Home আল্লাহর বিধান বা আহকাম নামায : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়

নামায : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়

2109
2
SHARE

imagesEZH5G7M1

নামায একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদাত। আল্লাহর সামনে ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে কায়মনোবাক্যে নিজের সচেতন উপস্থিতি ঘোষণা করার অন্যতম একটি প্রধান ইবাদাত হলো নামায। মানুষের জীবনদৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক উন্নতির ক্ষেত্রে নামাযের একটি মৌলিক ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই যারা প্রকৃত নামায আদায়কারী,তাদের সাথে অন্যান্যদের আচার-ব্যবহারগত পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের লোকজন মানসিক এবং আত্মিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। খুব কমই তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যোগ দেয়। ইসলামে নামায হলো সর্বোৎকৃষ্ট ইবাদাত এবং নামাযই হলো স্রষ্টাকে অনুভব করার জন্যে মানব জাতির পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী পন্থা বা উপায়।

ইবাদাত-বন্দেগি করা কিংবা আল্লাহর প্রশংসা বা গুণগান করা মানবাত্মার প্রাচীনতম একটি বৈশিষ্ট্য বা বহিপ্রকাশ। এটা মানুষের সত্ত্বাগত মৌলিক একটি দিক। মানব জীবনেতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে,যখন এবং যেখানেই মানুষের উপস্থিতি ছিল,সেখানেই প্রশংসা-কীর্তন বা প্রার্থনারও অস্তিত্ব ছিল।তবে ইবাদাতের ধরন বা পদ্ধতি কিংবা খোদা বা প্রার্থনীয় সত্ত্বা গোত্রভেদে বিভিন্ন ছিল।কেউ সূর্য বা তারকাকে খোদা বলে মনে করতো,কেউবা আবার কাঠ-পাথরের তৈরী মূর্তিকে পূজা করতো। কিন্তু মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশেষ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্যে নবী-রাসূলদের পাঠানোর পর তাঁরা যখন মানুষকে নিজেদের সম্পর্কে ধারণা দিলেন তাদেরকে সচেতন করে তুললেন,তখন তারা সর্বশক্তিমান এক স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো এবং এক স্রষ্টার ইবাদাতে আত্মনিয়োগ করলো।

মার্কিন মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস বলেন,মানুষ তার নিজের একান্ত বন্ধুকে কেবল তার আভ্যন্তরীণ চিন্তারাজ্যেই পেতে পারে। অধিকাংশ মানুষ সচেতনভাবেই হোক কিংবা আনমনেই হোক,ঠিক তার অন্তরের গহীন জগতেই তাকে খুজে বেড়ায়।চিন্তারাজ্যের এই গহীন স্তরে গেলে একজন তুচ্ছ ব্যক্তিও নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান বলে উপলব্ধি করে। এই যে মহাকাব্যিক বীর-পালোয়ান সৃষ্টি,বড়ো বড়ো জ্ঞানী-গুণী মনীষী,খোদার পথে কিংবা দেশের জন্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার যে স্পৃহা-এ সবই মানুষের মধ্যকার পবিত্রতার উপলব্ধি থেকে উৎসারিত। কেননা মানুষ চায় প্রশংসনীয় এমন কিছুর অস্তিত্ব যাকে ভালোবেসে পূজা করা যায়। এ কারণেই ইতিহাসের কাল-পরিক্রমায় দেখা গেছে বহু মানুষ নিষ্প্রাণ অপূর্ণ বহু সৃষ্টির পূজা করেছে। যা ছিল মূল পথ থেকে বিচ্যুত।

অনেকেই প্রশ্ন করে মানুষের মাঝে এই যে ইবাদাত করার উপলব্ধি,তাতে তার কী লাভ? বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এবাদাতের অনুভূতিটা আসলে অপূর্ণ সৃষ্টির পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্যে একটা সহজাত প্রচেষ্টা। মানুষ সবসময়ই চায়, তার সীমিত অস্তিত্ব থেকে অসীমতার দিকে পাড়ি জমাতে। এলক্ষ্যেই মানুষ চায় ইবাদাত-বন্দেগির মাধ্যমে এমন এক বাস্তব সত্যে উপনীত হতে,যেখানে সীমা নেই,নোংরামি নেই অপূর্ণতা নেই,বিলয় নেই। ইকবাল লাহোরী যেমনটি বলেছেন,ইবাদাত জীবনের বিকাশমূলক এমন একটি প্রচলিত প্রবণতা যার মাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিত্বের ছোট্ট দ্বীপ নিজেকে সামগ্রিক বিশালতার মাঝে উপলব্ধি করে। আইনস্টাইনও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন,একজন তুচ্ছ ব্যক্তিও ইবাদাতের সময় নিজের বিশালত্ব টের পায়।

অবশ্য স্রষ্টার ইবাদাত করার ব্যাপারটি কেবল মানুষেরই স্বতন্ত্র প্রবণতা নয়। সৃষ্টি জগতের সবকিছুই মূলত আল্লাহর সমীপে আত্মনিবেদিত। বিশ্বের সকল বস্তুই আল্লাহর অনুগ্রহে সঞ্চরণশীল। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রতিটি অনু-পরমাণু সত্যের পূজারী। যেভাবে সকল মানুষ সচেতন ভাবেই হোক বা অসচেনভাবেই হোক,তারা সত্যেরই প্রার্থনা করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা এসরা’র ৪৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন-সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবী,এবং যা কিছু তাদের মাঝে রয়েছে সবাই আল্লাহর তাসবিহ ও পবিত্রতার গুণগান গাইছে,এবং সকল বস্তুই আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণায় লিপ্ত। কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা তাসবিহ বা প্রশংসা ঘোষণা বোঝ না। বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ফারাবির দৃষ্টিতে আকাশের পরিভ্রমণ,পৃথিবী ঘূর্ণন,বৃষ্টি পড়া এবং পানির প্রবাহ সবকিছুই তাদের আল্লাহর মহিমা ও ইবাদাতেরই লক্ষণ। মাওলানা রুমি এই ধারণাটিকে কাজে লাগিয়ে কটি পংক্তিও লিখেছেন।

পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণূ গোপনে
তোমার সাথে কথা বলে দিবারাত্রী
সচেতন আমরা তার সবই দেখি এবং শুনি
তোমার সাথে অচেনা আমরা তাই চুপচাপ
পার্থিব জগতের মোহে ছুটছো শুধু
খোদায়ী জ্ঞানের অধিকারী হবে কবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এক এবং একক। তিনি স্ময়ং সম্পূর্ণ অস্তিত্বের অধিকারী। তিনি প্রকৃতিগতভাবেই সকল গুণে গুণান্বিত এবং সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটির উর্দ্ধে। বিশ্বের সাথে তার সম্পর্কটা হলো সৃষ্টি, ব্যবস্থাপনা, প্রেরণা বা অনুগ্রহ প্রদান করা ইত্যাদি।

আমরা যখন তাঁকে এইসব গুণাবলির মাধ্যমে চিনতে পারবো, তখন এই চেনাটাই আমাদের মাঝে স্রষ্টা সম্পর্কে বিনয়, প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করবে। এ অবস্থায় যেই স্রষ্টা পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান, আকাশ এবং যমীনের সকল কিছুর ব্যবস্থাপক, তিনি মানবাত্মাকে নিজের সাথে সম্পর্কসূত্রে আবদ্ধ করেন এবং তাদেরকে শক্তি প্রদান করেন যাতে তাদের অন্তর প্রশান্ত হয় একং মানসিক স্থিরতা আসে।
এভাবেই সকল মানুষ এমনকি যারা পৃথিবীকে বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিতে দেখে, তাদের জীবনেও প্রশংসা এবং প্রার্থনার প্রয়োজন রয়েছে। যারা গতানুগতিক জীবন যাপন করে অর্থাৎ যাদের জীবনে প্রতিটি দিনই আগের দিনের পুনরাবৃত্তির মতো, যাদের জীবন হতাশাগ্রস্ত, তারাও চায় উন্নততরো বাস্তবতা তথা খোদার সাথে অন্তরঙ্গ হতে এবং তার প্রশংসায় লিপ্ত হতে। আসলে মানব বৈশিষ্ট্যটাই এমন যে, সে চায় বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতে এবং সুখি ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে।
ইসলাম মানুষের এই প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং ইবাদাতের অনুভূতি লালনের চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে মানুষ চায় সত্যকে আবিষ্কার করতে এবং পূর্ণতায় উপনীত হতে।

নামায হলো ইবাদাত-বন্দেগি আর প্রশংসার সুস্পষ্টতম রূপ। নামায হলো ইসলামী ইবাদাতগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবং দ্বীনের মূল ভিত্তিগুলোর একটি। নামায আদায়কারী যখন আল্লাহর স্মরণের মাধুর্যকে অনুভব করে এবং কোরআন তেলাওয়াত করে, যিকির করে, তখন সে আল্লাহর সৌন্দর্য আর বিশালত্বের মাঝে বিলীন হয়ে যায়। এরকম অবস্থায় তার অন্তরাত্মা পূত-পবিত্রতা আর পূর্ণতার দিকে ধাবিত হয়।

২য় পর্ব

ইবাদাত করা মানুষের মৌলিক একটি প্রয়োজনীয়তা। এই প্রয়োজনীয়তা আভ্যন্তরীণ এবং ইবাদাতের মাধ্যমেই তার চাহিদাটা মেটানো হয়। আমরা আমাদের নিজেদের স্রষ্টার জন্যে নামায পড়ি, রুকুতে যাই, সিজদা করি এবং তাকে সকল দোষ-ত্রুটি আর দূষণ থেকে পবিত্র বলে মনে করি। তিনিই একমাত্র সকল প্রশংসার যোগ্য মহান স্রষ্টা। তাঁর কোনো শরীক নেই।
ইবাদাত ও প্রার্থনা আল্লাহর নবীদের মৌলিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। কোনো নবীর শিক্ষাই ইবাদাতবিহীন ছিল না। ইসলামী ইবাদাতের বৈশিষ্ট্য হলো মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও দর্শন ভিত্তিক এবং ইসলামী ইবাদাতগুলো জীবনার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এদিক থেকে এ ধরনের ইবাদাতগুলো মানুষের অবস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং এ ইবাদাত মানুষকে পূত-পবিত্রতায় পরিবর্তিত করে।

নামাযের মতো ইসলামের বহু ইবাদাত যৌথ বা সামষ্টিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ইসলাম ব্যক্তিগত ইবাদাতগুলোকেও এমনভাবে বিন্যস্ত করেছে যে জীবনের কোনো কোনো দায়িত্ব বা করণীয় পালন করার সাথে ইবাদাতগুলো সংশ্লিষ্ট। যেমন নামাযের কথাই ধরা যাক। নামায বিশ্বের সৃষ্টিকর্তার সামনে মানুষের বন্দেগির বা গোলামির প্রকাশ। এই নামাযের রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু আচরণমালা বা হুকুম-আহকাম। এমনকি মানুষ যখন একাকি নামায পড়ে, তখনো সে নৈতিক ও সামাজিক কিছু নীতিমালা মেনে চলে। যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা,সময়-সচেতনতা,অপরের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি নীতিমালা মেনে চলে এবং আল্লাহর উপযুক্ত বান্দাদের সাথে সম্পৃক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করে।

ইবাদাত করার মাধ্যমে আল্লাহর গুণগান করার পাশাপাশি মানুষের আত্মিক এবং মানসিক ভারসাম্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। নামায অন্তরাত্মাকে উদ্বেলিত করে এবং মানসিক প্রশান্তির একটি অন্যতম উপাদান। প্রকৃত ও যথার্থ নামাযের মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তর থেকে সকল প্রকার অপবিত্রতা ও কলুষতা দূর হয়ে যায়। এ কারণেই হয়তো ইমাম আলী (আ) বলেছেন-আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পর নামাযের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই। নবী করিম (সা) ও বলেছেন-নামায হলো একটা পানির ঝর্ণাধারার মতো যা মানুষের ঘরেই রয়েছে আর মানুষ প্রতিদিন পাঁচবার তাতে গোসল করে।

অবশ্য বিভিন্ন ধর্মাদর্শে ইবাদাত বন্দেগির রূপ বিভিন্ন রকম। কেউ খোদার ইবাদাত করে ভাষিক এবং শব্দগত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে। আবার কেউ করে রোযা রাখা,রুকু-সেজদা করার মতো কিছু আমলের মাধ্যমে। আবার কিছু কিছু ইবাদাত চিন্তাগত এবং আত্মিকও। চিন্তা হলো চেনা ও সচেতনতার মূল শেকড় এবং মানুষের পরিবর্তনের কারণ। সেজন্যে এই ইবাদাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবার চেয়ে উত্তম বলে পরিগণিত। রাসূলে খোদা (সা) বলেছেন-এক ঘণ্টা চিন্তা করা সত্তুর বছরের ইবাদাতের চেয়ে উত্তম। সর্বোপরি ইসলামে সকল ভালো কাজই ইবাদাত বলে গণ্য। তাই লেখাপড়া করা, কাজ করা, সামাজিক ও পারিবারিক কাজকর্মও ইবাদাত।

ইবাদাত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো সচেতনতা এবং অন্তর দিয়ে চেনা। ইবাদাত যদি এই দেখা এবং জাগরণের সাথে না হয় অর্থাৎ সচেতনভাবে যদি ইবাদাত করা না হয়,তাহলে ঐ ইবাদাত ইবাদাতকারীকে গোঁড়ামি ও মূর্খতার দিকে নিয়ে যায়। ইমাম আলী (আ) এর সময় খাওয়ারেজ নামে গোঁড়া এবং মূর্খ একটি দল ছিল। অজ্ঞানতার কারণে ইসলাম সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত ধারণা ছিল। পার্থিব জগতের ব্যাপারে তারা ছিল উদাসীন। তারা ইবাদাতের মধ্য দিয়ে রাত কাটাতো কিন্তু ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষা বা গভীর মর্ম তারা উপলব্ধি করতো না। তাদের ঐ ভুল ও বিকৃত চিন্তার ফলে ইসলামী উম্মাহর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এরকম অন্ধ চিন্তা ও অনুর্বর মস্তিষ্কের অধিকারীদের একজন ছিল ইবনে মুলজেম। সে আলী (আ) এর মতো একজন ইনসানে কামেল ও খোদা প্রেমিককে শহীদ করেছিল। আলী (আ) এই মূর্খ গ্রুপটিকে হিংস্র,উন্নত চিন্তা ও উদার অনুভূতিশূণ্য শঠ বলে অভিহিত করে বলেছেন-সর্বপ্রথম এদেরকে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি,আচার-আচরণগুলো শেখানো উচিত। মহান মনীষী তথা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণের সদা উপদেশ ছিল ইবাদাতে চরমপন্থা বা উগ্রতা বর্জন করতে হবে যাতে মানুষের অন্তরে সবসময় ইবাদাতের প্রতি আগ্রহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়,যার ফলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়ে।

একদিন নবী করিম (সা) কে জানানো হলো যে,কতিপয় সাহাবী সবকিছু ছেড়ে দিয়ে কেবল ইবাদাতে মগ্ন হয়ে পড়েছে। রাসূল (সা) একথা শুনে অসন্তুষ্ট হয়ে মসজিদে গিয়ে বললেন-তোমাদের কোনো দলের হচ্ছেটা কী! শুনলাম এ..ই ধরনের কিছু লোক নাকি আমার উম্মাতের মধ্যে রয়েছে ! আমি তো তোমাদের নবী,আমি তো তা করি না,আমি কখনোই সকাল পর্যন্ত সারারাত ইবাদাত করি না,আমি রাতের একটা অংশে বিশ্রাম করি। আমি সকল দিন রোযা রাখি না,সংসারিক কাজে আত্মনিবেশ করি। যারা নিজেদের মতো করে কেবল ইবাদাত করাকে টার্গেট করে নিয়েছে তারা আমার সুন্নাতের বাইরে।

ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদাত হলো মানুষের জন্যে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতা প্রাপ্তির বাহন। ইবাদাত জাগিয়ে তোলে এবং পথ দেখায়। ইবাদাত মানুষকে অলসতা থেকে মুক্তি দেয়। ইবাদাতের মাধ্যমে মানুষ নিজের অস্তিত্বের বাস্তবতায় উপনীত হয়। ইবাদাতের মধ্য দিয়ে যে সচেতনতা অর্জিত হয় তার ফলে মানুষ সত্য-সঠিক কাজ এবং নৈতিকতার শিক্ষা পায়। নামাযের মতো ইবাদাত হলো একধরনের মহৌষধ। তবে সেই নামায হতে হবে যথার্থ নামায। অর্থাৎ নামায আদায়কারী মনে মনে উপলব্ধি করবেন সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী সেই সামনে দাঁড়িয়েছি যে আল্লাহ সদা জাগ্রত। তাই আল্লাহর মহান সত্ত্বা ও শ্রেষ্ঠত্বকে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে নাামযে দাঁড়াতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাই পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন নামায পড়তে হবে সচেতনভাবে। সূরা নিসা’র ৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশায় বুঁদ থাকা অবস্থায় নামাযের ধারে-কাছেও যেয়ো না! যে পর্যন্ত না তোমরা বোঝো তোমরা কী বলছো!”

রাসূলে কারিম (সা) একদিন মসজিদে ঢুকলেন। দেখলেন মসজিদে দুটি গ্রুপ বৃত্তাকারে বসে কী কাজে যেন মনোনিবিষ্ট। তিনি দুটি গ্রুপকেই পর্যবেক্ষণ করলেন এবং খুশি হলেন। দুটি গ্রুপের একটি জিকির ও ইবাদাতে লিপ্ত ছিল,আর অপর গ্রুপটি জ্ঞান চর্চায় ব্যস্ত ছিল। পয়গাম্বর (সা) তাঁর সাথীদের দিকে তাকিয়ে বললেন-এই দুই গ্রুপই পূণ্য কাজ করছে। উভয়েই কল্যাণ ও সৌভাগ্যের পথে রয়েছে। কিন্তু আমাকে পাঠানো হয়েছে জ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত করে তোলার জন্যে। এরপর তিনি জ্ঞান-অন্বেষীদের দলে গিয়ে বসলেন।

যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে ভালোবেসে ইবাদাত করে,সে তার মাধুর্য অনুভব করবে এবং বন্দেগি ও আনুগত্যের পর্যায়ে পৌঁছবে,আর এ অবস্থায় সে এক আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অনুসরণ করবে।

৩য় পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে ইবাদাত হলো মানুষের আত্মিক ভারসাম্য এবং মানসিক প্রশান্তির কারণ। সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর নির্ভরতা মানুষকে জীবনের উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধী এবং সচেতন করে তোলে। কিন্তু অনেকেই জানে না,এক আল্লাহর সাথে কেন সম্পর্ক রাখা উচিত এবং কেন তাঁর ইবাদাত করতে হবে? অপর একটি দল বিশ্বাস করে,পরিপূর্ণ একটি সত্ত্বা হিসেবে মানুষ নিজের চিন্তা এবং কর্মতৎপরতার ভিত্তিতে নিজের সমস্যা উত্তীর্ণ হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানুষের সুখ-সমৃদ্ধির শিল্প ও বৈজ্ঞানিক উন্নতি অগ্রগতিই যথেষ্ট। যাই হোক ইবাদাত নিয়ে যতোরকম দৃষ্টিভঙ্গিই থাকুক না কেন,তা যে মানুষের সার্বিক মঙ্গল ডেকে আনে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আজ কথা বলার চেষ্টা করবো।

নিঃসন্দেহে মানুষ অত্যন্ত জটিল এবং এমন বিস্ময়কর এক সত্ত্বা যার সামনে বহু পথ খোলা রয়েছে। ইচ্ছে করলেই সে আল্লাহর পথে,পরিপূর্ণতার পথে যেতে পারে,আবার অবক্ষয়ের পথও সে নির্বাচন করতে পারে। মানুষের জন্যে এটা একটা বিপজ্জনক বিষয়। কেননা এটা মানুষকে স্বেচ্ছাচারী এবং উদাসীন করে তুলতে পারে। অন্যভাবে বলা যায় মানুষ যখন নিজেকে বিশ্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি বলে মনে করবে,তখনই উদাসীন এবং উদ্ধত হয়ে যাবে। আর এই অনুভূতিই তাকে পতনের অতলান্তে নিমজ্জিত করবে। কোরআন বলছে, মানুষ যখন নিজেকে কারো অমুখাপেক্ষী হিসেবে দেখে তখন সে নিশ্চয়ই সীমালঙ্ঘন করে। কিন্তু যখন সে নিজেকে আল্লাহর শক্তির সাথে সম্পর্কিত একটি সত্ত্বা বলে ভাবে তখন বিনয়ের সাথে তার দিকে ধাবিত হয় এবং নিজেকে স্বেচ্ছাচারিতা আর উদ্ধত আচরণ থেকে বিরত থাকে।

অন্যদিকে নিঃসন্দেহে জ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের শক্তিশালী হবার একটা উপাদান। কিন্তু যে মানুষের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক নেই,এবং,যে ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না সে কেবলমাত্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন আর অগ্রগতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে তো পারেই না বরং অনেক ক্ষেত্রে তার ক্ষতি সাধন করে। কেননা বর্তমান বিশ্বে আমরা লক্ষ্য করছি যে, শক্তি এবং সম্পদের অধিকারীরা প্রযুক্তির আশীর্বাদকে অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। আল্লাহর সাথে স্থায়ী সম্পর্ক এবং তাঁর ইবাদাত মানবিক উন্নয়ন ও বিকাশের পথ সুগম করে। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্যে মানুষের অন্তরের স্বাভাবিক যে চাহিদা আছে, ইবাদাত মানুষের সে চাহিদা মেটায়। আল্লাহর ইবাদাত যে করবে,আল্লাহর সৃষ্টিকুলের বিস্ময় দেখে যে স্রষ্টার প্রতি অনুগত হবে,তাতে তার নিজেরই লাভ হবে। কেননা ইবাদাত করার মাধ্যমে বিশেষ করে যারা আল্লাহর সামনে রুকু-সেজদা করে,তারা অপরাপর লোকজনের তুলনায় অনেক বেশি সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে।

ফরাশি বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডক্টর আলেক্সেস কার্ল লিখেছেন,বহু তিক্ত ও কষ্টকর অভিজ্ঞতার পর জানতে পেরেছি যে,নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতি বা কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতি একটি সমাজে বা জাতির মাঝে চরম অবক্ষয় ডেকে আনে। যে সমাজ আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগির ব্যাপারে উদাসীন,সে সমাজ ফেৎনা-ফাসাদ থেকে মুক্ত নয়। ফরাশি এই চিন্তাবিদ অন্যত্র বলেছেন-মানুষের সুখ যখন নিশ্চিত হয় তখন তার অন্তর এবং চিন্তা একসাথে কাজ করে। কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতার ত্র”টিটা হলো এই যে,তার তাদের মস্তিষ্ককে ব্যাপক শক্তিশালী করেছে কিন্তু অন্তরটাকে ফেলে রেখেছে। সে কারণে তাদের ঈমান এবং নৈতিকতা দুর্বল এমনকি বলা যায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।

আল্লাহর সাথে সম্পর্কের সর্বোত্তম উপায় হলো নামায। নামায হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্কের পবিত্র ও ঐকান্তিক উপায় এবং আল্লাহর আনুগত্যের সর্বোত্তম প্রকাশ। নামায ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণ হয় না। কোরআনে কারিমে নামাযের মতো আর কোনো বিষয়ে এতো গুরুত্ব দেওয়া হয় নি। সূরা নিসা’র ১০২ এবং ১০৩ নম্বর আয়াতে নামাযের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও যেন নামায আদায় করা হয়,কেননা ইসলামে নামায হলো মুমিনদের জন্যে স্থায়ীভাবে পালনীয় একটি দায়িত্ব।

কোরআনে কারিমে নামাযের জন্যে ব্যবহৃত শব্দটি হলো সালাত। আরবি ভাষায় এ শব্দটির অর্থ হলো লক্ষ্য করা বা মনোযোগী হওয়া,দোয়া করা,আনুকূল্য বা অনুগ্রহ দেখানো। এই শব্দটি কোরআনে প্রায় ১১৪ বার উল্লেখ করা হয়েছে। যেসব আয়াতে এই শব্দটি এসেছে সেসব আয়াতের বহুলাংশেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন তিনি যেন নামায কায়েম করেন। সূরায়ে ত্ব-হা’র ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-আমি আল্লাহ! আমি ছাড়া আর কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই। আমার ইবাদাত করো এবং আমার স্মরণে নামায আদায় করো।
অবশ্য আল্লাহ হলেন সর্বশক্তিমান,পরিপূর্ণতার আধার এবং সর্বপ্রকার অভাব-অভিযোগমুক্ত। সৃষ্টির ইবাদাত-বন্দেগির মুখাপেক্ষী তিনি নন।

এ ব্যাপারে কোরআনেও বলা হয়েছে। কোরআন এ বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে যে,আল্লাহর ইবাদাতের যে প্রভাব এবং উপকারিতা-সবই বান্দাদের জন্যে। ইবাদাত মানবীয় পূর্ণতায় পৌছার উপায় এবং আল্লাহর পথে চলার দিক-নির্দেশক। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের যতোরকম সমস্যাদি,তার কারণ কিন্তু আল্লাহর পথ থেকে দূরে থাকা। আল্লাহ হলেন মৌলিক সত্ত্বা বা পরমাত্মা। তাই আল্লাহকে ভুলে যাওয়া মানে হলো মূলকে ভুলে যাওয়া বা মূল থেকে দূরে সরে যাওয়া। আর মূল থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে হলো মানুষ তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে ফেলা।

সর্বোপরি কথা হলো মানুষের আত্মার পবিত্রতা প্রয়োজন,তাকে ধুয়ে মুছে পরিশোধন করা প্রয়োজন। আত্মার এই পরিশুদ্ধির জন্যে এক আল্লাহর ইবাদাত করা,তাঁর অসীম শক্তিমত্তার প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাঁর সকল আদেশ-নিষেধের আনুগত্য করা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি নামাযে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা আর বিচিত্র গুণাবলী স্মরণ করে,আল্লাহর সেইসব সুন্দর বৈশিষ্ট্যাবলির প্রভাব তার মাঝে পড়ে। আল্লাহ নিজেই তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন এবং তাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দেন।

আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের তুলনায় নামায আদায়কারীগণ যেটুকু আল্লাহর গুণগান বা প্রশংসা করেন তা একেবারেই নগণ্য। তবু ঐ সামাণ্য পরিমাণ প্রশংসাই আল্লাহ গ্রহণ করেন এবং তার প্রতিদান দেন। পবিত্র কোরআনে নামায আদায়কারীদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং তাদেরকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত নামাযী যারা তার ধৈর্যশীল,বিনয়ী,মোত্তাকি এবং তারা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে। কোরআনের আয়াত অনুযায়ী এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যারা,তারা বেহেশতের অধিবাসী হবে। সেখানে তাদেরকে যথার্থ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হবে এবং আল্লাহর বিচিত্র নিয়ামতে ভূষিত করা হবে।

৪র্থ পর্ব

পাঠক! নামায বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক এই আলোচনায় আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। অসীম দয়ালু আল্লাহর সামনে মানুষ অক্ষম এবং অতিশয় ক্ষুদ্র। মহান স্রষ্টার সাথে এই ক্ষুদ্র সত্ত্বার সম্পর্ক যার মাধ্যমে স্থাপিত হয় তা হলো নামায। পরমাত্মার সামনে জীবত্মার বিনয় প্রকাশের মাধ্যম হলো নামায। মনের আকাশে যখন মেঘ জমে,তখন কেবল নামাযের স্নিগ্ধ শীতল মৃদুমন্দ প্রেমের মেহরাবে উপস্থিতিই মানুষকে হালকা করতে পারে এবং মনের বাগিচায় খোদার স্মরণের সুগন্ধি ফুল ঘ্রাণ ছড়ায়। নামাযের এই সুগন্ধি সবার অন্তরে ছড়িয়ে যাক,সবাই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে সচেতন হয়ে উঠুন-এই প্রত্যাশায় শুরু করছি আজকের আলোচনা।

নামায কেন পড়বো-এরকম একটি প্রশ্ন সবার মনেই জাগতে পারে। বহুক্ষেত্রেই দেখা যায় সাধারণত বস্তুবাদী জীবনের ব্যস্ততা ও সমস্যাই মানুষকে দুঃখ-কষ্টের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ তখন এই দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি লাভের জন্যে দুশ্চিন্তাহীন একটা নিরাপদ জীবন প্রত্যাশা করে। এই প্রত্যাশা পূরণের জন্যে মানুষ যে-কোনো একটা কিছুর আশ্রয় নেয়। কেউ বই পড়ে,কেউ গান শোনে আবার কেউবা একাকীত্ব বেছে নেয়। কিন্তু এগুলোর কোনোটারই প্রভাব স্থায়ী নয়। জীবনের এরকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে ইসলাম স্থায়ীভাবে একটি স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা আমাদের সামনে প্রবাহিত করে দিয়েছে। আমরা যদি আমাদের অন্তরগুলোকে ঐ ঝর্ণাধারায় ধুয়ে নিই তাহলে স্থায়ীভাবে আমরা পবিত্রতা ও নিরাপত্তা পেতে পারি। প্রাণদায়ী এই ঝর্ণাধারাটি হলো নামায। আর এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

অন্তত ১০ হাজর বিষাদগ্রস্ত লোকের ওপর গবেষণা চালানোর পর ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী হেনরি র্যা ঙ্ক বলেছেন,আমি এখন ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোর গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করছি। সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে,যে কেউ ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাস লালন করবে কিংবা যথাযথত নিয়মে প্রার্থনালয়ে উপস্থিত হবে,তারা উন্নত মানবীয় ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার অধিকারী হবে।

আমেরিকার স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর ফ্রেডরিক পাওয়ার্স বলেছেন, এমন এমন কিছু রোগী আমাদের কাছে এসেছে যাদের অবস্থার উন্নতির ব্যাপারে বড়ো বড়ো এবং অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তারগণও খুব কমই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে তাদের অবস্থার উন্নতির ব্যাপারে যা তাদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল,তাহলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক এবং মোনাজাতের মতো অলৌকিক বিষয়। ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী সেরেল ব্রেতও বলেছেন,আমরা নামায এবং দোয়ার মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দের বৃহৎ সম্ভারে প্রবেশ করতে পারি,যেখানে সাধারণভাবে প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই।

এ কারণেই যারা নামায পড়েন তাদের জন্যে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে,দৈনিক কয়েকবার নামায পড়া আন্তরিক প্রশান্তির জন্যে সর্বোৎকৃষ্ট কর্মসূচি ও অনুশীলন। নামায হলো মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদার যোগান। জ্ঞান-বুদ্ধির আলো যেভাবে মানুষের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে তেমনিভাবে নামাযও মানুষকে বিকশিত করে। এ কারণেই নবী কারিম (সা) নামাযকে তাঁর নিজের চোখের আলো বলে উল্লেখ করে বলেছেন-প্রত্যেক বস্তুরই একটা চেহারা বা রূপ আছে আর ধর্মের রূপ বা চেহারা হলো নামায। অতএব এর চেহারাটার পরিপূর্ণ সৌন্দর্য রক্ষার চেষ্টা করো। হাদিসে এসেছে রাসূলে খোদা (সা) নামাযের সময় হলে বলতেন-হে বেলাল!নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রশান্তির পর্যায়ে নিয়ে যাও! অন্য এক হাদিসে এসেছে যখনই ইসলামের নবী পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তেন তখনই নামাযে দাঁড়াতেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন।

নামায পড়ার মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত,পূণ্যময় ও সৌন্দর্যপূর্ণ হয় এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। আল্লাহর সাথে নামাযের মাধ্যমে যোগাযোগ বা সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং নামায আদায়কারীর অন্তরাত্মায় পবিত্রতার দিকে ছোটার স্পন্দন অনুভূত হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে নামায মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় ও মন্দকাজ থেকে দূরে রাখে। নামায পড়লে মানুষের মাঝে গুনাহের কাজে লিপ্ত হবার প্রবণতা হ্রাস পায়। এ কারণেই ধর্মীয় চিন্তাবিদগণ বলেছেন,নামায মনের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার শক্তি বৃদ্ধি করে এবং ঈমানী শক্তি বৃদ্ধির প্রেরণার বৃহৎ একটি সম্ভার হলো নামায।

আসলে নামায মানুষের মাঝে বেশ কিছু গুণাবলী সৃষ্টি করে দেয়। যেমন পবিত্রতা ,ওজু করা এবং হাত-মুখ ধোয়া, মেসওয়াক করা,পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা প্রভৃতি নেক গুণাবলি মানুষের মাঝে সৃষ্টি করে নামায। অবশ্য মানুষ নামাযের ভঙ্গি এবং শব্দগুলোর প্রতি যতো বেশি মনোযোগী হবে,ততো বেশি তার প্রভাব ও ঔজ্জ্বল্য বিকীর্ণ হবে তার অন্তরে।নামাযের বিস্ময়কর প্রভাবের গুরুত্বের ব্যাপারে জনগণ বিশেষ করে দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন-এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ক্ষেত্রে আমাদেরকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একজন মালির সার্থকতা হলো ফলের গুণমান এবং পরিমাণের মধ্যে,যা তার নিজের চেষ্টা-প্রচেষ্টায় অর্জিত হয়। এইসব অনুশীলন মানব জীবনে বহু ইতিবাচক ও সন্তোষজনক গুণাবলি এনে দেয়।

নামাযের আরো কিছু ইতিবাচক প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন নামাযের স্থানটিকে পূত-পবিত্র হতে হবে,অপবিত্র হওয়া চলবে না।নামায আদায়কারীর পরিধানের বস্ত্র হতে হবে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন। সেইসাথে অপরের অধিকারের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাও নামাযের আরেকটি শিক্ষা বা বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই একটি মানুষকে অন্যায় বা অপরাধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে। ফলে মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি এবং সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নে নামাযের প্রভাবশালী ভূমিকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। অপরদিকে নামাযের সময়-সচেতনতার বিষয়টিও মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নিয়ম-শৃঙ্খলার ওপর ধর্মীয় গুরুত্বের সুস্পষ্ট নিদর্শন। এইসব কারণেই ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ হুকুম-আহকামগুলোর মধ্যে নামায অন্যতম। পরবর্তী আসরে এ সম্পর্কে আরো কথা বলার ইচ্ছে রইলো।

Â
৫ম পর্ব
পাঠক! নামায বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক এই আলোচনায় আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। নামায হলো আত্মার প্রতিপালক এবং আল্লাহ সান্নিধ্য লাভের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। সম্ভবত এজন্যেই নবীজী নামাযকে অভিহিত করেছেন ইসলামের পতাকা বলে। নামাযের প্রভাবশালী একটি দিক হচ্ছে ব্যক্তি মানুষের ভেতরে প্রশান্তি এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। যাই হোক নামাযের আরো কিছু দিক নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো।

ইমাম সাদেক (আ) বলেছেন, যার মাঝে পাঁচটি জিনিস থাকবে না তার জীবন সুখকর নয়। এই পাঁচটি জিনিস হলো-সুস্থতা,নিরাপত্তা,অভাবহীনতা,পরিতৃপ্তি এবং বন্ধু বা সহচর। ইমাম সাদেক (আ) এর দৃষ্টিতে নিরাপত্তার ব্যাপারটি সৌভাগ্যের একটি চালিকাশক্তি। সকল মানব মতবাদে এবং জ্ঞানী-গুণী মনীষীর কাছে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে আসলে সুস্থ মানব জীবন বা সভ্যতা নিরাপত্তা ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না। মার্কিন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিল ডুরান্ট তাঁর বিখ্যাত সভ্যতার ইতিহাস নামক গ্রন্থে লিখেছেন-সভ্যতার আবির্ভাব তখনই ঘটতে পারে,যখন নিরাপত্তাহীনতা, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটে,কেননা ভয়-ভীতি দূরীভূত হবার মাধ্যমে মনের ভেতর নতুন নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনীর একটা উদ্দীপনা জাগে, কৌতূহল জাগে। মানুষ তার স্বাভাবিক প্রবণতার দিকে ফিরে যায় এবং সেই প্রবণতা অনুযায়ী মানুষ জ্ঞান-আধ্যাত্মিকতা আর জীবনমান উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু সংকটপূর্ণ বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মানুষের সামনে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে তাহলো মানুষ কীভাবে তার ব্যক্তিগত জীবনে এবং সামাজিক জীবনে নিরাপত্তা বিধান করবে। বহুকাল ধরে সমাজ বিজ্ঞানীরা নিরাপত্তা সম্পর্কে বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এইসব দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের অভিজ্ঞতা এবং অধীত জ্ঞান থেকেই এসেছে এবং তা যথার্থভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে নি। একবিংশ শতাব্দীতেও আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে কিংবা মনোচিকিৎসা কেন্দ্রগুলো থেকে প্রকাশিত পরিসংখ্যানগুলো নিয়ে চিন্তা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে,বর্তমান যুগের মানুষ তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিক থেকে বিশেষ করে তাদের মানসিক এবং আত্মিক প্রশান্তির ক্ষেত্রে খুব বেশি একটা সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। কিন্তু বর্তমান যুগে এমন এমন মানুষও রয়েছেন যারা অস্থিরতা সৃষ্টিকারী বহু বিষয় থাকার পরও আত্মিক এবং মানসিক দিক থেকে ভালো আছেন এবং নিরাপদেই আছেন। এঁরা হলেন প্রকৃত নামাযী।এঁরা নামাযের আলোকিত রশ্মি দিয়ে নিজেদের অন্তরগুলোকে পলিশ করেন অর্থাৎ অন্তরে জমাট বাঁধা মরীচাগুলোকে পরিস্কার করে অন্তরগুলোকে বিনম্র ও প্রশান্ত করে তোলেন। এ ধরনের মানুষেরা কোরআনের সেই আহ্বানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করেছেন যেখানে বলা হয়েছে ঃ জেনে রাখো! আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত হয়। সূরা রা’দের ২৮ নম্বর আয়াতের অংশবিশেষ এটি। সকাল-সন্ধ্যায় আযানের যে ধ্বনি কানে বাজে,ঐ ধ্বনি শুনে মানুষ নামাযে দাঁড়ায়। এর মাধ্যমে নামাযিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে সর্বশক্তিমান তাঁর অবস্থা লক্ষ্য করছেন এবং জীবনের উত্থান-পতনে তিনিই হলেন তার পৃষ্ঠপোষক।

নামাযীরা কখনোই আশ্রয়হীন নন কেননা তাঁরা জানেন জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনেক বৃহৎ এবং উর্ধ্বে। আর সেই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছার জন্যে অবশ্যই আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা জরুরি। নামায হলো এই সম্পর্ক স্থাপনের প্রধান উপায়। আর যখনি নামাযে এই সম্পর্কটি স্থাপিত হয় তখনি তাঁর অন্তর প্রশান্ত হয় এবং তাঁর সকল অস্তিত্ব ঘিরে এক ধরনের নিরাপত্তা অনুভূত হয়। আল্লাহর নবী-রাসূলগণ এবং বিখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণের জীবন সংগ্রামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় তাঁরা যে তৌহিদের সুগন্ধিতে বিশ্বকে ঘ্রাণময় করে তুলেছেন,তাঁদের সেই সাফল্যের রহস্যটা মূলত তাঁদের সেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির মধ্যেই নিহিত। আর সেই নিরাপত্তা আর প্রশান্তি এসেছে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সূত্র ধরে। নবী-রাসূলগণ যখনি কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনার সম্মুখিন হয়েছেন তখনি তাঁরা নামায কায়েমের আহ্বান জানিয়েছেন। নামাযের একটা বিশেষ গুরুত্ব ছিল তাঁদের কাছে।
হযরত মূসা (আ) এর প্রতি ওহী নাযিল হয়েছিল যে তোমরা সারিবদ্ধ হও এবং নামায কায়েম কর। হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর দোয়ায় আল্লাহর কাছে চেয়েছেন-হে পরোয়ার দেগার! আমাকে নামায কায়েমকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো। আমার বংশধরকেও নামাযে সুপ্রতিষ্ঠিত করে দাও! হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার দোয়া কবুল করো। দোলনায় থাকা অবস্থায় হযরত ঈসা (আ)ও নিজেকে নামায কায়েম করার জন্যে আদেশপ্রাপ্ত বলে আত্মপরিচয়ে উল্লেখ করেছেন। সূরা র্মাইয়ামের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমার অস্তিত্বকে বরকতপূর্ণ তথা মঙ্গলময় করেছেন,যতোদিন আমি জীবিত আছি ততোদিন আমাকে নামায কায়েম করার এবং যাকাত আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হ্যাঁ ! নামাযি ব্যক্তি নামাযের আলোয় থাকার ফলে তাঁর অন্তরে কোনোরকম উদ্বেগ কাজ করে না। এজন্যে নামাযির অন্তরে সবসময় প্রশান্তি বিরাজ করে। তাঁর অন্তরে ভবিষ্যত সম্পর্কে কোনোরকম ভয়-ভীতি বা অস্পষ্টতা বাসা বাঁধতে পারে না। কারণটা হলো একজন নামাযি মনে করে সকল স্থান বা কাল-ই কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে,আর তিনি তো আল্লাহর কাছেই নিজেকে সমর্পন করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ সবসময় তাঁর সাথে সাথে রয়েছেন। তাই তিনি নির্ভীক। তিনি তাঁর বিগত দিনের ভুলগুলোর জন্যে খোদার দরবারে হতাশ হন না,কারণ তিনি জানেন আল্লাহ তওবা কবুলকারী এবং অনেক ক্ষমাশীল।
মানুষ আল্লাহু আকবার অর্থাৎ আল্লাহ বর্ণনাতীত বড়ো বলে সমগ্র সৃষ্টিকূলের স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেয়। সেইসাথে এ-ও স্বীকার করে যে যতোবড়ো শক্তিই থাকুক না কেন আল্লাহর শক্তিমত্তার কাছে তা তুচ্ছ এবং নগণ্য। একজন নামাযি বিসমিল্লাহির রাহ মানির রাহিম অর্থাৎ পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি বলে নামায শুরু করে। এর মাধ্যমে নামাযি স্মরণ করতে চায় যে আল্লাহর দয়া,মেহেরবাণী,আল্লাহর ক্ষমাশীলতার কোনো সীমারেখা নেই। এমতাবস্থায় তার অন্তরাত্মা নিরাপত্তা আর প্রশান্তিতে ভরে যায়। এরপর আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন অর্থাৎ সকল প্রশংসা উভয় জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর-ব’লে একথাই স্বীকার করে যে,প্রশংসা কেবল তাঁরই প্রাপ্য এবং তিনিই এর যোগ্য। মালিকি ইয়াওমিদ্দিন অর্থাৎ বিচার বা প্রতিদান দিবসের মালিক বলে এটাই মেনে নেওয়া হয় যে আল্লাহ সকল কিছুর ওপরই তাঁর কর্তৃত্ব রয়েছে। পরিণতিতে পার্থিব জীবনের সকল বালা-মুসিবৎ তাঁর দৃষ্টিতে সহজ স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ইয়্যাকা না’বুদু অ-ইয়্যাকা নাস্তায়িন অর্থাৎ হে খোদা! আমরা কেবল তোমারই ইবাদাৎ করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য কামনা করি-ব’লে নামাযি অর্থাৎ প্রার্থনাকারী আল্লাহর সাহায্য-সহযোগিতা প্রাপ্তির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে। আল্লাহর দরবারে রুকু করার মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে বিনয় প্রকাশ করা থেকে মুক্তি পায় আর সিজদা করার মাধ্যমে খোদা ব্যতিত অন্য কারো বন্দেগি করার শৃঙ্খলমুক্ত হয়। এভাবে একজন নামাযি আল্লাহর সাথে অবিচ্ছেদ্য এক সমঝোতায় উপনীত হয় যার ফলে সে পায় স্বাধীনতা , মুক্তি এবং নিরাপত্তা। কবি ইকবালের ভাষায়ঃ

هر كه پيمان با هو الموجود بست
گردنش از قيد هر معبود رست

পরম সত্ত্বার সাথে যিনিই করবেন নিরাপত্তা চুক্তি
ভ্রান্ত উপাস্যের শৃঙ্খল থেকে নিশ্চিত পাবেন মুক্তি।

৬ষ্ঠ পর্ব

পাঠক! নামায বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক এই আলোচনায় আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। যেদিন নবুয়্যতের নূর হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর পবিত্র হৃদয়ে প্রোজ্জ্বলিত হলো এবং তিনি নবুয়্যতের দায়িত্বে অভিষিক্ত হলেন,ফেরেশতাগণ সেদিন একে অপরকে অভিনন্দিত করলো আর এই মহান নিয়ামতের জন্যে আল্লাহর প্রশংসা করলো। রাসূলে খোদা (সা) এর উপর মানুষকে হেদায়েত করার যে গুরুদায়িত্বটি অর্পিত ছিল সেই দায়িত্ব অর্থাৎ দাওয়াতি কাজের দায়িত্ব তিনি শুরু করলেন। একদিন আল্লাহর ফেরেশতা তাঁর কাছে এলো। নবীজী নিজেকে আল্লাহর ওহী গ্রহণের জন্যে প্রস্তুত করলেন।

ওহীর ফেরেশতা সালাম জানালেন এবং নবীজী জবাব দিলেন। জিব্রাঈল বললো,এসেছি আল্লাহর পয়গাম্বরকে নামায শেখাতে। নবীজী অতীতেও আল্লাহর ইবাদাত করতেন কিন্তু নামাযের মতো বিশেষ ইবাদাতটি গ্রহণ করে ভীষণ খুশি ও আনন্দিত হলেন। জিব্রাঈল ওজু করলো। নবীজীও জিব্রাঈলের অনুসরণে ওজু করলেন। তারপর জিব্রাঈল নামায পড়ার নিয়ম-কানুন শেখালেন। অনেক রেওয়ায়েতেও এসেছে যে নবীজী যখন মেরাজে বা উর্ধ্বগমনে গিয়েছিলেন আল্লাহর সান্নিধ্যে,তখনই নামাযের প্রসঙ্গটি এসেছে এবং আল্লাহর নবী (সা) নামায পড়ার রীতিনীতিগুলো বর্তমান রীতিতে শিখেছেন। সেখানে নবীজীকে বলা হয়েছিল নামাযে দাঁড়াতে। ঠিক তখন বার্তা এসেছিল-

পড়ো! বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন…। করুণাময় আল্লাহর নামে যিনি ভীষণ দয়াময়। সকল প্রশংসা বিশ্বের মহান প্রতিপালকের। নবীজী আয়াতের শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। সে সময় আদেশ করা হলো রুকুতে যাওয়ার জন্যে। মুহাম্মাদ ( সা ) রুকুতে গেলেন এবং তিন বার বললেন-সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম ও বিহামদিহী। আমার প্রতিপালক মহান এবং পূত-পবিত্র এবং তাঁরি প্রশংসা করছি। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। তখন ফরমান এলো-হে মুহাম্মাদ! তোমার প্রতিপালকের জন্যে সিজদা করো। রাসূলে খোদা (সা) সেদজায় গেলেন এবং তিনবার বললেন-সুবহানা রাব্বিয়াল আলা অবিহামদিহি….অর্থাৎ আমার প্রতিপালক মহান এবং পূত-পবিত্র এবং তাঁরি প্রশংসা করছি। ঘোষণা এলো-ওঠো এবং বসো। রাসূলে খোদা (সা) সেজদা থেকে তাঁর মাথা তুললেন এবং বসলেন। এ সময় আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদা রাসূল (সা) কে বিনীত করে তুললো,তিনি পুনরায় সিজদায় গেলেন। এভাবেই মুসলমানদের প্রতি রাকাত নামাযের জন্যে দুটি সিজদা নির্দিষ্ট হয়।

এ ভাবেই রাসূলে খোদা (সা) আল্লাহর আদেশে নামায কায়েম করলেন। মুসলিম উম্মাতের ওপর দিবারাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়েছে। রাসূলে খোদা (সা) নামাযের নূরের সাহায্যে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করলেন এবং ব্যাপক আধ্যাত্মিক অনুভূতি মনে লালন করে ব্যাপক আনন্দ ও খুশিপূর্ণ হৃদয়ে বাসায় ফিরলেন। যখন তাঁর স্ত্রী খাদিজা (সা) কে দেখলেন,তাঁকে আল্লাহর ইবাদাত করার শ্রেষ্ঠ উপায় নামাযের সুসংবাদ দিলেন। খাদিজা (সা) এর জন্যে সেই মুহূর্তটা যে কী রকম এক ঐশী আনন্দঘন ছিল,তা ভাষায় বর্ণনাতীত। নবীজী এবং তাঁর স্ত্রী ওজু করলেন এবং দুই রাকাত নামায আদায় করলেন। কিছুক্ষণ পর আলী ইবনে আবি তালিবও এই পরিবারের সাথে একত্রে নামায পড়েন। তার পর থেকে এই তিন সর্বপ্রথম মুসলমান নামাযের সময় হলে জামাতে দাঁড়াতেন এবং আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ প্রেমপূর্ণ অন্তরে চমৎকার এই ইবাদাতটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করতেন।

গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে, নামাযের উত্তম একটি দিক হলো ব্যক্তির অন্তরাত্মায় প্রশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। এ বিষয়টি ব্যক্তি মানুষের মানসিক ও আত্মিক সুস্থতা রক্ষার ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। সুস্থতা এবং বাহ্যিক পবিত্রতা এমন একটি জিনিস যা নামাযের আদাব-কায়দার ভেতরে পরিলক্ষিত এবং পালিত হয়। নামাযী ব্যক্তি যেহেতু তাঁর ইবাদাতের মাধ্যমে অনেক উপকৃত হন সেজন্যে পবিত্রতা এবং স্বাস্থ্যনীতি মেনে চলাটাকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। তাই ওজু করার সময় দাঁত ব্রাশ করে দাঁতগুলোকে পরিস্কার এবং দুর্গন্ধমুক্ত করেন। কেননা রাসূলে খোদা (সা) বলেছেন, মেসওয়াকের সহিত দুই রাকাত নামায পড়া মেসওয়াক করা ছাড়া সত্তুর রাকাত নামায পড়ার চেয়ে উত্তম।
নামায আদায়কারী নামাযের সময় চেষ্টা করেন সুগন্ধি আতর ব্যবহার করতে। কেননা ইমাম সাদেক (আ) থেকে বর্ণিত হয়েছে,সুগন্ধি ব্যবহার করে যিনি নামায পড়েন,তাঁর নামায সুগন্ধি ব্যবহারবিহীন সত্তুর জন নামাযীর নামায থেকে উত্তম।

সাধারণত আমরা যখন একদল নামাযিকে দেখবো যে সুশৃঙ্খলভাবে একত্রে নামাযে দাঁড়িয়েছে,নামাযের সৌন্দর্য, সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো,আল্লাহপন্থী এই মানুষগুলোর আধ্যাত্মিক সুষমা সবকিছুরই একটা ব্যতিক্রমধর্মী দীপ্তি রয়েছে। নামায আদায় করা এবং শিষ্টাচার চর্চা করা দুটোই একসাথে ঘটে। নামাযের আগে প্রয়োজন হলো নামাযিকে প্রথমে অজু করতে হবে অর্থাৎ হাত-মুখ ধুতে হবে,পা ধুতে হবে অথবা মাসেহ করতে হবে,মাথা মাসেহ করতে হবে। এ সবই করতে হবে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে। নামাযিকে অবশ্যই পবিত্রতা অর্জন করতে হয়।শারীরিকভাবে পবিত্র হতে হয়,বাহ্যিকভাবে অর্থাৎ নামাযির জামা-কাপড় ইত্যাদিকে দূষণ থেকে পবিত্র হতে হয়,কেননা সৌন্দর্য আর পবিত্রতার উৎস মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হন নামাযি। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী নামাযে এইসব নিয়ম পালন আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথকে মসৃণতর করে এবং নামাযির তণু-মন-প্রাণ নিরাপদ ও প্রশান্ত হয়ে ওঠে।

একইভাবে যে স্থানে নামাযি নামায পড়তে দাঁড়ান সেই স্থান,যেই জামা-কাপড় তিনি পরেন সেগুলো এমনকি যেই পানি দিয়ে নামাযি অজু করেন সেই পানি-এ সবের কোনোটাই জবরদস্তিমূলক দখলকৃত হওয়া যাবে না। এই কারণে একজন নামাযি অন্যদের সম্পদ এবং অধিকার রক্ষা করাকে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে অনুভব করেন। কেননা তিনি জানেন যে নামাযের ভেতর মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করা হয় সেই নামায আল্লাহর কাছে কবুল বা গ্রহণযোগ্য হবে না।

এভাবেই নামায মানুষের উদ্ধত আত্মাকে দূর করে দিয়ে শান্তশিষ্ট করে তোলে,অপরের অধিকার আদায় করতে শেখায় এবং ব্যক্তি এবং সমাজে নিরাপত্ত ও সুস্থতা নিশ্চিত করে। এজন্যে চরিত্র বিজ্ঞান মনে করে আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ককে সর্বোন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং সংস্কার করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো বিশ্বের প্রতিপালকের সাথে পরিচয় করানো। আর এই পরিছয় করানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়টি হলো নামায। নামাযের গঠনমূলক ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত করে রাসূলে খোদা (সা) বলেছেন, যথাসময়ে নামায পড়ার চেয়ে উত্তম আর নেই। আল্লাহর ফেরেশতা মানুষকে বলে হে মানুষ! উঠো! তোমার পিঠের ওপর নিজ হাতে যেই আগুন জ্বালিয়েছো, নামায পড়ার মাধ্যমে তা নেভাও!

৭ম পর্ব

পাঠক! নামায বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক এই আলোচনায় আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আজকের আসরে আমরা নামাযের ফায়দা এবং তার অতীত ইতিহাস নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।

মানসিক অস্থিরতা এবং উত্তেজনা এমন এক ধরনের অসুখ যা বর্তমান শতাব্দীর মানুষকে হুমকিগ্রস্ত করছে। বিশেষজ্ঞ এবং বিজ্ঞানীরা এই সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে কিংবা কিছুটা হলেও মানসিক উত্তেজনা বা টেনশান কমিয়ে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রিডার্স ডাইজেস্ট ম্যাগাজিনে বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম মোল্টন মার্সটেন লিখেছেন,বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক যে দায়িত্ববোধ রয়েছে বহু মানুষেরই সে ব্যাপারে কোনো খেয়াল নেই। এই ইতস্তত বিক্ষিপ্ততা বা আপাত বিচ্ছিন্নতাই তাদের জন্যে ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বস্তুত মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বা চিন্তা যদি কোনো একটি বিষয়কেন্দ্রিক নিবদ্ধ থাকে,তাহলে সে এই ঘাটতি বা ত্রুটি মিটিয়ে নিতে পারে।
নামায হলো আল্লাহর রহমতের চাবিকাঠি। নামাযের বহু আধ্যাত্মিক ফায়দা রয়েছে। তার মধ্যে একটি উপকারিতা হলো,নামায যদি বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণ শর্ত পূরণ করে আদায় করা হয়,তাহলে মানুষের অন্তরাত্মা কেন্দ্রিভূত হয় এবং ভেতরটাকে আলোকিত করে তোলে।মানুষ যদি নামাযের ভেতর বস্তুতান্ত্রিক বিষয়-আশয় বা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে এবং আন্তরিকভাবে নামাযে উপস্থিত হয় তাহলে নিজের স্মৃতিশক্তিকে শক্তিশালী করতে পারে এমনকি জীবনের অপরাপর সমস্যাগুলোকেও কেন্দ্রিভূত করতে পারে। বিশেষ করে নামাযে সে একটি বিষয় বারবার অনুশীলন করতে পারে তাহলো-প্রতিবারই সে চেষ্টা করে নিজের অন্তরাত্মাকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করতে।

পূর্ববর্তী শরিয়তে নামায সম্পর্কে যে সব আয়াত এসেছে সেগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ঐশী ধর্মের আবির্ভাবের প্রথম দিন থেকেই অসম্ভব গঠনমূলক ও অব্যাহত অনুশীলনের মাধ্যম এই নামাযের অস্তিত্ব ছিল। আল্লাহর সকল পয়গাম্বরই নামায কায়েম করার জন্যে আদেশপ্রাপ্ত ছিলেন এবং নিজ নিজ সন্তান ও নিজের উম্মাতকে নামায পড়ার ব্যাপারে আদেশ দিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তবে বিভিন্ন জাতি এবং গোত্রের মাঝে নামায কায়েমের পদ্ধতিগত পার্থক্য ছিল।

ইতিহাসে এসেছে, আদম এবং হাওয়া বেহেশত থেকে বেরিয়ে আসার পর যখন মাটির পৃথিবীতে পা রাখলেন,উদ্বে-উৎকণ্ঠা আর অনুতাপে দীর্ঘদিন অশ্রু ফেললেন এবং আল্লাহর দরবারে তওবা করলেন। একদিন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জিব্রাঈলকে তাঁদের কাছে পাঠালেন। জিব্রাঈল বললেন,আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্যে তিনি একটি হাদিয়া বা উপহার নিয়ে এসেছেন। উপহারটি হলো দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার বিধান। পরদিন সকালে সূর্য ওঠার আগে আদম এবং হাওয়া নামাযে দাঁড়ালেন এবং অন্তরের গহীন থেকে তাঁরা আল্লাহর সাথে কথা বললেন। তারপর তাঁদের দুজনেই অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করলেন। এই নামায তাঁদের জন্যে ছিল সর্বোত্তম একটি উপহার যেই উপহারটি মহামূল্যবান উত্তরাধিকার হিসেবে তাঁদের সন্তানদের জন্যে তাঁরা রেখে গেছেন।

মক্কায় অবস্থিত মিনা এবং আরাফাতও মুসলিম জাতির জনক ইব্রাহীম (আ) এবং তাঁর সন্তান ইসমাঈল (আ) এর নামায আদায়ের স্মৃতি বহন করছে। চার হাজার বছর আগে তাঁরা জনগণকে এক আল্লাহর ইবাদাত করার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। হযরত ইব্রাহিম (আ) যখন তাঁর স্ত্রী হাজেরা এবং পুত্র ইসমাঈলকে তৃণহীন পানিবিহীন মরুভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলেন তখন হাত তুলে দোয়া করে বলেছিলেন,হে পরোয়ারদিগার! আমি আমার বংশধরদের ক’জনকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে পানিহীন তৃণহীন এক মরুতে বসবাসের উদ্দেশ্যে রেখে এসেছি যাতে তারা নামায কায়েম করে।
কোরআনে হযরত ইসমাঈল (আ) এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে একখানে বলা হয়েছে তিনি নামাযের দিকে আহ্বানকারী। সূরা মারিয়ামের ৫৪ এবং ৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-এবং এই গ্রন্থ অর্থাৎ কোরআনে ইসমাঈলের কথা স্মরণ করো,যিনি ছিলেন অঙ্গীকার রক্ষার ব্যাপারে সত্যবাদী আর ছিলেন একজন রাসূল ও পয়গাম্বর। তিনি সবসময় তাঁর পরিবার-পরিজনকে নামায এবং যাকাতের আদেশ দিতেন।

হযরত শোয়াইব (আ)ও একজন নবী ছিলেন। তাঁর কওমের লোকজন ছিল মূর্তিপূজক। তাদের বিচ্যুতি অর্থাৎ নিজেদের তৈরী প্রতিমার কাছে তাদের ভোগান্তি ও লাঞ্ছনা দেখে তিনি খুব কষ্ট পেতেন। তিনি তাঁর কওমের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন এবং আল্লাহর প্রশংসা বা ইবাদাতের সঠিক পন্থা তাদেরকে শেখাতেন। কখনো কখনো তাদের সামনে নামায পড়তেন এবং এক আল্লাহর কাছে নিজেদের অভাব অভিযোগ তুলে ধরে মোনাজাত দিতেন। কিন্তু তাঁর কওমের লোকজন এসবের জন্যে তাঁকে ভর্ৎসনা করতো এবং নামায পড়ার ক্ষেত্রে তারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতো। তারা বলতোঃ হে শোয়াইব! তোমার নামায কি তোমাকে এই আদেশ দেয় যে,আমাদের পূর্বপুরুষেরা যার উপাসনা করতো তাকে বর্জন করতে হবে….?

কোরআন যখন হযরত ইসহাক এবং ইয়াকুব সম্পর্কে কথা বলে,তখন একটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়। প্রসঙ্গটি হলো আল্লাহর আদেশে জনগণকে হেদায়েত করা,ভালো কাজ করার আদেশ দেওয়া,নামায কায়েম করা এবং যাকাত দেওয়ার আদেশ দিতে তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহিপ্রাপ্ত ছিলেন। হযরত মূসা (আ) আল্লাহর অনেক বড়ো একজন পয়গাম্বর ছিলেন। আল্লাহর দরবারে বিনয় এবং ভদ্রতার জন্যে তিনি বিখ্যাত ছিলেন। ঐকান্তিক নিষ্ঠা এবং প্রেমবোধ নিয়ে তিনি আল্লাহর সাথে কথা বলতেন। সেজন্যে তিনি মূসা কালিমুল্লাহ উপাধি পেয়েছিলেন।এক হাদিসে এসছেঃআল্লাহ তায়ালা তাঁকে খেতাব করে বলেছেন-হে মূসা! তুমি যেখানেই বা যখনই নামায পড়ো,অত্যন্ত বিনয়ের সাথে যমিনে সিজদা করো। মূসা (আ) যখন নবুয়্যত প্রাপ্ত হন,তাঁর ওপর আল্লাহর সর্বপ্রথম আদেশটিই ছিল নামায কায়েম করার ব্যাপারে। সূরা ত্বা-হা’র ১৩ এবং ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-আমি তোমাকে মনোনীত করেছি। এখন তোমার ওপর যা ওহী করা হয় তা-ই শোনো। আমি ‘আল্লাহ’,আমি ছাড়া আর কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই। আমার ইবাদাত করো আর আমার স্মরণের জন্যে নামায কায়েম করো।
কোরআনে কারিমের অন্য এক আয়াতে হযরত যাকারিয়া (আ) এবং লোকমান হাকিমের নামায পড়া এবং তাদের সন্মানদের নামায পড়তে বলার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আগে নামায পড়ার বিষয়টি হযরত ঈসা (আ) এর একটি প্রসঙ্গ থেকেও প্রমাণিত হয়। ঈসা (আ) যখন নবজাতক শিশু,তখন তাঁর মা মারিয়ামের পবিত্রতার সাক্ষ্য দেওয়ার জন্যে আল্লাহর আদেশে তিনি কথা বলেছিলেন।তিনি বলেছিলেনঃ আমি আল্লাহর বান্দা,তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন এবং আমি যেখানেই থাকি না কেন,আমার অস্তিত্বকে বরকতময় করেছেন এবং যতোদিন আমি জীবিত আছি,আমাকে নামায পড়া এবং যাকাত দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

৮ম পর্ব

Â
নামাজ মানুষের মুক্তি ও সৌভাগ্যের মাধ্যম। তাই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র হাদীসে বলা হয়েছে, নামাজ মুমিনের মেরাজ বা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম। নামাজ সম্পর্কে একজন কবি বলেছেন,
নামাজের পাখায় চড়ে যাব আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে
চাইব খোদার কাছে সফরের অনুমতি নামাজের রহস্যে
” আমি” আবার কে? তাই তো বলি:
তাঁর স্মরণ বা জিকির রয়েছে ঠোটে আমার,
এ ঠোট বা জিহবা তো তাঁরই দান
(কোনো কিছুতেই) নেই আমার কোনো অবদান,
এ নামাজ নয় আমার বা তোমার,
বরং তিনিই তো মালিক নামাজের ।

Â
ইসলাম ধর্মকে দূর্বল হিসেবে তুলে ধরার জন্য ইহুদি পন্ডিতরা একবার এক ফন্দি আঁটে। এ ফন্দি অনুযায়ী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে জ্ঞানের দিক থেকে দূর্বল হিসেবে তুলে ধরার জন্য ইহুদি পন্ডিতরা তাঁকে কিছু জটিল প্রশ্ন করার উদ্যোগ নেয়। আল্লাহর সর্বশেষ (সাঃ) রাসূল এইসব জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না এবং এর ফলে তাঁর ও ইসলাম ধর্মের দূর্বলতা মানুষের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে ইহুদি পন্ডিতরা ভেবেছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে মসজিদে প্রকাশ্য জনসভায় বিশ্বনবী (সাঃ) ইহুদি পন্ডিতদের জটিল সব প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন এবং তারা সবাই উত্তর পেয়ে বিস্মিত হল। সবশেষে ইহুদি পন্ডিতদের নেতা তার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি উত্থাপন করে রাসূল (সাঃ)কে জব্দ করতে চাইলেন। ঐ পন্ডিত বললেন, হে মুহাম্মাদ! বলুন তো দেখি আল্লাহ কেন দিন ও রাতে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আপনার ওপর ফরজ Â বা বাধ্যতামূলক করেছেন ? কেন এর চেয়ে কম বা বেশী করা হল না ?
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র পবিত্র চোখে তখন বিদ্যুৎ খেলছিল এবং মহান আল্লাহর প্রেমে তাঁর নূরানী চেহারা ছিল উদ্ভাসিত । তিনি বললেন,
যোহরের নামাজের সময় আল্লাহর আরশের নীচে অবস্থিত সব কিছু আল্লাহর প্রশংসা করে ও তাঁর গুণ-গানে মশগুল হয়। আর এ জন্যই আল্লাহ এ সময় অর্থাৎ মধ্যাহ্নের পর আমার ও আমার উম্মতের জন্য নামাজ ওয়াজেব করেছেন এবং এ জন্যই মহান আল্লাহ বলেছেন, সূর্য মধ্য আকাশ থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ার পর থেকে অন্ধকার নেমে আসার সময় পর্যন্ত নামাজ আদায় কর।

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আসরের নামাজ ফরজ বা বাধ্যতামূলক হবার কারণ সম্পর্কে বললেন, আসরের সময় হল সেই সময় যখন হযরত আদম (আঃ) তার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত গাছের ফল খেয়েছিলেন। ফলে আল্লাহ তাঁকে বেহশত থেকে বহিষ্কার করেন। আল্লাহ আদমের সন্তানদেরকে আসরের নামাজ পড়তে বলেছেন এবং আমার উম্মতের জন্যও তা ওয়াজেব করা হয়েছে। এই নামাজ মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নামাজসমূহের মধ্যে অন্যতম।

এরপর আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মাগরিবের নামাজ ফরজ বা বাধ্যতামূলক হবার কারণ সম্পর্কে বললেন, মহান আল্লাহ অনেক বছর পর হযরত আদম (আঃ)’র তওবা কবুল করেন এবং তিনি তখন তিন রাকাত নামাজ আদায় করেন। আল্লাহ আমার উম্মতের জন্যও মাগরিবের নামাজ বাধ্যতামূলক করেছেন, কারণ এ সময় দোয়া কবুল হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা রাত নেমে আসার সময় ও সকালে আল্লাহর প্রশংসা কর ।

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এশা’র নামাজ ফরজ বা বাধ্যতামূলক হবার কারণ সম্পর্কে বললেন, কবরে ও কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ অন্ধকারগুলো এশা’র নামাজের আলোয় কেটে গিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। আল্লাহ বলেছেন, এশা’র নামাজ আদায়ের জন্য অগ্রসর হওয়া এমন কোনো ব্যক্তি নেই যাকে আল্লাহ দোযখ বা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন না। আর ফজরের নামাজের দর্শন হল, সূর্য-পূজারীরা সূর্য উদয়ের সময়ে এবাদত করতো। তাই আল্লাহ কাফেরদের সিজদার আগেই ইবাদতে মশগুল হতে মুমিনদেরকে ফজরের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের রহস্য বা দর্শন সম্পর্কে বিশ্বনবী (সাঃ)’র কাছ থেকে বক্তব্য শোনার পর ইহুদি পন্ডিতরা লা-জওয়াব হয়ে গেলেন। কারণ, তাদের আর বলার কিছুই ছিল না। ফলে তারা অবনত মস্তকে মসজিদ ত্যাগ করে।
ইসলামের প্রতিটি বিধি-বিধানের রয়েছে যুক্তি ও দর্শন। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আজকাল ইসলামের কোনো কোনো বিধানের স্বাস্থ্যগত, নৈতিক ও মানসিক কল্যাণের কিছু রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। ফরাসী দার্শনিক ডক্টর অ্যালেক্সিস কার্ল বলেছেন, নামাজ মানুষের অনুভূতিগুলোর পাশাপাশি তার শরীরের ওপরও প্রভাব রাখে। এবাদত বা নামাজ কখনও কখনও খুব কম সময়ে রোগীদের অবস্থার উন্নতি ঘটায়। লর্ডের চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রার্থণার পর রোগ সেরে গেছে এমন ২০০’রও বেশি ঘটনা রেকর্ড করেছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায় প্রমাণিত হয়েছে যে মহান আল্লাহর ইবাদত বা তাঁর কাছে প্রার্থণার ফলে হাই-ব্লাড প্রেশার বা রক্তের উচ্চ-চাপ বৃদ্ধি প্রতিহত হয়। যারা নিয়মিত প্রার্থণাকেন্দ্রে যান তারা রক্ত-চাপ, হৃদরোগ, যক্ষা ও ক্যান্সারের মত অনেক রোগ থেকে মুক্ত থাকেন বলে রিডার্স ডাইজেস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মানুষের মন ও প্রাণকে প্রজ্জ্বোল আলোয় উদ্ভাসিত করার চির-সুন্দর এবাদত নামাজ আল্লাহর সাথে সংযোগের গভীর সেতু-বন্ধন। মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে নামাজ। তাই নামাজের আধ্যাত্মিক কল্যাণ ছাড়াও অন্য অনেক কল্যাণ থাকাও স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নামাজে বার বার ওঠা ও বসার ফলে মানুষের শরীরে রক্ত-সঞ্চালনের গতি বাড়ে। নামাজ মানুষের পরিপাকযন্ত্র ও হজমের প্রক্রিয়াকেও শক্তিশালী করে এবং এর ফলে মানুষের খাবারের রুচিও বাড়ে।
তবে এটাও মনে রাখা দরকার মানুষের জ্ঞান আল্লাহর অসীম জ্ঞানের তুলনায় খুবই সিমীত ও তুচ্ছ। তাই কেউ যদি আল্লাহর কোনো বিধানের কল্যাণকামী দর্শন বা উপকারিতার বিষয়টি বুঝতে বা আবিষ্কার করতে না পারেন তাহলে ঐ বিধানটি ত্যাগ করতে হবে এমন ধারণা অযৌক্তিক। নামাজ মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এমন এক ইবাদত যা খোদাপ্রেমিক মানুষ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার নির্দেশ পালনের জন্যই আদায় করে থাকেন। বস্তুগত কোনো কল্যাণ কিংবা বেহেশতের আশা ও দোযখের ভয় এক্ষেত্রে কোনোক্রমেই মূল বিবেচ্য বিষয় নয়। নামাজ পড়া যদি বাধ্যতামূলক নাও হতো, তবুও আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দারা তা আদায় করতেন।
মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে নামাজের তাৎপর্য ও রহস্যগুলো ভালোভাবে জানার এবং জীবনের সবক্ষেত্রে সেগুলো প্রয়োগের তৌফিক দেন- এই প্রার্থণা জানিয়ে শেষ করছি আজকের এ আলোচনা।#

৯ম পর্ব

Â
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র জীবনের একটি হাদীস শুনিয়ে আজকের আলোচনা শুরু করবো। রাসূল (সাঃ)’র বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সালমান ফারসী বলেছেন, একদিন রাসূলে খোদা (সাঃ)’র পাশে একটি গাছের নীচে বসেছিলাম। তিনি গাছটির একটি শুকনো ডাল ধরে নাড়া দিলে ঐ ডালের সমস্ত পাতাগুলো ঝরে পড়ে। এরপর আল্লাহর শেষ রাসূল (সাঃ) বললেন, সালমান, তুমি কি জিজ্ঞেস করবে না- কেন আমি এমন করলাম? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিই এর কারণ বলুন। তিনি তখন বললেন, যখন কোনো মুসলমান ভালোভাবে ওজু করে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তখন তার গোনাহগুলো ঠিক এই ডালের পাতাগুলোর মতই ঝরে পড়ে। এরপর তিনি সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন যেখানে দিনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে।
নামাজ অজস্র কল্যাণ ও বরকতের উৎস। অন্য কথায় এ এমন এক এবাদত যা থেকে বরকত ও কল্যাণের এত বিপুল ও অজস্র ফল্গুধারা প্রবাহিত যে মানুষের মন তা কল্পনা করতেও অক্ষম।
দিন ও রাতে ৫ ওয়াক্ত নামাজ সতর্ক থাকার ও সচেতন থাকার মাধ্যম। নামাজ মানুষের কাছে মানব-জীবনের পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরে এবং মানুষকে গতিশীল ও প্রাণবন্ত বা উদ্দীপ্ত করতে চায়। নামাজ দিন ও রাতগুলোকে করে অর্থপূর্ণ এবং সুযোগগুলো যে শেষ হয়ে আসছে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। সময়ের প্রবাহে মানুষের মধ্যে যখন দেখা দেয় উদাসীনতা, তখন নামাজ তাকে সচেতন হবার আহ্বান জানায়। নামাজ তাকে মনে করিয়ে দেয় যে তোমার একটা দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং আরো একটি দিনের যাত্রা শুরু হয়েছে তোমার জীবনে। তাই আরো বেশি সক্রিয় হও, ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ও আল্লাহর প্রেমের মধুর নেশায় মত্ত হয়ে এগিয়ে যাও সৌভাগ্যের স্বর্ণালী শিখরের দিকে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম যেমনটি নামাজকে ইসলামী জাগরণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে বলেছেন,

ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর
তখনো জাগিনি যখন যোহর
হেলায় ফেলায় কেটেছে আসর
মাগরেবের ওই শুনি আজান
নামাজে শামিল হওরে এশাতে
এশার জামাতে আছে স্থান!

বৃটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াল্টার কোফম্যান বলেছেন,
” এবাদত তথা প্রার্থণার মধ্যে ও স্রষ্টার গুণ-গানের মধ্যে মানুষ এমন এক আন্তরিক ও নৈতিক শক্তি লাভ করে যে অন্য সব সাধারণ মুহূর্তে ঐ শক্তি বা চেতনা লাভ সম্ভব হয় না। এবাদত ও প্রার্থণার সময় মানুষের একাকীত্বের দেয়াল ভেঙ্গে যায় এবং নামাজী বা প্রার্থণাকারীর সামনে খুলে যায় অসীম রহস্যের এক জগৎ। মানবীয় আবেগ ও কোমল বা সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বাহন হয়ে, কৃতজ্ঞতা ও ভক্তির ভাষাগুলো মর্মের অশ্রু হয়ে, একান্ত আলাপচারিতা এবং একান্ত আপনজন বা বন্ধুর কাছে উপস্থাপিত প্রত্যাশা কিংবা অনুরোধ হয়ে দেখা দেয়। প্রার্থনার সময় মানুষের আত্মায় যেন পাখা ও পালক যুক্ত হয়। তাই এ সময় সে উড়ে চলে ঊর্ধ্বাকাশে, উপর থেকে আরো উপরের আকাশে সে এগিয়ে যেতেই থাকে। ”

নামাজের গঠনমূলক ও শিক্ষা বা প্রশিক্ষণমূলক ভূমিকার কারণে নামাজ কায়েম বা প্রতিষ্ঠার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের ৮৬ টি আয়াতে নামাজের প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা দিনের দুই অংশে এবং রাতের প্রথমভাগে নামাজ কায়েম কর। কারণ, নিশ্চয় সৎকর্ম অসৎকর্মকে দূর করে বা ধ্বংস করে। এটা উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ। ”

পবিত্র কোরআনের যেসব আয়াত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মাত্রায় প্রাণ সঞ্চার করে ও মানুষকে আশাবাদী করে এই আয়াতটি সেসবের মধ্যে অন্যতম। একবার আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) একদল লোকের কাছে প্রশ্ন করলেন, পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে বেশী আশা-সঞ্চারক আয়াত কোনটি? এক ব্যক্তি বললেন, কোরআনের সেই আয়াতটি যাতে বলা হয়েছে, হে আমার বান্দারা, যারা নিজের ওপর জুলুম করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হয়ো না। হযরত আলী (আঃ) বললেন, এটাও ভালো, তবে আমি যে আয়াতের কথা বলতে চেয়েছি এ আয়াত তা নয়। অন্য এক ব্যক্তি অন্য এক সুন্দর আয়াতের কথা বললো। কিন্তু ঐ আয়াতও হযরত আলী (আঃ)’র প্রত্যাশিত আয়াত ছিল না। এ অবস্থায় লোকেরা বলল, আপনি নিজেই ঐ আয়াতটির কথা বলুন যা আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক। তখন তিনি বললেন, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব রাসূলে খোদা (সাঃ) বলেছেন, সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতটি সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক।
এই আয়াতের অর্থ আমরা একটু আগেই বলেছি। এই নূরানী আয়াতে দৈনিক ৫ বার নামাজ কায়েম করার কথা বলার পর পরই এই এবাদতের গঠনমূলক ও প্রজ্জ্বোল প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ নামাজ সৎকর্মের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং এই নামাজ নোংরা বা খারাপ কাজগুলোর কূফলকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের জীবনে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের সময় কূমন্ত্রণাদায়ী প্রবৃত্তিগুলো আমাদেরকে অনেক সৎ লক্ষ্য বা অঙ্গীকার এবং মানুষের কল্যাণকামীতা থেকে দূরে রাখে। কূমন্ত্রণাদায়ী প্রবৃত্তিগুলো সর্বপ্রথম যেখানে আঘাত হানে তা হল মানুষের ইচ্ছা-শক্তি ও দৃঢ়-সংকল্পের দূর্গ। এই দূর্গ নড়বড়ে হয়ে পড়লে মানুষ সহজেই অধঃপতন বা অবক্ষয়ের শিকার হয়। সিমীত ক্ষমতার ও দূর্বল শক্তির মানুষ আল্লাহকে নামাজের মধ্যে বার বার স্মরণের মাধ্যমে অসীম ক্ষমতা ও শক্তির আধারের সাথে সম্পর্কিত হয়। আল্লাহর এই মধুর স্মরণ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে সুদৃঢ় করে এবং তাকে কূপ্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হবার শক্তি দান করে। এ জন্যই নামাজকে আত্মিক রোগগুলো চিকিৎসার সবচেয়ে সুন্দর ও কার্যকরী ওষুধ বলে অভিহিত করা হয়।

মানুষের প্রতিটি অন্যায় কাজ বা পাপ তার অন্তরে একটি কালো বিন্দু বা কলংকের দাগ সৃষ্টি করে। পাপ কাজ অব্যাহ রাখলে ব্যক্তির সমস্ত সত্ত্বা কলুষিত হয়ে পড়ে এবং সে তার নিজের আত্মারই শত্রুতে পরিণত হয়। অন্যদিকে মানুষ যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সৎ কাজ করতে থাকে, তাহলে তার অন্তর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হতে থাকে। সৎকর্ম মানুষের অন্তর বা আত্মা থেকে পাপের প্রভাব ধুয়ে মুছে ফেলে আত্মাকে নির্মল ও উজ্জ্বল করে।

নামাজ মানুষের মধ্যে ঈমানের ভিত্তিগুলোকে মজবুত করে এবং তার মধ্যে খোদা-ভীতির চারাগাছ রোপন করে। নামাজের মধ্যে পঠিত বিষয়গুলো মানুষকে উচ্চতর মানবীয় গুণাবলীর দিকে আকৃষ্ট করে। ফলে পাপ বা মন্দ কাজের কারণে মানুষের মনে যেসব দূষণ বা ঘা সৃষ্টি হয় তা নামাজের মাধ্যমে সেরে যায়। যখন নামাজী সঠিকভাবে নামাজ আদায় করেন তখন তিনি আলোকিত ও আধ্যাত্মিক জগতের সাথে সম্পর্কিত হন এবং মানুষের হৃদয়ে স্বর্গীয় গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়। তাই কেউ যদি নামাজের সূক্ষ্ম রহস্য ও তাৎপর্যগুলো উপলব্ধি করতে পারেন তাহলে নামাজ তার জন্য সর্বাত্মক উন্নতি ও অগ্রগতির এক উচ্চতর শিক্ষালয় বা প্রশিক্ষণালয়ে পরিণত হবে। #
১০ম পর্ব
যে কাজ বা বিষয় সুন্দর, সে কাজের দিকে আহ্বানও সুন্দর। বাংলাদেশের মহাকবি কায়কোবাদ নামাজের দিকে আহ্বান তথা সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদতের দিকে আহ্বানের নজিরবিহীন মাধ্যম– আযানের মধুর ধ্বনি বা হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া বেহেশতী সূরের প্রশংসা করে লিখেছেন,

কে ঐ শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি
মর্মে মর্মে সেই সূর বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ নাচিল ধমনী
কে ঐ শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি।

নামাজ প্রার্থনা বা এবাদতের সুন্দরতম রীতি। পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত খোদাপ্রেমের সুন্দরতম প্রতিফলন বা প্রতিচ্ছবি এই নামাজ। একজন নামাজী যুবক তার জীবনের প্রথম নামাজের স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, যখনই মহান আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্যযুক্ত আযানের প্রাণ-সঞ্চারী বাণী শুনতাম তখনই কিছুক্ষণের জন্য উৎফুল্ল হয়ে উঠতাম। আযানের ধ্বনি খুবই আনন্দদায়ক ও হৃদয়-স্পর্শী। কিন্তু খুব দ্রুত আমার মন ভেঙ্গে যেত, আমি দুঃখিত হয়ে পড়তাম। কারণ, মানুষ কিভাবে নামাজ আদায় করে তা আমি দেখতে পেতাম না। আমার চোখ কখনও আলো দেখে নি। কারণ, আমি অন্ধ হয়েই জন্ম নিয়েছি। তাই অন্য সবাই যেভাবে বিশ্বকে দেখে আমি কখনও সেভাবে দেখতে পারি নি। আমার এ দুঃখ ও বেদনার সময় পাশে এসে দাঁড়ালেন আমার জননী। তিনি আমায় শেখাতে লাগলেন নামাজ পড়ার রীতি। প্রথম দিকে কঠিন লাগছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এই নামাজ সহজ ও মধুরতর হয়ে উঠলো। আপনারা হয়তো বিশ্বাস করবেন না, যখন জীবনের প্রথম নামাজ পড়লাম, তখন যেন আলোয় ভরা এক জগতে ঢুকলাম। তার আগ পর্যন্ত নিকষ অন্ধকারের কালিমা ছাড়া আর কিছুই দেখি নি, কিন্তু যখন নামাজে দাঁড়ালাম, বিমুগ্ধকর আলো আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট করলো। এ এমন এক আলো যা অনেক দূর থেকে এসে আমার মধ্যে প্রবেশ করতো এবং ছড়িয়ে পড়তো। আমি সেই সময় পর্যন্ত কখনও আলো দেখিনি। কিন্তু আলো আমার কাছে এখন এক বাস্তবতা। অন্ধ হয়েও আমি আলোকে চিনি। এ ঘটনা পরম করুণাময় ও অনন্ত দাতা আল্লাহর একটি অনুগ্রহ যা আমাকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
এই স্মৃতি-কথা অন্তঃহীন এমন এক অসীম সত্তার সাথে মানুষের গভীর সম্পর্কের প্রকাশ যে সত্তা হিসেব-নিকেশের উর্দ্ধে। মানুষের আত্মা উন্নত শ্রেণীর সত্তা। তাই মহান আল্লাহর সাথে সংযোগ বা সম্পর্ক স্থাপনের যোগ্যতা তার রয়েছে এবং এ ব্যাপারে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির পাশপাশি তার অগ্রগতি ঘটতে থাকে। এ প্রসঙ্গে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী- আঃ বলেছেন, মানুষ যত বেশী আল্লাহ সম্পর্কে জানতে পারে, ততই তার ঈমান উন্নততর হতে থাকে।
তাই নামাজী যখন তার নামাজে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বকে স্বীকার করে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তখন সে খোদায়ী গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। এ অবস্থায় তার আত্মা হয় উন্নততর।
তাই বিধাতার সবচেয়ে সুন্দর উপহার ও সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল নামাজ। নামাজ রাসূলের (সাঃ) ধর্মের ভিত্তি। পবিত্র কোরআনের ভাষায় নামাজ দয়া ও অনুগ্রহের উৎস।

মানুষের মধ্যে যেসব অভ্যন্তরীণ প্রবণতা ও শক্তি রয়েছে সেগুলোকে সঠিক পথে পরিচালিত না করা হলে মানুষ অন্যায়, দূর্নীতি ও বিচ্যুতির শিকার হয়। যেমন, লোভ-লালসা মানুষকে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত করে এবং এই অনন্ত ক্ষুধা বা চির-অতৃপ্ত লিপ্সা কখনও কখনও মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে লোভ-লালসার প্রবৃত্তিকে যদি জ্ঞান অর্জনের কাজে লাগিয়ে দেয়া হয় তাহলে তা হয় পূর্ণতা অর্জন বা আদর্শ মানুষ হবার মাধ্যম। তাই লোভ-লালসার প্রবৃত্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত না করলে মানুষ এই লোভ-লালসার দাস হয়ে পড়ে।

পবিত্র কোরআন মানুষের লোভ, ধৈর্যহীনতা বা অসহিষ্ণুতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। মানুষ যখন বিপদ বা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়, তখন সে ধৈর্যহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মানুষ যখন সম্পদ ও প্রাচুর্যের অধিকারী হয় তখন সে কৃপণ ও রক্ষণশীল হয়ে পড়ে। পবিত্র কোরআন’র সূরা মাআরিজের ১৯- ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ তো স্বভাবতই অতি অস্থিরচিত্ত। সে বিপদগ্রস্ত হলে হা-হুতাশ করতে থাকে এবং ঐশ্বর্যশালী হলে কৃপণ হয়ে পড়ে, তবে তারা নয় যারা নামাজ আদায় করে এবং নামাজে সদা-নিষ্ঠাবান।

প্রকৃত নামাজী সমস্ত সৌন্দয্য ও পূর্ণতার উৎসের সাথে স্থায়ী সম্পর্কের কারণে খোদায়ী গুণাবলীতে বিভুষিত হয় এবং খোদায়ী রং অর্জন করে। ধীরে ধীরে তার স্বভাব থেকে অসঙ্গতি ও খারাপ অভ্যাসগুলো বিদায় নিতে থাকে। মহান আল্লাহর স্মরণ ও ভালবাসা বা খোদা-প্রেম মানুষকে জীবনের সঠিক পথে এবং সৌভাগ্যের দিকে নিয়ে যায়। আর এ কারণেই নামাজী সংকট ও ব্যর্থতার সময় অধৈর্য হয়ে উঠে না এবং সম্পদের অধিকারী হলে অন্যদের ভুলে যায় না।
অন্য কথায় নামাজ মানুষের আত্মার শক্তি বৃদ্ধি করে এবং সংকট ও দুঃখ-কষ্টের মোকাবেলায় মানুষকে সহিষ্ণু ও শক্তিশালী করে। নামাজের সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা বা প্রশিক্ষিত মানুষ সুখের সময় নিজেকে গুটিয়ে নেয় না, বরং অন্যদেরকেও নিজের আনন্দের সাথে শরীক করার চেষ্টা চালায়। অবশ্য নামাজী তখনই এই গুণ অর্জন করে যখন সে নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করে এবং নামাজের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখে।

মানুষের ব্যক্তিত্বের ও চরিত্রের ওপর নামাজের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে মহান আল্লাহ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও জিকিরের মাধ্যমে পার্থিব লোভ-লালসা থেকে নিজেদের পবিত্র করতে বলেছেন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হতে বলেছেন। পবিত্র কোরআন আয়-উপার্জনকে ভালো ও কল্যাণকর কাজ বলে অভিহিত করেছে। একইসাথে এটাও বলেছে যে আয়-উপার্জন প্রকৃত নামাজীকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত বা উদাসীন করে না। কারণ মহান আল্লাহর স্মরণ কল্যাণের পথে মানুষের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ও সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল।

১১তম পর্ব

ইসলাম ধর্মের প্রধান ভিত্তি নামাজ। ইসলামের দৃষ্টিতে সৎকর্মশীলদের অন্যতম লক্ষণ হল- তারা নামাজ কায়েম করেন। নামাজের মাধ্যমে মানুষ পরিচিত হয় আধ্যাত্মিকতার সাথে এবং আস্বাদন করে খোদার স্মরণের মাধুর্য। রূকু ও সেজদায় আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপনের পাশাপাশি নিজের বিনয়াবনত ভাব মানুষের মধ্যে এনে দেয় বেহেশতের সৌরভ এবং অনাবিল স্বর্গীয় প্রশান্তি। এভাবে নামাজ মানুষের মনকে করে প্রফুল্ল।

নামাজের কল্যাণ ও গুরুত্ব প্রসঙ্গে ইরানের সমসাময়িক যুগের কবি রেজা ইসমাঈলী লিখেছেন,

নামাজের নূরে কর সুন্দর মুখমন্ডলকে
কেবলার দরজাকে উন্মুক্ত কর তোমার দিকে।
যদি হারিয়ে থাকো নিজ আত্মাকে
প্রেমময় নামাজের দর্পনে খুঁজে পাবে হারানো আত্মাকে।

ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী নামাজের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন, নামাজ আধ্যাত্মিক পথ-পরিক্রমার প্রধান মাধ্যম বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রধান পথ। খোদায়ী ধর্মগুলো মানুষের জন্য নামাজের ব্যবস্থা করেছে যাতে এর মাধ্যমে তারা মানব-জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা ইহকাল ও পরকালে মুক্তি এবং সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে। নামাজ মহান আল্লাহর দিকে অগ্রসর হবার প্রথম পদক্ষেপ বা ধাপ। কিন্তু এই ইবাদতের এতো শক্তি বা বরকত রয়েছে যে তা পূর্ণতার শিখরে ওঠা মানুষের জন্যেও বা স্বর্গীয় মানুষের জন্যেও আরো উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হবার মাধ্যম হতে পারে।
এ কারণেই মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মানুষ অর্থাৎ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, নামাজ আমার চোখের আলো। তিনি নামাজের সময় হলে নিজ মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল (রাঃ)-কে আযান দিতে বলতেন যাতে তাঁর হৃদয় নিরাপত্তা ও প্রশান্তিতে ভরপুর হয়ে উঠে। তাই এটা বলা যেতে পারে যে সম্ভবতঃ অন্য কোনো এবাদতই মানুষের আধ্যাত্মিক পূর্ণতার প্রতিটি পর্যায়ে নামাজের মত এতটা সহায়ক, শক্তিদায়ক এবং অগ্রগতির চালিকা-শক্তি নয়।
কিন্তু মানুষের অন্তরে নামাজের প্রভাব ও সুফলগুলোকে বদ্ধ-মূল করার জন্য কিছু শর্ত পূরণ বা পরিবেশ সৃষ্টি জরুরী। এ প্রসঙ্গে ধর্ম বিষয়ক প্রখ্যাত গবেষক ডক্টর মীর বাকেরী বলেছেন, ইবাদত-বন্দেগী মানুষের সহজাত চাহিদা বা প্রকৃতিগত স্বভাব। মানুষের এই চাহিদা পূরণের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবন। এ সময়েই মানুষের আত্ম-পরিচয় অর্জনের পিপাসা তীব্রতর থাকে। জীবনের এ পর্যায়ে শারীরীক পরিবর্তনের পাশাপাশি চিন্তা ও অনুভূতি বা আবেগের জগতেও অনেক পরিবর্তন ঘটে। এ বয়সে অর্থাৎ তারুণ্য ও যৌবনের পর্যায়ে মানুষ প্রচলিত ধারণা বা তথ্যগুলো সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠে এবং এসব তথ্য বা ধারণা ও নিজের কাঙ্ক্ষিত আদর্শের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান দেখতে পায়। বিশ্ব-জগতে বা সৃষ্টি জগতে নিরঙ্কুশ শক্তির অধিকারী কে – এই প্রশ্নই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হয়ে দেখা দেয়। অধিকাংশ চিন্তাবিদের মতে এই পর্যায়ে মানুষের আধ্যাত্মিক দিক জাগ্রত হয় এবং একমাত্র এই আধ্যাত্মিক দিকই মানুষের ধ্বংসাত্মক কূ-প্রবৃত্তির পাশাপাশি একটি নিয়ন্ত্রণকারী ও প্রশান্তিদায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

মানুষের আত্মিক প্রবণতা তাকে দয়াময় ও মহানুভব আল্লাহমুখী করে। আল্লাহমুখী হওয়ার অর্থ অবিনশ্বর ও অসীম শক্তির শরণাপন্ন হওয়া। পবিত্র কোরআনের সূরা কাসাসের ৮৮ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে উপাস্য ডেকো না। তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সব কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই। সব কিছু তাঁরই দিকে ফিরে আসবে।”

ঈমানের আলোয় আলোকিত ইরানের বর্তমান যুব প্রজন্মের এক সদস্য মিসেস মারজিয়া ইব্রাহিমী। তিনি নামাজ সম্পর্কিত এক নিবন্ধে নিজের অনুভূতি তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “মুয়াজ্জিন যখন আন্তরিক ও উদ্দীপ্ত বা প্রফুল্ল চিত্তে মানুষকে ইবাদতের দিকে আহ্বান জানায় এবং দূর্বল ও ক্ষুদ্র এক সৃষ্টি অসীম, অজর-অক্ষয় সত্তার সামনে দাঁড়ায় তখন সে দৃশ্য কতই না সুন্দর! প্রবৃত্তির কোলাহল বা হৈ-হল্লাতে ভরা জগত থেকে দূরে সরে গিয়ে একজন যুবক বা যুবতীর আত্মা যখন নির্জনতার জগতে পাখা মেলে দেয় এবং বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হয়, তখন সে দৃশ্য কতই না সুন্দর! নামাজ হল বিশ্ববাসীর প্রভুর সামনে দাসত্বের স্বীকারোক্তি। এই স্বীকারোক্তি মানুষের আত্মার গভীরে প্রবেশ করে তাকে উন্নত করে। ”
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নামাজকে ধর্মের স্তম্ভ এবং ঈমান ও কুফুরীর সীমানা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ পরিত্যাগ করা হল বিশ্বাস ও অবিশ্বাস বা কুফুরীর মধ্যে ব্যবধান, কিংবা নামাজের ব্যাপারে কম আগ্রহী বা উদাসীন হওয়াটা কুফুরী।
নামাজ সম্পর্কে জাহরা ফাতেমী নামের খোদাভীরু এক ইরানী তরুণী বলেছেন, যখন নামাজে দাঁড়াই তখন আল্লাহর প্রতি ভালবাসার সৌরভ বা সুঘ্রাণ আমার ক্লান্ত প্রাণ প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। নামাজের আলোয় আমার ক্ষুদ্র ও অন্ধকার মন আলোকিত হয়ে ওঠে। খোদা-প্রেমের আকুতি আমার কণ্ঠকে বাস্পরূদ্ধ করে এবং আমার সমগ্র সত্তায় আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত হয়, আমি আল্লাহর মহত্ত ও অসীমত্বের সামনে আনত হই বা সিজদায় নিমগ্ন হই। নামাজের আধ্যাত্মিক সফর শেষ হলে আমি নতুন এক মানুষে পরিণত হই এবং আমি হয়ে উঠি আশান্বিত ও প্রাণবন্ত, প্রফুল্ল। এ সময় আমার মনে হয় খোদায়ী রহমতের বৃষ্টি আমার আত্মার সমস্ত রং ধুয়ে ফেলেছে এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে মানুষের আত্মা ও মনের মুক্তির একমাত্র পথ নামাজ।

নামাজকে শ্রেষ্ঠ ইসলামী এবাদত বলা হয়। নবী হিসেবে মনোনীত হবার পর বিশ্বনবী (সাঃ)কে নামাজের বিধান দেয়া হয়। পবিত্র কোরআনও প্রকৃত নামাজীদেরকে চিরন্তন মুক্তি ও সৌভাগ্যের সুসংবাদ দেয়। এই মহাগ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী নামাজীরা তাদের এই কারবার বা ব্যবসার জন্য কখনও ক্ষতিগ্রস্ত নন এবং প্রকৃত মুমিন তারাই যারা নামাজ আদায় করে, জাকাত দেয় ও পরকালে দৃঢ়-বিশ্বাসী। পবিত্র কোরআনে সূরা ত্বাহার ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, আমিই এক আল্লাহ (একমাত্র প্রভু)। অতএব আমারই ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে ইবাদত কর।Â
 ১২তম পর্ব

সৌভাগ্য ও মুক্তি অর্জনের ইচ্ছা মানুষের চিরন্তন প্রকৃতি। নামাজ মানুষের এই চাহিদা মেটায়। নামাজে আমরা যেসব বাক্য উচ্চারণ করি ও যেসব জিকর বা শপথের পুনরাবৃত্তি করি সেসবই তৌহিদ বা একত্ববাদ, নবুওত, পরকাল এবং সামাজিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার নির্যাস। এসব শিক্ষা ইসলামী শিক্ষারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নবুওত লাভের পর পরই মানুষ গড়ার ও ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ভিত্তিগুলোকে মজবুত করার কাজে মশগুল হয়েছিলেন। তাঁর এই মিশন শুরু হয়েছিল মুসলমানদেরকে নামাজ ও অন্যান্য এবাদত শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে। নামাজ ইসলামের বৈশ্বিক কর্মসূচী এবং বিশ্বজনীন শিক্ষা ও আদর্শের এক প্রোজ্জ্বোল দৃষ্টান্ত। পবিত্র কোরআনে নামাজ অর্থে সালাত বা তার সমার্থক শব্দ ও প্রতিশব্দ রয়েছে প্রায় ৯৮ টি। আর এ থেকেই এই এবাদতের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে।

হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ) ছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র বিশিষ্ট বিশ্বস্ত সাহাবী এবং আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ)’র নিবেদিত-প্রাণ সঙ্গীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন মহানবী (সাঃ)’র এমন এক সাহাবী যিনি তাঁকে না দেখেই এক আল্লাহ ও তাঁর সর্বশেষ রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছিলেন। রাতের বেলায় দীর্ঘ সিজদার পর আকাশের দিকে তাকাতেন এবং উজ্জ্বল তারকারাজি প্রত্যক্ষ করতেন। প্রতিদিন সকালে এবাদতের পর তিনি হয়ে উঠতেন আরও প্রাণবন্ত, উৎফুল্ল ও আশাবাদী। হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ) যে সারা রাত জেগে এবাদত করতেন, এটা সে যুগের সবাই জানতেন। মহান আল্লাহর দরবারে মনের আকুতি, অনুনয় আর বিনীত নিবেদনগুলো তুলে ধরতেন নিজ প্রার্থণায়। কেউ কেউ বলতেন, হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ) সারা রাত কাটিয়ে দিতেন সিজদারত বা রুকুরত অবস্থায়। তবে কেউ কেউ এ বিষয়টাকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করতেন। মানুষের শরীর কিভাবে এতো ধকল বা কষ্ট সইতে পারে? -এটাই ছিল তাদের প্রশ্ন। হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ)’র সামনে এ ধরনের সন্দেহ বা প্রশ্ন উচ্চারিত হলে তিনি কিছু না বলে মুচকি হাসতেন।

হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ)-কে একদিন এক ব্যক্তি বললেন, আপনি সারা রাত জেগে নামাজ পড়েন বলে শুনেছি, অথচ আল্লাহ তো তার বান্দার ওপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেন নি। জবাবে জনাব ওয়াইস যথারীতি স্মিত হাসি হেসে প্রশান্ত চিত্তে দিগন্তের দিকে তাকালেন। তিনি দেখলেন লোকটি তার বক্তব্য শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। এ অবস্থায় হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ) বললেন, “এবাদত ও নামাজ আমার কাছে বিশ্রাম এবং চিত্ত-বিনোদন বা প্রশান্তিতে সময় কাটানোর সমতূল্য। আহা! যদি একটি রাতই সৃষ্টির সূচনা থেকে অসীম সময় পর্যন্ত দীর্ঘ হ’ত! আর আমি যদি ঐ রাতটা রুকু অথবা সিজদারত অবস্থায় কাটিয়ে দিতে পারতাম!”

লোকটি হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ)’র এ বক্তব্য শোনার পর প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। হযরত ওয়াইস যেন তার কাছে এক নতুন অধ্যায় বা দিগন্ত খুলে দিলেন। ঐ ব্যক্তি জানতেন, মানুষের মন যখন প্রশান্ত থাকে, তখন শরীরও প্রশান্তি লাভ করে। হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ)’র ঘর থেকে বের হবার সময় লোকটি আবৃত্তি করলেন পবিত্র কোরআনের এই অমৃত-বাণীঃ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি।’ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, অস্থিরতা বা অস্থির মন মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি দূর্বলতা। এ ধরনের মানুষ ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। সিদ্ধান্তহীনতার শিকার এ ধরনের ব্যক্তি যে মানসিক রোগী তা তারা নিজেরাও জানেন না। সমাজে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। মনোস্তাত্ত্বিকদের মতে, মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে বংশগতি বা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, শারীরিক গঠন, শরীরের হরমোন এবং রাসায়নিক উপাদানের মত বাহ্যিক চালিকা-শক্তিগুলোর প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়াও প্রভাব রয়েছে পিতা-মাতা, পরিবার এবং মূল্যবোধসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার মত বাহ্যিক বিভিন্ন চালিকা-শক্তির। মনোস্তাত্ত্বিকরা বলছেন, নামাজ মানুষের ব্যক্তিত্বের দূর্বলতাগুলো দূর করার মোক্ষম পন্থা হতে পারে। এ প্রসঙ্গে ডক্টর মজিদ মালেক মোহাম্মদী বলেছেন,

“নামাজী বা মুসল্লীদের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হ’ল, তারা খোদার বিধানের কাছে আত্ম-সমর্পিত। তারা সরল পথে থাকেন। প্রতিদিন নামাজে পঠিত আধ্যাত্মিক-বাক্য ও শব্দগুলো নামাজীকে কিছু বিশ্বাস এবং মূলনীতির সাথে সম্পর্কিত করে। ফলে তিনি স্থিরমতি হন এবং একটি সুনির্দিষ্ট পথ বেছে নেন। আর ঐসব আধ্যাত্মিক বাক্য ও শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তির ফলে তিনি হয়ে উঠেন সুস্থির এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও দৃঢ়-চিত্তের অধিকারী। ব্যক্তিত্বের স্থিরতা ও ভারসাম্যপূর্ণ মানসিক অবস্থা একজন মানুষের জীবনে সাফল্য বয়ে আনার জন্য জরুরী।” ডক্টর মজিদ মালেক মোহাম্মদী আরো বলেছেন, নামাজ সমাজে কোনঠাসা বা একঘরে হয়ে পড়া ব্যক্তিত্বের জন্যেও সংকট কাটিয়ে তোলার মাধ্যম। তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, ইসলাম প্রাত্যহিক নামাজগুলোকে জামাতে আদায় করার ওপর জোর দিয়েছে। একইসাথে প্রাণসঞ্জিবনী জুমার নামাজ মানুষকে উৎসাহ-উদ্দীপনায় টইটম্বুর এক মহতি সমাবেশে একত্রিত করে। ইসলাম যে সামাজিক বা সমাজবদ্ধ ধর্ম জুমার নামাজ তার দৃষ্টান্ত। ইসলামের এসব শিক্ষা নামাজীকে সামাজিক হতে উৎসাহ দেয়। সূরা ফাতিহায় বার বার সমষ্টিবাচক শব্দ বা বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে। নামাজের প্রত্যেক রাকাতের পাঠ্য এ সূরা মানুষের একাকীত্ব-পিয়াসী বা স্বাতন্ত্রতাকামী মনোভাব দূর করে। তাই দেখা যায়, ইসলাম সমাজকে ব্যক্তির চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়। যেমন, সূরা ফাতিহায় বলা হয়েছে, আমরা একমাত্র তোমারই এবাদত করি এবং একমাত্র তোমারই কাছে সাহায্য চাই। এভাবে নামাজ মানুষকে নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্বের সংকট থেকে মুক্তি দেয় এবং এ ধরনের মানুষকে সমাজের সাথে সম্পৃক্ত করে। #

 ১৩ তম পর্ব

নামাজঃ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়-শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি সালাম ও উষ্ণ শুভেচ্ছা। ধর্ম-বিশ্বাসী বা ধার্মিকরা মনে করেন একমাত্র আল্লাহই প্রশংসা পাবার যোগ্য এবং একমাত্র তাঁরই এবাদত করা যায়। তাদের মতে মহান আল্লাহ নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ দয়া ও করুণা প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে প্রশান্তি দান করেন। পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে এক আল্লাহর এবাদত ও প্রশংসা করতে মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আল্লাহর এবাদত ও প্রশংসা মানুষকে সংকীর্ণ বস্তু জগৎ থেকে আলোকিত জগতে নিয়ে যায় এবং ক্রমেই আরো উন্নত জগতে তার অবস্থানের পথ সুগম করে। বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহর এবাদত ও প্রশংসার সুন্দরতম প্রকাশ হ’ল- নামাজ। সূরা আরাফের ২০৫ ও ২০৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমার প্রতিপালককে প্রভাতে ও সন্ধ্যায় নিজ অন্তরে বিনীতভাবে ও সভয়ে এবং অনুচ্চ স্বরে স্মরণ কর, আর উদাসীন হয়ো না। নিশ্চয়ই যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে, তারা আল্লাহর এবাদতে অহঙ্কার করে না, তারা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং তাঁকেই সেজদা করে থাকে।”

মহাপুরুষ ও মহামানবীদের মধ্যে খোদা-প্রেমের কাতরতা দিনকে দিন তীব্রতর হয়ে থাকে। এমনই একজন মানুষ ছিলেন মহিয়সী নারী হযরত ঈসা (আঃ)’র মাতা হযরত মরিয়ম (সাঃ)। তিনি অধিকাংশ সময়ই আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকতেন। জীবন-সায়াহ্নে খোদা-প্রেমের ক্রমবর্ধমান কাতরতা নিয়ে এবাদতে মশগুল থাকার সময় তিনি উপলব্ধি করছিলেন যে এ পৃথিবীতে তাঁর অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এ রকম ভাবনার দিনগুলোতে একদিন মৃত্যুর ফেরেশতা হাজির হল। হযরত মরিয়ম (সাঃ)’র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁর প্রাণ নেয়ার অনুমতি চাইলো। মহান আল্লাহর দরবারে পবিত্রতা ও সতীত্বের মহিমায় ভাস্বর হযরত মরিয়ম (সাঃ)’র ছিল অসাধারণ উচ্চ মর্যাদা। তাই তিনি যখনই চাইতেন তখনই তাঁর কাছে হাজির করা হত বেহেশতের নেয়ামত। তিনি স্মরণ করলেন সে সময়ের কথা যখন তাঁকে হযরত ঈসা(আঃ)’র জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল, “হে মরিয়ম! এই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আল্লাহর প্রতি বিনম্র হও, সেজদা কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু আদায় কর।” তাই জীবনের শেষ লগ্নে তিনি মৃত্যুর ফেরেশতাকে বললেন, আমাকে আল্লাহর দরবারে সেজদার সুযোগ দাও, এরপর জীবন নিও।

মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত মরিয়ম (সাঃ)’র এ অনুরোধ রক্ষা করেন। খোদাপ্রেমের অফুরন্ত আকুতি ও বিনম্রতা নিয়ে হযরত মরিয়ম (সাঃ) যখন সেজদায় মগ্ন, তখনই তাঁর পার্থিব জীবনের অবসান ঘটে।এভাবে জীবনের শেষ মুহূর্তেও হযরত মরিয়ম (সাঃ) ছিলেন আল্লাহর প্রেমে একাত্ম ও একাকার। হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কাছে ছুটে এলেন। ডাক দিলেন মা বলে। কিন্তু কোনো জবাব এল না। গভীর দুঃখ আর শোকে সমাচ্ছন্ন হযরত ঈসা (আঃ) বুঝতে পারলেন মমতাময়ী মা আর ইহলোকে নেই। মহান আল্লাহর পর দুঃখ ও বেদনার একমাত্র সহায় মাকে গভীরভাবে ভালবাসতেন হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি মৃত মানুষকে জীবীতও করতে পারতেন। তাই দ্বিতীয়বার ডাক দিলেন স্নেহময়ী মাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় জীবীত হলেন হযরত মরিয়ম (সাঃ)। অশ্রুসিক্ত হযরত ঈসা (আঃ) মাকে প্রশ্ন করলেন, মা, আপনি কি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে চান? হযরত মরিয়ম (সাঃ) বললেন, হ্যাঁ, এ দুনিয়াতে আবার শুধু যে কারণে ফিরে আসতে ইচ্ছে হয় তা হ’ল, প্রবল শীতের রাতগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়তে এবং গ্রীস্মের তীব্র গরমের দিনগুলোতে রোজা রাখতে । এরপর পরিপূর্ণ মমতায় ভরা চোখে পুত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাছা! এই দুনিয়া খুবই ভয়ংকর। বিস্মিত ও দুঃখ-ভারাক্রান্ত হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের চেহারায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের বেহেশতী আনন্দ প্রত্যক্ষ করলেন। পূণ্যময়ী হযরত মরিয়ম (সাঃ) আবারও চোখ দুটি বন্ধ করলেন এবং শায়িত হলেন চিরনিদ্রায়।

বর্তমান বিশ্ব সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক সংকট, মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও নৈরাজ্যে জর্জরিত। হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সমসাময়িক যুগের মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যার ব্যাপারে পরিসংখ্যানগত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশটিতে আত্মহত্যার শতকরা ৭২ টি ঘটনা ঘটে হতাশার কারণে, শতকরা ১৩ টি আত্মহত্যা ঘটে মদ পানের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে, শতকরা ৮ ভাগ আত্মহত্যা ঘটছে অন্যান্য মানসিক রোগের জন্য এবং শতকরা ৭ ভাগ আত্মহত্যা ঘটে থাকে কোনো ধরনের পূর্ব-প্রেক্ষাপট বা কারণ ছাড়াই। এ ছাড়াও মার্কিন সমাজে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যক্তিরা যারা চাকুরী থেকে অবসর নেয়ায় এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে আছেন।

মনোস্তত্ত্ববিদরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন উপায়ের কথা বলে আসছেন। এ ব্যাপারে ধর্ম-বিশেষজ্ঞরাও ভিন্ন ধরনের কিছু পদ্ধতির কথা বলে থাকেন। মানসিক সংকটগুলো হ্রাসে নামাজের ভূমিকার কথাও এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষণযোগ্য। এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামাজ হতাশা বা বিষন্নতা দূর করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আশা এবং জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ধর্মীয় সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিরা নিয়মিত নামাজ পড়েন। আধ্যাত্মিক বিশ্বদৃষ্টি ও পরকালমুখী চিন্তার কারণে তারা জীবনের পড়ন্ত বেলায় তওবা বা অনুশোচনা এবং পাপ মার্জনার জন্য প্রার্থনায় মশগুল হন। তারা জীবনের এই সময়টাকে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার নবায়নের মূল্যবান সময় বলে বিবেচনা করেন। তাই বিভিন্ন ধরনের মানসিক আঘাতের শিকার ব্যক্তিরাসহ বয়স্ক ও প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য নামাজ ও প্রার্থনা আশা-উদ্দীপক এবং প্রশান্তিদায়ক মোক্ষম ওষুধ হিসেবে কাজ করে। আপনজনের মৃত্যুর মত মানসিক সংকট ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় নামাজ মানুষকে অবিচল রাখে এবং আত্মহত্যার মত অযৌক্তিক ও অশান্ত কাজ থেকে বিরত রাখে। আর এ জন্যই পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারার ৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। এ কাজ বিনয়ী বা খোদাভীরু ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন। ”
হ্যাঁ, সংকটগুলোর সমাধানের জন্য দুটি বিষয় খুবই জরুরী। এ দুটি বিষয় হল, ধৈর্য ও নামাজ। নামাজ মানুষকে মহান আল্লাহর অশেষ শক্তির সাথে সম্পর্কিত করে এবং তার মধ্যে সঞ্চার করে নতুন শক্তি ও মনোবল। অন্য কথায় নামাজ মানুষকে সংকট ও দুঃখ-বিপদের মোকাবেলায় পাহাড়ের চেয়েও অবিচল ও শক্তিমান করে। মহান আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে প্রকৃত নামাজী হবার তৌফিক দেন এই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ করছি নামাজ সম্পর্কিত এ সপ্তার আলোচনা।
 ১৪তম পর্ব
Â
নামাজঃ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়-শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও কল্যাণকামীতার অফুরন্ত দোয়ার প্রতীক তথা সহমর্মী হৃদয়ের প্রথম সম্ভাষণ ও উচ্চারণ হিসেবে পরিচিত সালাম এবং অশেষ উষ্ণ শুভেচ্ছা। আর সবার জন্য দয়াময় ও মহান আল্লাহর কাছে কামনা করছি রহমত ও বরকতের অশেষ ফল্গুধারায় সিক্ত পবিত্র রজব মাসের সমস্ত কল্যাণ। আশা করছি এই পবিত্র মাসে আমাদের সবার নামাজ-রোজা ও সৎকর্ম মহান আল্লাহ কবুল করবেন।
নামাজ মুমিনের জন্য মেরাজস্বরূপ। যথাযথ নিয়ম মেনে ও আদব সহকারে যদি নামাজ আদায় করা যায় তাহলে মানুষের সমস্ত সৎগুণ নামাজীর মধ্যে বিকশিত হবেই। একজন প্রকৃত নামাজী কখনও কোনো অসম্মান নিজের জন্য ও কোনো মানুষের জন্য মেনে নিতে পারেন না। নামাজ ও দোয়া মানুষের মন এবং শরীরে বিস্ময়কর প্রভাব ফেলে। মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক চেতনা জোরদার করে এই নামাজ। নামাজ ও দোয়ায় অভ্যস্ত ব্যক্তির চেহারার দিকে তাকালে দেখা যায় তার মধ্যে হিংসা ও মন্দ কাজের ছাপের পরিবর্তে সততার আলোকোজ্জ্বোল আভা ফুটে উঠেছে। এ ধরনের মানুষ যে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে খুবই সচেতন এবং তারা যে অন্যদের কল্যাণকামী তা-ও তাদের সৌম্য, প্রশান্ত ও পবিত্রতায় প্রদীপ্ত উজ্জ্বল চেহারাই বলে দেয়। এ ধরনের মানুষ তথা নামাজী হন নির্মল মনের অধিকারী, আচরণে বিনয়ী, প্রশান্ত-চিত্ত, ভয়-ভাবনাহীন প্রফুল্ল বা ফুরফুরে মেজাজসম্পন্ন, প্রবল আত্মবিশ্বাসী, সত্য ও সুপরামর্শ মেনে নিতে সদা প্রস্তুত এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, ঈমানদার ব্যক্তি হাস্য-রসিক হন এবং মুমিনের মুখে মুচকি হাসি লেগে থাকে। ফার্সী প্রবাদে বলা হয়, খান্দেহ বর হার দারদে বি-দারমান দাওয়াস্ত। অর্থাৎ চিকিৎসার অযোগ্য সমস্ত রোগের ওষুধ হল হাসি।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, জীবন সম্পর্কে হতাশ ব্যক্তির চেয়ে হাসি-খুশি বা প্রফুল্ল মেজাজের মানুষের আচরণ বেশী সুন্দর। এ ধরনের মানুষ খুব কমই মানসিক ও শারীরিক রোগে ভোগেন। তাই মানুষের জন্য আনন্দদায়ক সব পদক্ষেপই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক। আবার অনেক সময় মানুষের শরীরের রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন তাকে বিষন্ন বা প্রফুল্ল করে। যেমন, অনেক মানুষ সকালের দিকে কোনো কারণ ছাড়াই অনিচ্ছাকৃতভাবে খিটমিটে বা ক্রুদ্ধ হয়ে থাকেন রক্তে রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে। কর্টিসল নামের একটি রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রয়োগ করা হলে মানুষ হাসি-খুশি হয়ে ওঠে। খুব ভোরের দিকে মানুষের শরীরে এই রাসায়নিক উপাদান বা হরমোন বৃদ্ধি পায়। আর এ সময় যদি মানুষ জেগে থাকে তাহলে সে বিশেষ আনন্দ ও প্রফুল্লতা উপভোগ করতে পারে। আর এই বাড়তি আনন্দ সারাদিন তার সৃষ্টিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। আর এ জন্যেই যারা খুব ভোরে বা গভীর রাতে নামাজ ও প্রার্থনায় মশগুল হন তারা সবচেয়ে শিহরণ-জাগানো মানসিক আনন্দ উপভোগ করেন বলে মনোস্তাত্ত্বিকরা মনে করেন। অনাবিল আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি অর্জনের মোক্ষম পন্থা হল নৈশকালীন ইবাদত। অবশ্য নামাজ, তা যে সময়েই আদায় করা হোক না কেন, সব সময়ই আধ্যাত্মিক ও খোদাপ্রেমের অতুলনীয় আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং তা মানুষের মনকে করে বিকশিত, প্রাণবন্ত ও সজীব। বিশ্ববরেণ্য ইরানী কবি হাফেজ তার এক কবিতায় লিখেছেন,

খোদা হাফেজকে দিয়েছেন সৌভাগ্যের যত খনি এ জগতে
পেয়েছি তা নৈশ-বন্দেগী ও প্রভাতের সদা-পাঠ্য বাণীর বরকতে ।

আজকাল মনোস্তাত্ত্বিকরা বলছেন, খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগা ও নামাজসহ বিভিন্ন এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হওয়া মানুষের শারীরিক সুস্থতাসহ মানসিক প্রফুল্লতার জন্য সহায়ক। ফলে ভোরের নামাজ ও এবাদত মানুষকে বিষন্নতা থেকে রক্ষা করে। বিষন্নতায় ভুগছেন এমন রোগীদের শতকরা ৭৫ ভাগই সকালের ঘুমের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগেন এবং বিষন্নতার উপসর্গগুলো সকালের দিকেই তীব্রতর হয়। তাই মনোস্তাত্ত্বিকরা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ও এবাদত করাকে বিষন্নতা দূর করার মোক্ষম উপায় বলে মনে করছেন।

পবিত্র কোরআনেও ভোররাতের দোয়া ও নামাজেরও ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ সময়ের এবাদত মানুষের মানসিক বোঝাকে হাল্কা করে এবং দূর করে মানসিক জটিলতা ও বিষন্নতা বা হতাশা। ভোরবেলায় খোদাপ্রেমের আকুতিতে টুইটুম্বর এবাদতের মাধ্যমে অর্জিত আল্লাহর সান্নিধ্যের পরশ মানুষের তৃষ্নার্ত আত্মাকে জোগায় প্রশান্তির মদিরা। ফলে মনের নড়বড়ে ভাব দূর হয়ে যায় এবং আল্লাহর ওপর একান্ত নির্ভরতায় পরিপূর্ণ দৃঢ়-মনোবল নিয়ে সে শুরু করে এক নতুন দিন। আর এ জন্যই আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, “আল্লাহ যখন বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে স্বল্প আহার, স্বল্প ঘুম ও কম পরিমাণে কথা বলার গুণে বিভূষিত করেন। ”
রবিয়া বিন কা’ব ছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র বিশিষ্ট সাহাবী। তিনি বহু বছর রাসূল (সাঃ)’র পাশে ছিলেন এবং বিভিন্ন যুদ্ধেও তাঁর সাথী ছিলেন। এ কারণে মুশরিকদের নানা অত্যাচার ও যন্ত্রণা তাকে সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র কাছে কিছু চান নি। একদিন মহানবী (সাঃ) তাকে বললেন, হে রবিয়! তুমি ৭ বছর ধরে আমার সাথে ছিলে এবং আমার কাছে কিছুই চাও নি। তুমি কি আমার কাছে কিছুই চাইবে না?
উত্তরে মাথা নিচু করে তিনি বললেন, হে রাসূল আমাকে এ ব্যাপারে ভাবনার সময় দিন।
ঘরে ফিরে অনেক কথা মনে হলো রবিয়ার। অর্থনৈতিক সংকট দূর করার কথা কিংবা কখনও অসুস্থ না হবার আশার কথা। তার একজন ঘনিষ্ঠ লোক বড় কোনো পদ চাওয়ার পরামর্শ দিল তাকে। কিন্তু রাসূল (সাঃ)’র কাছে ফিরে এসে রবিয়া বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমি আপনার সাথে বেহেশতে যেতে পারি।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তাকে বললেন, কেউ কি তোমাকে এ বিষয়টি শিখিয়ে দিয়েছে? উত্তরে রবিয়া বললেন, না, আমি নিজেই ভেবেছি যে সম্পদ তো চিরস্থায়ী নয়, দীর্ঘ হায়াত বা জীবন ও পদ-এসবও একদিন শেষ হয়ে যাবে। বিশ্বনবী (সাঃ) রবিয়ার প্রশংসা করে বললেন, আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যাতে তোমাকে আমার সাথে বেহেশতে যেতে দেয়া হয়, তবে তুমিও অত্যধিক নামাজ ও সিজদার মাধ্যমে এই আশা পূরণের ব্যাপারে আমাকে সহায়তা কর।
রবিয়া বিন কা’ব খুব খুশী হলেন। তিনি একনিষ্ঠ মনে ও আল্লাহর প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে বেশী বেশী নামাজ আদায় করতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পারলেন সৌভাগ্য ও সুপথ এবং আল্লাহর সাথে গভীর ও প্রেমময় সম্পর্কের চাবিকাঠি হল নামাজ ও প্রার্থনা।

১৫তম পর্ব

নামাজঃ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়-শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর থেকে আপনাদের জানাচ্ছি ইসলামী ভ্রাতৃত্বসহ অশেষ দোয়া, কল্যাণকামীতা, ভালোবাসা ও সহমর্মীতায় পরিপূর্ণ সালাম এবং অফুরন্ত উষ্ণ শুভেচ্ছা। আর সবার জন্য দয়াময় ও মহান আল্লাহর কাছে কামনা করছি রহমত ও বরকতের বেহেশতী সৌরভে সিক্ত পবিত্র রজব, শাবান এবং রমজান মাসের সমস্ত কল্যাণ। আশা করছি মহান আল্লাহ এইসব পবিত্র মাসে আমাদের সবার নামাজ-রোজা ও সৎকর্ম কবুল করবেন এবং আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের পথে এগিয়ে নেবেন ।

নামাজ সম্পর্কে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করার পর শুরু করবো নামাজ সম্পর্কিত আজকের আলোচনার মূল পর্ব :

মসজিদে ঐ শোনরে আযান, চল নামাজে চল।
দুঃখে পাবি সান্ত্বনা তুই, বক্ষে পাবি বল।
ওরে চল নামাজে চল।।
তুই হাজার কাজের অসিলাতে নামাজ করিস কাজা,
খাজনা তারি দিলিনা, যে দ্বীন দুনিয়ার রাজা।
তারে পাঁচবার তুই করবি মনে তাতেও এত ছল।
ওরে চল নামাজে চল।

নামাজ মহান আল্লাহর প্রেমের সোপান। আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে ভালবাসার সর্বোত্তম চালিকা শক্তি নামাজ। নামাজ অন্তরের আলো, আত্মার সংস্কারক এবং মানসিক প্রশান্তির মাধ্যম। এ এমন এক মাধ্যম যা মানুষকে আধ্যাত্মিক উর্ধ্বলোক বা বেহেশতী পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত করে। আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টিতে নামাজের কার্যকারীতা অপরিসীম। আর এ জন্যই হাদীসে বলা হয়েছে, নামাজ বেহেশতের চাবিকাঠি। নামাজ ছাড়া মানুষের অস্তিত্বের আকর স্পন্দনহীন, নিস্প্রাণ বা বন্ধ্যা বিরাণভূমির মত, যাতে জন্ম নেয় না সৃষ্টিশীল কোনো কিছু, গজায় না কোনো বৃক্ষ এবং ফুল বা ফল তো দূরের কথা । যারা নামাজের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে অজ্ঞ তারা আধ্যাত্মিক শুন্যতার চরম শিকার।

মুসলমানরা সংখ্যালঘিষ্ঠ এমন দেশে বা অমুসলিম অধ্যুষিত কোনো দেশে কোনো মুসলমানের একনিষ্ঠ চিত্তের নামাজ আদায়ের দৃশ্য অনেক অমুসলমানের কাছে ইসলামের বাণীর মর্মকথা পৌঁছে দেয়। এক আল্লাহর এবাদতের এমন সুন্দর দৃশ্য দেখে অনেক অমুসলিম ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। তারা যখন দেখেন যে একজন মুসলমান বস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার কোলাহলে পরিপূর্ণ এ বিশ্বে আল্লাহর সামনে সবচেয়ে বিনয়ী, নম্র ও ভীত-বিহ্বল এবং তারা এই নামাজে দাঁড়িয়ে সৎ ও কল্যাণকামী হবার মত গুণ বা যোগ্যতা অর্জনের প্রার্থনা করেন, তখন তারা বিস্মিত না হয়ে পারেন না। হয়তো এমনই মুহূর্তে তারা বলতে চান,

হে নামাজী, আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
তব চরণতলে দিলাম পেতে হৃদয়-জায়নামাজ।

অনেকেই প্রশ্ন করেন নামাজের কি সামাজিক কোনো সুফল আছে অথবা নামাজ কি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে ? পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, নামাজ মানুষকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে। নামাজ মানুষকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহ সর্বত্র উপস্থিত রয়েছেন এবং তিনি মানুষের সব কাজ দেখছেন। আর যে ব্যক্তি এ কথা মনে রাখেন তিনি কোনো অন্যায়, অবিচার বা মন্দ কাজে জড়িত হতে পারেন না। অবশ্য যারা নামাজের তাৎপর্য ভালোভাবে উপলব্ধি করেন এবং যেভাবে নামাজ আদায় করা উচিত সেভাবে নামাজ আদায় করেন তারাই নামাজের সামাজিক সুফলগুলো পুরোপুরি ভোগ করতে পারেন। প্রকৃত নামাজী নিজে যেমন মিথ্যা কথা বলেন না, কারো ওপর জুলুম করেন না এবং কাউকে বিভ্রান্ত করেন না, তেমনি তিনি কারো ওপর জুলুমও সহ্য করেন না ও কারো প্রচারণায় বিভ্রান্তও হন না, কিংবা কারো মিথ্যা কথায় কান দেন না। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ)’র মত ব্যক্তিত্বরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ নামাজী এবং আর এ কারণেই তাঁরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশী অবদান রেখে গেছেন।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নামাজের লক্ষ্য। মানুষ মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার মোকাবেলায় পুরোপুরি অক্ষম, দূর্বল ও হীন দাসানুদাস। এ জন্যই নামাজী নামাজের মধ্যে বলেন, আমরা একমাত্র তোমারই এবাদত করি এবং একমাত্র তোমারই সাহায্য চাই। মানুষের যে কোনো ক্ষমতা নাই, যা কিছু আছে তা আল্লাহরই দেয়া, এ কথা স্বীকার করার মাধ্যমে নামাজী তার মধ্যে অহংকারের মূলগুলো উৎপাটন করেন। নামাজী নামাজে একথাও বলেন যে, সব কিছুর মালিক হলেন মহান আল্লাহ। এই উচ্চারণ নামাজীকে সব ধরনের আত্মকেন্দ্রীকতা, হিংসা, স্বার্থপরতা ও নিজেকে বড় ভাবার চিন্তা থেকে দূরে রাখে। ফলে মানুষ অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করা বা অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকেন।

মানব সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে বাধাগুলো হলো আত্মকেন্দ্রীকতা, হিংসা, স্বার্থপরতা ও নিজেকে বড় ভাবার চিন্তা, অজ্ঞতা, লোভ এবং অসহিষ্ণুতা বা অধৈর্য প্রভৃতি। নামাজ মানুষের এ ধরনের স্বভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যম। নামাজ মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও অন্যের অধিকার রক্ষা এবং অন্যের কল্যাণকামীতার গুণের মত বিভিন্ন মহৎ গুণের বিকাশ ঘটায়। আল্লাহ নিজে ন্যায় বিচারক এবং তিনি বিশ্বের সব কিছুই ন্যায়-বিচারের ভিত্তিতে গড়ে তুলেছেন। একই কারণে আল্লাহ ন্যায়বিচারকামীদের পছন্দ করেন। তাই নামাজীও জীবনের সবক্ষেত্রে ন্যায় বিচার এবং সামাজিক বিধি-বিধানের বাস্তবায়ন ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন।

নামাজ আদায়ের অন্যতম শর্ত হলো নামাজীর পোশাক ও নামাজ পড়ার স্থান বৈধ হতে হবে। চুরি করা বা অন্যের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া পোশাক পরে বা অবৈধভাবে কুক্ষিগত করা স্থানে নামাজ পড়লে তা জায়েজ হবে না। এভাবে নামাজ অন্যের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে এবং নামাজীকে জীবনের সবক্ষেত্রে ন্যায়বিচার চর্চায় অভ্যস্ত করে।
এভাবে দেখা যায়, নামাজ আত্মশুদ্ধি তথা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রসহ পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা সামাজিক ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মানুষের মনের অভ্যন্তরীণ প্রেরণা বা চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাপক অবদান রাখে।
১৬ তম পর্ব

Â
নামাজঃ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়-শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর শুরু করছি সেই মহান আল্লাহর নাম নিয়ে, সমস্ত প্রশংসা ও গৌরব যাঁর প্রাপ্য, যিনি সমস্ত পূর্ণতা ও সৌন্দর্য্যের উৎস, যিনি সর্ব বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী, যাঁর স্মরণই সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং যাঁর স্মরণেই রয়েছে সমস্ত কষ্টের নিশ্চিত প্রতিকার ও মহাপ্রশান্তি, যিনি সব ধরনের কল্যাণ বা মঙ্গলের আধার ও সব ধরনের বিপদ-আপদের একমাত্র ভরসা বা রক্ষাস্থল। আর শ্রোতা-ভাইবোনদের জানাচ্ছি অশেষ দোয়া, কল্যাণকামীতা, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও সহমর্মীতায় পরিপূর্ণ অসংখ্য সালাম এবং অফুরন্ত উষ্ণ শুভেচ্ছা। আর সবার জন্য দয়াময় ও মহান আল্লাহর কাছে কামনা করছি রহমত ও বরকতের বেহেশতী সৌরভে সিক্ত পবিত্র রজব, শাবান এবং রমজান মাসের সমস্ত কল্যাণ। আশা করছি মহান আল্লাহ এইসব পবিত্র মাসে আমাদের সবার নামাজ-রোজা ও সৎকর্ম কবুল করবেন এবং আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের পথে এগিয়ে নেবেন ।
মহান আল্লাহর অশেষ দয়া ও রহমতের কোলে আশ্রয় নেয়া মানুষের সৌভাগ্যের সবচেয়ে বড় পাথেয়। তাই আমাদের উচিত মহান আল্লাহর এবাদত-বন্দেগী, তাঁর কাছে প্রার্থনা ও তাঁর প্রেমে মশগুল হয়ে অন্তরাত্মাকে পবিত্রতা, সজীবতা এবং সৌন্দর্যে বিভূষিত করা। আর নামাজ এই মহাপ্রেমের ও মহামুক্তির সোনা-রূপার জিয়ন-কাঠি। কবির ভাষায়-

খোদার প্রেমের অমৃত পান করবো নামাজ-সাগরে
মন-প্রাণ উজাড় করবো নামাজের অশেষ রহস্যের আধারে
দেখবো আল্লাহর নূরের দীপ্তি, চাইবো তাঁর মিলন ও একাত্মতা
সমস্ত কল্যাণের ফুল ফল হয়ে ঝরে নামাজের প্রান্তরে।

নামাজের সুন্দরতম রূপ বা আত্মিক আকর্ষণগুলো ফুটে উঠেছে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা ও ওলি-আওলিয়াদের মধ্যে। নামাজের নূরের আলোয় আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)’র জীবন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র ভাষ্য অনুযায়, আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) যখন নামাজে মশগুল হতেন তখন আল্লাহর প্রেমের চেতনা ছাড়া তাঁর মধ্যে অন্য কোনো কিছুর চেতনা থাকতো না।
একবার সিফফিনের যুদ্ধে সংঘাত যখন চরম পর্যায়ে তিনি সে সময় যুদ্ধের ময়দানে থেকেই বার বার সূর্য ও আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য, জোহরের নামাজের সময় হয়েছে কিনা তা দেখা এবং নামাজ আদায় করা। এ সময় আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)’র একজন সঙ্গী তাঁর এই তৎপরতার কারণ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার পর বললেন, এমন তীব্র সংঘাতের সময়ও নামাজ আদায় করা কি জরুরী? উত্তরে মুমিনগণের নেতা বললেন, আমরা তো কেবল নামাজের জন্যই তাদের সাথে যুদ্ধ করছি এবং আমরা নামাজ কায়েম করতে চাচ্ছি। এভাবে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) সমাজে নামাজের সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবীত করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা ও সাধনায় নিয়োজিত হয়েছিলেন।
সিফফিনের যুদ্ধ চলার সময় আরো এক ঘটনায় দেখা গেছে, একটি তীর আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)’র পায়ে বিদ্ধ হল। চিকিৎসকরা বহু চেষ্টা করেও ঐ তীর ইমাম আলী (আঃ) পা থেকে বের করতে পারলেন না। কারণ, ঐ তীর বের করতে গেলে তিনি অসহ্য ব্যাথা ও যন্ত্রণা পেতেন। তখন চিকিৎসকরা বিষয়টি হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আঃ)’র কাছে উত্থাপন করলেন। তিনি বললেন, আমার বাবার নামাজে মশগুল হওয়া পর্যন্ত আপনারা অপেক্ষা করুন, কারণ, নামাজের সময় কোনো কিছুই তাঁকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখতে পারে না। এ অবস্থায় নামাজের সময় হলে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) যখন নামাজে মশগুল হলেন তখন আল্লাহর স্মরণে একাকার তাঁর দেহ থেকে ঐ তীর তুলে নেয়া হয়। কিন্তু তিনি কিছুই টের পেলেন না। নামাজ শেষ হবার পর তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর পা থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করলেন, কি ব্যাপার? তখন তাঁকে বলা হল, আপনি যখন নামাজে ছিলেন তখন আপনার পা থেকে তীর বের করা হয়েছে।

আমরা অনেকেই এ কথাটি হয়তো শুনেছি যে, শৈশবে শিশুকে যা শেখানো হয় তা পাথরে আঁকা খোদাই-কর্মের মতই অম্লান ও অমলিন থাকে। তাই আদব-কায়দা বা যে কোনো শিক্ষা কিংবা শিক্ষনীয় বিষয় শেখানোর সবচেয়ে ভালো সময় হল শৈশব। শৈশবের শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রকে দৃঢ়তর করার জন্যও জরুরী। মনোস্তাত্ত্বিকদের মতে, মানুষের ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই শৈশবেই। তাই শিশুকে সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া সামাজিক উন্নয়নের জন্যই জরুরী। তবে শিশুর মানসিক বিকাশ ও সুস্থতার জন্য সবচেয়ে বেশী জরুরী বিষয় হল শিশুকে ধার্মিক পরিবার এবং ধার্মিক পিতা-মাতার সাহচর্যে রাখা। এ ধরনের পরিবারেই শিশু আল্লাহর প্রতি ভালবাসার পরিবেশে জীবনের সঠিক পথ বা মুক্তির পথে চলার শিক্ষা অর্জন করে এবং তা ভবিষ্যতের জন্যে তার মনে বদ্ধমূল হয়ে থাকে। সৌভাগ্যের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা বিধানকারী ধর্ম ইসলামের প্রতি ভালবাসা বদ্ধমূল করার জন্য শৈশবের শিক্ষাই সবচেয়ে বেশী উপযোগী।

ইসলাম পিতা-মাতাকে শিশুর জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করতে বলে। কারণ, সুন্দর নাম শিশুর সুন্দর ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব রাখে। অন্যদিকে শিশুর জন্য অনুপযোগী বা অসুন্দর নাম রাখা হলে তা শিশুর ব্যক্তিত্বকে খাটো করার শামিল এবং এর ফলে এ ধরনের শিশুর ব্যক্তিত্ব নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
ধার্মিক পরিবারে জন্ম-নেয়া শিশু জন্মের পর পরই আযান ও নামাজের এক্বামা শুনে। তার কোমল আত্মার জন্য সেটাই প্রশান্তিদায়ক প্রথম শিশুতোষ-সঙ্গীত। দোয়া ও আযান শিশুর আধ্যাত্মিক চাহিদার প্রথম প্রাপ্তি। অন্যদিকে খাদ্য ও মায়ের দুধ তাকে বিভিন্ন মানসিক এবং শারীরিক রোগ থেকে রক্ষা করে। শিশুকে শৈশব থেকেই নামাজ ও প্রার্থনার মধুর ধ্বনির সাথে পরিচিত করতে বলা হয়েছে ধর্মীয় বর্ণনায়। মায়ের ও অন্য আপনজনদের নামাজ ও দোয়ার দৃশ্য এবং শব্দ প্রত্যক্ষভাবে শিশুর মানসিক জগতে প্রভাব ফেলে, ফলে শিশুর মন ও শরীরে এসব সুন্দর গুণ বা কাজের প্রতি আকর্ষণ স্থায়ী স্বভাব বা অভ্যাসের মত বদ্ধমূল হয়। এ ধরনের পরিবেশে বেড়ে-ওঠা শিশু তার ভবিষ্যত জীবনে নামাজ এবং দোয়া ও অন্যান্য এবাদতকে জীবনের অপরিহার্য কর্মসূচীতে পরিণত করে।

শৈশব ও কৈশরে নামাজ আদায়ের ফলে আল্লাহ, ধর্ম, ধর্মীয় মূল্যবোধর মত মহৎ বিষয়গুলো শিশুর মনে স্থায়ীভাবে শ্রদ্ধার আসন লাভ করে। আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)’র ভাষায় শিশুর মন উর্বর জমির মত। এখানে যে বীজই বপন করা হোক না কেন জমি তা গ্রহণ করে। তাই শিশুর মনে ঈমানের বীজ বপনের ফলে তার মধ্যে ধর্মের প্রতি ও অর্থ বা উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনের প্রতি আকর্ষণ প্রবল হয় এবং পরবর্তিকালে শিশু নিজেকে অসার ও আত্মপরিচয়হীন অবস্থা থেকে সহজেই নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে।

কৈশরও অনেকটা শৈশবের মতই। কৈশরে পা দেয়ার পর শিশু আরো নতুন ও বৈচিত্রময় জগতের মধ্যে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। সামাজিক পরিবেশ ও সঙ্গী-সাথীদের আচরণ এ সময় তাকে প্রভাবিত করে। মনোস্তাত্ত্বিকদের মতে কিশোর-কিশোরীরা সহজেই বন্ধুদের কথায় প্রভাবিত হয়। খুব দ্রুত আবেগপ্রবণ হওয়া বা উত্তেজনায় ভোগা এই বয়সের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ সময় যদি কোমলমতি কিশোর-কিশোরীরা আল্লাহর সান্নিধ্যের ধারণা ও এবাদতের মাধুর্যের স্বাদ পায়, তাহলে তাদেরকে অনেকাংশে বিপদমুক্ত রাখা সম্ভব এবং ভবিষ্যৎ মুক্তির পথে চলাও তাদের জন্য সহজ হবে। মানুষের ওপর নামাজের এতসব প্রভাবের কারণেই মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সাঃ)কে সম্বোধন করে বলেছেন, তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাজের জন্য আদেশ দাও এবং তাতে অবিচলিত থাক। (সূরা ত্বাহা-১৩২) Â

১৭ তম পর্ব

“নামাজঃ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়”-শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর শুরু করছি সেই মহান আল্লাহর নাম নিয়ে, সমস্ত প্রশংসা ও গৌরব যাঁর প্রাপ্য, যিনি সমস্ত পূর্ণতা ও সৌন্দর্য্যের উৎস, যিনি পাখির কন্ঠে জাগিয়ে তোলেন আনন্দের সুর-লহরী, ফুলের বক্ষে ছড়িয়ে দেন সুগন্ধ এবং যিনি নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি, এর সুন্দর ফুল-ফল, লতা-পাতা থেকে শুরু করে নদী, সাগর, মহাসাগর, আকাশ ছোঁয়া পাহাড়-পর্বত, ঝর্ণাধারার মিষ্টি কলতান– এসব কিছুর ধারাবাহিক বিকাশ ও সংরক্ষণে ক্লান্ত হন না। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সেই মহান আল্লাহর যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টির পর আমাদের জন্য সব ধরনের জীবন-উপকরণের ব্যবস্থা করেছেন, দিয়েছেন সুঠাম দেহ, দিয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তি বা সত্য ও মিথ্যাকে যাচাই করার জ্ঞান, দিয়েছেন সঠিক পথ লাভের মাধ্যম হিসেবে পবিত্র কোরআন ও সত্যিকারের হেদায়াতের বাস্তব ব্যাখ্যাকারী হিসেবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর পবিত্র আহলে-বাইত (আঃ)’র রেখে যাওয়া আদর্শ।

মহান আল্লাহর দেয়া নেয়ামতগুলোর যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সমস্ত সৃষ্টিকূলের পক্ষেও অসম্ভব, বিশেষ করে নামাজের মত মহানেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মত ভাষা ও সাধ্য মানবকূলের জন্য খুবই সিমীত। এই নামাজের মাধ্যমে হেদায়ত বা সুপথে অবিচল থাকার ব্যাপারে আমরা আমাদের অঙ্গীকারগুলো দৈনিক ৫ বার নবায়ন করি এবং নতুন করে শক্তি সঞ্চারিত করি সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে বা মহান আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বা মিশনগুলো বাস্তবায়নের তৎপরতায়। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই হেদায়ত, যার ওপর অবিচল থাকার জন্য আমরা সব সময়ই আল্লাহর দয়ার মুখাপেক্ষী এবং এমনকি নবী-রাসূল ও পবিত্র ইমামগণও আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী ছিলেন সব সময়। হেদায়াত ছাড়া শুধু জ্ঞান পাগলের হাতে ছুরি থাকার মতই ভয়ানক, কিংবা চোরের হাতে আলো থাকার মতই বিপজ্জনক। তাই হেদায়াত বা সুপথে অবিচল থাকার জন্য নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা জরুরী।

এভাবে বলা যায় নামাজ ইসলাম ধর্মের প্রধান স্তম্ভ। কোনো কোনো বর্ণনায় নামাজকে শরীরের মাথার মত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আধ্যাত্মিক উচ্চতর দিগন্তগুলোর উন্মোচক এই নামাজ মুমিনের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। প্রকৃত খোদা প্রেমিক যখন আযান শুনেন তখন তার মধ্যে খোদা-প্রেমের গভীর আকুলতা ও শিহরণ অন্তরে যেন ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। সুরভিত ফুলের মতই নামাজ মানুষের অন্তরকে করে পবিত্র, ফুলেল ও সুরভিত। তাই পবিত্রতার ফুলেল সৌরভ ও প্রেমময় আকুলতা নিয়ে নামাজ আদায় করা উচিত। নামাজ মহান আল্লাহর সাথে বান্দার দূরত্ব মোচন করে এবং বান্দা বা দাস নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর দাসত্বের প্রত্যক্ষ পুলক অনুভব করেন।

গেলো সপ্তার আলোচনায় আমরা নামাজের সাথে শৈশব ও কৈশরের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছি। আমরা বলেছি, শৈশব থেকেই শিশুকে নামাজের মত ধর্মীয় বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত করা এবং নামাজের প্রতি তাদের ভালবাসাকে বদ্ধমূল করা সম্ভব। আজকের আলোচনায়ও আমরা এ বিষয়ে বিশ্লেষণ অব্যাহত রাখবো।
শিশু-কিশোরদেরকে নামাজের প্রতি আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে পরিবার, স্কুল ও গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণ দেয়া বা শিক্ষিত করা বলতে কেবল তথ্য সরবরাহ করাকেই বোঝায় না। ব্যক্তির চিন্তাধারা ও বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা এবং এ জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করাও প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য তাদেরকে ধর্মের কল্যাণ বা উপকারিতা সম্পর্কে ধারণা দেয়া জরুরী। বিশেষ করে নামাজের আধ্যাত্মিক চেতনা শিশু-কিশোরদের মনে বদ্ধমূল করা নামাজের সংস্কৃতি বিস্তারের জন্য অপরিহার্য। নামাজসহ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা বিষয়গুলো তখনই শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতীদের মনে গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি করবে যখন তা হবে আনন্দময় বা তৃপ্তিদায়ক।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও এবাদত মানুষের সর্বোত্তম বা সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক চাহিদাগুলো পূরণ করে। শিশু-কিশোর বা যুবক-যুবতীরা যদি স্বাভাবিক অথচ আকর্ষণীয় পরিবেশে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও এবাদতের সাথে পরিচিত হয় তাহলে তাদের মধ্যে এ সম্পর্কে সুন্দর ধারণা সৃষ্টি হবে এবং ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসগুলোকে তারা অন্তর দিয়ে ভালবাসবে। তাই শুধু অভিভাবকদের পক্ষ থেকে উপদেশ দিয়ে বা সতর্কবাণী শুনিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও এবাদতের দিকে আকৃষ্ট করা যায় না, বরং সহৃদয় আচরণ এক্ষেত্রে বেশী জোরালো বা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধর্মীয় বিষয়ের শিক্ষক অথবা মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের আচরণ যদি খুব রুক্ষ হয়, কিংবা তারা যদি খুব কর্কষভাষী হন তাহলে কিশোর বা তরুণ বয়সীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও এবাদতের দিকে আকৃষ্ট হবে না। অন্যদিকে তাদের আচরণ যদি হয় সুন্দর এবং তারা মিষ্ট-ভাষী হন, তাহলে কিশোর, বয়সীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও এবাদতের দিকে আকৃষ্ট হবে সহজেই। গণমাধ্যমে অর্থসহ পবিত্র কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াত এবং নামাজের হৃদয়-স্পর্শী জিকিরগুলোর প্রচার শিশু-কিশোর বা তরুণ-তরুণীদের ও যুবক-যুবতীদের মধ্যে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে পারে।

শিশু-কিশোররা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়, তখন তাদের মধ্যে ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। এ সময় তাদের জানার আকাঙ্ক্ষাও প্রবল থাকে। তাই এ সময় মানসিক প্রশান্তি এবং অসীম রহমত ও শক্তির উৎসের সাথে তাদের সংযোগ স্থাপন খুবই জরুরী। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যৌবনে উপনীত হবার পর শিশু-কিশোরদের মধ্যে ধর্ম বিষয়ে জাগরণ দেখা দেয়। এমনকি যারা অতীতে ধর্মের প্রতি আগ্রহী থাকে না, তারাও যৌবনে উপনীত হবার পর ধর্ম বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠে। এই যে পরিবর্তন, তা তাদের ব্যক্তিত্বের বিকাশেরই অংশ। ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সে তরুণ ও যুবকরা ধর্মের আহ্বান অথবা বীরত্বের চেতনায় প্রভাবিত হয়। তারা এ সময় নতুন করে এমন এক বিশ্ব গড়ে তুলতে চায় যেখানে থাকবে না কোনো অন্যায়, অন্ধকার বা অজ্ঞতা, বরং থাকবে পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার।
ধর্মীয় অনুভূতি আত্মিক প্রশান্তি ও তৃপ্তির সাথে সম্পৃক্ত। কিশোর বা তরুণরা প্রকৃতিগতভাবেই এ ধরনের অনুভূতির জন্য তৃষ্ণার্ত। ধর্মীয় আনন্দের সাথে বস্তুগত আনন্দের পার্থক্য হল, বস্তুগত আনন্দ লাভের পর সে বিষয়ে আর মানুষের আগ্রহ থাকে না, কিন্তু মানুষের আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় আনন্দ এমনই যে তার চাহিদা দিনকে দিন বাড়তেই থাকে।
বিশ্ব রসায়ন অলম্পিয়াড প্রতিযোগিতায় মেডেল অর্জনকারী প্রতিভাবান ইরানী যুবক জনাব সাবেরী নামাজের আনন্দ সম্পর্কে তার অনুভূতি তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, মহাকৌশলী ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আমাকে অর্থহীনতার দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছে, যে অর্থহীনতায় বন্দী বর্তমান বিশ্বের অনেক যুবক। আমি যখন নামাজ আদায়ে মশগুল হই তখন যেন এমন একটি শক্তি-কেন্দ্র থেকে শক্তি পেতে থাকি, যার সাথে আমি সংযুক্ত এবং তখন আমি বিশেষ ধরনের আনন্দ পেতে থাকি। আল্লাহর প্রেম ও তাঁর কাছে প্রার্থনার আনন্দকে অন্য কোনো কিছুর সাথেই তুলনা করা যায় না। আমি খুব ভালোভাবেই এটা উপলব্ধি করছি যে, প্রার্থনার সময় একজন যুবকের চোখ থেকে যে পবিত্র অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, তা তার অন্তরকে আলোকিত করে এবং তার অন্তর দয়া ও ভালবাসায় টইটুম্বর হয়। একজন যুবকের জন্য এটা অনেক বড় অর্জন।
এভাবে নামাজ যুবক-যুবতীদের জীবনে ধ্রুবতারার মত আলোর স্থায়ী উৎসে পরিণত হতে পারে এবং তাদের জীবনে ঘটাতে পারে মহাবিপ্লব। ইউরোপীয় নওমসুলিম সাবেক ম্যারী বা বর্তমান ফাতেমা মনে করেন, পবিত্র কোরআনের বাণীগুলো মানুষের জীবন সম্পর্কে নতুন অর্থ তুলে ধরেছে, যার সাথে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না। নামাজ সম্পর্কে নিজের আনন্দের অনুভতি তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ” দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও পড়াশুনার পর শেষ পর্যন্ত উজ্জ্বল এক বিন্দুতে উপনীত হলাম। আমার মুসলমান বন্ধুদের উৎসব অনুষ্ঠানের সেই রাতে আমি তাদের আধ্যাত্মিকতা ও পবিত্রতার সমাহারে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। পবিত্র কোরআনের হৃদয়গ্রাহী বাণীর সুমধুর শব্দ, আযানের সূর এবং নামাজীদের কাতারে তাদের মধ্যে ঐক্য বা সমন্বয়ের দৃশ্য আমাকে বদলে দিল। আমি যেন এক নতুন জগতে প্রবেশ করলাম। আমার সমস্ত অস্তিত্ব ভরে উঠলো মিষ্টি অনুভূতিতে। প্রকৃত সৌন্দর্য্যরাশির এক দিগন্ত বা জানালা আমার সামনে খুলে গেল। সে সময়ই আমি আমার অন্তরের আহ্বানে স্বাধীনভাবে সাড়া দিলাম, বিমুগ্ধ ও স্তম্ভিত হয়ে নিজেকে নামাজীদের সারিতে খুঁজে পেলাম। যদিও আমি জানতাম না নামাজে কি বলতে হবে, কিন্তু আমার আত্মা যেন খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়া পাখীর মত এক বেহেশতী পরিবেশে পাখা ও পালক মেলে ধরলো। “Â
১৮তম পর্ব

প্রার্থনা ও মুনাজাতের বিশাল উদ্যানে এসো আমাদের সাথে
যেসব উদ্যানে বয়ে যায় বেহেশতী হাওয়া,
যে হাওয়া সুরভিত ঈমানের সুবাসে।
আমাদের সাথে চল দোয়া ও নামাজের জলসায়
দু-রাকাত প্রেমময় নামাজ পড়বো সেথায়
শুভ্র পিটিউনিয়া ফুল তুলে দু-হাত ভরে তোলো খোদার রহমতের নূরে।

ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে রয়েছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম রেজা (আঃ)’র পবিত্র মাজার। এই মাজারের সাথেই রয়েছে গওহরশাদ মসজিদ নামের এক বিখ্যাত মসজিদ। ইতিহাসে এসেছে, এই মসজিদে ছিল আহমদ নামের এক কর্মী বা খাদেম। একদিন সে যখন কাজে মশগুল, তখন এই মসজিদ নির্মাণের খরচ বহনকারী গওহরশাদ খাতুন নামের এক পূণ্যাত্মা মহিলা মসজিদের কাজের অগ্রগতি দেখার জন্য সেখানে আসেন। এক মুহূর্তের জন্য গওহরশাদ খাতুনের চেহারা থেকে নেক্বাব বা চাদর সরে গেলে তার সুন্দর চেহারার ওপর আহমদের দৃষ্টি পড়ে । ফলে আহমদের হৃদয়ে জন্ম নেয় গওহরশাদ খাতুনের প্রতি প্রবল অনুরাগ। দিনকে দিন এই অনুরাগ গভীরতর হতে থাকে এবং এই আকর্ষণ তাকে অসুস্থ ও শয্যাশায়ী করে ফেলে। আহমদের মা ছেলের এ অবস্থার কারণ জানার পর গওহরশাদ খাতুনের শরণাপন্ন হলেন, যদিও আহমদের মা জানতেন এ ধরনের শিশুসুলভ আকাঙ্ক্ষা অবাস্তব স্বপ্ন মাত্র । গওহরশাদ সব ঘটনা শুনে বললেন, তোমার ছেলেকে বল, সে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণ করবো, তবে শর্ত হ’ল, তাকে ৪০ দিন ধরে মসজিদের মেহরাবে নামাজ ও এবাদতে মশগুল হতে হবে এবং এসব এবাদতের সওয়াব আমাকে মোহরানা হিসেবে দিতে হবে।
আহমদের মা গওহরশাদ খাতুনের এই প্রস্তাবের কথা আহমদকে জানালেন। আহমদ গওহরশাদ খাতুনের প্রস্তাব শুনে শয্যা থেকে উঠে পবিত্র কোরআন নিয়ে মসজিদের মেহরাবে নামাজে মশগুল হল। সে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নামাজ আদায় করতে লাগলো এবং খোদার প্রেমে তার চোখ দুটি থেকে প্রবাহিত হত অশ্রু। এভাবে নিদ্রাহীন অবস্থায় আহমদ শক্তিহীন বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে এবাদতের আনন্দ তার মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে উঠলো এবং তার কাছে মনে হলো এবাদতের মত আনন্দদায়ক আর কিছু নেই। এভাবে ৩৯ দিন কেটে গেল এবং ৪০ তম দিনে গওহরশাদ খাতুনের দূত আহমদের শর্ত পূরণের খবর নিতে এল। সে আহমদকে জিজ্ঞেস করলো:
তুমি কি গওহরশাদ খাতুনের দেয়া শর্ত পূরণ করেছ?
বদলে-যাওয়া আহমদ বললো: ঐ মহিলাকে বলবেন, তাকে পাবার জন্য আমি আমার প্রকৃত প্রেমাস্পদ ও প্রিয়তমকে হাতছাড়া করতে প্রস্তুত নই। গওহরশাদের প্রতি ভালবাসা ছিল অপ্রকৃত ভালবাসা। আমি এর চেয়েও উচ্চতর বাস্তবতার সন্ধান পেয়েছি।

এভাবে গওহরশাদ খাতুন আহমদ নামের ঐ যুবকের অন্তরের চোখ খুলে দিতে ও তাকে প্রকৃত প্রেমাস্পদের দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম হয় যাতে খোদার প্রেমের স্বাদ আস্বাদন করে সে বস্তুগত ও পার্থিব আনন্দকে বর্জন করে।
আসলে এবাদতের আনন্দ ও মাধুর্য্য তুলনাহীন। ওলি-আওলিয়া বা আল্লাহর প্রিয় বান্দাগন এবাদতের আনন্দ ও মাধুর্য্য আস্বাদনের সুযোগ দিতে দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, সমস্ত সৃষ্টি ও অস্তিত্ব মহান আল্লাহর তাসবীহ বা প্রশংসা করে। সূরা নূরের ৪১ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কি দেখ না আকাশ ও ভূ-মন্ডলের সব কিছুই আল্লাহর প্রশংসা করছে এবং উড্ডীয়মান পাখীরাও আল্লাহর প্রশংসা করছে? তাদের প্রত্যেকেই আল্লাহর প্রশংসা, পবিত্রতা বা মহিমা ঘোষণা ও নামাজের পদ্ধতি জানে এবং ওরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত।’

মানুষের সীমিত দৃষ্টি অন্য জীবের এবাদত ও বন্দেগীকে উপলব্ধি করতে না পারলেও তারা এটা বোঝেন যে সর্বশক্তিমান এবং মহাকৌশলী আল্লাহ এবাদত ও প্রশংসার যোগ্য। মহান আল্লাহ দয়া, রহমত ও সৌন্দর্য্যের উৎস । তাই মহান আল্লাহর মহত্ত্বের ও শ্রেষ্ঠত্বের মোকাবেলায় সবারই বিনম্র এবং নতজানু থাকা উচিত। কারণ, পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আকাশ ও ভূ-মন্ডলে যা কিছু আছে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা বা প্রশংসা করে, কিন্তু মানুষ তাদের এইসব প্রশংসা বা তাসবীহ উপলব্ধি করতে পারে না। এই আয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হ’ল প্রত্যেক সৃষ্টি সর্বশক্তিমান আল্লাহর মোকাবেলায় বিনম্র এবং সব কিছুই আল্লাহর অসীম মহত্ত্বের সম্মুখে শ্রদ্ধায় মাথা নত করে। এরই আলোকে অনেকেই মনে করে বাতাসের শো শো শব্দ বা হাওয়ার গান, সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ বা নদীর ঢেউয়ের ছলাৎ-ছল ধনি, বুলবুলি বা অন্য পাখীদের কলতান এবং বৃষ্টির ছন্দময় পতনের ধ্বনি-এসবই আল্লাহর তাসবীহ বা প্রশংসা মাত্র। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)’র দৃষ্টিতে সৃষ্টিকূল মহান আল্লাহর এইসব প্রশংসা বা খোদার তাসবীহ সচেতনভাবেই করে থাকে। তাঁর মতে প্রতিটি অস্তিত্ব মহান আল্লাহ সম্পর্কে সচেতন।

যাই হোক, নামাজ আল্লাহর সামনে বিনীত হবার সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম। পূর্ণতাকামী মানুষের জন্য নামাজ মহান আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, প্রেম বা অনুরাগ ও গভীর বিশ্বাসের প্রকাশ। নামাজের নূর ও আল্লাহর দাসত্বে উজ্জীবিত ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে আমিত্বের সব ধরনের প্রকাশ তথা অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত করেছেন। মানুষের মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র অহংকারও থেকে থাকে তাহলে তা তাকে খোদাদ্রোহীতার দিকে টেনে নেয়। নামাজী বা মুসল্লীরা রুকু ও সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগানে মশগুল হয়ে মূলত অন্যান্য সৃষ্টির তাসবিহ পাঠের কনসার্ট বা খোদাপ্রেমের সম্মিলিত সংগীতে যোগ দেন। খোদার গুণগান বা আল্লাহর প্রেমের আকুতিতে ভরা প্রশংসা মানুষের মনকে করে প্রশান্ত, আন্তরিক, পবিত্র, সুস্থির ও দৃঢ়-চিত্ত বা আত্মবিশ্বাসী। সমসাময়িক যুগের খ্যাতনামা ইসলাম-বিশেষজ্ঞ ও সুইস চিন্তাবিদ মার্শাল বাওয়াজার বলেছেন, “নামাজ আল্লাহর মহত্ত ও একত্বের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় এবং নামাজের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর দলে শামিল হবার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের আগ্রহ প্রকাশ করে। নামাজের মাধ্যমে এই যে পরিবর্তন এর স্থায়ী অবস্থা বা স্থায়ীত্ব মানুষকে পার্থিব বা বস্তুগত বিষয়ে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করে।”

১৯তম পর্বÂ “নামাজ : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়” শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তার আসর শুরু করছি সেই মহান আল্লাহর নাম নিয়ে, সমস্ত প্রশংসা ও গৌরব যাঁর প্রাপ্য, যিনি সমস্ত ক্ষমতা, পূর্ণতা ও সৌন্দর্য্যের উৎস, যাঁর বিরতিহীন বা অসীম প্রশংসাও তাঁর অসীম মহত্ত্ব এবং পরিচিতির তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত। একজন নওমুসলিম মহিলার স্মৃতি-কথা উদ্ধৃত করে শুরু করবো আজকের মূল আলোচনা।
” আমার খুব ইচ্ছে হত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পরিচিত মুসলিম বন্ধু ফাতেমার মত নামাজ পড়তে। আমি জানতাম না নামাজ কি? একদিন ফাতেমার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইলে সে বলল, “নামাজ তো পড়া হয়নি,আগে অবশ্যই এই নামাজ পড়তে হবে।” আমি অপেক্ষা করছিলাম, আর ফাতেমা গভীর মনোযোগ ও অনুরাগ নিয়ে নামাজ পড়তে লাগলো। তার মন এত একনিষ্ঠ যে আমি যেন তার কাছে একেবারেই অপরিচিত। সে প্রশান্ত চিত্তে ও বিনম্রভাবে নামাজের বাক্যগুলো উচ্চারণ করছিল। সে যখন সিজদায় যেতো ও সিজদা থেকে মাথা তুলতো, তখন তার চোখে এক ঔজ্জ্বল্য এবং চেহারায় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক ভাব ফুটে উঠতো। আমার মনে এ প্রশ্ন জাগলো যে, ও কার সাথে কথা বলছে যে তার মধ্যে এমন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে? যখন নামাজ আদায়রত ফাতেমার দিকে তাকাতাম, তখন নামাজের প্রতি একটা মিষ্টি টান অনুভব করতাম। ইচ্ছে হত ওর নামাজের দৃশ্য বার বার দেখি। এর পর থেকে নামাজ সম্পর্কে ফাতেমার কাছে একের পর এক প্রশ্ন করতাম। সেও খুব সাগ্রহে ও দয়াদ্রচিত্তে নামাজের রহস্য তুলে ধরতো। ফলে প্রার্থনা সম্পর্কে আমার আগ্রহ দুনির্বার হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে বিশ্ব সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। কিছুকাল ইসলাম সম্পর্কে গবেষণার পর ঐশী এ ধর্মে দীক্ষিত হয়ে ও নামাজ আদায় করে আমি আলোর জগতে প্রবেশ করি।”

গেলো সপ্তায় আমরা বলেছিলাম নামাজ মানুষের জন্য সব সময়ই জরুরী বিষয়। মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নামাজের চেয়ে জোরালো অন্য কোনো মাধ্যম নেই। তাই ইসলামের মহান নবী (সাঃ)কে দেয়া আল্লাহর এ উপহারের গুরুত্ব আমাদের বোঝা উচিত। গবেষকদের মতে, নামাজ মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার এবং তাকে উন্নত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক স্তরে পৌঁছে দেয়ার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। নামাজের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণ হল, প্রথমতঃ এই এবাদত মানুষকে পাপ বর্জন করতে বলে।
দ্বিতীয়তঃ নামাজ মানুষের মধ্যে এবাদতের চেতনা জাগায়।
তৃতীয়তঃ নামাজ মানুষের মনে প্রশান্তি জোগায়।
নামাজ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, প্রার্থনা ও তাঁর দাসত্বের পরিপূর্ণ প্রকাশ। এই এবাদত মানুষকে বস্তুজগতের অন্ধকার, অজ্ঞতা ও সংকীর্ণতার কারাগার থেকে মুক্ত করে এবং মানুষের কূপ্রবৃত্তি ও আত্মম্ভরিতা বা ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ জন্যে ঐশী ধর্মগুলোতে নামাজ ধার্মিকতা ও ঈমানের প্রধান লক্ষণ হিসেবে স্বীকৃত এবং ইসলামে প্রচলিত নামাজ হচ্ছে নামাজের পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ রূপ।

অনেকে নামাজের বাহ্যিক দিককে বেশী গুরুত্ব দেন। তাই তারা নামাজের রাকাতের সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে বেশী আগ্রহী। কিন্তু ঈমান ও আমলের সাথে জ্ঞান বা প্রজ্ঞার সংযোগ থাকা বেশী জরুরী। ইসহাক বিন আম্মার হযরত ইমাম সাদেক্ব (আঃ)কে বলেছিলেন, আমার এক প্রতিবেশী অনেক নামাজ আদায় করেন, বিপুল পরিমাণ সদকা দেন, বহুবার হজ্বে গেছেন এবং তার মধ্যে কোনো দোষ দেখি নি। তখন ইমাম প্রশ্ন করলেন, তার বুদ্ধি বা জ্ঞান কি রকম? জবাবে ইসহাক বললেন, তার বুদ্ধিতে ঘাটতি আছে। ইমাম বললেন, তাহলে সে সফল হবে না।

চিন্তাশীলতার মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিশীল অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারে। সফল মানুষেরা কথা কম বলে বা বেশীরভাগ সময় নীরব থেকে আধ্যাত্মিক সম্পদ অন্বেষণ করতেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, চিন্তাসহকারে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা সারা রাত জেগে (চিন্তাহীন) এবাদত-বন্দেগী করার চেয়ে উত্তম। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (অঃ) বলেছেন, জ্ঞান ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা বা ইয়াক্বীন নিয়ে ঘুমানো অজ্ঞতা এবং সন্দেহ নিয়ে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।
তাই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও ওলী-আওলিয়াগণের দৃষ্টিতে চিন্তাযুক্ত তথা জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ এবাদতই গ্রহণযোগ্য হয়। একজন বিজ্ঞ মুসলিম আলেম তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, “হে আমার সন্তান! চিন্তাশীলতা মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির সবচেয়ে বড় মাধ্যম। চিন্তাশীলতা মানুষের কূপ্রবৃত্তি নির্মূলে ও চিরন্তন আবাসের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্ণনায় এসেছে, মহান আল্লাহর ক্ষমতা ও মহত্ত্ব সম্পর্কে চিন্তাভাবনা সবচেয়ে বড় এবাদত। এবাদতের চেয়েও চিন্তাশীলতা যে গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কে বলা হয়েছে, চিন্তাশীলতা মানুসেকে মহিমাময় খোদার কাছে পৌঁছে দেয়, আর এবাদত তার জন্য এনে দেয় খোদায়ী পুরস্কার। তাই তুমি যেন চিন্তাশীলতাকেই বেশী গুরুত্ব দাও।”

সচেতনভাবে ও চিন্তা-ভাবনার মধ্য দিয়ে নামাজ পড়ার সুফল হল, এর ফলে নামাজ হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক বা প্রেমময়। এ অবস্থায় নামাজে উচ্চারিত বাক্যগুলোর অর্থের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে এবং খোদাপ্রেমের আনন্দ-অনুভূতিতে নামাজীর মন ভরে থাকে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, যারা এবাদতে অনুরক্ত এবং এবাদতকে মনে প্রাণে ভালোবাসে তারা তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এ ধরনের মানুষ এবাদত সম্পন্ন করার সময় পৃথিবীর সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। এ ধরনের মানুষ পার্থিব জীবনে আরামে আছে না কষ্টে আছে সে দিকে কোনো লক্ষ্য রাখে না।

নামাজ আদায়ের মাধ্যমে নামাজী মহান আল্লাহর সাথে যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন ও খোদায়ী অনুগ্রহ লাভ করেন তার সুবাদে নামাজীর মধ্যে সুপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তিগুলো বিকশিত হয়। এর ফলে সৎকর্ম ও মানুষের জন্য কল্যাণকরা কাজ করার ব্যাপারে তার ইচ্ছে দৃঢ়তর হয়।
নামাজী আল্লাহ সম্পর্কে যত বেশী জানেন ততই সে বিনম্র ও বিনীতভাবে নামাজ আদায় করেন। পবিত্র কোরআনের সূরা মুমিনুনের প্রথম দুই আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিশ্বাসীরা অবশ্যই সফলকাম হয়েছে যারা তাদের নামাজে বিনম্র।
ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ” মানুষ সব সময়ই বিভিন্ন ধরনের ভুলের ফাঁদে রয়েছে। ছোট, বড়, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও যুবক-যুবতী নির্বিশেষ সব ধরনের মানুষই নানা ভুল করেন এবং তারা বিভিন্ন ধরনের পাপাচারের শিকার হন। এ অবস্থায় মানুষ যদি জীবনের মহাযাত্রায় সফল হতে চায় তাহলে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে সে তার ভুল-ত্রুটি ও পাপগুলোর ক্ষতিপূরণ করতে পারে। কারণ, মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, তোমরা দিবসের দুই অংশে এবং রাতের প্রথম দিকে নামাজ আদায় কর। কারণ, সৎ কাজ অসৎ কাজগুলোকে বিলীন করে দেয়। ”
তাই আমাদের উচিত প্রফুল্ল-চিত্তে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করা। আমরা যদি নামাজের গুরুত্ব এবং নামাজে পঠিত বাক্য ও শব্দগুলোর অর্থ ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি তাহলে আমরা দেখবো যে নামাজ কত আনন্দময় ও মধুর ব্যাপার। আর তখনই “নামাজের দিকে ছুটে আস” বা “হাইয়া আলাস সালাহ” নামক বেহেশতী আহ্বান মধুর চেয়েও মিষ্টি মনে হবে এবং আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব মহান আল্লাহর দরবারে প্রেম ও প্রার্থনা বা আত্ম-নিবেদনের জন্য প্রস্তুত হবে।
 ২০তম পর্ব

Â

জাওয়াদ চেনারী তার লেখা “অবশ’রে রহমত” বা “রহমতের জলপ্রপাত” শীর্ষক বইয়ে নামাজ সম্পর্কে ত্রিশটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এইসব প্রবন্ধের মধ্যে একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ” মানুষ বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও অশান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ফলে তারা মানসিক প্রশান্তির জন্য ব্যাকুল। মানুষ কষ্ট করে অথবা তেমন কষ্ট স্বীকার বা পরিশ্রম না করেই হয়তো তার বস্তুগত চাহিদাগুলো মেটাতে পারে। কিন্তু যখনই সে আত্মিক বা আধ্যাত্মিক চাহিদাগুলো পূরণের কথা ভাবে তখন সে নিজেকে রিক্ত-হস্ত দেখতে পায়। এ অবস্থায় কর্তব্য ও করণীয় বিষয়ে দিশাহারা মানুষের মনের মধ্যে বইতে থাকে অতৃপ্তি ও অশান্তির ঝড়। ফলে শেষ পর্যন্ত সে নিজের অজান্তেই এমন এক মহাশক্তি বা অতি-উন্নত সত্তার সন্ধান করতে থাকে যাঁর ছায়াতলে তার আত্মা পাবে প্রশান্তি। মানুষ এ বিশ্ব চরাচরে এমন এক শান্তির নীড় বা ছায়াতল খুঁজছে যেখানে তার আত্মা নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের হাত থেকে নিরাপদ থাকবে এবং হুমকির প্রবল ঝড়-ঝাপটাগুলো তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।”

এরপর জনাব জাওয়াদ চেনারী উপসংহারে লিখেছেন, “এ অবস্থায় মানুষ নিজেকে বস্তুগত শক্তির উর্ধ্বের নৈর্ব্যক্তিক ও অনির্বচনীয় শক্তির মুখাপেক্ষী বলে মনে করে, ফলে স্রস্টা বা আল্লাহর স্মরণ তার অন্তরে জোগায় প্রশান্তি এবং আল্লাহর স্মরণে ভরপূর নামাজ হয়ে উঠে তার জন্য অমূল্য সম্পদ। নামাজ কেবল আল্লাহর স্মরণ নয়, একইসাথে তা আল্লাহর সাথে কথোপকথন। আর বার বার মহান আল্লাহর সাথে কথা বলার মাধ্যমে তাঁর সাথে মানুষের সম্পর্ক হয় সুদৃঢ় ও স্থায়ী। ”
মানুষের সামাজিক জীবন তার প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তাই মানুষ একঘরে হয়ে জীবন-যাপন করতে পারে না। মানুষের সামাজিক জীবন ও অন্যদের সাথে সম্পর্ক বিভিন্নভাবে তার ওপর প্রভাব ফেলে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সঙ্গী বা সাহচর্যের পরিণাম সম্পর্কে মানব-জাতিকে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেছেন, “খারাপ সঙ্গীর চেয়ে একাকীত্ব উত্তম এবং ভালো বা সৎ সঙ্গী একাকীত্বের চেয়ে উত্তম।”

সামাজিক-জীবনে যেমন কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলা ও রীতি মনে চলতে হয়, তেমনি প্রত্যেক কাজেরই কিছু রীতি ও নিয়ম মেনে চলা সাফল্য অর্জনের জন্য জরুরী। ধর্ম মানুষকে এই দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলে। নামাজও এ ধরনের নিয়ম ও রীতির ব্যতিক্রম নয়। নামাজের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা ও এর আধ্যাত্মিক সাজ-সজ্জায় সজ্জিত হবার জন্য এর নিয়ম-শৃঙ্খলা, বিভিন্ন সূক্ষ্ম দিক ও রীতিগুলো খুব ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করা জরুরী। আর এর ওপরই নির্ভর করছে মানুষের পূর্ণতা। আর এ সব বিষয়ে উদাসীনতা ও অজ্ঞতা মানুষকে পশ্চাদপদ করে রাখে এবং তাকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে।

নামাজের নিয়ম-রীতি তথা আদব-কায়দা ও প্রথা দু-ধরনের। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ। নামাজের বাহ্যিক দিকের নিয়ম-রীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে ওজু করা, নামাজের সময় হবার পর প্রথম দিকেই নামাজ আদায় করা, পবিত্র পোশাক পরা প্রভৃতির কথা বলা যায়। নামাজের নিয়ম-রীতি তথা আদব-কায়দার এসব বাহ্যিক দিক মানুষের জীবনে নানা কল্যাণ বয়ে আনে। যেমন, ওজু-করা, সুগন্ধী মাখা, শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদ সুসজ্জিত এবং পবিত্র রাখা- এসব বিষয় মানুষকে স্বাস্থ্য-সম্মত ও পবিত্র জীবন যাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। “নামাজের ওয়াক্ত বা সময়” মানুষের কাছে সময়ের গুরুত্ব ও নিখুঁত বা সুপরিকল্পিত জীবন যাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে। কিন্তু নামাজের নিয়ম-রীতি তথা আদব-কায়দার বাহ্যিক দিকের চেয়ে অভ্যন্তরীন দিক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। নামাজের এসব নিয়ম-রীতি তথা আদব-কায়দার ওপরই নির্ভর করে নামাজের প্রকৃত ঔজ্জ্বল্য এবং আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা বা নৈকট্যের সম্পর্ক। নামাজের অভ্যন্তরীণ মান অনেকাংশে নির্ভর করে মহান আল্লাহর মোকাবেলায় নামাজীর বিনয় ও নম্রতার গভীরতার ওপর। আর এই বিনয় ও নম্রতা হাসিলের জন্য নামাজের নিয়ম-রীতি তথা আদব-কায়দার অভ্যন্তরীণ দিক সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ও সচেতনতা থাকা জরুরী। নামাজের এই অভ্যন্তরীণ জগতের পথ-পরিক্রমা মুসল্লীর মন থেকে সব ধরনের পদস্খলন ও দূর্নীতির চিন্তা নির্মূল করে। আর এ জন্যই মহান আলেম এবং ওলি-আওলিয়াগণ নামাজের অভ্যন্তরীণ নিয়ম-রীতি তথা আদব-কায়দা মেনে চলার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। মরহুম ইমাম খোমেনী (রহঃ)’র দৃষ্টিতে মহান আল্লাহর মহত্ত্বের সামনে নিজেকে তুচ্ছ দাস মনে করা নামাজের একটি সুপ্ত বা আত্মিক দিক এবং এই চেতনা মহান আল্লাহর মোকাবেলায় দাসের অবস্থান নির্ধারণ করে। অসীম ক্ষমতার মহাউৎস মহান আল্লাহর সামনে নামাজীর উচিত নিজেকে খুবই দূর্বল ও ছোট মনে করা, আর এভাবেই তার আমিত্বের পর্দা ছিন্ন হবে এবং এই চেতনা তাকে উর্ধ্ব জগতে উন্নীত করবে।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)’র মতে, প্রশান্ত চিত্তে নামাজ আদায় করা উচিত। মানুষ যদি উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মধ্যে এবং তাড়াহুড়া করে নামাজ আদায় করে তাহলে নামাজে একাগ্রতা ও অভিনিবেশ ক্ষুন্ন হয়। আর মনোযোগের ব্যাঘাতের ফলে নামাজে পঠিত বাক্যগুলো শব্দ ও শ্রুতির উর্ধ্বে উঠে না, ফলে সেগুলো নামাজীর অন্তরে কোনো প্রভাব ফেলে না।
শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক যাতনার সময় নামাজ আদায় না করে প্রফুল্লতার সময় নামাজ আদায় করা উচিত। মানসিক চাপের সময় নামাজ আদায় করা হলে ফলে নামাজের প্রতি এক ধরনের ভয় বা অস্বস্তি সৃষ্টি হতে পারে। এবাদতের নামে নিজের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়া বা অসহনীয় কিছু করা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র দেয়া শিক্ষার পরিপন্থী।
নামাজে বিনম্রতা ও একাগ্রতা থাকলে সেই নামাজই কেবল মানুষকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে। নামাজের মধ্যে একাগ্রতা বা হৃদয় ও মন নামাজে একাকার করে দেয়া বলতে নামাজে পঠিত বাক্যগুলোর অর্থ উপলব্ধিসহ নামাজ আদায় করাকে বোঝায়। হযরত ইমাম সাদেক্ব (আঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “যখন কেবলামুখি হয়ে নামাজে দাঁড়াবে, তখন পৃথিবীতে মানুষসহ যা কিছু আছে তার সব কিছুই ভুলে যাবে এবং স্মরণ করবে যে তুমি মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়েছ। কিয়ামতের দিন বা বিচার-দিবসে তোমরা পৃথিবীতে যা করেছিলে তা প্রকাশ্যে দেখতে পাবে।”
বর্তমান যুগে মানুষ বহু সমস্যায় আক্রান্ত বলে তাদের মন প্রশান্ত বা স্থির নয়। তাই একাগ্রচিত্তে ও প্রশান্ত মনে নামাজ পড়া এ যুগের মানুষের জন্য সহজ নয়। কিন্তু মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)’র মতে মানুষ জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের সহায়তায় তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। তবে এ জন্য শর্ত হল, জ্ঞান অর্জন এবং দয়াময় আল্লাহ সম্পর্কে জানা ও খোদায়ী বাস্তবতাগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা চালানো।
মানুষের উচিত মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনার হাত তুলে ধরা এবং নিজের আমিত্ব, আত্মকেন্দ্রীকতা ও স্বার্থপরতাকে মোকাবেলা করা। আর এ অবস্থায় নামাজ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে এবং মানুষ সৌভাগ্য ও মুক্তির পথে এগিয়ে

Share

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here