Home গ্রন্থাগার মুসলিম সমাজে অদৃষ্টবাদ ও নিরঙ্কুশ এখ্তিয়ারবাদ

মুসলিম সমাজে অদৃষ্টবাদ ও নিরঙ্কুশ এখ্তিয়ারবাদ

561
2
SHARE

মুসলিম সমাজে অদৃষ্টবাদ ও নিরঙ্কুশ এখ্তিয়ারবাদ

হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলই (আঃ) মানুষকে আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পিত হয়ে চলার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা মানুষের নিকট প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা ও আচরণবিধি উপস্থাপন করেন ও তাদেরকে তা শিক্ষা দেন এবং পরিস্থিতি অনুকূল হলে তা পূর্ণ মাত্রায় বাস্তবায়িত করেন। এ ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর মাধ্যমে আল্লাহর দেয়া জীবনবিধান ইসলাম পরিপূর্ণ ও চূড়ান্তরূপে নাযিল হয় এবং এ জীবনবিধান সহ মানুষের জন্য আল্লাহ্ তা‘আলার পরিপূর্ণ বাণী কোরআন মজীদকে স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলাই সামান্যতম বিকৃতি থেকেও রক্ষার নিশ্চিত ব্যবস্থা করেন (সূরাহ্ আল্-হিজর ঃ ৯)।
কোরআন মজীদ মানুষের গড়া অন্ধ আকিদা-বিশ্বাস ভিত্তিক ধর্ম ও মতাদর্শ সমূহের কঠোর সমালোচনা করেছে এবং তাদেরকে বিচারবুদ্ধি (‘আক্বল্) প্রয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। কোরআন মজীদে বার বার বলা হয়েছে ঃ افلا تعقلون (অতঃপর তোমরা কি বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাবে না?) আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন ঃ
ان شر الدوابّ عند الله الصم البکم الذين لا يعقلون.
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র নিকট নিকৃষ্টতম জন্তু হচ্ছে সেই বধির-বোবার দল যারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে না।” (সূরাহ্ ৮ ¬Ñ আল-আন্ফাল্ ঃ ২২)

অবশ্য কোরআন মজীদ ‘আক্বলের অগম্য ক্ষেত্রসমূহের জন্য এবং ‘আক্বলের গম্য ক্ষেত্রসমূহেও তাকে ভুল-ভ্রান্তি থেকে রক্ষা ও তাকে সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ দিয়েছে। আর হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ছিলেন জীবন্ত কোরআন; তিনি কোরআন মজীদের প্রচার করেছেন, লোকদেরকে সেদিকে আহ্বান করেছেন, তা শিক্ষা দিয়েছেন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তার ব্যাখ্যা পেশ করেছেন এবং স্বীয় জীবনে ও সমাজে তা বাস্তবায়িত করেছেন।
হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) যে ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা ও আচরণ শিক্ষা দিয়ে যান তা তাঁর ওফাতের পরে খোলাফায়ে রাশেদীনের (রাঃ) যুগেও পুরোপুরি অব্যাহত থাকে। তাই এ যুগে মুসলিম সমাজে অদৃষ্টবাদ ও নিরঙ্কুশ এখতিয়ারবাদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পরে ধীরে ধীরে অদৃষ্টবাদী চিন্তাধারা গড়ে উঠতে থাকে। এর আভাস পাওয়া যায় ইয়াযীদের এতদসংক্রান্ত যুক্তি উপস্থাপনের মাঝে। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ)-এর বোন হযরত যায়নাব (রাঃ)-এর সাথে বিতর্ককালে ইয়াযীদ তাঁকে বলেছিলো ঃ “আমরাই সত্যের ওপরে আছি; আল্লাহ্ তোমার পিতার নিকট থেকে রাজত্ব কেড়ে নিয়ে আমার পিতাকে দিয়েছেন এবং হোসেনকে লাঞ্ছিত ও আমাকে সম্মানিত করেছেন।” তার দাবী ছিলো এবং তার অনুগতরা প্রচার করতো যে, আল্লাহ্র ইচ্ছা না হলে ইয়াযীদ খেলাফতে অধিষ্ঠিত হতে পারতো না।
অবশ্য দ্বীনী বিষয়ে মানুষ যাদের কথা মেনে চলতো এবং যাদের নিকট থেকে দ্বীনী শিক্ষা গ্রহণ করতো তাঁদের মধ্যে তখনো অদৃষ্টবাদিতা প্রবেশ করে নি। কিন্তু সাধারণ জনগণের মধ্যে হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতির কারণে অদৃষ্টবাদিতার প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। পরবর্তী কালে দ্বীনী চিন্তাবিদগণের কারো কারো মধ্যে এর প্রভাব কিছুটা হলেও প্রবেশ করতে থাকে। এ কারণেই দ্বীনী ব্যক্তিত্ববর্গের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক বিষয়াদিকে সযতেœ এড়িয়ে চলার পথ বেছে নেন। অর্থাৎ দ্বীনী ব্যক্তিত্ববর্গের কতক যেখানে উমাইয়্যাহ্ বংশের শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং একাংশ অহিংস অসহযোগ নীতি অনুসরণ করে স্বাধীনভাবে দ্বীনী জ্ঞান-গবেষণা ও জনগণকে শিক্ষাদানের কাজে আত্মনিয়োগ করেন, তখন এই তৃতীয় অংশটি উক্ত উভয় পন্থা পরিহার করে ‘অরাজনৈতিক’ দ্বীনী চর্চায় মশগুল হন।
জাবারিয়্যাহ্ ও মু‘তাযিলী চিন্তাধারার আবির্ভাব
মুসলমানদের মধ্যকার ‘অরাজনৈতিক’ দ্বীনী চর্চায় মশগুল ধারার অনুসারীদের মধ্যে পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে অদৃষ্টবাদিতা একটি মতাদর্শরূপে গড়ে ওঠে যা ‘জাবারিয়্যাহ্’ মতবাদ নামে পরিচিত। এ ধারার সর্বপ্রথম বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন হযরত হাসান বছরী (রহ্ঃ) (২১-১১০ হিজরী)। অবশ্য তাঁর সময় অদষ্টবাদী চিন্তা-বিশ্বাসের ব্যাপক বিস্তার ঘটে নি। পরবর্তী কালে আবুল হাসান আশ্‘আরীর (২৬০-৩২৪ হিজরী) মাধ্যমে অদৃষ্টবাদী চিন্তাধারার ব্যাপক বিস্তার ঘটে।
হাসান বছরীর অন্যতম শিষ্য ওয়াছেল্ বিন্ ‘আত্বা (৮০-১৩১ হিজরী) তাঁর সাথে মতপার্থক্য করে তাঁর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান এবং নিজস্ব চিন্তাধারা প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি কোরআন ও হাদীছের যে সব উক্তির বাহ্যিক বা আক্ষরিক তাৎপর্য বিচারবুদ্ধির রায়ের সাথে খাপ খায় না বলে মনে করেন সে সব উক্তিকে ভাবার্থক বা রূপকার্থক বলে ব্যাখ্যা করেন। এর ভিত্তিতেই তিনি মানুষের পরিপূর্ণ স্বাধীন কর্মক্ষমতার প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। এ চিন্তাধারা অনুযায়ী, আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের কাজকর্মে মোটেই হস্তক্ষেপ করেন না।
ওয়াছেল্ বিন্ ‘আত্বা তাঁর শিক্ষক হাসান বছরী থেকে ও হাসান বছরীর অন্যান্য শিষ্য থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় তাঁকে “মু‘তাযিলী” (বিচ্ছিন্ন হয়ে এক কোণায় চলে যাওয়া) বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ থেকে তাঁর চিন্তাধারার অনুসারীদেরকেও “মু‘তাযিলী” নামে অভিহিত করা হয়।
ওয়াছেল্ বিন্ ‘আত্বা ও হাসান বছরীর অনুসারীদের মধ্যে একদিকে অদৃষ্টবাদ বনাম নিরঙ্কুশ এখতিয়ারবাদ নিয়ে, অন্যদিকে কোরআন মজীদের অর্থগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধে ওঠে। কারণ, মু‘তাযিলীদের মতের বিপরীতে, হাসান বছরীর অনুসারীরা কোরআন-হাদীছের একটিমাত্র বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করতেন। এমনকি তাঁরা কোরআন মজীদের ‘মুতাশাবেহ্’ আয়াতেরও বাহ্যিক ও আক্ষরিক তাৎপর্যের প্রবক্তা ছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ ঃ তাঁরা আল্লাহ্ তা‘আলার হাত থাকা এবং তাঁর ‘র্আশে অধিষ্ঠান সংক্রান্ত আয়াতের আক্ষরিক তাৎপর্য গ্রহণ করতেন।
এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ওয়াছেল্ বিন্ ‘আত্বা (৮০-১৩১ হিজরী) এবং ইসলামের ইতিহাসের তিনজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্বীনী ইমাম ও মনীষী হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রহ্ঃ) (৮৩-১৪৮ হিজরী), হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ্ঃ) (৮০-১৫০ হিজরী) ও হযরত ইমাম মালেক (রহ্ঃ) (৯৩-১৭৯ হিজরী) ছিলেন সমসাময়িক। আলোচ্য বিষয়ে এ তিনজন ইমামের চিন্তাধারা ছিলো ভারসাম্যপূর্ণ। অর্থাৎ তাঁরা না জাবারিয়্যাহ্ ছিলেন, না মু‘তাযিলী ছিলেন।
পরবর্তী কালে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে হানাফী মাযহাবের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। কিন্তু হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ্ঃ)-এর সমপর্যায়ের দ্বীনী ইমামের অনুপস্থিতির কারণে এবং আবুল হাসান আশ্‘আরী কর্তৃক মু‘তাযিলী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারা গ্রহণ করে তার প্রচার-প্রসারে সর্বাত্মকভাবে আত্মনিয়োগের ফলে তাঁর ও তাঁর চিন্তাধারা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে হানাফী মাযহাবের অনুসারীরা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এভাবে এক সময় অ-হানাফী জাবারিয়্যাহ্ ‘আক্বিদাহ্ (অদৃষ্টবাদী চিন্তাধারা) বাহ্যতঃ হানাফী মাযহাবের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। অন্যান্য মাযহাব, বিশেষতঃ হাম্বালী মাযহাবের অনুসারীরাও এ চিন্তাধারার দ্বারা কমবেশী প্রভাবিত হয়ে পড়ে।
যেহেতু জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারার অনুসারীরা ‘আক্বায়েদের ক্ষেত্রে ‘আক্বল্ (বিচারবুদ্ধি) প্রয়োগের বিরোধী ছিলেন এবং এর বিপরীতে মু‘তাযিলীরা ‘আক্বল্-এর ব্যবহারের ওপর খুবই গুরুত্ব আরোপ করতেন, আর মানুষ স্বভাবতঃই যে কোনো বিষয়ে কমবেশী বিচারবুদ্ধি (‘আক্বল্) প্রয়োগ করে এবং কোরআন মজীদেও ‘আক্বলের প্রয়োগের ওপর তাকিদ করা হয়েছে, যারা ‘আক্বল্ কাজে লাগায় না তাদের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে, সেহেতু মু‘তাযিলী চিন্তাধারার উদ্ভব হওয়ার পর থেকেই এ চিন্তাধারার অনুসারীদের মোকাবিলায় জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারার অনুসারীরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু আবুল হাসান আশ্‘আরী কর্তৃক মু‘তাযিলী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারা গ্রহণের ফলে স্রোতের গতি বিপরীতমুখী হয়ে যায়।
এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে, জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারা মূলগতভাবে বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ তথা যুক্তি প্রয়োগের বিরোধী হবার দাবী করলেও বিভিন্ন যুক্তির আশ্রয় নিয়ে তারা মু‘তাযিলী চিন্তাধারা খণ্ডন ও জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারার যথার্থতা প্রমাণের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক পরিহাস এই যে, তাদের চিন্তাধারার মধ্যকার এবং চিন্তা ও আচরণের মধ্যকার এ স্ববিরোধিতার প্রতি যথাযথভাবে দৃষ্টি প্রদান ও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় নি।
জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারায় নতুন প্রাণ সঞ্চার
জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারায় নতুন প্রাণ সঞ্চারকারী আবুল হাসান আশ্‘আরী (২৬০ Ñ ৩২৪ হিজরী) ছিলেন সমকালীন মু‘তাযিলী শেখ আবূ আলী জুবাঈ-র (ওফাত ৩০৩ হিজরী) শিষ্য। আবুল হাসান আশ্‘আরী কর্তৃক মু‘তাযিলী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারা গ্রহণের ঘটনাটি নিুরূপ ঃ
আবুল হাসান একদিন তাঁর শিক্ষক আবূ আলী জুবাঈকে জিজ্ঞেস করলেন ঃ “বান্দাহ্র কল্যাণ সাধন করা আল্লাহ্র জন্য অপরিহার্য কিনা?” আবূ আলী বললেন ঃ “হ্যা।” আবুল হাসান বললেন ঃ “কাফেরের সন্তান সেই তিনটি শিশু সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী যাদের একজন বালেগ হবার পূর্বেই আল্লাহ্ তাকে মৃত্যু দিলেন এবং অপর দু’জনকে জীবিত রাখলেন, অতঃপর তাদের একজন মুসলমান ও আল্লাহ্র হুকুমের অনুগত হলো, আর অপর জন কাফের হলো ও গুনাহ্গার হলো? কিয়ামতের দিন এ তিন ভাইয়ের অবস্থা ও তাদের সম্পর্কে হুকুম কী হবে?”
জবাবে আবূ আলী বললেন ঃ “যে মুসলমান হলো সে বেহেশতে যাবে, আর যে কাফের হলো সে দোযখে যাবে এবং যে বালেগ হবার আগে মারা গেলো সে না বেহেশতে যাবে, না দোযখে যাবে।”
তখন আবূল হাসান বললেন ঃ “যে বালেগ হওয়ার আগেই মারা গেলো সে যদি বলে ঃ ‘হে আল্লাহ্! আপনি যদি আমাকে জীবিত রাখতেন তাহলে আমি আপনার প্রতি ঈমান আনয়ন করতাম এবং আজ বেহেশতে গিয়ে আপনার বেহেশতী নে‘আমতের অধিকারী হতাম।’ তখন আল্লাহ্ তাকে কী জবাব দেবেন?”
আবূ আলী বললেন ঃ “সে তো জানে না যে, হয়তো জীবিত থাকলে সে কাফের হতো এবং জাহান্নামে যেতো। আল্লাহ্ তা‘আলা জানেন যে, এতেই তার কল্যাণ নিহিত যে, সে বালেগ হওয়ার আগেই মারা যাবে।”
তখন আবূল হাসান বললেন ঃ “আল্লাহ্ তা‘আলা এ তিন জনের মধ্য থেকে এক জনের ক্ষেত্রে কেন কল্যাণ নিশ্চিত করলেন? যে কাফের হয়েছে তার ক্ষেত্রে কেন কল্যাণ নিশ্চিত করলেন না?”
আবূ আলী এ কথার কোনো জবাব দিতে পারলেন না। তখন আবূল হাসান তাঁর নিকট থেকে চলে গেলেন এবং বললেন ঃ “আল্লাহ্ তা‘আলার হুকুম (বা কাজ)কে মু‘তাযিলী চিন্তাধারার সাহায্যে পরিমাপ (বিশ্লেষণ) করা যাবে তা থেকে তিনি উর্ধে।” অতঃপর তিনি মু‘তাযিলী চিন্তাধারা খণ্ডনে আত্মনিয়োগ করলেন।
ঘটনার পর্যালোচনা
এ ঘটনাটি মানব জাতির ইতিহাসে সর্বাধিক প্রচারিত ঘটনাবলীর অন্যতম। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে শত শত বছর ধরে ব্যাপক জনগণের মধ্যে অদৃষ্টবাদী চিন্তাধারার ভিত্তি হিসেবে এ ঘটনাটি কাজ করে আসছে। এখনো অদৃষ্টবাদিতার পক্ষে যুক্তি হিসেবে এ ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়। তাই এ ঘটনাটি বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, এ ঘটনাটির মধ্যে যেমন স্ববিরোধিতা রয়েছে তেমনি রয়েছে ভ্রমাত্মক যুক্তি (مغالطة =fallacy)।
আলোচ্য ঘটনায় আবুল হাসান আশ্‘আরী ও শেখ আবূ আলী জুবাঈ উভয়ের মধ্যেই, তাঁদের নিজ নিজ ‘আক্বিদাহ্ প্রশ্নে স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়।
আবুল হাসান আশ্‘আরী মু‘তাযিলী চিন্তাধারা পরিত্যাগ করে জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারা গ্রহণ করেন। জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারা ‘আক্বল্ বা বিচারবুদ্ধির সত্য উদ্ঘাটন ক্ষমতায় বিশ্বাসী নয়। অর্থাৎ এ চিন্তাধারার দাবী অনুযায়ী যুক্তিতর্কের দ্বারা সত্যে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ‘আক্বল্ প্রয়োগ করে অর্থাৎ যুক্তিতর্কের আশ্রয় নিয়ে মু‘তাযিলী চিন্তাধারাকে ভুল প্রতিপন্ন করে জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারাকে গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি, মুখে স্বীকার না করলেও কার্যতঃ স্বীকার করে নিলেন যে, ‘আক্বলের প্রয়োগ বা যুক্তিতর্কের সাহায্যে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা সম্ভব। এর উপসংহার দাঁড়ায় এই যে, মু‘তাযিলী চিন্তাধারা ভুল হলেও জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারা সঠিক নয়। কারণ, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে এ মতের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালানো হয়েছে, যদিও এ মত অনুযায়ী যুক্তিতর্কের সাহায্যে কোনো কিছুর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আবুল হাসান আশ্‘আরী এ সত্যটির দিকে দৃষ্টি দিতে ব্যর্থ হন এবং তিনি যে মানদণ্ডকে বাতিল করে দিয়েছেন সে মানদণ্ডের দ্বারাই স্বীয় মত প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। এভাবে তিনি চিন্তার ভারসাম্য রাখতে ব্যর্থ হন। ফলে তিনি এক ভুল থেকে আরেক ভুলে স্থানান্তরিত হন।
 শেখ আবূ আলী জুবাঈর চিন্তাধারাও স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত। আর তার কারণ হচ্ছে যুক্তিতর্ককে সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে না পারা। তিনি এমন একটি বিষয়কে সঠিক ধরে নিয়ে যুক্তিতর্কে অংশগ্রহণ করেন যা মু‘তাযিলী চিন্তাধারার মূল ভিত্তির সাথে সাংঘর্ষিক।
মু‘তাযিলী চিন্তাধারার মূল ভিত্তি হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করেন না; মানুষ তার কাজকর্মের ব্যাপারে পুরোপুরি স্বাধীন। কিন্তু আবুল হাসান ও আবূ আলীর মধ্যকার কথোপকথনে দেখা যাচ্ছে, আবুল হাসান আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে মানুষের জীবনে হস্তক্ষেপ করার পরিচায়ক একটি বিষয় উপস্থাপন করলে আবূ আলী তা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়ে আবূল হাসানের প্রশ্নের জবাব দেন।
আবুল হাসান আশ্‘আরী নাবালেগ শিশুর মৃত্যুর জন্য একমাত্র কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আল্লাহ্ তা‘আলার ইচ্ছাকে। তিনি অন্য কোনো কারণকে বিবেচনায় নেন নি। এটা জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যশীল, মু‘তাযিলী চিন্তাধারার সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়।
মু‘তাযিলী চিন্তাধারা অনুযায়ী আবূ আলীর বলা উচিৎ ছিলো যে, শিশুটির মৃত্যুর জন্য প্রাকৃতিক কারণ (এবং মানবিক কারণও, যেমন ঃ পিতামাতার পক্ষ থেকে যথাযথ যতœ না নেয়া) দায়ী। কিন্তু তিনি এখানে জাবারিয়্যাহ্ চিন্তাধারাকেই মেনে নিয়েছেন। এটা তাঁর চিন্তাধারার স্ববিরোধিতার পরিচায়ক।
চিন্তাধারার স্ববিরোধিতা ছাড়াও উভয়ের উপস্থাপিত বক্তব্যে অনেক দুর্বলতা নিহিত রয়েছে।
প্রথমতঃ কথিত নাবালেগ শিশুর মৃত্যুর জন্য কেবল আল্লাহ্ তা‘আলার ইচ্ছাকেই দায়ী করা হয়েছে এবং অন্যান্য কারণকে (প্রাকৃতিক ও মানবিক) উপেক্ষা করা হয়েছে। অথচ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা ইতিবাচকভাবে বা কল্যাণের লক্ষ্যে ব্যতীত বান্দার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেন না। দৃশ্যতঃ আল্লাহ্ তা‘আলার কোনো হস্তক্ষেপ নেতিবাচক হলেও (যেমন ঃ মৃত্যু ও ধ্বংস) উদ্দেশ্য ও ফলাফলের দিক থেকে তা ইতিবাচক ও কল্যাণকর। আল্লাহ্ তা‘আলার সমগ্র সৃষ্টিকর্মকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে উপনীত করা এবং ব্যষ্টি ও সমষ্টির কল্যাণের লক্ষ্যে অপরিহার্য না হলে আল্লাহ্ তা‘আলা কোনো নেতিবাচক হস্তক্ষেপ করেন না। (এ প্রসঙ্গে পরে অধিকতর আলোকপাত করা হয়েছে।)
দ্বিতীয়তঃ কাফেরের যে সন্তান নাবালেগ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে সে বেহেশতেও যাবে না, দোযখেও যাবে না Ñ এ ধারণা হচ্ছে একটি কল্পিত ধারণা যার পিছনে কোনো অকাট্য ভিত্তি নেই। কোরআন মজীদে জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের মাঝখানে আ‘রাফবাসীদের সাময়িক অবস্থানের কথা আছে যারা শেষ পর্যন্ত বেহেশতে যাবে (সূরাহ্ আল্-আ‘রাফ ঃ ৪৬ – ৪৯)। কিন্তু এ আ‘রাফবাসীদের মধ্যে নাবালেগরা শমিল নয়। এছাড়া নাবালেগদের জন্য বেহেশত ও দোযখের বাইরে তৃতীয় কোনো পারলৌকিক জগতের কথা কোনো অকাট্য সূত্রেই বর্ণিত হয় নি।
তৃতীয়তঃ বেহেশতীদের সামনে চিরন্তন শিশু-কিশোররা ঘুরে বেড়াবে (সূরাহ্ আল্-ওয়াক্বেয়াহ্ ঃ ১৭)। নিঃসন্দেহে এ শিশু-কিশোররা সেই মানব সন্তান যারা নাবালেগ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং এ ক্ষেত্রে তাদের কেবল মুসলমান পিতা-মাতার সন্তান হওয়া অপরিহার্য হতে পারে না। কারণ, শিশু-কিশোররা যেহেতু নিষ্পাপ সেহেতু তাদের মধ্যে পার্থক্য করার কথা চিন্তনীয় নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই শিশু-কিশোররা বেহেশতবাসী হিসেবে পরিগণিত হবে কিনা। এর জবাব হচ্ছে, না। কারণ, বেহেশতবাসী হওয়া মানে শুধু বেহেশতের মাঝে অবস্থান করার সুযোগ লাভ নয়। বরং পারিভাষিক অর্থে বেহেশতবাসী বলতে বুঝায় ভালো কাজের পুরস্কার স্বরূপ বেহেশতে অবস্থান (ও তার উপকরণাদি ভোগের সুযোগ লাভ)। এ অর্থে ‘চিরন্তন শিশু-কিশোররা’ ‘বেহেশতবাসী’ বলে পরিগণিত হবে না, বরং তারা হবে বেহেশতের উপকরণ। কারণ, বেহেশতবাসীরা তাদেরকে এবং তাদের চলাফেরা ও খেলাধুলা দর্শন করে এবং তাদের কথাবার্তা শ্রবণ করে আনন্দিত হবে। বেহেশতবাসীরা বেহেশতের মাঝে যে সব গায়ক পাখীর গান শুনে আনন্দিত হবে সে সব পাখী নিঃসন্দেহে বেহেশতবাসী বলে পরিগণিত নয়, বরং বেহেশতের উপকরণ রূপে পরিগণিত।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বেহেশতে যে সব বস্তুগত ভোগোপকরণ থাকবে তাতে দৃশ্যতঃ বিভিন্ন বেহেশতবাসীর মধ্যে কোনো রূপ পার্থক্য হবে না। কারণ, বেহেশতবাসীরা যা চাইবে তা-ই পাবে। কিন্তু বেহেশতে যে সব আত্মিক ও মানসিক নে‘আমত লাভ হবে তা পার্থিব জীবনে ব্যক্তির আত্মিক-মানসিক গঠন অনুযায়ী বিভিন্ন হবে এবং তার গুরুত্ব হবে এতই বেশী যে, বস্তুগত নে‘আমতকে কিছুতেই তার সাথে তুলনা করা যাবে না। এসব নে‘আমতের অধিকারীদের নিকট ঐ সব আত্মিক ও মানসিক নে‘আমতের তুলনায় বেহেশতের বস্তুগত উপকরণ খুবই নগণ্য বলে মনে হবে। অথচ অনেকে এ ধরনের আত্মিক ও মানসিক নে‘আমত লাভের ইচ্ছাই পোষণ করবে না। অবশ্য বস্তুগত নে‘আমত নেক আমলের পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্তির মধ্যে একটা আত্মিক-মানসিক আনন্দ রয়েছে যা অভিন্ন বস্তুগত নে‘আমত স্রেফ দান হিসেবে প্রাপ্তির মধ্যে থাকে না।
বলা বাহুল্য যে, চিরন্তন শিশু-কিশোররা বেহেশতের বস্তুগত নে‘আমত ভোগ করলেও তা হবে কর্মের প্রতিদানপ্রাপ্তির অনুভূতিজাত ও অন্যান্য আত্মিক-মানসিক নে‘আমত থেকে শূন্য। এমনকি যে সব বস্তুগত নে‘আমতের মধ্যে আত্মিক-মানসিক দিক জড়িত আছে তা থেকেও শিশু-কিশোরদের পক্ষে পরিপূর্ণ ভোগ সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ বেহেশতবাসী নারী-পুরুষের পবিত্র জুটির কথা বলা যায়। কারণ, একজন যুবকের দৃষ্টিতে একজন যুবতী এবং একজন যুবতীর দৃষ্টিতে একজন যুবক যে ধরনের নে‘আমত, একটি শিশুর দৃষ্টিতে তা নয়।
অতএব, বেহেশতে থাকা সত্ত্বেও শিশু-কিশোরদেরকে পারিভাষিক অর্থে বেহেশতবাসী বলা যাবে না। কারণ, তাদেরকে বেহেশতবাসী বলতে হলে বেহেশতের গায়ক পাখী ও প্রজাপতিদেরকেও বেহেশতবাসী বলতে হবে।
চতুর্থতঃ ওপরে যেমন উল্লিখিত হয়েছে, বেহেশতের সুখ বেহেশতবাসীর আত্মিক-মানসিক গঠনের ওপর নির্ভরশীল হবে বিধায় বিভিন্ন জনের সুখ-আনন্দ ভোগের মাত্রায় পার্থক্য হতে বাধ্য। কারণ, প্রত্যেকে স্বীয় আত্মিক-মানসিক গঠন অনুযায়ী যা চাইবে তা-ই লাভ করবে। অতএব, শিশু-কিশোরদের মনে বেহেশতবাসীদেরকে দেয় উচ্চতর নে‘আমত সমূহ লাভের আকাক্সক্ষাই জাগ্রত হবে না, ঠিক যেভাবে কয়েক দিন বয়সী ব্যঘ্র শিশুর সামনে মাতৃস্তন ও হরিণ শাবক বা তার গোশ্ত থাকলে সে মাতৃস্তন পান করবে; হরিণ শাবক বা তার গোশতের প্রতি তার কোনো আগ্রহ সৃষ্টি হবে না। অতএব, নাবালেগ শিশুর পক্ষ থেকে ‘বেহেশতবাসী’ হতে না পারার জন্য অভিযোগ উত্থাপনের প্রশ্নই ওঠে না।
পঞ্চমতঃ আবুল হাসান আশ্‘আরী তাঁর শিক্ষকের সাথে কথোপকথনের উপসংহারে যে মন্তব্য করেছেন তা ভ্রমাত্মক যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বললেন ঃ تعالی ذوالجلال ان توزن احکامه بالاعتزال  Ñ “মহাপরাক্রান্তের (আল্লাহ্ তা‘আলার) হুকুম (বা কাজ) সমূহ মু‘তাযিলী চিন্তাধারার দ্বারা পরিমাপ (বিশ্লেষণ) করা যাবে Ñ তা থেকে তিনি উর্ধে।” তাঁর এ কথার লক্ষ্য যদি শুধু মু‘তাযিলী চিন্তাধারার ত্র“টিনির্দেশ হতো তাহলে তা অত গুরুত্ব বহন করতো না। কিন্তু এ কথার লক্ষ্য ছিলো (এবং পরে আশ্‘আরী চিন্তাধারার পক্ষ থেকে যা সুস্পষ্ট ভাষায় দাবী করা হয়) ঃ আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর কাজের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করেন বলে মনে করা ঠিক নয় এবং মানুষের বিচারবুদ্ধি তাঁর কাজের কোনো নিয়মনীতি উদ্ঘাটন করতে সক্ষম নয়।

Share

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here