Home ইতিহাস পবিত্র আশুরা ও মহররম-৫

পবিত্র আশুরা ও মহররম-৫

554
0
SHARE

আশুরা উপলক্ষে ওস্তাদ আয়াতু্ল্লাহ মিসবাহ তাকী ইয়াযদীর পঞ্চম বক্তব্য

77

শহীদানের নেতা হযরত আবা আব্দিল্লাহ্ আল্-হোসাইনের (আঃ) শোকাবহ ম্মৃতিময় দিনগুলোর আগমনে হযরত ইমাম মাহ্দী (আল্লাহ্ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন), মহান রাহ্বার, মহান মার্জা’এ তাক্বলীদগণ ও হোসাইনী আদর্শের অনুসারী শিয়াদের সকলের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। আশা করি মহান আল্লাহ্ তা’আলা এ দুনিয়ায় ও পরকালে হযরত আবা আব্দিল্লাহ্ আল্-হোসাইনের সাথে আমাদের সম্পর্ককে কখনো দুর্বল হতে দেবেন না।বিগত আলোচনা সমূহে আমি কয়েকটি প্রশ্ন উপস্থাপন করেছি এবং আল্লাহ্ তা’আলা যতখানি তাওফীক দিয়েছেন ও আমার জ্ঞানে যতটুকু সম্ভব হয়েছে সে সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। এ প্রসঙ্গে আমি যে সর্বশেষ প্রশ্নটি উপস্থাপন করেছি তার জবাব দেয়ার জন্য ভূমিকা হিসেবে প্রথমে কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে চাচ্ছি। বিগত দুই আলোচনায় এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছি এবং আশা করছি অত্র আলোচনায় এ প্রসঙ্গটি সমাপ্ত করবো।
প্রশ্ন ছিলো এই যে, মুসলমানরা, এমনকি যারা বছরের পর বছর হযরত আলী (আঃ)-এর মিম্বারের সামনে বসে তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলো, এমনকি যারা নিজেরা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে নেতৃত্ব গ্রহণ ও ইসলামী হুকুমাতের শাসন ক্ষমতা গ্রহণের জন্য দাওয়াত করেছিলো খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে কেন তারা তাঁর বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে তুলে নিলো এবং তাঁকে এমন নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করলো? আমরা যদি এ ঘটনা বার বার ও প্রতি বছর না শুনতাম তাহলে এত সহজে বিশ্বাস করতে পারতাম না যে, এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু এসব ঘটনা হচ্ছে ইতিহাসের অকাট্য ঘটনাবলীর অন্যতম এবং এ ঘটনা সংঘটিত হবার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।


আমি এর আগে বলেছি যে, এ প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আমাদেরকে আশূরার ঘটনা থেকে কিছুটা পিছনে চলে যেতে হবে। আমাদেরকে ইসলামের প্রথম যুগের অবস্থা, বিশেষ করে শামের ক্ষমতা বনী উমাইয়্যাহ্র হাতে যাবার সময় থেকে তখনকার অবস্থা কিছুটা পর্যালোচনা করতে হবে। তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে, এ সময় কী ধরনের অবস্থা বিরাজমান ছিলো যে কিছু লোকের পক্ষে এ পরিস্থিতি কাজে লাগানো ও এ বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিলো।
আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, তৎকালে ইসলামী সমাজে বিভিন্ন দুর্বলতা ছিলো এবং এসব দুর্বলতার কারণেই এমন একটি ক্ষেত্র তৈরী হয়ে যায় যে, এর ফলে মু’আবিয়ার মতো রাজনীতিবিদদের পক্ষে সে ক্ষেত্র কাজে লাগানো এবং বিভিন্ন উপায়-উপকরণ ও উপাদানকে কাজে লাগিয়ে স্বীয় লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছিলো। এ দুর্বলতাগুলোর বেশীর ভাগই ছিলো জনগণের জ্ঞান ও সংস্কৃতির নিম্ন মান এবং গোত্র ভিত্তিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত থাকার সাথে সংশ্লিষ্ট। তখন অবস্থা ছিলো এই যে, গোত্রপতি যখন কোনো কাজ সম্পাদন করতো তখন অন্যরা অন্ধভাবে তার অনুসরণ করতো। এ ধরনের পরিস্থিতি ছিলো এমন একটি ক্ষেত্র যা রাজনীতিকদের পক্ষে খুব সহজেই কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছিলো।
সমস্ত দুনিয়া পূজারী রাজনীতিবিদদের ন্যায় মু’আবিয়াহ্ যে সব উপাদান বা হাতিয়ার কাজে লাগান তাকে সংক্ষেপে তিনটি বিষয় হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও এর মধ্য থেকে কোনো কোনোটিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এ তিনটি উপাদানের মধ্যে প্রথমটি ছিলো গোত্রের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে প্রলোভন প্রদান। অর্থাৎ তিনি টাকাপয়সা, উপহারাদি, বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং বিভিন্ন পদে বসানোর মাধ্যমে গোত্রপতিদের ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে কিনে নিতেন এবং তাদের মাধ্যমে স্বীয় লক্ষ্য হাসিল করতেন। দ্বিতীয়টি ছিলো সাধারণ জনগণের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা। অর্থাৎ নির্মম আচরণ, নিষ্ঠুরতা, গুপ্তহত্যা ও অমানবিক কঠোর আচরণের মাধ্যমে তিনি সাধারণ জনগণের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। তৃতীয় উপাদানটিকে অবশ্য কয়েক ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। এ উপাদানটি ছিলো প্রচার। এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, মু’আবিয়াহ্ প্রচারের জন্য কয়েকটি গোষ্ঠীকে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রচার কৌশল ব্যবহার করতেন।
মু’আবিয়ার শাসনকালের বিভিন্ন পর্যায়ে এ উপাদানগুলো কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে পার্থক্য ছিলো। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর শাসনকালকে অন্ততঃ তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে। প্রথম অধ্যায়টি হচ্ছে আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ)-এর খেলাফতে উপনীত হবার পূর্ববর্তী সময়। এ যুগে পরিস্থিতি মু’আবিয়ার জন্য যথেষ্ট সুবিধাজনক ছিলো। কারণ, শাম ছিলো ইসলামী হুকুমাতের কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। শামের লোকদের মধ্য থেকে খুব কম সংখ্যক লোকই হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)কে এবং তাঁর শীর্ষস্থানীয় ছাহাবীগণকে দেখেছিলো। তাছাড়া ইসলামী হুকুমাতের কেন্দ্রের সাথে শামের তেমন একটা যোগাযোগ ছিলো না। অন্যদিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলীফাহ্ বিশেষ করে তৃতীয় খলীফাহ্ মু’আবিয়ার হাতকে খুবই উন্মুক্ত রেখে দেন। তাঁরা মু’আবিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে খুব একট মাথা ঘামাতেন না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মু’আবিয়ার জন্য যে কোনো ধরনের তৎপরতা চালাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এ যুগে মু’আবিয়াহ্ শামের জনগণকে তাঁর পসন্দ অনুযায়ী গড়ে নেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়টি হচ্ছে আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ)-এর খেলাফতে উপনীত হবার পরবর্তী যুগ। এ যুগে মু’আবিয়ার কলাকৌশলে, বিশেষ করে প্রচার কৌশলে পূর্ববর্তী যুগের কলাকৌশল থেকে পার্থক্য দেখা যায়। তিনি হযরত আলী (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের বিরুদ্ধে এ মর্মে অপবাদ দেন যে, তাঁরা তৃতীয় খলীফাকে হত্যা করেছেন, অতএব, তাঁদেরকে এ রক্তের মূল্য দিতে হবে; তাঁদেরকে কিছাছ করতে হবে _ হত্যার বদলে হত্যা করতে হবে। অতএব, আলীর জন্য দায়িত্ব হচ্ছে তাদের হাতে ওসমান-হত্যাকারীদের তুলে দিতে হবে।
মু’আবিয়াহ্ আলী (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের বিরুদ্ধে এ অপবাদ ও গুজব তৈরী করলেন এবং একে কেন্দ্র করে মহড়া দিতে থাকলেন। তিনি এ বিষয়টি নিয়ে এতই প্রচার চালালেন যে, অনেক মানুষই তা বিশ্বাস করলো। এ কাজের ফলে এমন একটি ক্ষেত্র তৈরী হয়ে গেলো যে, মু’আবিয়াহ্ অনেক লোককে তাঁর পক্ষে টেনে নিয়ে যেতে ও হযরত আলী (আঃ)-এর মোকাবিলায় ছিফফীন যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলতে সক্ষম হলেন। ইতিহাসে যেমন উল্লেখ আছে, এ যুদ্ধে হাজার হাজার মুসলমান নিহত হয়। হাজার হাজার মুসলমান নিহত হলো, কিন্তু তা পারমাণবিক বোমায় নয়, বরং কয়েক বছরব্যাপী যুদ্ধে _ যার মধ্যে দ্বন্দ্ব যুদ্ধও অন্তর্ভুক্ত ছিলো; এ ছিলো একটা বিরাট সমস্যা। তবে শেষ পর্যন্ত হযরত আলী (আঃ)-এর নৈতিক দৃঢ়তার কারণে এ যুদ্ধ সমাপ্ত হয়।
তৃতীয় অধ্যায় হচ্ছে হযরত আলী (আঃ)-এর শাহাদাতের পরবর্তী সময়। এ যুগে একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরী হয়। এ যুগের পরিস্থিতি ছিলো এমন যে, জনগণ যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। এমনকি আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ)-এর সঙ্গীসাথীগণ পর্যন্ত তিনটি বড় বড় যুদ্ধে অর্থাৎ জঙ্গে জামাল, জঙ্গে সিফফীন ও জঙ্গে নাহ্রাভানে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন ছিলেন। মু’আবিয়াহ্ এ সুযোগকে কাজে লাগান।
মু’আবিয়াহ্ হযরত ইমাম হাসান (আঃ)-এর সেনাপতিদের কতককে অর্থকড়ি দিয়ে কিনে নেন এবং কতককে প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর পক্ষে নিয় নেন। এভাবে তিনি ইমাম হাসানকে সন্ধি করতে বাধ্য করেন। এ যুগে মু’আবিয়াহ্ সমগ্র ইসলামী ভূখণ্ডে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। শুধু শামে নয়, মিসর, ইরাক, হেজায, ইয়ামান ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত তাঁর নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। কেবল হযরত ইমাম হাসান (আঃ) এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর আহ্লে বাইত তাঁর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ান। সন্ধিতে বাধ্য করে মু’আবিয়াহ্ তাঁকেও রাজনৈতিক ময়দান থেকে বাইরে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন। এ অবস্থায় মু’আবিয়াহ্ অনুভব করেন যে, তিনি যা চান তা-ই করতে সক্ষম।
ইতিপূর্বে আমি যে তিনটি উপাদান বা হাতিয়ারের কথা উল্লেখ করেছি মু’আবিয়াহ্ সে তিনটি উপাদানকেই এমনভাবে কাজে লাগান যে, বলা চলে, এর ফলে হযরত ইমাম হাসান (আঃ)-এর হৃদয়ে এবং তাঁর শাহাদাতের পর আরো দশ বছর পর্যন্ত হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর হৃদয়ে যে পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছে তা ছিলো আশূরার দিনে এক বিজন মরুভূমিতে মযলুম অবস্থায় হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর যে পরিমাণ রক্ত ঝরেছে তার চেয়ে অনেক বেশী। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, না আমরা সে যুগ সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকেফহাল, না সে সমস্যাগুলো এমন যা মানুষের মধ্যে ভাবাবেগ জাগ্রত করতে সক্ষম, বা সেগুলোর উল্লেখ করে লোকদের স্মৃতিকে নবায়ন করা যেতে পারে। এটা বিচারবুদ্ধি দ্বারা অনুধাবন করার বিষয় যে, এ মহান পরিবারের ওপর কী ধরনের যুলুম সংঘটিত হয়েছিলো এবং তাঁদের হৃদয়ে কী পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছিলো। মু’আবিয়াহ্ তাঁর প্রচার ব্যবস্থাকে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন যে, এর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জুম’আ নামাযের সকল খোত্বায় খুব সহজেই হযরত আলী (আঃ)-এর ওপর লা’নত্ বর্ষণ করা সম্ভব হয়। এমনকি লোকেরা নামাযে কুনুত পড়ার সময় তাতেও তাঁর ওপরে লা’নত্ বর্ষণ করতো। হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ও হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এসব ঘটনা দেখছিলেন ও শুনছিলেন, কিন্তু তাঁদের পক্ষে এর মোকাবিলায় কিছুই করা সম্ভব হচ্ছিলো না।
হযরত ইমাম হাসান (আঃ) যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (আঃ) পরস্পরের জন্য সান্ত্বনা স্বরূপ ছিলেন, কিন্তু ইমাম হাসান (আঃ)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (আঃ) এমনই একা হয়ে গেলেন যে, যার কাছে ইিন তাঁর অন্তরের ব্যথা-বেদনা প্রকাশ করবেন এমন কেউও ছিলো না। মু’আবিয়ার জীবদ্দশার বাকী দশ বছরে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) মদীনায় থাকেন ও দারুণ মনঃকষ্টে ভুগতে থাকেন।
আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ)-এর শাহাদাতের পর থেকে কারবালার ঘটনা পর্যন্ত প্রায় বিশ বছর কেটে যায়। এ বিশ বছরের মধ্যে দশ বছর ইমাম হাসান (আঃ)ও বেঁচে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী দশ বছর ইমাম হোসাইন (আঃ) একদম একা ছিলেন। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর অনুসারীগণ ও অন্যদের মধ্যে যে সব আলোচনা ও সংলাপ হয়েছে এবং কখনো কখনো ইমাম হোসাইন (আঃ) ও মু’আবিয়ার মধ্যে যে পত্রবিনিময় হয়েছে ও দু’একবার দু’জনের মধ্যে যে দেখা-সাক্ষাত হয়েছে, ইতিহাসে সে সবের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা থেকেই হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর একাকিত্ব ও মযলুম অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
মু’আবিয়াহ্ দুই বার হেজায সফর করেন এবং এ সময় তিনি তাঁর একদল সৈন্যকে তাঁর সাথে মক্কা ও মদীনায় নিয়ে যান ও কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন _ যার উদ্দেশ্য ছিলো খলীফা হিসেবে ইয়াযীদকে তাঁর উত্তরাধিকারী করার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। মু’আবিয়ার এ দুই সফরে হেজায অবস্থানকালে তাঁর ও ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর মধ্যে কথোপকথন হয়। এ ছাড়াও মদীনার আরো যে চার-পাঁচ জন গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মু’আবিয়াহ্র নিকট নতি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন; মু’আবিয়াহ্ তাঁর সফরকালে তাঁদের সাথেও সংলাপে বসেন। এরা ছিলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব; তাঁরা কোনেভাবেই ইয়াযীদকে পরবর্তী খলীফাহ্ হিসেব মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। অন্যদিকে মু’আবিয়াহ্ তাঁদের নিকট থেকে বাই’আত আদায়ের জন্য খুবই চাপ সৃষ্টি করেন।
ইয়াযীদকে খেলাফতের উত্তরাধিকারী করার ব্যাপারে মু’আবিয়াহ্ হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর সাথে যে ক’বার কথাবার্তা বলেন তার মধ্যকার একটি বৈঠক সংক্রান্ত বর্ণনা থেকে জানা যায়, মু’আবিয়াহ্ ইমাম হোসাইনের (আঃ) সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার জন্য তাঁকে দাওয়াত করেন। তখন ইমাম হোসাইন (আঃ) মু’আবিয়ার কাছে গেলেন এবং দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা হলো।
এ সাক্ষাতে মু’আবিয়াহ্ বললেন ঃ “মদীনার সমস্ত লোকই ইয়াযীদকে খেলাফতের উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত আছে। কেবল তোমরা চারজন লোক এটা মেনে নিচ্ছো না। আর এদের নেতা হচ্ছো তুমি। তুমি যদি মেনে নাও ও বাই’আত হও তাহলে বাকী কয়েক জনও তাকে মেনে নেবে। এর ফলে উম্মাতের কল্যাণ ও ঐক্য নিশ্চিত হবে এবং রক্তপাতের সম্ভাবনা দূরীভূত হবে। কেন তুমি নতি স্বীকার করছো না এবং ইয়াযীদের অনুকূলে বাই’আত্ হচ্ছো না?”
জবাবে ইমাম হোসাইন (আঃ) বললেন ঃ “আপনি এত বছর হুকুমাত করেছেন, এত রক্তপাত ঘটিয়েছেন, এত ফাছাদ্ সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আর জীবনের শেষ দিনগুলোতে এসে মৃতু্যর পরেও গুনাহ্ ও আযাব বৃদ্ধিকারী কেনো কিছু করে যাবেন না। ওর গুনাহ্ নিজের ঘাড়ে তুলে নেবেন না। কী করে আপনি জনগণের ওপর তার আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চান যখন তাদের মধ্যে এমন লোকেরা রয়েছেন যারা নিজেরা তার চেয়ে এবং তাঁদের পিতা-মাতা তার পিতামাতার চেয়ে উত্তম এবং তাঁরা জনগণের জন্য অধিকতর কল্যাণকর? আপনি কী উদ্দেশ্যে চাচ্ছেন যে, অবশ্যই ইয়াযীদকেই ক্ষমতায় বসাবেন?”
মু’আবিয়াহ্ বললেন ঃ “মনে হচ্ছে তুমি বোধ হয় নিজেকে উপস্থাপন করতে চাচ্ছো? অর্থাৎ তুমি বলতে চাও যে, তোমার পিতা ও মাতা ইয়াযীদের পিতা ও মাতার তুলনায় উত্তম এবং তুমি নিজে ইয়াযীদের তুলনায় উত্তম?”
হযরত ইমাম (আঃ) বললেন ঃ”যদি বলি যে, তা-ই তাহলে কী হবে?”
মু’আবিয়াহ্ বললেন ঃ “তুমি যে বললে তোমার মা ইয়াযীদের মায়ের চেয়ে উত্তম এটা সঠিক বলেছো। কারণ, তা যদি না-ও হতো তো একথা বলার জন্য কেবল এটাই যথেষ্ট ছিলো যে, ফাতেমাহ্ কুরাইশ বংশোদ্ভূত আর ইয়াযীদের মা কুরাইশ বংশোদ্ভূত নয়।”
এখানে আপনারা মু’আবিয়ার চিন্তার ধরন লক্ষ্য করুন। এখানেও সেই জাতীয়তাবাদী ও গোত্রবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করা হচ্ছে।
মু’আবিয়াহ্ বলে চললেন ঃ “অবশ্য তোমার মা যে কুরাইশ এ ছাড়াও রসূলের কন্যাও বটেন। অতএব, এতে সন্দেহ নেই যে, তোমার মা অধিকতর উত্তম। কিন্তু তুমি যে বললে যে, তোমার পিতা ইয়াযীদের পিতার তুলনায় উত্তম এটা নিয়ে চিন্তা ও পর্যালোচনার অবকাশ আছে। কারণ, তুমি তো জানো যে, ইয়াযীদের পিতা তোমার পিতার বিরুদ্ধ সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং আল্লাহ্ ইয়াযীদর পিতার অনুকূলে রায় দিয়েছেন।”
আপনারা এখানে লক্ষ্য করুন, মানুষ কতখানি বেহায়া হলে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর সামনে হযরত আলী (আঃ)-এর তুলনায় তার নিজের (অর্থাৎ মু’আবিয়ার) শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করতে পারে!
মু’আবিয়াহ্ বলে চললেন ঃ “কিন্তু এই যে তুমি বললে যে, তুমি ইয়াযীদের চেয়ে উত্তম, এটা সঠিক নয়। ইসলামী সমাজের জন্য ইয়াযীদ তোমার চেয়ে অনেক বেশী উত্তম।”
এতে বিস্মিত হয়ে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) বললেন ঃ “আপনি বলছেন যে, মদখোর ইয়াযীদ আমার চেয়ে উত্তম?”
এবার দেখুন মু’আবিয়ার রাজনীতি; কেমন যুক্তি নিয়ে আসছেন তিনি। তিনি বললেন ঃ “দেখো, তামার চাচাতো ভাইয়ের গীবত করো না।”
যেহেতু ইমাম হোসাইন (আঃ) ও ইয়াযীদ কুরাইশ বংশের দুই শাখাগোত্রের লোক, সেহতু আরব রেওয়াজ অনুযায়ী মু’আবিয়াহ্ উভয়কে পরস্পরের চাচাতো ভাই বলে উল্লেখ করেন।
মু’আবিয়াহ্ ইমাম হোসাইন (আঃ)কে নছিহত করছেন এবং বলছেন, তুমি সহিংসতার আশ্রয় নিয়ো না; তোমার চাচাতো ভাইয়ের গীবত করো না, তার দুর্নাম করো না। ইয়াযীদ কখনোই তোমার গীবত করে নি, অতএব, সে তোমার চেয়ে উত্তম।
ইয়াযীদ কুকুর নিয়ে খেলা করতো, মদ পান করতো। মু’আবিয়াহ্ সেই ব্যক্তিত্বহীন ইয়াযীদকে মানবতা ও মর্যাদার মূর্ত প্রতীক হোসাইনের সাথে তুলনা করছেন এবং বলছেন, ইয়াযীদ তোমার চেয়ে উত্তম। তিনি কেমন চমৎকারভাবে ধার্মিকতার ও সত্যের সমর্থক হবার ভান করে ইসলামী যুক্তি হাযির করলেন যে, যেহেতু তুমি ইয়াযীদের গীবত করছো, কিন্তু ইয়াযীদ তোমার গীবত করছে না, সেহেতু ইয়াযীদ তোমার চেয়ে উত্তম।
আমাদের বর্তমান বিশ্বের সকল রাজনীতিবিদই এই একই কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন। আপনাদের হয়তো স্মরণ থেকে থাকবে, শাহের আমলের এক প্রধানমন্ত্রী ‘আলাম্ বলছিলেন, “মহামহিম শাহ্ নৈশভোজের নামায পড়তে ভোলেন না।” ‘আলাম্ মু’মিন লোকদেরকে বলতে শুনেছিলেন যে, নামাযে শাব্ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তিনি জানতেন না যে, দ্বীনদার ইরানীরা নামাযে শাব্ বা রাতের নামায বলতে তাহাজ্জুদ নামাযকে বুঝায়, তাই তিনি ভেবেছিলেন যে, নামাযে শাব্ বা রাতের নামায বোধ হয় শাম বা রাতের খাবার গ্রহণের সময় পড়তে হয় এমন কোনো নামায হবে। তাই তিনি বলেছিলেন ঃ “এই আলেমরা কী বলছেন যে, শাহ্ ধর্ম মানেন না? মহামহিম শাহ্ এমনকি নৈশভোজের নামায পড়তেও ভোলেন না।” আজকালকার কতক রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের সম্পর্কেও এ ধরনের কোনো কোনো কথা শোনা যায়। খান্নাস্ লোকেরা একজন ইসলাম বিরোধী কর্তাব্যক্তি সম্পর্কে বলে, “তিনি তো হাফেযে কোর্আন, হাফেযে নাহ্জুল্ বালাগ্বাহ্; তিনি নামাযে শাব্ অর্থাৎ তাহাজ্জুদ নামায পড়তেও ভোলেন না।” এরই নাম রাজনীতি।
ইতিহাাসে যুগে যুগে এমনটাই হয়ে এসেছে। সত্য ঘটনাকে বিকৃত করা হয়েছে, তাৎপর্য এদিক-সেদিক করা হয়েছে, মূল্যবোধ সমূহ ও পবিত্র ব্যক্তিত্ব বা বিষয় নিয়ে খেলা করা হয়েছে। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) মু’আবিয়ার সামনে কী বলবেন এবং কী যুক্তি দেখিয়ে তাঁর সাথে কথা বলবেন? মু’আবিয়াহ্ বলছেন, ইয়াযীদের পিতা তোমার পিতার চেয়ে উত্তম, কারণ, তাঁরা যুদ্ধ করেছেন এবং আল্লাহ্ ইয়াযীদের পিতার পক্ষে রায় দিয়েছেন।
এ হচ্ছে এক ধরনের অদৃষ্টবাদী ব্যাখ্যা বনী উমাইয়্যাহ্ যার প্রচলন করে। তারা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার তথা ক্ষমতা দখলের পর বলতে থাকে যে, এটাই ছিলো আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছা যে, তারা ক্ষমতার অধিকারী হবে।
অন্য এক ঘটনায়ও এ ধরনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। পূর্ববর্তী খলীফাদের যুগে হযরত আলী (আঃ) কোনো যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন নি। তিনি তাঁর পুত্রদেরকে পাঠান, কিন্তু তিনি নিজে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। একবার এক যুদ্ধের সময় দ্বিতীয় খলীফাহ্ হযরত আলী (আঃ)কে যুদ্ধে যেতে বললে তিনি বলেন ঃ “মদীনায় আমার কাজ আছে; আমি যাচ্ছি না।” এ প্রসঙ্গে খলীফাহ্ আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাসকে বলেন ঃ “তোমার চাচাতো ভাই যুদ্ধে যায় নি কেন জানো?” ইবনে আব্বাস বললেন ঃ “না।” খলীফাহ্ বললেন ঃ “আলী মদীনায় থেকে যায় যাতে নিজেকে খেলাফতের জন্য প্রস্তুত করতে পারে।” অর্থাৎ আমার পরে খলীফাহ্ হবার জন্য ক্ষেত্র তৈরীর উদ্দেশ্যে মদীনায় থেকে যায়। ইবনে আব্বাস বলেন ঃ “জবাবে আমি বললাম যে, আলীর জন্য এর কোনো প্রয়োজনই নেই। কারণ, সে বিশ্বাস করে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাকে খলীফাহ্ মনোনীত করে গিয়েছিলেন।” তখন দ্বিতীয় খলীফাহ্ বললেন ঃ হ্যা, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) চেয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ্ চান নি।” অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আলীকে খলীফাহ্ করতে চেয়েছিলেন বটে, কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা তা চান নি।
সে যুগে এ ধরনের ভ্রমাত্মক অপযুক্তির আশ্রয় নেয়া হতো। মু’আবিয়াও অপযুক্তির আশ্রয় নেন। এ কারণেই তিনি বলেন ঃ “আল্লাহ্ আলীর মোকাবিলায় আমার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এ করণেই সে আমার আগে মারা গেছে _ খারেজীদের হাতে নিহত হয়েছে।” ইয়াযীদও এ ধরনের অপযুক্তির আশ্রয় নেয়। ইয়াযীদ তার দরবারে হযরত যায়নাব (আঃ)কে বলে ঃ “দেখলে তো আল্লাহ্ তোমার ভাইয়ের সাথে কী আচরণ করলেন? তিনি তার ওপরে আমাকে বিজয়ী করেছেন।”
মু’আবিয়াহ্ তাঁর বিশ বছর ব্যাপী হুকুমাতকালে যে প্রচারণা চালান তার মধ্যে একটা ভ্রমাত্মক অপযুক্তিমূলক প্রচার ছিলো এই যে, আলী (আঃ)-এর অনুসারী শিয়াদের উদ্দেশে বা কুফার অধিকাংশ লোকের মতো যারা শিয়া না হলেও তাঁর বিরোধীও ছিলো না, তাদের উদ্দেশে বলা হতো, দেখো, আলীর পাঁচ বছরব্যাপী হুকুমাতকালে এ শহরের অবস্থা কী হয়েছে; কী পরিমাণ রক্তপাত হয়েছে, কত নারী বিধবা হয়েছে, কত শিশু ইয়াতীম হয়েছে, কৃষকরা কৃষিকাজে যেতে না পারায় কত কৃষিভূমি অনাবাদী হয়ে গেছে ও কৃষি বিনষ্ট হয়েছে, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর এখন অর্থনৈতিক দিক থেকে তোমরা পিছিয়ে গেছো। এসব সমস্যার জন্য দায়ী কে? আলী যদি শুরুতেই আমার সাথে আপোস করতো, সন্ধি করতো, তাহলে না যুদ্ধ সংঘটিত হতো, না রক্তপাত ঘটতো, না এসব দুর্ভাগ্য চেপে বসতো, না এতো নারী বিধবা হতো, না এতো শিশু ইয়াতীম হতো, না এতোকিছু ধ্বংস হতো, না এভাবে অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা চেপে বসতো।
এ ধরনের প্রচারের প্রভাব খুবই বেশী। এমনকি স্বয়ং হযরত আলী (আঃ)-এর যুগেও মু’আবিয়ার পক্ষ থেকে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর অপযুক্তিমূলক প্রচার চালানো হয়। আপনারা এ প্রসঙ্গে ‘নাহ্জুল্ বালাগ্বা’য় উলি্লখিত হযরত আলী (আঃ)-এর উক্তি নিয়ে চিন্তা করে দেখুন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, আলী (আঃ) কোন বিষয় নিয়ে তাঁর বন্ধুদের প্রতি অনুযোগ করতেন। তিনি বলেন ঃ “আমি গ্রীস্মকালে তোমাদেরকে বলি যে, ‘চলো যুদ্ধে যাই’, তোমরা বলো, ‘এখন খুব বেশী গরম’। শীতকালে বলি যে, ‘চলো যুদ্ধে যাই’, তখন বলো যে, ‘এখন ভীষণ শীত; অপেক্ষা করো আবহাওয়া ভালো হোক; আমাদের কৃষিকাজ পিছিয়ে গেছে, আমাদের ফসল এখনো মঠে রয়ে গেছে’।”
হযরত আলী (আঃ) বেশ কয়েক জায়গায় লোকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অনুযাগ করেন। আসলে মু’আবিয়াহ্ যে প্রচার চালাচ্ছিলেন তার প্রভাবেই তারা এমনটা করতো। তৎকালে হযরত আলী (আঃ)-এর হুকুমাতের আওতাধীন ইরাকের অভ্যন্তরে মু’আবিয়ার এজেন্টরা এ ধরনের প্রচার চালাতো এবং লোকদেরকে আলী (আঃ)-এর অবাধ্য করে তুলতো, আর তাদের মধ্যে বিদ্রোহ ও তাঁর প্রতি অসন্তুষ্টির ক্ষেত্র তৈরী করতো।
আচ্ছা, আজকের দিনে কি এ ধরনের অপপ্রচারের দৃষ্টান্ত নেই? আপনারা পত্রপত্রিকায় এ ধরনের মন্তব্য অনেক পড়ে থাকবেন যে, খোররাম্ শহর বিজয়ের পর যদি ইমাম যুদ্ধ বন্ধ করে দিতেন তাহলে আমাদের জন্য এত সমস্যা সৃষ্টি হতো না। যেই নেহ্যাতে আযাদী দল ও ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতারা _ যাদের সম্পর্কে হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) বলেছিলেন যে, এরা মুনাফিকদের চেয়েও অধম, তারা এখন পর্দান্তরালে দেশের নীতিনির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অনেকে নাম পরিবর্তন করে এবং অনেকে নাম পরিবর্তন না করেই তাদের ভূমিকা পালন করছে ও এ ধরনের কথাবার্তা বলছে।
এদের প্রচারের মূল কথা কী? তারা বলে, এ যুদ্ধ যদি চালিয়ে যাওয়া না হতো তাহলে আমাদের ওপর এতো দুর্ভাগ্য চেপে বসতো না। এ যুদ্ধের জন্য দায়ী কে? তারা বলে ঃ মোল্লারাই দায়ী। মোল্লাদের সরকার ছিলো, তাই জনগণের ওপর এ যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে রেখেছিলো। যদি আরো আগেই সন্ধি করতো, যুদ্ধ বন্ধ করতো তাহলে এ অবস্থা হতো না। এখন যে সব অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ফল। এরা এখনো যদি আমেরিকার সাথে আপোস করে তাহলে আমাদের সমস্যাবলীর সমাধান হয়ে যায়।
যদিও এসব বিষয় নিয়ে বার বার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সর্বোত্তমভাবে জবাব দেয়া হয়েছে, তথাপি যাদের লজ্জা-শরমের বালাই নেই তারা বার বার একই কথার পুনরাবৃত্তি করছে। এদের কৌশল হচ্ছে সেই মু’আবিয়ারই প্রচার কৌশল। মু’আবিয়ার প্রচার কৌশল ছিলো এই যে, একটা মিথ্যা কথা ছেড়ে দেবার পর তার মিথ্যা হওয়ার বিষয়টি যদি প্রকাশ্য দিবালোকের ন্যায়ও সুস্পষ্ট থাকতো তা সত্ত্বেও বার বার তার পুনরাবৃত্তি করা হতো। ফলে ধীরে ধীরে তা চালু হয়ে যেতো এবং জনগণ তাকে সত্য বলে গ্রহণ করতো। এরাও ঠিক একই নীতি অনুসরণ করছে।
কোনো কোনো বিষয়ে সম্মানিত রাহবার তাঁর বিভিন্ন ভাষণে সুস্পষ্ট ভাষায় কতগুলো বিষয় তুলে ধরেছেন এবং অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছন। উদাহরণ স্বরূপ, আমেরিকার সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে তিনি গত বছর বিস্তারিত বক্তব্য রেখেছেন। অন্যান্য লেখকগণও ঐতিহাসিক দলীল-দস্তাভেয ও যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছেন যে, আমেরিকার সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর সমাধান তো হবেই না, বরং সমস্যাবলী দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। আপনারা অন্যান্য দেশে এর দৃষ্টান্ত দেখুন। তুরস্ক কি আমেরিকার অনুগত দেশ নয়? তুরস্কের জনগণ ধর্মঘট করেছে; জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সেখানকার শ্রমিকরা তাদের বেতন শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বৃদ্ধি করার দাবী জানিয়েছে। এই হলো আমেরিকার নয়নমণি তুরস্কের অবস্থা।
এই তুরস্ক ছিলো বিশ্বের বৃহত্তম ইসলামী দেশ। এ দেশটি ছিলো ওসমানী খেলাফতের কেন্দ্রভূমি। কিন্তু এই দেশটিকেই আমেরিকা এমনভাবে লাঞ্ছিত করেছে যে, দেশটি এখন ইসরাঈলের উচ্ছিষ্টভোগীতে পরিণত হয়েছে। এ দেশটিকে ইসরাঈলের গোলামী করতে হবে যাতে ইসরাঈল তাকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র দেয়। কিন্তু এসব দেখেশুনেও কি এসব লোকের হুশ হয়? এরা এরপরও বলে ঃ “আমাদের সমস্যা এ কারণে যে, আমরা আমেরিকার সাথে আপোস করি নি। আমরা যদি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করি তাহলে আমাদের সমস্যাবলীর সমাধান হয়ে যাবে।”
এ হচ্ছে ঠিক সে ধরনেরই কথা যা মু’আবিয়াহ্ বলতেন। অবশ্য মু’আবিয়ার শাসনামলে আমেরিকার সাথে সম্পর্কের ব্যাপার ছিলো না, আর তাঁর সঙ্গীসাথীরাও নেহ্যাতে আযাদী বা ফ্রিডম মুভমেন্ট দল ছিলো না। কিন্তু আপনারা মিলগুলো দেখুন। তারা যুদ্ধের বিরোধী ছিলো। তারা আল্লাহ্ তা’আলার দেয়া বিধিবিধান ও দণ্ডবিধি কার্যকর করার বিরোধী ছিলো। তাদের আপত্তি ছিলো এখানে যে, হযরত আলী (আঃ) কেন কাফেরদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন না? হযরত আলী (আঃ) বলতেন ঃ “ইসলামী শাসকের দায়িত্ব সব কিছুর আগে ইসলামের হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করা ও ইসলামী মূল্যবোধ সমূহের হেফাযত করা। কেবল এর পরেই আসবে অর্থনীতি ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানের পালা।” কিন্তু তারা বলতো, প্রথমে কৃষি ও ব্যবসা, এরপর যদি সম্ভব হয় তাহলে জিহাদ উপস্থিত হলে তখন জিহাদেও যাবো, নয়তো সন্ধি করবো।” আজকের যুগে মু’আবিয়ার যুক্তির অনুসারী কারা? আর আলী (আঃ)-এর যুক্তির অনুসারী কারা?
দুই ধারায় প্রবাহিত মিঠা পানি, লোণা পানি
সৃষ্টিকুলের তরে প্রবাহিত রবে প্রলয় দিবস তক।
মু’আবিয়াহ্ এ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে লোকদেরকে হযরত আলী (আঃ) সম্বন্ধে, তাঁর হুকুমাত সম্বন্ধে, আলীর পুত্রের হুকুমাত সম্বন্ধে ও হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর বংশধরদের সম্বন্ধে নিস্পৃহ করে দেন। এভাবে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয় যে, মু’আবিয়াহ্ স্বয়ং হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর সামনেই তাঁর তুলনায় ইয়াযীদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।
এহেন পরিস্থিতিতে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর পক্ষে কী কাজ করা সম্ভব ছিলো? এ পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে যা করা সম্ভব ছিলো তা হচ্ছে তিনি কোনো না কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় ও নিভৃত গৃহকোণে কয়েক জন বাছাই করা লোককে অত্যন্ত গোপনে শিক্ষাদান ও পথনির্দেশ প্রদান করবেন। বিশেষ করে হজ্বের সময় যখন অনেক মানুষ জমায়েত হতো তখন তিনি মসজিদুল হারামে, বা আরাফাতে বা মীনায় জনতার ভীড়ের সুযোগে এ ধরনের লোকদের সাথে যোগাযোগ করতেন ও কথা বলতেন এবং কোনো নিভৃত কোণে ডেকে নিয়ে তাঁদেরকে শিক্ষা ও পথনির্দেশ দিতেন। তিনি এসব লোকের উদ্দেশে যে সব বক্তব্য রাখেন তার মধ্যে দু’টি বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। দৃশ্যতঃ মনে হয় যে, এ ধরনের একটি বৈঠক মীনায় অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) যে সব লোকের ওপর তাঁর কথার প্রভাব হতে পারে বলে মনে করতেন এমন একদল লোকের সাথে মু’আবিয়ার দৃষ্টির আড়ালে মীনায় বৈঠকে মিলিত হন। তিনি তাঁদেরকে বলেন ঃ “তোমরা আমার কথা শ্রবণ করো, তবে তা গোপন রেখো।”
হযরত ইমাম (আঃ) বুঝাতে চাইলেন যে, আমি তোমাদের কাছে একটা গোপনীয় কথা বলবো, অতএব, তোমাদেরকে তা গোপন রাখতে হবে; তা প্রকাশ করা যাবে না। আমি তোমাদের কাছে কোন্ গোপন কথা বলবো? আমি তোমাদের কাছে বলতে চাই যে, এ হুকুমাত ইসলামী হুকুমাত নয়। হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশে তাঁর পরে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসবে হযরত আলী (আঃ)কে মনোনীত করেন। কিন্তু মুসলমানরা তা গ্রহণ করে নি; তারা বললো যে, আমরা গণতান্ত্রিক হুকুমাত চাই। এরপর এক সময় মু’আবিয়াহ্ রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নিলেন এবং তিনি কোনো আইন-কানুনই মেনে চললেন না। তোমরা দেখতে পাচ্ছো, মু’আবিয়াহ্ কেমন অন্যায় ও যুলুম করে চলেছেন এবং কীভাবে ইসলামের আহ্কাম পরিত্যাজ্য হয়েছে এবং ইসলামের পবিত্র বিষয়গুলোর প্রতি অসম্মান দেখানো হচ্ছে।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) বললেন, আমি তোমাদেরকে শুধু এতটুকু বলতে চাই যে, তোমরা জেনে রাখো, এ হুকুমাত হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। আমি তোমাদেরকে বলছি না যে, তোমরা এখনই অভু্যত্থান করো। তোমরা আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনো, তবে গোপন রেখো; কাউকে বলো না যে, হোসাইন আমাদেরকে এই এই কথা বলেছেন। তোমরা গোপনীয়তা রক্ষা করো। “এরপর তোমরা তোমাদের নিজ নিজ দেশের ও নিজ নিজ গোত্রের সেই সব লোকের কাছে ফিরে যাও যাদেরকে তোমরা বিশ্বাস করো ও নির্ভরযোগ্য মনে করো এবং তোমরা যা জানতে পারলে সেদিকে তাদেরকে আহ্বান করো।” অর্থাৎ তোমরা নিজ নিজ গোত্রের মধ্য থেকে সেই ধরনের বিশ্বস্ত লোকদেরকে খুঁজে বের করো যারা তোমাদের কথার গোপনীয়তা রক্ষা করবে ও কখনোই তা প্রকাশ করবে না এবং তোমরা যা কিছু জানো ও আমি তোমাদেরকে যা বলছি ও তোমরাও তা স্বীকার করছো সেই সব কথা তাদেরকে বলো।
প্রশ্ন হচ্ছে, এতসব গোপনীয়তা এবং গোপনীয়তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করার কারণ কী? হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) কি এর মাধ্যমে তাঁর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চাচ্ছিলেন? না; তিনি জানতেন যে, তখন পরিস্থিতি কেমন ছিলো। তিনি কেন এ কথা বলছেন তার ব্যাখ্যাও প্রদান করেন। তিনি বলেন ঃ “আমি ভয় করছি যে, এ সত্য নিষপ্রভ হয়ে যাবে ও শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যাবে।” আমি ভয় করছি যে, লোকেরা হয়তো এ কথা ভুলে যাবে যে, ইসলাম সত্য এবং জানতে পারবে না যে, ইসলাম কী ছিলো? ইসলামী হুকুমাত কী ছিলো? ইসলামী মূল্যবোধ সমূহ কী ছিলো?
হুকুমাত যখন মু’আবিয়ার হাতে ছিলো এবং হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর পক্ষে সংগ্রাম ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব ছিলো না, কারণ, তিনি মুখ খুললেই তাঁকে গুপ্তহত্যা করা হতো এবং তাঁর গুপ্তহত্যার ফলে ইসলাম মোটেই লাভবান হতো না _ এহেন পরিস্থিতিতে তিনি লোকদের সাথে একজন একজন করে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতেন এবং কখনো কখনো কয়েক জনকে এক জায়গায় একত্র করতেন। তিনি তাঁদেরকে তাঁর এ তৎপরতা ও বক্তব্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বলতেন। তিনি বলতেন, আমার ভয় হচ্ছে, পাছে ধরনীর বুকে সত্য পুরোপুরি বাসি ও বিস্মৃত হয়ে না যায় এবং এমন না হয়ে দাঁড়ায় যে, সত্য কী তা কারোই জানা থাকবে না।
জনগণ যদি সত্যকে চিনতে পারে, কিন্তু প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা, পদপূজা ও প্রবৃত্তিপূজা তাদেরকে তদনুযায়ী আমল করতে না দেয়, তো সে ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরামের জন্য কাজ সহজ হয়ে আসে। কারণ, জনগণের ওপর হুজ্জাত পূর্ণ হয়ে গেছে এবং ওলামায়ে কেরামের ওপর আর দায়িত্বের বোঝা থাকছে না, যেহেতু জনগণ সত্যকে চিনতে পারা সত্ত্বেও তদনুযায়ী আমল করছে না। কিন্তু সত্য যেখানে বিস্মৃত হওয়ার পথে সেখানে ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের পক্ষে যদি প্রকাশ্যে সত্যের কথা বলা সম্ভবপর হয় তাহলে অন্ততঃ এই যুক্তিতে তাঁরা নিজেদেরকে সান্ত্বনা দিতে পারবেন যে, “আমি তো আমার দায়িত্ব পালন করেছি।” সে ক্ষেত্রে বড়জোর এই হবে যে, তাঁকে হত্যা করা হবে এবং শেখ ফজলুল্লাহ্র ন্যায় ফাঁসিতে ঝুলানো হবে। ইসলামের দুশমন অপশক্তি এর চেয়ে বেশী কিছু তো আর করতে পারবে না। কিন্তু তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারবেন এই ভেবে যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। শেখ ফজলুল্লাহ্ কি উদ্বিগ্ন ছিলেন? তিনি এই ভেবে পুরোপুরি নিরুদ্বিগ্ন ও নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু যে অবস্থায় সত্য কথা বলা যায় না এবং সত্যপন্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়; বস্তুতঃ মিথ্যা অপবাদ দেয়া খুবই সহজ কাজ; এ উদ্দেশ্যে অপবাদের হুল ফুটানো হয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কথায় যেন কোনোরূপ প্রভাব সৃষ্টি না হয়; এহেন অবস্থায় কথা বলা আর না বলা সমান হয়ে দাঁড়ায়। এহেন পরিস্থিতিতে যদি কথা বলেন তো তার পরিণতি হচ্ছে নিহত হওয়া এবং তা পরিস্থিতির ওপর কোনোই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতি সত্যপন্থীদেরকে চরম মনঃকষ্টে নিক্ষেপ করে এবং হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এ ধরনের চরম মনঃকষ্টের মধ্যে ছিলেন।
আপনারা অন্তর থেকে বলুন, কোন্টি অধিকতর যন্ত্রণাদায়ক, এভাবে মনঃকষ্টে ভোগা ও মযলুম অবস্থা, নাকি আশূরার দিনে নিহত হওয়া? হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) দীর্ঘ বিশ বছর যাবত, বিশেষ করে হযরত ইমাম হাসান (আঃ)-এর শাহাদাত পরবর্তী দশ বছর এভাবে চরম মর্মান্তিক মনঃকষ্ট সহ্য করেন।
ইমাম হোসাইন (আঃ) বলেন ঃ “আমি ভয় করছি যে, এ সত্য নিষপ্রভ হয়ে যাবে ও শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যাবে।” এরপর এ বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় তিনি বলেন ঃ অবশ্য চূড়ান্ত পরিণামে আল্লাহ্র দ্বীনের বিজয়ের ব্যাপারে আমি ইয়াকীন পোষণ করি, কারণ, “আর আল্লাহ্ তাঁর জ্যোতিকে পরিপূর্ণ করে দেবেন যদিও কাফেররা তা অপসন্দ করে।” কিন্তু এরা যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তাতে সত্য বিলুপ্ত হবার ও বিস্মৃত হবার অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আপনারা লক্ষ্য করুন, ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর জন্মস্থান মদীনায় _ যেখানে লোকেরা তাঁকে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর কাঁধে চড়তে দেখেছে সেখানে তাঁর নিজের গৃহে বসে কথা বলতে পারছেন না। তাই তাঁকে হজ্বের সময় মীনায় এসে কয়েক জন লোককে নিয়ে বৈঠক করে তাঁদের সাথে গোপনে কথা বলতে হচ্ছে।
আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে হজ্বের সফরে ইসলামী জাহানের কয়েক জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির সামনে তাঁর ভাষণ। তিনি এ সফরের সময় একটি অবকাশ পেয়ে যান এবং তা কাজে লাগাবার উদ্যোগ নেন। তিনি তাঁর বন্ধু ও সমর্থকদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোককে বেছে নেন এবং তাঁদের সাথে গোপনে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি তাঁদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। ইনশা আল্লাহ্, পরবর্তী আলোচনায় ইমাম (আঃ)-এর ভাষণের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করবো। এখানে কেবল এ ভাষণের একটি অংশের ওপর আলোকপাত করছি।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) উক্ত বৈঠকে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন করো নি। তোমরা “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ী ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর কাজ করছো না। তোমরা তোমাদের ধনসম্পদ ও প্রাণের ক্ষতি হবার ভয় করছো। এরপর তিনি তাঁর ভাষণের শেষ পর্যায়ে এই বলে আল্লাহ্ তা’আলার নিকট মুনাজাত করেন ঃ “হে আল্লাহ্, তুমি তো জানো যে, আমরা যা কিছু করেছি তা আধিপত্যের প্রতিযোগিতা নয় এবং তা পার্থিব চাকচিক্যের উদ্দেশ্যেও নয়।”
নিঃসন্দেহে আপনারা বক্তা ও ওয়ায়েযদের মুখ থেকে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর এ কথাগুলো বহু বার শুনে থাকবেন। হযরত ইমাম (আঃ) তাঁর দুই হাত তুলে আল্লাহ্ তা’আলার উদ্দেশে বলেন, হে আল্লাহ্, তুমি তো জানো আমার পিতার আমল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আমরা যে কাজগুলো করেছি তার উদ্দেশ্য এ ছিলো না যে, তুচ্ছ এ দুনিয়ার জন্য লোকদের সাথে প্রতিযোগিতা করবো। আমরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বা পদ লাভের জন্য প্রতিযোগিতায় নামি নি। আর দুনিয়ার চাকচিক্য তথা পার্থিব ধনসম্পদ বৃদ্ধি করাও আমাদের উদ্দেশ্য নয়। “বরং এর উদ্দেশ্য এই যে, আমরা তোমার দ্বীনের নিদর্শনাদি দেখাবো এবং তোমার এ ভূখণ্ডে ‘ইছ্লাহ্’কে প্রকাশিত করবো।” আমাদের এ সকল কাজের উদ্দেশ্য প্রথমতঃ এই যে, আমরা দ্বীনের নিদর্শনাদিকে, দ্বীনের ভিত্তি সমূহকে ও মূল্যবোধ সমূহকে জনগণের সামনে তুলে ধরবো এবং এভাবে আমাদের পথনির্দেশনার দায়িত্ব পালন করবো যাতে মানুষ হককে বাতিল থেকে আলাদা করে চিনতে পারে এবং হক যেন এই ঘন মেঘ সমূহের আড়ালে ও ঘোলা পানির মধ্যে হারিয়ে না যায়। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা ‘ফাছাদ’ কাজ সমূহকে আমাদের সাধ্যানুযায়ী ‘ইছ্লাহ্’ করবো এবং সমাজে যে সব বাতিল ও অন্যায় কাজ, যত নাজায়েয কাজ সম্পাদিত হচ্ছে সেগুলোকে প্রতিরোধ করবো। আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, এ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে যাতে “তোমার মযলুম বান্দাহ্রা নিরাপত্তা লাভ করে।”
এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করুন, মু’আবিয়াহ্ হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে বলেন ঃ তুমি যদি ইয়াযীদের অনুকূলে বাই’আত্ হও তাহলে সমাজের নিরাপত্তা রক্ষিত হবে। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আঃ) বলছেন ঃ তুমিই তা জনগণের নিরাপত্তা নস্যাৎ করেছো; তুমি জনগণের জান, মাল ও ইজ্জতের ওপরে হামলা করেছো।
বুস্র্ বিন্ আর্ত্বাহ্ যখন মদীনায় আসে তখন সে মুহাজির ও আনছার মেয়েদের দিকে হাত বাড়ায়।
অনেক সময় কেউ কেউ বলে ঃ মিম্বারে বসে কেন নোংরা বিষয়ে কথা বলছো? তাহলে কী বলবো? হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ওফাতের পর কয়েক দশকের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ্র খলীফার নামে মদীনার মেয়েদের ওপর চড়াও হলো। এহেন অবস্থায়ও মু’আবিয়াহ্ ইমাম হোসাইন (আঃ)কে বললেন ঃ তুমি ইয়াযীদের অনুকূলে বাই’আত হলে সমাজের নিরাপত্তা সংরক্ষিত হয়। আর ইমাম হোসাইন (আঃ) বলেন ঃ আমরা এ উদ্দেশ্যে অভু্যত্থান করবো যে, মযলুম লোকেরা যেন নিরাপত্তা লাভ করে।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর মুনাজাতে আরো বলেন ঃ “আর তারা যেন তোমার ফরয সমূহ, সুন্নাত সমূহ ও আহকাম পালন করে চলে।” যাতে সমাজে এসব বাস্তবায়িত হয় _ এটাই আমাদের লক্ষ্যে, অর্থ বা পদ-ক্ষমতা করায়ত্ত করা আমাদের লক্ষ্য নয়। নিজেদের জীবন বিপন্ন করার ও নিজেদেরকে অস্ত্রের লক্ষ্যে পরিণত করার পিছনে আমাদের উদ্দেশ্য আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা নয়। বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও দ্বীনের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে তার লক্ষ্য অর্থ-সম্পদ ও পদ-ক্ষমতা অর্জন হতে পারে না। যে ব্যক্তি নিহত হয় তার নিহত হবার পর অর্থ-সম্পদ ও পদমর্যাদা তার কী কাজে লাগে? আমাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা এই যে, সমাজে আল্লাহ্র দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর ভাষণের ধারাবাহিকতায় সেখান উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ বলেন ঃ “অতএব, তোমরা যদি আমাদেরকে সাহায্য না করো এবং আমাদের প্রতি ইনছাফ না করো তাহলে যালেমরা তোমাদের ওপর শক্তিশালী হবে।” এখানে হযরত ইমাম কোন্ পরিবেশে তাঁর বাছাইকৃত সমাজের শীর্ষস্থানীয় লাকদের সামনে কথা বলছেন? তা হচ্ছে, এরা ইমামের সাথে সংগ্রামে যোগদান না করলে তাদের ওপর যালেম অপশক্তি বিজয়ী হবে। তিনি তাঁর এ বাক্যের ধারাবাহিকতায় বলেন ঃ “আর তোমাদের নবীর নূরকে নিভিয়ে ফেলার চেষ্টা করবে।”
এভাবে ইমাম (আঃ) তাঁদের কাছে জানতে চান যে, এ ধরনের পরিণতি মেনে নিতে তোমরা প্রস্তুত আছো কি? তোরা যদি তা না চাও তাহলে আমাদেরকে এভাবে একা ফেলে রেখো না এবং অন্ততঃ মুখের কথা দ্বারা আমাদেরকে সমর্থন জানানোর ব্যপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগো না। তোমরা যদি আমাদেরকে সাহায্য না করো তাহলে তোমাদেরকে এমন একদিনের সম্মুখীন হতে হবে যখন যালেমরা তোমাদের ওপর পুরোপুরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে এবং এরপর আর কেউ তোমাদের কথা শুনবে না।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) দীর্ঘ বিশ বছর যাবত মদীনায় এভাবে জীবন যাপন করেন। তিনি নামাযে জুম’আয় খোত্বাহ্ দিতে পারতেন না, কারণ, তাঁর জন্য এর অনুমতি ছিলো না। জুম’আ নামাযের খতীব মু’আবিয়ার পক্ষ থেকে মনোনীত হতো এবং সে খতীবের জন্য হযরত আলী (আঃ)-এর ওপর লা’নত বর্ষণ করা বাধ্যতামূলক ছিলো, আর হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে তা বসে বসে শুনতে হতো।
এহেন পরিস্থিতিতে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) যদি অভু্যত্থান করতেন তাহলে তার চূড়ান্ত পরিণতি হতো এই যে, এমনকি তাঁর এ অভু্যত্থান যদি সর্বাত্তম ও লাভ করতো তো তা হতো এই যে,তৎকালীন সমাজে যে স্বল্পসংখ্যক মানুষ ভালো লোকদেরকে পসন্দ করতো তারা তাঁর নিহত হবার পর আফসোস্ করে বলতো যে, “আহা! আমরা ইমাম হোসাইনের মতো লোককে হারালাম!” এর কিছুদিন পর তাঁর নাম বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতো।
আপনারা যারা হযরত আলী (আঃ)কে ভালোবাসেন তাঁদের মধ্যে ক’জন আম্র্ বিন্ হামেক্বের নাম শুনেছেন? আপনারা এখানে যে, কয়েক অযুত সংখ্যক লোক উপস্থিত আছেন, আপনাদের মধ্য থেকে ক’জন আম্র্ বিন্ হামেক্ব বা রাশীদ্ হাজারী সম্পর্কে জানেন? হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) যদি ঐ পরিস্থিতিতে অভু্যত্থান করতেন তাহলে তিনিও তাঁদের মধ্যকার একজন বলে গণ্য হতেন।
হযরত ইমাম যায়নুল আবেদীন (আঃ)-এর পুত্র যায়েদ বিন্ আলী ইবনুল হোসাইনের অবস্থা কী হলো? আপনারা যায়েদ বিন্ আলী ইবনুল হোসাইনের ইতিহাস কতটুকু জানেন? তাঁর জন্য কী পরিমাণ শোকপ্রকাশ ও শোকানুষ্ঠান করছেন? এ পর্যন্ত কি কখনো যায়েদ বিন্ আলী ইবনুল হোসাইনের জন্য কোনো শোকানুষ্ঠান হয়েছে লোকেরা যেখানে তাঁর জন্য অশ্রুপাত করেছে? তিনি অভু্যত্থান করলেন এবং নিহত হলেন। এরপর তাঁর লাশকে ফাঁসিতে ঝুলানো হলো এবং এভাবে বেশ কিছুদিন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখা হলো।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)ও যদি মু’আবিয়ার শাসনামলে অভু্যত্থান করতেন তাঁর অবস্থাও এমনই হতো। প্রথমতঃ জনগণ তাঁর ডাকে সাড়া দিতো না। কারণ, মু’আবিয়াহ্ ছিলেন খুবই সতর্ক ও কূটবুদ্ধির অধিকারী ব্যক্তি; তিনি ইয়াযীদের মতো ছিলেন না যে প্রকাশ্যে মদ পান করতো। এমনকি তিনি হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে পর্যন্ত “নাহ্য়ী ‘আনিল্ মুন্কার্” বা মন্দ কাজে নিষেধ করার ভান করেন; তাঁকে বলেন ঃ “তুমি ইয়াযীদের গীবত করো না।”
মনে পড়ছে, হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের শুরুর দিকে তিনি যখন শাহের দোষত্রুটি ও অপরাধ তুলে ধরেন তখন সুফী ধরনের কিছু আলেম বলছিলেন ঃ “জানি না এইসব গীবত শোনা জায়েয আছে কিনা।” আজকের দিনেও, ক্ষমতাসীনদের দোষ বলা তো দূরের কথা, এমন অনেক লোক আছে যারা তাদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি, বক্র চিন্তা ও অন্ধকার দৃষ্টিকোণের কারণে দিশা হারিয়ে ফেলে এবং বুঝতে পারে না যে, কোথায় ও কীভাবে “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ী ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর দায়িত্ব পালন করবে। এ জন্য আমি ও আমার মতো লোকেরাও অনেকখানি দায়ী, কারণ, আমরা এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে তুলে ধরি নি।
হ্যা, হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) যে মু’আবিয়ার যুগে অভু্যত্থান করেন নি তার কারণ এই যে, তখনকার পরিস্থিতি এমন ছিলো না যে, তাঁর পক্ষে স্বীয় মযলুম অবস্থা ও শাহাদাতের মাধ্যমে স্বীয় উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ও বাণীকে ইতিহাসে যথোপযুক্তভাবে লিপিবদ্ধ করানো সম্ভব হতো যার ফলে তা অমর হতে পারতো ও ইতিহাসের কোনো ক্ষুদ্র কোণে হারিয়ে যেতো না। কিন্তু ইয়াযীদের যুগে তিনি ভালোভাবে হিসাব-নিকাশ করেই অভু্যত্থান করেন। অবশ্য এ ব্যাপারে তাঁর সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা ছিলো এবং এ ব্যাপারে বিপুল সংখ্যক সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, শুরু থেকেই ইমাম হোসাইন (আঃ) জানতেন যে, তিনি কী করতে যাচ্ছেন। তিনি তাঁর সঙ্গীসাথীদের কাছে তা বার বার উল্লেখ করেন এবং পথেও তিনি বেশ কয়েক বার উল্লেখ করেন যে, তাঁর এ সফরের পরিণাম হচ্ছে শাহাদাত। তবে এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা’আলার নিখুঁত পরিকল্পনাও ছিলো এই যে, হোসাইন (আঃ) এভাবে শহীদ হবেন যার ফলে অনন্ত কাল পর্যন্ত তিনি এমন এক প্রদীপের ন্যায় দেদীপ্যমান থাকবেন যা সকল জগতকে সকল যুগেই এমনভাবে আলো দান করবে যে, শুধু মুসলমানরা নয়, এমনকি কাফেররা, মূর্তিপূজারীরা, ইয়াহূদীরা ও খৃস্টানরা পর্যন্ত হোসাইনের কথা বলবে ও বাস্তবে তারা বলছে, আর আপনারাও বুযুর্গদের কাছ থেকে ও ওয়ায-নছিহতে বহু বার শুনেছেন এবং এ ব্যাপারে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে।
অতএব, এটা কীভাবে সম্ভব হলো যে, লোকেরা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে হত্যার জন্য উদ্যোগী হলো? _ এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে এই যে, কিছু লোক প্রলোভনের মুখে অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যায়, ঠিক আজকের দিনে যেভাবে কেউ কেউ অর্থ নিয়ে মজলিসে হাযির হয় ও ভোট ক্রয় করে; এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে এবং কেউ তা অস্বীকার করে নি। কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে যে, বুশেহ্র্ ও নাকা-র পার্লামেন্ট সদস্য বলেছেন ঃ “আমার কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, অমুকের পক্ষে ভোট দিন ও এই পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করুন।” কেউ এর প্রতিবাদ করে নি।
ঐ যুগেও মু’আবিয়াহ্ লোকদেরকে দলে টানার জন্য অর্থ প্রদান করতেন ও লোকদেরকে ক্রয় করতেন। অন্য একদলকে তিনি ভয় দেখিয়ে ঠাণ্ডা করেন। তিনি কিছু লোকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত পৈশাচিক কায়দায় ও নির্মমভাবে হত্যা ও নির্যাতনের আশ্রয় নেন। এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত বিগত আলোচনায় উল্লেখ করেছি। এভাবে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।
মোদ্দা কথা, সকল যুগেই প্রচারণা ও বিশেষ কৌশলের সাহায্যে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা হয়েছে। তৎকালীন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণ এভাবেই প্রচারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে, প্রচারণার দ্বারা লোকদের মন-মগয ও চিন্তাশক্তিকে করায়ত্ত করে নেয়া হয়। অন্যদিকে কিছু লোক অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে যায় এবং অন্যরা ভীতি ও আতঙ্কের কারণে নীরব হয়ে যায়। ফলে মানুষের মধ্যে আর স্বাধীন ইচ্ছা, স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অবশিষ্ট রইলো না।
মুসলিম বিন্ ‘আক্বীল্ কুফায় এলেন এবং লোকদের সামনে বক্তৃতা করলেন; তাদের কাছে সব কিছু ব্যাখ্যা করলেন। তারাও তাঁর নিকট হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর অনুকূলে বাই’আত্ হলো। কিন্তু তারা সকালে বাই’আত্ হলো, আর রাতে তা ভঙ্গ করলো। আর এভাবেই, ইতিপূর্বে যারা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর বরাবরে পত্র লিখে তাঁকে হুকুমাতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য দাওয়াত করেছিলো পরে তারাই তাঁর বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে তুলে নিলো এবং তাঁকে শহীদ করলো। এরাই ইয়াযীদের পক্ষে কারবালায় উপস্থিত হওয়া ও হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর রক্ত ঝরানোর জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলো।
আশূরার দিন সকালে ইয়াযীদী বাহিনীর সেনাপতি ওমর্ বিন্ সা’দ্ যখন তার সৈন্যদেরকে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর তাঁবুর ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেয়ার আগে প্রথমে তথাকথিত নামায আদায় করে, তারপর সে তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলে ঃ “হে আল্লাহ্র অশ্বারোহী সৈন্য! ওঠো, সওয়ার হও এবং বেহেশতে গিয়ে সেখানকার পানীয় পানে পরিতৃপ্ত হও।”
যে সব লোক হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর রক্তপাতের জন্য কারবালায় এসে জমা হয়েছিলো ওমর্ বিন্ সা’দ্ তাদেরকে সম্বোধন করছে “আল্লাহ্র অশ্বারোহী” বলে! আর তাদেরকে ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর হত্যার বিনিময়ে বেহেশতের সুসংবাদ দিচ্ছে! এর কারণ? কারণ, তাহলে ওমর্ বিন্ সা’দ্ রেই-এর অর্থাৎ বর্তমানে যা তেহরান সেখানকার, রাজত্ব লাভ করতে পারবে। তার রেই-এর রাজত্ব লাভের খাতিরে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে হত্যা করা বেহেশতে যাবার উপায় হয়ে দাঁড়ায়! আর তার সৈন্যরা হয়ে যায় “আল্লাহ্র অশ্বারোহী সৈন্য”!
আমাদেরকে এ সব ঐতিহাসিক ঘটনা ও কাহিনী থেকে আমাদের জীবনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) দীর্ঘ তেরোশ’ বছরেরও বেশীকাল পূর্বে নিহত হন এবং ইয়াযীদও হারিয়ে গেছে। বিন্তু আমাদেরকে এসব শোকানুষ্ঠানকে কাজে লাগাতে হবে। আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে, আমাদের করণীয় কী? না ইয়াযীদ শেষ হয়ে গেছে, না ওমর্ বিন্ সা’দ্ শেষ হয়ে গেছে, না তাদের নীতি ও কৌশলের কোনো পরিবর্তন ঘটেছে। পাশাপাশি শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে _ এইটি মিষ্টি পানি আর ঐটি লোণা পানি। লোক পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু নীতি সেই নীতিই রয়ে গেছে, খান্নাছ্রা সেই একই রকম খান্নাছ্। এরা বুযুর্গ ব্যক্তিদের গৃহে যায় আর ওয়াসওয়াসা দেয় ঃ ‘অমুক ব্যক্তির মর্যাদা কত বেশী! তিনি ইসলামের কত খেদমত করেছেন! এরা না থাকলে ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং আমেরিকা এসে ইরানকে ধ্বংস করে ফেলবে।’ এগুলো শিশুসুলভ কথা। প্রথমতঃ আমেরিকা যখন ইরানের ওপর আধিপত্যের অধিকারী ছিলো এবং সব কিছু তার হাতে ছিলো তখন কী করতে পেরেছিলো? এখন তো ইরানে ছয় কোটি মুসলমান আছে যারা বিপ্লব ও ইসলামকে ভালোবাসে। এখন কি আমেরিকা কিছু করতে পারবে? দ্বিতীয়তঃ এরা কি আল্লাহ্ তা’আলার অঙ্গীকারে আস্থা রাখে না? আল্লাহ্ তা’আলা যে বলেছেন ঃ “তোমরা যদি আল্লাহ্কে সাহায্য করো তাহলে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।” এ অঙ্গীকার কি মিথ্যা হয়ে গেছে? এ আয়াতের কি কোনো নতুন ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে?
আল্লাহ্র সাথে থাকুন, তাহলে আল্লাহ্ও আপনাদের সাথে থাকবেন। আপনারা যদি দুনিয়ায় ইজ্জত-সম্ভ্রম চান, তো তা আল্লাহ্র আনুগত্যের ছায়াতলেই রয়েছে। যদি আখেরাতের ইজ্জত-সম্মান চান তো তা-ও আল্লাহ্র গোলামীর ছায়াতলেই রয়েছে। দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্য কেবল হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর অনুসরণেই নিহিত রয়েছে।
হে পরোয়ারদগার! হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর ইজ্জতের উছিলায় তোমার কাছে আবেদন করছি,
ইসলাম ও মুসলমানদের মান-ইজ্জতকে দিনের পর দিন বৃদ্ধি করে দাও।
যে কেউই ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর খেদমত করে তাকে তোমার প্রিয়জনদের মধ্যে গণ্য করে নাও।
যে কেউ ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ও তাঁর লক্ষ্যের বিরুদ্ধে কাজ করে তাকেই ধ্বংস করে দাও।
আমাদের পরিণতিকে শুভ পরিণতিতে পরিণত করে দাও।
ইমাম খোমেইনীর ও শহীদগণের রূহকে কারবালার শহীদগণের সাথে হাশর করো।
সম্মানিত রাহবারের ছায়া আমাদের সকলের ওপরে স্থায়ী করে দাও।
ওয়াস্ সালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহ্মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।

Share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here