Home ইতিহাস পবিত্র আশুরা ও মহররম-৬

পবিত্র আশুরা ও মহররম-৬

453
0
SHARE

আশুরা উপলক্ষে ওস্তাদ আয়াতু্ল্লাহ মিসবাহ তাকী ইয়াযদীর ষষ্ঠ বক্তব্য

66

শহীদানের নেতা হযরত আবা আব্দিল্লাহ্ আল্-হোসাইনের (আঃ) শোকাবহ ম্মৃতিময় দিনগুলোর আগমনে হযরত ইমাম মাহ্দী (আল্লাহ্ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন), মহান রাহ্বার, মহান মার্জা’এ তাক্বলীদগণ ও হোসাইনী আদর্শের ভক্ত অনুসারীদের সকলের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। আশা করি মহান আল্লাহ্ তা’আলা এ দুনিয়ায় ও পরকালে হযরত আবা আব্দিল্লাহ্ আল্-হোসাইনের সাথে আমাদের সম্পর্ককে কখনো দুর্বল হতে দেবেন না।
প্রিয় শ্রোতাদের খেদমতে আশূরা সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করেছি। সে আলোচনায় আমরা এ পর্যায়ে উপনীত হয়েছিলাম যে, সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর দুশমনরা _ প্রকৃত পক্ষে যারা ছিলো ইসলামেরই দুশমন, তারা যে খেলাফত ও বেলায়াতের সঠিক পথকে বিকৃত ও বিচু্যত করতে সক্ষম হয়েছিলো এবং এতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হতে পেরেছিলো যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর সন্তানকে ঐ রকম অবস্থায় শহীদ করতে পেরেছিলো, তার কারণ ছিলো তাদের ক্ষমতা ও পদমর্যাদার অপব্যবহার, সমকালীন পরিস্থিতি এবং তাদের অনুসৃত কর্মপন্থা ও তাদের ব্যবহৃত কলাকৌশল। এর ফলেই তারা তাদের লক্ষ্যে উপনীত হতে পেরেছিলো।
সংক্ষেপে বলা যেতে পারে যে, বনী উমাইয়াহ্র প্রশাসন প্রচার, ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন এবং প্রলোভন _ এই তিনটি উপাদান বা হাতিয়ার ব্যবহার করে সমাজকে পরিবর্তিত করে দিতে এবং এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলো যে, এর ফলে লোকেরা এত বড় বিপর্যয়ের শিকার হয়। যেহেতু ঐতিহাসিক পরিস্থিতি কম-বেশী মোটামুটি পুনরাবৃত্তিযোগ্য এবং অন্যান্য যুগেও তার সাথে তুলনীয় ঘটনাবলী সংঘটিত হয়ে থাকে, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই পূর্ববর্তী প্রশ্নের পরে অন্য একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তা হচ্ছে, সন্দেহ নেই যে, মু’আবিয়াহ্ প্রতারণা ও বিকৃতকরণ সহ প্রচারযন্ত্রের ব্যবহার করেন এবং প্রকৃত পক্ষে একদিকে তাঁর বিরোধী ব্যক্তিত্ববর্গকে গুপ্তহত্যা করান, অন্যদিকে প্রলোভন ও হুমকির আশ্রয় নেন। এভাবেই তিনি তাঁর তৎপরতা চালান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কী কারণে জনগণ প্রতারিত হলো? কী কারণে তারা প্রলোভনের শিকার হলো ও হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করলো?


বস্তুতঃ এ হচ্ছে আরেক ধরনের মনস্তাত্তি্বক ব্যাপার। প্রকৃত পক্ষে এ প্রশ্ন সেই একই প্রশ্ন। এখানে বিষয়টা ক্রিয়া ও তার ফলাফল গ্রহণ পর্যায়ের। তারা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে, আর জনগণ তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তারা ছিলো প্রচারণা, হুমকি ও প্রলোভনের নায়ক, আর জনগণ ছিলো এসবের শিকার; তারা এগুলো গ্রহণ করে। বিগত কয়েকটি আলোচনায় আমি তাদের এ জাতীয় তৎপরতার কথা সংক্ষেপে তুলে ধরেছি। এ প্রশ্নের অপর দিক হচ্ছে, জনগণ এর দ্বারা কীরূপ প্রভাবিত হয়েছিলো? হ্যা, তারা জনগণকে প্রতারিত করছিলো, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণ কেন এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছিলো? মু’আবিয়াহ্ ভীতি প্রদর্শন করছিলেন, কিন্তু জনগণ কেন ভীতি প্রদর্শনে প্রভাবিত হলো?
প্রশ্নের এ দিকটি আমাদের কাছে প্রধানতঃ একটি কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে, সম্ভবতঃ এ প্রশ্নের জবাবের আলোকে আমরা নিজেদেরকে এজন্য প্রস্তুত করবো যে, খোদা না করুন, যদি অনুরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে এবং ইসলামের দুশমনরা যদি একই হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করে ইসলামী বিপ্লবের সঠিক গতিধারাকে পরিবর্তিত করে দেয়ার চেষ্টা করে, তখন আমরা যাতে সচেতনভাবে তা মোকাবিলা করতে পারি, তখন আমরা যাতে দুশমনদের তৎপরতা দ্বারা প্রভাবিত না হই।
কিন্তু এ কথার মানে এ নয় যে, কেবল তখনি আমরা নিজেদেরকে প্রস্তুত করবো যখন দেখবো যে, আরেকজন মু’আবিয়ার, আরেক জন ইয়াযীদের আবির্ভাব হয়েছে, অথবা আরেক জন শীমার, আরেক জন ওমর বিন্ সা’দ্ বা আরেক জন ইবনে যিয়াদের আবির্ভাব হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটে না; বরং চেতনাগত দিক থেকে তার সাথে মিলে যায় এমন ঘটনা সংঘটিত হয়।
আপনারা হয়তো এ হাদীছটি শুনে থাকবেন। শিয়া ও সুন্নী উভয় মাযহাবের বিভিন্ন বর্ণনা ধারাক্রমে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি এরশাদ করেছেন ঃ “বনী ইসরাঈলের ক্ষেত্রে যা যা ঘটেছে আমার উম্মাতের বেলায়ও তা সংঘটিত হবে।” এরপর তিনি বলেন ঃ “এমনকি তারা যদি কোনো গোসাপের গর্তে প্রবেশ করে থাকে তাহলে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে।”
এর মানে এ নয় যে, অবশ্যই রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর যুগে একজন ফের’আউনের আবির্ভাব ঘটবে এবং সে বলবে ঃ “আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় খোদা।” এবং তিনি মূসা (আঃ)-এর যুগের একজন ফের’আউনের সাথে মোকাবিলা করবেন, আর অত সীমাহীন ধনসম্পদের অধিকারী একজন কারুনেরও আবির্ভাব ঘটবে যাতে লোকেরা অনুরূপ একজন কারুনের মুখোমুখি হতে পারে, তেমনি একজন সামেরীরও আবির্ভাব ঘটবে যে একটি দেবমূর্তি তৈরী করবে _ একটি বাছুর তৈরী করবে আর লোকদেরকে তার পূজা করতে বাধ্য করবে।
না, এ সবের হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু চেতনাগত দিক থেকে ঐ সব ঘটনার সাথে পুরোপুরি মিল আছে এমন ঘটনা সংঘটিত হবে। এতে এ কথাই বলতে চাওয়া হয়েছে। ইসলামের প্রথম যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত এ জাতীয় ঘটনার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। এসব ঘটনা হচ্ছে এমন দৃষ্টান্ত বনী ইসরাঈলের মধ্যে যে ধরনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো।
তেমনি আমরা যে বলছি, ইসলামের প্রথম যুগে যা সংঘটিত হয়েছিলো হয়তো পরেও তা ঘটবে _ এ কথার অর্থ এই নয় যে, হুবহু সেই ঘটনাবলীই সংঘটিত হবে অর্থাৎ শামে একজন মু’আবিয়ার আবির্ভাব ঘটবে আর তিনি তাঁর পুত্রকে তাঁর নিজের পরে সিংহাসনে বসাবার জন্য তৎপরতা চালাবেন এবং মু’আবিয়ার পরবর্তীতে যা যা ঘটেছিলো এ ক্ষেত্রেও সে সব সংঘটিত হবে। না, বরং এমন সব ঘটনা সংঘটিত হবে যে সব ঘটনার মূল সুর ও তার নায়কদের উদ্দেশ্য হবে মু’আবিয়ার উদ্দেশ্য ও তাঁর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাবলীর মূল সুরের অনুরূপ, আর যা মু’আবিয়াকে ঐ সব ঘটনা ঘটাতে ও ঐ সব তৎপরতা চালাতে বাধ্য করেছিলো অনুরূপ উদ্দেশ্য এ যুগেও কিছু লোককে অনুরূপ ঘটনা ঘটাতে বাধ্য করবে। আর মু’আবিয়াহ্ তাঁর লক্ষ্য হাসিলের জন্য যে সব কর্মপদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করেছিলেন এই লোকেরাও তা ব্যবহার করবে। ঐ যুগে জনগণ যেভাবে প্রভাব গ্রহণ করেছিলো এ যুগেও হয়তো মোটামুটি তদনুরূপই ঘটবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের জন্য জানা প্রয়োজন যে, সে যুগে জনগণ কেন প্রতারিত হয়েছিলো? কেন তারা হুমকি ও প্রলোভনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো? এর আলোকেই আমরা নিজেদেরকে প্রস্তুত করবো যাতে এ ধরনের পরীক্ষা উপস্থিত হলে _ কেউ আমাদেরকে ভয় দেখাতে চাইলে, বা আমাদেরকে প্রলোভন দেখাতে চাইলে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি।
এ প্রসঙ্গটি তৎকালীন পরিস্থিতির আলোকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করি। অবশ্য এটা একটা বিস্তারিত ও দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ আলোচ্য বিষয়। তবে আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত সহজতর একটি পথ আছে। তা হচ্ছে এ ব্যাপারে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) থেকে শিক্ষা গ্রহণ।
আমি আমার পূর্ববর্তী আলোচনায় উল্লেখ করেছি যে, ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর জীবনের সর্বশেষ বিশ বছর অর্থাৎ মু’আবিয়ার শাসনামলের বিশ বছরের মধ্যে প্রথম দশ বছর তাঁর ভাইয়ের পাশে এবং পরবর্তী দশ বছর একা মদীনায় কাটিয়েছিলেন। এ সময় তিনি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ও চাপের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি কতক লোককে বেছে নিয়ে তাঁদের সাথে সরকারের এজেন্টদের দৃষ্টির আড়ালে গোপনে বৈঠক করতেন। তিনি তাঁদের কাছে অনেক সত্য তুলে ধরতেন। তিনি তাঁদেরকে বলতেন ঃ “আমি এ কারণে তোমাদেরকে এসব বিষয় বলছি যাতে সত্য সেকেলে বা বাসি হিসেবে পরিগণিত না হয় এবং মানুষ তা ভুলে না যায়, আর মানুষ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম হয়ে না পড়ে।”
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর এ ধরনের একটি বৈঠক সম্বন্ধে ইতিহাসে বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। বর্ণনাকারীগণ বলেন ঃ “মীনায় আমাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে যুগের ওলামায়ে কেরাম ও শীর্ষস্থানীয় মুসলমানদের মধ্য থেকে বাছাই করা লোকদেরকে তাতে ডাকা হয়।”
এ থেকে ধারণা করা যায় যে, বেশ অনেক দিন যাবত কাজ করে এ লোকদেরকে বাছাই করা হয়েছিলো। এ লোকেরা তাঁর সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এরপর তিনি তাঁদেরকে মীনার কোনো এক জায়গায় একটি বৈঠকে একত্রিত করেন।
আপনারা জানেন, আপনাদের মধ্য থেকে যারা হজ্বে গিয়েছেন তাঁরা জানেন যে, মীনা কী রকম ভীড়ের জায়গা; সেখানে ভীড় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এ কারণে মীনায় অনেক কাজই হতো। ইমাম হোসাইন (আঃ) যখন চাইতেন যে, সরকারী কর্মকর্তা ও এজেন্টদের দৃষ্টির আড়ালে বৈঠক করবেন তখন তিনি মীনায় বৈঠক করতেন।
ইমাম হোসাইন (আঃ) উক্ত বৈঠকে এসব বাছাই করা ব্যক্তিদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। সৌভাগ্যক্রমে উক্ত বক্তৃতার কিছু অংশ ইতিহাসে উদ্ধৃত হয়েছে; এ বক্তব্যগুলো “তুহ্ফুল্ ‘উকুল” গ্রন্থে, “বিহারুল্ আন্ওয়ার” গ্রন্থে ও আরো অনেক গ্রন্থে স্থানলাভ করেছে।
এ বক্তৃতার একটি অংশ গত আলোচনায় আপনাদের খেদমতে উদ্ধৃত করেছি। এর আরেকটি অংশ _ যা আজকের আলোচ্য বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, তা আজকের এ আলোচনায় আপনাদের খেদমতে উদ্ধৃত করবো। এ থেকেই আমরা বুঝতে পারবো যে, তদানীন্তন জনগণ কেন মু’আবিয়ার ও তাঁর মতো অন্যান্য লোকের প্রতারণার শিকার হয়েছিলো এবং খাঁটি মু’মিনগণ কেন তাদের মোকাবিলায় পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছিলেন না।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) একটি ভূমিকার মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। প্রথমে তিনি তাঁদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন ঃ “তোমরা এই উম্মাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি। তোমরা হচ্ছো সেই লোক যারা ইসলামের ছায়াতলে, তোমরা যে ইসলামী প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করেছো তার ছায়াতলে এবং তোমরা যে জ্ঞানের অধিকারী তার ছায়াতলে জনগণের নিকট সম্মানের অধিকারী। এ হচ্ছে এমন এক মর্যাদা আল্লাহ্ যা তোমাদেরকে দিয়েছেন।”
এ থেকে সুস্পষ্ট যে, বৈঠকে অংশগ্রহণকারী লোকেরা ছিলেন কওমের ওলামায়ে কেরামের অন্তর্ভুক্ত। এরপর তিনি একে একে তাঁদেরকে আল্লাহ্র দেয়া নেয়ামত সমূহের কথা, তাঁদেরকে আল্লাহ্র দেয়া সম্মান ও মর্যাদার কথা উল্লেখ করেন। এরপর তিনি তাঁদেরকে তিরস্কার করতে শুরু করেন। তিনি বলেন ঃ “আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে এত সব মর্যাদা দিয়েছেন, এত সব সম্মান দিয়েছেন, এই সামাজিক অবস্থান দিয়েছেন _ যে কারণে জনগণ তোমাদের কথা শোনে, তোমাদেরকে সম্মান করে, কিন্তু তোমরা তোমাদের এ অবস্থানকে কাজে লাগাও নি।” তিনি বলেন ঃ “আল্লাহ্ তোমাদেরকে এ অবস্থান দেয়া সত্ত্বেও তোমরা তোমাদের কর্তব্য পালন করো নি।”
তিনি বলতে চান, এটাই আশা করা যাচ্ছিলো যে, তোমরা তোমাদের ‘ইল্মী মর্যাদার দাবী অনুযায়ী, সমাজে তোমাদের যে মর্যাদা, অবস্থান ও ইজ্জত রয়েছে তার দাবী অনুযায়ী এই ধরনের কাজ করবে, কিন্তু তোমাদের কেউই এ কাজগুলো করে নি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, তোমরা ইসলামের প্রচলনের জন্য তোমাদের ধনসম্পদ ব্যয় করো নি।
অবশ্য এ বৈঠকে উপস্থিত লোকেরা নিয়ম মাফিক তাঁদের ধনসম্পদের খুম্স্ ও যাকাত দিয়ে আসছিলেন। তাঁরা তাঁদের অন্যান্য ফরয দেয় সমূহও প্রদান করছিলেন। তা সত্ত্বেও হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) বলেন ঃ “তোমরা তোমাদের সম্পদকে ব্যয় করো নি।” এর মানে হচ্ছে, তোমরা তোমাদের ফরয দেয় সমূহ প্রদানের চেয়ে বেশী ব্যয় করো নি। নচেৎ ফরয দেয় সমূহ প্রদান করা তো সকলের জন্যই অপরিহার্য। অর্থাৎ তোমরা যখন অনুভব করেছো যে, দ্বীনের প্রচার ও প্রচলন করা অপরিহার্য তখন এটা সঠিক কর্মনীতি নয় যে, তোমাদের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে বলবে যে, আমরা আমাদের ফরয দেয় সমূহ প্রদান করেছি, অতএব, আমাদের ওপর আর কোনো কাজের দায়িত্ব নেই। প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিৎ এই যে, তোমরা তোমাদের অর্থসম্পদকে ইসলামের প্রচার ও প্রচলনের কাজে এবং বিদ্’আতের প্রতিরোধের কাজে, বিদ্’আতের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কাজে ব্যবহার করবে। কিন্তু তোমরা এ কাজ করো নি। তার চেয়েও বড় কথা, হযরত ইমাম (আঃ) বলেন ঃ ” যিনি তোমাদের জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর জন্য তোমরা তোমাদের জীবনকে বিপন্ন করো নি।”
আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, আমাদের সামনে যখন ফরয কাজ উপস্থিত হয় তখন ক্ষতির সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা তা আদায় করি; এরপর আর তা আমাদের জন্য ফরয থাকে না বলে আমরা ধরে নিই। আমাদের দৃষ্টিতে, আম্র্ বিল্ মা’রূফ বা ভালো কাজের আদেশ দানের শর্ত হচ্ছে এই যে, তাতে যেন ব্যক্তির নিজের ক্ষতি না হয়। দ্বীনের প্রচার ও প্রবর্তনের জন্য সংগ্রামকে আমরা ঐ পর্যন্ত অপরিহার্য মনে করি যাতে ব্যক্তি নিজে বিপদাপন্ন না হয়। কিন্তু হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এই ওলামায়ে কেরামকে বলেন ঃ _” যিনি তোমাদের জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর জন্য তোমরা তোমাদের জীবনকে বিপন্ন করো নি।” এর মানে হচ্ছে, তাঁদের উচিৎ ছিলো এজন্য তাঁদের জীবনকে বিপন্ন করা।
এ কথাই আমি এর আগে এক আলোচনায় উল্লেখ করেছিলাম। বলেছিলাম, আমাদের যুগে যিনি এ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন তিনি হলেন হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)। তিনি বলেন ঃ “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহের বেলা তাকিয়াহ্ প্রযোজ্য নয়, তাকিয়াহ্ সাধারণ বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ পর্যায়ের আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহি ‘আনিল্ মুন্কারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ ক্ষেত্রে যদি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তখন এ নীতি প্রযোজ্য যে, বেশ তো, আমরা তো বলেছি, এর চেয়ে বেশী বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যেখানে ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের প্রশ্ন জড়িত, ইসলামের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে তাকিয়ার কথা উঠতেই পারে না। ” এ ধরনের বিষয়ের ক্ষেত্রেই ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) বলেন যে, এখানে তাকিয়াহ্ হারাম, তা “তার পরিণতি যা হবার তা-ই হোক না কেন।” অর্থাৎ এর পরিণতি যেখানে গিয়েই ঠেকুক না কেন, হাজার হাজার মানুষ নিহত হোক না কেন, অতঃপর আর তাকিয়াহ্ করা চলবে না। কারণ, ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহ হুমকির সম্মুখীন। হযরত ইমাম এগুলোকে সাধারণভাবে এক কথায় ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এর আগে আমি বলেছি যে, আমাদের অভিন্ন পোশাকধারীদের অনেকের বিরুদ্ধে আমার অনুযোগ এই যে, তাঁদের উচিৎ ছিলো এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এবং এর বাস্তব দৃষ্টান্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা, দেখিয়ে দেয়া যে, তা কোথায় প্রযোজ্য, হযরত ইমাম যে বলেছেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহের বেলা তাকিয়াহ্ প্রযোজ্য নয়, সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোন্গুলো। এ ব্যাপারে হযরত ইমাম নিজেই কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন; এগুলো ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, এগুলোর সীমারেখা তুলে ধরা প্রয়োজন। এ কাজ করা হলে তা জনগণকে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে অধিকতর সঠিকভাবে জানার ক্ষেত্রে খুবই সাহায্য করবে। অবশ্য এ ত্রুটি এ অধমেরও বটে। এখানে আমার একথা বলার উদ্দেশ্য এটাই স্মরণ করিয়ে দেয়া যে, আমাদের এ ধরনের দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এ দুইটি অনুযোগ করেন। তিনি বলেন, মু’আবিয়াহ্ ও বনী উমাইয়্যাহ্ যে ইসলামকে বিকৃত করতে সক্ষম হয়েছে তার একটি কারণ এই যে, তোমরা তোমাদের অর্থ ব্যয় করো নি এবং দ্বিতীয় কারণ এই যে, তোমরা তোমাদের জীবনকে বিপন্ন করো নি; তোমরা তোমাদের জীবন রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছো। তারা যখন তোমাদেরকে হুমকি দিয়েছে তখন তোমরা পশ্চাদপসরণ করেছো। আর তৃতীয় এই যে, “তোমাদের উচিৎ ছিলো আল্লাহ্র পরিবর্তে কওমকে সাহায্য না করা।”
সে যুগে আরবদের সংস্কৃতিতে কওমী ও গোত্রীয় সম্পর্ক ছিলো অন্যতম মূলনীতি। আজকেও যে সব গোত্র উপজাতীয়, বিশেষতঃ যাযাবর জীবন যাপন করে আপনারা যদি তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তাহলে তাদের মনমানসিকতার সাথে পরিচিত হতে পারবেন এবং দেখতে পাবেন যে, তাদের মধ্যে এক ধরনের গোত্রীয় সহমর্মিতা ও প্রবল স্বজনপ্রীতি রয়েছে। তাদের মধ্যে আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রীয় লোকদের প্রতি অন্ধ প্রীতি রয়েছে যা আমাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু অন্যভাবে শহরবাসীদের মধ্যেও এখনো এ মানসিকতা আছে। তবে সে যুগে আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের প্রতি সমর্থনের চেতনা ছিলো অত্যন্ত প্রবল। বর্তমান যুগে এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে দলপ্রীতি ও উপদল প্রীতি। লোকেরা নিজ দলের ও অভিন্ন ফ্রন্টের লোকদের প্রতি অন্ধভাবে সমর্থন জানায়। এ হচ্ছে সেই একই ধরনের ভূমিকা এক সময় লোকেরা গোত্র ও কওমের প্রতি অন্ধ প্রীতির কারণে যা পালন করতো। আমাদের জীবনধারা তো আর গোত্রীয় জীবনধারা নয়, তাই বর্তমানে আমাদের অন্ধ সমর্থন পাচ্ছে অভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ধারার সমর্থকরা।
আপনারা একটু লক্ষ্য করলেই বিষয়টা বুঝতে পারবেন। আমরা এখানে কারো নাম নিতে চাই না। তাছাড়া আসলেই আমাদের এ মজলিস সে ধরনের নয়, অতএব, কারো নাম উল্লেখ করে কথা বলা বা কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলা উচিৎ নয়। কিন্তু সামপ্রতিককালে আপনারা পত্রপত্রিকায় অবশ্যই দেখে থাকবেন। দুই ব্যক্তি জার্মানী গিয়েছিলো। অবশ্য স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ীই এখানকার জার্মান দূতাবাস তাদের সেখানে যাওয়ার সকল বন্দোবস্ত করেছিলো। সেখানে একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য এখান থেকে কিছু লোককে দাওয়াত করা হয়েছিলো। এটা ছিলো ইসলামী বিপ্লবের বিরোধীদের সম্মেলন। সারা দুনিয়ার আনাচে কানাচে থেকে ইসলামী বিপ্লব বিরোধীদেরকে এনে এ সম্মেলনে জড়ো করা হয়েছিলো। সেখানে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে একজন নারী পুরোপুরি নগ্ন হয়ে যায় ঠিক মাতৃগর্ভ থেকে যেভাবে নগ্ন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, একজন পুরুষও একইভাবে নগ্ন হয়।
সেখানে একজন তথাকথিত সংস্কারবাদী লেখক বক্তৃতা করে এবং তা তাদের পত্রিকায় ছাপা হয়। তাদের খুব নামকরা চেইন পাবলিকেশন্স আছে; তাতে তার বক্তৃতা ছাপা হয়। তাতে সে হযরত ইমাম সম্পর্কে বলে _ অবশ্য ‘হযরত ইমাম’ কথাটা আমার, সে ‘ইমাম’ শব্দটি ব্যবহার করে নি; সে মন্তব্য করেছিলো ঃ “খোমেইনীকে ইতিহাসের জাদুঘরে পাঠিয়ে দেয়া হবে।” সে হিজাব সম্পর্কেও বলে ঃ “আমাদের দেশের সংবিধানে হিজাব সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি।” সে গণতন্ত্র ওপাশ্চাত্য মূল্যবোধ সমূহ সম্পর্কেও কথা বলে। সে বলে ঃ “এটা ইসলামের সমস্যা যে, নিজেকে পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমূহের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। আমরা এ কাজ করবো। আর এ পথ থেকে ফেরার উপায় নেই।” তার কথার তাৎপর্য হচ্ছে ইসলাম বিদায় নেবে, আর হিজাব ও এ জাতীয় বিষয়াদি তো থাকবেই না। তারা পুরোপুরি স্বাধীন হবে।
এ বিষয়টা যখন ফাস হয়ে গেলো এবং ঐ প্রবন্ধটি ও সম্মেলন সংক্রান্ত রিপোর্ট যখন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে গেলো তখন দ্বীনী ব্যক্তিত্ব হসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি এর নিন্দা করেন। তিনি বলেন ঃ “ঐ ব্যক্তির এ ধরনের কথাবার্তা বলা কোনো মতেই উচিৎ হয় নি। এ সব কথা অপ্রাসঙ্গিক ও ভিত্তিহীন।” তিনি এ ধরনের আরো কিছু মন্তব্য করেন।
কিন্তু দৃশ্যতঃ পরে অভিন্ন রাজনৈতিক ধারার অনুসারী তাঁর বন্ধুরা তাঁকে এ জন্য তিরস্কার করে। তারা বলে তুমি এ ব্যক্তির সমালোচনা করেছো, অথচ সে আমাদের অভিন্ন রাজনৈতিক ধারার অনুসারী। তাই তোমার এ কাজ তো ঠিক হয় নি। তারপর তারা একটা বিবৃতি তৈরী করলো এবং তাঁর প্রথম বক্তব্য প্রকাশের কয়েক দিন পরেই এ বিবৃতি ছাপা হলো। তাতে বলা হলো, তাঁর নামে যা প্রকাশিত হয়েছিলো তা মিথ্যা ছিলো; তিনি এমন কথা বলেন নি। এভাবে যে ব্যক্তি উক্ত বক্তা ও প্রবন্ধ লেখকের নিন্দা করেছিলেন তিনি যে পত্রিকা তাঁর সে বক্তব্য ছেপেছিলো সে পত্রিকাকে তিরস্কার করে বিবৃতি দিলেন। তিনি বললেন, পত্রিকাটির এ ধরনের বক্তব্য ছাপা উচিৎ হয় নি। তিনি তাঁর নামে ইতিপূর্বে প্রকাশিত বক্তব্যটি পুরোপুরি অস্বীকার করেন।
হ্যা, আপনারা যদি ঐ ব্যক্তিকে চিনতে পেরে থাকেন তাহলে অবশ্যই বুঝতে পেরেছেন যে, এ ধরনের ব্যক্তির পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য কত বড় নীচু মানের ও নোংরা কাজ! তিনি যদি স্রেফ একজন রাজনীতিবিদ হতেন ও আলেমের পরিচিতির অধিকারী না হতেন এবং এ ধরনের কথা বলতেন তাহলে মানুষ মনে এত কষ্ট পেতো না। কিন্তু এটা এমন এক ব্যক্তির ভূমিকা যিনি নিজেকে ইসলামের রক্ষক বলে দাবী করেন, আলেম ও ইমামের ধারার অনুসারী বলে নিজেকে দাবী করেন। এহেন ব্যক্তি যখন এভাবে কথা বলেন, এ ধরনের ভূমিকা পালন করেন তখন অবশ্যই মানুষের মনে কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
কেন তিনি এমনটি করলেন? যেহেতু তিনি উক্ত বক্তা ও প্রবন্ধকারের অভিন্ন রাজনৈতিক ধারার অনুসারী, যেহেতু তিনি ঐ ব্যক্তির সাথে অভিন্ন রাজনৈতিক ফ্রন্টে অবস্থান করছেন, সেহেতু তিনি তাঁর কথা পরিবর্তন করেন।
সেই যুগেও কওম ও গোত্রের বিষয়টি খুবই প্রচলিত ছিলো। তাদের মনোভাব ও আচরণ ছিলো এই যে, আমার গোত্রের কোনো লোক যদি অপরাধ করে তাহলে আমি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেবো না অথবা তার পক্ষ সমর্থন করবো, বা তার কাজটির পক্ষে কোনো না কোনোভাবে ছাফাই গাইবো। কিন্তু বিরোধী গোত্রের কেউ যদি একই অপরাধ করতো তাহলে তা নিয়ে তারা এই বলে হৈচৈ শুরু করে দিতো যে, ঐ লোকটি এত বড় অপরাধ করেছে; অবশ্যই তার বিচার হতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
কওম ও গোত্র প্রীতি হচ্ছে এমন একটি সমস্যা যা মানুষকে সত্যের পক্ষাবলম্বন করতে দেয় না। তেমনি আজকের দিনেও ব্যক্তি যখন দেখতে পায় যে, লোকটি তার নিজের গোত্রের বা কওমের লোক, অথবা অভিন্ন রাজনৈতিক ধারার অনুসারী, তখন সে অন্য পথ ধরে; তার বিরুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিতে পারে না, বলতে পারে না যে, “তুমি ভুল করেছো; তোমার অন্য সকল কথা আমি স্বীকার করি, কিন্তু এইখানে একটি ভুল আছে; এটা কোরআনের বরখেলাফ হয়েছে, ইসলামের অপরিহার্য বিষয়ের বা বিধানের বরখেলাফ হয়েছে। তোমার এ কথা ইসলামের মূল ভিত্তিকে, এ বিপ্লবের মূল ভিত্তিকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে।” অথচ প্রকৃত ব্যাপার হলো এই যে, আলোচ্য ব্যক্তি ইসলামকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করে নি, বরং তাকে উৎখাত করার অঙ্গীকার করেছে। সে ইসলামের বিদায়ের আগাম ‘সুসংবাদ’ দিয়েছে। অথচ এহেন ব্যক্তিকেও সমর্থন করা হয়। এটাই হচ্ছে আমাদের সমস্যা। সে যুগের কওম ও গোত্রের প্রতি অন্ধ সমর্থন এবং এ যুগের রাজনৈতিক দল, ধারা ও ফ্রন্টের প্রতি অন্ধ সমর্থনের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) সে যুগের উক্ত ওলামায়ে কেরামকে বলেন, “তোমারা আল্লাহ্র কারণে স্বীয় আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের সাথে শত্রুতা করো নি।” অর্থাৎ অনেক সময় শরয়ী দায়িত্ব-কর্তব্যের দাবী হয়ে দাঁড়ায় এই যে, মানুষ তার আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের সাথে শত্রুতা করবে।
অবশ্য এতে সন্দেহ নেই যে, ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং তাদের খোঁজ-খবর নেয়া ও উপকার করাকে ফরয করেছে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে হারাম করেছে, কিন্তু আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের প্রতি সমর্থন জানানোর মূল্য যদি হয় ইসলাম ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করা তখন কী করতে হবে? তখন কি ইসলামকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, নাকি আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রকে, পুত্রদেরকে, জামাইদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, এমনকি তারা ইসলামের স্বার্থের বিপরীতে কাজ করলেও? তারা যদি তাদের কাজের দ্বারা ইসলামের ক্ষতি করে তবুও কি মানুষ তাদেরকে সমর্থন করবে? আমার সন্তানরা এই রকম, অমুকরা আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের লোক _ এ যুক্তিতে তাদের প্রতি অন্যায় ও অযৌক্তিক সমর্থন জানানো কি ঠিক হবে যা দুশমনদের অপব্যবহারের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে?
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর এ ভাষণে সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, “যে সব কারণে মু’আবিয়ার পক্ষে তোমাদের ওপর আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ইসলামকে বিচু্যত করা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহ্র কারণে তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের লোকদের সাথে দুশমনী করো নি।”
অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন ও গোত্র প্রীতি, গোষ্ঠী প্রীতি, স্বদলীয়দের ও অভিন্ন রাজনৈতিক ধারার অনুসারীদের প্রতি ভালোবাসা সত্য কথা বলার ও সত্যের প্রতি সমর্থন জানানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে এমন একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে যায় যা কাজে লাগিয়ে ইসলামের দুশমনরা বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাতে সক্ষম হয়। তারা বলে যে, এদের মধ্যে স্বজনপ্রীতি রয়েছে, দলপ্রীতি রয়েছে, এরা বাইতুল মালের সম্পদ ভোগ করতে চায়, এর অপব্যবহার করতে চায়, বাইতুল মাল হাতে পেলেই প্রথমে তারা তাদের আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের লোকদেরকে দেবে, ক্ষমতা পেলে তারা নিজেদের লোকদেরকে বিভিন্ন পদে বসাবে। এভাবে তারা আপনাদের বিরুদ্ধে প্রচার করার জন্য ক্ষেত্র তৈরী করছে। এ কারণেই আমরা তাদের ক্রিয়ার শিকার হচ্ছি।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) বলতে চান যে, যারা মু’আবিয়ার প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণ হচ্ছে তাদের ধনসম্পদ প্রীতি, তাদের আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রপ্রীতি। তাই তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের ধনসম্পদ হারাতে চাও নি, নিজেদের জীবন বিপন্ন করতে চাও নি এবং বাইতুল মাল থেকে প্রাপ্ত সুবিধা হারাতে চাও নি।
প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী সংস্কৃতিতে এ তিনটি জিনিসের মর্যাদা কী? ধনসম্পদের প্রীতি, পদের প্রীতি, প্রাণের মায়া, আত্মীয়-স্বজন ও কওমের প্রতি প্রীতি, অনুসারী ও সমর্থকদের প্রতি প্রীতি _ সামগ্রিকভাবে এসবকে ইসলামী সংস্কৃতিতে ‘হুব্বে দুনিয়া’ বা দুনিয়া-প্রীতি ও দুনিয়া-পূজা বলা হয়। এরশাদ হয়েছে ঃ “সমস্ত গুনাহের শীর্ষে অবস্থান করছে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা।”
এখানে ভালোবাসা মানে কী? মানুষ চন্দ্র ও নক্ষত্রমণ্ডলীকে ভালোবাসে, তাহলে কি সে সবচেয়ে বড় গুনাহে লিপ্ত হয়েছে? সে সুন্দর প্রকৃতিকে ভালোবাসে, তাহলে কি সে সবচেয়ে বড় গুনাহে লিপ্ত হয়েছে? আপনি আল্লাহ্ তা’আলার সৃষ্টি অন্য মানুষদেরকে ভালোবাসেন, তাহলে কি আপনি সবচেয়ে বড় গুনাহে লিপ্ত হয়েছেন? দুনিয়া-প্রীতি যে সকল গুনাহের শীর্ষে বা সকল গুনাহ্র উৎস _ এ কথার মানে কী?
এর মানে হচ্ছে পার্থিব বিষয়াদি ও স্বার্থকে অন্তরে স্থান দিয়ে সেগুলো হাসিল করাকেই লক্ষ্যে পরিণত করা। এর মানে ধনসম্পদ, পদমর্যাদা, বন্ধু-বান্ধব, অনুসারীবৃন্দ, আত্মীয়-স্বজন, স্বগোত্র, স্বীয় গোষ্ঠী ও দল ইত্যদিতেই তৃপ্তি খোঁজা _ এটাই হলো দুনিয়া-পূজা। অতএব, মুসলমানরা যে বনী উমাইয়্যার এসব শয়তানী কর্মতৎপরতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো তার পিছনে নিহিত কারণকে এক কথায় বলতে হবে দুনিয়া-পূজা।
দুনিয়া-পূজার প্রধান নিদর্শন হচ্ছে এই যে, মানুষের জীবন যখন বিপন্ন হয় তখন সে আর অন্য কোনো কিছু নিয়েই চিন্তা করতে প্রস্তুত থাকে না। সে যখন কোনো কাজ করতে চায়, কোনো খেদমত আঞ্জাম দিতে চায়, সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য সমূহ পালন করতে চায় তখন সর্বাগ্রে সে নিজের জন্য ও স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করে যাতে সে নিজে ঠিক থাকতে পারে। কিন্তু তাকে যদি বলা হয় যে, তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে, অথবা বলা হয় যে, তুমি অমুক পথে গেলে তা হবে বিপজ্জনক, তখন সে সব কিছু বাদ দিয়ে কেবল নিজে বেঁচে থাকার জন্য এবং আরো বেশীদিন দুনিয়ার স্বাদ গ্রহণের জন্য চেষ্টা-সাধনা করা ছাড়া অন্য সব কিছু ভুলে যায়।
আপনারা যখন কাফেরদেরেকে দেখতে পান তখন তাদের মধ্যে কী বৈশিষ্ট্য দেখতে পান? কোরআন মজীদে এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ও আহ্লে বাইতের মা’ছূম ইমামগণ (আঃ)-এর উক্তিতে কাফেরদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আত্মপ্রীতি, আত্মস্বার্থপরতা ও দুনিয়া-পূজা। এর বিপরীতে মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আল্লাহ্র জন্য আত্মত্যাগ, ত্যাগ স্বীকার, ক্ষমা, আত্মোৎসর্গ ও শাহাদাত কামনা। অর্থাৎ মৃতু্য তাঁদের জন্য সমস্যা নয়। দুনিয়ার জীবন তাঁদের জন্য মৌলিক লক্ষ্য নয়। তাঁদের প্রকৃত সৌভাগ্যের জন্য, পবিত্র আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্য, তাঁদের দ্বীনের জন্য তাঁদের মূল্যবোধ সমূহের জন্য তথা তাঁরা যা ভালোবাসেন তার জন্য যদি মৃতু্যবরণ করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে তাহলে খুব সহজেই তাঁরা তাঁদের প্রাণ দিয়ে দেন; এতে তাঁদের কোনো সমস্যাই হয় না। হযরত আলী (আঃ) বলেন ঃ “আল্লাহ্র শপথ, শিশুর কাছে মাতৃস্তন যতখানি প্রিয় আবি তালেবের পুত্রের কাছে মৃতু্য তার চেয়েও বেশী প্রিয়।”
হযরত আলী (আঃ) কি আল্লাহ্র নামে মিথ্যা শপথ করেছেন যে বললেন, শিশুর কাছে মাতৃস্তন যতখানি প্রিয় তাঁর কাছে মৃতু্য তার চেয়েও বেশী প্রিয়? তিনি তো ছিলেন আলী; তাঁর যুগের অনন্য ব্যক্তি। তিনি কি মিথ্যা বলতে পারেন? আর সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) আশূরার রাতে তাঁর বোনকে বলেন ঃ “আমার সঙ্গীসাথীগণও এমনই।”
দেখুন হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) কী ধরনের লোক তৈরী করেছিলেন। তিনি দীর্ঘ বিশ বছর ধৈর্য ধরে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন এবং আশূরার জন্য এ ধরনের কুসুমরাজি তৈরী করেছিলেন। এরা না থাকলে আশূরার ঘটনায় রওনক হতো না। তাহলে আপনি ও আমি হোসাইনের সাথে পরিচিত হতাম না। হোসাইন যদি একা কোনো গৃহকোণে পড়ে থাকতেন তাহলে হয়তো তাঁকে গোপনে বা প্রকাশ্যেই হত্যা করা হতো, আর তাহলে আজকের এ মজলিস হতো না।
দেখুন হোসাইনের গড়া এই লোকেরা আশূরার রাতে কী বলেছিলেন। হযরত যায়নাব (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা) তাঁর ভাইয়ের কাছে এলেন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে, আগামী কাল শাহাদাতের দিন _ এরা সবাই নিহত হবেন তখন তিনি বললেন ঃ “ভাইজান, আপনার চারদিকে আপনার এই যে সঙ্গীসাথী ও বন্ধুগণ রয়েছেন (যারা আগেই চলে গেছে _ মাঝপথেই চলে গেছে বা ঐ রাতেই দলে দলে চলে গেছে তারা বাদে যারা রয়ে গেছেন তাঁদের সম্পর্কে বললেন ঃ) আপনি কি তাঁদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন যে, তাঁরা আপনার প্রতি পুরোপুরি আন্তরিকভাবে নিষ্ঠাবান?” তখন হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর দু’চোখ থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হলো, তিনি বললেন ঃ “আল্লাহ্র শপথ, আমি তাদেরকে চলে যেতে বলেছি, তাদেরকে পরীক্ষা করেছি, কিন্তু তাদের মধ্য থেকে কেউই তা করে নি, বরং তারা নিশ্চিতভাবেই আমার সামনে নিহত হওয়াকে ঠিক তদ্রূপ পসন্দ করে যেমন পসন্দ করে শিশু তার মাতৃদুগ্ধকে।”
ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর সঙ্গীসাথীদেরকে বার বার বলেছিলেন যে, “তোমরা চলে যাও, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দূরে চলে যাও; এখানে থেকো না। এরা আমাকে হত্যা করতে চায়; তোমাদের নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।” বলা বাহুল্য যে, এ ছিলো এক ধরনের পরীক্ষা যাতে এরপর কেবল খালেছ লোকগুলো থেকে যান। এদের সম্পর্কে তিনি এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলেন যে, এদেরকে আমি পরীক্ষা করেছ, তাড়িয়ে দিয়েছি, বলেছি যে, “চলে যাও”, কিন্তু আমি জানতাম যে, এরা আমার সামনে নিহত হওয়াকে ঠিক তদ্রূপ পসন্দ করে যেমন শিশু তার মাতৃদুগ্ধকে পসন্দ করে। অতএব, এরা আর আমার কাছ থেকে পৃথক হবে না।
হ্যা, আপনারা তো শুনেছেন যে, আশূরার রাতে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর সঙ্গীসাথীগণ দাঁড়িয়ে কী কথাগুলো বলেছিলেন; বলেছিলেন ঃ “আমরা যদি সত্তর বার নিহত হই এবং প্রতি বারই আমাদের লাশ পুড়িয়ে ছাই করে ফেলো হয় ও সে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেয়া হয়, এরপর আবারো জীবিত হই, তারপর আপনার পাশে চলে আসবো এবং শহীদ হবো।”
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) দীর্ঘ বিশ বছর ধৈর্য ধরে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে এ ধরনের কুসুমরাজি তৈরী করেছিলেন। এর পাশাপাশি ঐ সব লোকের কথা স্মরণ করুন যাদের প্রতি অনুযোগ করে তিনি বলেছিলেন, “তোমাদের আসল সমস্য হচ্ছে দুনিয়া-প্রীতি; তোমাদের সমস্যা এই যে, তোমরা মৃতু্যকে ভয় পাও।” তিনি তাঁর সময়কার সেই বিশিষ্ট লোকদেরকে সম্বোধন করে বলেছিলেন ঃ “কিন্তু তোমরা তোমাদের ওপর যালেমদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়েছো।” তিনি আরো বলেন ঃ “আর তোমরা খোদায়ী কার্যাবলীকে তাদের হাতে সোপর্দ করে দিয়েছো।” খোদায়ী কাজকর্ম আঞ্জাম দেয়া তো খোদায়ী লোকদের দায়িত্ব, কিন্তু তা তোমরা যালেমদের হাতে সোপর্দ করে দিয়েছো। তোমরা তাদের পক্ষে রায় দিয়েছো _ তাদেরকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছো। অথচ তারা হচ্ছে এমন লোক যারা “সন্দেহজনক কাজ করে এবং প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার পিছনে ছোটে।”
বস্তুতঃ এ ধরনের শাসকগোষ্ঠী এমন কাজ করে যা বৈধ হবার ব্যাপারে কোনো শরয়ী দলীল বিদ্যমান নেই, আর তারা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার পিছনে ধাবিত হয় এবং অন্যান্য প্রবৃত্তিপূজারীদের প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার পথ উন্মুক্ত করে দেয়। তারা এমন ধরনের সাংস্কৃতিক ভবন প্রতিষ্ঠা করে কার্যতঃ যা হয় গুনাহ্ ভবন। তারা জনগণের তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে তাদের জন্য পাপকর্মে লিপ্ত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, তাদের জন্য পাপের উপায়-উপকরণ জোগাড় করে। তারা এমন পত্রপত্রিকা প্রকাশে উৎসাহ প্রদান করে যেগুলো পাপচারকে উৎসাহিত করে।
ইমাম (আঃ) বলেন, হ্যা, তোমাদের ভূমিকার পরিণতিতেই এমনটি হয়েছে। কেন তারা তোমাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলো? কেন তোমরা এ ধরনের ভূমিকা পালন করলে? এর কারণ “মৃতু্য থেকে তোমাদের পলায়ন এর ওপর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিয়ে দিয়েছে।” অর্থাৎ তোমরা যে মৃতু্য থেকে পলায়ন করেছো এর ফলেই তারা তোমাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তোমরা যদি মৃতু্য থেকে পলায়ন না করতে ও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে এবং দুশমনদের মোকাবিলায় রুখে দাঁড়াতে তাহলে তারা পশ্চাদপসরণ করতো।
আপনারা দেখুন আশূরার দিনগুলোতে ইসলামের দুশমনরা কীভাবে পশ্চাদপসরণ করেছে! আপনারা কী করেছেন? আপনারা কি মানুষ হত্যা করেছেন? আপনারা কি কোনো জায়গায় হামলা করেছেন? আপনারা কি অরাজকতা সৃষ্টি করেছেন? বরং আপনারা আপনাদের এই কালো জামাগুলো দ্বারা, আপনাদের এই শোকগাথা গাওয়ার দ্বারা, আপনাদের শিরে ও বক্ষে করাঘাত হানার দ্বারা আপনারা এটাই জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমরা ইসলাম চাই। আপনাদের এ তৎপরতার কারণেই তারা পশ্চাদপসরণ করেছে; তারা আর সাইয়েদুশ শুহাদার প্রতি ও এ দিনগুলোর প্রতি ধৃষ্টতা দেখাতে সাহস পায় নি। আল্-হামদু লিল্লাহ্ _ সকল প্রশংসা আল্লাহ্র যে, এ বছর আপনারা অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় ব্যাপকভাবে ও অধিকতর উত্তমভাবে সকল শহরে ও সকল গ্রামে আশূরার শোকানুষ্ঠান করছেন। অন্ধ হোক হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর দুশমনদের চোখ, আপনাদের এ তৎপরতার কারণেই তারা পশ্চাদপসরণ করেছে।
আপনারা যদি আপনাদের যিন্দেগীর অন্য সকল পর্যায়ে _ আপনাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান সমূহে আপনাদের এ ধরনের উপস্থিতি প্রদর্শন করতেন, মঞ্চে হাযির থাকতেন _ অবশ্য এ জন্য প্রয়োজন নেই যে, আপনারা কাউকে হত্যা করবেন, প্রয়োজন নেই যে, অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের ন্যায় সরকারী ভবন সমূহে হামলা চালাবেন, কারণ, এগুলো আপনাদের জন্য শোভনীয় নয়, হোসাইনীদের জন্য শোভনীয় নয়, উচিৎ নয়। কিন্তু দ্বীন ও সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর জন্য ভালোবাসা প্রকাশ আপনাদের জন্য শোভনীয় ও উচিৎও বটে, এটা আপনাদের কর্তব্য। তাই আপনাদের বলতে হবে ঃ আমরা আমাদের দ্বীনের হেফাযতের জন্য আমাদের ধনসম্পদ, আমাদের জীবন, আমাদের আত্মীয়-স্বজন আমাদের সন্তানদের উৎসর্গ করতে প্রস্তুত আছি। এ হচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি _ এ কথা আমি বার বার বলেছি। কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে ঃ “আর তোমরা তাদের জন্য (কাফেরদের মোকাবিলায়) তোমাদের সাধ্যানুযায়ী সামরিক শক্তি প্রস্তুত করো।” তবে আল্লাহ্ তা’আলা এজন্য সামরিক শক্তি ও যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করতে বলেন নি যে, তার সবই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে হবে। বরং যাতে “তোমরা আল্লাহ্র দুশমনকে ভয় দেখাতে পারো।” অর্থাৎ তোমরা শক্তি সঞ্চয় করো, এসব উপকরণ সংগ্রহ করো যাতে দুশমনরা ভয় পায়।
অতএব, আপনারা নিজেদের শাহাদাতের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করুন যাতে দুশমনরা পশ্চাদপসরণ করে। তারা তো তাদের জীবনকে বিপন্ন করতে চায় না। যারা এক বোতল মদের জন্য চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তারা তাদের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চায় না। আপনারা যদি বীরের মতো ময়দানে আসেন তাহলে তারা পালিয়ে যাবে। তারা যেন অনুভব করে যে, আপনারা এমন লোক যারা ময়দান ছেড়ে যাবেন না _ এটাই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইমাম হোসাইন (আঃ)ও বলেন ঃ জনগণ যদি বনী উমাইয়্যার দ্বারা প্রভাবিত হতে না চায়, তারা যদি চায় যে, তাদের দ্বীন সংরক্ষিত থাকুক তাহলে তাদের মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে, তা হচ্ছে ঃ তারা তাদের ধনসম্পদ দ্বীনের পথে খরচ করবে, তাদের জীবন বিপন্ন করার জন্য প্রস্তুত থাকবে এবং গোষ্ঠীপ্রীতি থেকে বিরত থাকবে _ তারা সত্যের অনুসারী হবে; অমুক মহলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া, অমুক ধারার অনুসারী হওয়া, অমুক দলভুক্ত হওয়া ইত্যাদি তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক হবে না।
আল্লাহ্ তা’আলা কী বলেছেন? হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) কী বলেছেন? মুজতাহিদ শাসক আজ কী বলছেন? তিনি যা বলেছেন তা-ই করতে হবে; এটাই হবে আমাদের নিরাপত্তার রক্ষাকবচ, আমাদের ঐক্যের রক্ষাকবচ, আমাদের কাতারে দুশমনদের ও বিজাতীয়দের পূজারীদের অনুপ্রবেশের পথে প্রতিবন্ধক। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর ঐ ভাষণে উক্ত ওলামা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর উমাইয়্যাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবার কারণ সম্বন্ধে বলেন ঃ তা হচ্ছে “মৃতু্য থেকে তোমাদের পলায়ন এবং সেই জীবনের প্রতি তোমাদের দারুণ আকর্ষণ যা একদিন তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে।” অর্থাৎ এই পার্থিব জীবনের প্রতি তোমাদের মায়া তোমাদের বীরের ন্যায় ময়দানে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর দুশমন তোমাদের এ অবস্থারই অপব্যবহার করছে। কিন্তু তোমরা যদি এ জীবনকে ভালো না বাসতে, আখেরাতের যিন্দেগীর ওপর প্রত্যয় পোষণ করতে, আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করার ও চিরন্তন সৌভাগ্যের অধিকারী হবার লক্ষ্যে এই দুনিয়ার ভোগ-আনন্দ থেকে হাত গুটিয়ে নিতে তাহলে কিছুতেই দুশমন তোমাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারতো না।
হ্যা, তৎকালীন জনগণের মধ্যে যে দুর্বলতা ছিলো _ যা উমাইয়্যাদের আধিপত্যের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিলো, আমরা যদি চাই যে, তা আমাদের মধ্যে তৈরী না হোক এবং যদি প্রস্তুত হয়ে থাকেও তো দূরীভূত হয়ে যাক, তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, তারা তিন ধরনের তৎপরতা চালিয়েছিলো। তার মধ্যে একটি ছিলো প্রতারণা মূলক ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। আরেকটি ছিলো হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন এবং তৃতীয়টি ছিলো প্রলোভন প্রদান।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতারণা মূলক ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কী? এর মোকাবিলায় আমাদের জ্ঞানকে শক্তিশালী করতে হবে। ইসলাম, শিয়া মাযহাব ও হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর কর্মধারা এবং আজকের দিনে হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর কর্মধারা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের জ্ঞানকে এতখানি শক্তিশালী করতে হবে যাতে দুশমনরা নিশ্চিন্তে ইমাম বিরোধী চিন্তাধারাকে ইমামের চিন্তাধারা ও কর্মধারা হিসেবে চালিয়ে দিতে না পারে। কারণ, মু’আবিয়াহ্ এ ধরনের কাজই করেছিলেন, অন্যরাও এ কাজই করেছিলো এবং আজকের দিনেও মু’আবিয়ার মানস সন্তানরা একই কাজ করে চলেছে। ইমাম যে সব বিষয়ের পুরোপুরি বিরোধী ছিলেন, যে সবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন, তারা বলতো যে, ইমাম ঐগুলোই চাচ্ছিলেন। আজকে যে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, তাদের দ্বারা প্রভাবিত যে যুবকরা স্বাধীনতা চাচ্ছে তথা পশ্চিমা ধরনের স্বাধীনতা চাচ্ছে, উচ্ছৃঙ্খলতার স্বাধীনতা চাচ্ছে, তারা কী না করে চলেছে!
একবার আমি জুম’আ নামাযের খোৎবাহ্র পূর্বে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় এরা কিসের পিছনে ছুটছে তা তুলে ধরেছিলাম। তখন আমার বিরুদ্ধে ডজন ডজন প্রবন্ধ লেখা হয়েছিলো। তাতে তারা বলেছিলো, “এ লোকটা মিথ্যা কথা বলছে; আমরা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাই।”
আপনারা নওরোজ পূর্ববর্তী বুধবারের উৎসব দেখেছেন এবং বুঝতে পেরেছেন যে, তারা কী ধরনের স্বাধীনতা চাচ্ছিলো, আর যারা নওরোজ পূর্ববর্তী বুধবারের উৎসব উদযাপনকে উৎসাহিত করছিলো তারা কী চাচ্ছিলো। এরা কিসের পিছনে ছুটছিলো? তারা তাখ্তে জামশীদের উৎসবেরও আয়োজন করতে চাচ্ছিলো এবং এ কাজের জন্য মোটা অঙ্কের বাজেটও বরাদ্দ করেছিলো। এরা বলে, ইমাম এগুলোই চাচ্ছিলেন। এরা বলে, “ইমাম কি মুক্তি ও স্বাধীনতার কথা বলেন নি? অতএব, বুঝাই যাচ্ছে যে, ইমাম এগুলোই চাচ্ছিলেন।”
লক্ষ্য করুন, এরা কী ধরনের ভ্রমাত্মক অপযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। ইমাম যেন ইসলামের দুশমনদের হাতে স্বাধীনতা তুলে দিতে চাচ্ছিলেন; আল্লাহ্র দ্বীন ও মূল্যবোধ সমূহের স্বাধীনতা চান নি। অথচ ইমাম শৈশব কাল থেকে শুরু করে মৃতু্যর পূর্ব পর্যন্ত সারাটি জীবন যে কাজের জন্য ব্যয় করেছেন তা ছিলো ইসলামী মূল্যবোধ সমূহের হেফাযত। ইমাম যে অভু্যত্থান করেছিলেন তা এসব মূল্যবোধের হেফাযতের জন্য করেছিলেন, লোকদেরকে মূল্যবোধ থেকে মুক্ত করে দেয়ার জন্য করেন নি।
আজকের দিনে ইরানের কতক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আমাদেরকে অনুগৃহীত করার ভাব দেখান। আমরা যখন বলি যে, আপনারা সাংস্কৃতিক বিষয়াদিতে মূল্যবোধ রক্ষা করছেন না, তখন তাঁরা বলেন, স্বাধীনতার চেয়ে বড় আর কোন্ মূল্যবোধ আছে? আমরা জনগণকে স্বাধীনতা দিয়েছি; এটা হচ্ছে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ, আর ইমাম এটাই চাচ্ছিলেন।
এ হচ্ছে হুবহু সেই কথা ইতিপূর্বে যার উল্লেখ করেছি; এ হচ্ছে হুবহু মু’আবিয়ার উক্তি। মু’আবিয়াহ্ হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে বলেছিলেন ঃ “তুমি ইয়াযীদের বিরুদ্ধে গীবত করছো। ইয়াযীদ তোমার চেয়ে ভালো, কারণ, সে তোমার বিরুদ্ধে গীবত করে নি; সে তোমার আড়ালে তোমার দোষ বলে নি। তুমি যে বলছো ইয়াযীদ মদ্যপ, এ কথা বলে তুমি তার গীবত করছো।”
ভ্রমাত্মক অপযুক্তি এ ধরনেরই। আমরা যদি এ ধরনের ভ্রমাত্মক অপযুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হতে না চাই তাহলে আমাদেরকে দ্বীন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য আমাদেরকে কী করতে হবে?
বন্ধুগণ! প্রিয় তরুণ বন্ধুগণ! আপনারা দিন-রাতের মধ্যে একটি সময় দ্বীনী বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য, দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের জন্য ব্যয় করুন। কারণ, দ্বীনের মূল্য উদরের মূল্যের তুলনায় তুচ্ছ নয়। আরাম-আয়েশের তুলনায় দ্বীনের মূল্য কম নয়। খেলাধুলার তুলনায় দ্বীনের মূল্য কম নয়। তাই আপনারা এজন্য কর্মসূচী তৈরী করুন, ধর্মীয় জলসার আয়োজন করুন, দ্বীনী বিষয়াদি অধ্যয়ন করুন।
আল্লাহ্র প্রশংসা যে, ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরে বহু দ্বীনী গ্রন্থ রচিত হয়েছে। আপনারা আলোচনা সভার আয়োজন করুন, একত্রে বসে দ্বীনী বিষয়ে আলোচনা করুন। অবশ্যই একজন মুবালি্লগ বা একজন দ্বীনী শিক্ষককে দাওয়াত করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। মরহুম শহীদ অধ্যাপক মোতাহহারীর (রেযওয়ানুল্লাহি ‘আলাইহি) গ্রন্থাবলীর ন্যায় গ্রন্থাবলী নিয়ে আলোচনা করুন। দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্রের ছাত্রগণ যেভাবে তাঁদের পাঠ্যপুস্তক সমূহের ওপরে আলোচনা-পর্যালোচনা করেন ঠিক সেভাবেই আপনারা প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করুন এবং সঠিক ও ভুল তথ্যাদিকে পরস্পর থেকে পৃথক করুন। আপনারা প্রতিটি ছত্র পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন যে, এর তাৎপর্য কী। এরপর নিজেরাই এর ব্যাখ্যা করুন ও তা নিয়ে আলোচনা করুন। কোথাও যদি কোনো অস্পষ্টতার মুখোমুখি হন তাহলে কাউকে সপ্তাহে একবার বা মাসে একবার দাওয়াত করুন; তিনি এসে আপনাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেবেন।
আপনারা নিজেরা যদি অধ্যয়ন না করেন তাহলে ধর্মীয় মজলিস সমূহও তেমন একটা সক্রিয় হয়ে উঠবে না। কারণ, ধর্মীয় জলসা সমূহ সাধারণতঃ আশূরার সময় অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে কেবল এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়েই আলোচনা করা হয়। আর তারা রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, ভিডিও আর পত্রপত্রিকার মাধ্যমে প্রচার চালায়। পত্রিকা, হ্যা, পত্রিকা আপনাদের ওপর প্রচার-বোমা বর্ষণ করে। এমতাবস্থায় ফল কী দাঁড়ায়? ফল কী দাঁড়ায় তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। আল্-হামদু লিল্লাহ্, কোমে আমাদের দ্বীনদার জনগণের মধ্যে এটা দেখা যায় না, কিন্তু অন্য সর্বত্র এমন কতক বেন্দ্র আছে যে, আপনারা যদি সেগুলোকে রুখে না দাঁড়ান অর্থাৎ আপনারা যদি নিজেদেরকে জ্ঞানের অস্ত্রে সুসজ্জিত না করেন তাহলে, খোদা না করুন, ক্রমান্বয়ে তা এক সময় পবিত্র কোম নগরীতেও এসে পেঁৗছে যাবে।
সব কিছু বলার মতো নয়, নইলে বলতাম যে, এই শহরেও কী সব ঘটছে। এটা একটা সমস্যা। শয়তানী প্রচার ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের মোকাবিলায় অধ্যয়ন ও জ্ঞান-গবেষণা প্রয়োজন। দ্বীনী বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ প্রয়োজন। নইলে এমনি এমনি মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পায় না। এজন্য সময় ব্যয় করতে হবে। দ্বীন যদি আপনাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে, আপনারা খেলাধুলাকে যতটুকু মূল্য দিচ্ছেন এটা যদি সে তুলনায় অর্ধেক মূল্যবান বলেও মনে করেন তাহলে আপনারা তরুণরা টেলিভিশনে ফুটবল খেলা দেখার জন্য যে পরিমাণ সময় ব্যয় করেন অথবা আপনারা স্পোর্টস্ ক্লাবে গিয়ে যে পরিমাণ সময় ব্যয় করছেন তার অর্ধেক পরিমাণ সময় দ্বীনী বিষয়াদি অধ্যয়নের জন্য ব্যয় করুন।
দ্বীন যদি প্রিয় হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে। দ্বীন জোর করে আমাদের অন্তরে অস্তিত্বলাভ করবে না। ঈমান নিজে নিজে বিকাশলাভ করে না। কিন্তু আমাদের সামাজিক উপাদান সমূহ ঈমান বিতাড়নকারী, ঈমান সৃষ্টিকারী নয়। বিশেষ করে এই যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে বা, খোদা না করুন, বিজাতীয়দের এজেন্ট হওয়ার কারণে আমাদের দেশের সাংস্কতিক বিভাগের কর্মকর্তাগণ যে ভুল নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছেন, তা মূলতঃ ইসলাম বিরোধী নীতি _ যে নীতি আমাদের সমাজের সংস্কৃতিকে ধর্মহীন ও নাস্তিক্যবাদী সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর মোকাবিলায় আপনাদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তৎপরতা চালাতে হবে। আপনাদেরকে এ কাজ নিজেদের জন্য কর্তব্য বলে মনে করতে হবে।
এ কাজ করতে গিয়ে আপনারা হুমকি ও প্রলোভনের সম্মুখীন হবেন, তবে আপনাদেরকে এ সবের মোকাবিলায় ঈমানকে শক্তিশালী করতে হবে। মানুষ যে ভয় পায় এটা ঈমানের দুর্বলতার পরিচায়ক। অমুক কাজ না করলে অফিস থেকে বের করে দেবে, বেতন কমিয়ে দেবে। বাস্তবেও কি তারা তা করে নি? শিক্ষা বিভাগের কত কর্মকর্তাকে বিগত দুই বছরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে! কতজন বিশ্ববিদ্যালয়-ভিসিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে! আমি জানি না আগে দায়িত্বে ছিলেন এমন ক’জন বিশ্ববিদ্যালয়-ভিসিকে শেষ পর্যন্ত তাঁদের পদে বহাল রাখা হবে! কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়-ভিসিকে তাঁর অফিসের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী সহ, এমনকি পিয়নদেরকে পর্যন্ত পরিবর্তন করা হচ্ছে। কিন্তু কেন? কারণ, তাঁরা এই রাজনৈতিক ধারার অনুসারী নন।
আপনারা দৃঢ়তার পরিচয় দিন। আপনারা তাদেরকে জানিয়ে দিন ঃ “আমাদেরকে যদি চাকুরীচু্যতও করা হয় তথাপি আমরা ইমামের ধারা থেকে সরে যাবো না।” আপনারা পৌরুষের পরিচয় দিন, সাহসিকতার পরিচয় দিন। তারা আর কতদিন আপনাদের সাথে এ ধরনের আচরণ করতে পারবে? এই লোকেরা যদি দৃঢ়তার পরিচয় দিতো, নিজেরা পরাজয় শিকার করে না নিতো, তাহলে তারা এদের সাথে এ রকম আচরণ করতো না। আসলে আমরা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছি, দুর্বলতা দেখিয়েছি। এ কারণেই এ যালেমদের পক্ষে আমাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।
এখানে যেন ভুল ধারণা করা না হয়। কারণ, আমি গোটা সরকারের কথা বলছি না। বরং কতক মন্ত্রণালয়ে ও কতক অফিসে আলাদা গোপন ধারা আছে; এ ধারা হচ্ছে সেই ধারা আমেরিকা যে ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো অন্যরা এ সম্পর্কে খবর রাখে না অথবা তাদেরকে ধোঁকা দেয়া হয়েছে, অথবা ….।
আমরা যাতে হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন এবং প্রলোভনের মোকাবিলায় দৃঢ়তার পরিচয় দিতে পারি, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি সে লক্ষ্যে আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী করতে হবে। ঈমান কেবল অধ্যয়ন থেকে তৈরী হয় না। ঈমানকে আমলের মাধ্যমে, কাজের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হয়। অবশ্য জ্ঞান হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু কেবল আমল ও কর্মের মধ্য দিয়েই ঈমান বিকাশপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। এক ব্যক্তি যদি নামায আদায় না করে তাহলে সে নামায সম্পর্কে যত বই-পুস্তকই অধ্যয়ন করুক না কেন, কখনোই তার ঈমান শক্তিশালী হবে না। কেবল অনবরত চর্চার মাধ্যমেই ঈমান ও আমল শক্তিশালী হয়ে থাকে। অতএব আপনারা চর্চা করুন; নিজেকে নিজে বার বার বলুন ঃ “ইসলাম যদি আমার কাছ থেকে দাবী করে তাহলে আমি মৃতু্যর জন্য প্রস্তুত আছি।” মৃতু্যর নামোচ্চারণের সাথে সাথে ভয় পাবেন না, প্রকম্পিত হবেন না। তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে?
এ ব্যাপারেও সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর শিক্ষা থেকে কল্যাণ লাভ করতে হবে। আশূরার দিন তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথীদেরকে বললেন ঃ “হে সম্ভ্রান্তদের সন্তানগণ! ধৈর্য ও স্থৈর্যের পরিচয় দাও।” দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে হবে। কারণ, “মৃতু্য তো সেই সীমান্তচৌকি বৈ নয় যা তোমাদেরকে অভাব-অভিযোগ ও রোগ-শোক থেকে সুপ্রশস্ত বেহেশত ও চিরন্তন নেয়ামতের দিকে নিয়ে যায়।”
এটাই হচ্ছে একজন প্রকৃত স্বাধীনচেতা লোকের কথা। তিনি প্রথমে তাদেরকে এই বলে সম্বোধন করেন যে, তোমরা স্বাধীনচেতা লোক, তোমরা মহান লোক _ মহান লোকদের সন্তান, তোমরা কিছুটা ধৈর্য-স্থৈর্যের পরিচয় দাও। এই মৃতু্য তোমাদেরকে কঠিন পরিস্থিতি, দুঃখ-কষ্ট ও লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি দেবে এবং তোমাদেরকে অবিনশ্বর নেয়ামতে পরিপূর্ণ সুপ্রশস্ত বেহেশতে নিয়ে যাবে। তাই এটা শোভনীয় নয় যে, তোমরা ভয় পাবে।
কেন আপনারা মৃতু্যকে ভয় পাচ্ছেন? কেউ যদি আপনাদেরকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয় এবং একটি সুরম্য প্রাসাদে প্রবেশ করায় আপনি কি তাকে ধন্যবাদ জানান, নাকি তাকে আপনি অপসন্দ করেন? এ দুনিয়া তো মু’মিনের জন্য কারাগার; মৃতু্য আপনাদেরকে এ কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে বেহেশতের প্রাসাদে প্রবেশ করাবে। তাই একে কি পসন্দ করতে হবে _ ভালো বাসতে হবে, নাকি শত্রু মনে করতে হবে এবং তাকে ভয় করতে হবে? নাকি এ কারণে তাকে খুবই ভালো বাসতে হবে যে, সে সকলের জন্য নয়, কেবল আপনাদের জন্য এ কাজ করছে?
অন্যদিকে সে আপনাদের শত্রুদেরকে বেহেশত থেকে বহিষ্কার করে জাহান্নামে নিয়ে যায়। কারণ, এই যে দুনিয়া মু’মিনের জন্য তার পরকালীন জীবনের মর্যাদার তুলনায় কারাগার, তা-ই কাফেরদের জন্য বেহেশত স্বরূপ, তা এখানে তাদের যে কোনো ধরনের দুর্ভাগ্যই থাকুক না কেন। কারণ, পরকালীন জীবনে তাদের জন্য এমন কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে যে, এখানে তারা যত কঠিন পরিস্থিতি ও দুঃখ-কষ্টই মোকাবিলা করুক না কেন, তা ঐ শাস্তির তুলনায় বেহেশত স্বরূপ। তাই মৃতু্য কাফেরদেরকে বেহেশত থেকে বহিষ্কার করে এবং জাহান্নামে নিয়ে যায়। কিন্তু এই মৃতু্যই আপনাদেরকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয় এবং এমন সুপ্রশস্ত জান্নাতে নিয়ে যায় যে, “যার প্রশস্ততা আসমান ও পৃথিবীর মধ্যকার প্রশস্ততার সমান।” মৃতু্য আপনাদেরকে আসমান ও যমিনকে পরিব্যাপ্তকারী প্রশস্ততার অধিকারী বেহেশতে নিয়ে যাবে; এটা কি কোনো খারাপ ব্যাপার? এটা কি আপনাদের অপসন্দ হওয়া উচিৎ? আপনাদের কি তাকে ভয় করা উচিৎ? এটা তো কোনো ভয় করার মতো ব্যাপার নয়।
সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) ঐসব কথা বলে তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মনোবলকে শক্তিশালী করেন। নচেৎ এটা কেবল এমনি এমনি ঘটে নি যে, তেরো বছর বয়সী কিশোর বলেছিলেন ঃ “মৃতু্য আমার নিকট মধুর চেয়েও সুমিষ্ট।” এটা কোনো মামুলী ব্যাপার ছিলো না। কারণ, তিনি হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর তত্ত্বাবধানে বড় হন ও এ চেতনার অধিকারী হন। আপনি ও আমি যদি হোসাইনী হয়ে থাকি তাহলে এসব শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদেরকে এটা বিশ্বাস করাবো যে, আমরা যদি হোসাইনের পথে পথচলা অব্যাহত রাখি তাহলে মৃতু্য আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠতম মুক্তিদাতা ।
এ দুনিয়ার বুকে মানুষ কত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করবে? কত কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে? ধর্মের নামে কত যুলুম-অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করবে? দ্বীনের নতুন ব্যাখ্যার নামে কত বিদ্’আত্ দেখবে? এ অবস্থায় আমরা যত তাড়াতাড়ি মৃতু্যবরণ করবো ততই আমাদের জন্য তা স্বস্তিদায়ক হবে। আল্লাহ্ সাক্ষী, সমাজের অবস্থা যে মনঃকষ্ট দেয় সে তুলনায় অধমের জন্য মৃতু্য খুবই সুমিষ্ট।
সমাজে এখন যা ঘটছে, কাফেররা যদি লোকদের বিরুদ্ধে তা করতো তাহলে দুঃখ ছিলো না। দ্বীনের বিকৃতি সর্বাধিক মনঃকষ্টের ব্যাপার। ইমামের রচনাবলী পুনরুজ্জীবনের নামে ইমামের ধারাকে বিকৃত করা মনঃকষ্টের ব্যাপার। মৃতু্যতে আমাদের কী ক্ষতি? মৃতু্য তো আমাদেরকে এসব মনঃকষ্ট থেকে মুক্তি দেবে।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) বলেন ঃ “আমি কতই না উদগ্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি যে, আমি আমার নানা, পিতা ও ভাইয়ের কাছে পেঁৗছবো! হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফ (আঃ)কে দেখার জন্য যে ধরনের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন আমি সে ধরনের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি।”
হযরত ইউসুফ (আঃ) কূপে নিক্ষিপ্ত হবার পর হযরত ইয়াকুব (আঃ) অনেকগুলো বছর তাঁর বিচ্ছেদ সহ্য করেন। এ সময় তিনি ইউসুফ (আঃ)কে দেখার জন্য যে ধরনের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) মৃতু্যর জন্য সে ধরনের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন, কারণ এই মৃতু্যই ছিলো তাঁর জন্য তাঁর নানা, পিতা ও ভাইয়ের সাথে মিলিত হবার উপায়।
হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এ ধরনের বক্তব্যের দ্বারা তাঁর সঙ্গীসাথীদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন এবং তাদের মধ্যে মনোবল সৃষ্টি করতেন। এ কারণেই তাঁরা শাহাদাত লাভের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন এবং শহীদ হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।
ভেবে দেখুন, কেমন ছিলো সেই ব্যাপারটা; আমরা জানি যে, যে সব ভবঘুরে যুবক শাহী সরকারের দেয়া ভুল শিক্ষার কারণে পঙ্কিলতার আবর্তে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর বাণীতে উদ্দীপিত হয়ে তারাই শাহাদাতকামীতে পরিণত হয় এবং তারা রণাঙ্গনে গিয়ে সেই সব বীরত্বগাথা সৃষ্টি করে। এটা কেমন ব্যাপার ছিলো? হযরত ইমামের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে যে প্রাণ সঞ্জীবনী বক্তব্য বেরিয়ে আসে তা লোকদের অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করে এবং তাদের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন সৃষ্টি করে।
আমরা যেন হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ও আহ্লে বাইতের মা’ছূম ইমামগণ (আঃ) থেকে এ শিক্ষা গ্রহণ করি যে, যেমন আমাদের নিজেদের মধ্যে তেমনি অন্যদের মধ্যও শাহাদাতকামী চেতনা শক্তিশালী করবো এবং আল্লাহ্র রাস্তায় মৃতু্যকে একটি সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষায় পরিণত করবো। তাহলে আর কেউই আপনাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
হে পরোয়ারদেগার!
হোসাইন ও আলীর মর্যাদার উসিলা করে তোমার কাছে আবেদন জানাচ্ছি, আমাদের জ্ঞান, আমাদের ঈমান ও হোসাইনের প্রতি আমাদের মহব্বতকে দিনের পর দিন বৃদ্ধি করে দাও।
আমাদেরকে হযরত আবি আবদিল্লাহ্র প্রকৃত সহায়তাকারীতে পরিণত করো।
হযরত ইমামের, ইসলামী বিপ্লবের শহীদগণের ও চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শহীদগণের আত্মাকে কারবালার শহীদগণের সাথে হাশর করো।
এ আলোচনায় যারা উপস্থিত হয়েছেন তাঁদের সকলকেই হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর মেহমান রূপে গণ্য করো।
তাঁদের পথে পথচলা অব্যাহত রাখার জন্য আমাদেরকে তাওফীক প্রদান করো।
মহান রাহবারকে ইজ্জত-সম্মান, মর্যাদা ও শক্তি সহকারে দীর্ঘজীবি করো।
আমাদেরকে তাঁর মর্যাদার কদর করার তাওফীক দাও।
আমাদের শেষ পরিণতিকে কল্যাণময় করে দাও।
ওয়াস সালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।

Share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here