েফের একদল লোক মাসজিদুল হারামে এসে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানালো। মক্কার জনগণের মাঝে তখন শোরগোল পড়ে গেল যে ওহাবিরা খুব শীঘ্রই মক্কায় হামলা চালাবে। তাদের মাঝে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হলো। এদিকে হজ্ব পালনের জন্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আলেমগণ, সুন্নিদের চার মাজহাবের মুফতিগণ ঘোষণা করেন যে ওহাবিরা কাফের এবং অমুসলিম,তাদের সাথে জেহাদ করা ওয়াজিব। তাঁরা মক্কার আমিরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ওহাবিদের মোকাবলায় লড়বার জন্যে।” কিন্তু ওহাবিদের সাথে যুদ্ধ করতে আলেম সমাজ সম্মত হলেও মক্কাবাসীরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলো না। এদিকে সাউদও মক্কায় একটি চিঠি লিখে হুমকি দিয়েছিল-তিন দিনের মধ্যে কাবা যিয়ারতকারীদের সবাইকে কাবা ত্যাগ করতে হবে।

মক্কার গভর্নরসহ আরো অনেক আলেম সাউদের কাছে গিয়ে মক্কাবাসীদের নিরাপত্তা চাইলো। সাউদও একটি চিঠিতে সবাইকে নিরাপত্তা দিয়েছিলো। ১২১৮ হিজরিতে সাউদ বিনাযুদ্ধে মক্কায় প্রবেশ করে। কাবা যিয়ারত করে লোকজনকে সমবেত করে তাদেরকে ওহাবি ফের্কার দাওয়াত দিয়ে বাইয়াত গ্রহণ করতে চাইলো। সেইসাথে সবাইকে বললো ওহাবি সেপাহীদের সাথে মক্কা শহরে যেতে এবং ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মূল্যবান সব নিদর্শন ধ্বংস করে দিতে। মক্কা দখল করার পর ওহাবিরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে দেয়। নবীজী (সা) এর জন্মস্থানের গম্বুজ, হযরত আলী (আ) এর জন্মস্থানের গম্বুজ, হযরত খাদিজা (সা), আবু বকর (রা) এর স্মৃতিময় নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলো। ওহাবিরা এইসব পবিত্র স্থাপনা ধ্বংস করার সময় তবলা বাজিয়ে গান গেয়ে নেচে নেচে উল্লাস করতো। ওহাবিদের এই জঘন্য কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো। অনেকেই এ বিষয়ে বহু বইপুস্তক লিখেছেন।

কুয়েতের আহলে সুন্নাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ডক্টর রেফায়ি “ওহাবি ভাইয়ের প্রতি পরামর্শ” নামক গ্রন্থে ওহাবি আলেমদের উদ্দেশ্যে লিখেছেনঃ তোমরা নবীজীর প্রথম হাবিবা বা সহধর্মিনী উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কোবরা (সা) এর ঘর ধ্বংস করার অনুমতি দিয়েছো এবং কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখাও নি। অথচ ঐ ঘরটি ছিলো কোরআন তথা ওহি অবতীর্ণ হবার পবিত্র স্থান….কেন তোমরা আল্লাহকে ভয় করছো না এবং পয়গাম্বরে কারিমের ব্যাপারে লজ্জা করছে না। ..তোমরা নবীজীর জন্মস্থানটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে তাকে পশু বেচাকেনার স্থানে পরিণত করেছো যাকে কিছু নেককার ও ভালো মানুষ ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে তোমাদের ওহাবিদের ছোবল থেকে মুক্ত করায় গ্রন্থালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে…..”

ওহাবিদের ভয়াবহতম এবং ন্যক্কারজনক আরেকটি কাজ-যে কাজের ক্ষতি সবসময়ের জন্যেই বহমান থাকবে-তা হচ্ছে মক্কার “আলমাকতাবুল আরাবিয়া” নামের বিশাল লাইব্রেরিতে আগুন দেওয়া। এই কুতুবখানায় দুর্লভ ও মূল্যবান ষাট হাজার কিতাব ছিল এবং চল্লিশ হাজারেরও বেশি হাতে লেখা অনন্য পাণ্ডুলিপি ছিলো। এগুলোর মাঝে সেই জাহেলি যুগের, ইহুদিদের, কুরাইশ কাফেরদেরও হাতে লেখা বহু নিদর্শন মজুদ ছিল। বিশাল এই গ্রন্থাগারে আরো ছিল প্রাচীন কোরআন, আলী (আ), আবু বকর, ওমর, খালেদ বিন ওলিদ, তারেক বিন যিয়াদসহ নবীজীর আরো বহু সম্মানিত সাহাবির হাতে লেখা অনন্য সব নিদর্শন। আলমাকতাবুল আরাবিয়া লাইব্রেরিতে আরো যেসব মূল্যবান নিদর্শন মজুদ ছিলো তার মধ্যে ছিলো রাসূলে খোদা (সা) এর অস্ত্রশস্ত্র, ইসলাম আবির্ভাবকালে যেসব মূর্তির পূজা করা হতো-যেমন লাত, উযযা, মানাত, হুবাল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের বর্ণনায় এসেছে, ওহাবিরা কাফেরদের সাথে সংশ্লিষ্ট নিদর্শনগুলো এই গ্রন্থাগারে মজুদ থাকার অজুহাত দেখিয়ে তাতে আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দিয়েছে।

পূর্বপুরুষদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং প্রাচীনদের ইতিহাস সংরক্ষণ করা একটি সমাজের সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত হয়। কেননা এইসব নিদর্শন শিক্ষা নেওয়া, ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত থেকে করণীয় ঠিক করা ইত্যাদির জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বিভিন্ন দেশ ও সরকার এ ধরনের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে সংরক্ষণ করার জণ্যে বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং কাউকে সেখানকার ছোট্ট একটি মৃৎপাত্রও কিংবা সামান্য একটি প্রস্তর লিখনও নিয়ে যেতে দেয়া হয় না। নিঃসন্দেহে ইসলামী সভ্যতা বিশ্বের উন্নত সভ্যতাগুলোর একটি এবং মুসলমানরা ইসলামী শিক্ষার আলোকেই এই সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছিলেন। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং তাঁর সঙ্গীসাথীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নিদর্শন সমৃদ্ধ এই সভ্যতার উত্তরাধিকার ও অংশ। তাই এইসব নিদর্শন সংরক্ষণ করা এবং সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করা ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতির গোড়াপত্তনকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই প্রতীক। পক্ষান্তরে এগুলোকে ধ্বংস করা মূর্খতা ও জাহেলি কুসংস্কার তথা গোঁড়ামির শামিল। ভ্রমণকাহিনী আর ইতিহাসের বহু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে ইসলামী দেশগুলোসহ ওহির দেশে পূণ্যবানদের শত শত মাযার ছিল,যেগুলোর অধিকাংশই ওহাবিরা শেরেক আর কুফুরির অজুহাতে বিনষ্ট করে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে।

সাউদ বিন আব্দুল আযিয মক্কা মুকাররমা দখল করার সময় আহলে সুন্নাতের বহু আলেম ওলামাকে বিনা কারণে শহীদ করেছে এবং মক্কার বহু সম্ভ্রান্ত লোককে কোনোরকম অভিযোগ ছাড়াই ফাঁসি দিয়েছে। মুসলমানদের যে-কেউই নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসের ওপর স্থির থাকতো তাদের বিভিন্নভাবে শাস্তির হুমকি দিয়েছিলো। সে সময় হাটে-বাজারে, অলিতে গলিতে সাউদের ঘোষকেরা হাঁক মেরে ঘোষণা করে দিতোঃ “হে লোকজন! সাউদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হও এবং তার বিস্তৃত ছায়ার নীচে আশ্রয় নাও!” ওসমানী সরকারে নৌ-বাহিনীর উচ্চতরো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক রিয়ার এডমিরাল আইয়ুব সাবুরি লিখেছেনঃ আব্দুল আযিয বিন সাউদ বিভিন্ন গোত্রের শেখদের সমাবেশে দেওয়া তার প্রথম বক্তৃতায় বলেছেন, আমাদের উচিত সকল শহর নগরকে আমাদের অধীনে নিয়ে আসা। আমরা আমাদের আকিদা বিশ্বাসগুলো তাদেরকে শিক্ষা দেবো। আমাদের এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে নিরুপায় হয়ে নবীজীর সুন্নাত তথা মুহাম্মাদি শরিয়াতের অনুসরণের দাবিদার আহলে সুন্নাতের আলেমদেরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে…বিশেষ করে নামকরা আলেমদেরকে; কেননা এরা যতোদিন বেঁচে থাকবে ততোদিন আমাদের আকিদা বিশ্বাস হাসির মুখ দেখবে না। তাই যারাই নিজেদেরকে আলেম বলে মনে করে প্রথমে তাদেরকে নির্মূল করতে হবে।”

সাউদ বিন আব্দুল আযিয মক্কা দখল করার পর আরব্য উপদ্বীপের অন্যান্য শহরও দখল করার চিন্তাভাবনা করে। এবার তাই হামলা চালায় বন্দর নগরী জেদ্দার ওপর। ওহাবি লেখক ইবনে বুশর তাঁর “নজদির ইতিহাস” নামক গ্রন্থে লিখেছেন, সাউদ মক্কায় বিশ দিনেরও বেশি ছিলেন,তারপর জেদ্দা দখল করার জন্যে মক্কা ত্যাগ করে। সাউদ জেদ্দা অবরোধ করে ঠিকই, কিন্তু জেদ্দার শাসক গোলা নিক্ষেপ করে বহু সংখ্যক ওহাবিকে হত্যা করে এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। ওহাবিরা এভাবে পরাজিত হবার পর মক্কায় ফিরে না গিয়ে বরং তাদের মূল ভূখণ্ড নজদে চলে যায়, কেননা তারা শুনতে পেয়েছিল ইরান থেকে একদল সেনা নজদে হামলা করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে সুবর্ণ একটি সুযোগ এসে যায় ওহাবিদের হাত থেকে মক্কা শহরকে পুনরায় উদ্ধার করার। মক্কার গভর্নর শারিফ গালিব ওহাবিদের হামলার পর জেদ্দায় লুকিয়েছিলেন,তিনি এখন জেদ্দার শাসকের সহযোগিতায় প্রচুর সেনা নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তাদের সেনাদের কাছে কামান-গোলার মতো অস্ত্রশস্ত্র ছিল যার ফলে তারা ওহাবি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়ে পুনরায় মক্কা বিজয় করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ওহাবিরা এরপরেও বিশ্বমুসলমানের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান মক্কাকে পুনরায় দখল করার পাঁয়তারা করে। শেষ পর্যন্ত ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে ওহাবিদের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হিসেবে পরিচিত সাউদের আদেশে পবিত্র মক্কা শহরটিকে আবারো অবরোধ করা হয়। দখল করার পর সাউদ মক্কার জনগণের ওপর এতো কঠোর আচরণ করতে থাকে যে শহরের বহু লোক ক্ষুধা তৃষ্ণায় মারা যায়। সাউদের আদেশে মক্কা শহরের প্রবেশদ্বার এবং বের হবার পথ সবই বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে-ই মক্কা থেকে পালাতে চেয়েছিল তাকেই হত্যা করা হয়েছিল। তাদের হাত থেকে শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায় নি। অবস্থা ভীষণ বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত মক্কার গভর্নর শারিফ গালিব ওহাবিদের সাথে হাত না মিলিয়ে পারলো না।

ওহাবিরা মক্কা অবরোধ করার সময় সে তাদের সাথে ভালো আচরণ করেছিল এমনকি ওহাবি আলেমদেরকে মূল্যবান সব উপঢৌকনও দিয়েছিল প্রাণে বেঁচে থাকার জন্যে। মক্কা দখল করে এবার ওহাবিরা ইরাকি হজ্বযাত্রীদের জন্যে চার বছর,সিরিয়াবাসীদের জন্যে তিন বছর এবং মিশরীয়দের জন্যে দুই বছর হজ্বের মতো আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ ইবাদাতের সকল আনুষ্ঠানিকতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

সাউদ কেবল হজ্বের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই ক্ষান্ত হয় নি, এবার সে নজর দিয়েছে মদিনাতুন্নাবির দিকে। মদীনা শহরও সে অবরোধ করে ফেলে। কিন্তু মদিনাবাসীগণ যেহেতু ওহাবি আকিদা এবং তাদের সহিংসতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন সেহেতু তাঁরা ওহাবিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। প্রায় বছর খানেক এই প্রতিরোধ সংগ্রামের পর অবশেষে ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে সাউদ ঐ শহরটিকেও দখল করে। ওহাবিরা নবীজী (সা) এর হেরেমের মূল্যবান সকল জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। তবে মুসলমানদের গণ বিরোধিতার ভয়ে রাসূলে আকরাম (সা) এর পবিত্র রওজা ধ্বংস করে নি ওহাবিরা। সাউদ বিন আব্দুল আযিয মদিনা মুনাওয়ারা দখল করার পর ঐ শহরবাসীদেরকে মাসজিদুন নববীতে সমবেত করেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্য শুরু করেন এভাবেঃ “হে মদিনার জনগণ! আল কোরআনের পবিত্র আয়াত আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম অর্থাৎ আজ তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করে দিলাম এর ভিত্তিতে তোমাদের ধর্ম ও বিধিবিধান আজ পূর্ণতায় পৌঁছেছে, ইসলামের নিয়ামতে তোমরা মর্যাদাবান হয়েছো,একক অদ্বিতীয় সত্ত্বা আল্লাহ তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট ও খুশি হয়েছেন। তোমাদের পূর্বপুরুষদের বাতিল ধর্মগুলো ছেড়ে দাও এবং কক্ষণো তাদেরকে ভালো মানুষ হিসেবে মনে করো না। তাদের ওপর দরুদ বা রহমত প্রেরণ করা কঠোরভাবে পরিহার করবে কেননা তাদের সবাই শেরেকি নীতির মধ্যেই মারা গেছে।”

সাউদ তার সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে বহু গণহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। সে সময়ে তার এবং তার অনুসৃত ওহাবি ফের্কার ভয়াবহ সহিংসতা আরবের বাদশা এবং জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে মৃত্যুর ভয়ে হজ্ব এবং যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করতেও সাহস করতো না। মক্কার শাসক নিজের জীবনের ভয়ে সাউদের ইচ্ছায় আদেশ দিতে বাধ্য হয়েছিল মক্কা ও মদিনায় ইমামদের যতো মাযার আছে এবং এ ছাড়াও আরো যতো পবিত্র স্থাপনা আছে,সকল স্থাপনা ভেঙ্গে গুড়িয়েঁ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে। ওহাবি মাযহাবকে হেজাজে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং ওহাবিরা চাওয়া অনুযায়ী আযান থেকে ইসলামের মহান নবী (সা) এর ওপর দরুদ পাঠানো সংক্রান্ত অংশটিও বাদ দেওয়া হয়েছিল। হেজাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ববর্গ এবং আরবের আমির ওমরাগণ ওহাবিদের এই বলদর্পী, বিচ্যুত আকিদা বিশ্বাসপূর্ণ ফের্কাকে আর সহ্য করতে না পেরে সর্বোচ্চ মহলে অর্থাৎ ওসমানী বাদশার কাছে প্রচুর চিঠি লেখেন এবং ওহাবিদের ক্রমবর্ধমান শক্তির ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে তাকেঁ অবহিত করেন। তাঁরা আরো গুরুত্বের সাথে বলেন যে ওহাবি ফের্কা কেবল সৌদি আরবের মধ্যেই সীমিত থাকবে না,তারা সমগ্র ওসমানী সাম্রাজ্যজুড়ে সকল মুসলমানের ওপর ওহাবি মতবাদের প্রসার ঘটাতে চায়।

ওসমানী সাম্রাজ্য সে সময় হেজাজ, ইয়েমেন, মিশর, ফিলিস্তিন, সিরিয়া এবং ইরাকের মতো মুসলিম ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত ছিল। ওসমানী বাদশা তাই মিশরের গভর্নরকে আদেশ দিয়েছিলেন ওহাবিদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে। ঠিক সে সময় সাউদের বয়স ছিল ছেষট্টি বছর এবং অন্ত্রের ক্যান্সারে সে তখন মারা যায়। সাউদের মৃত্যুর পর তার ছেলে আব্দুল্লাহ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। যাই হোক, মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলি পাশা ওসমানী সরকারের পক্ষ থেকে ওহাবিদের বিরুদ্ধে বেশ কটি সশস্ত্র যুদ্ধ করে ওহাবিদেরকে পরাজিত করে মক্কা, মদিনা এবং তায়েফকে মুক্ত করতে সমর্থ হয়। এই যুদ্ধে মিশরের গভর্নর ওহাবিদের বেশ কজন কমান্ডারকে আটক করে ওসমানী সাম্রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী ইস্তাম্বুলে পাঠিয়ে দেয়। এই বিজয়কে ঘিরে মিশরে বেশ আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়। কিন্তু ওহাবিদের কাজ তখনো শেষ হয়ে যায় নি। মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলি পাশা সেজন্যে জলপথে আরেকটি বাহিনী হেজাজের উদ্দেশ্যে পাঠায়। পাশা তখন মক্কা শহরকে তাদের ঘাটিঁ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার আমির এবং তার ছেলেকে নির্বাসনে পাঠায়,আর তার মালামাল বাজেয়াপ্ত করে। এরপর মিশরে ফিরে গিয়ে তাদের কওমের ইব্রাহিম পাশা নামের একজনের নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে নজদের দিকে পাঠায়।

ইব্রাহিম পাশা নজদের দিরইয়া শহরটিকে অবরুদ্ধ করে। দিরইয়া ছিল ওহাবিদের তৎকালীন মূল কেন্দ্র। ওহাবিদের প্রতিরক্ষা বাহিনী ইব্রাহিম পাশার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু ইব্রাহিম পাশার বাহিনী ছিল কামানের মতো আরো অনেক ভারি অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত। ফলে ওহাবিরা সুবিধা করতে পারে নি এবং ইব্রাহিম পাশার কাছে পরাজিত হয়। ওহাবিদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইব্রাহিম পাশা দিরইয়া শহর জয় করে এবং আব্দুল…ইবনে সাউদকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর আব্দুল…ইবনে সাউদসহ তার আরো বহু নিকটজনকে ওসমানী বাদশার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওসমানী সম্রাট আব্দুল… এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদেরকে বাজারঘাট শহর নগর প্রদক্ষিণ করানোর পর ফাসিতেঁ ঝুলিয়ে হত্যা করে। আব্দুল…ইবনে সাউদের মৃত্যুর পর আলসাউদের সমকালীন শাসকসহ তার সহযোগীরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে আনন্দ উৎসবের আয়োজন করে।

ইব্রাহিম পাশা ৯ মাসের মতো দিরইয়া শহরে অবস্থান করেন এবং তারপর শহরটিকে সকল অধিবাসীশূন্য করার নির্দেশ দেন। অবশেষে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেন দিরইয়া শহরটি। ইব্রাহিম পাশা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব এবং আলে সাউদের বহু বংশ ও উত্তর প্রজন্মকেও নির্মূল করেন অথবা নির্বাসনে পাঠান যাতে ভয়াবহ বিপজ্জনক ঐ ফের্কাটির নামও আর অবশিষ্ট না থাকে। এই বিজয়ের পর ওসমানী সম্রাট নজদ এবং হেজাজ ভূখণ্ডের শাসনের ভার মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলী পাশার ওপর অর্পন করেন। এভাবেই ১২১৩ হিজরিতে অর্থাৎ ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ওহাবি মতবাদের বিলুপ্তি ঘটে। এরপর অন্তত এক শতাব্দি সময়কাল পর্যন্ত ওহাবি মতবাদের নামটিরও আর কোনো অস্তিত্ব ছিল না কিংবা বলা ভালো এই ফের্কাটি নিয়ে আর কেউ কখনো কোনোরকম চিন্তাভাবনা করেনি।

মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলী পাশা ইব্রাহিম পাশার নেতৃত্বে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত বিশাল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে নজদ ভূখণ্ডে যেরকম সফল অভিযান চালিয়েছিল, সৌদিআরব ভূখণ্ডে সেই অভিযানের প্রতিক্রিয়া ছিল সুস্পষ্ট এবং চোখে পড়ার মতো। নজদ বিজয়ের পর আব্দুল আযিয এবং তার ছেলে সাউদের বিশাল বিস্তৃত দেশটি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বহু সংখ্যক ওহাবি প্রাণ হারায়। ওহাবি ফের্কার দাওয়াত দেওয়ার ধারা এবং বিচ্যুত এই আকিদা-বিশ্বাস জনগণের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার ধারা বন্ধ হয়ে যায়। আপামর জনগণ ওহাবিপন্থীদের ভয়ে যেভাবে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল সেই ভয় মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে কেটে যায়।

প্রকৃতপক্ষে আলসাউদ তেষট্টি বছরে ব্যাপক স্থবির হয়ে পড়ে। আব্দুল আযিয বিন আব্দুর রহমানের আগমন পর্যন্ত এই স্থবিরতার ধারা অব্যাহত থাকে। আব্দুল আযিযের আগমনে সাউদ বংশের শক্তি যেমন ফিরে আসে তেমনি বিচ্যুত ঐ ওহাবি মতবাদের চর্চাও পুনরায় বৃদ্ধি পায়। আব্দুল আযিয বিন আব্দুর রহমান ‘ইবনে সাউদ’ নামেই বেশি পরিচিত। ওহাবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার লক্ষ্যে ইবনে সাউদ ‘এখওয়ানুত তাওহিদ’ নামে একটি সংগঠন গঠন করে। এই সংগঠনভুক্তদের আবাসনের জন্যে ব্যাপক তৎপরতাও চালায়। আসলে ‘এখওয়ানুত তাওহিদ’ ছিল ওহাবিদের সামরিক ও ধর্মীয় শাখা যার দায়িত্ব ছিল সমগ্র আরব ভূখণ্ডে এই মতবাদের বিস্তার ঘটানো।ইতিহাসে এসেছে আব্দুল আযিয বৃটিশদের সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাসীন হয়েছে। অবশ্য গেল কয়েক শতাব্দির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিভিন্ন ঘটনায় আধিপত্যবাদীদের পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যাবে। উপনিবেশবাদীরা ক্ষমতালিপ্সু অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগিয়েই তাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করেছে এবং বলাবাহুল্য ক্ষমতালিপ্সুরাই উপনিবেশবাদীদেরকে নিজেদের দেশে ঢোকার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। আব্দুল আযিয বিন সাউদও তাদের একজন।

ব্রিটিশদের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে ক্ষমতায় গিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর জয়ী হবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ঐ সময়টা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাল। ব্রিটিশরা তখন চেয়েছিল ওসমানী সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করার মাধ্যমে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে তা দখল করে নিতে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ব্রিটিশ সরকার নজদে তাদের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন দুটি বংশের সাথে মৈত্রী গড়ে তোলে। এই দুই খান্দানের একটি হলো হাশেমি; মক্কা এবং মদিনার ওপর যাদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। অপর বংশটি হলো আলেসাউদ যারা রিয়াদ এবং নজদের ওপর শাসন করছিল। ব্রিটিশরা আরবের আরব গোত্রগুলোকে খুশি করার জন্যে এবং ওসমানী সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার ক্ষেত্রে তাদেরকে ব্যবহার করার জন্যে এই দুই খান্দানকে-যারা পরস্পরের বিরোধী ছিল-টার্গেট করে। ব্রিটিশরা উভয় খান্দানের কাছে দুত পাঠায়। ‘টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স’-যিনি আরবের লরেন্স নামেই বেশি পরিচিত-তাকে পাঠানো হয় শরিফ হোসাইনের শিবিরে। আর ‘হ্যারি সেন্ট জন ব্রিজার ফিলবি’-যে কিনা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং নিজেকে আব্দুল্…নাম ধারণ করেছিল-তাকে পাঠানো হলো আলেসাউদের কাছে।

লরেন্স শরিফ হোসাইনকে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সুসংবাদ দেয় যে, ওসমানীদের পরাজয়ের পর বৃহত্তম আরবের শাসনভার তার ওপর অর্পন করা হবে। ব্রিটিশ এই একই প্রতিশ্রুতি আব্দুল আযিয সাউদিকেও দেয়। তারা নজদ, এহসা, কাসিম এবং জুবাইলের ওপর আব্দুল আযিযের শাসনকেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল আযিয এবং বৃটেনের মধ্যে সংঘটিত চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশরা আলেসাউদকে বার্ষিক ষাট হাজার লিরা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বাইরের যে কোনো হামলায় আব্দুল আযিয ও তার সন্তানদেরকে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেয়। পক্ষান্তরে ইবনে সাউদও প্রতিশ্রুতি দেয় যে,সৌদি আরবের ব্রিটিশ সমর্থনপুষ্ট ভূখণ্ডের ওপর হামলা করা হবে না এবং ব্রিটিশদের শত্রুদেরকে কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর হাশেমি বংশীয় এবং মক্কার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হোসাইন ইবনে আলি নিজেকে আরবের বাদশা দাবি করে এবং আলেসাউদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু আব্দুল আযিয ব্রিটিশ সহযোগিতায় হোসাইন শরিফকে পরাস্ত করে। এর কবছর পর সাউদিরা তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়,কিন্তু বৃটেন নিজেদের স্বার্থচিন্তা করে আব্দুল আযিয সাউদিকে সমগ্র আরবের ওপর তার আধিপত্য বিস্তারকে সমীচীন মনে করে নি। ইতোমধ্যে ইবনে সাউদ হেজাজের ওপর তার আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশে তার সেনাদেরকে মক্কা মুকাররমার দিকে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেয়।

ওহাবি সেনারা ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় যাবার আগে হেজাযের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর তায়েফে গিয়ে পৌঁছে। তায়েফের আমির ওহাবি সেনাদের আগমনের কথা শুনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আগেভাগেই পালিয়ে যায়। এরপর তায়েফের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ওহাবিদের সাথে আলোচনায় বসে রক্তপাতহীনভাবেই তাদের হাতে তায়েফ শহর সমর্পন করে। কিন্তু ওহাবিরা তায়েফে প্রবেশ করার পর কথা রাখেনি। চুক্তি ভঙ্গ করে তারা নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরায়। এতোটা নির্দয় নিষ্ঠুরভাবে তারা হত্যাকাণ্ড চালায় যে তাদের হাত থেকে নারী-শিশু-পুরুষ কেউই রক্ষা পায় নি। অন্তত দুই হাজার মানুষকে তারা হত্যা করে যাদের মাঝে বহু আলেম ওলামাও ছিলেন। ওহাবিরা তায়েফ বাজার লুট করে বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। তায়েফে আব্দুল আযিযের সেনাদের এই নোংরামি আর নিষ্ঠুরতা ইতোপূর্বে এই তায়েফেই তাদের পূর্বসূরি ওহাবিদের বর্বর হামলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের হামলা থেকে শাফেয়িদের বিখ্যাত মুফতি শায়খ আব্দুল্ল.. যেভরিও রক্ষা পান নি। ওহাবিরা তাকেঁ মসজিদ থেকে টেনে বের করে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে।

কিছুদিন পর আব্দুল আযিয ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মক্কাও দখল করে। চুক্তি ভঙ্গ করে আব্দুল আযিয যে হেজাজে হামলা করলো বৃটেন প্রথমে তার বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল। কেননা মধ্যপ্রাচ্যে বৃটেনের প্রয়োজন ছিল তাদের সাথে সম্পৃক্ত কোনো শাসকের। অপরদিকে সৌদি আরবের তেল সম্ভারের দিকে তাদের নজর ছিল। সেজন্যেই বৃটেন হাশেমি বংশকে সরিয়ে দিয়ে ইবনে সাউদকে সমগ্র আরব্য উপদ্বীপ দখলে সাহায্য করেছিল। তারি পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ওহাবি আকিদার ভিত্তিতের সৌদি বাদশাহীর ভিত রচিত হয়। এরফলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঐ গোঁড়া ওহাবি ফের্কা তাদের আকিদা প্রচার-প্রসারের শক্তিশালী ঘাটিঁ পেয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই ওহাবি মতবাদ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোতে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে এবং আব্দুল আযিযও নিজেকে ওহাবি ফের্কার নেতা এবং হারামাইন শরিফাইনের খাদেম হিসেবে দাবী করে। সৌদিরা সেই শুরু থেকেই নিরীহ মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে,তাদের ধনসম্পদ লুট করে নিজেদের প্রয়োজনীয় আর্থিক বাজেট নিশ্চিত করতো,আর এখন তেল বিক্রি করে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাচ্ছে।

১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল আযিযের মৃত্যুর পর তার ওসিয়্যত অনুযায়ী তার সন্তানদের হাতে থাকবে হুকুমাতের দায়িত্ব। আব্দুল আযিযের রেখে যাওয়া ৩৯ জন পুত্রসন্তান তাই ওসিয়্যত অনুসারে বয়সানুক্রমিক ধারায় সৌদি আরবের হুকুমাতের মসনদে আসীন হয়েছে।

গত আসরে আমরা বলেছিলাম ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল আযিযের মৃত্যুর পর তার ওসিয়্যত অনুযায়ী তার সন্তানদের হাতে হুকুমাতের দায়িত্ব অর্পিত হয়। আব্দুল আযিযের রেখে যাওয়া ৩৯ জন পুত্রসন্তান সেই ওসিয়্যত অনুযায়ী বয়সানুক্রমিক ধারায় সৌদি আরবের হুকুমাতের মসনদে আসীন হয়। এর পরবর্তী ইতিহাসের দিকে আজ আমরা নজর দেওয়ার চেষ্টা করবো।

আব্দুল আযিযের সন্তানদের মধ্যে সর্বপ্রথম ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল তার নাম ছিল সাউদ। তার পরের বাদশা ছিল ফয়সাল বিন আব্দুল আযিয। কিন্তু ফয়সালের বাদশাহীর সময় সাউদি পরিবারে অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় এবং এক পর্যায়ে ফয়সাল বিন আব্দুল আযিযকে হত্যা করা হয়। ফয়সালের বাদশাহীর সময় অপর যে ঘটনাটি সংঘটিত হয় তা হলো ইবনে আব্দুল ওহাবের সন্তানেরা ইতোপূর্বে যে সৌদি আরবের ওহাবি মাযহাবের নেতৃত্ব দিতো সেই নেতৃত্ব বা ওহাবি মাযহাবের প্রধানের দায়িত্ব থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেয়। ইবনে আব্দুল ওহাবের সন্তানদেরকে ওহাবি মাযহাবের প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ফলে আলে-সাউদের কাছে ওহাবি মতবাদ একটি রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে পরিণত হয় এবং আলে সাউদ ও ইবনে আব্দুল ওহাব খান্দানের মধ্যকার প্রায় দুইশ’ বছরের সহযোগিতামূলক সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে।

বাদশা ফয়সালের পর খালেদ বিন আব্দুল আযিয ক্ষমতার মসনদে আসীন হন। বাদশা খালেদের শাসনকালে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি ছিল ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়।মহান এই বিপ্লবের ঘটনা ওহাবিদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে। কারণটা হলো ইরানের বিপ্লব ছিল মার্কিন বিরোধী এবং স্বৈরাচারী শাসন বিরোধী প্রকৃত ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক একটি বিপ্লব। ওহাবি মতবাদসহ গোঁড়া এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন সকল আকিদা-বিশ্বাস ও মতবাদের বিরোধী এই বিপ্লব। বাদশা খালেদের মৃত্যুর পর ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে ফাহাদ বিন আব্দুল আযিয বাদশাহী মসনদে আসীন হন এবং তিনি নিজেকে খাদেমুল হারামাইন আশশারিফাইন ঘোষণা করেন। পবিত্র এবং মহান এই ইসলামী দায়িত্ব সম্পন্ন উপাধি ধারণ করে নেপথ্যে তিনি তার অন্যায় কাজকর্মগুলোর ব্যাখ্যা দিতেন। ইহুদিবাদী ইসরাইলের কাছে আরব এবং মুসলিম জনশক্তি ফিলিস্তিনীদেরকে নতজানু করে তাদের সাথে সমঝোতা করার প্ররোচনা দেন। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদেশে চার শ ইরানী হজ্বযাত্রীকে হত্যা করা হয়েছিল এই ফাহাদ বিন আব্দুল আযিযের সময়ে।

২০০৫ সালে ফাহাদের মৃত্যুর পর ফাহাদের সৎ ভাই মালেক আব্দুল.. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনিও লেবাননের প্রতিরোধ যুদ্ধে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে সহযোগিতা করেন এবং একইভাবে ইয়েমেন ও বাহরাইনের জনগণের ওপর দমন নিপীড়ন চালানোর ক্ষেত্রে সেইসব দেশের শাসকদেরকে সার্বিক সাহায্য ও সহযোগিতা করার কর্মসূচি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। সবোর্পরি ওহাবিরা সৌদি হুকুমাতের ছত্রচ্ছায়ায় এবং সৌদি আরবের তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অঢেল পয়সায় ভালো একটি সুযোগ লাভ করেছে তাদের ঐ ওহাবি মতবাদ প্রচার করার এবং তার প্রসার ঘটানোর। প্রচুর পয়সার অধিকারী হওয়ায় তারা আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঐ বাতিল আকিদা প্রচার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে তারা গরীব অসহায় মানুষের মাঝে বিপুল অর্থ বিলিয়ে, ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে ইত্যাদি বিচিত্র পদক্ষেপ নিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে নিজেদের ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাসকে সম্ভাব্য সকল পন্থায় মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে।

মানুষ যেহেতু ইন্দ্রিয় দিয়ে সৃষ্টিকূলকে অনুভব করে এবং মানুষের জন্যে যেহেতু স্থান এবং কালের বিষয়টি প্রযোজ্য সেজন্যে মানুষ চায় সবকিছুকেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হিসেবে বিবেচনা করতে। এইরকম বোধ ও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা এমনকি আল্লাহকেও পঞ্চেন্দ্রিয় নির্ভর মানুষের মতো চামড়া, গোশত, রক্ত, হাড্ডিসহ মানবীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পন্ন বলে মনে করে। আল্লাহকে এরকম দৈহিক অবয়ব সম্পন্ন বলে যারা ভাবে তাদেরকে অভিহিত করা হয় ‘মুশাব্বাহে’ বলে। মুশাব্বাহে ছাড়াও কিন্তু আরেকটি দল আছে যারা আল্লাহর ঠিক মানবীয় অবয়ব কাঠামো থাকার কথা না বললেও তাঁর একটা অবয়ব থাকার কথা অস্বীকার করে না। এর কারণ হলো এরা কেবল কোরআন এবং রাসূলের বর্ণনার বাহ্যিক দিকটাই দেখে কোনোরকম চিন্তা-গবেষণা করাকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের বিশ্বাস, কোরআন কেবল তেলাওয়াৎ করার জন্যেই নাযিল হয়েছে,গবেষণার জন্যে নয়। এই চিন্তাটা একেবারেই ভ্রান্ত কেননা স্বয়ং কোরআনেরই বহু আয়াতে মানুষকে চিন্তা-গবেষণা করার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

যেমন সূরা মুহাম্মাদের ২৪ নম্বর আয়াতে এসেছেঃ ‘তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’একইভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা সোয়াদের ২৯ নম্বর আয়াতে বলেছেনঃ ‘এটি একটি বরকতময় কিতাব,যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষেরা এর আয়াত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে এবং বুদ্ধিমানেরা তা অনুধাবন করেন’। সালাফিয়া ফের্কার প্রতিষ্ঠাতা ইবনে তাইমিয়া এমন এক ব্যক্তি যে কিনা আল্লাহর দৈহিক অবয়বের কথা বলেছেন কোরআনের আয়াতের বাহ্যিক অর্থের ওপর নির্ভর করে। হাত পায়ের মতো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ রয়েছে আল্লাহর-এ ধরনের বিশ্বাস তার বর্ণিত আকিদায় লক্ষ্য করা যায়। যদিও সেইসব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঠিক মানুষের মতো নয়, ভিন্নতর। এইসব কিংকর্তব্যবিমূঢ় কথাবার্তা বলার উদ্দেশ্য আসলে শ্রোতাদের চিন্তাশক্তি নষ্ট করে দেওয়ার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ইবনে তাইমিয়া বলেছেনঃ আল্লাহর হাত আছে কিন্তু হাত বলতে আমরা যেই অঙ্গ বা প্রত্যঙ্গকে চিনি সেইরকম হাত নয়,বরং আল্লাহর উপযোগী হাত। অতএব বলা উচিত এই অঙ্গের নাম হাত নয় কেননা হাত বলতে আমরা এমন একটি অঙ্গকে বুঝি যাকে সবাই একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও বাহ্যিক গঠন সহকারে চেনে। দৈহিক অবয়বের সাথে আল্লাহর তুলনা ইবনে তাইমিয়ার ‘আরশুর রাহমান অমা ওরাদা ফিহে…..’ বইতেও লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ সূরা যুমারের ৬৭ নম্বর আয়াতে এসেছেঃ ‘কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে…….’।

এখানে মুঠো শব্দটির অর্থ হচ্ছে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা; যেমন আমরা কথাপ্রসঙ্গে প্রায়ই বলে থাকিঃ ওটাতো আমার হাতে,অর্থাৎ ঐ ব্যাপারটা পুরোপুরি আমার নিয়ন্ত্রণে। কোরআনের উল্লেখিত আয়াতে বর্ণিত হাতের মুঠোও তেমনি একটি রূপকমাত্র যার অর্থ হচ্ছে মৃত্যুপরবর্তী বিশ্বের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার থাকবে আল্লাহর।#

সূরা যুমারের ৬৭ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা বলেছিলাম এখানে ‘মুঠো’ বলতে সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণের কথা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া তার বইতে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করে বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন যমিন আল্লাহর হাতে ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে এবং তিনি তা ছুঁড়ে মারবেন যেভাবে বাচ্চারা বল ছুঁড়ে মারে। কোরআনের এরকম ভুল ব্যাখ্যা সালাফিদের বক্তব্যে প্রচুর দেখা যায়। তারা আল্লাহর দৈহিক গঠনের কথা বলে আল্লাহর উচ্চ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে নিয়ে খেলেছে ছিনিমিনি খেলা। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে ইবনে তাইমিয়া মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব এবং এই মতবাদের অন্যান্য অনুসারীদের দৃষ্টিশক্তি একেবারেই অগভীর,তারা কেবল শব্দের বাহ্যিক বা আক্ষরিক দিকটার দিকেই তাকিয়েছে, শব্দের ভাবার্থ এবং প্রতীমানার্থ নিয়ে না ভাববার কারণে একত্ববাদের সূক্ষ্ম প্রাণ বা আত্মা থেকে রয়ে গেছে অনেক দূরে। এদের লেখালেখি আর কথাবার্তাতেও এই গোঁড়ামি আর অগভীর বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।

রাসূলে খোদা (সা) এবং তাঁর নেককার সাহাবি ও তাবেয়িনগণ তৌহিদের যে মর্মাথের কথা বলে গেছেন, ওহাবিরা তা থেকে মুক্ত। কেননা তৌহিদ এমন একটি সত্য, এমন এক বাস্তবতা যা কেবল যথাযথ তথ্যপ্রমাণ আর মেধা শক্তির মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। তৌহিদ এমন একটি বিষয় যা অন্তরে ঈমান এবং বিশ্বাসের গভীরতা সৃষ্টি করে এবং জীবনটাকে আল্লাহর ওপর ঈমান কেন্দ্রিক করে তোলে। মজার ব্যাপার হলো ওহাবিরা কোনো কোনো আয়াতের বাহ্যিক অর্থকে ধারণ করে নিজেদেরকে তৌহিদের যথার্থ রক্ষক এবং কোরআনের আয়াতের যথাযথ বাস্তবায়নকারী বলে মনে করে আর তাদের বাইরের সবাইকে কাফের বলে মনে করে। ইবনে তাইমিয়া তার বিরোধীদের জবাবে বলেছেন আল্লাহর কিতাব,রাসূলে আকরাম (সা)’র সুন্নাত এবং তাঁর সাহাবি ও তাবেয়িনদের বক্তব্যে যদিও আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বার কথা দেখা যায় না কিন্তু এ ব্যাপারটিকে তো অস্বীকারও করা হয় নি। তাই আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বা রয়েছে বলে মনে করা যায়।

ইবনে তাইমিয়া আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বা সংক্রান্ত তার বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় বলেন, আল্লাহ আকাশ সমূহের উপরে বসে রয়েছেন। তিনি হাসেঁন, পথ চলেন, দৌড়েন ইত্যাদি। তিনি তার “আকিদাতুল হামাভিয়া’ নামক পুস্তিকায় লিখেছেনঃ আল্লাহ তায়ালা হাঁসেন। কিয়ামতের দিন তিনি হাঁসিমুখে বান্দাদের সামনে প্রকাশিত হবেন।” অথচ কোরআনে কারিম সূরা আনআমের ১০৩ নম্বর আয়াতে সবার উদ্দেশ্যে বলেছে যে, আল্লাহ এমন এক সত্ত্বা,পৃথিবীর কারো পক্ষেই তাঁকে দেখা সম্ভব নয়। বলা হয়েছেঃ “দৃষ্টিসমূহ তাঁকে দেখতে পায় না, অবশ্য তিনি সকল দৃষ্টি বা চোখগুলোকে দেখেন; তিনি অত্যন্ত দয়ালু, সূক্ষ্মদর্শী ও সুবিজ্ঞ।” ইমাম আলী (আ) আল্লাহ সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ “আল্লাহ মানে হলো এমন একজন মাবুদ যাঁর সম্পর্কে সৃষ্টিকূল দিশেহারা,কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং সৃষ্টিকূল তাঁকে ভালোবাসে। আল্লাহ তো তিনিই, যাঁকে চোখ দিয়ে অনুভব করা যায় না এবং যিনি মানুষের চিন্তা, বুদ্ধি-বিবেচনার অনেক উর্ধ্বে।”

কোরআনের একটি প্রাণবন্ত আয়াতে আল্লাহর ‘দৈহিকতা’কে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এ বিষয়ে ‘সূরা এখলাস’ অবতীর্ণ হয়েছিল বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। বিশিষ্ট দার্শনিক নিশাবুরি হিজরি চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দির একজন বিখ্যাত হাদিস শাস্ত্রবিদও ছিলেন। তাঁকে ‘ইমামুল মুহাদ্দেসিন’ এবং ‘মুহাদ্দেস আলখোরাসান’ নামে অভিহিত করা হতো। নিশাবুরি রাসূলে আকরাম (সা) এর বিশিষ্ট সাহাবি আবি ইবনে কাব থেকে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটি হলোঃ মুশরিকরা একদিন রাসূলে খোদার কাছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। ঠিক সে সময় মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা) এর ওপর সূরায়ে এখলাস নাযিল করেন। যেখানে বলা হয়েছেঃ ‘হে পয়গাম্বর! মুশরিকদের বলুন! তিনি আল্লাহ,এক এবং অমুখাপেক্ষী, তাঁর কোনো সন্তানাদি নেই এবং তিনিও কোনো বাবা-মায়ের সন্তান নন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অদ্বিতীয়,তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।’ বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব জাহাবিও এই বর্ণনার সত্যতা অনুমোদন করেছেন। আসলে কোরআন এইসব আয়াতের মাধ্যমে মুশরিকদের এই জবাবই দিচ্ছে যে, আল্লাহর দৈহিক কোনো অস্তিত্ব নেই যে তাঁর বংশ বা সন্তানাদি থাকবে। তারপরও দুঃখজনকভাবে ইবনে তাইমিয়ার মতেো লোকেরা আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বার অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যস্ত।

আরো একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন বায়হাকি। তিনিও আল্লাহর দৈহিক অস্তিত্বের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল্লাহর দৈহিকতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সপক্ষে তিনি হাম্বলি মাযহাবের ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ ‘ অভিধান বিশারদগণ ‘দেহ’ শব্দটির ব্যাখ্যায় বলেছেন এটি এমন এক বস্তু যার দৈর্ঘ আছে, প্রস্থ আছে, উচ্চতা আছে, গঠন এবং আকৃতি আছে। আর আল্লাহ তায়ালা এই সকল অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য থেকে পবিত্র। তাই তাঁর দৈহিক অস্তিত্বের কথা বলা একেবারেই অনুচিত কেননা ‘দেহের’ যতো প্রকার আভিধানিক কিংবা পারিভাষিক অর্থ হয় সর্বপ্রকার অর্থ থেকে আল্লাহ পাক মুক্ত। শরীয়তেও এই শব্দটির প্রয়োগ নেই। অতএব, আল্লাহর দৈহিকতা সংক্রান্ত বিশ্বাস একান্তই ভ্রান্ত।’

মজার ব্যাপারটি হলো, ইবনে তাইমিয়া নিজেকে হাম্বলি মাযহাবের একজন অনুসারী বলে দাবী করে। আর হাম্বলি মাযহাবটির প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান হলেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল। স্বয়ং আহমাদ ইবনে হাম্বল যেখানে আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বা সংক্রান্ত বিশ্বাসকে বাতিল বলে মনে করেন সেখানে ইবনে তাইমিয়া কীভাবে আল্লাহর দৈহিক গঠন কাঠামো রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন! এভাবেই তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার এই বিচ্যুত ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ওহাবি চিন্তা বা মতবাদের মূল ভিত্তি রচনা করেছে। পরবর্তী আসরে আল্লাহর দৈহিকতা সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার অপর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আজকের আসরের সময় শেষ হয়ে আসায় আজ আর এ সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ নেই।

ইবনে তাইমিয়া এবং তার ছাত্র ইবনে কাইয়্যেম তাদের বইতে লিখেছেনঃ ‘পৃথিবীর সৃষ্টিকূল সৃষ্টির আগে আল্লাহ ঘন মেঘের মাঝখানে ছিলেন, না তার নীচে বাতাস ছিলো, না তার উপরে, সমগ্র বিশ্বে তখন কোনো বস্তুর অস্তিত্ব ছিল না আর আল্লাহর আরশ ছিল পানির ওপরে।’ এই বক্তব্যে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। এই যে বলা হলো কোনো কিছু সৃষ্টির আগে আল্লাহর ঘন মেঘের মাঝে ছিলেন। অথচ মেঘ আল্লাহরই সৃষ্টি। তাই কী করে এটা বিশ্বাস করা যায় যে বিশ্বে স্রষ্টার অস্তিত্বের আগে সৃষ্টি অর্থাৎ মেঘের অস্তিত্ব থাকতে পারে! কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী পৃথিবীর সকল সৃষ্টির ওপর আল্লাহ ক্ষমতাবান,আল্লাহর ওপর কোনো সৃষ্টির কর্তৃত্ব থাকতেই পারে না। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে ইবনে তাইমিয়াদের বক্তব্য পুরোপুরি বিরোধপূর্ণ।

ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসীদের আরো একটি বদ্ধমূল ধারণা হলো আল্লাহর অবস্থানের একটা সুনির্দিষ্ট স্থান আছে। যেহেতু তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ দেহসর্বস্ব এবং ব্যবহার বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং তিনি আকাশের আরো উর্ধ্বে অবস্থান করেন। ইবনে তাইমিয়া তার মিনহাজুস সুন্নাহ নামক বইতে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবেঃ ‘হাওয়া জমিনের উপরে। মেঘ হাওয়ার উপরে। আকাশসমূহ যমিন এবং মেঘের উপরে, আরশ আকাশ সমূহের উপরে আর আল্লাহ এই সবকিছুর উপরে রয়েছেন।’এ ধরনের বক্তব্য কি কোরআনের বর্ণনার পরিপন্থী নয়? যেখানে সূরা বাকারার ১১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। অতএব,তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও, সেদিকেই আল্লাহ বিরাজমান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ।’ একইভাবে সূরা হাদিদের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাকো।’

আরো কয়েকটি আয়াত লক্ষ্য করা যাক। সূরা সিজদাহর চার নম্বর আয়াতে এসেছেঃ………’অতঃপর আরশের ওপর (শক্তি) আসীন হয়েছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের জন্যে কোনো অভিভাবক বা সুপারিশকারী নেই।’ সূরা হাদিদের চার নম্বর আয়াতে এসেছেঃ …অতপর তিনি আরশের ওপর (ক্ষমতার মসনদে) সমাসীন হয়েছে। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে আর যা ভূমি থেকে নির্গত হয়,যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় এবং যা আকাশে উত্থিত হয়।’ সূরা ত্বাহা’র পাঁচ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন’। ওহাবিরা এই আয়াতগুলোর বাহ্যিক বা শাব্দিক দিক বিবেচনা করে আল্লাহর আরশের একটা চিত্র বা কাঠামো তৈরি করেছে যা হাস্যকরও বটে।

তারা ভেবেছে আল্লাহর ওজন বেশি এবং আরশের ওপর বসেছেন। ইবনে তাইমিয়ার মতে আরশের প্রত্যেক দিকে নিজের চার আঙ্গুল পরিমাণ বড়ো আল্লাহ। আরশ হচ্ছে অনেকটা গম্বুজের মতো,আর আল্লাহর আরশ ঐ গম্বুজের ওপরে স্থাপিত। ঐ গম্বুজ আকাশসমূহের ওপরে স্থাপিত। ঐ আরশ আল্লাহর ভারে শব্দ করে,যেমন শব্দ হয় উটের পিঠে অতিরিক্ত মালামাল বহন করলে।’ ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র এবং মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাবের নাতি ইবনে কাইয়্যেম জোওযি তার বইতে লিখেছেনঃ “আল্লাহর আরশ দুই আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্বের পরিমাণ ঘনত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত এবং তা অবস্থান করছে আটটি দুম্বার পিঠে,যেসব দুম্বার পায়ের নখ থেকে হাঁটুর দূরত্বও দুই আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। এই দুম্বাগুলো এমন এক সমুদ্রের ওপর অবস্থান করছে যার গভীরতা দুই আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। আর ঐ সমুদ্রটি অবস্থিত সপ্তম আকাশের ওপর।” এইসব অযৌক্তিক বর্ণনা কোরআন, হাদিস, সাহাবিবর্গ-কেউই দেন তো নন ই,উল্টো বরং বলেছেন আল্লাহ এক অবর্ণনীয় সত্ত্বা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে অমুখাপেক্ষী এবং বেনিয়ায অর্থাৎ কোনো কিছুই তাঁর প্রয়োজন নেই, এ বিষয়টি কোরআনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা বাকারার ২৬৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ তায়ালা অমুখাপেক্ষী এবং সহিষ্ণু। এই সূরারই ২৬৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ তায়ালা অভাবমুক্ত এবং প্রশংসা পাবার উপযুক্ত।” কোরআন যুক্তি-প্রমাণ আর চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী। কোরআনের যে-কোনো বক্তব্যকেও তাই যুক্তি প্রমাণ আর চিন্তা ভাবনা করেই প্রত্যয়ন করতে হয়। মানব সমাজের প্রতিও কোরআনেও আহ্বান সেরকমই। তাই আল্লাহর আরশ সম্পর্কে যেসব বক্তব্য এসেছে সেগুলোর যৌক্তিকতার প্রমাণ দেখানো উচিত।

একটা সাধারণ বিবেক দিয়েও চিন্তা করা যায় যে আটটি দুম্বার পিঠে উপবিষ্ট রয়েছেন আল্লাহ-এটা কী করে বিশ্বাস করা যায়? কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন,কারো প্রতি নির্ভরশীল নন। তাহলে আটটি দুম্বার কাছে তিনি নির্ভরশীল হয়ে যান না! কারণ তাদের পিঠেই তো আল্লাহ বসে আছেন। আটটি দুম্বার পিঠে যদি আল্লাহর আরশ থাকে তাহলে আল্লাহর অস্তিত্বের সূচনা থেকে যতোদিন আল্লাহ থাকবেন ততোদিন এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে হবে। অথচ কোরআন সূরা হাদিদের চার নম্বর আয়াতে বলছে,”আল্লাহই সর্বপ্রথম এবং আল্লাহই সর্বশেষ সত্ত্বা।” আটটি দুম্বার ব্যাপারে কোনো কিছু বলা হয় নি।নবী কারিম (সা)ও স্রষ্টার পরিচয় প্রসঙ্গে বলেছেনঃ “হে খোদা! তুমি সবার আগে ছিলে, তোমার আগে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না এবং তুমিই সবার শেষে থাকবে, তোমার পরে কোনো কিছু থাকবে না।”

“আরশে আল্লাহর অবস্থান” আসলে একটা রূপক বৈ ত নয়। এর অর্থ হলো সমগ্র বিশ্বের ওপর আল্লাহর কর্তৃত্বশীল, বিশ্বের সকল বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আল্লাহরই হাতে ন্যস্ত। যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান।’ অথচ সালাফিরা আল্লাহর আরশকে পায়াধারী বলে বর্ণনা করে বলেছে ঐ পায়াগুলোর মধ্য থেকে যদি একটি না থাকে তাহলে আল্লাহর আরশ ধসে পড়বে এবং আল্লাহও যমিনে পড়ে যাবেন। (নাউযুবিল্লাহ)। আমিরুল মুমেনিন হযরত আলী (আ)-যাঁকে রাসুলে খোদা ‘জ্ঞানের দরোজা’ বলে অভিহিত করেছেন-কালামুল্লাহ শরিফে আরশের অর্থ সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তায়ালা আরশকে ক্ষমতা প্রদর্শনের নিমিত্তে তৈরি করেছেন,তাঁর নিজস্ব স্থানের জন্যে নয়।”

আরোহন অবরোহন, আকাশে সঞ্চরণ এবং বিভিন্ন ধরনের কুরসিতে উপবেশন ইত্যাদি কাজ আল্লাহ করেন বলে একক এবং অদ্বিতীয় সত্ত্বা আল্লাহ সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার চিন্তা। ‘মিনহাজুস সুন্নাহ’ নামক গ্রন্থে ইবনে তাইমিয়া লিখেছেনঃ “আল্লাহ পাক প্রতি রাতে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং আরাফার রাত্রিতে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আসেন যাতে খুব নিকট থেকে তাঁর বান্দাদের দোয়া কবুল করতে পারেন। পৃথিবীর আকাশে এসে আল্লাহ তায়ালা আহ্বান জানানঃ আমাকে ডাকার মতো স্মরণ করার মতো কেউ কি আছো যার দোয়া আমি কবুল করবো!”

সালাফিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী আকাশের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর অনেক কুরসি রয়েছে। ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইবনে কাইয়্যেম জুযি ‘মাজমুউল ফাতাভি’ নামক বইতে তার শিক্ষকের বরাত দিয়ে লিখেছেনঃ
“আল্লাহর জন্যে প্রত্যেক আকাশে একটি করে কুরসি রয়েছে। যখন পৃথিবীর আকাশে অবতীর্ণ হন তখন এই আকাশের জন্যে নির্দিষ্ট কুরসিতে বসেন এবং বলেনঃ ‘কোনো তওবাকারী কি আছে যাকে মাফ করে দেবো…’ সকাল পর্যন্ত সেই কুরসিতে থাকেন এবং সকাল হয়ে গেলে পৃথিবীর আকাশের কুরসি ত্যাগ করে উর্ধ্বাকাশে চলে যান এবং অন্য কুরসিতে বসেন।’

মরক্কোর বিশিষ্ট ভূপর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে এ সম্পর্কে সালাফিয়াদের নেতার একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করে লিখেছেনঃ দামেশকের জামে মসজিদে ইবনে তাইমিয়ার সাথে দেখা। ইবনে তাইমিয়া জনগণকে ওয়াজ নসিহত করে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলছিলেনঃ
“আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন যেমনিভাবে আমি এখন অবতরণ করছি”। এই বলে তিনি মিম্বার থেকে একটি সিড়িঁ নিচে নামলেন। ঐ মজলিসে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ফিকাহশাস্ত্রবিদ মালেকির ছেলে ইবনে যাহরা। তিনি ইবনে তাইমিয়ার ঐ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। কিন্তু মিম্বারের পায়া ঘেঁষে যারা বসে ছিল সেইসব সহজ সরল লোকজন ইবনে তাইমিয়ার কথা বিশ্বাস করলো এবং উঠে দাঁড়িয়ে ইবনে যাহরাকে ভর্ৎসনা করলো। ইবনে যাহরা হাম্বলি মাযহাবের অনুসারী কাজির দরবারে গিয়েও নাজেহাল হলো। কিন্তু হাম্বলি কাজির এই ঘটনায় দামেশকের মালেকি এবং শাফেয়ি কাজিদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত শাসককে অবহিত করা হয় এবং তিনি ইবনে তাইমিয়াকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।”

ইবনে তাইমিয়া আসলে আল্লাহকে সঞ্চরণশীল বলে বিশ্বপ্রতিপালককে বস্তজাগতিক সৃষ্টির মতোই নির্ভরশীল করে তুলেছেন। সেজন্যেই বান্দাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্যে আল্লাহর আরোহন অবরোহনের প্রয়োজন পড়ে। এইসব বৈশিষ্ট্য আসলে বস্তুজগতের সাথেই সংশ্লিষ্ট। বান্দাদের আবেদন বা কথাবার্তা শোনার জন্যে কিংবা তাদের দরখাস্ত কবুল করার জন্যে আল্লাহর সঞ্চালন কিংবা কুরসিতে বসবার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সূরায়ে ক্বাফ-এর ১৬ নম্বর আয়াতে এসেছেঃ আল্লাহ মানুষের গলার রগের চেয়ে নিকটে। একইভাবে সূরা বাকারার ১১৫ নম্বর আয়াতের অংশবিশেষে বলা হয়েছে “… এবং যেদিকেই তাকাওনা কেন আল্লাহ সেখানেই রয়েছেন..” আয়াতগুলোর বক্তব্য থেকে অনুমিত হয় যে, আল্লাহ সবখানেই রয়েছেন এবং শোনার জন্যে কিংবা অপরাপর কাজের জন্যে আল্লাহকে এখান থেকে সেখানে চলাফেরা করতে হয় না। মহাজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্ষমতাই সর্বময় তাঁর উপস্থিতির উৎস যে ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বহুবার বলা হয়েছে।

সূরা বাকারার ২৮৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “…সকল বস্তুর ওপর আল্লাহ ক্ষমতাবান।” আসলে জ্ঞান ও ক্ষমতা হলো আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম গুণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর গুণাবলিকে ‘কাদের, আলেম, কাদির এবং আলিম’ ইত্যাদি শব্দযোগে বর্ণনা করা হয়েছে। এখন তাই ইবনে তাইমিয়াকে প্রশ্ন করা উচিত নীতিগতভাবে বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ কি বস্তুজাগতিক সৃষ্টিকূলের মতো বান্দাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন নাকি এই যোগাযোগ বা সম্পর্কটা নীরবে মানুষের অন্তরাত্মার মাধ্যমে সংঘটিত হয়? ইবনে তাইমিয়ার চিন্তা অনুযায়ী আল্লাহ চেয়ারে বসেন এবং তাঁর সিংহাসনও রয়েছে। এমনকি আল্লাহর সিংহাসনের পাশে রাসূলে খোদার (সা) জন্যেও একটি আসন রয়েছে। অথচ নবীজী তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান সত্ত্বেও নিজেকে আল্লাহর একজন বান্দা হিসেবে গর্ববোধ করেন। পবিত্র কোরআনের সূরা কাহাফের ১১০ নম্বর আয়াতে নবীজীকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছেঃ “বলুন! আমিও তোমাদের মতোই একজন মানুষমাত্র। (আমার বিশেষত্ব হলো) আমার কাছে ওহি নাযিল হয় যে তোমাদের মাবুদই একমাত্র মাবুদ….”।ইবনে তাইমিয়া এবং তার ছাত্র ইবনে কাইয়্যেম জুযি আরেক কদম উর্ধ্বে গিয়ে আল্লাহকে বাদশাদের সাথে তুলনা দিয়ে লিখেছেনঃ

“আল্লাহ তায়ালা পরকালীন জুমার দিনে আরশ থেকে নীচে নেমে আসেন এবং কুরসিতে বসেন। নুরের তৈরি মিম্বারগুলোর মাঝে তাঁর কুরসি স্থাপিত। নবীগণ ঐ মিম্বারগুলোতে বসেন। সোনালী ঐ কুরসিগুলো এইসব মিম্বারকে ঘিরে রয়েছে। সেখানে শহীদগণ, সিদ্দিকগণ বসেন…আল্লাহ তায়ালা জলসায় উপস্থিত সদস্যদের সাথে আলাপ আলোচনা শেষে কুরসি থেকে উঠে গিয়ে বৈঠক ত্যাগ করেন এবং নিজের আরশের দিকে চলে যান।”

মজার ব্যাপার হলো সালাফিয়ারা যে এইসব অলীক কল্পকাহিনী বর্ণনা করছে এগুলোর পেছনে কোরআন বা হাদিসের কোনো প্রামাণ্য সূত্র নেই। কেবলমাত্র কল্পনার ওপর নির্ভর করেই তারা এসব চিত্র এঁকেছে। না কোরআনে এসবের পক্ষে কোনো প্রমাণপঞ্জী আছে, না সুন্নিদের নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ সিহহা সিত্তায় কিছু আছে। বলা যায় অবাস্তব এইসব কল্পকাহিনী কেবল ইবনে তাইমিয়া এবং তার কিছু অনুসারীর মনগড়া ব্যাপার। তারা আল্লাহকে দৈহিকরূপ দিয়ে এবং আল্লাহর সাদৃশ্য তৈরি করে মূলত তাঁর ঐশী অবস্থান ও মর্যাদারই অবমাননা করেছে। আহলে সুন্নাতের একজন বিশিষ্ট আলেম ইবনে জুহবুল বলেছেনঃ
“ইবনে তাইমিয়া আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ও তাঁর সাহাবাগণ বলেছেন বলে যেসব কথা উদ্ধৃত করেছেন, প্রকৃতপক্ষে সেগুলোর কোনোটাই তাদেঁর কেউ বলেন নি।”

সালাফিয়া আকিদায় বিশ্বাসীদের আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো তারা মনে করে কেবলা হচ্ছে আল্লাহর সশরীরী উপস্থিতির স্থান। নামায পড়ার সময় এভাবেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল মুসল্লির সামনে উপস্থিত থাকেন বলে তাদের বিশ্বাস। তাদের বক্তব্য হলো, কোনো নামাযির উচিত নয় কেবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা কেননা আল্লাহ তায়ালা তার সামনে উপস্থিত রয়েছেন এবং এই কাজ করার ফলে আল্লাহ বিরক্ত এবং মনোক্ষুন্ন হতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে কেবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য হলো নামাযের সময় সকল নামাযি ও মুমিনের মনোযোগ এক ও অভিন্নমুখী করা, কেবলামুখি হয়ে দাঁড়ানোর মানে এই নয় যে আল্লাহ ঐদিকে রয়েছেন। বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ সবখানেই রয়েছেন এবং সকল বিষয়ে তিনি সচেতন। যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছেঃ অহুয়া লিকুল্লি শায়্যিন আলিম।

আল্লাহ এমন এক সত্ত্বা যিনি অসীম এবং অপার, সবকিছুর ওপরই তিনি প্রাজ্ঞ এবং সচেতন। আল্লাহর জন্যে যদি নির্দিষ্ট স্থান কিংবা কালের বৃত্ত তৈরি করা হয় তাহলে একদিকে যেমন তাঁকে নির্ভরশীল করে ফেলা হয় তেমনি তাঁকে বৃত্তাবদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। অপরদিকে ওহাবিদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট স্থান এবং কালের মাঝে আল্লাহকে আবদ্ধ করে ফেলার মানে দাঁড়ায়, নির্দিষ্ট স্থান এবং কালের বাইরে অনির্দিষ্ট অসীম স্থান ও কালের মাঝে আল্লাহর উপস্থিতি নেই, আর এ বিষয়টি প্রকারান্তরে আল্লাহর দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতারই পরিচায়ক। অথচ প্রকৃত সত্য হলো বিশ্ব প্রতিপালক অনন্ত, অসীম এক সত্ত্বা। তাঁর মাঝে কোনো অপূর্ণতা কিংবা অক্ষমতা বলে কিছু নেই।

ইবনে তাইমিয়া বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ সম্পর্কে আরো বিভিন্ন রকম বর্ণনা দিয়েছেন। এসব বর্ণনায় অনেক ক্ষেত্রেই আল্লাহর মহান মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করা হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কোরআনই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে কিনা প্রকৃত সত্যকে চিন্তাশীল ও বুদ্ধিমানদের সামনে তুলে ধরে। সূরা শুরার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “কোনো কিছুই তাঁর মতো নয়….।” কোরআনে কারিমের মুফাসসির এবং বিশিষ্ট শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ মাকারেম শিরাযি এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন- “মূলতঃ এ আয়াতটি আল্লাহর সকল গুণাবলির সাথে পরিচিত হবার মৌলিক ভিত্তি। এই আয়াতের দিকে না তাকিয়ে বা এর মর্মার্থ উপলব্ধি না করে আল্লাহর গুণাবলির কোনোটাই বোঝা যাবে না। কেননা আল্লাহকে চেনার দুর্গম পথের যাত্রীদের জন্যে আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা দেওয়াটাই হচ্ছে সবচেয়ে নাজুক রসাতল-যেখান থেকে যে-কোনো মুহূর্তে তার পতন ঘটতে পারে সোজা শের্‌কের জাহান্নামে।

অন্যভাবে বলা যায়, আল্লাহর অস্তিত্ব এমন বা তিনি এমন এক সত্ত্বা, যে-কোনো দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর ক্ষেত্রে অপূর্ণ। তাঁর অসীম সত্ত্বাকে কোনো সীমিত দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধিই করা যাবে না। যেমন কোনো কোনো কাজ আছে আমাদের জন্যে সহজ, আবার কোনো কোনোটা কঠিন। কোনো কোনো বস্তু আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে আবার কোনো কোনো বস্তু আমাদের কাছে…কেননা আমাদের অস্তিত্বই সীমিত…কিন্তু যেই সত্ত্বার অস্তিত্ব যে-কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই অসীম এবং চিরন্তন, তা অনুভবযোগ্য নয়। ইমাম আলী (আ) নিজেও নাহজুল বালাগায় আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে বহুবার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে আল্লাহর অসীম শক্তি ও ক্ষমতাটা এমন যে,ছোটো-বড়ো, ভারি-হালকা, শক্তিশালী-দুর্বল ইত্যাদি সকল সৃষ্টিই আল্লাহর শক্তিমত্তার কাছে সমান। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনে হাজার মাক্কি তাঁর ‘আলফাতাভি-আল-হাদিসা’ নামক গ্রন্থে ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে লিখেছেনঃ ‘খোদা তাকে অন্ধ, বধির, গোমরাহ, হীন এবং অপদস্থ করে দিয়েছেন। তার সমকালীন আহলে সুন্নাতের ফকিহ ইমামগণ যেমন ইমাম শাফেয়ী (রহ), ইমাম মালেক (রহ), ইমাম আবু হানিফা (রহ) এর অনুসারী ফকিহগণ তার চিন্তা-চেতনা এবং কথাবার্তা বলেছেন…ইবনে তাইমিয়ার কথাবার্তা মূল্যহীন এবং সে বেদায়াত সৃষ্টিকারী, গোমরাহ ও ভারসাম্যহীন। আল্লাহ তায়ালা তার সাথে যথার্থ আচরণ করুন এবং আমাদেরকে তার আকিদা-বিশ্বাসের পাপ আর তার পথ ও পদ্ধতি থেকে রক্ষা করুন।”

ইবনে তাইমিয়া তার ‘মিনহাজুস সুন্নাহ’ এবং ‘আলআকিদাতুল হামাভিয়া’ নামক গ্রন্থে তৌহিদ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি আল্লাহর গুণাবলির মধ্যে ‘দৌড়ানো’কেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন,আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাদের নিকটবর্তী হবার জন্যে তাদেঁর দিকে দৌড়ে যান। তাঁর এ বিশ্বাসের পক্ষে তিনি একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হাদিসটি হলো, নবী করিম (সা) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ পাক বলেন যদি কোনো বান্দা আমার দিকে এক বিঘৎ পরিমাণ অগ্রসর হয়,আমি তার দিকে আধা মিটার এগিয়ে যাবো। আর সে যদি আধা মিটার অগ্রসর হয় আমি এক মিটারেরও বেশি কাছে এগিয়ে যাবো। আর যদি বান্দা হেঁটে হেঁটে আমার দিকে আসে আমি দৌড়ে দৌড়ে তার দিকে এগিয়ে যাবো।”

ইবনে তাইমিয়া বান্দার দিকে আল্লাহর এই দৌড়ানোকে দৈহিক দৌড় বলেই মনে করেন। এতে করে হাদিসে মূল বক্তব্যই আড়ালে থেকে যায়। এই হাদিসে আসলে বান্দাদের কাছে আল্লাহর আধ্যাত্মিক, আত্মিক এবং মানসিক নৈকট্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে মূল যে বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তাহলো যারা আল্লাহর দিকে অগ্রসর হতে চায় আল্লাহ তাদেরকে অগ্রসর হতে সাহায্য করেন। আল্লাহর প্রতি ভক্তি বা তাঁর ইবাদাতের ব্যাপারে যে যতো বেশি আগ্রহী হবে তার প্রতি আল্লাহর মনোযোগও দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। মূল্যবান এই হাদিসটি থেকে ইবনে তাইমিয়ার উপলব্ধি পুনরায় প্রমাণ করে তিনি এবং সালাফিয়াগণ আল্লাহকে মানুষের মতোই মনে করেন,কেননা দৌড়ানোর বিষয়টি দৈহিক গুণাবলির সাথেই সংশ্লিষ্ট।সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক উচ্চ পরিষদও আল্লাহর দৌড়ানোকে বিবেচনাযোগ্য বলে মনে করে। সৌদি আরবের বিখ্যাত মুফতি আব্দুল আযিয বিন আযও ফতোয়া বিষয়ক এক বক্তব্যে বলেছেনঃ ‘আল-কোরআন এবং সুন্নাহ’তে স্পষ্টভাবেই আল্লাহর চেহারা, হাত, চোখ, আঙ্গুল এবং পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশের বর্ণনা এসেছে। আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিভঙ্গি এই বিশ্বাসের ওপরই প্রতিষ্ঠিত…নবী করিম (সা) আল্লাহর এই গুণাবলিকে যথার্থ মর্যাদার সাথে প্রমাণ করেছেন।’

অবশ্য সালাফিয়ারা সবসময়ই তাদের ভ্রান্ত কথাবার্তাগুলোকে নবীজীর হাদিস এমনকি কোরআনের আয়াত বলে উদ্ধৃত করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। অথচ কোরআনের কোত্থাও কিংবা রাসূলে আকরাম (সা) এর নির্ভরযোগ্য বক্তব্যের কোনো জায়গায় আল্লাহর দৌড়ানোর ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত নেই। এমনকি রাসূলে খোদার বক্তব্য আল্লাহর মানবীয় এইসব গুনাবলি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

মহা দয়ালু স্রষ্টা কোরআনকে আমাদের জন্যে পাঠিয়েছেন তাঁর দিকে যাবার তাঁর পথে চলার একটি গাইড বা পথনির্দেশক হিসেবে। পার্থিব এই জীবনের আঁকাবাঁকা, উত্থান-পতনময় দুর্গম ও জটিল পথে এবং বিভিন্ন চিন্তাদর্শের বেড়াজালে যাতে আমরা দিশেহারা হয়ে না যাই কিংবা যাতে আমরা সঠিক পথ হারিয়ে না বসি সেজন্যেই আল্লাহ পাক কোরআনকে আমাদের গাইড লাইন হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন। আমরা এখানে কোরআনের আয়াতের প্রতি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবো যাতে পরহেজগারদের দিকে আল্লাহর দৌড়ানো সংক্রান্ত রাসূলে খোদার বক্তব্যের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরায়ে আঙ্কাবুতের উনসত্তর নম্বর আয়াতে বলেছেনঃ
“আর যারা আমাদের পথে একনিষ্ঠ লক্ষ্য নিয়ে সাধনা করে, আমরা অবশ্যই তাদেরকে আমাদের পথে পরিচালিত করবো এবং আল্লাহ পাক সৎকর্মশীলদের সাথে রয়েছেন।”

আল্লাহর পথে যারা চেষ্টা প্রচেষ্টা চালায় আল্লাহ তাদেরকে এভাবেই সহযোগিতা করেন এবং তাদেরকে আল্লাহ তাঁর একান্ত হেদায়াত দান করেন। আর প্রকৃতপক্ষে এটাই হলো রাসূলে খোদার হাদিসের ব্যাখ্যা যেখানে তিনি বলেছিলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর নেককার, পরহেজগার বান্দাদের দিকে দৌড়ে যান। আর এই আয়াতের প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই বোঝা যাবে এখানে আল্লাহর দৈহিক রূপে দৌড়ানোর বিষয়টি বোঝায় না অর্থাৎ এর উদ্দেশ্য মানুষের মতো দু’পায়ে আল্লাহর দৌড় দেওয়া নয়। আল্লাহ তার বান্দাদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন-এ ধরনের বহু আয়াত রয়েছে পবিত্র কোরআনে। তবে মানুষের মতো দৈহিক দৌড় দেওয়া এবং এ ধরনের মানবীয় অঙ্গসঞ্চালনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি হেদায়েত দেন না, কেননা আল্লাহর এ জাতীয় সঞ্চালনের প্রয়োজনই নেই।

ইবনে তাইমিয়া আরো বিশ্বাস করেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে আমাদের বাহ্যিক চোখ দিয়ে দেখা সম্ভব। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেনঃ “যে-কোনো বস্তু বা জিনিসেরই অস্তিত্ব যদি পরিপূর্ণতরো হয় দেখার জন্যে তা অধিকতর উপযুক্ত হয়। আর যেহেতু আল্লাহ হচ্ছেন পূর্ণাঙ্গ এবং পরিপূর্ণতম সত্ত্বা তাই অন্যান্য বস্তুর চেয়ে তাঁকে দেখা সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক। ফলে আল্লাহকে অবশ্যই দেখতে পাওয়া উচিত।”
ওহাবিরা অবশ্য ‘আল্লাহকে দেখার বিষয়টি’ নিয়ে এতো বেশি বাড়াবাড়ি করেছে, এতো বেশি সীমালঙ্ঘন করেছে যে,বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন যে-কোনো সচেতন চিন্তার মানুষই তাদের ঐ চরমপন্থী কথাবার্তায় বিস্মিত না হয়ে পারেন না।

ইবনে তাইমিয়া বিশ্বাস করেন কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক তাঁর অবয়ব পরিবর্তন করে মানুষের সামনে আসবেন এবং আত্মপরিচয় দিয়ে বলবেনঃ
“আমি তোমাদের খোদা।’ কিন্তু মানুষ তার জবাবে বলবেঃ ‘আমরা তোমাকে চিনি না এবং আমরা তোমার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যদি আমাদের খোদা আসেন আমরা তাঁকে চিনতে পারবো।’ তারপর আল্লাহ তাঁর আসল অবয়বে তাদের সামনে আসবেন এবং আত্মপরিচয় দেবেন। মানুষেরা তখন বলবেঃ হ্যাঁ! তুমিই আমাদের খোদা! তারপর তারা আল্লাহর পেছনে পেছনে বেহেশতের দিকে যাবে।”

আচ্ছা! ওহাবিদের এইসব কথাবার্তা কি আল্লাহর সাথে ঠাট্টা-রসিকতা করা নয়? আরেকটি প্রশ্ন হলো মানুষ কি আগে দুনিয়াতে কখনো আল্লাহকে দেখেছে যে কিয়ামতে তাঁকে তাঁর আসল চেহারা দেখে চিনতে পারবে? পাঠক! আপনারা কি কেউ আল্লাহকে দেখেছেন কিংবা আল্লাহকে দেখেছে এমন কাউকে চেনেন? আল্লাহকে দেখার কোনো সুযোগ নেই-কোরআনে এ সংক্রান্ত সবচেয়ে স্পষ্ট যে আয়াতটি প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃত করা যায় তাহলো সূরা আনআমের ১০৬ নম্বর আয়াত। আয়াতটি হলোঃ “চোখগুলো তাঁকে দেখতে পায় না কিন্তু তিনি সকল চোখকেই দেখেন। তিনি সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন এবং সকল বিষয়েই সচেতন।”

আল্লাহকে যে মানব চোখ দিয়ে দেখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় সে সম্পর্কে কোরআনের সূরা আরাফে’র ১৪৩ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। বলা হয়েছেঃ “তারপর মূসা যখন প্রতিশ্রুত সময়ে যথাস্থানে এসে পৌঁছলেন,তখন তাঁর সাথে তাঁর রব কথা বললেন। তিনি বললেনঃ হে পরোয়ারদেগার! আমাকে দর্শন দাও,আমি তোমাকে দেখবো। আল্লাহ বললেনঃ ‘আমাকে কক্ষণো দেখবে না।”

যে দুটি আয়াতের উদ্ধৃতি দেওয়া হলো,তা থেকে নিরূপণ হয়ে যায় যে,ইবনে তাইমিয়ার কল্পনাপ্রসূত চিন্তাভাবনাগুলো ভ্রান্ত।প্রকৃত সত্য হলো আল্লাহ এমন এক সত্ত্বা যাকে কখনোই দেখা যাবে না। ইবনে তাইমিয়া এবং অন্যান্য সালাফিয়ারা আল্লাহ সম্পর্কে আরো অনেক কথাবার্তা বলেছেন। যেমনঃ আল্লাহ পাক মশার পিঠে চড়েও চলাফেরা করতে পারেন। আল্লাহ কোঁকড়ানো চুলধারী যুবক। আল্লাহর চোখে ব্যথা হলে ফেরেশতারা তাঁর সেবায় এগিয়ে যান। আল্লাহ পাক নবীদের সাথে করমর্দন করেন। সোনালী রঙের জুতা পরা পা রয়েছে আল্লাহর। আল্লাহর কাঁধ আছে, কোমর আছে, আঙুল আছে, তিনি আশ্চর্য হন এবং হাঁসেন ইত্যাদি….

এইসব অযৌক্তিক কল্পনার জবাবে আমরা ইতোপূর্বেও বলেছি যে আল্লাহ তায়ালা মানুষসহ কোনো কিছুর সাথেই তুলনীয় নয় এবং তাঁর কোনো দৈহিক অবয়ব নেই। সূরা আঙ্কাবুতের আটষট্টি নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বানায় কিংবা তার কাছে সত্যের দাওয়াত আসার পরও তাকে অস্বীকার করে তারচেয়ে অত্যাচারী আর কে হতে পারে? কাফেরের স্থান কি দোযখ নয়? বিশিষ্ট দার্শনিক ইমাম গাযযালি এবং কুরতাবিসহ আরো বহু মুসলিম মনীষী বলেছেন যারা আল্লাহর দৈহিকতায় বিশ্বাস করে তারা কাফের। কেননা দেহ মানেই হলো মাখলুক অর্থাৎ সৃষ্ট,আর সৃষ্ট কোনো কিছু তথা মাখলুকাতের পূজা বা প্রার্থনা করা মূর্তি পূজার শামিল।

আল্লাহ সম্পর্কে নাহজুল বালাগায় ইমাম আলী (আ) এর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে এভাবেঃ “..কোরআনে তৌহিদ সম্পর্কে এসেছে: ‘কোনো কিছুই তাঁর মতো নয়’। ফলে তাঁর সাথে কোনো কিছুর তুলনা দেওয়াটা ভুল এবং আল্লাহর বাইরে চিন্তার শামিল। যে-ই আল্লাহকে কোনো কিছুর মতো ভাবে সে লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারলো না। যদি একান্ত প্রয়োজনে তুলনা দিতে হয় সেটা তো আল্লাহর বান্দার দেওয়া বর্ণনা হলো,আল্লাহর নিজের নয়। কেননা তিনি কোনো কিছুর সাথেই তুলনীয় নন। তাই যারা আল্লাহকে কোনো কিছুর সাথে তুলনা করলো তারা তো আল্লাহকে চেনার পথে অগ্রসর না হয়ে লক্ষ্যচ্যুত হয়ে গেল এবং আল্লাহকে উপলব্ধি করতে পারলো না।”

বিশিষ্ট মনীষী ও ইসলামী চিন্তাবিদ ইমাম গাযযালি (রহ) বলেছেনঃ ‘কেউ যদি মনে মনে ভাবে আল্লাহর একটি দৈহিক অবয়ব রয়েছে যা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে গঠিত,তাহলে সে মূর্তি পূজক হয়ে যাবে কেননা প্রতিটি দেহই সৃষ্টি করা হয়েছে বা বানানো হয়েছে। আর সর্বকালের সর্বযুগের সকল আলেম ওলামা বা ধর্মীয় মনীষীই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে সৃষ্টির পূজা করা কুফুরি এবং মূর্তি পূজার শামিল।’ কুরতাবি আরেকজন বিখ্যাত আলেমে দ্বীন। যারা আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বায় বিশ্বাস করে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেনঃ ‘প্রকৃত সত্য কথাটি হলো আল্লাহ তায়ালার দৈহিক সত্ত্বার প্রবক্তা বা এই মতে বিশ্বাসীদের সবাই কাফের। কেননা মূর্তি পূজক আর ব্যক্তি পূজারিদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।’

ইসলামের ইতিহাসবিদ এবং বহু আলেম মনে করেন ইবনে তাইমিয়াসহ কোনো কোনো মুসলমানের চিন্তায় আল্লাহর দেহতত্ত্বটা প্রবেশ করেছে ইহুদি ধর্ম থেকে। শাহরেস্তানি তাঁর ‘মেলাল ও নাহল’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ “যেসব ইহুদি দৃশ্যত মুসলমান হয়েছিল তারা আল্লাহ তায়ালার দৈহিক সত্ত্বা সংক্রান্ত অসংখ্য হাদিস তৈরি করেছিল এবং সেগুলোকে ইসলামী শরিয়তে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল। এ সংক্রান্ত সকল হাদিসেরই উৎস হলো তৌরাত।” ইবনে খালদুন আরেকজন বিখ্যাত মুসলমান ইতিহাসবিদ। তিনিও বলেছেনঃ ইসলামের আবির্ভাবস্থল আরব বই-পুস্তক কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিল না। তারা সৃষ্টি রহস্য এবং বিশ্বের সৃষ্টিকূল সংক্রান্ত রহস্য উদঘাটনের জন্যে ইহুদি আলেম ওলামা, আহলে তৌরাত এবং নাসারাদের কাছে জিজ্ঞেস করতেন।” অনেক নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থেও তৌরাত এবং ইহুদি উৎস থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। যাই হোক, আসরের এ পর্যায়ে আমরা ওহাবিদের আরেকটি বিশ্বাস নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। এই আকিদাটির নাম হচ্ছে ‘শাফায়াত’। ইবনে তাইমিয়া এই আকিদার প্রবক্তা, আর তাঁর অনুসারী মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব এ সম্পর্কে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন।

‘শাফায়াত’ শব্দটির সাথে আমাদের সবারই কমবেশি পরিচয় রয়েছে। যখনই কারো অপরাধ, গুনাহ কিংবা শাস্তির প্রসঙ্গ ওঠে এবং কেউ মাঝখানে এসে তাকে শাস্তি থেকে মুক্তি দেয়,তখনই বলা হয় অমুক তার পক্ষে ‘শাফায়াত’ করেছে। শাফায়াতের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কোনো মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী হওয়া কিংবা কোনো মানুষের কল্যাণে কাজ করা। শরিয়তের পরিভাষায় শাফায়াত হচ্ছে আল্লাহর কোনো অলি-আওলিয়া আল্লাহর কাছে অন্য কোনো মানুষের জন্যে মুক্তি বা ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া। তিনি আল্লাহর কাছে ঐ ব্যক্তির গুনাহগুলো ক্ষমা করার জন্যে কিংবা তার শাস্তি হ্রাস করার জন্যে আবেদন জানাবেন। ওহাবিদের সাথে ইসলামের অন্যান্য মাযহাবের মতপার্থক্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো এই ‘শাফায়াত’। ওহাবিরা অবশ্য এক ধরনের শাফায়াতকে ইসলামের একটি মূলনীতি হিসেবে মেনে নিয়েছে, তবে তারা বলে ঐ শাফায়াত একান্তই কিয়ামতের দিনের জন্যে নির্দিষ্ট। সেদিন গুনাহগার উম্মাতের জন্যে শাফায়াতকারীগণ আল্লাহর কাছে শাফায়াত করবেন। শাফায়াতের ক্ষেত্রে ইসলামের নবীর অংশ অনেক বেশি থাকবে। কিন্তু তাদের মূল যে বক্তব্য তাহলো মুসলমানদের কোনোরকম অধিকার নেই এই পৃথিবীতে কোনো নবী কিংবা আল্লাহর কোনো অলি-আওলিয়ার কাছে শাফায়াত প্রার্থনা করা। যদিও নবীজীর কাছ থেকে কিংবা আল্লাহর অন্যান্য আওলিয়ার কাছে শাফায়াত চাওয়ার প্রচলন সেই নবীজীর জীবিত থাকাকালেই মুসলমানদের মাঝে চলে আসছে। মুসলিম কোনো জ্ঞানী-গুণী মনীষীই উপযুক্ত বান্দাদের কাছে শাফায়াতের আবেদন করাকে প্রত্যাখ্যান করে নি। তবে হিজরী অষ্টম শতাব্দির শুরু থেকে ইবনে তাইমিয়া এবং পরবর্তীকালে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে শাফায়াত চাওয়াকে নিষেধ এবং হারাম ঘোষণা করেন এবং যথারীতি তাদের ঐ দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতাকারীদেরকে কাফের ও নাস্তিক বলে অভিহিত করেন।

এই দুইজন বিশ্বাস করেনঃ যে শাফায়াত নবীগণ, ফেরেশতাগণ এবং আল্লাহর অলিগণ করবেন তা একান্তই আখেরাতের সাথে সম্পৃক্ত, পৃথিবীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণে কোনো বান্দা যদি নিজের লক্ষ্য অর্জন করা অর্থাৎ নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে আল্লাহ এবং তার মাঝে তৃতীয় কোনো মাধ্যমকে শাফায়াতের জন্যে অবলম্বন করে,তা শির্‌ক হিসেবে গণ্য হবে এবং তা হবে আল্লাহর বাইরে অন্য কারো বন্দেগি করার শামিল। অথচ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সকল বান্দারই উচিত কেবল সরাসরি আল্লাহর কাছেই তার চাওয়া পাওয়ার কথা এভাবে বলাঃ “হে আল্লাহ! আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যাদেরকে তুমি মুহাম্মাদ (সা) এর শাফায়াত ধন্য করেছো!” এভাবে বলা ঠিক নয়ঃ “হে মুহাম্মাদ! আমার জন্যে তোমার খোদার কাছে শাফায়াত করো!”

সালাফিয়ারা এবং মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের অনুসারীরা শাফায়াত নিয়ে মহা ঝামেলা সৃষ্টি করেছে। এখনো ওহাবিরা শাফায়াত সম্পর্কে ব্যাপক হৈ চৈ করছে এবং শাফায়াতের প্রবক্তাদের উদ্দেশ্যে বিশ্রী শব্দ এবং ভাষা ব্যবহার করছে। অলি আওলিয়াদের কাছ থেকে শাফায়াত প্রার্থনা করতে নিষেধ করেছে তারা। এর পেছনে কিছু কারণ অবশ্য তারা তুলে ধরেছে।

আল্লাহর অলিদের কাছে শাফায়াত কামনা করতে নিষেধ করার পেছনে সর্বপ্রথম কারণটি হলো এটা শির্‌ক বা অংশীবাদের পর্যায়ভুক্ত। কেননা তাদের বিশ্বাস শাফায়াতের আবেদন আসলে শাফায়াতকারীর পূজা করার মতো বিষয়। অর্থাৎ শাফায়াতের আবেদন করার মধ্য দিয়ে বান্দা আসলে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং এভাবে আল্লাহর একত্ববাদী সত্ত্বার সাথে শরিক করা হয়। ওহাবি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব ‘কাশফুশ শাব্‌হাত’ নামক গ্রন্থে দাবি করেছেন, ‘শাফায়াত’ এবং ‘তাওয়াসসুল’ শির্‌কের প্রকারভেদ। এ কারণে বহু মুসলমানকে মুশরিক বলে অভিহিত করেছে।এই ফের্কার দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের অপরাপর ফের্কার সাথে সম্পূর্ণ পৃথক। মূলত ওহাবিরা শাফায়াতের বিষয়টিকে ভুল বুঝেছে। এদের দৃষ্টিভঙ্গির জবাবে বলা উচিতঃ শাফায়াতের যে কোনো প্রকার আবেদনকে তখনই শির্‌ক বলে পরিগণিত করা যায় যখন শাফি বা শাফায়াতকারীকে ‘ইলাহ’, ‘খোদা’, ‘সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক’ ইত্যাদি বলে মনে করা হয়। কিন্তু আল্লাহর দরবারে প্রকৃত শাফায়াতকারীদের কাছে শাফায়াতের আবেদন করা শির্‌ক নয়; কেননা শাফায়াতের আবেদনকারী শাফায়াতকারীদেরকে আল্লাহর মনোনীত এবং ঘনিষ্ট বলেই মনে করে, কখনোই তাদেঁরকে খোদা বলে মনে করে না। বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণেই তাদেঁরকে শাফায়াতের উপযুক্ত বলে মনে করে। অপরদিকে ইসলামের শিক্ষায় এসেছে, শাফায়াতকারীগণ কেবল আল্লাহর সম্মতিতেই অমুশরিক গুনাহগারদের জন্যে শাফায়াত করতে পারবেন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ করার এবং মাগফেরাতের আবেদন করতে পারবেন। পবিত্র কোরআনের আয়াতে আমরা দেখবো পয়গাম্বর (সা) এবং অন্যান্য সঠিক শাফায়াতকারীগণের কাছে শাফায়াতের আবেদন মূলত ঐশী মাগফেরাতের জন্যে এক ধরনের দোয়া। আল্লাহর কাছে অলি-আওলিয়া এবং নবীদের অবস্থান ও মর্যাদা যেহেতু নৈকট্যপূর্ণ, সেজন্যে মুসলমানরা তাদেঁর কাছে আবেদন জানায় তাদের জন্যে যেন একটু দোয়া করেন। কেননা তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ পাক নবী আকরাম এবং তাঁর আওলিয়াদের দোয়া কবুল করেন এবং তাদের মাধ্যমে গুনাহগারদের গুনাহ দূর করেন।
কোরআনের আয়াত প্রমাণ করছে যে, মানুষের পক্ষে নবীজীর ক্ষমা প্রার্থনা করা পুরোপুরি প্রভাবশালী এবং উত্তম। সূরা মুহাম্মাদের উনিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘ওয়াসতাগফির লিজাম্বিকা ওয়ালিল মু’মিনিন’
অর্থাৎ’তোমার এবং ইমানদার নরনারীর ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো!’ একইভাবে সূরা তওবার ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘ওয়াসাল্লি আলাইহিম ইন্না সালাতাকা সাকানুল লাহুম’
অর্থাৎ ‘আর তাদের জন্যে তুমি দোয়া করো! নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া হচ্ছে তাদের জন্যে শান্তির কারণ।’
তো যেখানে নবীজীর দোয়া মানুষের জন্যে এতো উপকারী সেখানে তাঁর কাছে মানুষের দোয়া প্রার্থনায় কীসের বাধা! আর দোয়ার আবেদনে শাফায়াতের আবেদন ছাড়া কি অন্য কিছু রয়েছে?

হাদিসের কেতাবগুলোতেও শাফায়াত শব্দটি ‘দোয়া’ অর্থেই বেশিরভাগ ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি সহিহ বোখারির লেখক ইমাম মোঃ বোখারি তাঁর গ্রন্থেও ‘শাফায়াত’ শব্দটিকে দোয়া হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন ‘যখনই লোকজন ইমামের কাছে আবেদন জানিয়েছে তাদের জন্যে বৃষ্টি কামনা করতে,তাদের আবেদন তো প্রত্যাখ্যান করা ঠিক নয়।’ এ কারণে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে শাফায়াত বা দোয়া কামনা করা অবৈধ নয়।

শাফায়াত মানে যে দোয়া তার পক্ষে আরো সুস্পষ্ট অনেক তথ্য প্রমাণ রয়েছে। একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। হাদিসটি ইবনে আব্বাস রাসূলে খোদা (সা) এর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। বলা হয়েছেঃ ‘যখনই কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করে এবং তার জানাযার নামাযে এমন চল্লিশজন মুসল্লি অংশ নেয় যারা আল্লাহর সাথে কাউকে কখনো শরিক করে নি, আল্লাহ ঐ মৃত ব্যক্তির জন্যে তাদের শাফায়াত গ্রহণ করেন।’
সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিস এটি। মৃত ব্যক্তির জন্যে অমুশরিক চল্লিশ জনের শাফায়াত মানে আল্লাহর দরবারে ঐ ব্যক্তির জন্যে রহমত এবং মাগফেরাত কামনা করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। অতএব শাফায়াতের স্বরূপ যদি হয় দোয়া করা, তাহলে এই দোয়ার আবেদন করাটা কেন শেরেক হিসেবে পরিগণিত হবে?

শাফায়াতের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করার পেছনে ওহাবিদের আরেকটি কারণ বা দলিল হলো তারা বিশ্বাস করে মুশরিকরা যে আল্লাহর একত্ববাদী সত্ত্বার সাথে অন্যদেরকে শরিক করেছিল অর্থাৎ শির্‌ক করেছিলো, তাদের ঐ শিরকের কারণ ছিল মূর্তিগুলোর কাছে শাফায়াত কামনা। পবিত্র কোরআনেও এই বিষয়টির উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা ইউনূসের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “আর তারা অর্থাৎ মূর্তিপূজকরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছু বস্তুর পূজা করে যেগুলো না তাদের কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারে, আর না পারে তাদের কোনো উপকার করতে; আর তারা বলেঃ এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের জন্যে সুপারিশকারী….।”
এই আয়াতকে সামনে রেখে ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসীরা বলেনঃ একারণেই নবী করিম (সা) এবং আল্লাহর অলি-আওলিয়াদের কাছে যে-কোনো ধরনের শাফায়াত কামনা করা মূর্তির কাছে মুশরিকদের শাফায়াত কামনা করার শামিল।

সালাফিয়াদের এই আকিদা বিশ্বাসের জবাবে বলতে হয় নবী-রাসূলগণের কাছে শাফায়াত কামনা করা আর মূর্তিগুলোর কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানো-এই দুয়ের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যটি হলো মুশরিকরা মূর্তিগুলোকে তাদের খোদা বলে মনে করতো। খোদা মনে করার কারণেই তারা মূর্তিগুলোর কাছে শাফায়াত কামনা করতো। কিন্তু যিনি একজন মুসলমান তিনি আল্লাহর অলি আওলিয়াকে কোনোভাবেই খোদা বলে মনে করেন না। মনে করেন আল্লাহর কাছে মর্যাদার অধিকারী এবং তাঁর খুব নিকটবর্তী একজন বান্দা হিসেবে। আর সে জন্যেই তাদেঁর কাছে শাফায়াত বা দোয়ার আবেদন জানান একজন মুসলমান। কেননা মুসলমানরা বিশ্বাস করেন নবী করিম (সা), উপযুক্ত মুমিন ব্যক্তিগণ, শাহাদাত লাভকারীগণ এবং ফেরেশতাগণ আল্লাহর দরবারে শাফায়াত করার অধিকারের মর্যাদাপ্রাপ্ত। সেজন্যেই মুসলমানগণ দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় জগতেই আল্লাহর দরবারে শাফায়াতকারী হিসেবে তাঁদের কাছে দোয়ার আবেদন জানায়।

ইসলামী দ্বীন অনুযায়ী শাফায়াত হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্যে অসামান্য এক নিয়ামত।যেসব ব্যক্তি আল্লাহর বন্দেগি ত্যাগ করেনি এবং কুফুরি বা শির্‌ক করে নি, আল্লাহর আওলিয়াদের শাফায়াত তাদের জন্যে আশার আলোর মতো। শাফায়াত তাদের অন্তর থেকে হতাশা দূর করে দেয় আর আল্লাহর রহমতের প্রতি তাদের আগ্রহ উদ্দীপনা বাড়ায়। কিন্তু শাফায়াত সম্পর্কে বাহ্যত কিছু ইসলামী ফের্কা যেসব বোধ-বিশ্বাস বা মতাদর্শের কথা বলে সেগুলো একটু পর্যালোচনার বিষয়। সালাফিয়া বা ওহাবিরা বিশ্বাস করে কোরআনের সুস্পষ্ট হুকুম অনুযায়ী দোয়া করার সময় আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ডাকা ঠিক নয় কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানোর মানে হলো এক আল্লাহর বাইরে কারো কাছে নিজের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা।

তাঁরা সূরা জ্বিনের ১৮ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন যেখানে বলা হয়েছেঃ ‘তোমরা আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে ডেকো না।’ একইসাথে সূরা মুমিনের ৬০ নম্বর আয়াতে এসেছেঃ ‘তোমরা আমাকে ডাকো,আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো’। উদ্ধৃত আয়াত দুটির প্রথমটিতে-যেখানে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে তারা যেন আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে না ডাকে-তা থেকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো প্রার্থনা করাকে হারাম বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর উদ্দেশ্যে রুকু সিজদা করা, ইবাদাত করা শির্‌ক হিসেবে পরিগণিত,যারা তা করবে তারা মুশরিক হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর অলিদের কাছে শাফায়াত কামনা করার মানে তাদের ইবাদাত করা নয় বরং যারা শাফায়াত কামনা করে তারা জানে শাফায়াত কেবল আল্লাহর সম্মতিতেই সংঘটিত হয়। এধরনের ব্যক্তি মুমিন এবং আল্লাহর ওলিদেরকে ‘মাধ্যম’ হিসেবে গ্রহণ করে যাতে তাঁরা ঐ ব্যক্তির জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করে, কেননা আল্লাহ পাক পয়গাম্বর এবং পুণ্যবানদের দোয়া ভালোভাবে কবুল করেন।

সুতরাং কেউ যদি তার গুনাহগুলো ক্ষমার জন্যে কিংবা তার প্রয়োজনীয়তা মেটানোর জন্যে দোয়া চাইতে নবীজীর শরণাপন্ন হয় সেটা কক্ষণো নবীজীকে আল্লাহর মতো চিন্তা করা হয় না বরং তাকেঁ কেবল ‘মাধ্যম’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুফাস্‌সির আল্লামা তাবাতাবায়ি এ সম্পর্কে বলেছেন ইমামের কাছে প্রয়োজনীয়তা মেটানোর প্রত্যাশা করাটা তখনি শের্‌ক বলে পরিগণিত হবে যখন প্রত্যাশাকারী ইমামকে পরোয়ারদেগারের মতো প্রভাবশালী এবং চিরন্তন শক্তির অধিকারী বলে চিন্তা করবে। কিন্তু শক্তিমত্তার অধিকারী যদি আল্লাহকেই ভাবা হয় আর ইমামকে যদি মাধ্যম হিসেবে মনে করা হয় তাহলে শির্‌ক হবে না।

মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব ইসলামের নামে যে ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসের প্রসার ঘটিয়েছেন ইসলামের মৌলিক এবং নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী সেগুলোর অসারতা প্রমাণিত হবার ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়। প্রকৃত ব্যাপারটা হলো ইবনে তাইমিয়ার মতো আব্দুল ওহাবরাও ইবাদাত বা প্রার্থনার গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারে নি। এজন্যেই তারা ভেবেছে নেককার শাফায়াতকারীগণের কাছে শাফায়াতের প্রত্যাশা করা মানে তাদের ইবাদাত করা। তারা জানতো না যে প্রকৃত ইবাদাত হলো আল্লাহর দরবারে পরিপূর্ণ বিনয়ের প্রকাশ, কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সম্মান করা বা তার প্রতি বিনয় প্রদর্শন করা ইবাদাত নয়। এমনকি সেই গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ববর্গ যদি নবী কারিম (সা) কিংবা তাঁর আহলে বাইতের মহান ইমামদের মতোও হন-যাঁরা নিজেরাই আল্লাহর বন্দেগি এবং আনুগত্য করার ক্ষেত্রে আদর্শস্থানীয়।

শাফায়াতকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে ওহাবিদের আরেকটি দলিল হলো এই যে, তারা মনে করে শাফায়াতের অধিকার কেবল আল্লাহরই রয়েছে,তাঁর বাইরে আর কারো ঐ অধিকার নেই। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে পবিত্র কোরআনের সূরা যুমারের ৪৩ এবং ৪৪ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছেঃ ‘তারা কি আল্লাহ ব্যতীত সুপারিশকারী গ্রহণ করেছে? বলুন! তাদের কোনো এখতিয়ার না থাকলেও এবং তারা না বুঝলেও? বলুন সমস্ত সুপারিশ আল্লাহরই ক্ষমতাধীন! আসমান ও যমিনে তাঁরই সাম্রাজ্য, অতপর তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ কিন্তু এ আয়াতে এ কথা বলা উদ্দেশ্য নয় যে, ‘কেবল আল্লাহই শাফায়াত করবেন,ব্যাস..অন্য কারো আর শাফায়াত করার অধিকার নেই।’ কেননা এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আল্লাহ কখনোই কারো জন্যে কারো কাছে শাফায়াত করবেন না এবং আল্লাহ এসব কাজের অনেক উর্ধ্বে। বিবেকও এটা সমর্থন করে না যে বলি কোনো বান্দার গুনাহ মাফের জন্যে খোদা ‘মাধ্যম’ হয়েছেন। কারণটা হলো এই, একথা বলার সাথে সাথে যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়ায় তাহলো আল্লাহ মাধ্যম হয়ে কার কাছে শাফায়াত করবেন? তাই আয়াতের কেন্দ্রীয় বক্তব্য হচ্ছে আল্লাহ হলেন শাফায়াত গ্রহণ করার মালিক। তিনি যাকেই উপযুক্ত মনে করবেন তাকেঁই বান্দার ব্যাপারে শাফায়াত করার অনুমতি দেবেন। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী ওহাবিদের দাবির সাথে এই আয়াতের কোনো সম্পর্কই নেই। রাসূলে খোদার সময় থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানরা কেবল বিশ্ব স্রষ্টাকেই শাফায়াতের মালিক এবং শাফায়াত গ্রহণকারী হিসেবে মনে করে আসছে,তাঁর কোনো আওলিয়াকে নয়। সেইসাথে মুসলমানরা এ-ও বিশ্বাস করে যে কেবল তিনি বা তাঁরাই শাফায়াত করার যোগ্য যাদেঁরকে আল্লাহ শাফায়াত করার অনুমতি দিয়েছেন। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী রাসূলে খোদা (সা)কে আল্লাহ শাফায়াতের অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং শাফায়াত করার অনুমতিপ্রাপ্ত হিসেবে তাঁর কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানোটাই স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত।

বোখারি এবং মুসলিমের মতো বিখ্যাত হাদিসবেত্তাদের মতো আলেমগণও তাঁদের সংকলিত হাদিস গ্রন্থে কক্ষণো শাফায়াতকে শির্‌ক বলে উল্লেখ করেন নি। মুহাম্মাদ তিরমিযির সুনানে তিরমিযি সহিহ হাদিস গ্রন্থ ‘সিহহা সিত্তা’র অন্তর্ভুক্ত অন্যতম প্রধান একটি গ্রন্থ। তিরমিযি তাঁর গ্রন্থে শাফায়াত সম্পর্কে আনাস ইবনে মালিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। আনাস ইবনে মালিক বলেনঃ নবীজীর কাছে আবেদন জানিয়েছি কিয়ামতের দিন তিনি যেন আমার জন্যে শাফায়াত করেন। তিনি আমার আবেদন গ্রহণ করে বললেনঃ ‘আমি এ কাজটি আঞ্জাম দেবো।’ নবীজীকে বললামঃ ‘আপনাকে কোথায় খুজেঁ পাবো?’ নবীজী বললেনঃ ‘পুলসিরাতের কাছে।’ যাই হোক, আনাসের কাছে মোটেও মনে হয় নি যে শাফায়াতের আবেদন করা এক ধরনের শির্‌ক।

ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসীগণ শাফায়াতের আবেদন করাটাকে শির্‌ক বলে মনে করেন। কিন্তু বিখ্যাত হাদিসবিদ বোখারি এবং তিরমিযি তাঁদের সংকলিত হাদিস গ্রন্থে শাফায়াত সম্পর্কে যেসব হাদিস বর্ণনা করেছেন সেখানে শাফায়াতের পক্ষে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যেমন তিরমিযি আনাস ইবনে মালিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। আনাস ইবনে মালিক বলেনঃ নবীজীর কাছে আবেদন জানিয়েছি কিয়ামতের দিন তিনি যেন আমার জন্যে শাফায়াত করেন। তিনি আমার আবেদন গ্রহণ করে বললেনঃ ‘আমি এ কাজটি আঞ্জাম দেবো।’ নবীজীকে বললামঃ ‘আপনাকে কোথায় খুজেঁ পাবো?’ নবীজী বললেনঃ ‘পুলসিরাতের কাছে।’ এ বর্ণনা থেকে শাফায়াতের আবেদন করাটাকে শির্‌ক ভাববার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। কেননা আনাস দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে নবীজীর (সা) এর কাছে শাফায়াতের আবেদন জানিয়েছেন এবং নবীজীও তাকে কথা দিয়েছেন। অন্তত আনাসের কাছে কোনোভাবেই মনে হয় নি যে শাফায়াতের দরখাস্ত করাটা শির্‌ক।

সাওয়াদ ইবনে আযেব নবী আকরাম (সা) এর আরেকজন সঙ্গী ছিলেন যিনি নবীজীর কাছে শাফায়াত প্রার্থনা করেছেন। নবী কারিম (সা) সম্পর্কে সাওয়াদ ইবনে আযেব একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন যেই কবিতার মধ্যে নবীজীর কাছে সুস্পষ্টভাবে শাফায়াত প্রার্থনা করা হয়েছে। কবিতার একটি পংক্তি এ রকমঃ

অকুল্ লি শাফিআন ইয়াওমা লা..জু শাফাআতিন
বিমুগ্‌নি ফাতিলান আন সাওয়াদ ইবনে আযিবিন
অর্থাৎ
হে নবীকূল শিরোমণি!
পুনরুত্থান দিবসে তুমি হয়ো আমার শাফায়াতকারী
যে দিন অন্য কারো শাফায়াতে সাওয়াদ ইবনে আযেবের
অবস্থার বিন্দুমাত্রও হবে না উন্নয়ন,
হবে না কোনো লাভ এমনকি
খুরমা বিচির শাঁসের সমান।

সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী চিন্তাবিদরা বা তাদের নেতৃবৃন্দ এ ধরনের হাদিসগুলোর উদ্ধৃতি দেয় না কিংবা ইঙ্গিতও করে না। আলকোরআনের সূরা নিসা’র ৬৪ নম্বর আয়াতের কথাও তারা উল্লেখ করে না,কেননা ঐ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে শাফায়াতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘…আর তারা যখন নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করেছিলো (এবং আল্লাহর আদেশ নিষেধকে পদতলে পিষ্ট করেছিলো) তখন যদি আপনার কাছে আসতো এবং পরোয়ারদেগারের দরবারে ক্ষমার আবেদন জানাতো, আর নবীজীও যদি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহকে তারা তওবা কবুলকারী এবং মেহেরবানরূপে পেতো।’ এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায় তাঁর রাসূল (সা) কে বান্দার গুনাহ মাফ করার জন্যে আল্লাহর দরবারে আবেদনকারী ‘মাধ্যম’ হিসেবে অর্থাৎ শাফায়াতকারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

বিখ্যাত মুসলিম মনীষী ও মুফাসসিরে কোরআন ফাখরে রাযি এই আয়াতের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ ‘রাসূলে খোদা (সা) তাদের জন্যে ক্ষমার আবেদন জানিয়েছিলেন (এ আয়াতে যাদের কথা এসেছে)।’…যা নবীজীর উচ্চ মর্যাদারই পরিচয় বহন করে। এর অর্থ দাঁড়ায় তারা এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের কাছে এসেছে…যিনি ঐশী রেসালাতের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং সুমহান মর্যাদার অধিকারী। অদৃশ্য এবং অজানা বাস্তব সত্য সম্পর্কে তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হয় এবং তিনি আল্লাহর বান্দাদের মাঝে আল্লাহরই প্রতিনিধি। নবীজী যেহেতু আল্লাহর কাছে এরকম এক উচ্চ মর্যাদার আসনে অবস্থান করেন,সেজন্যে তাঁর শাফায়াত গ্রহণ না হয়ে পারে না।’

এখন কথা হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেহেতু সুস্পষ্টভাবেই রাসূলে খোদা (সা) কে বান্দাদের গুনাহ মাফের জন্যে শাফায়াত করার অধিকার দিয়ে ধন্য করেছেন, সেহেতু প্রশ্ন জাগে সালাফিরা কেন এই সত্যটাকে অস্বীকার করছে? প্রসঙ্গক্রমে ইবনে তাইমিয়ার একটি বক্তব্যও এখানে উল্লেখ করাটা মনে হয় অসমীচীন হবে না। ইবনে তাইমিয়া বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তায়ালা তাঁর আওলিয়াকে শাফায়াত করার অধিকার দিয়েছেন, তবে আমাদেরকে তার আবেদন করা থেকে বিরত রেখেছেন।’ তার এই বক্তব্যটাই শাফায়াত সংক্রান্ত বিতর্কের ব্যাপারে সালাফিয়াদের মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গির অসারতার পরিচয় বহন করে। কেননা পবিত্র কোরআনের সূরায়ে নিসা’র ৬৪ নম্বর আয়াতেই বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাঁর বান্দাদেরকে বলেছেন তারা যেন তাদের নবীজীর কাছে শাফায়াত করার আবেদন জানায়।

আচ্ছা এ রকম কি কখনো হতে পারে যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কাউকে কোনো কিছুর অধিকার দেবেন অথচ সেই অধিকারকে কাজে লাগাতে নিষেধ করবেন? এই কথাটাই তো বৈপরীত্যপূর্ণ। তাহলে আল্লাহ যেহেতু তাঁর আওলিয়াকে এ ধরনের অধিকার দিয়ে থাকেন তা অবশ্যই যাতে অন্যরা উপকৃত হতে পারে সেজন্যে, সেই অধিকারকে কাজে না লাগানোর জন্যে নয়। সালাফিয়াদের চিন্তাধারায় সবসময়ই এ ধরনের বিচিত্র বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। তাদের বিচ্যুত চিন্তাধারার ক্ষেত্রে যুক্তি প্রমাণের দুর্বলতার এটা আরেকটি দলিল। শাফায়াতকে নাকচ করার পেছনে ওহাবিদের সর্বশেষ যুক্তি হলো পৃথিবীর বুকে আল্লাহর ওলিদের কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানোটা মৃতের কাছে প্রয়োজন মেটানোর আবেদন করার মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

তাদের মতে এ রকম কাজ একেবারেই অবিবেচনা প্রসূত এবং অর্থহীন। তারা তাদের মতের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে সূরা নামলের ৮০ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে, যেখানে বলা হয়েছেঃ “আপনি আহবান শোনাতে পারবেন না মৃতদেরকে এবং বধিরকেও নয়, যখন তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে যায়।” কোরআন এ আয়াতে মুশরিকদেরকে মৃতের সাথে তুলনা দিয়ে বলেছে, মৃতের যেমন উপলব্ধি শক্তি নেই, তেমনি সত্যের আহ্বান অর্থাৎ ইসলাম বোঝার শক্তিও মুশরিকদের নেই। মৃতেরা যদি কথা বলতে পারতো কিংবা তাদের যদি শোনার অনুভূতি থাকতো, তাহলে মৃত অন্তরের অধিকারী মুশরিকরাও হেদায়েতের উপযুক্ত হতো।

সালাফিয়ারা সূরা ফাতেরের ২২ নম্বর আয়াতেরও উল্লেখ করে থাকে শাফায়াতের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্যে। এ আয়াতে বলা হয়েছেঃ “অবশ্যই সমান নয় জীবিত ও মৃত। আল্লাহ্ শ্রবণ করান যাকে ইচছা। আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নন।”
আগের আয়াতের মতো এ আয়াতেরও ভুল ব্যাখ্যা করেছে ওহাবিরা। এ আয়াতের প্রকৃত অর্থ হলো ‘যেসব মৃতদেহ কবরে শায়িত হয় তাদের উপলব্ধি ক্ষমতা থাকে না এবং রুহ বা আত্মা যে দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায় ঐ দেহের আর বোধশক্তি থাকে না।’ এখন কথা হলো আল্লাহর যেসব মহান বান্দা বা মনোনীত ব্যক্তির কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানো হয়, তাঁদের আত্মা তো মৃত নয়। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী বারযাখ বিশ্বে তাঁদের আত্মা জীবন্ত। তাদেঁর কাছেই শাফায়াতের আবেদন জানানো হয়, কবরে শায়িত নিষ্প্রাণ কোনো সাধারণ লাশের কাছে নয়।

ওহাবিদের যুক্তি হলো কোরআনে বলা হয়েছেঃ ‘যেসব মৃতদেহ কবরে শায়িত হয় তাদের উপলব্ধি ক্ষমতা থাকে না এবং রুহ বা আত্মা যে দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায় ঐ দেহের আর বোধশক্তি থাকে না।’ আবার কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহর মনোনীত নবী রাসূল, অলি আওলিয়াদের আত্মা মৃত নয়,বারযাখ বিশ্বে তাঁদের আত্মা জীবন্ত। তাদেঁর কাছেই শাফায়াতের আবেদন জানানো হয়, কবরে শায়িত নিষ্প্রাণ কোনো সাধারণ লাশের কাছে নয়। কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী পবিত্র আত্মাগুলো অন্য জগতে জীবন্ত থাকে এবং বেহেশতি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে,ফলে সাধারণ আত্মার মতো সেইসব আত্মারও যে উপলব্ধি শক্তি থাকবে না এ যুক্তি ঠিক নয়।

সহিহ বোখারিতে বদর যুদ্ধের গল্প প্রসঙ্গে এসেছেঃ ঐ যুদ্ধে কাফেরদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হবার পর নবী করিম (সা) তাঁর একদল সাহাবিকে নিয়ে একটি পুকুরের পাড়ে এলেন যেখানে মৃত মুশরিকদের লাশগুলোকে ফেলা হয়েছিল। নবীজী মৃতদের নাম ধরে ধরে ডাকলেন এবং বললেনঃ ‘আল্লাহ এবং তার রাসুলের আনুগত্য করাটাই কি তোমাদের জন্যে উত্তম ছিল না? আমরা খোদার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো যথাযথভাবে পেয়েছি, তোমরা কি তোমাদের খোদার অর্থাৎ মূর্তিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পেয়েছো?’ নবীজীর কথার এ পর্যায়ে ওমর বললেনঃ ‘হে রাসূলে খোদা (সা)! আপনি এক কারো সাথে কথা বলছেন যাদের প্রাণ নেই।’ নবীজী উত্তরে বললেনঃ যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ সমর্পিত তাঁর শপথ! আমি যা বলছি তাদের চেয়ে তুমি তা বেশি শ্রবণকারী নও।’

একইভাবে নির্ভরযোগ্য আরো বহু বর্ণনায় এসেছে যে,নবীজীকে গোসল করানো এবং কাফন পরানোর কাজ শেষ করে হযরত আলী(আ) নবীজীর চেহারা মুবারককে খুলে তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ হে রাসূলে খোদা (সা)! আমার বাবা-মা আপনার জন্যে উৎসর্গিত! আপনি জীবিত এবং মৃত উভয় অবস্থাতেই পূত-পবিত্র! আপনার পরোয়ারদেগারের কাছে আমাদের কথা স্মরণ করুন! আরবি সাহিত্যে উজকুর্নি ইন্দা রাব্বিক বলতে শাফায়াত করা অর্থ বোঝায়। হযরত ইউসূফ (আ) কারাগারে কাটানোর সময় তাঁর সাথে থাকা একদল বন্দির কারামুক্তির পর তারা যখন বাদশার দরবারে ফিরে যাচ্ছিল তখন বলেছিলেনঃ উজকুর্নি ইন্দা রাব্বাক অর্থাৎ বাদশার কাছে আমার কথা স্মরণ করো!হযরত আবু বকর সম্পর্কেও শাফায়াত কামনা সংক্রান্ত একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়ঃ রাসূলে খোদা (সা) এর রেহলাতের পর তিনি নবীজীর চেহারা মুবারক উন্মোচন করে হযরত আলী (আ) এর মতোই বলেছিলেনঃ হে রাসূলে খোদা (সা)! আমার বাবা-মা আপনার জন্যে উৎসর্গিত!আপনি জীবিত এবং মৃত উভয় অবস্থাতেই ছিলেন পূত-পবিত্র! আপনার পরোয়ারদেগারের কাছে আমাদের কথা স্মরণ করুন!
সালাফিয়ারা যেহেতু মানুষের আত্মার দেহবিচ্ছিন্ন স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না কিংবা মৃত্যুর পর আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস করে না, সেহেতু তারা মনে করে নবী-রাসূলগণ কিংবা আল্লাহর অলি আওলিয়া আর পুণ্যবান বান্দাদের আত্মাও মৃত্যুর পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সেজন্যে তাদের ধারণা যে বস্তুর কোনো অস্তিত্বই নেই তার কাছে শাফায়াতের আবেদন করার কোনো মানেই হয় না, তাই তাদের কাছে শাফায়াতের আবেদন করাটা বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী কাজ। পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে মৃত্যু পরবর্তী আত্মা বা রূহের বেঁচে থাকা সম্পর্কে বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও সালাফিয়া মতবাদে বিশ্বাসীরা এ ধরনের চিন্তাভাবনা নিজেদের মাঝে লালন করছে।

আলেম ওলামাগণ শাফায়াতের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন এবং তাঁরা ইবনে তাইমিয়া কিংবা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাবের বক্তব্যকে ইসলামী দ্বীনের বিরোধী বলে মনে করেন। এ বক্তব্যের পক্ষে আমরা কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করবো। খলিল আহমাদ সাহারানপুরি হানাফি ( জন্ম:১৩৪৬ হিঃ) বলেছেনঃ “দোয়ার সময় নবী-রাসূলগণ, নেককার সালেহিনগণ, অলি আওলিয়াগণ, শহিদগণ কিংবা সিদ্দিকীনদের শরণাপন্ন হওয়া বা শাফায়াতের জন্যে তাদেঁর সহায়তা নেওয়া আমাদের এবং আমাদের আলেম সমাজের দৃষ্টিতে জায়েয, চাই তাঁরা জীবিতই থাকুন কিংবা মৃত-তাতে কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ যে দোয়ার মাঝে বা মুনাজাতে বলে: হে খোদা! অমুকের ওসিলায় তুমি আমার দোয়াটুকু কবুল করে নাও! আমার চাহিদা পূরণ করো-তাতে দোষের কিছু নেই।”

আরেকজন বিখ্যাত মনীষী হলেন বায়হাকি। তিনি বর্ণনা করেন: দ্বিতীয় খলিফার খেলাফতের সময় এক বছর খুব খরা গিয়েছিল। সে সময় হযরত বেলাল কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলে খোদা (সা) এর রওজা মোবারকে গিয়ে বললেনঃ “হে রাসূলে খোদা (সা)! তোমার রবের কাছে তোমার উম্মাতের জন্যে বৃষ্টি চাও…নৈলে ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে।” নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট ইসলামী মনীষী আলী ইবনে আহমাদ সামহুদি তাঁর লেখা ভাফাউল ভাফা গ্রন্থে লিখেছেনঃ “আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করা বা শাফায়াতের আবেদন করার জন্যে রাসূলে খোদার শরণাপন্ন হওয়া,তাঁর সুমহান ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার আশ্রয় নেওয়া তাঁর জন্ম-পূর্ববর্তীকাল, জন্ম-পরবর্তীকাল,তাঁর মৃত্যুর পর, আলমে বারজাখের সময় এবং পুনরুত্থান দিন-সবসময়ই জায়েয।”

এরপর হযরত আদম (আ) এর তাওয়াসসুল বা ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর শরণাপন্ন হবার বিখ্যাত বর্ণনাটিও উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক ঐ বর্ণনাটি এসেছে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) থেকে। হযরত ওমর (রা) বলেছেনঃ হযরত আদম (আ) অবহিত হয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে ইসলামের নবী (সা) পৃথিবীতে আসবেন, তিনি তাই আল্লাহর দরবারে আরজি পেশ করলেন এভাবেঃ “হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সা) এর ওসিলায় তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।” ইসলামে শাফায়াতের বিষয়টি আল্লাহর সাথেই সম্পর্কিত তবে আল্লাহর অনুমতিক্রমে অন্যান্যরাও শাফায়াতের আবেদন করতে পারেন। সূরা মারিয়ামের ৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “যে দয়াময় আল্লাহ্র কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে, সে ব্যতীত আর কেউ সুপারিশ করার অধিকারী হবে না।” একইভাবে সূরা ত্বা-হা’র ১০৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “দয়াময় আল্লাহ্ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় সন্তূষ্ট হবেন সে ছাড়া কারও সুপারিশ সেদিন কোন উপকারে আসবে না।”
এখন প্রশ্ন হলো আল্লাহ কেন তাঁর কোনো কোনো আওলিয়াকে শাফায়াতের অনুমতি দিলেন? এর উত্তর হলো মানুষের মাঝে তাদেঁরকে মর্যাদাবান হিসেবে তুলে ধরা। নবীজী বলেছেনঃ “তিনিটি দল আল্লাহর কাছে শাফায়াত করবে। নবীগণ, আলেমগণ এবং শহীদগণ।” তবে সেইসব পাপীই আওলিয়াদের শাফায়াতের আশা করতে পারে যারা নিজেদের গুনাহর কারণে অনুতপ্ত হয়ে যথার্থই তওবা করে এবং তারপর নবী-রাসূলদের প্রদর্শিত পথে ঠিকঠাকমতো চলে।

তাওয়াসসুল একটি বহুল পরিচিত শব্দ। তাওয়াসসুল একটি দোয়ার উপায়। তাওয়াসসুল আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হবার একটি দরোজা। পারিভাষিক অর্থে বান্দার হাজত পূর্ণ করার জন্যে আল্লাহর কাছে কোনো বস্তু কিংবা ব্যক্তিত্বকে মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করানোই হচ্ছে তাওয়াসসুল। ইসলামে এসেছে মানুষ তিনটি উপায়ে আল্লাহর কাছে তাওয়াসসুল অন্বেষণ করতে পারে।

এক, নিজের ব্যক্তিগত নেক আমলের সাহায্যে। অর্থাৎ বান্দা তার নেক আমলগুলোকেই আল্লাহ এবং তার মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টিকারী মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করাতে পারে এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারে ঐ আমলগুলোর ওসিলায় যেন আল্লাহ তার হাজত পূর্ণ করে দেন।

তাওয়াসসুলের দ্বিতীয় উপায়টি হলো আল্লাহর মনোনীত এবং প্রিয় বান্দাদের দোয়াকে তাওয়াসসুল বা মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করানো। তার মানে হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দাদের কাছে তার জন্যে দোয়া চাওয়ার আবেদন করা। যেমনটি পবিত্র কোরআনে হযরত ইউসুফ (আ) এর গল্পে আমরা লক্ষ্য করবোঃ

ইউসুফ (আ) এর ভাইয়েরা যখন তাদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত হলো তখন তারা গেল তাদের পিতা হযরত ইয়াকুব (আ) এর কাছে। পবিত্র কোরআনে সূরা ইউসুফে এই ঘটনার বিবরণ রয়েছে। ইউসুফের ভাইয়েরা তাদের পিতাকে বললোঃ “হে পিতা! মহান আল্লাহর কাছে আমাদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো। বলো যে আমরা ভুল করে ফেলেছি।” ইয়াকুব (আ) জবাবে বললেনঃ “আমি শীঘ্রই আমার পরোয়ারদেগারের দরবারে তোমাদের জন্যে ক্ষমার আবেদন জানাবো। আল্লাহ অনেক ক্ষমাশীল এবং মেহেরবান।” এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় হযরত ইয়াকুব (আ) এর সন্তানেরা দোয়া এবং এস্তেগফারের জন্যে তাদের পিতার শরণাপন্ন হয় এবং তাকেঁ তাদের ক্ষমার ওসিলা হিসেবে সাব্যস্ত করে।
তাওয়াসসুলের তৃতীয় উপায়টি হলো আল্লাহর কাছে যাদের বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে সেইসব ব্যক্তিত্বদের শরণাপন্ন হওয়া বা তাদেরকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা। নবীজীর সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও এ ধরনের তাওয়াসসুলের উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়।

কোনো মুসলমানই নেক আমলের সাহায্যে আল্লাহ তায়ালার সাথে তাওয়াসসুলের বৈধতার ব্যাপারে সন্দেহ করে না।
অথচ ওহাবিদের বিশ্বাস তাওয়াসসুল প্রার্থীর উচিত নয় কোনো ব্যক্তির শরণাপন্ন হওয়া এবং এরকম বলাঃ ‘হে খোদা! আমি তোমার পয়গাম্বরের ওসিলায় তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি।’ ওহাবি মতবাদের দৃষ্টিতে এ ধরনের তাওয়াসসুল করা ভুল এবং এ ধরনের আমল যারা করে তাদেরকে তারা মুশরিক বলে মনে করে। অথচ আহলে সুন্নাতের অনেক বড়ো বড়ো আলেমের বক্তব্য এবং লেখালেখিতেও রাসুলে খোদা (সা) এর প্রতি তাওয়াসসুল করার ব্যাপারে বহু বর্ণনা রয়েছে। তাদেঁর লেখায় কখনোই এ ধরনের তাওয়াসসুলকে শিরক বলে উল্লেখ করা হয় নি।
 

Share

2 COMMENTS

    • সালামুন আলাইকুম, জনাব মাইনুদ্দীন মজুমদার
      আশা করি মহান আল্লাহর একান্তু অনুগ্রহে আপনি এবং আপনার পরিবারের সকলেই সুস্থ ও সুন্দর আছেন। আমরা যখনই নিজের মতবিরোধী কোন কিছু শুনি তখন একজন পাক্কা মুসলমান মানুষের উচিত পবিত্র কোরআন থেকে সুন্দর যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করা। কারণ হুমকী ও পেশীশক্তির জোর দেখিয়ে আপনি একজন নীরিহ মানুষকে হত্যা করতে পারবেন কিন্তু তার বলিষ্ঠ চিন্তাকে নয়। তাই আসুন ইসলাম বিরোধী কেন লেখাকে কুরআনের আলোকে খন্ডন করি তাহলে গুমরাহ চিন্তা ও ঐ চিন্তার অনুসারীরাও মারা যাবেন।
      ভুল হলে আমরাকে সংশোধন করে দিবেন।
      ফি আমানিল্লাহ

LEAVE A REPLY