ঐশী আতিথ্যের মাস-রমজান

0
377

৬ষ্ঠ পর্ব

ghorani negar (5)

রহমতের মাস রমযান। এই মাস তাই সবার কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাই চায় কীভাবে এ মাস থেকে বেশি বেশি ফায়দা হাসিল করা যায়। সবাই আন্তরিকভাবে কামনা করে নিজেকে সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে পবিত্র একটি জীবন শুরু করতে। কিন্তু শত চাওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় তা হয়ে ওঠে না। ওঠেনা কেননা, রহমত লাভের পথ সে নিজেই হয়তো রুদ্ধ করে রেখেছে। হয়তো জানেও না কেন রুদ্ধ হয়ে গেল। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলবো ইনশাআল্লাহ।

মানুষ সাধারণত ভুল করে থাকে। ভুলের উর্ধ্বে নয় মানুষ। তবে এই ভুল করার মাধ্যম বিচিত্র। অনেক সময় মানুষ হয়তো জানেও না যে সে ভুল করছে। যেমন আমরা অনেক সময় হাসতে হাসতে অপরের প্রসঙ্গে কথা বলি,কূশল জিজ্ঞাসা করি। খারাপ কথা নয়,ভালো কথাই। কিন্তু বলতে বলতে দেখা যায় এমন এক প্রসঙ্গ চলে আসলো,যা নিয়ে কথা বলাটা গীবত বা পরনিন্দার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়। যা কিনা মারাত্মক একটি গুনাহের কাজ। এই গুনাহের চিন্তাটাও মাথায় আসে না,অথচ আমরা দিব্যি পরনিন্দা করে যাই। পরনিন্দার সূচনাটা হয়তো অন্যভাবে শুরু হয়েছে। সেজন্যে এটাকে আর গীবত বলে মনেই হয় নি। এরকমটা যদি হয়েই থাকে তাহলে সে রহমত প্রাপ্তির পথে বাধার সৃষ্টি করবে।

পরনিন্দা খুবই বাজে একটি প্রবণতা। যারা সঙ্কীর্ণমনা,অপরের ভালো যাদের সহ্য হয় না,যারা হিংসুক কিংবা যারা অপরের মুখোমুখি হবার সাহস রাখে না তারাই মূলত পরনিন্দুক হয়ে থাকে। ইসলামকে ভালোভাবে বা যথার্থভাবে চর্চা না করার কারণেই এইসব মৌলিক মানবীয় দুর্বলতাগুলো মানুষের মাঝে বাসা বাঁধে। কেননা ইসলাম তার অনুসারীদের জন্যে চমৎকার একটি জীবন বিধান দিয়েছে। দিয়েছে একটি সুন্দর আচরণ-বিধিও। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় তার একটি ভারসাম্যমূলক নীতি ইসলাম দিয়ে দিয়েছে। তা যদি আমরা যথার্থভাবে অনুসরণ করি তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকে না। মানবীয় যে অসৎ গুণাবলীর কথা বললাম সেগুলো যদি আমরা চর্চা করি তাহলে আমাদের পুণ্যকর্মগুলোও কোনোরকম সার্থকতা খুঁজে পাবে না। রমযান মাসেও এসব প্রবণতা আমাদের রহমত অর্জনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

পরনিন্দা চর্চার এক পর্যায়ে মানুষ মিথ্যা কলঙ্ক বা অপবাদ রটাতে শুরু করে। এমন কোনো কথা নেই যে পৃথিবীতে সকল মানুষই সবাইকে পছন্দ করবে। একজন আরেকজনকে পছন্দ না-ও করতে পারে। ভালো না লাগা থেকেই তা হয়। অবশ্য ভালো না লাগার কারণ তো একটা থাকেই। তো কেউ যখন কাউকে পছন্দ না করে,তখন তার কোনো কিছুই ভালো লাগে না। এককথায় তাকে চোখের সামনে না দেখলেই তার ভালো লাগে। কিন্তু এ ধরণের মানুষ যখন চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় তখন চলন বাঁকা বলে মনে হয়। এটা এক ধরণের মানসিক সমস্যা। এই সমস্যা থেকেই ছিদ্রান্বেষী চিন্তার উদ্ভব ঘটে। ছিদ্র অন্বেষণ করে কিছু পাওয়া না গেলেই মিথ্যা অপবাদ রটানোর পালা শুরু হয়ে যায়। এরফলে দেখা দেয় সন্দেহ প্রবণতা, অবিশ্বাস এবং আস্থাহীনতা।

ঈমানের দুর্বলতা থেকেই নীচু মানের এইসব আচরণ বা প্রবণতার সৃষ্টি হয়। সাধারণত যারা নিজেদের বা অন্যদের মান-সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখে না,তারাই এইসব দুর্বলতায় ভোগে। প্রকৃত ঈমানদার মানুষ এগুলো চর্চা করবে না। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপারটি হলো দুর্বল চিত্তের এইসব ব্যক্তিরা তাদের ভুল স্বীকার করে না কখনোই। যারফলে তাদের মনের বা চিন্তার এই ত্রুটিগুলো থেকেই যায় এবং আল্লাহর সমূহ রহমত থেকে তারা বঞ্চিত হয়। এইসব প্রবণতা দূর করার জন্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো প্রথমেই এই অসৎ গুণাবলীর কুফল সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। নিজের ভেতরে যে তার অস্তিত্ব রয়েছে তা মেনে নিতে হবে। আর অবাঞ্চিত বদঅভ্যাসের মূলোৎপাটন করার মধ্যে সফলতার যে আনন্দানুভূতি রয়েছে,মানসিক প্রশান্তির যে সূক্ষ্ম উপাদান ও প্রফুল্লতা রয়েছে,তা দিয়েই কু-প্ররোচনা বা কু-মন্ত্রণা প্রদানকারী অনুভূতিগুলোর ওপর বিজয় লাভ করা যাবে।

পবিত্র কোরআনে অপবাদ রটানোর বাস্তবতাকে ছোট্ট অথচ খুবই তীক্ষ্ণ একটি আয়াত দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। আয়াতটির বঙ্গানুবাদ দাঁড়াবে এ রকমঃ “তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? কিন্তু এটা তোমরা ঘৃণা করবে।” গীবত করাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো জঘন্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন। এটা নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘনকারী একটি অপকর্ম। ইসলাম সবসময়ই এ ধরণের অপরাধকে নিন্দনীয় বলে গণ্য করেছে। না কেবল গণ্য করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং প্রতিটি মুসলমানের জন্যে মিথ্যা অপবাদের দায়ে আক্রান্ত ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে বলেছে। নাহজুল ফাসাহায় বলা হয়েছে “তোমার উপস্থিতিতে যদি কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটানো হয় তাহলে তুমি অপবাদগ্রস্ত লোকটির সাহায্যকারী হও এবং অপবাদ রটনাকারীকে ঘৃণা করো,আর ঐ দলটিকে পরিত্যাগ করো।”
বিশেষ করে রমযান মাসে কারো বিরুদ্ধে অপবাদ রটানো বা কারো গীবত করা আত্মবিধ্বংসী একটি মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য। অপবাদ রটানো একটা শয়তানী প্রবণতা। শয়তান যেহেতু এ মাসে দুর্বল হয়ে পড়ে সেহেতু এ মাসে গীবত করার মানে হলো ঐ গীবতকারী শয়তানের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নবী কারিম ( সা ) তাই বলেছেন,”যে ব্যক্তি রমযান মাসে কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবে,সে তার রোযার জন্যে আল্লাহর কাছ থেকে কোনো পুরস্কার পাবে না।” অপর একটি হাদিসে বলা হয়েছে “মুসলমান হলো ঐ ব্যক্তি যার হাত এবং মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।” আল্লাহ আমাদেরকে কথা বলার সময় সংযত হবার সৌভাগ্য দান করুন। আমাদের বাহ্যিক হাত আর লেখার হাত দিয়ে অপরকে অপবাদদুষ্ট করা থেকে রক্ষা করুন।

সাধারণত সময় কাটানোর অবসর আড্ডাতেই এইসব বাজে প্রবণতা বেশি চর্চা হয়। রমযান মাসে তাই অযথা আড্ডাবাজিতে যোগ না দেওয়াই উত্তম। তবে হ্যাঁ,যদি সমবেত কোনো পুণ্যকাজের লক্ষ্যে একত্রিত হবার প্রসঙ্গ আসে,তাহলে ভিন্ন কথা। মোটকথা হলো, প্রথমত রমযান মাসে সময় অপচয় করা যাবে না। পরিকল্পিতভাবে সময়গুলোকে ইবাদাতের জন্যে সূচি বিন্যস্ত করতে হবে যাতে অলস সময়ের সুযোগে শয়তানী প্রবণতা চর্চার মওকা না মেলে। মনে রাখতে হবে পরনিন্দা হচ্ছে একটি আত্মিক ব্যাধি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকবে। রহমতপূর্ণ রমযানে আমাদেরকে যেন আল্লাহর নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হতে না হয়,সেদিকে খেয়াল রেখে অসৎ গুণাবলী চর্চা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তৌফিক দিন।

৭ম পর্ব

শুভাকাঙ্খী হওয়া একটা ভালো গুণ,সৎগুণ। কল্যাণকামিতা ইসলামের একটি অন্যতম শিক্ষা। এটা পরনিন্দার ঠিক বিপরীত। পরনিন্দা চর্চা যে রহমত প্রাপ্তির অন্তরায়, সে বিষয়ে গত আসরে আমরা খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। এ ব্যাপারে সামান্য সচেতনতাও যদি এসে থাকে আপনাদের মনে তাহলেই আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে। আজকের আসরে আমরা আরো কিছু অসৎ প্রবণতার কথা বলার চেষ্টা করবো,যেসব প্রবণতার মধ্যে রমযান মাসের অসামান্য রহমত থেকে আমাদের বঞ্চিত হবার শঙ্কা রয়েছে।
পরনিন্দার মতো আত্মঘাতী প্রবণতার পথ ধরে হিংসা এবং পরশ্রীকাতরতার অশুভ প্রবণতাটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অপরের সম্পর্কে জানার এক অদম্য কৌতূহল জেগে ওঠে মনের গভীরে। ছিদ্রান্বেষী হয়ে ওঠে মন। পেছনে লেগে থেকে থেকে কিংবা কাউকে পেছনে লাগিয়ে রেখে কোনো ত্রুটি খুঁজে পেলে তো যুদ্ধ জয় হয়েই গেল,কিন্তু যদি কিছুই খুঁজে পাওয়া না যায়-তবেই দাঁড়ায় মহাবিপদ। ভাবখানা এমন যেন ত্রুটি না থাকাটাই মস্ত বড়ো একটা ত্রুটি। এখন তাই ত্রুটি বানাতে হবে। মিষ্টির দোকানের গ্লাসে গুড় লাগানোর গল্পের মতো গল্প তৈরী করার কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে ছিদ্রান্বেষী দুষ্ট লোকটি। ছিদ্রান্বেষী মনের এই আগুন বড়ো সাংঘাতিক। এই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় জীবনের সকল অর্জিত সম্পদ। ছিদ্রান্বেষী মন নিজেকে যেমন জ্বালায় তেমনি জ্বালায় পরিপার্শ্বকেও। মনের ভেতরে ক্ষোভ,হিংসা, পরশ্রীকাতরতা জন্ম দেয় এই ছিদ্রান্বেষী প্রবণতা।
ইসলাম এই প্রবণতার প্রচণ্ড বিরোধী। ইসলাম অপরের দোষত্রুটি খুঁজে না বেড়িয়ে গুণগুলো দেখতে বলেছে। শুধু তাই নয় একমাত্র যুদ্ধ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করাকে ভীষণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আমাদের মানবীয় দুর্বলতার কারণে এসব জেনেও আমরা অনেক সময় না জানার মতো কাজ করে বসি-যা কেবল আল্লাহর রহমত প্রাপ্তিরই অন্তরায় নয়,বরং আল্লাহর রোষানলে পড়ার শামিল। মানুষ যে পরচর্চা করে,তার পেছনেও রয়েছে হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা। হিংসা হলো এক ধরণের আগুন,তুষের আগুন। মনের ভেতরে তুষের আগুনের মতো হিংসা জ্বলতে থাকে নিরবে নিভৃতে। কিছুতেই তা নিভতে চায় না। যে কারণে আগুন জ্বলে,সেই কারণটার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা নেভে না। কেন জ্বলে এই আগুন ?
হ্যাঁ! এটা এমনিতেই মনের একটা কু-প্রবণতা। পার্থিব জগতের শান-শওকত চিন্তা থেকে এবং পরকালীন চিন্তার অভাব থেকেই তার জন্ম হয়। মানুষ যদি ভাবতো এই পৃথিবীর কোনো কিছুই পরকালীন জীবনে কাজে আসবে না একমাত্র পুণ্যকাজগুলো ছাড়া,তাহলে আর অপরের ধন-সম্পদ দেখে কাতর হতো না। যেহেতু পরকালীন চিন্তা নেই সেহেতু অপরের ভালো,অপরের সুখ-শান্তি,অপরের বিত্ত-বৈভব দেখে সহ্য হয় না। কেবলই ভাবতে থাকে কীভাবে অপরের সেই সুখ-শান্তি নষ্ট করা যায়,কীভাবে তার বিত্ত-বৈভব ধ্বংস করে দেওয়া যায়। এই চিন্তাতেই তার দিন কাটে,রাত কাটে। ঘুম হয় না। হিংসুকের চোখ থেকে আল্লাহ ঘুম কেড়ে নেন। হিংসুকের মন থেকে আল্লাহ শান্তি কেড়ে নেন। হিংসুকের অন্তর থেকে শুভ বোধগুলো দূর হয়ে যায়। মুখ থেকে চলে যায় আস্বাদ-স্পৃহা,অরুচি কিংবা রুচিহীনতা দেখা দেয়। সম্পদ থাকতেও খাবার তৌফিক থাকে না। আর অশুভ চিন্তা, অন্যায় পরিকল্পনা মাথার ভেতর খেলতে থাকে সবসময়। মিথ্যাচার প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখন। যার পরিণতি হয় ভয়াবহ।

হিংসা মানুষের সকল সদগুণ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়, যেভাবে আগুন পুড়িয়ে ছাই করে দেয় আস্ত চেলাকাঠ। হিংসা যে কতো ভয়ঙ্কর একটি প্রবণতা তা বোঝা যাবে বাংলা একটি প্রবাদ থেকে। প্রবাদটি হলো “নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা।” একবার একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন তো,ঘটনাটা কী ভয়াবহ! নিজের লাভে নয় বরং অপরের ক্ষতি করার জন্যে নিজের জীবন দেওয়ার মতো ঘটনার কথাও শোনা যায়। কিন্তু কেন! কেন আমরা অপরের সুখে কষ্ট পাবো? কেন আমরা উদার হবো না ? ইসলাম তাই হিংসা বা পরশ্রীকাতরতাকে তীব্র ঘৃণার চোখে দেখে। মনের ভেতর হিংসা পুষে রেখে রমযান মাসে রোযা রাখলে তা কেবল উপোস করাই হবে,তা থেকে কোনোরকম রহমত প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হয় না। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেনঃ যারা আমার বান্দার নেয়ামত দেখে হিংসা করে তারা আমার বন্টন ব্যবস্থাকে অপছন্দ করছে।
কোরআনের এ আয়াত থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে,আল্লাহ যাকে যেরকম বিত্ত-বৈভব দিয়েছেন,তার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিরহস্য আমাদের পক্ষে বোঝা কোনোদিনই সম্ভব নয়। তিনি সমাজে ধনী-গরীব সৃষ্টি করেছেন। কাউকে শারীরিক পূর্ণতা দিয়েছেন কাউকে অপূর্ণতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এ সবের ওপর মানুষের কোনোরকম হাত নেই। একইভাবে আল্লাহ মানুষদেরকে পরস্পর নির্ভরশীল করে সৃষ্টি করেছেন। কাউকে যদিও বিত্তশালী করেছেন,দেখা যায় সে-ই আবার অন্য কোনো বিষয়ে অপরের ওপর নির্ভরশীল। বিত্ত-বৈভবগত এই শ্রেণীবিন্যাসের রহস্য আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের উচিত সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। এই বোধ যদি মনের গভীরে লালন করা যায় তাহলে মনের ভেতরকার হিংসা নামক অনন্ত আগুনের গোলাটি নিভে যাবে। প্রশান্ত হয়ে উঠবে মন। শান্তিতে ভরে উঠবে জীবন। তাই হিংসা নয়,আল্লাহর বণ্টন ব্যবস্থার ওপর সন্তুষ্ট থাকাই আমাদের কর্তব্য।

এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা উচিত,তাহলো আল্লাহ কিন্তু বলেন নি যে ধন-সম্পদের মালিক হওয়া যাবে না। মানুষ তার নিজের শ্রম দিয়ে পরিশ্রম দিয়ে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে পারে। বরং যারাই নিজের ভাগ্য গড়ার কাজে আত্মনিয়োজিত হবে,সচেষ্ট হবে আল্লাহ তাদের সাহায্য করবেন।তাই পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্পদশালী হবার মধ্যে কোনোরকম দোষ নেই,বাধানিষেধও নেই। মনে রাখতে হবে নানা কারণে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। বহু ধনী মানুষ নানা কারণে গরীব হয়ে পড়ে। আবার গরীব মানুষও চেষ্টার মাধ্যমে ধনসম্পদের মালিক হয়। তাই অপরের ধন-সম্পদ দেখে হিংসায় জ্বলেপুড়ে না মরে নিজের উন্নতির জন্যে চেষ্টা চালানোই সঙ্গত। তাতে আল্লাহও খুশি হন। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী পরিশ্রমী লোকের শ্রমটাও ইবাদাততূল্য।

যেখানে রমযান মাসের রোযা বিগত দিনের পাপগুলোকে মুছে ফেলে, সেখানে যদি হিংসা বা পরশ্রীকাতরতার মতো একটা অসৎ গুণ পাপের পরিবর্তে পুণ্যগুলোকেই নষ্ট করে দেয় তাহলে এর চেয়ে আর দুর্ভাগ্য কী হতে পারে! তাই মনটাকে কলুষমুক্ত করতে হবে। মনের ভেতর হিংসা-বিদ্বেষ পুষে রাখা ঠিক নয়। রমযানে তো নয়ই,রমযান মাসের বাইরেও এইসব নিকৃষ্ট বিষয়ের চর্চা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই রমযান হয়ে উঠবে আমাদের জন্যে রহমতের বসন্ত ঋতু। আল্লাহ আমাদেরকে এই ঋতু অর্থাৎ রমযানের ঐশী কল্যাণগুলো থেকে উপকৃত হবার তৌফিক দিন। সবশেষে সপ্তম রোযার দোয়া দিয়ে শেষ করবো আজকের আসর।

৮ম পর্ব

রমযানের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। রমযানের পবিত্রতা কীভাবে নষ্ট হয় ? হ্যাঁ! যেসব কাজ ইসলাম বিরোধী,সেসব কাজ করলেই রমযানের পবিত্রতা নষ্ট হবে। আজকাল ইসলাম বিরোধী কাজের সমন্বিত চর্চার অত্যাধুনিক মাধ্যম হলো স্যাটেলাইট এবং ইন্টারনেট। এ মাধ্যমগুলো শুভ কাজের জন্যে যেমন ব্যবহারযোগ্য,তেমনি অশুভ কাজের জন্যেও। যাদের ঘরে এগুলোর চর্চা হয় তারা খুব সহজেই বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারবেন। তাই এ বিষয়টি রমযানের রহমতের সুবাতাসকে যেমন প্রবাহিত করতে পারে তেমনি দূষিতও করে দিতে পারে। যদি দূষিতই করে তাহলে তা অবশ্যই ব্যাহত করবে রমযানের মূল উদ্দেশ্যকে। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে আজকের আসরে আমরা খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো।

স্যাটেলাইট এবং ইন্টারনেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অন্যতম একটি উপহার। পৃথিবীর দূরত্বকে একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে এই প্রযুক্তি। ঘরে বসেই আপনি সমগ্র পৃথিবীর খোঁজখবর পেতে পারেন। ইন্টারনেটে বা স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে যেমন ইসলাম চর্চার সুযোগ আছে তেমনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ শয়তানী চর্চারও মহাসুযোগ আছে। বিশেষ করে পশ্চিমা কিছু ওয়েব-সাইট এবং স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এমন কিছু অনুষ্ঠান প্রচার করছে যা আমাদের নীতি-নৈতিকতার স্খলন ঘটানোর জন্যে যথেষ্ট। উলঙ্গপনা,বেহায়াপনা,অবাধ যৌনতা চর্চার নির্লজ্জতা দেখানো হয় বেশ কিছু চ্যানেলে। যুবক যুবতীরা বিশেষ করে অবিবাহিতরা এইসব চ্যানেলের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়বে-এটাই স্বাভাবিক। একমাত্র ইসলাম চর্চার মধ্য দিয়েই চরিত্র নষ্ট করার মাধ্যম এইসব চ্যানেলকে বর্জন করা যেতে পারে। পশ্চিমারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবেই এইসব চ্যানেল চালু করেছে। ভাবতেও অবাক লাগে নগ্নতা চর্চা ছাড়া যেন অর্থ উপার্জনের আর কোনো উপায় নেই!

ঘরের ড্রয়িং রুমে রিমোর্টের বোতাম টিপলেই উপভোগ করা যায় বিকৃত মনোরঞ্জনের সমূহ আয়োজন। রমযান মাসে তাই রোযা ভঙ্গ হওয়াটা খুবই সহজ। যিনি রোযা রাখবেন,তাঁকে তাই অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। কেবল রমযান মাসেই নয়,রমযানের বাইরেও যাতে এইসব চর্চা না হয়,সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে মুসলমান আর অমুসলমানদের মাঝে ইবাদাত ছাড়াও নৈতিক চরিত্রের দিক থেকে বড়ো ধরণের পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা সমাজ যেসব সংস্কৃতি চর্চা হয়,সেগুলো মুসলমানদের জন্যে সর্বাংশে পরিহার্য। পশ্চিমা সমাজে নারীদের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ। সেই সমাজের তথাকথিত আধুনিকতা ইসলামের দৃষ্টিতে নগ্নতার পর্যায়ের পড়ে। পশ্চিমা সমাজে নারীরা হিজাবমুক্ত জীবন চর্চায় অভ্যস্ত,কিন্তু মুসলমানদেরকে হিজাবের মানদণ্ড মেনেই সকল কার্যক্রম চালাতে হয়।

এই যে পার্থক্যগুলো,এগুলো যদি আমরা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে না পারি,তাহলে কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতির অবাধ স্রোতে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিও ভেসে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদেরকে তাই সচেতন হতে হবে। আমাদের মুসলমানদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শ্রদ্ধা-সম্মান ও স্নেহের ভারসাম্যপূর্ণ যে সুন্দর একটি সম্পর্ক রয়েছে,সে সম্পর্কটি পাশ্চাত্য সমাজে নেই। সেজন্যেই পাশ্চাত্য সমাজে বলতে গেলে পারিবারিক সমাজ ব্যবস্থাটাই এখন নেই। তো যেখানে এই পারিবারিক কিংবা সামাজিক শৃঙ্খলাপূর্ণ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাপূর্ণ ব্যবস্থাই নেই সেখানে যে পাশবিকতা এসে স্থান জুড়ে নেবে-তাতে আর সন্দেহ কী! আর এই বিশৃঙ্খল সমাজের চিত্রগুলো স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। ছড়িয়ে পড়ছে পাশবিকতার অবাধ চর্চার চিত্র। তাই অভিভাবকদের রয়েছে এ ব্যাপারে অনেক বড়ো দায়িত্ব।

সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং তাদেরকে সঠিক সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা অভিভাবকদের প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোকে সচেতনভাবে এবং সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আজকাল মোবাইল ফোনও কিন্তু চারিত্রিক স্খলনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে তা রোধ করা যাবে ? আপনার সন্তানকে মোবাইল ব্যবহার করতে না দিয়ে? না তা মোটেও ঠিক হবে না। তাহলে কি তাকে নিম্নমানের মোবাইল সেট কিনে দেবেন? তা করলে সুকৌশল অবলম্বন করতে হবে। তা নাহলে আপনার প্রতি তার এক ধরণের অবিশ্বাস,অনাগ্রহ এবং বিরক্তিই বাড়বে। তারচেয়ে বরং ছোটোবেলা থেকেই আপনার সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করুন। তাকে ভালো-মন্দ,উচিত-অনুচিত,ইহকাল-পরকাল,বেহেশ্ত দোযখ ইত্যাদির ধারণা দিন। তাকে সুস্থ সংস্কৃতির প্রতি উদ্বুদ্ধ করুন। পশ্চিমা সংস্কৃতি যে খারাপ, যুক্তির মাধ্যমে তাকে তা বুঝিয়ে দিন। ইসলাম সম্পর্কে বুঝতে দিন।

সন্তানের মনে যখন ডিশ-কালচার সম্পর্কে ধারণা জন্মাবে,তখন পশ্চিমা সংস্কৃতির বাজে দিক সম্পর্কে তার মনের ভেতর সুস্থ চিন্তা জাগিয়ে দিন। রমযান মাস হতে পারে এই প্রশিক্ষণের শুভ সূচনাকাল। সন্তান যদি ছাত্র বা ছাত্রী হয়ে থাকে,তাহলে রমযান মাসের জন্যে তাকে নতুন একটি রুটিন করে নেওয়ার জন্যে বলুন। সেই রুটিনটি আপনি দেখেশুনে দিন এবং রুটিন অনুযায়ী তার কার্যক্রম লক্ষ্য করুন। মনে রাখবেন রুটিনে এমন শক্ত কোনো কর্মপরিকল্পনা রাখা ঠিক হবে না, যার ফলে আপনাদের সন্তানের ওপর চাপ পড়ে। বরং নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় করণীয়সহ নিজের পড়ালেখার পাশাপাশি সুষ্ঠু একটি কর্মসূচি দিন। যেখানে পড়ালেখার বিষয়টিও থাকবে, নামায, কোরআন তেলাওয়াত, ইসলামী সাহিত্য পাঠসহ টিভির শালীন ও শিক্ষণীয় অনুষ্ঠানগুলো দেখারও সুযোগ থাকবে।

আজকাল নেট ক্যাফে , সাইবার ক্যাফে , কফি নেট ইত্যাদি বিচিত্র নামে ইন্টারনেট ব্রাউজিং-এর জন্যে ব্যবসায়িক বহু প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া যায়। আপনার সন্তানকে যাতে সেখানে সময় কাটাতে না হয় সে ব্যবস্থা সম্ভব হলে আপনি বাসাতেই করে দিতে পারেন। তাহলে সে কী করছে না করছে তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ থাকবে। তবে রমযান মাসে ব্রাউজিং এর ব্যাপারে কৌশলে নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে,ইন্টারনেট ব্রাউজিং এ অভ্যস্ত যারা তারা খুব সহজেই অশালীন সাইটগুলোতে প্রবেশ করতে জানে। এরফলে রমযানের পবিত্রতা যেমন নষ্ট হবে তেমনি নৈতিক চরিত্রও স্খলিত হবে। ব্যাহত হবে রহমত লাভের মহান উদ্দেশ্য। তবে ইন্টারনেটের সুস্থ ও সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধ সাধতে গেলে হিতে বিপরীত হবার আশঙ্কা থেকে যাবে।

সর্বোপরি নৈতিক শিক্ষাই হলো সন্তানদেরকে অনৈতিকতা চর্চা থেকে বিরত রাখার সর্বোত্তম উপায়। রমযান কী,কেন,কীভাবে এলো, এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য,এর তাৎপর্য কী ইত্যাদি বিষয়ে আপনার সন্তানকে পড়ার সুযোগ দিন,তাকে বলারও সুযোগ দিন,বলার জন্যে তাকে বাহ্বা দিন,উৎসাহিত করুন। এতে করে তাকে ভিন্ন জায়গায় সময় নষ্ট করার বাজে অভ্যাস থেকে যেমন বিরত রাখা সহজ হবে,তেমনি নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পথও সুগম হবে। সন্তানদের বই পড়ার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য রাখতে হবে, বাজে কোনো বই কিংবা পর্ণ ম্যাগাজিন বা চরিত্র হনন কারী কোনো ম্যাগাজিন পড়ছে কী না! রমযান মাস এইসব শিক্ষা ও কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্যে উপযুক্ত একটি সময়। এ সময়টাকে আমরা যেন সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি আল্লাহর দরবারে সেই তৌফিক কামনা করছি।

৯ম পর্ব

আত্ম-গর্ব বা আত্মম্ভরিতা বা হামবড়াই নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করব। আলোচনার শুরুতেই পবিত্র কোরআনের সুরা কাহফের ১০৩ এবং ১০৪ আয়াতের দিকে একবার নজর দেই । এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, “বলুন! আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেব, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে বিভ্রান্ত হয়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করেছে।”
অন্যদিকে হজরত আলী (আ) বলেছেন, যার হৃদয়ে একবার আত্মম্ভরিতা বা আত্মগর্ব প্রবেশ করেছে তার ধ্বংস অনিবার্য।

মনোজগতের মারাত্মক এক ব্যাধি আত্মম্ভরিতা বা হামবড়াই বা আত্মগর্বের বিপদের কথা আমরা জানতে পারলাম। অন্য অনেক উপসর্গের মত এরও নানা প্রকারভেদ আছে। এবার এর প্রকারভেদের দিকে নজর দেই। ইমাম মূসা আল কাজেম (আ) বলেছেন, আত্মম্ভরিতা কয়েক প্রকারের। এর মধ্যে একটি হলো, কারো কাছে নিজের বদ বা খারাপ কাজগুলোও সৎ কর্ম হিসেবে প্রতিভাত হতে থাকে এবংg তিনি সে সব কাজকে সৎ কর্ম হিসেবে মনে করতে থাকেন, এবং নিজে ভাল কাজ বা সৎ-কর্ম করছেন বলে ধরে নেন। এ ছাড়া আত্মগর্বের আরেকটি প্রকার হলো, কেউ কেউ মনে করেন ঈমান এনে আল্লাহর প্রতিvv আনুকুল্য দেখান হয়েছে। নাউজুবিল্লাহ। অথচ বাস্তব সত্য হলো, অন্ত:করণে ঈমান আনার শক্তি এবং সামর্থ যুগিয়ে আল্লাহই প্রকৃতপক্ষে তাকে অপরিসীম দয়া করেছেন।

আত্মগর্ব বা আত্মম্ভরিতার আরেকটি প্রতিশব্দ হলো হামবড়াই । আত্মগর্বী ব্যক্তির কাছে নিজের সৎ গুণাবলী বড় হয়ে ভেসে উঠে। তিনি নিজেই নিজেকে বড় করে তোলেন। অর্থাৎ হামবড়াই করতে থাকেন। তিনি তার এই গুণাবলীর জন্য যারপরনাই সন্তোষ প্রকাশ করেন। একইভাবে তিনি নিজেকে সকল ধরণের ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত বলে ভাবতে শিখেন, নিজের সৎগুণের ব্যাপারে বেশ উৎফুল্লবোধ করেন এবং,প্রফুল্ল চিত্তে ভাবেন যে সৎকর্মে লিপ্ত রয়েছেন। নিজের মধ্যে আত্মগর্ব বা আত্মম্ভরিতা নেই তার বদলে সৎগুণরাজি আছে মনে করে তিনি বিনীত চিত্তে খোদার কাছে শোকরিয়াও জ্ঞাপন করেন। কারো কারো মনো জগতের এহেন পরিস্থিতি প্রতিই হয়ত ইঙ্গিত করে হজরত আলী (আ) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে খোদার দরবারে বড় বলে মনে করেন প্রকৃতপক্ষে তিনি একেবারেই মূল্যহীন ব্যক্তি মাত্র।

ইমাম জাফর আস সাদেক (আ) আত্মম্ভরিতা প্রসঙ্গে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, শয়তান বলে, আদম সন্তানদের যদি তিনটি ক্ষেত্রে পরাভূত করতে পারি তবে তারা যতই সৎ কর্ম করুক না কেনো তা নিয়ে আর আমি মাথা ঘামাই না, কারণ আমি নিশ্চিত ভাবে জানি তার ওই সব সৎ কর্ম আর গ্রহণ করা হবে না। এই তিনটি ক্ষেত্র হলো, ১. কেউ যদি নিজের সৎ কর্মকে বাড়িয়ে দেখতে শুরু করে, ২. কেউ যদি তার পাপ-তাপ, ভুল-ভ্রান্তির কথা ভুলে যায়, ৩. কারো মনে যদি আত্মগর্ব, আত্মম্ভরিতা বা হামবড়াই চেপে বসে।

একজন জ্ঞানী বা নিষ্ঠাবান মানুষের মনোজগতের গঠন কি রকম হওয়া বাঞ্চনীয়? বিশ্ব জগতের জন্য রহমত স্বরূপ হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, একজন জ্ঞানী ব্যক্তি অন্যের গুটিকয়েক ভাল কাজকে অফুরন্তর সৎকর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন এবং নিজের অন্তহীন সুকর্মকে হাতে গোণা অল্প কয়েকটি সৎ কর্ম হিসেবে ধরে নেন।

আত্মম্ভরিতা একজন অতিশয় সাধারণ মানুষের সৎ গুণ এবং সৎ কর্মকে যেমন বিনষ্ট করতে পারে ঠিক একইভাবে একজন ধার্মিকের সৎ গুণ এবং সৎ কর্মকে সমভাবে বিনাশ করতে পারে। মানব আত্মাকে বিনাশ করার মতো যে সব বদ বা খারাপ গুণ দেখতে পাওয়া যায় তার মধ্যে আত্মগর্ব বা আত্মম্ভরিতার স্থান রয়েছে। মৃত্যুর পর এবং আলমে বারজাখে অবস্থান কালে আত্মম্ভর ব্যক্তিকে দুঃসহ একাকিত্বের মধ্যে কাটাতে হবে। আত্মম্ভরিতার কাঁধে ভর করে আরো মারাত্মক গুনাহের সূচনা হতে পারে, হতে পারে মারাত্মক কোনো পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ার মতো দুর্ভাগ্য জনক ঘটনা। কারো হৃদয়ে যদি একবার আত্মম্ভরিতার বীজ প্রবেশ করতে পারে তবে সাথে সাথেই তার সৎ কর্মের ইতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত তেমন ব্যক্তির শেরেকের মতো মারাত্মক অপরাধে লিপ্ত হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটতে পারে।

‘বুঝলেই পাগল সারে’ বলে একটা কথা অনেকেই বলে থাকেন। এ কথার মর্মাথ হলো পাগল যদি বুঝতে পারে যে পাগলামী করছে তা হলে সাথে সাথেই পাগলামী বন্ধ করে দেবে। আত্মম্ভরিতার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। কারণ আত্মম্ভর ব্যক্তি কখনোই বুঝতে পারেন না যে তিনি আত্মম্ভরিতা করছেন। কাজেই তিনি নিজেকে শোধরানোর প্রয়োজন আছে বলেই মনে করেন না। তিনি তার অপরাধ বা গোনাহকে ছোট বলে হিসেব করতে থাকেন আর এ ভাবেই তিনি ধ্বংসের পথে ধাবিত হতে থাকেন। আত্মম্ভরিতার কৃষ্ণ পর্দায় তার অন্ত:করণ, তার জ্ঞান-বুদ্ধি, মেধা এবং মনন আগাগোড়া আবৃত হয়ে পড়ে। তিনি আর নিজের কোনো নিচতা বা ক্ষুদ্রতা কিংবা পাপাচার দেখতে পান না। আর এভাবে তিনি কামেল হওয়ার পথ থেকে হারিয়ে যান। তিনি আর পূর্ণতা অর্জন করতে পারেন না।

আত্মম্ভরিতার রাস্তা ধরেই আসে রিয়া বা প্রদর্শন বাতিকতা, নিফাক বা কপটতা। একই সাথে গর্ব উদ্ধত করে তুলে আত্মম্ভর ব্যক্তিকে। এই যখন হয় মনোজগতের অবস্থা তখন অন্যের প্রতি তিনি ঘৃণা প্রদর্শন করেন। অন্যকে তুচ্ছ বলে মনে করতে থাকেন। তিনি মানবিক মূল্যবোধের পথ থেকে সরে যেতে থাকেন ধীরে ধীরে, নিষ্ঠুর হয়ে উঠেন, হয়ে উঠেন হৃদয়হীন এবং তিনি ভয়াবহ ভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন, তার ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায় ধ্বংস। হজরত আলী (আ) বলেছেন, আত্মম্ভরিতা থেকে যে একাকিত্বের সৃষ্টি হয় তার মত ভয়াবহ আর কিছু নেই। তিনি আরো বলেছেন, আত্মম্ভর ব্যক্তির মেধা বা মনন বলে কিছুই নেই। আত্মম্ভরিতাকে তিনি মুর্খতার ভিত্তিফলক বলে অভিহিত করেছেন।

আত্মম্ভরিতা থেকে বাঁচতে বা রক্ষা পেতে হলে কি করতে হবে? হ্যাঁ, এবার আমরা সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করব। প্রথমেই নিজেকে চমৎকার আত্ম বিশ্লেষক হতে হবে। নিজের প্রতি পক্ষপাতহীনভাবে অর্থাৎ নির্মোহ দৃষ্টিপাত করতে হবে। নিজ কর্ম-তৎপরতা,উদ্দেশ্য সহ সব কিছু আবেগবিহীন ভাবে ভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। একই সাথে খোদার দয়া চাইতে হবে। খোদা যেনো তাকে নিজ দুর্বলতা সর্ম্পকে অবহিত হওয়ার সুযোগ দান করেন তা একান্ত ভাবে কামনা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, খোদা যখন কেউকে তার অপার রহমতের ধারায় পূর্ণ করে দিতে চান তখন তাকে নিজ দুর্বলতা, ভুল এবং ভ্রান্তি বোঝার ক্ষমতা দান করেন।

এ কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, যে জীবন, ক্ষমতা,জ্ঞান বা সাফল্য সবই হচ্ছে আল্লাহর অপরিসীম দয়ার কারণে। তার দয়া ও করুণার কারণেই সকল সৎকর্ম, নেক তৎপরতা, এবাদত বা উপাসনা সম্ভব হয়ে উঠছে। জীবনে নানা সুযোগ লাভ ঘটছে। তার ইঙ্গিত ছাড়া আমাদের কারো পক্ষেই কোনো ভাল কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীর কোনো মানুষই তার প্রতি অর্পিত ইবাদতের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। নবী-রসুল-ইমাম-আউলিয়াদের মর্মস্পর্শী দোয়া এবং আল্লাহর দরবারে পানা ও মাগফেরাত কামনা করে কান্নাকাটি এ কথার স্বাক্ষ্য বহন করে। তারা জানতেন জীবনের প্রতিটি মুর্হুত এবাদতের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করলেও আল্লাহর সীমাহীন দয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না। কাজেই তারা বিনম্র চিত্তে এবং সিক্ত হৃদয়ে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করতেন কাজেই তাদের রাস্তা ধরে আমাদের সবাইকে পরম বিনম্র চিত্তে তার ক্ষমা ও মাগফেরাত কামনা করতে হবে।
আল্লাহর সীমাহীন বরকত, রহমত এবং মাগফেরাত লাভের মাস এই রমজান। আসুন আমরা আত্মগর্ব, হামবড়াই বা আত্মম্ভরিতার কৃষ্ণব্যাধি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আজ থেকে তার দরবারে নতজানু হই। কান্নায় ভেংগে পড়ি আমাদের পাপ মোচনের জন্য। ইমাম বাকের (আ) বলেছেন, আত্মগর্বের পথ আধ্যাত্মিকতা দ্বারা রুদ্ধ করে দিতে হবে।

Share

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY