Home ইতিহাস পবিত্র আশুরা ও মহররম-১১

পবিত্র আশুরা ও মহররম-১১

466
0
SHARE

আশুরা উপলক্ষে ওস্তাদ আয়াতু্ল্লাহ মিসবাহ তাকী ইয়াযদীর একাদশতম দিনের  বক্তব্য

শহীদানের নেতা হযরত আবা আব্দিল্লাহ্ আল্-হোসাইনের (আঃ) শোকাবহ ম্মৃতিময় দিনগুলোর আগমনে হযরত ইমাম মাহ্দী (আল্লাহ্ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন), মহান রাহ্বার, মহান মার্জা’এ তাক্বলীদগণ ও হোসাইনী আদর্শের ভক্ত অনুসারীদের সকলের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে এ দুনিয়ায় ও পরকালে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর সাথে বন্ধন অটুট রাখার তাওফিক দান করবেন- এই প্রত্যাশা করছি ।
এ ধারাবাহিক আলোচনায় আমরা এ পর্যায়ে উপনীত হয়েছি যে, হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) স্বয়ং যেমন বলেছেন, তাঁর অভু্যত্থানের পিছনে অন্যতম কারণ ছিলো “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”। আমরা “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। সেই সাথে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি যে, কোন্ অর্থে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর অভু্যত্থান “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্” ছিলো এবং কী ধরনের পরিস্থিতিতে এভাবে “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর দায়িত্ব পালন ফরয হয়ে পড়ে।
আমাদের আলোচনায় আমরা উক্ত প্রশ্নের যে জবাবে উপনীত হয়েছি তা হচ্ছে, যখন সমাজ থেকে ইসলামের সত্যকে মুছে ফেলা, জনগণকে পথভ্রষ্ট করা ও ইসলামী হুকুমাতের বিলুপ্তি ঘটানোর জন্য জটিল ধরনের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করা হয় অথবা সত্য সঠিক হুকুমাতের অস্তিত্ব না থাকে, যদি প্রচলিত সাধারণ পথে তার মোকাবিলা করা সম্ভব না হয়, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত প্রচেষ্টা কোনো ফল না দেয়, তখন সমস্যার সমাধানের জন্য কেবল এই একটি পথ অবশিষ্ট থাকে অর্থাৎ শাহাদাতকামী ও মযলুম অবস্থায় সত্যকে তুলে ধরা ছাড়া অন্য কোনো পথ না থাকে, তখন এ পথ অনুসরণ করা অপরিহার্য হবে। তাছাড়া যদি এমন কোনো পরিস্থিতি উপস্থিত হয় যখন সত্যের পথ প্রদর্শন ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এ ধরনের পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখনও এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা ফরয হবে।

অবশ্য সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর এ অভু্যত্থানের বরকত এমনই ছিলো যে, ইসলামের ইতিহাসে পুনরায় এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। কারণ, এ ছিলো এমন এক পরিস্থিতি যখন ইসলামী সমাজের পরিবেশ এমনই অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো যে, সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করা সম্ভব ছিলো না। আল্লাহ্র রহমতে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর অভু্যত্থানের ফলে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যার ফলে পরবর্তী মা’ছূম ইমামগণ (আঃ) সমগ্র ইসলামী ভূখণ্ডের প্রতিটি অংশেই ইসলামের সত্য সমূহকে পেঁৗছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা এমন সব শিষ্য ও অনুসারী তৈরী করতে পেরেছিলেন যারা সর্বত্র ইসলামের শিক্ষা বিস্তার করেন এবং লোকদেরকে দ্বীনী শিক্ষা প্রদান করেন। তাঁরা ইসলামী ভূখণ্ডের বিভন্ন অংশে দিকনির্দেশনামূলক ও দ্বীনী পুনর্জাগরণমূলক বিভিন্ন আন্দোলনে সাহায্য করেন। ফলে হযরত ইমাম মাহ্দীর ইমামতীর যুগে (আল্লাহ্ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর আন্দোলনের ন্যায় কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন হয় নি। ইনশা আল্লাহ্ এর পরেও এ ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না।
মোদ্দা কথা, যে কোনো সাধারণ বিষয়ই এমন নয় যে, তার জের থাকবেই বা তার একাদিক দৃষ্টান্ত থাকতেই হবে। যখন কোনো একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয় তখন সে সম্পর্কিত হুকুম সুনির্দিষ্ট করে জানা যেতে পারে। তবে অসম্ভব নয় যে, এ ধরনের ব্যাপকতা ও এ ধরনের বৈশিষ্ট্য সহকারে এ ধরনের অভু্যত্থান আর অপরিহার্য হয়ে দেখা দেবে না। অপেক্ষাকৃত সীমিত পরিসরের অভু্যত্থান সমূহ সাধারণতঃ কখনো কখনো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ইসলামী বিপ্লবের সম্মানিত রাহ্বারের দেয়া আভাস অনুযায়ীও এ যুগে এ ধরনের অভু্যত্থান প্রয়োজন হয়ে পড়তে পারে। লোকেরা তাঁর কথা শুনেছে এবং তা থেকে কল্যাণ লাভ করেছে।
মোদ্দা কথা, এ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা শোনা ও যার প্রতি মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ইসলামী সমাজ যখন ইসলামের দুশমনদের সাথে মুখোমুখি হয় এবং মুসলমানরা যখন তাদের সাথে বিভিন্ন ধরনের আন্তঃক্রিয়া করে তখন তাদের অনুপ্রবেশের ও তাদের সাফল্যের ক্ষেত্র তৈরী হয় এবং এ কারণে ইসলামী সমাজকে সব সময়ই তাদের সাথে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু আমরা যদি কখনো খরগোশের মতো ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ি এবং দুশমনদের প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ি তাহলে তখন দুশমনদের মধ্যে লোভের সৃষ্টি হবে। ফলে পুনরায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে যার ফলে আমাদের জন্য এ ধরনের শাহাদাতকামী আন্দোলন ও তৎপরতা অপরিহার্য হয়ে পড়বে।
এ কারণেই “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্” সম্বন্ধে মোটামুটি দীর্ঘ আলোচনা পেশ করেছি। বলেছি যে, “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর সাধারণ অর্থে এতে আরো কয়েকটি বিষয় শামিল হয়ে যায়। এই সাধারণ অর্থের মধ্যে একটি হতে পারে দ্বীনী দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে শিক্ষা দান। লোকদেরকে উপদেশ দান ও নছিহত করা এর একটি সাধারণ তাৎপর্য হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এমন এক পর্যায় আসতে পারে যার ফলে জিহাদ এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
দ্বীনী দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে শিক্ষা দান প্রসঙ্গে বলেছি যে, এর তিনটি শাখা হতে পারে। একটি হচ্ছে অজ্ঞ বা মূর্খকে শিক্ষাদান। একটি হচ্ছে গাফেল বা উদাসীনকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। আর একটি হচ্ছে হেদায়াত বঞ্চিতকে হেদায়াত করা বা পথ প্রদর্শন করা। এ হচ্ছে এমন ব্যক্তি যে ইসলামী সমাজে থেকে দ্বীনী জ্ঞানের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পায় নি এবং এখনো পর্যন্ত যার জন্য প্রয়োজনীয় অপরিহার্য দ্বীনী ‘ইল্ম্ অর্জনের জন্য সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি হয় নি। অতএব, তাকে তা শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। এটা হচ্ছে এমন একটি পর্যায় যা “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। অবশ্য পুনরায় উল্লেখ করতে চাই যে, এটা হচ্ছে এর সাধারণ তাৎপর্য।
“আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর দ্বিতীয় তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, এক ব্যক্তি তার দ্বীনী দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে ও এতদসংশ্লিষ্ট মসলা-মাসায়েল অবগত, কিন্তু কোনো এক পরিবেশ ও পরিস্থিতির শিকার হয়ে সে স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে গাফেল বা উদাসীন হয়ে পড়েছে। তার অবস্থা দেখে মনে হয় যে, এ ধরনের কোনো হুকুম আছে বা এ ধরনের মসলা-মাসায়েল আছে এবং তাকে এসব দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে হবে বলেই যেন সে মনে করে না।
মোদ্দা কথা, মানুষ যে আচরণ করে ও যে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করে তার ভিত্তি হচ্ছে তার চিন্তা-চেতনা। আর আমাদের চিন্তা-চেতনার বেশীর ভাগ বিষয়ই আমাদের পারিপাশ্বর্িকতার দ্বারা প্রভাবিত। বিভিন্ন দর্শনীয় বিষয়াদি ও বিভিন্ন শ্রবণীয় বিষয়াদি থেকে আমরা জাগ্রত হয়ে উঠি।
মানুষ যে কোনো একটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হয় তা আসলে তার পারিপাশ্বর্িক পরিস্থিতির প্রভাবাধীন। সাধারণতঃ দেখা যায় যে, কোনো পরিবেশ যদি দূষিত, অন্ধকার ও পাপপঙ্কিল হয় সেখানে হয়তো অনেক মানুষই তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যের ব্যাপারে গাফেল হবে। তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করেন যে, ইসলামে এ ধরনের দায়িত্ব-কর্তব্য আছে কিনা? তখন তারা বলবে ঃ আছে। কিন্তু তাদের নিজেদের যে এ ধরনের দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে এবং তাদের তা আঞ্জাম দেয়া উচিৎ _ এ ব্যাপারে তারা গাফেল। এ হচ্ছে গাফেল বা উদাসীনকে তার দায়িত্ব-কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেয়া। অর্থাৎ তাকে জাগ্রত ও সচেতন করা।
আর তৃতীয় হচ্ছে ভ্রান্ত ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শন করা। অর্থাৎ যে সঠিক জ্ঞান রাখে না, কিন্তু মনে করে যে, সে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। এ ধরনের লোককে বলা হয় জাহেলে মোরাক্কাব বা জটিল ধরনের অজ্ঞ। সে এ ব্যাপারে সচেতন নয় যে, সে তার দায়িত্ব-কর্তব্য স্বন্ধে যা জানে তাতে ভুল করছে। এ ধরনের ব্যক্তিকে ভুল ধরিয়ে দিতে হবে, সঠিক শিক্ষা দিতে হবে বা সঠিক পথ প্রর্দন করতে হবে এবং বুঝিয়ে দিতে হবে যে, সে ভুল করছে। তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে, ‘তুমি ধারণা করছো যে, এটা তোমার দায়িত্ব-কর্তব্য, বা এভাবে তা আঞ্জাম দিতে হবে, কিন্তু তুমি ভুল করছো; আসলে এ রকম নয়; সঠিক পথ অমুক ধরনের; হুকুমটির প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে এই।’
এ হচ্ছে কথার সাহায্যে পথপ্রদর্শন। এভাবে আপনি ভ্রান্ত ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শন করলেন।
এ তিন ধরনের দায়িত্বই শিক্ষাদানের পর্যায়ভুক্ত। এ শিক্ষাদানের কাজ কখনো কখনো ব্যক্তিগত পর্যায়ে করা হয়ে থাকে। যে কেউই তার পারিবারিক পরিমণ্ডলে স্বীয় সন্তানদের ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ব্যাপারে এ ধরনের দায়িত্বের অধিকারী যদি তারা দ্বীনী দায়িত্ব-কর্তব্যের ব্যাপারে অজ্ঞ হয়ে থাকে বা ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত থেকে থাকে বা গাফেল হয়ে থাকে। তখন তার দায়িত্ব হচ্ছে এদেরকে শিক্ষা দেয়া ও পথপ্রদর্শন করা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন ঃ “তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবারের সদস্যদেরকে সেই আগুন থেকে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।”
মানুষের জন্য নিজের ব্যক্তিগত কর্তব্য কাজ সমূহ সম্পাদন করা যেমন দায়িত্ব তেমনি তার প্রভাবাধীন হিসেবে স্বীয় পরিবারের সদস্যদেরকে ও ঘনিষ্ঠ জনদেরকে তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে শিক্ষাদান করাও তার দায়িত্ব। আর ব্যাপকতর পর্যায়ে ওলামায়ে কেরাম ও যারা দ্বীনী বিষয়াদিতে বিশেষজ্ঞ এটা তাঁদের ওপর একটা অধিকতর গুরুভার, ব্যাপকতর ও গভীরতর পর্যায়ের দায়িত্ব যা তাঁদেরকে সমাজের বুকে আঞ্জাম দিতে হবে। আর সমাজে যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানাদির মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ পরিচালিত হয় তখন এ কাজের জন্য একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আপনারা জানেন যে, অতীতে সমাজ পরিচালনা ছিলো অত্যন্ত সাদাসিধা ধরনের। বর্তমানে যে সব মন্ত্রণালয় দেখা যায় অতীতে তা এ ধরনের ছিলো না। উদাহরণ স্বরূপ, ইসলামের প্রথম যুগে যখন কোথাও শাসকমণ্ডলী পাঠানো হতো তখন বড় জোর তিন ব্যক্তিকে পাঠানো হতো। আমার যতটা স্মরণে আসছে, ইতিহাসে দেখেছি যে, তাঁদের মধ্যে একজন থাকতেন শাসক বা প্রশাসক, একজন থাকতেন শিক্ষক ও কাযী বা বিচারক। এই দ্বিতীয় ব্যক্তি হতেন কোরআন বিশেষজ্ঞ এবং তিনি অন্যদেরকে কোরআন শিক্ষা দিতেন। যেহেতু তিনি হতেন আলেম সেহেতু লোকেরা দ্বীনী আহকাম সহ যে কোনো বিষয়ে জানার জন্য ও জ্ঞানার্জনের জন্য তাঁর কাছে আসতো। আর তৃতীয় ব্যক্তি হতেন খাজাঞ্চী যিনি কর আদায়ের ব্যবস্থা করতেন এবং তার হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণ করতেন।
তৎকালে এই তিন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তিনটি সংস্থা গড়ে উঠতো ও সকল কাজ তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকতো। পরে ধীরে ধীরে যখন সামাজিক সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে ও তার আয়তনও বৃদ্ধি পায় তখন এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিনটি থেকে চারটি, এরপর চারটি থেকে দশটি এভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এখন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, একেকটি দেশের মন্ত্রী পরিষদে বিশটি, ত্রিশটি মন্ত্রণালয় থাকে। বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতিতে জীবন যাপন করছি তাতে এই তিন ধরনের শিক্ষা দানের কাজ তিনটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাক্ষরতা শিক্ষাদান ও প্রচলিত পার্থিব জ্ঞান সমূহের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বীনী সচেতনতা সৃষ্টির জন্যও দায়িত্বশীল, অবশ্য যদি শাসন ব্যবস্থা ইসলামী শাসন ব্যবস্থা হয়।
এখানে ন্যায়নীতির দৃষ্টিতে স্বীকার করতে হবে যে, আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় অতীত কাল থেকেই তথা দেশে ইতিপূর্বে যখন অন্য ধরনের সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিলো তখনও শ্রেষ্ঠতম সংস্থা হিসেবে এ সমাজের খেদমত করেছে। আমি যতটা জানি সম্ভবতঃ বর্তমানেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের শ্রেষ্ঠতম মন্ত্রণালয় সমূহের অন্যতম। এর পিছনে কারণও আছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই যে, এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরতদের বেশীর ভাগই অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ মূলতঃ সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে এসেছেন। এরা আপনাদেরই সন্তান এবং তাঁদের কাজকর্ম দ্বীনী মহল সমূহেরই সাথে। তাঁদের দ্বীনী চিন্তাচেতনা অত্যন্ত মযবুত। এ কারণেই তাঁরা যখন পাঠদানের জন্য স্কুলে যান তখন তাঁরা এ দায়িত্ব অনুভব করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়াও দেশে উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় রয়েছে যা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের জন্য একই দায়িত্ব বহন করছে। এছাড়া আছে সংস্কৃতি ও ইসলামী নির্দেশনা মন্ত্রণালয়। এর নামের ‘ইসলামী নির্দেশনা’ই এ মন্ত্রণালয়ের এ দায়িত্ব নির্দেশ করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এ দু’টি মন্ত্রণালয় যেভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে তা কাম্য পর্যায়ের নয়।
যদিও মহান রাহবার বেশ কয়েক বছর আগেই উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন ঃ “আপনাদের দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহকে ইসলামী করা।” কিন্তু এ লক্ষ্যে গুরুত্বের সাথে কাজ করা হয় নি। এর কারণ হয়তো এই যে, এ মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা ও এর অধীনস্থ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনেকেই এ লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব দিতে চান না। হ্যা, এর পিছনেও কারণ আছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই যে, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের অনেকেই, এমনকি এগুলোর পরিচালকগণেরও অনেকেই বৈদেশিক পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত। এরা বেশ কয়েক বছর ইউরোপে কাটিয়েছেন অথবা ইউরোপে কাটিয়েছিলেন এমন ধরনের ব্যক্তিদের অধীনে কাজ করছেন। এ কারণে এদের স্বভাব-চরিত্র ও এদের সংস্কৃতি ইসলামী জাহানের সংস্কৃতির পরিবর্তে কুফ্রী সংস্কৃতির খুবই নিকটবর্তী। ফলে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের লোকদের তত্ত্বাবধানে যারা শিক্ষা লাভ করে তারা এদের চেয়ে ভালো হয়ে গড়ে ওঠে না।
মোদ্দা কথা, এ দু’টি মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম ত্রুটিপূর্ণ। সংস্কৃতি ও ইসলামী মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মের অবস্থা কেমন তা-ও সকলেরই জানা আছে। বিশেষ করে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, এ মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, দ্বীনী বিষয়াদির ব্যাপারে তাঁদের কোনো দায়িত্ব নেই এবং ‘ইসলামী নির্দেশনা’ একটি আনুষ্ঠানিকতা বৈ নয়, নচেৎ এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তা-ই শাহের আমলে সংস্কৃতি ও শিল্পকলা মন্ত্রণালয় যে দায়িত্ব পালন করতো। তাঁরা বলেছেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে আমাদের কোনো করণীয় নেই। আমরা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি _ প্রাগৈতিহাসিক কালের সংস্কৃতি, নাচ, গান ইত্যাদি বিষয় চালু করবো। আমরা অন্যান্য দেশে ফার্সী ভাষার ও ইরানের জাতীয় সংস্কৃতির প্রসার ঘটাবো।’ তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, ইসলাম নিয়ে তাঁদের কোনো কারবার নেই। তাঁরা যদি অস্বীকার করতে চান, যদি দাবী করেন যে, এসব কথা বলেন নি তাহলে জানিয়ে দিতে চাই যে, এ ব্যাপারে দিন-তারিখ সহ সুনির্দিষ্ট ঘটনা আমার জানা আছে এবং কারা সেখানে শ্রোতা ছিলেন, কা’দেরকে সম্বোধন করে সে বক্তব্য রাখা হয়েছিলো তা-ও আমার জানা আছে। তাঁরা এর দিন-তারিখও আাকে দিয়েছেন এবং আমি তা পেশ করতে বাধ্য হবো।
সে যা-ই হোক, মোট কথা, আমাদের সমাজে এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের যুব সমাজকে শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করা। একটু আগে যেমন উল্লেখ করেছি, এর মধ্যে একটির অবস্থা মোটামুটি ভালো, কিন্তু বাকী দু’টির অবস্থা মোটেই বাঞ্ছিত পর্যায়ের নয়। আর এ দু’টির মধ্যে একটির অবস্থা খুবই খারাপ।
হ্যা, প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, এ তিনটি প্রতিষ্ঠান যদি তাদের দায়িত্ব পালন না করে তাহলে জনগণের কী করতে হবে? যদিও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের সরকারের মোকাবিলায় আমাদের একটি দায়িত্ব আছে এবং রাষ্ট্রের ওপর আমাদের অধিকার আছে, কিন্তু এ সব কথায় না গিয়ে সোজাসুজি বলতে হয় যে, এসব প্রতিষ্ঠান যদি দায়িত্ব পালন না করে তাহলে আমাদের কী করতে হবে? তারা সঠিক কাজ না করলে জনগণের কি আর কোনো দায়িত্ব নেই? যথষ্ট সময় থাকলে এ ব্যাপারে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করতাম, তবে সংক্ষেপে বলতে হয় যে, নীতিগতভাবে এ দায়িত্ব মূলতঃ স্বয়ং জনগণের। কেবল বর্তমান জটিল সমাজ ব্যবস্থার কারণেই এ দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তেছে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি আলোচনা এসে যায়। তা হচ্ছে, মূলতঃ সরকারের দায়িত্ব কী? অথবা বলতে হয় যে, এমন স্বতন্ত্র কতগুলো দায়িত্ব আছে কি যেগুলো মূলতঃ সরকারের দায়িত্ব যাতে জনগণের কোনো ভূমিকা নেই? তেমনি এর বিপরীতে এমন কতগুলো দায়িত্ব আছে কি যেগুলো আঞ্জাম দেয়া স্বয়ং জনগণের দায়িত্ব এবং জনগণের পক্ষে যা আঞ্জাম দেয়া সম্ভব না হলেও বা তা আঞ্জাম দেয়ার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া না গেলেও জনগণের পক্ষ থেকে সরকার সেগুলো আঞ্জাম দেবে না?
ঘটনাক্রমে শিক্ষাদান হচ্ছে এ ধরনের একটি কাজ। এটা মূলতঃ স্বয়ং জনগণের কাজ। সমাজে ইসলামী জ্ঞানের প্রচলনের জন্য প্রচেষ্টা চালানো স্বয়ং জনগণের দায়িত্ব। এর কিছু অংশ আঞ্জাম দেয়ার দায়িত্ব সরকারের ওপর পড়েছে এবং তা আঞ্জাম দেয়া তার দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। তাই সরকারের কাছে এ দায়িত্ব পালনের দাবী করা যেতে পারে। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক সরকার যদি সে দায়িত্ব পালন না করে তাহলে জনগণের কাঁধের ওপর থেকে এ দায়িত্ব নেমে যাবে না। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি ও ইসলামী নির্দেশনা মন্ত্রণালয় যখন তাদের দায়িত্ব পালন করছে না তখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই যে, আমরা নিজেরাই তরুণ ও যুব সমাজের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবো। এখানে শিক্ষা বলতে আমি ফরয শিক্ষার কথা অর্থাৎ দ্বীনী শিক্ষার কথা বলতে চাচ্ছি। অন্যান্য শিক্ষা কেবল ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
তবে এখানে আমরা যে দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছি তা হচ্ছে এই যে, এ কাজটিকে অর্থাৎ দ্বীনী দায়িত্ব-কর্তব্য সংক্রান্ত শিক্ষা দানকে আমরা “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করছি। অর্থাৎ লোকদেরকে দ্বীন সম্পর্কে কমপক্ষে এতটুকু জ্ঞানের অধিকারী করতে হবে যাতে তারা খারাপ পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিচু্যত না হয়, তাদের দ্বীন দুর্বল হয়ে না পড়ে, তাদের ঈমান নড়বড়ে হয়ে না যায়, তাদের মধ্যে দ্বীনী বিষয়াদিতে সন্দেহ প্রবেশ করতে না পারে। এমন কাজ করা অপরিহার্য।
এ পর্যায়ে আমি আরয করতে চাই যে, এ কাজের একটি বিরাট অংশের দায়িত্ব আমাদের ওপর, তথা আলেমদের ওপর বর্তেছে। ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব এ ব্যাপারে বিভিন্ন স্তরের লোকদের অনুাবন ক্ষমতা ও জ্ঞানগত স্তর সামনে রেখে দ্বীনী বই-পুস্তকাদি রচনা করা, শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া, বিভিন্ন ধরনের ক্লাসের ব্যবস্থা করা, উপস্থিত ও অনুপস্থিত এবং আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এ শিক্ষা যেমন কতক ক্ষেত্রে হবে সংক্ষিপ্ত ও কতক ক্ষেত্রে হবে বিস্তারিত, তেমনি কতক ক্ষেত্রে হবে স্বল্প মেয়াদী ও কতক ক্ষেত্রে হবে দীর্ঘ মেয়াদী। কেবল তাহলেই যুব সমাজ এসব আয়োজন থেকে উপকৃত হতে পারবে।
সৌভাগ্যক্রমে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পাদিত হয়েছে। বিশেষ করে ইউনিভার্সিটি মবিলাইযেশন সংস্থার সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দ্বীনী শিক্ষা দেয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচীর আওতায় প্রতি বছর কম-বেশী দুই হাজার ছাত্রছাত্রী দ্বীনী শিক্ষা লাভ করে। মাননীয় রাহ্বারের নির্দেশে এদের জন্য বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে যা সশস্ত্র বাহিনী সমূহের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হচ্ছে। অন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের সকল ছাত্রছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়-পূর্ব পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীরা ও সকল পর্যায়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাও এসব বই-পুস্তক অধ্যয়ন করে উপকৃত হতে পারেন। তাঁরা এগুলো অধ্যয়ন করে ইসলাম সম্পর্কে দক্ষতার অধিকারী হতে পারেন। তাছাড়া বর্তমানে দ্বীনী বিষয়ে পাঠদানের ক্যাসেট (ও সিডি) পাওয়া যায়; তাঁরা এগুলোর সাহায্যে নিজেদেরকে দ্বীনী জ্ঞানে সুসমৃদ্ধ করতে পারেন। তাহলে তাঁরা শয়তানী সন্দেহ-সংশয়ের দ্বারা খুব কমই প্রভাবিত হবেন। আমাদের সংস্থা থেকে এ ব্যাপারে ছয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে; আপনারা যদি এ বিষয়ে অধিকতর অবগত হতে চান তাহলে এ গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করতে পারেন।
হ্যা, এই হলো শিক্ষাদানের বিষয় যা “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্” হিসেবে গণ্য এবং আমাদের জন্য ফরয। এর দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে উপদেশ ও নছিহত। এ ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠ জনদের ও পোষ্যদের ক্ষেত্রে এবং যাদের ওপর ব্যক্তির প্রভাব আছে এমন লোকদেরকে উপদেশ ও নছিহতের মাধ্যমে দ্বীনী শিক্ষা দান করা সকলেরই দায়িত্ব। প্রতিটি ব্যক্তিরই দায়িত্ব হচ্ছে স্বীয় জ্ঞানগত স্তর অনুযায়ী তার সন্তান-সন্ততিদেরকে উপদেশ প্রদান ও নছিহত করা, কল্যাণের পথ ও অকল্যাণের পথ তথা ভালো পথ ও মন্দ পথের মধ্যকার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং ভালো ও কল্যাণের পথে চলার জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করা। তাদেরকে ফরয কাজ সমূহ সম্পাদনে আগ্রহী করে তুলতে হবে, তা সে কাজ ব্যক্তিগত পর্যায়ের হোক বা সমষ্টিগত পর্যায়ের হোক।
তবে ব্যাপকতর পর্যায়ে আরো কতক সরকারী প্রতিষ্ঠান উপদেশ ও নছিহতের জন্য দায়িত্বশীল এবং সরকারীভাবে যে সব বক্তির ওপর এ দায়িত্ব রয়েছে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তাঁদেরকে স্বীয় দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হতে হবে। তাঁদের উপদেশ ও নছিহতের বক্তব্যকে এমনভাবে সুবিন্যস্ত করতে হবে যাতে তা সমাজের প্রয়োজনকে পূরণ করতে পারে। বিশেষ করে যুব সমাজ যে সব ত্রুটির শিকার হয় তাঁদেরকে সেদিকে বেশী মনোযোগী হতে হবে। এমন হওয়া উচিৎ নয় যে, যে সব বিষয় একশ’ বা দু’শ’ বছর পূর্বে ছিলো সেগুলোর পুনরাবৃত্তির মধ্যে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনকে সীমাবদ্ধ করবো এবং সমাজের আজকের প্রয়োজনের ব্যাপারে অমনোযোগী হবো।
উপদেশ ও নছিহত করার ক্ষেত্রেও বিশেষ শর্তাবলী রয়েছে। আর “আমর বিল্ মা’রূফ্” হিসেবে এটা অধিকতর সুপরিচিত বিষয়। সকলেই জানেন যে, সহজ-সরল ব্যক্তিগত বিষয়াদিতে “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর দায়িত্ব-কর্তব্য কী। তাই এ বিষয়ে আর আলোচনা করতে চাই না। আমি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই। তা হচ্ছে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর ঘটনা এবং এ থেকে আমাদের অধিকতর শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আমি বলেছি যে, এক ধরনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্” আছে দুঃখজনকভাবে যার প্রতি আমাদের অনেকেই উদাসীনতা ও উপেক্ষা প্রদর্শন করেছেন। বিশেষ করে ইসলাম বিরোধী বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর নেতৃত্বে সংগ্রামের পূর্বে এ ধরনের উদাসীনতা ও উপেক্ষা বেশী ছিলো। এ ধরনের ষড়যন্ত্র সব সময়ই ছিলো এবং আছে; তা যেমন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হতে পারে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হতে পারে, শিক্ষা ক্ষেত্রে হতে পারে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হতে পারে, এমনকি সামরিক ক্ষেত্রেও হতে পারে।
এ ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলার লক্ষ্যে “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্” আঞ্জাম দেয়ার জন্য কোনো সহজ কাজের মাধ্যমে, কয়েক দিনের একটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে পারবো না। বরং এ জন্য অত্যন্ত জটিল ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। শয়তানী চক্র তাদের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে গবেষণা করে ও বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে সে সব শয়তানী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে মোকাবিলা করার জন্য অত্যন্ত সুচিন্তিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
এ ষড়যন্ত্রের একটি ছোট শাখা সম্পর্কে সম্মানিত রাহবার তাঁর এক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন ঃ “দুশমনরা এসে আমাদের কতক সংবাদপত্রকে তাদের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা এগুলোকে ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করবে। দেশের ভিতরকার সংবাদপত্র সমূহ যদিও ইরানী লোকেরাই চালাচ্ছে তথাপি কতক আত্মবিক্রিত লোক কতক সংবাদপত্রকে, এবং অসম্ভব নয় যে, এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থে পরিচালিত কতক সংবাদপত্রকেও, আমেরিকার বা অপর কতক দুশমনের অথবা যায়নবাদীদের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে এবং এগুলোর মাধ্যমে তাদেরই স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে। এভাবে তারা শত্রুর কাজে সাহায্য করছে।”
সম্মানিত রাহ্বারের বক্তব্য অনুযায়ী, যে কাজ ভয়েস্ অব্ আমেরিকার করার কথা সে কাজ এরাই আঞ্জাম দিচ্ছে। এ হচ্ছে দুশমনরা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে সব কাজ করে চলেছে তার অংশবিশেষ মাত্র।
এখন আপনারা দেখুন কেবল এই একটি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে, সংবাদপত্রকে আশ্রয় করে তারা যে ষড়যন্ত্র করেছে তার বিরুদ্ধে কী করা যেতে পারে?
এটা এমন কাজ নয় যে, একজন, দু’জন বা দশজন লোক এসে এর বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে পারবে। বিরাট ও দীর্ঘ হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে পরিকল্পিত এ রহস্যজনক শয়তানী তৎপরতার বিরুদ্ধে আমরা কী কাজ করতে পারি _ এ ব্যাপারে ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমাদের অনেক বেশী সংবেদনশীল হওয়া উচিৎ। এ ক্ষেত্রে “আমর বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্” আঞ্জাম দেয়ার বিষয়টিকে আমাদের অধিকতর গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিৎ।
এটা কোনো ব্যক্তিগত গুনাহের ব্যাপার নয় যে, এক ব্যক্তি এ গুনাহে লিপ্ত হয়েছে এবং আপনি তাকে বলবেন যে, “এই কাজ করো, এই কাজ করো না।” এটা এমন একটি ব্যাপার যে, অসম্ভব নয় যে, এক সময় তা গোটা ইসলামের অস্তিত্বকেই হুমকির সম্মুখীন করবে। এক সময় হয়তো আমরা চোখ মেলে তাকাবো, আর দেখবো যে, সব কিছুই ইসলামের দুশমনদের হাতে পড়েছে। ইনশা আল্লাহ্, এমনটি হবে না; সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর নাম এবং তাঁর বরকত এমনটি হতে দেবে না।
কিন্তু শত্রুরা এমনই জটিল পরিকল্পনা করেছে এবং তার প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে যে, তারা তাদের পরিকল্পনা সফল হওয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি আশাবাদী। আমাদের জন্য দুশমনকে ছোট মনে করা ঠিক হবে না। অবশ্য আল্লাহ্ তা’আলার অনুগ্রহে এবং হযরত ইমাম মাহ্দীর ইমামতীর সাথে (আল্লাহ্ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) আমাদের আত্মিক সম্পর্কের কারণে আমাদের হৃদয় সমূহ দুশমনদের প্রচারের মোকাবিলায় দুর্গসম সুদৃঢ় হওয়া উচিৎ। কিন্তু এর মানে এ নয় যে, আমরা চুপচাপ বসে থাকবো এবং এ ব্যাপারে কোনো কিছু করবো না। বরং আল্লাহ্র ওপর তাওয়াক্কুল করে এবং তাঁর সহায়তার ব্যাপারে আস্থা পোষণ করে আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন ঃ _ “তোমরা যদি আল্লাহ্কে সাহায্য করো তাহলে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।” খোদায়ী সাহায্য আছে, কিন্তু সে জন্য শর্ত হচ্ছে এই যে, আমাদের সাধ্য অনুযায়ী ইখলাছের সাথে চেষ্টাসাধনা চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের ঘাটতিগুলোকে পূরণ করে দেবেন। মোদ্দা কথা, এ ব্যাপারে আমাদের দৃঢ়তার পরিচয় দিতে হবে। এ বিষয়ে অনেক বেশী আলোচনা করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে যে আলোচনা করলাম তা মূলতঃ একটি ভূমিকা স্বরূপ। এ ভূমিকার লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের দ্বীনী ভাইদের মধ্যে এ অনুভূতি তীব্রতর করা, গভীর করা। আমি জানি না আমার এ প্রচেষ্টায় সফল হয়েছি, অথবা হই নি। তবে সে যা-ই হোক, এ ধারাবাহিক আলোচনার সর্বশেষ কিস্তি হিসেবে আজ পুরো বিষয়টির ওপর উপসংহার টানতে হবে।
এ ধারাবাহিক আলোচনার শুরু থেকেই অর্থাৎ প্রথম কিস্তির আলোচনার সময় থেকেই দ্বীনী ভাইদের কাছ থেকে বেশ কয়েক ডজন লিখিত প্রশ্ন এসেছে। আমি এগুলো পড়েছি, পড়ে চিন্তা করেছি ও সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করেছি। এখন বুঝতে পারছি না এ সীমিত অবকাশে এ ব্যাপারে কী করা যেতে পারে। মফস্বল শহর থেকে দ্বীনী ভাইবোনেরা যোগাযোগ করেছেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষকগণের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁরা বলছেন ঃ আমরা কী করবো? আমরা জানি না আমাদের কী করা উচিৎ। আমাদের অন্তরে বেদনার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা জানি যে, আমাদের একটি কর্তব্য আছে। কিন্তু বুঝতে পারছি না আমাদের কী করতে হবে।
আমি আমার আলোচনার এ শেষ পর্যায়ে প্রথমতঃ বলতে চাই যে, আমরা জানি না কেন? কী কারণে আমরা জানি না? এর পর যতটা সম্ভব এ কাজের জন্য একটি সাধারণ দিকনির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করবো।
আমাদের মধ্যে দু’তিনটি ঘাটতি রয়েছে যার ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, দীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল পরে, অধিকতর নির্ভুলভাবে বলতে হলে বলতে হয় যে, আটত্রিশ বছর পরে অর্থাৎ হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) কর্তৃক ১৯৬৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলনের সূচনা করার আটত্রিশ বছর পরেও, হযরত ইমামের বক্তব্য আমাদের কানে থাকা সত্ত্বেও, আমাদের হাতে তাঁর রচনাবলী, বিশেষ করে তাঁর অছিয়্যাতনামা ও তাঁর ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও আমরা এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বলছি যে, আমরা জানি না আমাদের কী করতে হবে? আমাদের সমস্যা কী? আর এরপর যদি আমরা আমাদের তৎপরতা শুরু করতে চাই তাহলে কোথা থেকে শুরু করবো? এ হচ্ছে এমন একটি সমস্যা যার ওপরে ইতিপূর্বেকার আলোচনাগুলোতে আলোকপাত করেছি।
বিগত কয়েক বছর ধরে শিথিলকরণের সপক্ষে যে প্রচার চলেছে তা খুবই প্রভাব বিস্তার করেছে। তারা বিভিন্ন ভাষায় ও বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে। অবশ্য যে সব লোক এ ধরনের প্রচারে শামিল হয়েছে তাদের অনেকেই হয়তো সদিচ্ছা সহকারেই এ প্রচারে অংশ নিয়েছে। অন্ততঃ আমরা এ সুধারণা পোষণ করি যে তাদের উদ্দেশ্য ভালো। তারা শিথিলতার পক্ষে ব্যাপকভাবে প্রচার চালিয়েছে, অন্যদের চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো উচিৎ ও এ জাতীয় আরো অনেক কথার প্রচার করেছে। এর ফলে সকলের মধ্যেই কমবেশী প্রভাব বিস্তার হয়েছে। এই যে বললাম ‘সকলের মধ্যেই’ _ এর কারণ এই যে, হয়তো হাতের আঙ্গুলে গণা যাবে এমন কিছু সংখ্যক লোক ব্যতিক্রম আছেন।
এভাবে অনবরত প্রচারের ফলে শেষ পর্যন্ত আমরা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি যে, এ যুগে, বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব বেশী কঠোরতা করা, অর্থাৎ রূঢ়তা বা তথাকথিত উগ্রতার সাথে আচরণ করা চলে না। বস্তুতঃ শিথিলতা এবং দেখেও না দেখার ভাণ করা ব্যতীত আর সব ধরনের আচরণেরই তারা নাম দিয়েছে উগ্রতা বা সহিংসতা। দ্বীনী গৌরব করা, বিনা প্রশ্নে আহ্কামে ইসলামীর অনুসরণ, কেবল একটি দ্বীন অর্থাৎ সত্য দ্বীন থাকা উচিৎ _ এ বিশ্বাস পোষণ করা, কেবল এ দ্বীনই সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করা ও এ ধরনের অন্যান্য ধারণা, ইসলামী আহকাম থাকতে হবে, ইত্যাদি বিষয় হচ্ছে তাদের দৃষ্টিতে সেকেলে চিন্তাধারা। এগুলোই হচ্ছে প্রচারযন্ত্রের অধিকারীদের প্রচারের বিষয়বস্তু।
তারা বলে, আজকের আধুনিক বিশ্ব এগুলোকে পসন্দ করে না। একটিমাত্র দ্বীন মানে কী? হাজারটা দ্বীন থাকা উচিৎ। তরা দ্বীনী ক্ষেত্রে প্লুরালিজম্ বা বহুত্ববাদের প্রবক্তা। তারা এ বিষয়ে এতই কথা বলেছে এবং এতই লেখালেখি করেছে যে, প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে।
আমরা যদি এ খরগোশের নিদ্রা থেকে জেগে উঠতে চাই, আমরা যে ফাঁদে পড়েছি তা থেকে যদি উদ্ধার পেতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই শিথিলনৈতিকতার ফাঁদকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে হবে। আর এটা খুবই সম্ভব, কারণ এটা হচ্ছে মাকড়শার জাল; এটা মিথ্যা মাত্র।
ইসলামে সহজতা আছে। দ্বীন ইসলাম সহজ দ্বীন। _ “আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজতা পসন্দ করেন।” কিন্তু ইসলামে উদাসীনতা নেই। উদাসীনতা মানে শিথিলনৈতিকতা। দ্বীন ইসলাম সহজ দ্বীন, কিন্তু ইসলাম বলে না যে, ইসলামে যা আছে সে ব্যাপারে উদাসীনতা দেখাতে হবে; তাকে উপেক্ষা করতে হবে। ইসলামে যা আছে তাকে দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করতে হবে। শিথিলতা ও উদাসীনতার প্রবক্তারা যা বলছে তা হচ্ছে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর অপযুক্তি; বহু বার আমরা এর জবাব দিয়েছি। তারপরও তারা পত্রপত্রিকায় একই কথা লিখে চলেছে। তার পরেও দেশের সাংস্কৃতিক দায়িত্বীল তথাকথিত ব্যক্তিত্ব সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করছেন। বহু বার এর জবাব দিয়েছি, আবারো সে জবাবের পুনরাবৃত্তি করছি ঃ ইসলামে শিথিলনৈতিকতা ও উদাসীনতার স্থান নেই। _ এ কথার অর্থ শিথিলনৈতিকতা ও উদাসীনতাকে অনুমোদন প্রদান নয়। বরং এর মানে হচ্ছে, ইসলামী শরীয়াত অত্যন্ত সহজ।
দ্বীন ইসলাম অত্যন্ত সহজ দ্বীন। কিন্তু এ সহজ দ্বীনকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করতে হবে। এর ভিতরে সূচ্যগ্র পরিমাণও ত্রুটি প্রবেশ করানো যাবে না। কিন্তু এরা এই যে চেতনার প্রবর্তন করেছে তা আমাদের যুব সমাজকে প্রভাবিত করেছে। সাহিত্য, কবিতা, উপন্যাস, থিয়টার, সিনেমা ফিল্ম ইত্যাদির মাধ্যমে এবং আরো অনেক কিছুর মাধ্যমে তারা কাজ করে আমাদের সমাজে এ শিথিলনৈতিকতা ও উদাসীনতা প্রবেশ করিয়েছে। অবশ্য তারা এখনো সমাজে তা পুরোপুরি প্রচলন করে উঠতে পারে নি; এখনো তা পুরোপুরি চালু হয় নি, কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু লোকের ওপর তার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। তাই আমাদেরকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ মাকড়শার জালকে ছিন্ন করতে হবে। তাদের এ দাবী মিথ্যা। কারণ, ইসলাম সৎসাহস দাবী করে, ইসলাম তার প্রতি আনুগত্য চায়, ইসলাম তাকওয়া চায়, ইসলাম দৃঢ়তা চায়; ইসলাম কখনোই শিথিলনৈতিকতার প্রচলন করে না।
আমরা যদি আমাদের দায়িত্ব্-কর্তব্যের সাথে পরিচিত হতে চাই, আমরা যদি চাই যে, আমরা শয়তানের ফাঁদে পড়বো না এবং যদি চাই যে, এমন দিন না আসুক যখন, খোদা না করুন, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বিপন্ন হয়, তাহলে প্রথমেই আমাদের জন্য করণীয় হচ্ছে এ ফাঁদকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা। এটা হচ্ছে একটি পদক্ষেপ।
দ্বিতীয় পদক্ষেপটি একটি সাংস্কৃতিক দুর্বলতার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো এই যে, আমরা এ দুর্বলতায় আক্রান্ত হয়ে আছি। আর এ সাংস্কৃতিক দুর্বলতা হচ্ছে অতীতে দীর্ঘকাল ধরে যা হয়েছে তার, বিশেষ করে পাহলাভী শাসনামলে সম্পাদিত বিভিন্ন কাজের ফল। হয়তো আমরা নিজেরাও অর্থাৎ আমাদের অনেকেও _ এতে অংশীদার ছিলাম। আর তা হচ্ছে এই যে, আমাদের মধ্যে এমন একটা ভাব ছিলো যে, ‘যা হয় হোক, আমার কী? বা তোমার কী?’
এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছিলো যে, প্রত্যেকেই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলো; অন্যদের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাতো না। প্রত্যেকেই তার ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনায় যা করা উচিৎ মনে করতো তদ্রূপ কাজ করতো; অন্যদের সাথে পরামর্শ করার, সহযোগিতা করার ও অভিন্ন চিন্তা করার প্রয়োজন মনে করতো না।
এভাবে যে ‘একলা চলো’ মানসিকতা গড়ে উঠেছিলো তার ফলে লোকদের মধ্যে এ ক্ষেত্রে তৎপরতা চালানোর জন্য অন্যদের প্রয়োজন অনুভব করতো না। এটা ছিলো আমাদের একটি সাংস্কৃতিক ঘাটতি।
আমরা যখন “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্”-এর দায়িত্ব পালন করতে চাই তখন আমাদের দু’তিন জন প্রতিবেশী সহ আমরা নিজেরা, অথবা আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে অথবা বাজারে আমাদের প্রতিবেশী দোকানদারগণকে, মহল্লায় বসবাসরত আমাদের বাড়ীঘরের প্রতিবেশীদের নিয়ে কাজ করি। আমরা যদি খুব বেশী অন্যদেরকে নিয়ে কিছু করতে চাই তাহলে কেবল এদেরকে নিয়ে পদক্ষেপ নেই। কিন্তু আমাদের যে সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনে অধিকতর ধারাবাহিকভাবে, দৃঢ়তরভাবে ও অধিকতর প্রভাবশালীভাবে কাজ করা প্রয়োজন আমরা তা বিশ্বাস করি নি। অবশ্য এর কারণও ছিলো।
আমাদের মধ্যকার অনেকের এ বিষয়টি বিশ্বাস না করার পিছনে সঙ্গত কারণ ছিলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা জানি যে, ইসলাম ঐক্য, সংহতি ও সহমর্মিতার প্রতি, পারস্পরিক ভালোবাসার প্রতি আহ্বান জানায়। এরশাদ হয়েছে ঃ _ “মু’মিন ব্যক্তি অন্যদেরকে জানে ও অন্যরাও তাকে জানে।” অর্থাৎ মু’মিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, সে অন্য মু’মিনদের সাথে মিলেমিশে চলে এবং অন্য মু’মিনরাও তার সাথে মিলেমিশে চলে। আরো এরশাদ হয়েছে ঃ “যে ব্যক্তি কেবল নিজের চিন্তা করে সে ধ্বংস হয়ে যায়।” আল্লাহ্ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন ঃ _ “তোমরা সবাই মিলে একত্রিত হয়ে আল্লাহ্র হাতলকে ধরে রাখো এবং বিভক্ত হয়ে যেয়ো না।”
কিন্তু সকলে যেন, যাকে বলে, অচল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। আমরা সবাই জানি যে, ইসলাম ঐক্যের প্রবক্তা, সংহতির প্রবক্তা। ইসলাম চায় যে, সকল মুসলমান এক দেহের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ থাকবে। নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন ঃ “মু’মিনগণ পরস্পরের অংশ।” এর ভিত্তিতেই শেখ সা’দী বলেছেন ঃ “আদম-সন্তাগণ একে অপরের অঙ্গ।”
উক্ত হাদীছ ও আরো অনেক রেওয়াইয়াত অনুযায়ী মু’মিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক একটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সম্পর্কের সমতুল্য। শেখ সা’দী এ থেকে সাহায্য নিয়ে একে আরো কিছুটা সমপ্রসারিত করে উপস্থাপন করেছেন এবং বলেছেন যে, আদম সন্তানগণ অর্থাৎ সকল মানুষই পরস্পরের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ন্যায়।
যা-ই হোক, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন ঃ “মু’মিনগণ পরস্পরের অংশ।” অতএব, আমরা মু’মিনগণ যখন পরস্পরকে ভালোবাসবো তখন কার্যতঃ আমাদের শরয়ী দায়িত্ব পালন করা হবে। আর আমরা যদি পরস্পরকে ভালো না বাসি তাহলে ইসলাম দুর্বল হয়ে যাবে, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব, আমাদেরকে পরস্পরের সাথে আরো বেশী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এখানে একটি সমস্যার কথা না বললে নয়। তা হচ্ছে এই যে, বিগত প্রায় এক শতাব্দী কাল যাবত এবং বর্তমানেও এমন একটি ধারণা পোষণ করা হচ্ছে যে, সমাজদেহকে যদি সংঘবদ্ধ করতে হয় তাহলে তাকে দলীয় কাঠামোর অধীনে সংঘবদ্ধ করতে হবে। কিন্তু ইরানে সাংবিধানিকতার যুগ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যে সব রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে সেগুলোর কর্মতৎপরতার ইতিহাস মোটেই ভালো নয়। এমনকি ইসলামী বিপ্লবের পরে যে সব দল গঠিত হয়েছে সেগুলোও দলীয় সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত নয় এবং জনগণের অন্তরে স্থান লাভ করতে পারে নি।
আপনাদের হয়তো স্মরণ থেকে থাকবে যে, হেযবে জোম্হুরিয়ে ইসলামী বা ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শহীদ ড. বেহেশতী, শহীদ ড. বাহোনার, বর্তমান সম্মানিত রাহ্বার ও জনাব হাশেমী রাফসানজানী। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) কিন্তু দল গঠনের ওপর তেমন কোনো গুরুত্ব আরোপ করেন নি এবং বলেন নি যে, আপনারা দল গঠন করুন। তিনি বলেন ঃ “আপনারা যদি চান যে, দলও করবেন তাহলে হেয্বে জোম্হুরিয়ে ইসলামী-ই থাক।”
হযরত ইমামের এ কথার অর্থ মোটেই এ নয় যে, আপনাদেরকে অবশ্যই দল গঠন করতে হবে। আমাদের কাছে এ ধরনের ব্যাখ্যাও এসেছে যে, “রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাদিকে হয় ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখতে হবে নয়তো দলীয় বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। যেহেতু দলীয় কাজের ওপর সন্তুষ্ট নই সেহেতু ব্যক্তিগতভাবে এসব দায়িত্ব আঞ্জাম দেবো।”
এ জাতীয় কথা যারা বলেন তাঁরা এ সত্যটি থেকে গফেল রয়েছেন যে, এর বাইরে তৃতীয় একটি পথও রয়েছে। ইসলামী মডেল ঐ দু’টি পন্থার কোনোটিই নয়। ইসলামী মডেল হচ্ছে সেটাই যা হযরত ইমাম নিজে উপস্থাপন করে গেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় এই যে, এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তাগবেষণা করা হয় নি।
হযরত ইমামের নেতৃত্বাধীন বৈপ্লবিক আন্দোলনের শুরুর দিকে যে সব মুসলমান তাঁর জন্য আত্মোৎসর্গ করার জন্য আগ্রহী ছিলেন তাঁরা, বিশেষ করে তেহরানের এ ধরনের মুসলমানরা তাঁর খেদমতে এসে বলেন, “হুযুর, আমাদের জান ও মালকে আমরা আপনার এখতিয়ারে সোপর্দ করছি; আপনি বলুন, একে আমরা কী কাজে লাগাবো। আপনি আমাদেরকে কাজের পদ্ধতি বলে দিন।”
এদের মধ্যে কয়েকটি সীনাযানীর অর্থাৎ বুক চাপড়ে শোক প্রকাশকারী দল ও দ্বীনী কাজের গ্রুপ ছিলো। ইমাম তাদেরকে বললেন, “তোমরা তোমাদের এ দল ও গ্রুপগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করো; জোট গঠন করো। প্রতিটি দল ও গ্রুপই আলাদা থাকবে, প্রতিটিই নিজ নিজ জায়গায় বহাল থাকবে। তোমাদের প্রত্যেকটি দল ও গ্রুপেরই নিজস্ব জায়গা ও মহল্লা থাকুক, প্রত্যেকটিরই সদস্য মণ্ডলী থাকুক। তোমাদের কাজের ধারাও তোমরা নিজেরাই নির্ধারণ করো। তোমাদের বক্তাগণ, তোমাদের ওয়ায়েযগণ, তোমাদের দলের মাদ্দাহ্ বা মা’ছূমদের প্রশংসাকারীগণ হবে তোমাদের একান্ত নিজস্ব। কিন্তু এ সত্ত্বেও তোমরা তোমাদের প্রতিবেশী সীনাযানী দলের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করো। তোমরা যৌথভাবে পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করো। তোমরা একত্রে বসে মত বিনিময় করো এবং অভিন্ন মূলনীতি সমূহ বের করার চেষ্টা করো। প্রতিটি দলের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা বজায় রেখে, এসো তোমরা অভিন্ন বিষয়াদিতে জোটবদ্ধ হও।”
আমার ভয় হচ্ছে, আমি যে এ কথাগুলো বলছি এরও রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা করা হতে পারে। তবে সীনাযানী দল সমূীহের ক্ষেত্রে ‘জোটবদ্ধ দল সমূহ’ কথাটা হযরত ইমামের এ বক্তব্য থেকেই জন্ম নেয়। কিন্তু এখন একটি গোষ্ঠীর জন্য এ ‘জোট’ কথাটা ব্যবহৃত হচ্ছে। আমি এ গোষ্ঠীকে সমর্থন করতে চাই না। তাদের কাজ সঠিক নাকি সমালোচনাযোগ্য তা-ও বলতে চাই না। তবে শুধু এতটুকু বলতে চাই যে, হযরত ইমাম যে ধরনের ‘জোট’ তৈরীর কথা বলেছিলেন এটা তা নয়। হযরত ইমাম মূল মডেলটি দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, দ্বীনী তৎপরতা পরিচালনাকারী গোষ্ঠীগুলো পরস্পর জোটবদ্ধ হবে; ‘জোটবদ্ধ গোষ্ঠী সমূহ’ হবে।
প্রথমে এ ধরনের চারটা গোষ্ঠী ছিলো। এর মধ্যে একটিকে দিকনির্দেশনা দিতেন বর্তমান সম্মানিত রাহবার, একটিকে পরিচালনা করতেন জনাব হাশেমী রাফসানজানী, একটির নেতৃত্ব দিতেন শহীদ বাহোনার এবং আমিও এ ব্যাপারে কিছুটা খেদমত আঞ্জাম দিতাম। সবাই মিলে হযরত ইমামের কাছে অনুরোধ জানালেন যে, আমাদের মধ্যে জোট সৃষ্টির জন্য আপনি একজন প্রতিনিধি মনোনীত করে দিন। তখন তিনি শহীদ ডক্টর বেহেশতীকে এ দায়িত্ব দিলেন। আজকেও যদি আমরা কাজ করতে চাই তাহলে আমাদেরকে সংঘবদ্ধ হতে হবে, পরস্পরের সাথে সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে হবে।
কিন্তু আমার একথা বলার উদ্দেশ্য দল গঠন করা নয়। আমি দল পরিত্যাগ করতে বলছি না। আমি বলতে চাই যে, সংঘবদ্ধতার জন্য ইসলামী মূল্যবোধ সমূহের সাথে সামঞ্জস্যশীল সর্বোত্তম মডেল হচ্ছে তা-ই হযরত ইমাম যা নির্দেশ করেছিলেন। দলে একটি সমস্যা থাকে যা এ ধরনের সংঘবদ্ধতায় থাকে না।
আপনারা লক্ষ্য করুন, একটি দল কীভাবে গঠিত হয়। প্রথমে এটি কয়েক জন লোক মিলে গঠন করেন। প্রকৃত পক্ষে এরাই দলের কাজকর্ম পরিচালনা করেন। বলা হয় যে, তাঁরা সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন এবং এ জাতীয় কথাবার্তা। আসলে এ হচ্ছে ঘটনার বাইরের রূপ। প্রকৃত পক্ষে এই কিছু সংখ্যক লোকই পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন এবং এরাই দলকে পরিচালনা করেন। নেতৃত্বে পেঁৗছলে এরাই পেঁৗছেন। এরাই মূল ভূমিকা পালন করেন। আর যেহেতু এরা দল সমূহের প্রধান সেহেতু যখন নির্বাচনে বিজয়ী হন, তা মজলিসে শূরায়ে ইসলামীর নির্বাচনই হোক বা অন্য কোনো নির্বাচনই হোক, রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা এরাই হাতে নিয়ে নেন। আর যেহেতু নির্বাচনে জয়লাভ করাই লক্ষ্য, সেহেতু এ জন্য যে কোনো মূল্য দিতেই তাঁরা প্রস্তুত থাকেন।
এমনকি দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব লাভের জন্যও অনেক তৎপরতা চালানো হয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য থাকে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আরো এক স্তর ওপরে ওঠা। অর্থাৎ দলীয় তৎপরতায় বস্তুগত ও পার্থিব লক্ষ্যসমূহ খুবই প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে থাকে।
‘ককেসাস পর্বতের আড়ালে’ বলে একটা কথা আছে; আপনারা হয়তো এ কথাটা শুনে থাকবেন। নির্বাচনের কাজে সিটি কর্পোরেশনের তহবিল, সিটি কর্পোরেশনের পার্ক, যানবাহন ও অন্যান্য উপায়-উপকরণ, বিভিন্ন ব্যাঙ্কের অর্থ, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের উপায়-উপকরণাদি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপায়-উপকরণাদি এবং অন্য আরো অনেক কিছুর ব্যবহার আইনে নিষিদ্ধ হলেও অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জয়লাভ করার উদ্দেশ্যে ‘ককেসাস পর্বতের আড়ালে’ এগুলো ব্যবহার করে থাকে। এ ধরনের দৃষ্টান্ত অনেক।
কিন্তু হযরত ইমাম যে পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন তাতে এ ধরনের কোনো ব্যাপার নেই। দ্বীনী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে দ্বীন। এ কারণে তারা যখন তাদের মধ্য থেকে তাদের নেতৃত্ব দেয়ার লক্ষ্যে কাউকে নির্বাচিত করে তা এ কারণে করে যে, তিনি এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা পালন করেন। তারা এ কারণে তাঁকে দায়িত্ব দেয় যে, তারা অভিজ্ঞতার আলোকে প্রকৃতই এ উপসংহারে উপনীত হয় যে, তিনি আসলেই সবচেয়ে বেশী খেদমত করতে পারবেন। এখানে অন্য কোনো ব্যাপার নেই।
দলের ক্ষেত্রে বৈদেশিক উপায়-উপকরণের ব্যবহার ও বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে। কিন্তু দ্বীনী গোষ্ঠীগুলোতে এর সম্ভাবনা নেই বা খুব কম আছে। অর্থাৎ এ দুয়ের মধ্যে তুলনা করা সম্ভব নয়। এ ধরনের গোষ্ঠীতে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের উদ্দেশ্য থাকে দ্বীন। তাই তারা কোনো ব্যক্তিকে খুব ভালোভাবে চিনে নিয়ে তবে তাকে নেতৃত্বে বসায়। আর দল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যাধি হচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা। আর এরপর তা দল সমূহ কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় পর্যবসিত হয়।
কারো কাছে যদি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এ প্রশ্নের জবাব চান যে, জনাব, অমুক দল যাদেরকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে তারা কি আপনাদের প্রার্থীদের তুলনায় অধিকতর সুযোগ্য নন? তখন ক্ষেত্র বিশেষে মুখেও স্বীকার করে যে, হ্যা তারা অধিকতর সুযোগ্য। কিন্তু শেষে বলে ঃ “হ্যা, তবে আমাদের দল এদেরকে মনোনয়ন দিয়েছে; এরা আমাদের সাথে অভিন্ন রাজনৈতিক ধারার অনুসারী। আমাদের রাজনৈতিক ফ্রন্ট বা জোটের স্বার্থের দাবী এটাই। আমরা কথা দিয়েছি যে, আমাদের ফ্রন্টের দলগুলো যা সিদ্ধান্ত নেবে আমরা তার প্রতি সমর্থন জানাবো।”
কিন্তু দ্বীনী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এ ধরনের কথা শোনা যাবে না। অতএব, আমাদের জন্য যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, আমাদের দ্বীনী সংঘবদ্ধতা থাকতে হবে। কিন্তু তা যেন পশ্চিমী ধরনের দলীয় মডেলের না হয়। ইসলামে দলীয় মডেলের অস্তিত্ব নেই। এগুলো সব পাশ্চাত্য থেকে এসেছে। হতে পারে যে, কোনো এক দিক থেকে এ ধরনের দল হোসাইনীও হতে পারে, কিন্তু একদিক থেকে তাতে ত্রুটি ও দোষ রয়েছে। তাই আমাদের সামনে যখন উন্নতিতর পদ্ধতি বিদ্যমান আছে তখন আমরা কেন তা-ই বেছে নেবো না? এ পদ্ধতি তো একান্তই আমাদের নিজস্ব পদ্ধতি, আমাদের ইসলামী পদ্ধতি। এ পদ্ধতি হচ্ছে ইসলামী গোষ্ঠী গড়ে তোলার পদ্ধতি। তবে আমাদেরকে বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
এটা হলো দ্বিতীয় বিষয়। প্রথম বিষয়টি কী ছিলো?
একটি বিষয় হচ্ছে এই যে, শিথিলনৈতিকতা ও উদাসীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে, দ্বীনী চেতনা ও সংবেদনশীলতাকে শক্তিশলিী করতে হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও ‘একলা চলো’ মানসিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। আমাদের মধ্যে এ সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হবে যে, যে সব শয়তান আমাদের অস্তিত্বকে, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ও আমাদের দ্বীনকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রাম পরিচালনা করা ও তাদের কৃত ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। অতএব, জনগণকে সাথে নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে এসবের মোকাবিলা করতে হবে। এজন্য সংঘবদ্ধতার আশ্রয় নিতে হবে, পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে, পরস্পরের মধ্যে সংহতি থাকতে হবে। আর যদি দল গঠন ছাড়া অন্য কোনো পথই খোলা না থাকে তাহলে দলও গঠন করতে হবে।
যা-ই হোক, হযরত ইমাম দল করতে নিষেধ করেন নি, কিন্তু তিনি যা পসন্দ করতেন তা করার জন্য তিনি তাঁর আন্দোলনের শুরুর দিকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন। তা হচ্ছে দ্বীনী গোষ্ঠী বা গ্রুপ গঠন। তাহলে আমাদেরকে এখন কী করতে হবে? আমার প্রস্তাব হচ্ছে এই যে, আপনাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ মহল্লার মসজিদে _ যে মসজিদে তুলনামূলকভাবে বেশী সংখ্যক নামাযীর সমাবেশ ঘটে, সেখানে এভাবে কাজ করার চেষ্টা করুন। উক্ত মসজিদে মহল্লার সকলকে দাওয়াত করুন। অবশ্য প্রত্যেককে তার অবস্থা বুঝে সেভাবে দাওয়াত করতে হবে। দাওয়াতপ্রাপ্তরাও একে অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এটা তারা ভালোভাবেই জানে। একটি ক্লাসে যখন একজন ভালো ছাত্র থাকে এবং অন্যদের তুলনায় তার মধ্যে কাম্য গুণ কিছুটা বেশী থাকে তখন সে একাই গোটা ক্লাসকে তার পিছনে টেনে নিয়ে আসতে পারে। তখন যুবকরা ভালোই জানে যে, কী করতে হবে। আপনি কিছু লোকের মাধ্যমে মহল্লার অন্য লোকদের জড়ো করার চেষ্টা করুন; এমনকি কেউ যদি বিপ্লব বিরোধীও হয় তাকেও দাওয়াত করুন।
মনে রাখতে হবে যে, যারা বিপ্লব বিরোধী তাদেরও অনেকেই অজ্ঞতা জনিত কারণে বিপ্লব বিরোধী হয়েছে। অতএব, প্রথমে তার কাছে যেতে হবে এবং তার ওপরে কাজ করতে হবে। দ্বীনী গোষ্ঠীর বৈঠকে ডেকে নয়, বরং এর বাইরে তার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তাকে প্রভাবিত করতে হবে, হেদায়াতের চেষ্টা করতে হবে। এরপর সে নিজেই যখন আপনাদের দ্বীনী গোষ্ঠীতে শামিল হতে চাইবে আশা করা যায় যে, ততদিনে সে এতখানি পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে থাকবে যে, তর ওপর আস্থা স্থাপন করা যায়।
হ্যা, গোষ্ঠী গঠনের কাজ যখন হয়ে যাবে তখন বেশী কর্মক্ষমতা আছে এমন কয়েক জনকে বেছে নিয়ে তাদের ওপর কাজের দায়িত্ব প্রদান করুন। তারাই বেশীর ভাগ তৎপরতা চালাবে, পরামর্শসভা গঠন করবে। তারা সভা আহ্বান করবে ও পরিচালনা করবে। সবাই আন্তরিকতা সহকারে বসে চিন্তাভাবনা ও আলোচনা করবে। তারা নিজেরা চিন্তাভাবনা করার ও নিজেরাই কাজ করার চেষ্টা করবে। বস্তুতঃ এটাই হচ্ছে জনগণের পরিচালনা ব্যবস্থা।
এই যে, পাশ্চাত্য থেকে জনগণের কর্তৃত্বের কথা বলা হয়, আল্লাহ্ সাক্ষী, এটা নির্জলা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, ওদের ব্যবস্থায় শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের কোনো ভূমিকাই নেই। বরং জনকর্তৃত্ব হচ্ছে এটাই যে, একটি মহল্লার সকল জনগণ একত্রে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ও তা বাস্তবায়ন করে। এখানে কোনো জোরজবরদস্তির ব্যাপার নেই, কোনো দানের ব্যাপার নেই, ভয়ভীতির ব্যাপার নেই। এ ব্যবস্থায় সবাই দায়িত্ববোধের কারণে কাজ করে। এটাই হচ্ছে প্রকৃত জনকর্তৃত্ব। এটাই হচ্ছে জনগণের হুকুমাত। যে ক্ষেত্রে প্রতারণামূলক প্রচারণার আশ্রয় নিয়ে, এবং কখনো কখনো ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে _ অর্থ দিয়ে বা পদের লোভ দেখিয়ে, বিভিন্ন ধরনের ওয়াদা দিয়ে তথা একেক জনকে একেক পন্থায় পক্ষে টানা হয়, তা জনকর্তৃত্ব নয়।
আপনারা কি মনে করেন যে, তেহরান শহরের কোটায় ত্রিশ জন মজলিস সদস্য নির্বাচন করতে গিয়ে যে সব লোক, যাকে বলে ‘ককেসাস পর্বতের আড়ালে’ ত্রিশ জনের একটি তালিকায় ভোট দেয়, তাদের অনেকেই কি এদের মধ্য থেকে বিশ জনকেও চেনে? আপনারা বিশ্বাস করুন যারা এই ত্রিশ জনের লিস্টে ভোট দিয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা নব্বই জনই এমন যে, তারা ঐ তালিকার ত্রিশ জনের মধ্যে বিশ জনের নামও এর আগে শোনে নি, তাদের সকলকে চেনা তো দূরের কথা। লোকেরা যে তাদের সকলকে চিহ্নিত করবে এবং দূরদৃষ্টি ও দয়িত্ববোধ সহকারে তাদের যোগ্যতা সম্বন্ধে পর্যালোচনা ও অন্যদের সাথে তুলনা করবে এবং এরপর ভোট দেবে এটা আদৌ আশা করা যায় না। এটা হলো পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের পদ্ধতি।
কিন্তু ইসলামী গণতন্ত্র অনুযায়ী হুকুমাত হবে জনগণের ইসলামী হুকুমাত। এ ব্যবস্থায় প্রত্যেকেই দ্বীনী দায়িত্বানুভূতির কারণে বলবে ঃ “আমি এমন কাউকে ভোট দেবো যে সব চাইতে ভালোভাবে কাজ করবে, ইসলামের জন্য সবচেয়ে উত্তমভাবে কাজ করবে।” অবশ্য অসম্ভব নয় যে, একশ’ জনের মধ্যে দু’জন তাদের ক্ষমতা ও দায়িত্বের অপব্যবহার করবে। কিন্তু একশ’ জনের মধ্যে দু’জনের এরূপ ভূমিকা আসলেই তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না।
কিন্তু ওদের ঐ গণতন্ত্রের ভিত্তিই অপব্যবহারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ওদের গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হচ্ছে প্রতারণা। ওদের মূলনীতি হচ্ছে মিথ্যা প্রচারণার আশ্রয় নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিল করা।
আপনারা আপনাদের সমাবেশগুলোকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করুন। আপনাদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়াদর্্রচিত্ততা শক্তিশালী করুন। আপনারা লক্ষ্য করুন ইসলামের দেয়া কোন্ কোন্ আদেশ-নিষেধের কথা আপনারা ভুলে গেছেন। এরশাদ হয়েছে, জামা’আতে নামায আদায়ের পরে দু’জন মুসলমান যখন পরস্পরের সাথে হাত মিলায়, পরস্পরের খোঁজ-খবর নেয়, জিজ্ঞেস করে ঃ “কেমন আছেন?” তখন _ তাদের জন্য একশ’ রহমত নির্ধারিত হয়ে যায় যার মধ্যে নিরানব্বইটি ঐ ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত হয়ে যায় যে তার বন্ধুকে অধিক ভালোবাসে।
লক্ষ্য করুন, মু’মিনরা যাতে নিজেদের মধ্যে _ যাদের লক্ষ্য অভিন্ন _ বন্ধুসুলভ সম্পর্ক সৃষ্টি করে, পরস্পরের ত্রুটিকে উপেক্ষা করে এবং পরস্পরের সাথে ভালোবাসা সহকারে আচরণ করে এ জন্য ইসলাম কী পরিমাণ চেষ্টা করেছে। ইসলাম চায়, মু’মিনরা আল্লাহ্ তা’আলার প্রতি ঈমান ও খোদায়ী লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করবে, প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার পথে নয়।
রেওয়াইয়াতে এরশাদ হয়েছে ঃ মুমিনগণ যদি কেবল অন্য মু’মিনের সাথে সাক্ষাত করার জন্য তার বাড়ীতে যায় এবং এ সাক্ষাতের উদ্দেশ্য কেবল তাকে দেখা ছাড়া আর কিছু না হয় তখন আল্লাহ্ তা’আলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন এবং তাকে নির্দেশ দেন ঃ “যাও, ঐ ব্যক্তিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো, তুমি যে এই মু’মিনের গৃহের দরযায় কড়া নাড়ছো (বা আঘাত করছো), তার সাথে তোমার কী কাজ আছে?” তখন ফেরেশতা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে ঃ “তুমি যে এই মু’মিনের গৃহের দরযায় কড়া নাড়ছো (বা আঘাত করছো), তার সাথে তোমার কী কাজ আছে?” আগত মু’মিন ব্যক্তি জবাব দেয় ঃ “আমার বন্ধুকে দেখতে এসেিেছ।” ফেরেশতা জিজ্ঞেস করে ঃ “তুমি কি তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা চাইতে এসেছো?” সে বলে ঃ “না।” ফেরেশতা বলে ঃ “তোমার অন্য কোনো প্রয়োজন আছে?” সে বলে ঃ “না।” ফেরেশতা বলে ঃ “তাহলে কী জন্য তাকে দেখতে চাও?” সে বলে ঃ “কেবল এজন্য এসেছি যে, তার জন্য আমার মন অস্থির হয়ে উঠেছিলো। তাই তাকে দেখতে এসেছি।” তখন আল্লাহ্ তা’আলা ঐ ফেরেশতাকে লক্ষ্য করে বলেন ঃ “ঐ মু’মিনকে আমার এ কথা জানিয়ে দাও ঃ “আসলে তুমি আমাকেই দেখতে এসেছো, অতএব, তোমার অভ্যর্থনা আমার জন্য অপরিহার্য হয়ে গেছে।”
এ হচ্ছে ইসলামী আহ্কামের অন্যতম দৃষ্টান্ত।
আপনারা পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করুন। অন্তরের মলিনতাকে দূর করে ফেলুন। কিন্তু কোরআন-হাদীছে যেখানে ঐক্যের কথা বলা হয়েছে, কোরআন মজীদে বলা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ইসলামের দুশমনরা এরও অপব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। তারা মনে করছে, যে কোনো পন্থায় যে কোনো ধরনের ঐক্য প্রতিষ্ঠাই বুঝি বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আসলেই কি তা-ই?
উদাহরণ স্বরূপ ধরা যাক, কোথাও ক্ষমতা এমন লোকদের হাতে যাদের হাতে ক্ষমতা থাকা ইসলাম পসন্দ করে না। সেখানে ঐক্য অর্জনের জন্য সকলে এসে তাদের অনুগত হয়ে গেলো। এটাই যদি হবে ঐক্যের উদ্দেশ্য, তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষই তো কাফের-মোশরেক। তাহলে ঐক্য হাসিলের জন্য কি মুসলমানদেরকে গিয়ে কাফের হতে হবে? তেমনি মুসলিম জাহানের মোট জনসংখ্যার হয়তো শতকরা নব্বই ভাগই সুন্নী, তাহলে কি ঐক্য হাসিলের জন্য শিয়াদেরকে সুন্নী হয়ে যেতে হবে?
বস্তুতঃ ইসলামের দৃষ্টিতে কাম্য বা বাঞ্ছিত ঐক্য হচ্ছে সত্যকে কেন্দ্র করে ঐক্য। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন ঃ _ “(তিনি আদেশ দিয়েছেন যে,) তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখো এবং এ ব্যাপারে মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ো না।”
সবাইকে দ্বীনকেই মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং একে কেন্দ্র করেই ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। এটা চাওয়া হয় নি যে, মু’মিনরা গিয়ে বে-দ্বীনদের সাথে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে। ইসলামের দুশমনদের সাথে ঐক্য গড়ে তোলা হলে তা থেকে মু’মিনরা আত্মধ্বংস ছাড়া আর কী অর্জন করতে পারবে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির জন্য কী মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে? এ ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। অবশ্য উভয়ের ফলাফল একটিই। ইসলামী আইন-কানুন এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মুজতাহিদ শাসক _ এ হচ্ছে ঐক্যের মানদণ্ড। যারা সত্যি সত্যিই চায় যে, সমাজে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হোক এবং তা হোক এমন কারো হাত দিয়ে যিনি নীতিগতভাবে হযরত ইমাম মাহ্দীর (আল্লাহ্ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত, তাদের কাছে এ দু’টিই মানদণ্ড।
মুজতাহিদ শাসকের মাধ্যমে ইসলামী আইন-কানুনের শাসন _ এটাই হচ্ছে ঐক্যের মানদণ্ড। মতামতের পার্থক্য অনেক। কখনোই মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হবে না। মানুষের আচরণের ধরনও বিভিন্ন। লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কখনোই অভিন্নতা অর্জিত হবে না। কিন্তু এই দু’টি বিষয় সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মানদণ্ড হতে পারে। সকলেরই চাওয়া উচিৎ যে, ইসলাম বাস্তবায়িত হোক। আর সকলেরই চাওয়া উচিৎ যে, এই ইসলামী আহ্কাম এমন ব্যক্তির হাতে বাস্তবায়িত হোক যিনি ইসলাম সম্পর্কে, বিশেষ করে সাাজিক ও সমষ্টিগত বিষয়াদিতে অন্যদের তুলনায় অধিকতর জ্ঞান রাখেন। বস্তুতঃ এমন ব্যক্তিই এ কাজের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার ও তাঁর ওলীগণের পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত _ যাতে শাসক আত্মসাতকারী ও জবরদখলকারী না হয়।
এখন আপনারা যদি বেলায়াতে ফাক্বীহ্ তথা মুজতাহিদের শাসন-কর্তৃত্ব মেনে নেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এতে ইসলামও রয়েছে। কারণ, মুজতাহিদ শাসক তো আর অনৈসলামী হুকুম দেয়ার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেন না। অতএব, আমরা বলতে পারি যে, বেলায়াতে ফাক্বীহ্ রূপ অক্ষকে কেন্দ্র করেই ঐক্য হাসিল হতে পারে।
এর বাইরে পশ্চিমা গণতন্ত্র ও মূল্যবোধ সমূহকে কেন্দ্র করে যে ঐক্য গড়ে উঠতে পারে তার অবস্থা কী? তারা স্বাধীনতার কথা বলে। তারা কী ধরনের স্বাধীনতা চায় তা তো আপনারা বার্লিন কন্ফারেন্সে লক্ষ্য করেছেন। আমি যেদিন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে বললাম যে, তারা কী ধরনের স্বাধীনতা চায়, অমনি সকল দৈনিক পত্রিকা আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামলো। দেশের অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন।
এবার বুঝুন, ঐ ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য কোটারীগুলো কেমন ঐক্যের পিছনেই না ছুটলো! কী ধরনের স্বাধীনতাই না তারা চাচ্ছিলো! আর কী ধরনের লাঞ্ছনা ও হীনতা-নীচতা সহকারেই না তারা সে কন্ফারেন্সটা করলো! তারা যেমন নিজেদের ইজ্জত-আব্রূ নষ্ট করলো, তেমনি নিজেদের দেশের ইজ্জত-আব্রূ এবং নিজ দেশের জনগণের ইজ্জত-আব্রূও নষ্ট করলো!
অবশ্য ইসলাম ও মুসলিম জনগণের ইজ্জত-আব্রূ এতই সমুন্নত যে, এদের এ সব নোংরামীর দ্বারা তা নষ্ট করা সম্ভব নয়। _ “আর ইজ্জত তো আল্লাহ্র জন্য এবং তাঁর রাসূল ও মু’মিনদের জন্য।” কিন্তু তারা তাদের নাপাক মুখে যে পরিমাণ ধরে সে পরিমাণ নাপাক পানির কুলি ইসলামী সমাজের দিকে নিক্ষেপ করেছে। এরা এই ধরনের স্বাধীনতার পিছনে ছুটছে।
যা-ই হোক, কী ধরনের ভিত্তির ওপর ভিত্তিশীল ঐক্য বাঞ্ছনীয় তা ঊল্লেখ করেছি। আমি বলতে চাচ্ছি যে, যারা ইসলাম চায় এ ধরনের সকল গোষ্ঠীকে এক ফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ইসলামের জন্য এটাই বাঞ্ছনীয় বিষয়। ঐক্য হতে হবে দ্বীনের ভিত্তিতে যার প্রতীক ও মূলসুর হচ্ছেন মুজতাহিদ শাসক। অতএব, আপনারা যদি সমচিন্তার লোক, কর্মসহযোগী ও বন্ধু নির্বাচন করতে চান তাহলে আপনাদেরকে এ মূলনীতির ভিত্তিতে তা করতে হবে যে, আপনারা দেখবেন, সে ব্যক্তি কি আন্তরিকভাবে আহ্কামে ইসলামীর বাস্তবায়ন চায়, নাকি ইসলামী আহ্কাম পরিত্যাগের জন্য বাহানা খোঁজে এবং বলে যে, এর অন্য ব্যাখ্যাও আছে।
এক ধরনের লোক ইসলামী আহ্কাম পালনের দায়িত্ব এড়ানোর উদ্দেশ্যে বলে ঃ “হ্যা, বিষয়টি আপনি এভাবে বুঝেছেন। কিন্তু আপনি যা বুঝেছেন সেটাকেই চূড়ান্ত মনে করা আপনার উচিৎ হবে না। আরো অনেক বুঝ আছে।” অর্থাৎ এভাবে তারা কার্যতঃ দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করে। ইসলামের দণ্ডবিধি যখন পরিত্যক্ত হয় এবং শরয়ী আহ্কামকে যখন আপেক্ষিক গণ্য করা হয় _ যার কোনো বিচারবুদ্ধিগত ও বাস্তবতার ভিত্তি নেই, তখন মূলনীতি বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
যারা প্রকৃতই মনেপ্রাণে চায় যে, ইসলামী আহকাম বাস্তবায়িত হোক তারা কোরআন মজীদে যা কিছু আছে এবং হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) যা কিছু এরশাদ করেছেন তার সব কিছুর ওপরে ঈমান পোষণ করে। তেমনি হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) যে লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তাঁর গোটা জীবন ব্যয় করেছেন এবং যে জন্য তিনি এ আন্দোলন গড়ে তোলেন ও বিপ্লব করেন আমরা সেই ইসলামকে চাই। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, অঙ্ফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোথাও পড়াশুনা করে যারা ডিগ্রী হাসিল করেছেন তাঁরা ইসলামের যে ব্যাখ্যা পেশ করছেন আমরা সে ইসলাম চাই না।
তাঁরা আমাদের ওপর তাঁদের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমরা চাই আল্লাহ্ তা’আলা স্বয়ং ইসলামকে যেভাবে পেশ করেছেন সেভাবে। আমরা হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ও বারো জন মা’ছূম ইমাম (আঃ) ইসলামের যে ব্যাখ্যা পেশ করেছেন এবং বিগত চৌদ্দশ’ বছর যাবত ওলামায়ে কেরাম ইসলামের যে ব্যাখ্যা করেছেন সে ব্যাখ্যাকেই গ্রহণ করি। আমরা কেবল সে ইসলামকেই চাই; এর বাইরে ইসলাম বলতে কিছু নেই।
কেউ যদি মনে করে যে, এই ইসলাম এই রকম এবং ঐ ইসলাম ঐ রকম, তাহলে তা একটা বিরাট ভুল। এ হচ্ছে এক ধরনের উদাসীনতা ও শিথিলনৈতিকতা এবং তা ইসলামের অবমাননা বৈ নয়। কারণ, ইসলাম একটির বেশী নয়। অন্য সব কিছুই হচ্ছে কুফ্র্, নাস্তিকতা। কিন্তু তারা তার নাম দিয়েছে ইসলামের অন্য এক ব্যাখ্যা।
আমরা তো ইসলামকে দু’টি মনে করি না। তাই আপনাদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে এই যে, আপনারা দ্বীনী জলসা সমূহের পুনরুজ্জীবন করুন, মসজিদকে এর অক্ষে পরিণত করুন। সংশ্লিষ্ট মহল্লার সকলকে _ যারা ইসলামে ঈমান পোষণ করে, যারা অন্তর থেকে কামনা করে যে, ইসলাম বাস্তবায়িত হোক, যারা মুজতাহিদ শাসককে মানে _ এ ধরনের সকলকে দাওয়াত করুন, তাদের সকলের প্রতি দয়াদর্্র হোন, সকলের সাথে আন্তরিক হোন, তাদের ভুলত্রুটিগুলোকে উপেক্ষা করুন, তাদের ছোটখাটো ভুলত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে লজ্জা দেবেন না। যতটা আপনাদের পক্ষে সম্ভব হয় তাদেরকে সাহায্য করুন। আপনাদের হাতে যদি দুনিয়ার ধনসম্পদ না থাকে এবং তাদেরকে আর্থিক দিক থেকে সাহায্য করতে না পারেন তাহলে অন্ততঃ হাসিমুখে ও আন্তরিকতার সাথে কথা বলে তাদেরকে সাহায্য করুন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন ঃ _ “আর নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা (অন্যদেরকে) নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।”
বিপ্লবের সময়, বিপ্লবের পরে ও যুদ্ধের সময় ইরানী জনগণের মধ্যে এ ধরনের চেতনা ও মানসিকতাই ছিলো। লোকেরা তাদের নিজেদের ও ঘরের লোকদের রাতের খাবারের রুটি নিজেরা না খেয়ে অন্য মুসলমানদেরকে দিতো। আপনারা এ চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করুন। তাহলে সংহতি বৃদ্ধি পাবে। মুসলমানরা যে এক দেহের সমতুল্য কাজের মাধ্যমে বাস্তবে তা প্রতিফলিত করুন।
হ্যা, আপনাদের মধ্যে যখন সংঘবদ্ধতা হসিল হবে তখন আপনাদের সামনে কী ধরনের চৈন্তিক খাবার পেশ করবো? এ ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ নেই যে, এর অক্ষ হবে কোরআন মজীদ এবং হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ও মা’ছূম ইমামগণের (আঃ) বাণী। অবশ্য এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। এ ব্যাপারে ইসলামী ব্যক্তিত্বগণ যাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে সঠিক বলে সত্যায়িত করেছেন তাঁদের ব্যাখ্যা থেকে সাহায্য নিতে হবে। বিশেষ করে হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) শহীদ অধ্যাপক মোতাহ্হারী রচিত সকল গ্রন্থকে নির্ভরযোগ্য বলে সত্যায়িত করেছেন। আপনারা এ সব গ্রন্থকে নির্দ্বিধায় পেশ করতে পারেন। এ ধরনের গ্রন্থাবলী থাকতে যদি আপনারা সন্দেহজনক জিনিসের কাছে যান, বা যেগুলোর মিথ্যা বা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার বিষয় সুস্পষ্ট সে সব জিনিসের কাছে যান কেবল এ বাহানায় যে, আমরা নতুন কিছু চাই, তাহলে তো কোরআন মজীদকে পাশে সরিয়ে রাখতে হবে এবং অন্য কিছু খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, কোরআন তো চৌদ্দশ’ বছর আগের জিনিস।
এটা কি কোনো যুক্তিসঙ্গত কথা যে, যা কিছু পুরনো তা-ই খারাপ, আর যা কিছু নতুন তা-ই ভালো? বরং দ্বীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি এর বিপরীত। দ্বীনে যা কিছু নতুন তা-ই বিদ্’আত্ এবং তা গোমরাহীর কারণ। এটা “নাহ্জুল্ বালাগ্বাহ্”র কথা। অবশ্য একটি আয়াতের নতুন কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে এবং তা সঠিক-ও হতে পারে। কিন্তু দ্বীনে নতুন কিছু সংযোজন, নিজের পক্ষ থেকে মনগড়া কিছু পেশ করা বিদ্’আত্ বৈ নয়। আর তা হচ্ছে গোমরাহী এবং তার পরিণাম হচ্ছে জাহান্নাম। কিন্তু কেউ যদি সঠিক পদ্ধতিতে গবেষণা করে কোরআন মজীদ ও সুন্নাত থেকে কোনো নতুন জিনিস বের করে আনে তাহলে অবশ্যই তা মাথায় তুলে নিতে হবে। ইসলামের গোটা ইতহাস জুড়ে আমাদের ওলামায়ে কেরাম এ কাজই করে এসেছেন।
তবে এ কাজের জন্য বিশেষ পদ্ধতি আছে, যে পদ্ধতি বিচারবুদ্ধির কাছে গ্রহণযোগ্য, যা নির্ভরযোগ্য। সঠিক পদ্ধতিতে গবেষণা করতে হবে, মনগড়া পদ্ধতিতে নয়, আমেরিকাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয়। বিপ্লব বিরোধীরা যাতে আমাদের ওপর খুশী হয়, যায়নবাদীরা যাতে আমাদের প্রশংসা করে, সে উদ্দেশ্যে গবেষণা করলে চলবে না। সঠিক পদ্ধতিতে গবষণা করলে যদি কোরআন ও সুন্নাত থেকে নতুন কোনো বিষয় পাওয়া যায় তো অবশ্যই তাকে স্বাগত জানাতে হবে; এটা খুবই ভালো কাজ হবে।
তাহলে আমাদের কাজ হওয়া উচিৎ এই যে, আমরা কোরআন ও সুন্নাহ্কে, ইসলামের চেতনাকে আরো ভালোভাবে বুঝার চেষ্টা করবো যাতে ইসলামের ব্যাপারে যে সব সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা হয় তার জবাব দিতে পারি। সেই সাথে আমাদেরকে ইসলামী জাহানের সাথে সংশ্লিষ্ট সমকালীন সমস্যাবলীর সঙ্গে, তা আমাদের নিজেদের দেশেরই হোক বা অন্য দেশেরই হোক, আরো বেশী পরিচিত হতে হবে, এসব সমস্যার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে হবে। এগুলো হচ্ছে এমন কাজ যা করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
আমাদের সমস্যা হচ্ছে এই যে, আমরা মনে করেছি, “আম্র্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহ্য়ি ‘আনিল্ মুন্কার্” সব সময়ই একটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের কাজ। আমরা যদি মনে করি যে, ইসলামের খেদমত করতে চাইলে বড়জোর বিক্ষোভে শামিল হবো ও শ্লোগান দেবো তহলে ভুল করবো। এ শ্লোগান সমূহ হচ্ছে এক ধরনের ইঙ্গিত। এ হচ্ছে শুরু।
মহররমের প্রথম দশদিন তথা আশূরার দিগুলো শেষ হয়েছে। শোকানুষ্ঠান, সীনাযানী ইত্যাদি ধীরে ধীরে শীতল হয়ে যাচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য সফর মাসের শেষ পর্যন্ত কমবেশী চলতে থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের মধ্যে এই যে উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর নামের ছায়াতলে আমাদের মধ্যে যে আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা হারিয়ে ফেলবো। তারপর আর এক বছর পর দেখবো কী হয়। কিন্তু এরূপ হওয়া উচিৎ নয়, বরং এটা হওয়া উচিৎ আমাদের কাজ শুরুর ইশারা স্বরূপ এবং সাইয়েদুশ শুহাদার শোকানুষ্ঠানে আমরা যে নূরানী অবস্থার অধিকারী হয়েছি তাকে অব্যাহত রাখা ও হেফাযত করা প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে এই যে ঐক্য ও অভিন্নহৃদয়তা সৃষ্টি করা সম্ভব হলো একে শক্তিশালী করতে হবে; একে পরবর্তী এক বছরের জন্য ছেড়ে দিলে চলবে না। তাই আজকেই আমাদেরকে যোগাযোগ করতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আমি আপনাদেরকে হুকুম দেয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখাবো না। তবে যেহেতু অনেকেই বলছেন ঃ “কী করবো?” সেহেতু অধম বলতে চাই, আমার বিচারবুদ্ধিতে যা আসছে তা-ই বলছি। তবে আপনাদের মাথায় যদি এর চেয়ে উত্তম কিছু আসে তাহলে তা আমাকে বলুন, তাহলে তা-ও করবো।
আপনারা এই আজ রাতেই _ এ সমাবেশ থেকে গিয়েই সিদ্ধান্ত নিন এবং আগামী কাল মহল্লার লোকদেরকে একটি দ্বীনী গোষ্ঠীতে সংঘবদ্ধ করুন। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, প্রথম দিনেই এ কাজ সম্ভব হবে না। কিন্তু প্রথম দিনে দু’জন লোককেও তো দাওয়াত করতে পারবেন। এরপর তিনজনকে, চারজনকে _ এভাবে ধীরে ধীরে এক মাসে মহল্লার সকল লোককেই সংগঠিত করতে পারবেন। এর ফলে একটি খাঁটি ও ত্রুটিমুক্ত দ্বীনী গোষ্ঠী তৈরী হবে। এভাবে আমরা দ্বীনকে অধিকতর উত্তমভাবে শিখতে পারবো এবং যথাসময়ে এ সমষ্টিকে অধিকতর উত্তমরূপে কাজে লাগাতে পারবো।
এ দ্বীনী গোষ্ঠীটি ভালোভাবে সুসংগঠিত হয়ে গেলে আমরা আমাদের পাশর্্ববর্তী মহল্লার এ ধরনের দ্বীনী গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবো। এভাবে এ কোম নগরীতে যদি কুড়িটি দ্বীনী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, এরপর প্রতিটি গোষ্ঠী থেকে একজন করে _ একজন বা দু’জন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে হবে। এরা মিলে একটি পরামর্শ সভা গঠন করবেন। এর উদ্দেশ্য হবে এ ধরনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এক সময় এমন পরস্থিতি দেখা দিতে পারে যে, সকলের নিকট কোনো তথ্য পেঁৗছানো প্রয়োজন, তখন সাথে সাথে পরামর্শ সভার এ সদস্যদের মাধ্যমে এক দিনেই সকল গোষ্ঠীর নিকট সে তথ্য পেঁৗছে যাবে।
আপনাদের অনেকে হয়তো ভুলে গেছেন যে, বৈপ্লবিক তৎপরতা শুরুর পর প্রথম দিকে যখন হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর নিকট থেকে কোনো বাণী এসে পেঁৗছতো তখন কীভাবে তা এক রাতের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হতো। হ্যা, তখন জনগণের মধ্যে সংহতির চেতনা তৈরী হয়েছিলো। কিন্তু খুব শীঘ্রই আমরা এ চেতনা হারিয়ে ফেলি। অবশ্য আল্লাহ্র রহমত যে, আমরা তা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলি নি। তবে তা দুর্বল হয়ে গেছে। আপনারা এ চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করুন।
ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পন্থা হচ্ছে ইসলামী অহকাম ও বেলায়াতে ফকীহ্ বা মুজতাহিদের শাসন-কর্তৃত্বে বিশ্বাসী মুসলমানদের মধ্যকার মানবিক ও ইসলামী সম্পর্ককে শক্তিশালী করা। আপনারা যদি এ সম্পর্ককে বাস্তব রূপ দিতে পারেন, শক্তিশালী করতে পারেন, তাহলে আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, আমেরিকা কোন্ ছার, সারা বিশ্বও যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কিছু করতে চায় তবুও তারা আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
এবার পুরো আলোচনার উপসংহার পেশ করতে চাই।
এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে যা আলোচনা করা হলো তার অক্ষ বা মূল কথা হচ্ছে এই যে, প্রথমতঃ ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে, সন্দেহ-সংশয় সমূহের জবাব দিতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও ভাষ্য থেকে দেশের রাজনৈতিক সমস্যাবলীর সাথে পরিচিত হতে হবে। এগুলোই হচ্ছে আলোচনার অক্ষ বা মূল বিষয়। অবশ্য এ সব কিছুই এসেছে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। তাই এক অর্থে বলা চলে যে, এটাই হচ্ছে এর চেতনা। কিন্তু আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, আপনারা যদি শুধু জলসার আয়োজন করেন, বিশেষ করে, ধরুন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকেরা যদি রাত থেকে শুরু করে ফযরের ওয়াক্ত পর্যন্ত কেবল সীনাযানী করতে থাকে তাহলে তাতে আমাদের সমস্যাবলীর সমাধান হবে না।
সাইয়েদুশ শুহাদার নাম নেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, তা আমাদেরকে সমবেত করবে। আমাদেরকে সমবেত করবে কী উদ্দেশ্যে? এ উদ্দেশ্যে যে, আমরা যেন ইসলামকে আরো ভালোভাবে শিখি, ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে আরো ভালোভাবে সংগ্রাম করি। এটা মূল কর্মসূচী নয় যে, রাত থেকে ফযরের ওয়াক্ত পর্যন্ত কেবল সীনাযানী করবো _ বুক চাপড়াবো। আমাদের এ শোকানুষ্ঠানগুলোকে সামাজিক সমস্যাবলী সমাধানের প্রেরণায় পরিণত করতে হবে। এটা হলো লবণের মতো যা না হলে তরকারী খাওয়ার উপযোগী হয় না। কিন্তু আমরা যেন লবণকে তরকারীর বিকল্প মনে না করি। আমাদেরকে আরো ভালোভাবে দ্বীনী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা করতে হবে। আপনারা সন্দেহ-সংশয়ের জবাব দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করুন। রাজনৈতিক সমস্যাবলী ভালোভাবে অনুধাবন করুন। দুশমনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পন্থা আরো ভালোভাবে আয়ত্ত করুন।
হে পরোয়ারদেগার! সাইয়েদুশ শুহাদার পবিত্র খুনের উছিলায় তোমার কাছে আবেদন জানাচ্ছি,
ইসলাম ও ইসলামী লোকদেরকে সাহায্য-সহায়তা করো।
এ ইসলামী হুকুমাতকে হযরত ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবকাল পর্যন্ত মুজতাহিদ শাসকের ছায়াতলে সকল বিপদাপদ থেকে হেফাযতে রাখো।
হযরত ইমাম খোমেইনীর ও শহীদগণের রূহ্কে কারবালার শহীদগণের সাথে হাশর করো।
আমাদের ওপরে ইসলামী হুকুমতের কাঠামোর স্তম্ভ মহান রাহ্বারের ছায়া সব সময়ের জন্য স্থায়ী করে দাও।
আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্যের সাথে আরো বেশী পরিচিত করে দাও।
আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে সফল করে দাও।
আমাদের অন্তরগুলোকে শয়তানী সন্দেহ-সংশয় ও ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাযত করো।
আমাদের বংশধরদেরকে রোয কিয়ামত পর্যন্ত হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর চিরপ্রেমিক বানিয়ে দাও।
আমাদের সকলকেই হযরত ইমাম মাহ্দীর প্রকৃত খাদেমে পরিণত করে দাও।
আমাদের শেষ পরিণামকে শুভ পরিণামে পরিণত করে দাও।

Share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here