ওহাবী বা সালাফী মাযহাবের নেপথ্য

0
683

ওহাবী বা সালাফী মাজহাবের গোপন কথা ( 2 )

ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারার অন্যতম প্রচারক মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব বলেছিলেন ‘ যারা ফেরেশতা, পয়গাম্বর এবং আল্লাহর অলিদের প্রতি তাওয়াসসুল করে এবং তাদেঁরকে নিজেদের শাফায়াতকারী হিসেবে চিন্তা করে কিংবা তাদেঁর ওসিলায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করে, তাদেরকে হত্যা করা বৈধ এবং তাদের মালামাল মোবাহ।” মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব তার এই মনগড়া চিন্তাধারার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন এবং কোনোরকম প্রমাণপঞ্জী ছাড়াই নিজের বিচ্যুত চিন্তাধারাকে ইসলামের ধর্মীয় চিন্তা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ ‘ ইসলাম সকল মাজহাব এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তার মাঝে তৃতীয় কাউকে মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করাবে এবং ঐ মাধ্যমের কথা উল্লেখ করবে, সে কাফের এবং মুরতাদ,তার রক্ত হালাল এবং তার ধন-সম্পদ মোবাহ।”

নবীজীর প্রতি তাওয়াসসুল সম্পর্কে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেইখ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লা..আশ শেইখ মনে করেন, মৃত্যুর পর যেহেতু এই পৃথিবীর সাথে নবীজীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং কোনো কাজ করার শক্তি থাকে না, এমনকি কারো জন্যে দোয়া পর্যন্ত করতে পারে না, এককথায় সর্বপ্রকার কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তাই অক্ষমের প্রতি তাওয়াসসুল করা বিবেক-বুদ্ধি অনুসারে বাতিল এবং শের্‌ক হবে।” ওহাবি আলেমরা চেষ্টা করছেন কেবল শিয়াদেরকেই নবীজী এবং তাঁর আহলে বাইতের সাথে তাওয়াসসুলকারী হিসেবে দেখাতে এবং তাদেরকে নিকৃষ্টতম কাফের হিসেবে সাব্যস্ত করতে। ওহাবিদের ফতোয়া জারির প্রধান কেন্দ্র সৌদি ইফতা পরিষদ শিয়াদের সাথে বিয়ের ব্যাপারে দেওয়া এক প্রশ্নের জবাবে ফতোয়া দিয়ে লিখেছেঃ শিয়া এবং কমিউনিস্টদের সাথে আহলে সুন্নাতের বিয়ে বৈধ নয় আর যদি বিয়ে হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে,কেননা শিয়ারা আহলে বাইতের প্রতি তাওয়াসসুলকারী, আর এটা মস্ত বড়ো শেরেকি।
অথচ ইহুদি খ্রিষ্টানদের সাথে বিয়ের ব্যাপারে তাদের দেওয়া ফতোয়া হলোঃ ‘ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান যদি ব্যভিচারী না হয়ে থাকে তাহলে আহলে কিতাব হবার কারণে তাদের সাথে মুসলমানদের বিয়ে জায়েয।’ এখানে আশ্চর্যজনক এবং দুঃখজনক বিষয়টি হলো এই যে ইসলামী পরিভাষায় আলেম নামধারীগণ ইহুদি নাসারার সাথে বিয়েকে বৈধ বলে মনে করে অথচ কোরআন এই দুই দলকে কাফেরদের সারিতে স্থান দিয়ে বলেছেঃ ইহুদীরা বলে ওযাইর আল্লাহ্ পুত্র এবং নাসারারা বলে ‘মসীহ আল্লাহ্ পুত্র’। এ হচেছ তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ্ এদের ধ্বংস করুন, এরা কীভাবে সত্য পথ থেকে বিচ্যুতির পথে চলে যাচেছ? শিয়াদের ব্যাপারে ওহাবিরা কুফুরির অভিযোগ এনে তাদের রক্তকে হালাল বলে ঘোষণা করলেও বাস্তবতা হলো এই যে,আল্লাহর একত্ব, নবী কারিম (সা) এর রেসালাত, কোরআনের প্রতি ঈমান, পরকালের প্রতি ঈমান ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোর ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের সাথে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি এক ও অভিন্ন।
তাওয়াসসুল নিয়ে ওহাবিদের এ ধরনের চিন্তা আসলে একান্তই ভ্রান্ত। কেননা কোরআন এবং কোরআনের বর্ণনার সাথে পরিচিত সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, তাওয়াসসুল তৌহিদের সাথে তো বৈপরীত্যময় কিংবা অসংলগ্ন নয় ই, বরং আল্লাহর দরবারে দোয়া করা এবং তাঁর নৈকট্য লাভের অন্যতম একটি উপায়ও বটে। প্রত্যেক মুসলমানই জানেন আল্লাহ তায়ালা একক এবং স্বাধীন সত্ত্বা। বিশ্বের সকল কিছুর মূলে রয়েছেন তিনি। বিশ্বের সকল আবিষ্কার-উদ্ভাবনী তাঁরই ইচ্ছায় কার্যকরী হয়। কোরআনে কারিমে রাসূলে খোদা (সা) কে সম্বোধন করে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছেঃ ‘আর যুদ্ধে যখন তুমি তীর নিক্ষেপ করেছিলে, আসলে তা তো তুমি নিক্ষেপ করো নি, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং।’ (সূরা আনফালঃআয়াত-১৭)
এ আয়াতে নবীজীর তীর নিক্ষেপের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আল্লাহর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার মানে ঐ তীর আল্লাহ এবং তাঁর পয়গাম্বর উভয়েই নিক্ষেপ করেছেন। এ আয়াতের মাধ্যমে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে সকল কাজেরই মূল কর্তা হলেন আল্লাহ,তাঁর ইচ্ছাতেই সকল কাজ সংঘটিত হয়, এদিক থেকে নবীজী হলেন কাজের একটি মাধ্যম,বলা যায় কাজ সমাধা করার গৌণ মাধ্যম,মূখ্য নন,মূখ্য হলেন আল্লাহ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেউ কলম দিয়ে কিছু একটা লিখলো। এখানে কলম হচ্ছে লেখার একটা মাধ্যম যা দিয়ে মানুষ লেখার কাজ করে থাকে। এখন কলম আর লেখক ব্যক্তিটিকে কি একই কাতারে দাঁড় করানো যায়? কিংবা এ দুয়ের মর্যাদা বা অবস্থান কি এক? দুঃখজনকভাবে ওহাবিরা তাওয়াসসুলকে শাফায়াতের মতোই ভুল বুঝেছেন। তারা মাধ্যমকে অদ্বিতীয় স্রষ্টার সাথে একই কাতারে শামিল করে ফেলেছেন। এ কারণেই তারা মুসলমানদেরকে মুশরিক বলে সাব্যস্ত করেছেন। অথচ তাওয়াসসুল মানে রাসূলে খোদা (সা) কে একক এবং অদ্বিতীয় আল্লাহর দরবারে পবিত্র একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা বোঝায়, কোনোভাবেই আল্লাহর সাথে নবীজীকে শরিক করা বেোঝায় না।
আল্লাহর নৈকট্য লাভ ইবাদাত বন্দেগির পথে মানুষের সবোর্চ্চ সাফল্য। সূরা মায়েদার পঁয়ত্রিশ নম্বর স্পষ্ট করে বলা হয়েছে কোনো মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যাবে না। বলা হয়েছেঃ”হে মুমিনগণ! আল্লাহ্কে ভয় কর,আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকো! তাঁর নৈকট্য লাভের জন্যে ওসিলা অন্বেষণ কর এবং তাঁর পথে জেহাদ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও।” এই আয়াতে ঈমানদারদের সাফল্যের লক্ষ্যে তিনটি বিশেষ আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশ তিনটি হলোঃ তাকওয়া এবং পরহেজগারী, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার উদ্দেশ্য একজন ওসিলা অন্বেষণ করা এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা। কিন্তু এ আয়াতে ওসিলা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এখানে আসলে ওসিলার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। তবে সর্বাবস্থাতেই এমন কোনো বস্তু কিংবা ব্যক্তিকে বোঝায় যা বা যিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ হবেন।
এখানে বস্তু বলতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান, জিহাদ, নামায, রোযা, আল্লাহর ঘরের যিয়ারত, দান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইত্যাদিকেও বোঝায়, এগুলোর সবই আল্লাহর নৈকট্য লাভের ওসিলা হতে পারে। রাসূলে খোদা (সা), ইমামগণ, আল্লাহর নেক বান্দাগণের প্রতি তাওয়াসসুলও সে ধরনেরই ইবাদাতের শামিল, কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ হতে পারে। শ্রোতাবন্ধুরা! এ নিয়ে আরো কথা বলার ইচ্ছে রইলো পরবর্তী আসরে। আজ আর সময় নেই। যারা সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।#
পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে এসেছে নবী করিম (সা) নিজেও বান্দাদের প্রতি দয়া ও মহানুভবতা প্রকাশ করেন। সূরা তাওবার ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ”আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তার প্রতি যদি তারা সন্তুষ্ট থাকতো,এবং যদি বলতো আল্লাহ আমাদের জন্যে যথেষ্ট,শীঘ্রই আল্লাহ এবং তার পয়গাম্বর তাদেঁর অনুগ্রহ আমাদের প্রতি আরো দান করবেন এবং আমরা আল্লাহর প্রতি আগ্রহী হয়ে রইলাম, তবে তাদের জন্যে তা অবশ্যই উত্তম হতো।”এখানে স্বয়ং কোরআনই রাসূলে খোদা (সা)কে দয়ালু এবং দাতা হিসেবে পরিচয় করেছেন। তাহলে আমরা কেন তাঁর কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করবো না কিংবা তাঁর মহান অবস্থান ও মর্যাদার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করবো না?  
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা নিসা’র ৬৪ নম্বর আয়াতে নবীজীর শাফায়াত লাভ করা এবং তার প্রতি তাওয়াসসুল করার জন্যে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং নবীজীকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ “যদি তারা স্বীয় জীবনের ওপর অত্যাচার করার পর তোমার নিকট আগমন করতো, তারপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতো, আর রাসূলও তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতেন, তবে নিশ্চয়ই তারা আল্লাহকে তওবা কবুলকারী এবং করুণাময় হিসেবেই পেতো।”
ওহাবিরা তাওয়াসসুলকে রদ বা প্রত্যাখ্যান করার দলিল হিসেবে কোরআনের বহু আয়াত উদ্ধৃত করেছেন। যেমন সূরা ফাতিরের চৌদ্দ নম্বর আয়াত,যেখানে বলা হয়েছেঃ “তোমরা তাদেরকে আহ্বান করলে তারা তোমাদের আহ্বান শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের আহ্বানে সাড়া দেবে না,তোমরা তাদেরকে যে শরিক করেছো তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞানী,সর্ববিষয়ে সচেতন আল্লাহ ছাড়া আর কেউই তোমাকে সত্যাসত্যের ব্যাপারে অবহিত করতে পারে না।” এই সূরাতে মূর্তি পূজকদের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি আয়াত এসেছে, এসব আয়াতেও মূর্তি পূজা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা মূর্তিগুলো না তাদের পূজাকারীদের চাহিদা বা প্রার্থনাগুলো শুনতে পায়, কিংবা শুনতে পেলেও না তারা তাদের পূজকদের কোনো সমস্যা নিরসণ করার শক্তি রাখে, না এই সৃষ্টি জগতের ওপর তাদের বিন্দুমাত্র ক্ষমতা আছে। কিন্তু ওহাবিদের একদল নবীজী এবং আল্লাহর আরো অনেক মহান বান্দার সাথে মানুষের তাওয়াসসুল করাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্যে এই আয়াতসহ এরকম আরো কিছু কিছু আয়াত উদ্ধৃত করে বলেনঃ কোরআন বলছে, আল্লাহ ছাড়া আর যাকেই ডাকো না কেন-এমনকি পয়গাম্বরকেও-তারা তোমাদের কথা শোনে না, কিংবা শুনলেও তা মঞ্জুর করতে পারে না।
ওহাবিরা সূরা আরাফের ১৯৭ নম্বর আয়াতেরও উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে। যেখানে বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা তোমাদের সাহায্য করার কোনো ক্ষমতা রাখে না, এমনকি তারা নিজেদেরকেও সাহায্য করতে পারে না।” এ ধরনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে সালাফিরা নবীজী কিংবা ইমামদের রুহের ওপর তাওয়াসসুল করাকে তৌহিদের বিরোধিতা বলে মনে করে। অথচ এসব আয়াতের প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যাবে আয়াতগুলোতে মূর্তির কথা বলা হয়েছে, যেসব মূর্তি কাঠ পাথরের তৈরি এবং সেগুলোকে তাদের পূজকরা আল্লাহর সাথে শরিক করেছিল,যাদের প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর বরাবরে বিন্দুমাত্র শক্তিও নেই।
এ কথা কে না জানে যে, নবী-রাসূল, অলি-আওলিয়া, আল্লাহর পথে শহীদগণকে পবিত্র কোরআন সুস্পষ্টভাবে জীবিত বলে উল্লেখ করেছে! তাঁরা বারযাখি জীবনের অধিকারী। আর বারজাখি জীবনে রুহ বা আত্মার তৎপরতা অনেক বেশি বিস্তৃত কেননা পার্থিব জগতের বস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক থেকে আত্মাগুলো পুরোপুরি মুক্তি লাভ করেছে। অপরদিকে নিঃসন্দেহে পবিত্র আত্মার প্রতি তাওয়াসসুল করার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর সামনে তাদের স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে প্রতিস্থাপন করা, বরং আল্লাহর কাছে তাদেঁর যে সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে বা আল্লাহর কাছে তাদের যে ঘনিষ্ট অবস্থান রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করা। তবে হ্যাঁ! কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউই শাফায়াতের আবেদন করবেন না। ঠিক সেভাবেই বিশ্ব প্রতিপালকের অনুমতি ছাড়া কারো প্রতি তাওয়াসসুল করার বিষয়টিও সংঘটিত হবে না। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবীজীর মাধ্যমে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছেনঃ “মনে রেখো! যাদের চাহিদা বা অভাব অভিযোগ আছে, কিংবা কোনোরকম দুরবস্থায় পড়ে এখন তা থেকে মুক্তি আশা করছে, তাদের উচিত মুহাম্মাদ (সা) এবং তাঁর পবিত্র আহলের মাধ্যমে আমাকে ডাকা,যাতে সবোর্ত্তম উপায়ে তাদের চাহিদাগুলো মেটানো যায়।”
এ কারণেই নবীজীর সাহাবায়ে কেরাম এবং অন্যান্য বুযুর্গানে দ্বীনের জীবনীতে লক্ষ্য করা যাবে, যে কোনো সমস্যায় পড়লে তাঁরা রাসূলে খোদার কবরের পাশে গিয়ে তাওয়াসসুল করতেন এবং রাসূলের পবিত্র আত্মার মাধ্যমে পরোয়ারদেগার আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। এ সম্পর্কে শিয়া এবং সুন্নিদের নির্ভরযোগ্য বহু গ্রন্থে অনেক বর্ণনা রয়েছে। রাসূলে খোদা (সা) এর স্ত্রী হযরত আয়েশার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বর্ণনা রয়েছে। দারমি’র লেখা ‘সহিহ’ গ্রন্থে আবুল জাওযা থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, এক বছর মদিনায় প্রচণ্ড খরা দেখা দিয়েছিল। আয়েশা তখন জনগণকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তারা যেন এই খরা থেকে মুক্তি পাবার জন্যে পয়গাম্বরের প্রতি মুতাওয়াসসিল হয়। জনগণ তা-ই করে এবং সেই বছর ব্যাপক বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল।
সহিহ বোখারিতে এসেছে,দ্বিতীয় খলিফা খরা এবং দুর্ভিক্ষের সময় নবীজীর চাচা আব্বাসের প্রতি তাওয়াসসুল করে বলেছিলেনঃ”হে আল্লাহ! রাসূলে খোদার জীবিতাবস্থায় আমরা খরার কবলে পড়লে তাঁর প্রতি তাওয়াসসুল করতাম আর রহমতের বৃষ্টি নাযিল হতো। এখন তাঁর চাচাকে আমরা বৃষ্টির জন্যে আবেদনের ওসিলা করেছি। হে আল্লাহ আমাদেরকে তুমি পানিতে পরিপূর্ণ করে দাও!” বোখারি লিখেছেন, এই তাওয়াসসুলের পর বৃষ্টি নাযিল হয়েছিল। বিশিষ্ট মুফাসসির আলূসিও তাঁর বইয়ের বহু অংশে তাওয়াসসুল সংক্রান্ত অনেক বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর সেইসব বর্ণনার সারসংক্ষেপ হলো রাসূলে খোদার প্রতি তাওয়াসসুল করার মাঝে কোনো বাধা নেই-না তাঁর জীবিতাবস্থায় কিংবা রেহলাতের পর। নবীজী ছাড়া অন্যদের প্রতিও তাওয়াসসুল করার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই, তবে শর্ত হলো আল্লাহর দরবারে সত্যিকার অর্থেই তাঁর মর্যাদা থাকতে হবে।#
ইসলামে যিয়ারতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যিয়ারত মুসলমানদের ইবাদাতের কর্মসূচিগুলোর একটি। তাঁরা শাফায়াতের প্রতি বিশ্বাস অনুযায়ী তাওয়াসসুল এবং পূত-পবিত্র ব্যক্তিত্ববর্গের কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে তর্কাতীত বিষয় বলে মনে করে। যদিও ইবনে তাইমিয়ারা নবীজীর কবর যিয়ারত করাকে হারাম বলে মনে করে। যাই হোক,বিষয়টি নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো।
আগেকার দিনে হাজিগণ রাসূলে খোদার চাচা এবং ওহুদ যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ শহীদ হামযা’র কবরের মাটি দিয়ে তাসবিহ তৈরি করতেন। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দির একজন বিখ্যাত কবি খাকানি শেরবানি রাসূলের নামকরা সাহাবি সালমানের মাযার যিয়ারতকারীদের উদ্দেশ্যে তাঁর লেখা একটি কবিতায় উপদেশ দিয়েছেন, সালমানের কবরের মাটি দিয়ে তাসবিহ তৈরি করতে, কেননা এই মহান সাহাবির কবরের পবিত্র মাটির একটা আধ্যাত্মিক মূল্য রয়েছে। তিনি লিখেছেনঃ
মক্কা থেকে সবাই নেয় হামযার কবরের মাটির তাসবিহ
তুমিও নাও মাদায়েন থেকে সালমানের কবরের তাসবিহ
এই ধরনের বক্তব্যের কারণে কোনো মুসলমান তো গোলোযোগ করতোই না বরং মক্কার অগ্রজেরা খাকানির কসিদাকে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতেন। কিন্তু সালাফিয়া মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে তাইমিয়া নবীজী (সা) এর কবর যিয়ারত করাকে এমনকি যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করাকেও হারাম বলে ঘোষণা করেছে।
ইবনে তাইমিয়া তার মিনহাজুস সুন্নাহ নামক গ্রন্থে কোনো দলিল প্রমাণ ছাড়াই লিখেছেনঃ “যিয়ারত সম্পর্কে নবীজীর যেসব হাদিসের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে সেগুলোর সবই মিথ্যা এবং বানোয়াট, ঐ হাদিসগুলোর সনদ সবই দুর্বল বা জায়িফ।”
ইবনে তাইমিয়া আরো বলেছেনঃ “নবীজী কিংবা অন্য কারো কবর যিয়ারত করার অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা এবং আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করা,তাই এ ধরনের কাজ পুরোপুরি হারাম এবং শির্ক।”
যদিও নবীজী কিংবা বুযুর্গানে দ্বীনের কবর যিয়ারত করা হয় আল্লাহর কাছে তাদেঁর উচ্চ মর্যাদার কারণে,আল্লাহর সাথে তাদেঁরকে তুলনা করে নয়। ইবনে তাইমিয়া এবং ওহাবি ফের্কার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব শিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরোপ করেছে যে, শিয়ারা তাদের ইমামদের মাযার যিয়ারত করাকে আল্লাহর ঘর কাবার হজ্ব করা থেকেও বড়ো বলে মনে করে।
মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব “কাশফুশ শাবহাত” নামক বইতে নবী, আউলিয়া এবং আহলে বাইতের ইমামদের কবরের প্রতি শিয়াদের সম্মান প্রদর্শন করাকে অজুহাত বানিয়ে তাদেরকে শির্ক এবং বহু খোদায় বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ইবনে তাইমিয়া, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব এবং তাদের অনুসারীদের সবচে বড়ো একটি দুর্বলতা হলো নিজেদের জ্ঞানগত বিভ্রান্তি। তারা দ্বীন সম্পর্কে তাদের অপরিপক্ক জ্ঞান এবং বিচ্যুত মানদণ্ড দিয়েই অন্যদের শেরেকি বা একত্ববাদ বিচার করে থাকে। তারা দ্বীন সম্পর্কে তাদের ভুল উপলব্ধি, ভ্রান্ত জ্ঞান বা ধারণাকে অন্যদের আকিদা-বিশ্বাসের ওপর চাপিয়ে দেয়। অথচ কোরআনে কারিম, বিভিন্ন বর্ণনা এবং ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়া বা রায় ওহাবিদের চেয়ে ভিন্ন।
যিয়ারত সম্পর্কে স্বয়ং নবী করিম (সা) এর একটি হাদিস হলোঃ “বেশি বেশি কবর যিয়ারত করবে যাতে পরকালীন পৃথিবীর কথা মনে জাগে।” আরেকটি হাদিস এরকমঃ “কবর যিয়ারতে যাবে কেননা তার মাঝে তোমাদের জন্যে রয়েছে দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা।”
মানুষ কবর যিয়ারত করতে গেলে নিজেদের স্বাভাবিক দুর্বলতার বিষয়টি উপলব্ধি করে। বস্তুগত শক্তি সামর্থের নশ্বরতা খুব কাছে থেকে টের পায়। বিচক্ষণ মুসলমান যাঁরা তাঁরা কবর দেখে বুঝতে পারেন দ্রুত ক্ষীয়মান এই পার্থিব জীবনকে অবহেলায় কাটিয়ে দেওয়া ঠিক নয় বরং অনন্ত জীবনের পাথেয় সঞ্চয়ে সচেষ্ট হওয়া উচিত।
রাসূলে খোদা (সা) কিংবা তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ইমামদের কবর যিয়ারতকালে যিয়ারতকারীগণ প্রকৃতপক্ষে তাদেঁর সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন যে, জীবনে তাদেঁর প্রদর্শিত পথ ছাড়া আর কোনো পথে পা বাড়াবেন না। নিঃসন্দেহে কবর যিয়ারত হচ্ছে রাসূলের সুন্নাত। অনেক হাদিস গ্রন্থে এসেছে রাসূলে খোদা (সা) মা আমেনার কবর যিয়ারত করতে গিয়ে কান্নাকাটি করতেন। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলে খোদা (সা) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করে নিজেও কেঁদেছেন এবং অন্যদেরকেও কাদিয়েঁছেন, তারপর বলেছেন… “কবরগুলোকে যিয়ারত করবে,কেননা কবর যিয়ারত করলে মৃত্যুর কথা মনে পড়ে।” সূরা তাকাসুরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একদল মুশরিকের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যারা কবর যিয়ারত করতে গেছে কিন্তু শিক্ষা নেওয়ার জন্যে নয়। এই সূরার ১ এবং ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “আত্মগৌরব এবং প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে দূরে রেখেছে। তোমরা কবর যিয়ারত করতে গেছো এবং তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের কবরগুলো গুনেছো।” আল্লাহ মৃতদের সংখ্যা বা কবর গণনার মাধ্যমে গর্ব করাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তবে তাদের যিয়ারত করাকে কোনোভাবেই নিষেধ করেন নি।
হিজরি সপ্তম শতাব্দির বিখ্যাত মুফাসসির মুহাম্মাদ কুরতাবি এই আয়াত দুটির ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ “কঠিন হৃদয়গুলোর জন্যে কবর যিয়ারত হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম ঔষধ। কারণ যিয়ারত তাদেরকে আখেরাত এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে আর মৃত্যু ও আখেরাতের কথা স্মরণ হলে দুনিয়াবি চাওয়া পাওয়া হ্রাস পাবে এবং দুনিয়ায় থাকার আগ্রহ দূর হবে।”
নবীজীর কবর যিয়ারত সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার সামগ্রিক বক্তব্য থেকে কয়েকটি পয়েন্ট বেরিয়ে আসে। যেমন নবীজীর কবর যিয়ারত করা বেদআত এবং হারাম। যারা নবীজী কিংবা অপর কোনো নেককার বান্দার কবর যিয়ারত করার লক্ষ্যে সফরে বের হয়, তারা হারাম কাজের উদ্দেশ্যে সফরে বেরিয়েছে, তাদের উচিত তাদের নামায (কসর না করে) পূর্ণ করা। এ ধরনের সফরকে তিনি গুনাহের কাজ বলেও মনে করেন। ইবনে তাইমিয়ার এ ধরনের কথাবার্তা কেবল যে ভিত্তিহীন এবং বাতিল তাই নয় বরং বেয়াদবিপূর্ণও বটে।
ইবনে হাজার আসকালানিসহ বহু ফকিহ ইবনে তাইমিয়ার এসব বক্তব্য খণ্ডন করে রাসূলের বহু হাদিসের উদ্ধৃতিত দিয়ে গ্রন্থ লিখেছেন। এসব হাদিস ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লা ইবনে ওমর, আনাস ইবনে মালিক, ইবনে আসাকিরের মতো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো আজকের আলোচনা। নবী করিম (সা) বলেছেনঃ “যে-কেউ যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে মদিনায় আসবে এবং আমাকে যিয়ারত করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে শাফায়াত করবো এবং তার পক্ষ্যে সাক্ষ্য দেবো।
বলাবাহুল্য, নবীজীর অনেক সাহাবি এবং তাবেয়িন যুগ যুগ ধরে নবীজীর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করেছেন। তাই রাসূলে খোদার কবর যিয়ারত করা হারাম-ইবনে তাইমিয়া কিংবা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহহাবের এরকম বক্তব্য মেনে নেওয়ার মানে হলো হালালকে হারাম বলে সাব্যস্ত করা,যা অনেক বড়ো গুনাহের কাজ। আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক উপলব্ধি দান করুন।
মুসলমানরা সবসময়ই দ্বীনের মহান মনীষীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদেঁরকে স্মরণ করে এসেছে। তাঁরা নবী করিম (সা) এবং আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক সৃষ্টিকারীদেরকে নিজেদের শাফি অর্থাৎ শাফায়াতকারী বলে মনে করেন। সেজন্যেই তাদেঁর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন।
যিয়ারত হলো মূলত সেইসব নেককার মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহর কাছে যাঁরা সম্মানিত এবং মর্যাদাবান। এ ধরনের ব্যক্তিত্বদের প্রতি সম্মান দেখানো, তাদেঁর মাযারের যারিহ বা লোহার বেষ্টনীতে চুম্বন করা, তাদেঁর হারামে দোয়া করা, নামায পড়া ইত্যাদি সবই আল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করা বা তাঁর নৈকট্য অর্জন করার লক্ষ্যেই করা হয়ে থাকে, আল্লাহর সাথে শরিক করার জন্যে নয়। যেহেতু রাসূলে খোদা (সা), তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের অবস্থান আল্লাহর দরবারে খুবই ঘনিষ্ট সেজন্যে মুসলমানরা তাদেঁর কবর যিয়ারত করার জন্যে বেশি আগ্রহী। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আমিনী তাঁর “সিরাতানা ওয়া সুন্নাতান” নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ “মদিনা মুনাওয়ারা যে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হারাম হিসেবে পরিগণিত এবং সুন্নাতে নববীতেও মদিনা শরিফ, সেখানকার মাটি এবং বাসিন্দারা এমনকি সেখানে যাদেঁরকে দাফন করা হয়েছে তাঁদেরকে অনেক উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বলে মূল্যায়ন করা হয়, সেটা নবীজী এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের কারণে। একইভাবে নবীজী, আল্লাহর আউলিয়া এবং অসিদের সাথে কিংবা সিদ্দিকিন, শুহাদাসহ খাটিঁ মুমিনদের সাথে সম্পর্কের কারণেও সম্মান ও মর্যাদা বাড়ে।”
আসলে যিয়ারত মানে কেবল মাযারের ইট পাথর যারিহ গম্বুজ তথা বাহ্যিক দিকটাই নয়-যেমনটি ওহাবিরা মনে করে-বরং যিয়ারতের মধ্যে রয়েছে গোপন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা তথা আল্লাহর প্রতি ইমানের গভীরতা ইত্যাদি। যে তার প্রিয়জনকে হারায় বিভিন্ন কারণে তাকে ভুলতে পারে না,তাই বিচিত্র অনুষ্ঠানে তাকে স্মরণ করে এবং তার মাযারে হাজির হয়। প্রিয়জনকে হারানোর ব্যথায় কান্নাকাটি করা মানুষের মধ্যকার সাধারণ একটি রীতি যেই প্রবণতাটি মানুষের প্রকৃতিগত বা স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। সহিহ বোখারি শরিফের সংকলক বোখারি (রহ) লিখেছেনঃ “নবী (সা) এক মহিলাকে একটি কবরের পাশে দেখলেন কান্নাকাটি করছে। তিনি মহিলাকে বললেনঃ “বিরত থাকো এবং প্রিয়জনের দূরত্বে ধৈর্যধারণ করো।” নবীজী বলেন নি তুমি যা করছো তা হারাম, বরং তিনি ঐ মহিলাকে সুস্পষ্টভাবে ধৈর্য ধরার আদেশ দিয়েছেন, যিয়ারত করা থেকে দূরে থাকতে বলেন নি, অথচ সালাফিয়ারা মহিলাদের যিয়ারত করাকে হারাম ঘোষণা করেছে।
হযরত আলি (আ) থেকে বর্ণিত আছেঃ নবী করিম (সা) কে যখন দাফন করা হলো, ফাতেমা (সা) তখন তাঁর কবরের পাশে দাঁড়ালেন এবং কবরের সামান্য একটু মাটি নিয়ে চেহারায় মাখলেন আর কান্নাকাটি করতে করতে দুটি পংক্তি আবৃত্তি করলেন। পংক্তি দুটির বঙ্গানুবাদ এরকমঃ
আহমাদের কবরের মাটি শুঁকবে যে একবার
প্রয়োজন নেই জীবনে তার দামি সুগন্ধি নেয়ার
মস্ত বিপদ এসে ভর করেছে আমার পর
উজ্জ্বল দিনও যেন হয়ে যায় রাতের আঁধার॥
আল্লাহ তায়ালা যাকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন তাঁর প্রতি সম্মান দেখানোটা বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও যুক্তিযুক্ত এবং পূণ্যময়, আর যিয়ারত করা এক ধরনের সম্মান প্রদর্শনেরই নামান্তর মাত্র। আল্লামা মাহদি নারকি তাঁর “জামেউস সাআদাত” নামক গ্রন্থে যিয়ারত সম্পর্কে লিখেছেনঃ”জেনে রাখো,পয়গাম্বরগণ কিংবা ইমামদের রুহ মোবারক মৃত্যুর পরও…পার্থিব জগতের ওপর সক্রিয় থাকে। পার্থিব এই জগতের বিষয় আশয় এই পবিত্র আত্মাগুলোর কাছে সুস্পষ্টভাবেই প্রকাশ্য…তাঁরা আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহে খুশি,যাঁরা তাদেঁর কবর যিয়ারত করতে আসেন বা তাদেঁর কবরে উপস্থিত হন সবার ব্যাপারেই অবহিত। যিয়ারতকারীগণের প্রশ্ন, তাদেঁর তাওয়াসসুল, অনুনয়-বিনয়,তাদের শাফায়াতের আবেদন ইত্যাদি শুনতে পান। পবিত্র এইসব রূহের সহৃদয় দয়ার মৃদুমন্দ যিয়ারতকারীদের ওপর প্রবাহিত হয় এবং তাদেঁর নূর যিয়ারতকারীদের ওপর বিকীর্ণ হয়। পবিত্র এই আত্মাগুলো যিয়ারতকারীদের চাওয়া পাওয়া, তাদের পাপ ক্ষমা করা, বিপদ-মুসিবত দূর করার ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। নবী আকরাম (সা) কিংবা পবিত্র ইমামগণের মাযার যিয়ারতকে মুস্তাহাব বলে অনুমোদন করার এটাই হলো মূল রহস্য।”
কোরআনও কবর যিয়ারতকারীদেরকে তো কাফের বলেই নি বরং পরোক্ষভাবে যিয়ারত করাকে অনুমোদন করেছে। সূরা তাওবার ৮৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবীজীকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ “কক্ষণো কোনো মুনাফিকের নামাযে জানাযা পড়বেন না কিংবা কক্ষণো তাদের কবরের পাশে দাড়িয়েঁ ক্ষমার আবেদন জানিয়ে দোয়া করবেন না! কেননা তারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং ফাসেক অবস্থায় মারা গেছে।” এ আয়াত থেকে বোঝা যায় নবীজী মুমিনদের মাযারের পাশে দাড়িয়েঁ তাদের ক্ষমার জন্যে দোয়া করতেন। অবশ্য মুনাফিকরা এই অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, কেবলমাত্র মুমিনরাই নবীজীর এই দোয়ার বরকত লাভে ধন্য হয়েছে। এইসব বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয় কবর যিয়ারত করাটা কেবল বৈধই নয় বরং নবীজীর একটি সুন্নাতও বটে।
সালাফিয়া মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে তাইমিয়া বুযুর্গানে দ্বীনের কবর যিয়ারত করাকে “কবর পূজা” বলে অভিহিত করে এটাকে জাহেলিয়াতের যুগের মূর্তি পূজার সাথে তুলনা করেছেন।দ্বাদশ শতাব্দিতে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাব -আলে সৌদের সহযোগিতায় ইবনে তাইমিয়ার আকিদা বিস্তার ঘটিয়েছেন-যিয়ারতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং হারাম শরিফ, কবর ও অন্যান্য পবিত্র স্থাপনা ধ্বংস করে ফেলেন। তার আকিদার বিরোধীদের তিনি কাফের ঘোষণা করেন এবং তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব বলে রায় দেন। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাবের ভাই সোলাইমান সমকালীন বিখ্যাত একজন আলেম ছিলেন। তিনি তাঁর ভাইয়ের আকিদাকে প্রত্যাখ্যান করে বহু চিঠি এবং বই লেখেন। সাওয়ায়েকুল ইলাহিয়া” নামক বইতে তিনি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহহাবকে লিখেছেনঃ “প্রত্যেক মাযহাবের আলেমগণই একজন মুসলমানের মুরতাদ হবার কারণগুলো উল্লেখ করেছেন। তাদেঁর কেউই বলেন নি যে-কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্যে মানত করবে কিংবা অন্য কারো কাছে প্রয়োজনীয়তার কথা বলবে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। কারো কবর স্পর্শ করা, কিংবা কবরের মাটি নেওয়া ইত্যাদিদ কাজ করলে মুরতাদ হয়ে যাবে কিংবা তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে যাবে-এরকম কোনো হুকুম কেউই দেন নি। তুমি তোমার নিজস্ব চিন্তাধারা অনুযায়ী কাজ করে মুসলমানদের এজমা থেকে পৃথক হয়ে গেছো বিশেষ করে কবর স্পর্শ করা, কিংবা কবরের মাটি নেওয়ার কাজ করলে তাকে কাফের ফতোয়া দিয়ে এমনকি যে তাকে কাফের বলবে না তাকেও কাফের বলে প্রকারান্তরে সমস্ত উম্মাতে মুহাম্মাদ (সা) কেই কাফের বলে সাব্যস্ত করেছো। অথচ সাত শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে সমগ্র মুসলিম ভূখণ্ডেই এইসব আমল হয়ে আসছে, কিন্তু কোনো আলেম কাউকে এজন্যে কাফের বা মুরতাদ বলে ফতোয়া দেয় নি।..”
যিয়ারতের উদ্দেশ্য বস্তুজাগতিক গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আধ্যাত্মিকতার জগতে প্রবেশ করা এবং এক আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ সালাফিরা মরহুম শহিদান, নেককার ও সালেহ বান্দাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারীকে মুশরিক বলে অভিহিত করে তাদের হত্যা করাকে ওয়াজিব বলে ঘোষণা করেছে। যদিও বুযুর্গানে দ্বীনের কবর যিয়ারত করাটা মুসলমানদের জন্যে গর্ব এবং আন্তরিক প্রশান্তির কারণ। আল্লাহর সবাইকে শুভবুদ্ধি দিন। #
মুসলমানরা সবসময়ই দ্বীনের মহান মনীষীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাঁদেরকে স্মরণ করে এসেছে। এমনকি তাঁদের সমাধিসৌধ নির্মাণ করে মাযারের পাশে মসজিদ তৈরি করে ইবাদাত বন্দেগির মধ্য দিয়ে মনীষীদের স্মৃতিকে মনের ভেতরে জাগ্রত রেখে এসেছে। কিন্তু ওহাবিরা আল্লাহর অলি, সালেহিন এমনকি নবীদের কবরের ওপরেও মসজিদ কিংবা সমাধিসৌধ নির্মাণ করাকে বেদআত বলে অভিহিত করেছে।
এভাবে বেদআতের প্রসঙ্গটি সর্বপ্রথম উত্থাপন করেছিলেন সালাফিয়া মতবাদের তাত্ত্বিক ইবনে তাইমিয়া এবং তারপরে তাঁরই সুযোগ্য ছাত্র ইবনে কায়্যেম জোওযি। তারা কবরের ওপর কোনো স্থাপনা নির্মাণ করাকে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং ঐ ধরনের স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্যে ফতোয়া জারি করেছেন। ইবনে কায়্যেম তার বইতে লিখেছেন এ ধরনের স্থাপনা ধ্বংস করার কাজে এমনকি একটি দিনও বিলম্ব করা জায়েয নয়। এইসব নীতিমালার ভিত্তিতে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের মাধ্যমে ওহাবি মতবাদ সংগঠিত হবার পর এবং আলে সৌদের পৃষ্ঠপোষকতার পর পবিত্র স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক সেনা সমাবেশ করা হয় এবং সেগুলোকে ধ্বংস করে, সেখানকার সম্পদ লুট করা হয়। ১৯২৬ সালে মদিনায় বাকি কবরস্থানে নবী করিম (সা) এর সাহাবিবৃন্দ এবং খান্দানের মাযারগুলোকে ধ্বংস করার ঘটনা ওহাবিদের সবচেয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ধৃষ্টতামূলক আচরণ হিসেবে পরিগণিত। অথচ আজ পর্যন্তও সালাফি বা ওহাবি আলেমরা তাদের এই অমানবিক, নোংরা ও ধৃষ্টতাপূর্ণ কাজের পক্ষে দ্বীনী প্রমাণ তো দূরের কথা, বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো যুক্তিও দেখাতে পারে নি।
ইসলামের দ্বীনী নিদর্শনগুলোর প্রতি সম্মান দেখানো বা সেগুলোকে সংরক্ষণ করা মহান আল্লাহরই নির্দেশ বা পরামর্শ। সূরায়ে হাজ্জের বত্রিশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ “কেউ যদি ঐশী নিদর্শনগুলোকে সম্মান করে তাহলে সে যেন তার আন্তরিক তাকওয়ারই বহিপ্রকাশ ঘটালো।” সাফা, মারওয়া, মাশআর, মিনা এবং হজ্জের সামগ্রিক আনুষ্ঠানিকতা সবই ঐশী নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত। একইভাবে নবী-রাসূলসহ সালেহিনদের কবরের প্রতি সম্মান দেখানোটাও ইসলামের একটি দ্বীনী দায়িত্ব এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। কেননা ইসলামের মহান নবী এবং আল্লাহর অন্যান্য অলি-আওলিয়ারা হলেন আল্লাহর যমিনে তাঁরি সর্বোত্তম নিদর্শন,তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি উপায় হলো তাঁদের কবর এবং কীর্তিগুলোকে সংরক্ষণ করা। নবী, রাসূল আর সালেহিনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা বা তাঁদের কবরগুলোকে সংরক্ষণ করার মধ্য দিয়ে দ্বীনে ইসলামের প্রতি মুসলমানদের ভালোবাসাই প্রকাশ পায়।
কোরআনে কারিমও এই কাজকে পছন্দনীয় বলে উল্লেখ করে আদেশ দিয়েছে, কেবল নবীজী (সা) কেই নয় বরং তাঁর আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপারেও সবাই যেন সহানুভূতিশীল হয়। সূরা শূরা’র তেইশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “..বলো, আমি এর (অর্থাৎ আমার রেসালাতের) বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে-আমার-আত্মীয়দের (অর্থাৎ আহলে বাইতের) সৌহার্দ ছাড়া আর কোনো প্রতিদান চাই না…।” এই আয়াত অনুযায়ী প্রশ্ন দাঁড়ায়, রেসালাতের খান্দানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার একটা উপায় কি আল্লাহর অলিদের স্মৃতিগুলো, তাঁদের পবিত্র মাযারগুলো কিংবা তাঁদের বাসস্থানগুলো সংরক্ষণ করা নয়?
মজার ব্যাপার হলো কোরআনে কেবল ইসলামী নিদর্শনগুলোকেই সংরক্ষণ করার কথা বলা হয় নি বরং কবরের ওপর সৌধ নির্মাণ করাকেও জায়েয বলে ঘোষণা করেছে। আসহাবে কাহাফের ঘটনায় এই বিষয়টি এসেছে। আসহাবে কাহাফ যখন ঘুম থেকে জেগে উঠলো এবং কিছু সময় বেঁচে থাকার পর মারা গেল, জনগণ তখন বলাবলি করছিলো যে তাঁদের কবরের ওপর সৌধ নির্মাণ করবে কি করবে না! কেউ কেউ বলেছিলেন এই পুণ্যবান লোকদের সম্মানে তাঁদের কবরের ওপর একটি সৌধ নির্মাণ করা উচিত, আবার অনেকেই বলেছেন মসজিদ নির্মাণ করলে তাঁদের স্মৃতিও সংরক্ষণ করা হবে। পবিত্র কোরআনের সূরা কাহাফের একুশ নম্বর আয়াতে এই ঘটনা উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যে মৃত সালেহ বান্দাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে তাঁদের কবরের ওপর সৌধ নির্মাণের সাথে বিশ্বস্রষ্টার পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।
যদি কোনোরকম বিরোধিতা থাকতো তাহলে কোরআনের নূরানি আয়াতে তার উল্লেখ করা হতো এবং এ কাজ করতে নিষেধ করা হতো। যেভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইহুদি, খ্রিষ্টানসহ পূর্ববর্তী উম্মাতদের বহু আচরণকে অবৈধ বলে কোরআনে উল্লেখ করেছেন এবং সেসব করতে নিষেধ করেছেন। যেমনটি সূরা হাদিদের ২৭ নম্বর আয়াতে খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে বলা হয়েছেঃ ” এবং তারা নিজেরাই (খ্রিষ্টানরা) সন্ন্যাসবাদের প্রবর্তন করেছিল, আমরা তাদের ওপর এর বিধান দেই নি, যদিও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তাদের উদ্দেশ্য,তবু এটা তারা যথাযথভাবে পালন করে নি।”
এখন কথা হলো আল্লাহ যদি তাঁর আওলিয়ায়ে কেরাম বা বুযুর্গানে দ্বীনের কবরের ওপর মসজিদ কিংবা সৌধ নির্মাণ করার বিরোধিতা করতেন তাহলে কোরআনে কারিমে আল্লাহ এ কাজের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতেন এবং এই কাজকে তাঁর অপছন্দনীয় বলে উল্লেখ করতেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আল্লাহর মনোনীত বা উপযুক্ত বান্দাদের কবরের ওপরে মাযার স্থাপনা নির্মাণের রেওয়ায বহু প্রাচীনকাল থেকেই মুসলমানদের মাঝে প্রচলিত ছিল। সমগ্র মুসলিম ভূখণ্ডেই তার নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ রাসূলে খোদা (সা) এর সন্তান এবং তাঁর খান্দানের কবরের ওপর স্থাপনা বা সৌধ নির্মাণ করেছেন। সুন্নি মাযহাবের অনুসারীরাও শহিদান এবং বুযুর্গানে দ্বীনের কবরের ওপর গম্বুয ও স্থাপনা নির্মাণ করেছেন এবং তাঁদের কবর যিয়ারত করেন। মুসলমানরা নবী-রাসূলসহ আল্লাহর অলিদের কবর যিয়ারত করাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি উপায় বলে মনে করেন। সে লক্ষ্যে এগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করাটাও ইসলামী মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ বলে মনে করেন। কেবল ওহাবি মতবাদের অনুসারিরাই এর বিরুদ্ধে গিয়ে পবিত্র স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস করে ফেলায় বিশ্বাস করে।
ওহাবি মতবাদের আবির্ভাবের আগে ইসলামের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নবিয়্যে মুকাররামে ইসলাম (সা) এর জীবনী লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা ছাড়াও তাঁর ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেমন আংটি, জুতা, মেসওয়াক, তলোয়ার, ঢাল এমনকি রাসূলে খোদা (সা) যেসব কূপ থেকে পানি খেয়েছেন সেই কূপগুলো পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ওহাবিদের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে সেগুলোর খুব কমই এখন অবশিষ্ট রয়েছে। পৃথিবীর সকল ধর্ম এবং জাতির লোকই নিজস্ব প্রাচীন ঐতিহ্যগুলোকে সংরক্ষণ করে, এটা পুরাতাত্ত্বিক সংস্কৃতিরই একটা অংশ। কিন্তু ওহাবিরা এসব চিন্তাভাবনা না করেই নিজেদের ভ্রান্ত আকিদা অনুযায়ী ইসলামের পরিচয়কে প্রামাণ্য করে তোলার মাধ্যম মহামূল্যবান ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। যদিও তা আন্তর্জাতিক রীতিনীতিরও খেলাপ। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বোধ ও উপলব্ধি দান করুন।
ওহাবি মতাদর্শের লেখক হাফেজ ওহাবা এই মতবাদকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করেছেন এভাবেঃ
“ওহাবি ফের্কা হলো অবৈধ এবং বিদায়াতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং যুদ্ধ করা। বিশেষ করে সেইসব বেদায়াত যেগুলো শিরকের শামিল। যেমন যিয়ারত করা, তাওয়াসসুল করা, অলি-আওলিয়াদের ব্যবহৃত বিচিত্র সামগ্রীকে তাবাররোক বা পবিত্র উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা, কবরের পাশে নামায পড়া, কবরে বাতি জ্বালানো, কবরের ওপর লেখা, আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কসম খাওয়া, খোদা ছাড়া অন্য কারো কাছে আরোগ্য বা সাহায্য চাওয়া এবং শাফায়াত প্রার্থনা করা ইত্যাদি।”
ইবনে তাইমিয়াও বলেছেনঃ “কবরে চুমু দেওয়া বা কবর মোসেহ করা শের্‌ক,যদি তা নবী করিম (সা) এর কবরও হয়ে থাকে। নবীজীর কবরের ওপর হাত রাখা এবং কবরে চুমু দেওয়া জায়েয নেই এমনকি তা তৌহিদের খেলাফ।”
এই বক্তব্যগুলোই আসলে বিদয়াত। কেননা;রাসূলে খোদার সময়ে সাহাবায়ে কেরামগণ নবীজী এবং তাঁর ব্যক্তিগত বিচিত্র বস্তুকে তাবাররুক হিসেবে গ্রহণ করার জন্যে উদগ্রিব থাকতেন। তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্রকে তাঁরা অত্যন্ত পবিত্র মনে করে সেগুলোকে পবিত্র উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতেন। নবীজীও কখনো সাহাবাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন নি। সিহহা সিত্তার অন্যতম বোখারি শরিফের সংকলক ইমাম বোখারি (রহ) এর বক্তব্যের একটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘ওরওয়া বিন মাসউদ’ নামে রাসূলে খোদা (সা) এর একজন সাহাবি বলেন “খোদার কসম! নবী করিম (সা) এর ওজুর পানি সাহাবাগণ কখনোই নিচে পড়তে দিতেন না, সব পানি পড়তো সাহাবিদের হাতে,তাঁরা ঐ পানি নিজেদের চেহারা ও শরীরে মাখতেন…যখনই নবীজীর ওজু করার সময় হতো সাহাবিরা তখনই ওজুর পানি হাতে নেওয়ার জন্যে প্রতিযোগিতায় নেমে যেতেন।”
হজ্বের সময় রাসূলে আকরাম (সা) যখন তাঁর চুল কাটতেন, সাহাবাগণ তখন নবীজীর কর্তিত চুলগুলো জমা করতেন পবিত্রতা ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে। একইভাবে নবীজী যখন কোনো পানির মশকের মুখ দিয়ে পানি খেতেন সাহাবিগণ ঐ মশকের মুখ কেটে নিতেন বরকতের উদ্দেশ্যে। এসব কাজ যদি শির্‌ক হতো তাহলে নবিয়্যে মুকাররামে ইসলাম মুসলমানদেরকে সেসব করতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। কেননা নবীজীর সন্তানের মৃত্যুর জন্যে যখন চন্দ্রগহণকে কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছিলো, নবীজী তখন কঠোরভাবে ঐ ভ্রান্ত আকিদার বিরোধিতা করেছিলেন। নবীজীর কাছ থেকে ফযিলত ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে জনগণ যে চেষ্টা চালিয়েছেন সে সম্পর্কে বহু হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, নবীজী এ কাজের বিরোধিতা করেছেন এরকম কোনো বর্ণনা নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না।

আসলে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে যেসব পুণ্যবান সালেহিন বান্দার, তাঁদেরকে পবিত্র জ্ঞান করার অর্থ শেরেকি করা নয়, বরং সবসময় এই বিশ্বাস থেকেই করা হয় যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাঁদের কারো পক্ষেই সম্ভব নয় অপর কারো জন্যে মঙ্গল বয়ে আনা কিংবা কারো বিপদ দূর করা। রাসূলে খোদার মিম্বার, তাঁর কবর, কবর ছোঁয়া এবং তাতে চুমু খাওয়া ইত্যাদি কাজ নবীজীর ওফাতের পর মুসলমানরা করতেন।মদিনার বিখ্যাত ফকিহ সায়িদ বিন মুসাইয়্যেব এবং ইয়াহিয়া বিন সায়িদ এসব কাজ করতেন। ঐশী ব্যক্তিত্ববর্গের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র কিংবা তাঁদের কবরকে পবিত্র জ্ঞান করার অর্থ হলো যেহেতু তাঁরা ছিলেন অনেক উন্নত পর্যায়ের এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী মানুষ, সেজন্যে তাঁদের প্রতিটি জিনিসই পবিত্র এবং মর্যাদা ও সম্মানের যোগ্য।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ)র কাহিনীটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। বর্ণনায় এসেছে, হযরত ইয়াকুব (আ) ছিলেন ইউসুফ (আ) এর পিতা। বার্ধক্যে এসে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ইউসুফ (আ) তাঁর জামাটি পাঠালেন বাবার জন্যে। হযরত ইয়াকুব (আ) পুত্র ইউসুফের দেওয়া জামাটি চোখে লাগালেন আর তাঁর চোখ ভালো হয়ে গেল। এটাই হলো তাবাররোক,এটাই হলো পবিত্রতা জ্ঞান। এই তাবাররোক করাটা বা আল্লাহর অলিদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রকে পবিত্র জ্ঞান করাটা যদি শেরক হতো তাহলে কোরআন কি ইয়াকুব (আ) এর এই কাজকে নেতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করতো না? নবীজীর কবর ছোঁয়া বা কবরে চুমু দেওয়াতেও কোনো সমস্যা নেই বলে আহমাদ ইবনে হাম্বল মনে করতেন। সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূলে খোদার সাথে সবসময়ের জন্যেই থাকতেন,তাঁরাও তাবাররোক অন্বেষণ করেছেন। আমরা এ সময়ের মুসলমানরা যারা নবীজীকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করি নি,তারা নবীজীর মাযার স্পর্শ করে, চুমু দিয়ে তাঁর প্রতি আমাদের অন্তরের ভালোবাসা ও প্রেমের পরিচয় দেব এতে দোষের কী আছে?
কোনো স্থান বা জায়গার প্রকৃতিজাত কোনো মূল্য সাধারণত নেই। কিন্তু পবিত্র স্থানগুলো আল্লাহর পূণ্যবান বান্দাদের নামায রোযার কারণে, ইবাদাতের কারণে বিশেষত্ব লাভ করে। কেননা আল্লাহর পূণ্যবান বান্দারা বহু জায়গায় নেক আমল অর্থাৎ ইবাদাত করার কারণে সেইসব স্থানে আল্লাহর রহমত নাযিল হয়, সেখানে আল্লাহর ফেরেশতাগণ যাওয়া আসা করেন, সেখানে তাই প্রশান্তি নেমে আসে। এটাই হলো সেই বরকত যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সেইসব স্থানে দেওয়া হয়েছে। মুমিন ব্যক্তিগণ এ ধরনের জায়গা বা স্থাপনায় এলে আল্লাহর প্রতি তাঁদের মনোযোগ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। তাঁরা তাই দোয়া-এস্তেগফার করার মধ্য দিয়ে ঐশী নূরে নিজেদের অন্তরের শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা চালায়। মাসজিদুন নাবী, নবীজীর রওজা মোবারক কিংবা আল্লাহর কোনো বুযুর্গানে দ্বিনের কবরের পাশে দাঁড়ালে তাঁদের খালেস বন্দেগি এবং আল্লাহর পথে নিজেদের শ্রম ও কষ্টের কথাগুলো মনে পড়ে। তাই তাঁদের মতো করে নিজেদেরকে গড়ে তোলা অর্থাৎ তাঁদের মতোই খালেস বন্দেগি করার স্পৃহা মনে জাগে।
পয়গাম্বর (সা) এর মিরাজ গমন শুরু হয়েছিল মাসজিদুল আকসা থেকে। তার আগে তিনি মদিনায়, সিনাই পর্বতে এবং বেথেলহামে নেমে নামায পড়েছিলেন। জিব্রাইল (আ) নবীজীকে বলেছিলেনঃ “মদিনা তাইয়্যেবায় নামায পড়েছেন কেননা সেটা ছিল আপনার হিজরতের স্থান, সিনাই পর্বতে নামায পড়েছেন কেননা সেখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মূসা (আ) এর সাথে কথা বলেছিলেন আর বেথেলহামে নামায পড়েছেন কেননা তা ছিল মারিয়াম (সা) এর পুত্র ইসা (আ) এর জন্মস্থান।” তবে হ্যাঁ! বুযুর্গানে দ্বীন এমনকি রাসূলে খোদা (সা) এর কবরের ওপর সিজদা করা ঠিক নয়। অর্থাৎ কবরকে কেবলা বানাতে নিষেধ করেছেন রাসূল (সা)। তবে কবরের পাশে নামায পড়ায় সমস্যা নেই। যেমন মাকামে ইব্রাহিম। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার এক শ পঁচিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ..এবং মাকামে ইব্রাহিমকে প্রার্থনাস্থল নির্ধারণ করেছিলাম..।”
এসব বর্ণনা থেকে ওহাবিদের দৃষ্টিভঙ্গি যে অমূলক এবং ভ্রান্ত, তা কি প্রমাণিত হয় না?
ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে সমকালীন আলেমগণের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নেতিবাচক। তাঁরা মুসলিম সমাজের জন্যে ইবনে তাইমিয়াকে বিপজ্জনক বলে মনে করতেন। তার কারণ আলেম সমাজ ইবনে তাইমিয়ার ভ্রান্ত মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির জবাব দিতে গিয়ে যতো প্রকার তথ্য প্রমাণই দিতেন সেগুলোর কোনো প্রভাবই তার ওপর পড়তো না এমনকি তার ভ্রান্ত আকিদার বিরুদ্ধে যতো রকমের প্রতিবাদই জানানো হতো সে সেগুলোকে তোয়াক্কাই করতো না। উল্টো বরং নিজেকেই খাঁটি মুসলমান বলে মনে করতো। ইবনে তাইমিয়ার সমকালীন বিখ্যাত আলেম “তাকি উদ্দিন সুবকি” (মৃত্যুঃ৭৫৬ হিজরি) ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে লিখেছেনঃ “ইবনে তাইমিয়া কোরআন এবং সুন্নাহর অনুসরণের আড়ালে ইসলামি আকিদায় বেদয়াত ঢুকিয়ে ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোকে এলোমেলো করে দিয়েছে। সে মুসলমানদের সামগ্রিক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।”     ইবনে তাইমিয়া নিজেকে একজন হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী বলে দাবি করতো। কট্টর ও গোঁড়ামিপূর্ণ চিন্তার অধিকারী ছিল সে। দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা যৌক্তিক কোনো আলোচনায় সে বিশ্বাস করতো না। আলেম সমাজ ইবনে তাইমিয়ার লেখা বইগুলো পর্যালোচনা করে বলেছেন আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তাঁর সত্ত্বাসহ ইসলামের অন্যান্য বিধান সম্পর্কে তার যে বক্তব্য সেগুলো একান্তই শিশুসুলভ। তার সেইসব বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় ইসলামের গভীর এবং মূল্যবান তত্ত্ব সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। আলেমদের এই দৃষ্টিভঙ্গি যথার্থই ছিল বলতে হবে। কেননা ইবনে তাইমিয়া যুক্তিতর্ক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিকে দূরে ঠেলে রেখে অতি দ্রুত বাহ্যিকতা এবং বস্তুজাগতিকতার রসাতলে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ এবং তাঁর একত্ববাদ সম্পর্কে তার পদক্ষেপগুলো ছিল একেবারেই নড়বড়ে। সে আসলে কল্পনাবিলাসী ছিল। নিজেকে একজন মুসলমান বলে মনে করতো আর তার বিরোধিতাকারীদেরকে অতি সহজেই গালি দিত, এমনকি তাদেরকে মুশরিক, দ্বীন থেকে খারিজ হয়ে গেছে ইত্যাদি বলে মনে করতো।  
ইবনে তাইমিয়া বিচিত্র বেদায়াতের জন্ম দিয়ে ওহাবিয়াত নামের উগ্র এবং ভয়ংকর একটি ফের্কার সৃষ্টি করে। এই ফের্কাটি জন্মের সূচনা থেকে এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি, হত্যাকাণ্ডসহ মুসলিম বিশ্বে শত শত অপরাধ সংঘটিত করেছে। এইসব খেয়ানত থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় কেন ইসলামে বেদায়াতের জন্ম দেওয়া এবং ধর্মের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়াকে কবিরা গুনাহ বলে গণ্য করা হয়। হযরত আলি (আ) বলেছেনঃ “বেদায়াতের মতো আর কোনো জিনিসই দ্বীনকে বিরান করে নি।” কোরআনে কারিমেও নিজের মিথ্যা বক্তব্যকে আল্লাহর বলে যে বেদায়াতের জন্ম দেওয়া হয় তাকে ভৎর্সনা করা হয়েছে। সূরা ইউনূসের ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “বলো! আমাকে জানাও! আল্লাহ তোমাদের জন্যে যা কিছু রিযিক পাঠিয়েছেন,তোমরা কেন তার কিছু অংশ হালাল আর কিছু অংশ হারাম সাব্যস্ত করে নিলে? বলো, আচ্ছা আল্লাহ কি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন নাকি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছো?”  
ধর্মের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া, ধর্মীয় বিধি বিধানে কিছু সংযোজন করা বা কোনো কিছু বিয়োজন করার মানেই হলো আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করা। অন্যভাবে বলা যায়, যে-কোনো ধরনের দখলদারিত্বের টার্গেট যদি হয় দ্বীন এবং তার মাঝে যদি পরিবর্তন আনা হয়, তাহলেই তা ধর্মের ওপর মত চাপানো বলে গণ্য হবে। আর যদি কোনো ব্যক্তি তার এইসব কর্মকাণ্ডকে আল্লাহর কিংবা রাসূলে খোদার বলে দাবি করে তাহলে তার ঐসব কর্মকাণ্ড বেদয়াত হিসেবে গণ্য হবে। বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ মোহসেন আমিন আমেলি বেদয়াতের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ “বেদায়াত হলো দ্বীনের অংশ নয় এমন কোনো বিষয়কে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করা। একইভাবে হারামকে মোবাহ মনে করা কিংবা মোবাহকে হারাম করা। ফরয নয় এমন বিষয়কে ফরয বলে গণ্য করা এবং মোস্তাহাব নয় এমন বিষয়কে মোস্তাহাব বলে গণ্য করা।”  
অন্যভাবে বলা যায় ঐশি বিধি বিধানে কোনো কিছু সংযোজন করা কিংবা বিয়োজন করার নামই বেদয়াত। আর বেদয়াতকারী ইসলামী শরিয়ত এবং আল্লাহর বন্দেগির বৃত্তের বাইরে চলে যায়।
বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ। কীসে মানুষের কল্যাণ আর কীসে অকল্যাণ তিনিই সবার চেয়ে ভালো জানেন কেননা তিনিই সবাইকে সৃষ্টি করেছেন। সেজন্যে অপার দয়াময় আল্লাহ মানুষের সর্বোত্তম জীবন যাপনের জন্যে এবং মানুষের সার্বিক উন্নয়নের জন্যে উপযুক্ত সকল বিধি বিধান দ্বীনে ইসলামে দিয়ে দিয়েছেন। এইসব বিধান মানুষের সমগ্র জীবনের জন্যে পরিপূর্ণ এবং সর্বোৎকৃষ্ট জীবন বিধান। কোরআনে কারিমে এই বিধানের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছে মানুষের জন্যে জীবন বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে। সূরা ইউসূফের চল্লিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর, তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদাত করবে, আর কারো ইবাদাত করবে না, এটাই সরল সঠিক দ্বীন।”  
ইবনে তাইমিয়া আসলে তৌহিদের নামে তার ভ্রান্ত আকিদার ভিত্তিতে আল্লাহ সম্পর্কে, যিয়ারত, তাওয়াসসুল, শাফায়াতের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে উল্টাপাল্টা ধারণা দিয়েছে এবং সেই ধারণাকেই মৌলিক ইসলাম বলে প্রচার করেছে। তার এবং মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি গভীর মনোনিবেশ করলে দেখা যাবে তারা আসলে চেয়েছে একজন মুসলমানের সাথে আল্লাহর অলিদের আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে পুরোপুরি মুছে ফেলতে, বিশেষ করে নবী করিম (সা) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক। ইসলামের আবির্ভাবের শুরুতে এবং রাসূলে খোদার ওফাতের পর ইসলামের শত্রুরা যে কাজ করেছিল ইবনে তাইমিয়ার কর্মকাণ্ড তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এইসব ওহাবি আলেমদের মতো বেদয়াতি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা বাকারার উনআশি নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ “তাদের জন্যে আফসোস, যারা নিজ হাতে বই লেখে আর বলে বেড়ায়-এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে…..”  
মজার ব্যাপার হলো,ইবনে তাইমিয়া সারাজীবন যেসবের বিরোধিতা করেছেন, মৃত্যুর পর তার সাথে সেই কাজগুলোই করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে তার প্রচারিত মতবাদ নিজ অনুসারীদের ওপরেই প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় নি। কেননা বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির বলেছেনঃ
“মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের একদল তার লাশের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াৎ করেছিল, বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে তাকে দেখে চুমু খেয়েছিল। এছাড়া একদল নারীও তাই করলো…লোকজন বরকতের উদ্দেশ্যে তাদের টুপি, পাগড়ি, জামা কাপড়ে ইত্যাদি তার লাশের ওপর ফেলেছিল।….কেউ কেউ তাকে গোসল দেওয়ার জন্যে আনা পানির অতিরিক্ত অংশ পান করলো আবার অনেকেই গোসলের জন্যে আনা কাপূরের অবশিষ্ট অংশ ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছিল।”  
যেই ওহাবি মতবাদ নিজেই দ্বীনের ভেতর বহু বেদায়াতের জন্ম দিয়েছে, সেই মতবাদই আবার অন্যদেরকে বেদায়াতের ব্যাপারে অভিযুক্ত করছে এমনকি নতুন নতুন উদ্ভাবনীর ব্যাপারেও। অথচ মানুষের অভ্যন্তরীণ সৃজনশীলতা বিকশিত হয় নতুন নতুন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে এবং এই উদ্ভাবনী মানুষকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। যেমন যোগাযোগ সরঞ্জাম বা পরিবহণ সামগ্রি অর্থাৎ গাড়ির মতো মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তৈরি করা…যেগুলো মানুষের কল্যাণে লাগে, সেগুলো কোনোভাবেই বেদায়াত হতে পারে না এবং এগুলো ব্যবহার করা গুনাহের কাজ নয়। নতুন নতুন আবিষ্কার যদি ইসলামের জন্যে ক্ষতির কারণ না হয় সেগুলোকে ইসলাম স্বাগত জানায়। অথচ ওহাবিরা তাদের বিকৃত এবং ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোকে বেদায়াত বলে মনে করে। তারা বলে এগুলো মানুষকে আল্লাহ বিমুখ করে তোলে, তাই এগুলো ব্যবহার করা শেরেকি।
সৌদি আরবে মহিলাদের গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ এ ধরনের আরো অনেক প্রতিবন্ধকতার কারণে আধুনিক টেকনোলজির কল্যাণ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। কিছুদিন আগেও সৌদিআরবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা ‘শের্‌ক’ হিসেবে গণ্য ছিল। এ পর্যন্ত বহু টেলিফোন সেন্টারে হামলা হয়েছে। এখনো ওহাবি আলেমদের দৃষ্টিতে বৈজ্ঞানিক অনেক প্রযুক্তির ব্যবহার হারাম। ইসলামী গবেষকগণ ওহাবিদেরকে খারেজি সম্প্রদায়ের সাথে তুলনা করেছেন। আলী (আ) সময় খারেজিরা তাঁর বিরোধিতা করেছিল এবং নিজেদেরকে আলী (আ) এর চেয়েও বেশি ইমানদার বলে মনে করতো। এরা ছিল গোঁড়া সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি। খারেজিদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে তারা ছিলো ঐশী খেলাফত, কোরআন এবং ইসলাম সম্পর্কে ভুল উপলব্ধি বা চিন্তাধারার অধিকারী। এরাও ছিল ওহাবিদের মতোই দ্বীনের ভেতর বেদায়াত সৃষ্টিকারী। খারেজিরাও নিজেদের মূর্খতার কারণে মুসলমানদেরকে কাফের বলে গণ্য করতো এবং তাদের মালামাল ও রক্তকে মোবাহ বলে মনে করতো।
অথচ প্রকৃত ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলে আকরাম (সা) এর সুন্নাতের অনুসরণ। এ সম্পর্কে রাসূলে খোদা (সা) বলেছেনঃ ‘সবোর্ত্তম বস্তু হলো আল্লাহর কিতাব, সবোর্ৎকৃষ্ট দিক নির্দেশণা হলো মুহাম্মাদ (সা) এর হেদায়াত ও দিক-নির্দেশণা, আর সর্বনিকৃষ্ট জিনিস হলো বেদায়াত, আর সকল বেদায়াতই গোমরাহী।’ আল্লাহ সবাইকে সর্বপ্রকার গোমরাহি থেকে রক্ষা করুন।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পর¯পর বিচিছন্ন হয়ো না…’।বিচ্ছিন্ন কোনো সমাজের সাথে রাসূলের সম্পর্ক নেই বলেও কোরআনে বলা হয়েছে। সূরা আনআমের ১৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং অনেক দলে (বিভিন্ন মাযহাবে)বিভক্ত হয়ে গেছে, ( হে মুহাম্মাদ!) তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই।নবী করিম (সা) সবসময়ই মুসলমানদের ঐক্য কামনা করেছেন। একবার এক ইহুদির প্ররোচনায় দুই কবিলার মুসলমানরা পরস্পর সংঘর্ষের মুখোমুখি দাড়িয়েঁ গিয়েছিল।নবীজী অনতিবিলম্বে তাদের কাছে গিয়ে হাজির হয়ে বললেনঃ খোদাকে ভয় করো!খোদাকে ভয় করো!তোমরা আমার চোখের সামনে সেই জাহেলি প্রথাকে নতুন করে নিয়ে আসছো, তাও আবার ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদেরকে হেদায়েত দেওয়ার পর!যেই ইসলাম জাহেলিয়াত থেকে তোমাদের মুক্তি দিয়েছে এবং কুফুরি থেকে রক্ষা করেছে এবং তোমাদেরকে পরস্পরের প্রতি সদয় ও ঘনিষ্ট করেছে?
হযরত আলি (আ) ও সুন্দর ভাষায় সকল মুসলমানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অনৈক্য ও বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে বিরত থাকতে। তিনি বলেছেনঃ ‘মুসলিম সমাজ থেকে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন হয়ো না,আল্লাহর রহমত সমাজ বা ঐক্যের মাঝে,তাই বিচ্ছিন্নতা পরিহার করো,মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি শয়তানের শিকার যেমনটি পাল থেকে বিচ্ছিন্ন ভেড়া নেকড়ের শিকার হয়। যুগে যুগে মুসলিম বড়ো বড়ো মনীষীদের বক্তব্যেও সবসময় ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খ্রিষ্টিয় অষ্টাদশ শতাব্দিতে ওহাবি মতবাদ সৃষ্টি করে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব মুসলমানদের ঐক্যে মারাত্মক বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন করে। ওহাবিরা নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী অন্যান্য মুসলমানকে মুশরিক বলে ঘোষণা করে এবং তাদের জান-মাল এমনকি নারীদেরকে নিজেদের জন্যে হালাল বলে ঘোষণা করে।
ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে ওহাবিরা বহু হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে সালাফিদের নৃশংসতা কতো জঘণ্য। এরা কেবল নিজেদেরকেই তৌহিদের অনুসারী বলে মনে করে বাদবাকি সবাই তাদের দৃষ্টিতে মুশরিক। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আকিদা মুসলমান সমাজকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। অথচ কোরআন মুসলমানদের একের বিরুদ্ধে আরেকজনের অভিযোগ, অপবাদ দেওয়া, নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবা কিংবা বিচ্ছিন্নতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের একটি ফতোয়া থেকেই এই মতবাদে বিশ্বাসীদের মাঝে সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছে। সেইসাথে ইসলাম এবং আল্লাহর শত্রুদের মোকাবেলায় মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির পথে সৃষ্টি হয়েছে বিচ্ছিন্নতার দেয়াল। কাশফুশ শাবহাত নামক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন “যারা ফেরেশতা, পয়গাম্বর কিংবা আল্লাহর অলিদেরকে… শাফায়াতকারী বা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বলে গণ্য করবে তাদের রক্ত হালাল এবং তাদেরকে হত্যা করা বৈধ।” ইতিহাসে লক্ষ্য করা গেছে আলেসৌদ সরকার কারবালা, মদিনা, তায়েফসহ আরো বহু ইসলামী স্থাপনায় হামলা চালিয়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছে।
উগ্র এই মতবাদের সহিংসতার অসন্তোষজনক পরিণতি এখন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিকৃত চিন্তাধারার অধিকারী ওহাবি মতবাদের ধারক হচ্ছে এযুগের সহিংসতাকামী গোষ্ঠি তালেবান, আলকায়েদা এবং সেপাহে সাহাবাসহ এজাতীয় আরো অনেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠি। আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ইরাকসহ আরো অনেক দেশে পাশবিক হামলা চালিয়ে এরা বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামকে ভয়ঙ্কর চেহারায় তুলে ধরছে। ভয়াবহ এই সালাফি গোষ্ঠিগুলো অন্যান্য মুসলমানকে মুশরিক ভেবে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করছে। আমরা উগ্র এই গোষ্ঠিগুলোর পেছনের ইতিহাস একটু দেখা নেওয়ার চেষ্টা করবো।
আফগানিস্তানের সন্ত্রাসী এবং ওহাবি গোষ্ঠি তালেবান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, পাকিস্তান ও সৌদিআরবের যৌথ প্রচেষ্টায় সৃষ্টি হয়েছে। তাদের নেতা হলো মোল্লা মুহাম্মাদ ওমর। এই গোষ্ঠিটি ১৯৯৬ সালে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করে এবং দেশের শাসনভার হাতে তুলে নেয়। তারা ওহাবিদের কাঙ্ক্ষিত সরকারের নমুনা জনগণের সামনে তুলে ধরে। তারা ইসলামের নামে নৃশংস এবং মূর্খতাপূর্ণ আইন কানুন চালু করে। সিনেমা থিয়েটার বন্ধ করে দেয়। জনগণকে বেত্রাঘাত করে জামাতে নামায পড়তে বাধ্য করে এবং লম্বা দাড়ি রাখতেও বাধ্য করে। তালেবানরা মেয়েদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং মহিলাদেরকে ঘরের বাইরে কাজ করতে নিষেধ করে। তালেবানরা তাদের আকিদা বিরোধীদের হত্যা করে চাই সে সুন্নি হোক কিংবা শিয়া। এই উগ্র গোষ্ঠিটি মুসলমানদের ঐক্যকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পশ্চিমা মিডিয়াগুলোকে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা চালাবার মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
সেপাহে সাহাবা নামে এরকম আরেকটি গোষ্ঠি আছে পাকিস্তানে। তালেবান এবং সৌদি আরবের সহযোগিতায় সৃষ্টি হয়েছে এই গোষ্ঠিটি। এরা ওহাবিদের চেয়েও বেশি উগ্র। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে পাকিস্তানের শিয়াদেরকে তারা নির্দয়ভাবে হত্যা করছে। ইমাম হোসাইন (আ) এর জন্যে শোকানুষ্ঠান পালনের ঘোর বিরোধী এই গোষ্ঠিটির প্রধান টার্গেট হলো শিয়া এবং সুন্নিদের মাঝে ফাটল ধরানো। মসজিদে নামাযরত অবস্থায়ও এই উগ্র গোষ্ঠিটি মুসল্লিদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। কেবল শিয়া-সুন্নিদেরকেই নয় বরং তারা নিজেদের তরিকার লোকজনকেও নির্মমভাবে হত্যা করতে দ্বিধা করে না।
আলকায়েদা’ এরকম আরেকটি গোষ্ঠি। ওসামা বিন লাদেনের মাধ্যমে এই গোষ্ঠিটির জন্ম হয়। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই গোষ্ঠিটির গোপন সম্পর্ক রয়েছে তবুও ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পেছনে এই গোষ্ঠিটির হাত থাকার অজুহাতে আলকায়েদার ঘাটিঁ হিসেবে পরিচিত আফগানিস্তানের ওপর মার্কিনীরা হামলা চালিয়ে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মুসলমানকে হত্যা করে। ওহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠিটি এখন বিভিন্ন নামে ইরাক, ইরান, ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়াসহ আরো বহু মুসলিম দেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মুসলমানদেরকেই তাদের প্রধান শত্রু বলে মনে করছে।
অথচ বোখারি শরিফে এসেছে, খায়বার যুদ্ধে আলি (আ) এর এক প্রশ্নের জবাবে হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেনঃ তাদের সাথে লড়াই করো যতোক্ষণ না তারা বলে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর প্রেরিত রাসূল। এই দুটি বিষয়ে যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তাহলে তাদের রক্ত ঝরাণো জায়েয নেই।’ অথচ ওহাবিরা যাদের রক্ত ঝরাচ্ছে তারা সবাই মুসলমান। আসলে ওহাবিদের এইসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বে ইসলামকে ভয়ঙ্কররূপে তুলে ধরা। যদিও কোরআনে বলা হয়েছেঃ আমরা আপনাকে রূঢ় ও কঠিন হৃদয়ের অধিকারী করি নি, কেননা আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচিছন্ন হয়ে যেতো।’ অন্যত্র এসেছে দ্বীন তো প্রেম ছাড়া আর কিছু নয়।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা,রাসূলের প্রতি ভালোবাসা, সালেহিন এবং সকল মানুষকে ভালোবাসা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। ভালোবাসা এবং প্রেমের ভিত্তিমূলে সৃষ্ট এই ঐশী ধর্ম এখন ওহাবিদের মতো উগ্র গোষ্ঠিগুলোর কার্যক্রমের ফলে সুযোগ সন্ধানী ইসলামের শত্রুরা এই দ্বীনটিকে বিকৃতভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছে। ওহাবিদের কার্যক্রমকে কাজে লাগিয়ে তারা ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে উগ্র এবং সন্ত্রাসী বলে প্রচার চালাচ্ছে।
আল্লাহ সবাইকে দ্বীনের সঠিক বোধ ও উপলব্ধি দিন।
ওহাবি মতবাদটি এখন যতোটা না মাযহাবী তারচেয়ে বেশি সৌদি আরবের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ওহাবি চিন্তার প্রচার প্রসারের কাজ শুরু হয়েছিল মূলত সৌদি সরকারের সম্পদ ও ক্ষমতার আলোকে, তাই এই হুকুমাত যতোদিন অব্যাহত থাকবে ততোদিন ওহাবি মতবাদের অস্তিত্বও বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরবের শাসনব্যবস্থা হচ্ছে রাজতান্ত্রিক। আলে সৌদের খান্দানের মাঝেই সৌদি আরবের ক্ষমতা ঘুরপাক খায়। রাজবংশেরই এক জনের কাছ থেকে আরেক জনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। সৌদি প্রিন্স বা যুবরাজগণই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের অর্থাৎ আলে সৌদের মাধ্যমেই সৌদি আরবের কেন্দ্রিয় শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়। দেশটিতে সরকার বিরোধী সর্বপ্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রমকে শক্তহাতে দমন করা হয়। ওহাবি মতবাদ সৌদি আরবে এমনভাবে শেকড় গেড়েছে যে তাদের সংস্কৃতি, তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগ পর্যন্ত ওহাবি মতাদর্শের আলোকে গঠিত হয়েছে।
ক্ষমতার উচ্চ আসনগুলো ওহাবি মুফতিগণের হাতে চলে গেছে এবং আলে সৌদ সরকারের নীতি নির্ধারণী ব্যবস্থায় তারা উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। দেশের আইন ও বিচার মন্ত্রী, হজ্ব মন্ত্রী, ইসলামী মর্যাদা বিষয়ক মন্ত্রী, আওকাফ এবং ইসলামী দাওয়াত সংস্থার মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ওহাবি মুফতিদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়। ওহাবিরা হারামাইন শরিফাইনের ওপর কর্তৃত্ব ছাড়াও বড়ো বড়ো অনেক সংস্থা গঠন করেছে। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তারা ওহাবিদের বিকৃত মতবাদের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে থাকে। ‘রাবেতায়ে আল আলমে ইসলামী’ বড়ো বড়ো আলেমদের সংস্থা বা “কেবারুল উলামা” এবং “আমরু বিল মারুফ ওয়া নিহি আনিল মুনকার” সংস্থা এগুলোর অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,কেবারুল উলামা সংস্থার একুশজন মূল সদস্য রয়েছে যাদের সবাই ওহাবি। তারা ওহাবি মতবাদের প্রচার ছাড়াও সৌদি আরবের রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এভাবে ওহাবিরা সৌদি আরব সরকারের ওপর ব্যাপক কর্তৃত্ব করার পাশাপাশি সেদেশের সম্পদ ও তেল ভাণ্ডারের ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। এ কারণেই সৌদি আরবে সুন্নি কিংবা শিয়াসহ অন্য কোনো মাযহাবের কার্যক্রম চালানোর কোনোরকম সুযোগই নেই।
সৌদি সরকার এখন তাদের সকল অর্থ সম্পদ ব্যয় করে ওহাবি ফের্কা বিস্তারের মূল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তারা তাদের দেশে এই মতবাদ ছাড়া অন্য কোনো মাযহাবের কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা ওহাবিদের ছাড়া অন্যদেরকে মুসলমানই মনে করে না,কাফের, মুশরিক এবং বেদায়াতী বলে ভাবে। এ কারণে সৌদি আরবে ওহাবিদের ছাড়া অন্য কোনো মাযহাবের লোকজন ভালো চাকুরি পায় না, তাই আর্থিক দিক থেকে তাদের অবস্থান ওহাবিদের তুলনায় অনেক পেছনে। গোঁড়ামি, সহিংসতা এবং কট্টর চিন্তাভাবনার কারণে ওহাবি ফের্কায় চরম উগ্রবাদের জন্ম হয়েছে। অথচ কোরআনের নূরানি আয়াত আর রাসূলে খোদা (সা) এর মন কেড়ে নেয়া কথাবার্তা অনুসারে জনগণের সাথে আচার আচরণের ভারসমতা,সদয় মিষ্টি ব্যবহার ইত্যাদি হলো একজন প্রকৃত মুসলমানের বৈশিষ্ট্য।
মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য মিষ্টি ব্যবহার ও আচরণের কথা বলছিলাম। অথচ ওহাবিদের ব্যবহার ঠিক তার বিপরীত। এ যুগের একজন বিখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ নাসের মাকারেম শিরাযি ওহাবিদের জাহেলি আচরণের একটি স্মৃতির কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়ঃ “প্রথমবার যখন মদিনায় খোদার ঘর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদিনায় গেলাম, অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখতে পেলাম। ‘আমেরিন বে মারুফ’ নামে লম্বা লম্বা দাড়িঁওয়ালা-গোঁড়া ওহাবিদের-একটি গ্রুপ নবী কারিম (সা) এর রওজা মোবারকের চারপাশ ঘিরে রেখেছে। তাদের সবার হাতেই চাবুক। যে-ই নবীজীর রওজায় চুমু দিতে এগিয়ে যায় তারই মাথায় ঐ চাবুক দিয়ে আঘাত করছে। তারা যিয়ারতকারীদের বলছেঃ রওজা শরিফের এই বেষ্টনিটা ক’টুকরো লোহা আর কাঠ মাত্র,তোমাদের এই কাজটা শেরেকি।”
আয়াতুল্লা মাকারেম শিরাযি আরো বলেনঃ”গোঁড়া ওহাবিরা এ বিষয়টি বুঝতে পারে নি যে যিয়ারতকারীদের ঐ কাজের উদ্দেশ্য কাঠ আর লোহাকে চুমু দেওয়া নয় বরং ঐ চুম্বন রাসূলে খোদা (সা) এর প্রতি তাদের ভালোবাসা ও প্রেমের প্রকাশ। ওহাবিরা কিন্তু নিজেরাই কোরআন শরিফের জেল্‌দে চুমু খায়। তারা হাজরে আসওয়াদ নামের কালো পাথরেও চুমু খায় এবং বরকত কামনা করে। তো হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া শেরক না হলে রাসূলে খোদা (সা) এর রওজা মোবারকের পাথরে চুমু দেওয়াকে ওহাবিরা শের্‌ক বলে মনে করে কীভাবে! এটা কি স্ববিরোধিতা নয়? দুঃখজনকভাবে ওহাবি আলেমদের কাছে নিরবতা ছাড়া এই প্রশ্নের আর কোনো জবাব নেই।”
হেজাজ হলো ওহী নাযিলের স্থান, আল্লাহর ঘর, মুসলমানদের ক্বেবলা এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিবহুল বহু কীর্তিময় স্থান, যা মুসলমানদের ঐক্যের জন্যে খুবই উপযোগী প্রতীক হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্য।তা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে সৌদি শাসকেরা ঐক্যের বিপরীতে বিচ্ছিন্নতার নীতি অনুসরণ করছে। আলে সৌদের সাথে পশ্চিমা শক্তিগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সম্পর্কের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সৌদিআরব এখন ইঙ্গোমার্কিনীদের নীতি বাস্তবায়নকারীতে পরিণত হয়েছে। মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতার বিস্তার এবং ওহাবিদের সহিংস নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঐক্যের ক্ষেত্রগুলোকে যে ধ্বংস করা হয়েছে, তাকে উপনিবেশবাদীদের নীতিরই বাস্তবায়ন বলে মনে করা হচ্ছে। সৌদিআরবে বিদ্যমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কারণে এই বিভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে কেউ বিক্ষোভও করতে পারছে না। বহু কিতাব, ম্যাগাজিন এবং মাসজিদুন্নাবি ও মাসজিদুল হারামসহ বিভিন্ন মসজিদে দেওয়া খুতবা,বিশেষ করে বেদআত, শিরক ও তৌহিদ সংক্রান্ত আলোচনাগুলোর সবই ওহাবিদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত।
হজ্বের সময় যেহেতু সারা বিশ্ব থেকে মুসলমানরা এসে সমবেত হয় সেজন্যে ওহাবিরা এ সময় তাদের ভ্রান্ত আকিদা প্রচারের জন্যে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালায়। মুসলমানদের মাঝে হজ্ব একটি ফরয ইবাদাত হবার কারণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর বাইরেও সারা বছর জুড়েই মুসলিম নারী-পুরুষ ওমরা করার জন্যে, নবীজীর রওজা মোবারক যিয়ারত করার জন্যে সৌদি আরবে যায়। এ কারণে সৌদি সরকার একটি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করেছে যার উদ্দেশ্য হলো ওহাবি মতবিশ্বাসের আলোকে যিয়ারতকারীদের ধর্মীয় বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়া। এই মন্ত্রণালয় ওহাবি মতবাদ অনুযায়ী বহু কিতাব ও ম্যাগাজিন ছাপিয়ে হজ্ব সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিলি করে। #
হজ্বের সময় সৌদি সরকার ওহাবি মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে বই এবং ম্যাগাজিন ছেপে যিয়ারতকারীদের মাঝে বিলি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেন্টারও সৌদি আরব জুড়ে ওহাবি মতবাদ প্রচার প্রসারের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। ওহাবিদের কিছু ধর্মীয় কেন্দ্রও আহলে সুন্নাত তথা হাম্বলি, শাফেয়ি, হানাফি এবং মালেকি মাযহাবের মতো বিখ্যাত মাযহাবগুলোর প্রতি বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন ফতোয়া জারি করে থাকে। দুঃখজনক বিষয়টি হলো জনগণ এইসব ফতোয়া মানতে বাধ্য। এসবের বাইরেও ওহাবি মতবাদ প্রচার প্রসারের আরো গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো গণমাধ্যম। ওহাবিরাও এই গণমাধ্যমের গুরুত্ব বুঝতে পেরে এক্ষেত্রে ব্যাপক তৎপর হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব থেকে বহু স্যাটেলাইট চ্যানেল এখন ওহাবি মতবাদ প্রচারের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এইসব চ্যানেলে অন্যান্য মুসলমানদেরকে কাফির বলে প্রচার করা হয় আর ওহাবিদেরকেই কেবল খাটিঁ মুসলমান বলে গণ্য করা হয়।
‘আলআরাবিয়া’ নিউজ চ্যানেলটিও সৌদিআরবের আন্তর্জাতিক চ্যানেলগুলোর একটি। এই চ্যানেলটি নিউজধর্মী পরিচয়ধারী হলেও তাদের রিপার্টে কিংবা নিউজ ভিত্তিক প্রোগ্রামগুলোতে ওহাবি মতবাদ প্রচারের চেষ্টা করে এবং এই মতবাদের বিরোধীদের প্রতি বিশেষ করে ইরানের ইসলামী বিপ্লব এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী প্রতিরোধের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ইন্টারনেটও যেহেতু সহজলভ্য এবং এর ইউজার প্রচুর সেজন্যে এটিও ওহাবিদের গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইসলামের বিভিন্ন মাযহাবের বিরুদ্ধে বর্তমানে ওহাবিদের বহু সাইট তৎপর রয়েছে। ওহাবি অনেক ধনকুবের এবং সৌদি সরকারের আর্থিক সহায়তায় এগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদিআরবে ওহাবিদের বৃহৎ ছয়টি লাইব্রেরি রয়েছে। সেইসাথে ১১৭ টিরও বেশি প্রকাশনাকেন্দ্র ও ছাপাখানা সৌদিআরবে বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বই প্রকাশের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এইসব প্রকাশনা সংস্থা বা ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত বইগুলোর বহু অধ্যায় জুড়ে থাকে ওহাবি মতবাদের বিরোধীদের আকিদা প্রত্যাখান করা। এ ক্ষেত্রে তারা শিয়া সুন্নি নির্বিশেষে ভিন্ন মাযহাবকে অযৌক্তিক ও অবমাননাকর ভাষায় তুলে ধরে।
 
দুঃখজনকভাবে মুহাম্মাদি খাটিঁ ইসলাম যেখান থেকে সূচিত হয়েছে সেই সৌদি আরবই এ ব্যাপারে উদাসীন। ইসলামের ঐশী বিধিবিধানগুলো ওহি নাযিলের স্থানেই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। ভালোবাসা সেখানে সহিংসতায় পরিণত হচ্ছে, ইসলামী ঐক্য পরিণত হচ্ছে বিভিদে আর স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তা সেখানে রূপ নিচ্ছে গোঁড়ামিতে। আলে সৌদ সরকার ওহাবি মতবাদের বিকৃত ও ভ্রান্ত শিক্ষাদর্শের ভিত্তিতে মুসলমানদের মাঝে রহমতপূর্ণ, দয়াপূর্ণ, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এক স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার পরবির্তে ইসলাম বিরোধী বলদর্পী শক্তিগুলোর হাতে হাত মিলিয়ে তাদের নীতিই ওহাবি মতবাদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায় আলে সৌদ সরকার এবং সৌদি আরবের ওহাবি মতবাদ হচ্ছে মুসলিম বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আধিপত্যবাদী সরকারগুলোর শক্তিশালী নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।
সৌদিআরব সরকারের সমূহ পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেয়েও ওহাবি মতবাদ কিন্তু আলেম সমাজের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে এসেছে। এই মতবাদটি গড়ে ওঠার সূচনাতেই চারদিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়ে। ‘শেখ জাফর কাশেফ আলগাত্তা’র কিংবা ‘সাইয়্যেদ মোহসেন আমিন আমেলি’র মতো বিখ্যাত আলেমগণও ওহাবি মতবাদের আকিদা বিশ্বাসকে ভ্রান্ত ও বিচ্যুত বলে প্রমাণ করে বই লিখেছেন। আলগাত্তার ‘মিনহাজুর রাশাদ’ এবং আমেলি’র ‘কাশফুল এরতিয়াব’ নামক বইগুলোতে ওহাবিদের আকিদাকে দলিল প্রমাণের সাহায্যে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তাঁরা আরো দেখিয়েছেন, ওহাবি মতবাদের অনুসারীদের আচরণ কেবল সহিংসতাপূর্ণই নয় বরং তাদের চিন্তা চেতনাও উগ্রতা, গোঁড়ামি আর অযৌক্তিকতায় ভরপুর। যুক্তি, তথ্য ও জ্ঞানপূর্ণ এ ধরনের সমালোচনা এমন একটা সময়ে হয়েছিল,যে সময় দ্বীন বিরোধী ওহাবি মতবাদটি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। ওহাবিরা সীমাহীন ত্রাস ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের মালামাল লুট করে তাদের ঐ ভ্রান্ত মতবাদটিকে আজ পর্যন্ত চালু রেখেছে।
অবশ্য ওহাবি ফের্কার নেতাদের ভাগ্য খুবই প্রসন্ন ছিল বলতে হবে। কেননা তারা অঢেল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের মাধ্যমে অর্জিত সমৃদ্ধ অর্থনীতির অধিকারী দেশ সৌদি আরবের সার্বিক সহায়তা পেয়েছে। তাছাড়া মুসলমানদের পবিত্র স্থাপনা হারামাইন শরিফাইনও সৌদিআরবে অবস্থিত হবার সুবাদে সেদেশের সরকারই সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সেখানে ওহাবিরা সরকারী আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় সেগুলোকে নিজেদের আকিদা প্রচারের কাজে লাগাতে পারছে। সেইসাথে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যে তারা সমগ্র মুসলিম জাতির মাঝে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতে পেরেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা সরকারগুলোর জন্যে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের মতো অনুগত একটি সরকারের খুবই প্রয়োজন।
কারণটা হলো অন্যান্য আরব দেশগুলোর সাথে যেহেতু সৌদি আরবের গোত্রীয় এবং সাংস্কৃতিক অভিন্নতা রয়েছে,তাই মধ্যপ্রাচ্যের ঐসব দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই সৌদি সরকারের মাধ্যমে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে কিংবা চাপিয়ে দিতে সক্ষম। ওহাবি নেতারা অবশ্য নিজেদেরকে খাটিঁ এবং মূল ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করে থাকে এবং এ দাবির পেছনে তারা ভিত্তিহীন অনেক বড়ো বড়ো দলিলও তুলে ধরার চেষ্টা করে থাকে। অথচ বাস্তবতা হলো এই যে, ওহাবি মতবাদের শিক্ষাগুলো উপনিবেশবাদীদের লক্ষ্যগুলোই বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে আর হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর খাঁটি ইসলামকে নির্মূল করতে সহায়তা করছে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি’র প্রফেসর হামিদ আলগারের একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে পরিসমাপ্তি টানবো আজকের আলোচনার। ‘ওহাবিজম’ নামে তিনি গবেষণামূলক একটি বই লিখেছেন। ঐ বইতে তিনি বলেছেনঃ”দুটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। প্রথমটি হলো ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বা ইসলামের সমৃদ্ধ চিন্তাদর্শে ওহাবিজম বিশেষ কোনো স্থানের অধিকারী নয়। এই দলটির অবস্থান বুদ্ধিবৃত্তিক মৌলিক চিন্তাধারার বাইরে। তবে তাদের সৌভাগ্য হলো এই, সৌদিআরবের মতো দেশে এবং মুসলিম বিশ্বের ভৌগোলিক মূল কেন্দ্র হারামাইনের কাছে এই মতবাদটির উত্থান হয়েছে। দ্বিতীয় দিকটি হলো,..তাদের সৌদি পৃষ্ঠপোষকগণ বিংশ শতাব্দিতে তেলের বিশাল সম্পদের অধিকারী হয়। ঐ সম্পদের একটা অংশ কেবল…মুসলিম বিশ্বে ওহাবি মতবাদ প্রচারের কাজে লাগানো হয়। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা যদি না থাকতো তাহলে ইতিহাসের পাতায় ওহাবি মতবাদ গুরুত্বহীন এবং দৃঢ়তাহীন একটি ফের্কা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকতো।” ইসলাম নিয়ে আরো বেশি চর্চা,গবেষণা করা হলে এই সত্য সবার সামনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।

Share

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY